বিকেল হয়ে গেল।
আরেকটা বড় জলধারার সামনে এসে পৌঁছেছে ওরা। সবাই ক্লান্ত। একটা বড় বট গাছের নিচে বিশ্রামের জন্য বসল অভিযাত্রী দল।
কতদূর এলাম আমরা?’ প্রশ্ন করল রেমি। ওর কপাল বেয়ে ঘাম নামছে।
‘আধ মাইল হয়েছে হয়তো। জিপিএস-এর দিকে তাকাল স্যাম। একটু অপেক্ষা করল সিগন্যালের জন্য। না, আধ মাইলের একটু বেশিই এসেছি।
‘ছাগলের মাথার হদিস পেতে আরও কতদূর যেতে হবে কে জানে! বিড়বিড় করল লিও।
‘সেটাই তো চ্যালেঞ্জ।’ স্যাম বলল।
‘অবশ্যই আমাদেরকে এটাও মনে রাখতে হবে, ছাগলের মাথা বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে সেটা আমরা জানি না।’ বলল ল্যাজলো।
‘আমার মনে হয় ছাগলের মাথা প্রাকৃতিক কোনো জিনিসই হবে। কর্নেল কুমাসাকা দিক নির্দেশের ব্যাপারে যা যা লিখেছেন সবই প্রাকতিক উপাদান। যেমন: জলধারা, সূর্য ওঠার দিক।’ রেমি বলল।
ভুল হলো। কুমাসাকা জলধারার ব্যাপারে কিছু লিখে যাননি। তিনি ঝরনাধারার ব্যাপারে লিখেছেন। জলধারা আর ঝরনাধারার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। ল্যাজলো শুধরে দিল। আমি এখনও কোনো ঝরনা দেখিনি এখানে।
‘আমি ছাগলও দেখিনি। ফোড়ন কাটল লিও।
মাঝেমাঝে উত্তরটা আমাদের সামনেই থাকে। রেমি কয়েকটা বড় বড় পাথরের দিকে তাকিয়ে বলল কথাটা। রেমির দৃষ্টি অনুসরণ করে স্যামও তাকাল সেদিকে।
একটু পর দাঁত বের করে হাসতে শুরু করল স্যাম। আমি তোমাদেরকে কখনও বলেছি আমার বউটা কীরকম স্মার্ট? এগোলো বিশাল আকৃতির পাথরগুলোর দিকে। ল্যাজলো, বলুন তো ওগুলো দেখতে কীসের মতো?
‘কীসের মতো আর? কয়েক ঢাউস সাইজের পাথর।
হাসল রেমি। অন্ধের দেশে এক চোখঅলা ব্যক্তিই হয় রাজা।
‘তা ঠিক। কিন্তু আপনার এই কথার সাথে পাথরের সম্পর্কটা ধরতে পারলাম না…’ থেমে গেল ল্যাজলো। আবার তাকাল পাথরগুলোর দিকে।
কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে রইল সবাই। নীরবতা ভাঙল লিও। আচ্ছা, তোমরা এসব কী বলো? কিছুই তো বুঝি না। কোনো কোড় ভাষায় কথা বলছ নাকি?
স্যাম মাথা নেড়ে লিও-কে পাথরগুলো দেখাল। পাথরগুলো আ খেয়াল করে দেখো। ছাগলের মাথার মতো দেখতে।
বলো কী? আমার নিজেকে এখন মদন মনে হচ্ছে…’
মাথা নেড়ে সায় দিল ল্যাজলো। আপনার সাথে আমি একমত।
.
৪০.
স্যাম জিপিএস-এর আরেকটা চিহ্ন দিল। তারপর জুম করল জিপিএস-এ। জঙ্গলের এই অংশটুকুর স্যাটেলাইট অংশটুকু দেখার বৃথা চেষ্টা করে ইস্তফা দিল।
নাহ, স্যাটেলাইট ইমেজে জঙ্গলের কোনো বিশেষ কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাছপালা এত ঘন যে উপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে সবুজ চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে পুরোটা।’
‘হুম। আচ্ছা, নোটবুকের পরের অংশে যেন কী ছিল?’ প্রশ্ন করল রেমি। ‘শত্রুর এলাকায় প্রবেশ করো টাইপের কিছু একটা লেখা ছিল বোধহয়?’
