এখানে আসার আগে রেমি কুমাসাকা’র মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলে এসেছে। মহিলার সাথে কথা বলে মনে হয়েছে সে বেশ সাবলীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটা জবাব দিয়েছে খুব সতর্কভাবে।
নারিটা বিমানবন্দর থেকে সাওয়ারা’র দূরতৃটা মূল শহর টোকিও চেয়ে কম। ম্যাপের উপর চোখ বোলাল স্যাম। ট্রেনলাইন দেখা যাচ্ছে। সেলমা অবশ্য আগেই ইমেইল করে সব তথ্য দিয়ে রেখেছে, কীভাবে, কোথায় যেতে হবে। লাইনে দাঁড়ানো ট্যাক্সিগুলোর দিকে এগোল স্যাম।
‘ট্রেনে যাব না?’ রেমি প্রশ্ন করল। নাকি টিকেট কাটার সিস্টেম জানো না বলে ভয় পাচ্ছো?”
‘আমাদের হাতে সময় সীমিত। স্যাম জবাব দিল। এখন ট্রেনের খোঁজ খবর নিতে গেলে অনেক সময় চলে যাবে। তাছাড়া কোনটা লোকাল ট্রেন আর কোনটা এক্সপ্রেস ট্রেন সেটাও আমাদের জানা নেই। তাই ঝুঁকি না নিয়ে ট্যাক্সিতে যাওয়াই ভাল। এখান থেকে মাত্র ১৫ কি.মি, যেতে হবে। কঠিন কিছু নয়।’
লাইনে দাঁড়ানো প্রথম ট্যাক্সিটা এগিয়ে এলো। যাত্রী ঢোকার দরজা খুলে গেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ট্যাক্সির ড্রাইভার নেমে এসে ওদের লাগেজ তুলতে সাহায্য করে আবার ডাইভিং সিটে গিয়ে বসল। একটা কাগজে পরিষ্কার করে ঠিকানা লেখা আছে। রেমি সেটা ডাইভারকে দেখাতেই ঘনঘন মাথা নাড়ল ড্রাইভার। জানাল ঠিকানাটা তার চেনা আছে। অল্প-স্বল্প ইংরেজি বলতে পারে ড্রাইভার। হলিউড সিনেমা আর ইউটিউব দেখে শিখেছে। রেমি বলল, ওদের তাড়া আছে। ড্রাইভার যেন একটু দ্রুত গাড়ি চালায়। জবাবে জাপানিজ বলল, ড্যাশবোর্ডে জিপিএস লাগানো আছে। যে রাস্তা দিয়ে যেতে সবচেয়ে কম সময় লাগবে সেই রাস্তা দিয়েই ওদেরকে নিয়ে যাবে সে।
যতক্ষণ লাগবে ভেবেছিল ওরা, ট্যাক্সি করে ঠিকানায় পৌঁছুতে তারেচে একটু বেশি সময় লাগল। প্রায় ৪৫ মিনিট লেগেছে। কাঠের তৈরি এক আবাসিক বাড়ির সামনে এসে নামল ফারগো দম্পতি। স্যাম ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিতে চাইলে ড্রাইভার জানাল, সে তাদেরকে নিয়ে ফিরবে। যতক্ষণ সময় লাগবে তার অপেক্ষা করতে আপত্তি নেই। খুশি হয়ে স্যাম ওকে বখশিশ দিয়ে রেমিকে নিয়ে বাড়ির দরজার দিকে এগোল।
দরজায় নক করার আগেই খুলে গেল দরজা। কালো সোয়েটার পরিহিত এক মহিলা দরজা খুলে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসি উপহার দিলেন। রেমিও পাল্টা হাসি দিল। স্যাম রেমি’র একটু পেছন পেছন এগোচ্ছে। আগেই কথা হয়েছে, এখানার যাবতীয় বিষয় রেমি’র নেতৃত্বে হবে।
‘আপনি কর্নেল কুমাসাকা’র মেয়ে?’ রেমি প্রশ্ন করল।
মহিলা মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ। তবে আমাকে চিয়োকো বলে ডাকলেই খুশি হব। আপনি রেমি? আপনার কণ্ঠটা ফোনে শুনেছি বোধহয়। পরিচিত লাগছে।’
