‘রুবো,’ বলে স্যাম মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করল রুবো আর বেঁচে নেই। চোখ বড় বড় হয়ে গেল কবিরাজের। ডলারগুলো নিতে ইতস্তত করলেও পরে নিজেকে সামলে নিল।
‘আপনি ইংরেজি বলতে পারেন?’ জানতে চাইল স্যাম।
কাঁধ ঝাঁকাল বৃদ্ধ। পারে না। এক তরুণ ছেলেকে ইশারা করে ডাকল সে। স্যাম তরুণটিকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল।
‘ফারি আরকী,’ জবাব দিল তরুণ। উচ্চারণে আঞ্চলিক টান।
‘আমরা একটা পুরানো গ্রাম খুঁজছি। ওই গ্রামে কেউ থাকে না। স্যাম বলল। কিন্তু তরুণের চোখ দেখে মনে হলো সে ঠিক বুঝতে পারছে না। আবার বলল স্যাম। একটা গ্রাম। নাউরু একসময় থাকতো ওখানে। ওই। গ্রামটা খুঁজে বের করতে চাই।’
এবার তরুণটি বুঝতে পেরে গ্রামের বয়স্কদের কাছে গেল। আলোচনা করল সবার সাথে। কিছুক্ষণ এর-ওর সাথে কথা বলে ফিরল স্যামের কাছে।
‘ওইখানে কিছু নাই। ভালা না জায়গাড়া।
‘আমরা জানি। কিন্তু তবুও আমাদেরকে যেতে হবে। সামনে এগিয়ে এসে বলল রেমি।
আবার বয়স্কদের কাছে গেল ছেলেটা। আরেক দফা পরামর্শ করার পর ফিরে এলো।
যাওনের লিগা রাস্তা নাই।’
‘সমস্যা হবে না। আমরা হেঁটেই যাব।’ রেমি জবাব দিল। তুমি আমাদেরকে একটু গ্রামটা দেখিয়ে দিতে পারবে?
স্যাম চট করে ২০ ডলার বের করে তরুণের সামনে ধরল। তরুণ একবার বয়স্কদের দিকে তাকিয়ে লুফে নিল নোটটা। এমনভাবে নিল যেন আর একটু দেরি হলে ওটা বাতাসে মিলিয়ে যেত।
‘এহনই যাইবেন?’ ছেলেটা জানতে চাইল।
মাথা নাড়ল স্যাম। হ্যাঁ।
গাড়ির কাছে ফিরে যাবতীয় মালপত্রগুলো ওরা চারজন ভাগ করে নিল। রওনা হলো তরুণের পেছন পেছন। গ্রামের মানুষ, তরুণটির পায়ে কোনো স্যাণ্ডেল বা জুতো নেই। ভার নিয়ে চলার এক ফাঁকে ল্যাজলো লিও’র দিকে তাকিয়ে দেখল বেহাল অবস্থা। লিও’র মুখ প্রায়ই বাংলা পাঁচ হয়ে থাকে। আর এখন বোঝা নিয়ে এগোতে গিয়ে ওটা হুতুম পেঁচার মতো হয়ে আছে। অবশ্য ফারগো দম্পতি এসব ভার বহনকে মোটেও কষ্ট হিসেবে নেয়নি। বড় বড় পা ফেলে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে তারা।
পাক্কা এক ঘণ্টা পাহাড় বাওয়ার পর অন্য একটা পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে পৌঁছুল সবাই। এখানটায় পাখির কিচিরমিচির ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সব কেমন গুমোট, চুপচাপ। একটু দূরে থাকা কিছু সাজানো পাথরের দিকে নির্দেশ করল ছেলেটা। পাথরগুলো মানুষ সাজিয়েছে সেটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। যদিও ঝোঁপঝাড়ের কারণে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে ওগুলো দেখতে।
গাছের ছায়ায় বিশ্রামের জন্য থাম। ওরা। তরুণ ওদেরকে একটা জিনিস দেখাল।
‘টেবিল।