মাথা নাড়ল ল্যাজলো। ঠিক বলেছেন। এ-ব্যাপারে আপনার কোনো পরামর্শ আছে?
সামনে থাকা পাহাড়ের চূড়োর দিকে তাকাল স্যাম। আমার মনে হয় কর্নেল কুমাসাকা নোটবুকে সংকেতগুলো লেখার সময় একটু চালাকি খাঁটিয়েছেন। প্রথমে পূর্ব দিকে যাওয়া কথা বললেও ছাগলের মাথা থেকে এখন আমরা যেদিকে এগোচ্ছি এটা উত্তর-পূর্ব দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু পূর্ব দিক লিখে রাখলে বিষয়টা খুব সহজ হয়ে যেত। ছাগলের মাথা যোগ করে কর্নেল বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। এটা হচ্ছে, আমার মতামত। এখন তোমাদের কারও কিছু বলার আছে?
‘কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে অনেক চড়াই উঠে এসেছি। আপত্তি তুলল রেমি।
বুঝেছি, তুমি বলতে চাচ্ছে, তখন তো তাদের কাছে ভারি বোঝা ছিল। গুপ্তধন নিয়ে উঠতে হয়েছিল তাদের, ঠিক?
‘মিস্টার স্যাম, আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি মিসেস ফারগো’র সাথে একমত। তাই আমার মনে হচ্ছে, জাপানিরা তখন এমন একটা প্রাকৃতিক পথ বেছে নিয়েছিল যে পথে বাধার পরিমাণ কম।’
মন্দ বলেননি। তবে আমার মনে হচ্ছে এই জলধারা অনুসরণ করে এগোলে আমরা সঠিক জায়গায় পৌঁছে যেতে পারব।’ বলল স্যাম।
‘সেটাই যদি হবে তাহলে কুমাসাকা কেন নোটবুকে সহজ করে লিখল না জলধারা ধরে এগোবে আর গুপ্তধন পেয়ে যাবে! সে কোন দুঃখে ছাগলের মাথা দেখে তারপর শত্রুর এলাকায় ঢুকতে বলল? লিও যুক্তি দাঁড় করাবার চেষ্টা করল।
হয়তো সে আশংকা করেছিল সময়ের সাথে সাথে জলধারা বয়ে যাওয়ার পথ বদলে যেতে পারে। যেমন; এখন গ্রামের ওদিকটায় জলধারা যে পথ দিয়ে বইছে রুবো’র আমলে তখন ওদিকে বইত না। তাই এত বছর পর রুবো হঠাৎ জলধারার গতিপথের পরিবর্তন দেখে গ্রাম খুঁজে পেতে একটু দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গিয়েছিল। কিংবা এমনও হতে পারে, অত সহজ করে লিখে রাখলে যে-কেউ সংকেতের অর্থ বের করে হাজির হয়ে যেত এখানে। গুপ্তধন হাতিয়ে নিত। কর্নেল হয়তো সেই ভয়ে একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কাব্য রচনা করে গেছে। এরকম আরও অনেক কারণ থাকতে পারে…’ ব্যাখ্যা করল স্যাম।
‘আমাদের বাঁশ যাওয়ারও অনেক কারণ থাকতে পারে…’ লিও বিড়বিড় করল।
‘এত হতাশ হয়ো না, লিও। আমরা কিন্তু এখন পর্যন্ত ঠিকঠাকভাবে সবগুলো পয়েন্ট খুঁজে পেয়েছি।’ বলল রেমি।
‘আমি আপনার সাথে সম্পূর্ণ একমত। চলুন, জুলধারা ধরে এগিয়ে গিয়ে দেখি, কী আছে? যদি ভুল হয় অন্য পথ ধরব। ব্যস, হয়ে গেল। এইটুকু একটা দ্বীপ, গুপ্তধন হাতে না এসে যাবে কোথায়? ল্যাজলো সমর্থন জানাল।
