লিলি’র গড়ন বরাবরই হালকা-পাতলা। তবে অসুখের কারণে ও এখন একদম পাটকাঠির মতো হয়ে গেছে। শরীর শুকিয়ে গেলেও ওর দেহের পরিবর্তনগুলো এখনও বোঝা যায়। শিশু আর নারীর মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে।
হঠাৎ পেছন থেকে ডাল ভাঙার আওয়াজ ভেসে এলো। কাছে কোথাও হবে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল লিলি। কে? কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। লিলি অবাক হলো।
ক্যাডা রে ওইহানে?
গাছের পাতার খসখসে শব্দ ছাড়া কেউ ওর প্রশ্নের জবাব দিল না।
লিলি আবার চলতে শুরু করল। কাউকে না দেখতে পেলেও উদ্বেগে ওর পেট খিচে রয়েছে। পায়ের পরিষ্কার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল ও। লিলি আবার থামল। কোমরে দুহাত রেখে ঘুরে দাঁড়াল এবার। যৌবনের রেখা ফুটতে শুরু করার পর থেকেই গ্রামের ছেলে-ছোকররা ওকে জ্বালাতে শুরু করেছে। এখন হয়তো ওদেরই কেউ আসছে পিছু পিছু। ও জানে, ছেলেগুলো যদিও কোনো ক্ষতি করবে না। স্রেফ জ্বালায়। লিলি অবশ্য এসবে পটে না, পাত্তাও দেয় না। ওর মা ওকে সাবধান করে দিয়েছে, ছেলেদের অন্তরে শয়তান থাকে। লিলি ভাল করে খেয়াল করে দেখল ওর পেছনে কেউ নেই।
‘আমি শব্দ শুনছি কইলাম। আমারে মদন বানাইতে পারবি না।’ লিলি নিজে যতটা না সাহসী তারচেয়ে সাহসী গলায় বলল কথাটা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল কিন্তু কারও দেখা নেই। ভালই ভালই চইল্যা যা কইলাম। আমি যদি তোরে ধরবার পারি তাইলে কিন্তু খবর কইর্যা দিমু!
নেই। কেউ নেই।
ফাইজলামি না কিন্তু। বন্ধ কর এইসব!’ বাক্যের শেষের দিকে এসে ওর কণ্ঠ একটু ভেঙে গেল। জিমি নামের এক ছেলে প্রায়ই আড়াল থেকে ওকে উপহার পাঠায়। লিলি ভাবছে এখন হয়তো জিমি আছে এখানে। বাইরে বাইরে পাত্তা না দিলেও এরকম উপহার পেতে লিলি’র অবশ্য খারাপ লাগে না।
কারও দেখা না পেয়ে আবার চলতে শুরু করল লিলি। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একজোড়া শক্ত হাত ওর মুখ চেপে ধরল পেছন থেকে। খুব জোরে চিৎকার করল লিলি কিন্তু হাতের চাপে সেটা ফাপা আওয়াজের মতো শোনাল। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করল ও। কিন্তু মাথার একপাশে আঘাত লাগতেই লিলি চুপসে গেল। বজ্রমুষ্ঠি গলায় চেপে বসে শ্বাসরোধ হওয়ার সময় সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল লিলি’র।
***
ফিরতি পথে ওর গতি খুবই ধীর। কারণ স্যাম ও রেমি’র গাড়ি একটা ভারি ট্রাকের পেছনে পড়েছে। ভক ভক করে দূর্গন্ধযুক্ত কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগোচ্ছে ট্রাকটা। নিয়মের কোনো তোয়াক্কা না করে রাস্তার মাঝ দিয়ে চলছে ধীরে ধীরে। ট্রাকটাকে ওভারটেক করতে গিয়ে পিছিয়ে এলো স্যাম। বিপরীত দিক থেকে আরেকটা গাড়ি আসছে।
অবশেষে হোটেলে পৌঁছুনোর পর সেলমাকে ফোন করল স্যাম।
‘হ্যালো! কী অবস্থা? বলল সেলমা। দ্বীপে কীরকম দিন কাটছে তোমাদের?
