‘আসলে আমি নিজেও এরচেয়ে বেশি কিছু জানি না। আমার জন্ম হয় ১৯৩৯ সালে। ততদিনে দিনে যুদ্ধে চলে গেছেন। তার সাথে আমার তেমন কোনো স্মৃতি জড়িত নেই।’
কিন্তু বড় হওয়ার পর নিশ্চয়ই বাবার সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন?
চিয়োকো মাথা নাড়লেন। যুদ্ধের পর সব বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। জাপান তখন নিজেকে ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে গড়তে ব্যস্ত। কেউ অতীত নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পায়নি। অবশ্য যখন কলেজে পড়তাম তখন আমি একটু খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কাজ হয়নি। কোনো রেকর্ড পাইনি বাবার নামে।
‘তার কোনো ভাই-বোন আছে? কিংবা ঘনিষ্ঠ কেউ?
হা। একটা বোন ছিল। শক্ত করে ঢোঁক গিললেন চিয়োকো। আমাকে ফুপি-ই বড় করেছিলেন। ২০ বছর আগে তিনি মারা যান। বাবার ব্যাপারে ফুপি শুধু এতটুকু বলেছিলেন, বাবা অনেক সাহসী ও সম্মানী ব্যক্তি ছিল। অনেক দেশপ্রেম ছিল তার। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি শহীদ হয়েছেন। তাছাড়া স্বামী হিসেবেও নাকি আমার মায়ের সাথে তার সম্পর্ক ভাল ছিল। আপনাদের বলা হয়নি, যুদ্ধের সময় আমার মা-ও মারা যান।
‘দুঃখিত। নরম স্বরে বলল রেমি।
‘এসব নিয়ে কথা বলতে আমার এখনও কষ্ট হয়। অথচ কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। আমার তখন বয়স মাত্র ৬ বছর। টোকিও-তে প্রতিনিয়ত বোম পড়ছে। কিন্তু একদিন শুরু হলো চূড়ান্ত তাণ্ডব। আবাসিক এলাকায় বোম ফেলে সব চুরমার করে দেয়া হলো।’ চিয়োকো একটু থেমে শ্বাস নিলেন। ‘মায়ের শরীরে আগুন লেগে গিয়েছিল। আমার কপাল ভাল ছিল প্রাণে বেঁচে গেছি। কিন্তু আমার মা রক্ষা পায়নি।
‘খুব ভয়াবহ ঘটনা।
‘শুধু ভাষায় সেই ভয়াবহতা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাইলের পর মাইল সব ছাই হয়ে গিয়েছিল তখন। টোকিও-র ১০ লাখ লোক গৃহহীন হয়ে পড়েছিল, মারা পড়েছিল প্রায় ১ লাখ। কথা বলতে বলতে চিয়োকো যখন রেমি’র দিকে তাকাল তখন তার চোখ ভেজা। টাটকা দুঃখ এখনও দেখা যাচ্ছে চোখে। নিজের চোখে নরক দেখেছি আমি। সে দৃশ্য কোনোদিনও ভোলা সম্ভব নয়। যে একবার এরকম পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাবে তার পক্ষে এসবের ঘা ভুলে যাওয়া কঠিন।
‘আমি দুঃখিত চিয়োকো। ফিসফিস সান্ত্বনা দিল রেমি।
‘ওরকম যুদ্ধ আর কখনও হয়নি। ভাগ্য ভাল ছিল, তাই বেঁচে গেছি। যুদ্ধের পর এক আত্মীয়র বাসায় বড় হতে শুরু করলাম। পৃথিবীতে এক নব্য শক্তিধর দেশ হিসেবে ধীরে ধীরে জাপান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল।
একটু সময় চুপ করে রইল রেমি। তারপর বলল, “আচ্ছা, তার কোনো ছবি বা চিঠি আছে?’
যা ছিল সব আগুনে পুড়ে গেছে। আমার ফুপির কাছে পুরানো কিছু ছবি আছে অবশ্য। ওগুলো আপনাদের কতটুকু কাজে আসবে বলতে পারছি না। ওসব বাবার তরুণ বয়সের ছবি। চিয়োকো একটু ইতস্তস্ত করলেন। ‘দেখবেন?
