‘আশা করি, আমাদের ভাগ্য যেন ভাল হয়। অন্তত হনিয়ারা ফেরার আগপর্যন্ত।
গন্তব্যে পৌঁছুনোর পর একজন বয়স্ক ব্যক্তি বেরিয়ে এলো ওদেরকে দেখে। তার গায়ের রং তামাক বর্ণের। বারান্দা থেকে নেমে এলো সে। রুবো তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
তার সাথে কথা বলতে শুরু করল রুবো। স্যাম ও রেমিকে দেখিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। দেখে মনে হচ্ছে, লোকটাকে বোঝাচ্ছে ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে। লোকটা মাথা নাড়ল। বিষয়টা বিবেচনা করবে। কথা শেষে রেমি’র দিকে তাকিয়ে দাঁতবিহীন মাঢ়ি দেখিয়ে লজ্জামাখা হাসি দিল রুবো।
‘কবিরাজ কইল নাউরু এহন খুব ব্যারামে পড়ছে। কথা কইতে পারব কিনা এহুনি কওয়া যাইতাছে না।’ রুবো বলল।
‘আচ্ছা, আমরা কি তাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?
কবিরাজরে তাইলে আমেরিকান ডলার দেওয়ন লাগব।’
কত?
২০।’ স্ত্রীর দিকে তাকাল স্যাম। বেশ।
‘আমাগো হাতে খুব বেশি সময় নাই। নাউরু মরণের কাছাকাছি চইল্যা গ্যাছে।
স্যাম ও রেমিকে নিয়ে কুঁড়েঘরের দিকে এগোল রুবো। আপনেরা ভিত্রে বহেন। আমি ওর লগে গিয়া কথা কইয়া আসি।’
মাথা নাড়ল রেমি। সাবধানে ঢুকল অন্ধকার কুঁড়েঘরে। ওর পাশে স্যাম রয়েছে। ভেতরে থাকা ছোট্ট একটা রুম প্রবেশ করল ওরা।
.
২৮.
সূর্যের রশ্মিতে দেখা গেল ভেতরে ধূলো উড়ছে। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। কোনমতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে ওরা। একটা বিছানা পাতা রয়েছে। একজন খাটো জীর্ণশীর্ণ ব্যক্তি শুয়ে আছে ওতে। তার পুরো শরীর নগ্ন সেফ পরনে একটা জীর্ণশীর্ন নেংটি। বার্ধক্য তার শরীর থেকে জীবনাশক্তি চুষে নিয়েছে। তার অবস্থা দেখে মনে হলো, এই বুঝি দেহ থেকে আত্মা উড়াল দেবে।
বয়স্ক লোকটা ওদের দিকে তাকাল। খুব কষ্ট করে শ্বাস-প্রশ্বাস চালাচ্ছে বেচারা। রুবো এগিয়ে গেল লোকটার বিছানার কাছে।
লোকটার দিকে ঝুঁকে কানে কানে বিড়বিড় করে কী যেন বলে তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। কয়েক মিনিট পর কিছু শব্দ মিনমিন করে উচ্চারণ করল লোকটা।
মাথা নাড়ল রুবো, দেয়ালের পাশে থাকা বেঞ্চের দিকে ইশারা করল ফারগো দম্পতিকে। স্যাম ও রেমি গিয়ে বসল ওতে। রুবোও এগোল।
‘এইড্যা হইলো নাউরু। অয় কইল কতা কওয়ার চেষ্টা কইরা দেখবো। থামল রুবো। আপনেরা কী জানবার চান?