‘এই তো চলছে। ওদিকের হালচাল কী?
‘সব স্বাভাবিক। ডেস্ট্রয়ারের ব্যাপারে সূত্র পাওয়ার জন্য বিভিন্ন রেকর্ড ঘাটছি। কিন্তু যা বুঝতে পারছি, আর কিছু পাওয়া যাবে না।
‘হতাশ হলাম। যদি কেউ বেঁচে না ফিরত তাহলে তো কেউ জানতেই পারতো না ওই ডেস্ট্রয়ারের কোনো অস্তিত্ব ছিল কখনও।
“এরকম ঘটনা আমি এরআগে কখনও দেখিনি।’
‘বেশ, যদি তোমার হাতে সময় থাকে তাহলে আমি তোমাকে আরেকটা প্রজেক্ট দেব।’
‘নতুন প্রজেক্ট নেয়ার জন্যই আমার বেঁচে থাকা।’ সেলমা একটু রসিকতা করল।
‘জায়ান্ট আর জাপানিজদের নিয়ে বিষয়টা।
‘ইন্টারেস্টিং! বলে ফেলো।
স্যাম আপনমনে হাসল একটু। এরআগে বোধহয় এটা নিয়ে একটু বলেছিলাম তোমাকে। তবে এবার আমি সিরিয়াস। এখানার পাহাড়ে গুহা আছে আর সেখানে নাকি জায়ান্টরা থাকে। মাঝেমাঝে বেখেয়ালী লোকজনদের ধরে নিয়ে যায় জায়ান্টরা।
তারপর,
‘জানি, শুনতে হাস্যকর লাগছে কিন্তু এই লোককাহিনিটা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে অন্য কারণে। আমি পাহাড়ের গুহাগুলোর প্রতি আগ্রহী।
‘খুলে বল।
‘আমি এখানকার গুহাগুলোর একটা ম্যাপ চাই। জানি, জিনিসটা পাওয়া খুবই কঠিন। ম্যাপ না হোক একটা বর্ণনা হলেও চলবে। জায়ান্টদের গুহা দেখার খায়েশ জেগেছে আমার।
‘আচ্ছা। তাহলে সবমিলিয়ে বিষয়বস্তু মোট তিনটা। জায়ান্ট, গুহা আর জাপানিজ?’
‘হ্যাঁ। আমি চাই এসব নিয়ে তুমি খোঁজ-খবর করে যত বেশি সম্ভব তথ্য যোগাড় করে আমাকে জানাও। আর খোঁজ নিয়ে দেখো, শেষের দিকে জাপানিরা এই দ্বীপে কী কী করেছিল।’
‘জাপানিরা শেষের দিকে দ্বীপ থেকে পালিয়েছিল। ওটা তো আমরা একবার রিসার্চ করেছি, তাই না?
করেছ। কিন্তু আমি অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাপানিদের কাজকর্মের পুরো বিবরণ খুঁজছি।’
নাউরু’র কথাগুলো জানাল স্যাম। দাস বানিয়ে রাখা, গোপন গবেষণা এসবের কোনো উল্লেখ ইতিহাসের কোথাও আছে কিনা জানতে চাই। কিংবা কোনো গুজব। কোনোকিছুই যেন বাদ না পড়ে। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে। নাউরুর অবস্থা আশংকাজনক। যেকোনো সময় সে পরকালের ট্রেনে চড়ে বসবে। তার কাছ থেকে হয়তো আর কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সেলমা। তারপর বলল, কমাণ্ডারের নাম যেন কী বললে?
‘এখনও বলিনি। কেন?
হয়তো তেমন কিছুই না। কিন্তু গোয়াডালক্যানেলে এক কর্নেল…’
বলো, সেলমা…’
‘ডুবে যাওয়া ডেস্ট্রয়ার থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারে রিসার্চ করার সময় দেখলাম ওখানে একজন উঁচু পদের অফিসারও আছে। আর্মি। দাঁড়াও, চেক করে দেখি। সম্ভবত কর্নেল হবে।’
