‘তোশহিরো ওয়াতানাবি, ওল্লোংগং, সাউথ ওয়ালেস। ১৮ নাম্বার রিজ গার্ডেন।
ওল্লোংগং? এটা কোনো জায়গার নাম। সত্যি?’ রেমি প্রশ্ন করল।
স্যাম মাথা নাড়ল। তাই তো দেখছি। সময় দেখল ও। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পরবর্তী ফ্লাইট কয়টায়?
ট্রাভেল ওয়েবসাইট বের করল রেমি। দুই ঘণ্টা পর একটা ফ্লাইট আছে। ব্রিসবেন দিয়ে যাবে। কালকের আগে সরাসরি সিডনি যাওয়ার কোনো প্লেন নেই।’
তাহলে চলো একটু ঘুরে আসি।
‘দারুণ। তবে আমার নতুন পোশাক কিনতে হবে।
‘দুনিয়ার ওই এক জিনিস ছাড়া আর কিছু করার নেই নাকি? আগে চলো সকালের নাস্তা সেরে নিই।
হাতে সময় নেই। এয়ারপোর্ট চল।
আচ্ছা! তাহলে যা খাওয়ার ব্রিসবেনে গিয়ে খাব।’
‘আমরা কি এই রুম ছেড়ে দেব?’
না, রুম থাকবে। দুই দিনের জন্য কী কী লাগবে তোমার… সাথে নিয়ে নাও।’
ফ্লাইটে মাত্র অর্ধেক যাত্রী উঠেছে। ব্রিসবেনে নেমে হোটেল বুকিং ও খাওয়া-দাওয়া সেরে জেমস স্ট্রিটে গেল ওরা। শপিং করল। সত্যি বলতে শপিং যা করার রেমি-ই করল। স্যামের শপিং বলতে রেমি’র নতুন পোশাকের ব্যাপারে “ভাল লাগছে” “দারুণ মানিয়েছে” এসব বলে যাওয়া।
পরদিন সিডনি পৌঁছে সড়কপথে ওললাংগং রওনা হলো ফারগো দম্পতি। ওয়াতানাবি সাহেবের চিকিৎসা যেখানে হয়েছিল সেই নার্সিং হোমের ঠিকানা যোগাড় করে নিজের যাবতীয় শক্তি-সামর্থ্য খাঁটিয়ে ওদের দুজনের জন্য ওয়াতানাবি’র সাথে সন্ধ্যায় একটা মিটিঙের ব্যবস্থা করেছে সেলমা।
ওয়াতানাবি’র বাড়িতে এসে ওরা দেখল ইটের দোতলা বাড়ি। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি গাছ লাগানো। কাছেই একটা হাসপাতাল আছে। বাড়িতে ঢুকতেই এক মোটাসোটা মহিলা এসে ওদের দুজনকে কার্ড রুমে বসতে দিয়ে ওয়াতানাবি-কে আনতে গেল। ৫ মিনিট পর হুইলচেয়ারে একটা রুগ্ন শরীরের জাপানিজকে নিয়ে ফিরল সে। লোকটার চুলগুলো রূপোলী। চেহারায় অনেক বলিরেখা।
‘মিস্টার ওয়াতানাবি, আমাদের সাথে দেখা করার জন্য ধন্যবাদ। ওয়াতানাবি যেহেতু অস্ট্রেলিয়ায় বেশ কয়েক বছর ধরে আছে তাই সে ইংরেজি বোঝে, এটা ধরে নিয়ে ইংরেজিতেই বলল রেমি। স্যাম আর ও দু’জন মিলে পরামর্শ করে এসেছে… অপরিচিত কারও কাছে কথা বলার সময় নারীরা আগে কথা বললে পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে সুবিধে হয়। প্রথমেই পুরুষ কথা বললে আবহাওয়ায় মিষ্টতা থাকে না।
ওয়াতানাবি মাথা নাড়ল। কিছু বলল না।
‘আমার স্বামী ও আমি হলাম আর্কিওলজিস্ট।’
এবারও কিছু বলল না সে। খুব মিষ্টি করে হাসি দিল রেমি। আমরা যুদ্ধের সময়কার বিষয় নিয়ে জানতে এসেছি। আপনাদেরকে যখন বন্দী করা হয়েছিল, সেই জাহাজের ব্যাপারে কিছু বলুন। অনেক দূর থেকে আপনার কথা শুনতে এসেছি আমরা।’
জাপানির চোখ সরু হলো কিন্তু এবারও সে চুপ। রেমি ভাবল, আরেকবার চেষ্টা করা যাক।
‘আপনার সাথে আরও চারজন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছিল শুনেছি। ঝড়ের মধ্যে সমুদ্রযাত্রা অনেক কঠিন ছিল, তাই না?
