সামনে এগোতে শুরু করল সবাই। টানা একঘন্টা চলার পর ওরা দেখল জলধারা চওড়া হয়ে তারপর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দু’দিকে চলে গেছে। লিওর দিকে তাকাল স্যাম।
‘কোনদিকে যাওয়া যায়?
‘কোনোদিকেই নয়। তবে হোটেলে ফিরে গেলে ভাল হয়।
কী যে বলো? গুপ্তধন উদ্ধার করতে এসে এরকম কথা বলা মানায়?
‘আরে ভাই, একটা রাস্তা পছন্দ করে ফেলুন। উৎসাহ দিল ল্যাজলো। ‘একটু রোমাঞ্চের স্বাদ নিন!
লিও’র সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করল সবাই। কিছুক্ষণ পর ডান দিকে যাওয়ার মত দিল লিও। এই জলধারা পূর্ব দিকে একটু বেশি এগিয়েছে।’
‘এবার বুঝেছ? কেন কর্নেল লিখে যায়নি “জলধারা ধরে এগোলে গুপ্তধন পেয়ে যাবে?” খোঁচা মারল রেমি।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করল সবাই। চড়াই উঠছে। অনেক খানি উঁচুতে ওঠার পর থামল ওরা। নিচের দিকে তাকাল স্যাম।
‘নাহ। ওরা ভারি গুপ্তধন নিয়ে এত উঁচুতে উঠতেই পারে না। আমরা ভুল পথে এসেছি।’
মাথা নেড়ে সায় দিল রেমি। হুম। চলো অন্য পথ ধরে এগোই।’
স্যাম আকাশের দিকে তাকাল। জলধারা ঠিক যেখানে দু’ভাগ হয়েছে। ওখানে পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। রাতটা আমরা ওখানেই ক্যাম্প করে কাটাব। তারপর সকালে উঠে আবার রওনা হওয়া যাবে।’
ল্যাজলো তাকাল লিও’র দিকে। মন খারাপ করবেন না, মিস্টার লিও। ভুল হতেই পারে। ব্যাপার না।’
‘এজন্যই আমি তখন বলেছিলাম হোটেলে ফিরে যাই। লিও জবাব দিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী তাবুতে রাত কাটাল ওরা। ডিনারের মেনুটা সাদামাটা হলেও খেয়ে সবাই তৃপ্তি পেয়েছিল। কিন্তু অশান্তি করেছে ঢাউস সাইজের মশাগুলো।
সারারাত মশার গান শুনে সকালে উঠল অভিযাত্রী দল। সময় নষ্ট না করে এগিয়ে চলল ২য় জলধারা ধরে। জঙ্গল কুয়াশায় ঢাকা। ২০ মিটারের বেশি দৃষ্টি দেয়া যাচ্ছে না।
এগোতে এগোতে হঠাৎ মাথা নিচু করে থামল স্যাম। এক হাত উঁচু করে সঙ্গীদেরকেও থামার ইঙ্গিত করল। থামল সবাই। তাকাল পেছনে।
“কিছু শুনেছ?’ রেমিকে জিজ্ঞেস করল স্যাম।
রেমি মাথা নাড়ল। না তো৷ কী?
