জাপানিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কয়েক সপ্তাহ পাহাড়ে গা ঢাকা দিয়েছিল ওরা দুজন। পরবর্তীতে গ্রামে ফিরে দেখল পুরো গ্রাম জনশূন্য। ধীরে ধীরে জঙ্গল গিলে নিল গ্রামটাকে। একপর্যায়ে মিত্রবাহিনি দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে ওরা দু’জন তাদের সাথে কাজে যোগ দিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পাশ্ববর্তী গ্রামের মেয়েদেরকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছিল ওরা।
পুরো গল্প শোনার সময়টুকু স্যাম ও রেমি নিজেদের মুখের অভিব্যক্তি যতদূর সম্ভব শান্ত-স্বাভাবিক করে রাখল। গলা পরিষ্কার করল রেমি।
‘শুনে খারাপ লাগল। যাক, তারপরও বলব উনি সৌভাগ্যবান। এখনও জীবিত রয়েছেন। একটু থামল ও। কীভাবে আসল প্রশ্ন করবে ঠিক করে নিচ্ছে। ওই বাক্সগুলোতে কী ছিল উনি জানেন?
নাউরুকে প্রশ্নটা করল রুবো। জবাবে নাউরু যেভাবে মাথা নাড়লেন তাতে বোঝা গেল তিনি উত্তরটা জানেন না।
‘গুহাটা কোথায়?
রুবো আবার নাউরুর দিকে ফিরল।
‘অয় ঠিক মতো জানে না। পাহাড়ের উপরে জায়গা। ভালা না।
“উনি কি নির্দিষ্ট করে জায়গাটার ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন? যাতে আমরা গুহা খুঁজে পেতে পারি? আসলে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। প্লিজ, উনাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করে দেখুন।
রুবো অনুরোধ রাখল। কিন্তু নাউরু কোনো জবাব দিল না। মাথা নাড়ল রুবো। অরে আর না জ্বালাই আমরা। যদি পরে কইতে চায় তাইলে সব জানবার পারবেন।
ইতস্তত করছে স্যাম ও রেমি। নাউরু যদি বাক্স আর গুহার ব্যাপারে আরও তথ্য জেনে থাকেন সেগুলো হয়তো আর কারও জানা হবে না। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তার সাথে মাটিচাপা পড়ে যাবে।
কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। রুবো’র হাতে স্যাম ৫০ ডলার ধরিয়ে দিল। কবিরাজের জন্য…’।
ডলারগুলো পকেটে ঢোকাল রুবো। ঠিক আছে, অরে দিয়া দিমু। নিচের অংশে থাকা কুঁড়েঘরগুলোর দিকে পা বাড়াল সে।
‘রুবো এখানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছে। তার দুই-একটা বিষয় জানাশোনা থাকতে পারে। রেমি হাত ধরতে ধরতে স্যাম বলল।
রুবো’র পিছু পিছু এগোল ওরা। একটু ধীরে এগোচ্ছে। স্যাম, যদি নাউরু রুবোকে গুহার ব্যাপারে তথ্য দিয়ে থাকে? রুবো যদি সেটা আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে তখন?
রুবো’র যা বয়স তাতে সে ওরকমটা করবে বলে মনে হয় না। তার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে সে সত্যিকার অর্থেই গুহা অপছন্দ করে। রুবো রহস্যময় বাক্সগুলো খোলার চেষ্টা করতে যাবে বলে মনে হয় না। তার উপর এখন বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সেইসাথে জায়ান্টসহ আরও কত কী আছে পাহাড়ে কে জানে!
‘আচ্ছা, বুঝলাম। কিন্তু রুবো ডলার খুব পছন্দ করে। এমনও হতে পারে, অন্য কারও কাছ থেকে বেশি ডলারে গুহার তথ্য বিক্রি করে দিল।
হুম, সেটা করতে পারে। কিন্তু বিক্রিটা করবে কার কাছে? দ্বীপটাকে খেয়াল করে দেখ। কে অনুসন্ধানে নামতে যাবে? স্থানীয় লোকদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে? সব তো লবডঙ্কা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমি। স্যাম বলল, তাহলে সবঠিক আছে? রুবোকে বিশ্বাস করা যায়?
‘স্যাম ফারগো, আপনার কথাই আমার শিরধার্য।
‘আহা! আমার কী সৌভাগ্য! আরও কিছু বলি তাহলে?
রেমি স্যামের রসিকতাকে পাত্তা দিল না। নাউরুর গল্প নিয়ে কথা বলতে হবে আমাদের।
রুবোকে নামিয়ে দেই, তারপর। গাড়ির কাছাকাছি এসে সতর্ক হলো স্যাম। গলা চড়াল। রুবো? আমাদেরকে পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আপনি প্রস্তুত তো?
রুবো মাথা নাড়ল। চলেন, যাই গা।
দাঁত বের করে হাসল স্যাম। চলুন।
তার বাড়িতে নামিয়ে দিল তখন মধ্যদুপুর। নিজের বার্ধক্যে আক্রান্ত শরীরটাকে ধীরে ধীরে বয়ে নিয়ে গেল রুবো। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হলো পুরো পৃথিবীর বোঝা যেন তার কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
‘আজকে সবার অনেক পরিশ্রম গেল। তাকে দেখতে দেখতে বলল রেমি।
‘তা ঠিক।’ স্যাম সায় দিল।
‘বেশ। এবার আমরা কমাণ্ডার আর সেই বাক্সগুলো নিয়ে আলাপ করব।”
হ্যাঁ। পাহাড় জঙ্গলে ঢাকা। কোনো ম্যাপও আঁকা নেই। তাছাড়া যুদ্ধের সময় হয়তো পুরো এলাকা শত্রুপক্ষ চষে বেরিয়েছিল। এমনও হতে পারে বাক্সগুলো আগের জায়গায় নেই। সরিয়ে নিয়েছে কেউ। আবার এও হতে পারে, পানির নিচে থাকা ইমারতের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কোত্থেকে কীভাবে শুরু করতে পারে সে-ব্যাপারেও আমাদের কোনো ধারণা নেই। এই সমস্যাগুলো না থাকলে বলতাম, গুপ্তধন আমাদের হাতের মুঠোয়!
তাহলে এখানে আমাদের কাজ শেষ?
হেসে গিয়ার দিল স্যাম। সত্যি বলতে কেবল শুরু।
‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই ঝামেলা থেকে তুমি মজা পাচ্ছি।’
‘তোমার ধারণা ঠিক। কারণ, আমি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করি।
পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাদামী নদীর দিকে তাকাল রেমি। এবড়োথেবড়ো রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে ওদের টয়োটা লম্ফঝম্ফ করে এগোচ্ছে।
‘গাড়ির লাফানো বন্ধ করো!
“আরে, এটাই তো মজা!”
.
২৯.
গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যান্ড
হাঁটতে হাঁটতে কেশে উঠল লিলি। গ্রামের দক্ষিণ দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া জলধারা ধরে এগোচ্ছে ও। লিলির বয়স মাত্র ১৪ বছর। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে অসুস্থ। রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নতুন ওষুধ নিতে শুরু করেছিল কিন্তু হিতে বিপরীত হচ্ছে মনে হয়। তবে আজ একটু সুস্থ্য লাগায় ঘুরতে বেরিয়েছে।