‘তাকে জাপানিজ কর্নেল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে দেখুন। স্থানীয় লোকদেরকে খাটানো থেকে শুরু করে গ্রামে হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত তার যা যা মনে আছে সব আমরা জানতে চাই।’
নাউরুকে স্থানীয় ভাষায় প্রশ্ন করল রুবো। স্যাম ও রেমি এই ভাষার একবর্ণও বুঝতে পারল না। নাউরুর সাথে কথা বলা শেষে রুবো স্যামের দিকে ফিরল।
‘অয় কইতাছে, ওইডা অনেক পুরাইন্যা কাহিনি। কেউ আর ওই কাহিনি লইয়্যা মাতা ঘামায় না। ওই সময়কার বেবাক লোক মইর্যা গ্যাছে। শুদু অয় বাইচ্যা আছে এহন। আরেকজন বাইচ্যা আছিল, অর চাচতো ভাই। হার নাম আছিল: কটু।’
‘জি, কিন্তু আমরা সেই কাহিনিটা শুনতে আগ্রহী। গোয়াডালক্যানেলে জাপানিরা এসে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ছিল, স্থানীয় লোকদেরকে দাস বানিয়ে রেখেছিল এই বিষয়গুলো আমরা এই প্রথম জানতে পেরেছি। তাকে বলুন, যেন শুরু থেকে সব বলে। স্থানীয় লোকদেরকে কোন কাজে লাগিয়েছিল জাপানিরা? কী উদ্দেশ্য ছিল তাদের?’ বলল স্যাম।
নরম কণ্ঠে নাউরুকে প্রশ্ন করল রুবো। উত্তর দিতে গিয়ে বিপদজনকভাবে ওঠানামা করতে শুরু করল নাউরুর বুক। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কথা বলতে বলতে নাউরু’র কণ্ঠ একসময় তেল ফুরিয়ে যাওয়া মোটরের আওয়াজের মতো ধীরে ধীরে বুজে এলো। বেচারা নাউরু তার জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে ওদেরকে তথ্য দেয়ার চেষ্টা করছে।
নাউরুর কথা শুনে ফারগো দম্পতিদের দিকে ফিরল রুবো। ‘গোয়াডালক্যানেলের অফিসার হইয়া এক অফিছার আইছিল… কর্নেল… হ্যাঁতে গ্রাম থেইক্যা ব্যাডা লোকগো ধইরা ধইরা নিয়ে গেছিল। এইহানকার সবাই তারে ড্রাগন কইয়া ডাকত। আস্তা শয়তান আছিল, খাড়া হারামী। এইহানকার মানুষগো হুদাই খুন করছিল শয়তানডা। বেশিরবাগ জাপানিরা ভালা আছিল কিন্তু ওইডা আছিল একড়া কুত্তার বাচ্চা।
রুবো জানাল স্ত্রীদের কাছ থেকে তাদের স্বামীদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে কাজে লাগানো হয়েছিল তখন। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত টানা খাটানো হতো তাদেরকে। এদিকে তাদের স্ত্রী, বোন, বাচ্চাদেরকে গায়েব করে দেয়া হতো। গুজব আছে পাহাড়ের গুহায় ভয়ঙ্কর এক্সপেরিমেন্ট চালাতে জাপানিরা। পুরুষদের কর্মক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে তাদেরকে খুন করা হতো। তারপর লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য তাদের আত্মীয়দেরকে অস্ত্রের মুখে নিয়ে আসা হতো তখন। সেই লাশগুলোকে সৎকার করতে না দিয়ে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলতে বাধ্য করা হতো যাতে হাঙর সেগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে খেয়ে নিতে পারে।
শেষের দিকে সবচেয়ে শক্তিশালী ১০০ জন দ্বীপবাসীকে প্রায় ১ ডজন ভারি কাঠের বাক্স বহন করতে বাধ্য করেছিল জাপানিরা। এখানকার গাছ কেটে বাক্সগুলো বানানো হয়েছিল। খুব ভারি ছিল বাক্সগুলো। মাথায় তপ্ত রোদ নিয়ে পাহাড়ে যেতে হয়েছিল তাদেরকে। পুরো একদিনের সফর। খাবার বলতে দেয়া হয়েছিল কিছু পানি।
বাক্সগুলোকে পাহাড়ের গুহায় ঢোকানো হয়েছিল। কাজ শেষ হতেই কর্নেল নির্দেশ দিয়েছিল সেই ১০০ জন পুরুষকে যেন খুন করা হয়। সৌভাগ্য আর শারীরিক সক্ষমতার জোরে নাউরু আর তার চাচাতো ভাই সেই বিভীষিকা থেকে প্রাণে ফিরতে পেরেছিল সেদিন। একটা গুহায় দু’জন লুকিয়ে ছিল। কয়েকদিন লুকিয়ে থাকার পর সাহস করে বাইরে এসে দেখেছিল সবার মৃত দেহ পচে গলে একাকার।