‘আমার মনে হলো আমি পানিতে কিছু পড়ার আওয়াজ শুনলাম।
ওদেরকে অবাক করে দিয়ে দুরদার করে সামনের এগিয়ে গেল ল্যাজলো। ঠিকই শুনেছেন। আমরা এবার সেই ঝরনাধারা পেয়ে গেছি। ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলল সে।
সবাই দৌড়ে গেল ল্যাজলোর কাছে। দেখল সামনে একটা উঁচু ঝরনা। চওড়াও বেশ ভাল। প্রায় ২০ ফুট। অনবরত সাদা পানি ঝরিয়ে যাচ্ছে। তার ডানপাশে আরেকটা ছোট ঝরনা।
ছোট ঝরনার দিকে তাকিয়ে বলল রেমি। দেখো, ওই ঝরনা থেকে অন্তত আরও দুটো জলধারার জন্ম হয়েছে।’
হুম। কিন্তু এবার আসল প্রশ্নটা হচ্ছে কুমাসাকা তার নোটবুকে ঝরনার পেছনে যেতে বলেছে। তাহলে?’ স্যাম প্রশ্ন করল।
‘এখন কোনটার পেছনে যাব?’ জানতে চাইল ল্যাজলো।
‘তারমানে আমরা একটা গুহার মতো কিছু খুঁজছি, তাই না? আমার দৃষ্টিশক্তি মোটামুটি ভালই। আমি ছোট ঝরনাটার পেছনে বিশাল সাইজের পাথর আর গুহার মতো কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি। লিও জানাল।
মাথা নেড়ে দাঁত বের করে হাসল স্যাম।
ঝরনার ওপাশে.. অর্থাৎ ঝরনার পেছনে… ঠিক রেমি ফিসফিস করল।
‘ভাইসাহেব, আপনাকে যে যা-ই ভাবুক। আমি মনে করি, আপনাকে সবাই যতটা ভাবে আপনি আসলে ততটা খারাপ নন। লিও’র পিঠ চাপড়ে বলল ল্যাজলো। ল্যাজলোর দিকে তাকিয়ে হুতুম পেঁচার মতো মুখ করল লিও। সরে গেল একপাশে। ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে, প্রশংসার আড়ালে খোঁচা লুকিয়ে আছে।
জিপিএস-এ আবার চিহ্ন দিল স্যাম। তাহলে আর দেরি কীসের? চলো, যাওয়া যাক। আমরা একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছি। আচ্ছা, এখান থেকে রেমি আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাও। যাবে?
‘আমার মনে হয় এই সম্মানটা ল্যাজলো’র প্রাপ্য। কোডটা তো উনি ভেঙেছেন।’ বলল রেমি।
‘আহ, বেশ বেশ। আমি-ই যাচ্ছি সামনে। আমার পেছন পেছন আসুন সবাই। ফলো মি! ল্যাজলো সামনে পা বাড়াল।
***
গুহার মুখটা বিশালাকৃতির। গুহার মুখ তিন মিনিট ধরে ম্যাচেটি দিয়ে পরিষ্কার করে তারপর প্রবেশ করল ওরা।
ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতে হবে। স্যাম বলল। ফ্ল্যাশলাইট অন করল সবাই।
ল্যাজলো সবার সামনে খুব সাবধানে পা ফেলে এগোচ্ছে। গুহার ভেতরের উচ্চতা খুব একটা বেশি নয়; মাত্র ৫ ফুট, চওড়ায় টেনেটুনে ১৫ ফুট হবে। মাথানিচু করে এগোচ্ছে ওরা। গুহার আরও ভেতরে প্রবেশ করে ওরা দেখতে পেল ভূমিতে পানি জমে জলাশয়ের মতো তৈরি করেছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে ওতে। হয়তো ঝরনার পানি চুঁইয়ে এসে তৈরি হয়েছে এটা।
ল্যাজলো, সাবধানে এগোবেন। এমনও হতে পারে এটা ১০০ ফুট গভীর। সতর্ক করে দিল স্যাম।
সর্তক করে দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্য…’ থেমে গেল ল্যাজলো। স্থির করে ধরল হাতে থাকা ফ্ল্যাশলাইট।
কী হয়েছে?’ রেমি প্রশ্ন করল।
‘আমরা-ই এখানে প্রথম অভিযাত্রী নই, বোধহয়।’ বলে একপাশে সরল ল্যাজলো। স্যাম ও রেমি সামনে এগিয়ে এসে গেল একজোড়া কঙ্কাল পড়ে আছে। পাথুড়ে ভূমিতে। তাদের মণিবিহীন চোখের কোটর গুহার মুখের দিকে তাক করা।
লিও ওদেরকে পাশ কাটিয়ে কঙ্কালগুলোর কাছে গেল। খুন হওয়া গ্রামবাসী। নিচু গলায় বলল সে।
‘হতে পারে। কিন্তু জাপানিরা এই কাজ করেছে বলে তো বিশ্বাস হচ্ছে না। সাইজে ছোট কঙ্কালটার পা দেখো।