‘জি, আমি রেমি। আর ইনি আমার স্বামী স্যাম।
‘আপনাকে দেখে ভাল লাগল। স্যাম একটু মাথা নুইয়ে বলল।
‘ধন্যবাদ। ভেতরে আসুন। চিয়োকো ওদেরকে নিয়ে ভেতরে গেলেন।
রেমি খেয়াল করল মহিলার বাঁ পাশের গালে বেশ কিছু কাটাছেঁড়ার দাগ আছে। দাগগুলো দেখতে বেশ পুরোনো। চিয়োকোর গালে পুরো মেকআপ করা। তারপরও দাগগুলো সম্পূর্ণভাবে ঢাকা পড়েনি।
‘আমাদের সাথে দেখা করতে রাজি হওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ভেতরে ঢোকার পর বলল রেমি।
‘ধন্যবাদ দেয়ার কিছু নেই। আপনারা আসাতে আমিও খুশি হয়েছি। কিন্তু আমার বাবার ব্যাপারে আপনাদেরকে তথ্য দিয়ে কতদূর সাহায্য করতে পারব তাতে সন্দেহ আছে। বাবার সাথে আমার ওঠাবসা হয়নি বললেই চলে। এদিকে আসুন… ভেতরের রুমে গিয়ে কথা বলি।
ফারগো দম্পতি এগোল চিয়োকো’র সাথে। রেমি লক্ষ্য করল মহিলার হাতেও গালের মত কিছু ক্ষত চিহ্ন আছে।
‘আপনারা বসুন। আমি চা করেছি। নিয়ে আসি।’ বলল চিয়োকো।
স্যাম ও রেমি বসে রইল চুপচাপ। ওদের মাথার উপরে একটা ফ্যান বনবন করে ঘুরছে। একটু পর রুমে ফিরে এলেন মহিলা। হাতে একটা ট্রে। তাতে তিনটা কাপ, একটা পট আর এক প্লেট মিষ্টি।
সবাইকে চা পরিবেশন করার পর চিয়োকো রুমের একটু ছায়া ঢাকা অংশে গিয়ে বসলেন।
‘আপনার অ্যাপায়নের জন্য ধন্যবাদ।’ কথা শুরু করল রেমি।
‘এসব তো কিছুই নয়। আপনার অনেক দূর থেকে এসেছেন।
‘তা ঠিক।’ রেমি একটু থামল। আপনি বেশ ভাল ইংরেজি বলতে পারেন।
‘আমি একটা আন্তর্জাতিক কোম্পানীতে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছি। আমেরিকার সাথে লেনদেন করত কোম্পানীটা। তাই ইংরেজি শিখতে হয়েছিল। তাছাড়া যে স্কুলে পড়ালেখা করেছিলাম সেখানেও ইংরেজি শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছিল তখন। যুদ্ধের পর ইংরেজি জানা লোকদের খুব কদর ছিল। তবে অনেক বছর হলো আর চর্চা করি না। আমার ইংরেজি হয়তো এখন বেশ দূর্বল হয়ে গেছে। কোনো ভুল-ভ্রান্তি করে ফেললে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে। দেখবেন। আলতো করে তার স্টাইল করা ধূসর চুলে হাত চালালেন চিয়োকো। আপনারা আমার বাবা’র উপর গবেষণা করছেন। আমি তো ভয় পাচ্ছি, না জানি এতদূরে এসেও প্রয়োজনীয় তথ্য না পেয়ে আপনাদেরকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়।
‘আসলে আমরা তার জীবনের গল্পের বিভিন্ন টুকরোগুলোকে একত্রিত করতে চাচ্ছি। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যাণ্ডে যুদ্ধের সময় তিনি জাপানি সেনাবাহিনির একজন উচ্চপদস্থ অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময় তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। জানা যায়, কারাভোগ করা অবস্থায় ক্যাম্পেই মৃত্যু হয়েছিল তার। কিন্তু কর্নেল কুমাসাকা’র ব্যাপারে বিস্তারিত কিছুই জানা যায়নি।