‘ছবিগুলো দেখতে পারলে দারুণ হয়। রেমি জবাব দিল। চিয়োকো ছবি আনতে রুম থেকে বের হলেন। কয়েক মিনিট পর ফিরলেন তিনি। হাতে একটা কার্ডবক্স। স্যাম উঠে দাঁড়িয়ে তার হাত থেকে কার্ডবক্সটা নিতে সাহায্য করল।
‘আমার আর গায়ের জোর নেই আগের মতো। সময় যেন সব শক্তি চুরি করে নিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের আয়ু, আশা-ভরসা, তারুণ্য সব চলে যায়।
স্যাম ও রেমি ছোট ছোট ধাতব ফ্রেমের ছবিগুলো দেখতে শুরু করল।
‘এই ছবিগুলো সবচেয়ে ভাল। এটাতে দেখতে পাবেন আমার বাবার ছেলেবেলার ছবি। তারপর ভার্সিটি থেকে পাশ করার পরের ছবি। একটা মাত্র ছবি আছে যেখানে বাবা-মা একসাথে উপস্থিত।
ছবিটা দেখল ওরা। শক্ত-সামর্থ্য এক তরুণ তার সুন্দরী বধূকে নিয়ে হাস্যজ্জ্বল মুখে ছবি উঠেছে। ছবিটা সাদাকালো কিন্তু তারুণ্যে উদ্ভাসিত।’ রেমি ফ্রেমটা ধরে দম বন্ধ করে বলল, আপনার মা তো দেখতে ভয়ঙ্কর সুন্দরী ছিলেন!
‘ঠিক বলেছেন। আমার ফুপিও সবসময় তার রূপের প্রশংসা করতেন। চিয়োকা অন্য একটা ফ্রেম কাঁপা হাতে তুলে নিয়ে তাকালেন রেমি’র দিকে। ‘এই ছবিটা আমার খুব প্রিয়। ফুপি তুলেছিল এটা। আমেরিকার সাথে যুদ্ধের আগে আরশায়ামা-তে তোলা। ওখানকার গাছগুলোতে সুন্দর সুন্দর ফুল ফোটে। সে-বছর একটু দেরিতে ফুটেছিল। একদম কনকনে শীতে আরকী। তারপর একটা সময় আছে যখন গাছ থেকে সব ফুল ঝরে যায়। তখন মনে হয় যেন গোলাপী রঙের তুষার পড়ছে।
ফারগো দম্পতি ছবিটা ভাল করে লক্ষ্য করল। কুমাসাকা’র পরনে আর্মির পোশাক। ছবিতে একটা ক্লাসিক ভাব আছে। ছবিতে কুমাসাকা’র বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। স্যাম নিশ্চিত হলো যুদ্ধের আগেই কুমাসাকা কর্নেল পদে ছিলেন। জাপানের সাথে আমেরিকার ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালে।
‘আপনার বাবার চাকরি জীবন সম্পর্কে কিছু জানেন? ইউনিট ৭৩১-এ তিনি ছিলেন কিনা কিংবা মিয়েজি কর্পোরেশনের সাথে জড়িত ছিলেন কিনা? রেমি জানতে চাইল।
‘আমি এসবের নাম এরআগে কখনও শুনিনি। একটু খুলে বললে ভাল হয়।
‘এগুলো আর্মি গ্রুপ। মেডিক্যাল রিসার্চের সাথে জড়িত ছিল।’
‘মেডিক্যাল? কিন্তু আমার বাবা তো ডাক্তার ছিলেন না।
তার মাইক্রোবায়োলজি-তে ডিগ্রি ছিল।’
‘ছিল। কিন্তু অফিসার হিসেবে চাকুরি জীবন শুরু করেছিলেন। অর্জিত ডিগ্রিকে বাস্তব জীবনে কোনে কাজে লাগাননি। আমার ফুপির মুখে শুনেছি, তখন অনেক জাপানিরা নিজেদের পড়াশোনাকে পেশাগত কাজে না লাগিয়ে আর্মিতে যোগ দিয়েছিল।