বিষয়টা বুঝতে পারল রেমি। এই গ্রামের বাসিন্দারা সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুঁটকি বানাতো। এই টেবিলেই মাছ শুকাতে দিতে তারা। পাথরের টেবিল হওয়ায় এগুলো এখনও টিকে আছে। পাশের পাহাড় থেকে পাথর কেটে এনে টেবিলগুলো বানানো হয়েছিল।
‘দেখে তো মনে হচ্ছে, এই একই পাথর দিয়ে রাজা লক মন্দির তৈরি করেছিল।’ বলল লিও।
‘ঠিকই বলেছ। এখানে এরকম পাথর খুবই সহজলভ্য ছিল তখন। স্যাম সায় দিল।
চারদিকে তাকিয়ে দেখল ল্যাজলো। এখানে তো এখন কিছু নেই। সব গায়েব। এই ছেলেটা যদি আমাদেরকে সাহায্য না করতো তাহলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ হয়ে যেত, সন্দেহ নেই।
নাউরুর ভাষমতে, এই গ্রামের সবাইকে খুন করা হয়েছিল। কেউ কোনো চিহ্ন রেখে যাওয়ার মতো সময় পায়নি।’ বলল রেমি।
একটু সরে দাঁড়াল স্যাম। পকেট থেকে কম্পাস বের করে দেখল। তারপর আগের জায়গায় ফিরে এসে তাকাল তরুণটির দিকে।
‘অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা এখানে থাকব। তুমি যেতে পারো। স্যাম বলল।
স্যামের কথা শুনে তরুণ হতভম্ব হয়ে গেছে। স্যাম এবার ইশারা ইঙ্গিত করে আবার বলল কথাটা। এবার তরুণ নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফিরতি পথ ধরল সে। যদি এই পাগলা বিদেশিগুলো জঙ্গলের মাঝখানে ক্যাম্প করে জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে চায়, খেলুক। তাতে ওর কী? ওর পকেটে ডলার উঠেছে। আর কী লাগে?
তরুণ বিদেয় হওয়ার পর ব্যাগ থেকে জিপিএস বের করল স্যাম। যে রাস্তা ধরে এখানে এসেছে জিপিএস-এ সেটার চিহ্ন দিয়ে রাখল যাতে ফেরার সময় পথ ভুল না হয়। আমরা যে পথে এগোচ্ছি, পূর্ব দিক পড়ছে ওদিকে। শেষ কুঁড়েঘর থেকে সূর্য উদয়ের দিক… তারমানে আমার মনে হচ্ছে, এখানে পূর্ব দিকের কথা বলা হয়েছে।’ স্যাম বলল।
‘আর ছাগলের মাথা?’ জিজ্ঞেস করল ল্যাজলো।
‘এটা খুঁজে বের করা একটু কঠিন। আশা করছি জিনিসটা চোখের সামনে পড়লে আমরা চিনতে পারব।’
‘যদি এমন হয় ছাগলের মাথা দিয়ে যেটাকে বোঝানো হয়েছে সেটা এতদিনে ধুয়ে গেছে কিংবা ধ্বংস হয়ে গেছে? লিও প্রশ্ন ছুঁড়ল।
‘সেরকম পরিস্থিতি হলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
লিও স্যামের কথা পাত্তা না দিয়ে একটা মশা মারল। ছাগলের মাথা খুঁজতে হবে। এই গ্রামের লোকেরা কবে কখন ছাগল খেয়েছিল এখন সেটার মাথা খুঁজতে হবে!
পূর্ব দিকে এগোচ্ছে সবাই। তাপমাত্রা বাড়ছে ধীরে ধীরে। কিছু দূর যাওয়ার পর পেছন ফিরে তাকাচ্ছে স্যাম। দেখে নিচ্ছে কেউ ওদের পিছু নিয়েছে কিনা। ওই ছেলেটা আর গ্রামবাসীরা মনে হয় না ওদের কোনো ক্ষতি করতে চাইবে। তারপরও সাবধানের মার নেই।
পূর্বে এগোতে এগোতে পাহাড়ী ঢাল আরও খাড়া হতে শুরু করল। ধীরে ধীরে ওদের রাস্তাটা উত্তর দিকে বেঁকে গেছে। ম্যাচেটি বের করে সামনের ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার করতে করতে ধীর গতিতে এগোল ফারগো দম্পতি।