‘তিনজন নাবিক, একজন সৈনিক।’ বলল ওয়াতানাবি। তার কণ্ঠ বেশ কোমল।
‘আচ্ছা। তাহলে সবমিলিয়ে ৫ জন?
‘হ্যাঁ। ১০০ জন থেকে ৫ জন।
কাহিনিটা বলবেন আমাদেরকে? কী হয়েছিল?
কাধ ঝাঁকিয়ে চেয়ারে নড়েচড়ে বসল ওয়াতানাবি। ঝড়ের কবলে পড়ে আমাদের জাহাজটা ডুবে যায়। তার ইংরেজি উচ্চারণ বেশ ভাল। তবে একটু অস্ট্রেলিয়ান টান আছে।
‘হা, জানি। ডেস্ট্রয়ার, তাই না?
জাপানিজ মাথা নাড়ল। ওটার বয়স ছিল মাত্র ১ বছর। কিন্তু ওই এক বছরেই অনেক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল।
তারপর?
‘সেভাবে মেরামত করা সম্ভব হয়নি। পানি ঢুকে পড়েছিল জাহাজে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কোনো উপায় ছিল না। সাগরে ডুবে গেল জাহাজটা।
‘আচ্ছা। তো দ্বীপের ওদিকে কী জন্য গিয়েছিলেন?’ রেমি জানতে চাইল।
‘গোয়াডালক্যানেল থেকে সৈনিকদের তুলতে গিয়েছিলাম। আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ওদেরকে নিয়ে টোকিও চলে যেতে হবে। অনেক দীর্ঘ যাত্রা। ঝড়টা হঠাৎ করে উদয় হয়েছিল। মেঝের দিকে তাকাল ওয়াতানাবি। ‘আমাদের অধিকাংশের জীবনের শেষ চমক ছিল ওটা।
‘আমাদেরকে সেই রাতের কথা বলুন।’ বলল রেমি। ওই ঘটনার অভিজ্ঞতা যাদের ছিল তাদের মধ্যে একমাত্র আপনিই বেচে আছেন এখনও।
ওয়াতানাবি তার দু’চোখ বন্ধ করল। খুলল একটু পর। গলা পরিষ্কার করে স্মৃতি হাতড়ে বলতে শুরু করল সে।
‘আমাদের বেজ থেকে সন্ধ্যায় রওনা দিয়েছিলাম। জানতাম, বুগেইনভিল এর ১০০ মাইলের ভেতরে আমাদের কোনো প্লেন আক্রমণ করবে না। কারণ ওইটুকু শত্রুপক্ষের রেঞ্জের বাইরে ছিল। ৩০ নট গতিতে এগোচ্ছিলাম আমরা। সাগর সে-রাতে কেমন যেন দ্বিধা-দ্বন্দে ছিল। ঝোড়ো বাতাস আসছিল পশ্চিম দিক থেকে। কে জানতো, সেই হালকা ঝোড়ো বাতাস থেকে আমাদের কপালে দুর্গতি ঘটবে। রাত সাড়ে দশটার দিকে গোয়ালক্যানেলে পৌঁছুলাম আমরা। সৈনিকদের তুলে নিয়ে ১ ঘণ্টার মধ্যে রওনা হলাম।
ওয়াতানাবিকে উৎসাহ দিয়ে মাথা নাড়ল রেমি।
‘যাত্রার দুই ঘণ্টার পর থেকে শুরু হলো সাগরের রুদ্রমূর্তি ধারণ। পাহাড় সমান উঁচু উঁচু ঢেউ আসতে শুরু করল। সাথে তুমুল বৃষ্টি আর বাতাস। অবশ্য ওর চেয়েও জঘন্য আবহাওয়ার মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা ছিল আমাদের। কিন্তু আগের আঘাতপ্রাপ্ত অংশের মেরামত বিকল হয়ে গেল… সমস্যাটা তৈরি হলো তখন। আমাদের হাতে করার মতো কিছুই ছিল না। কয়েকটা লাইফবোট ছিল কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করে শান্তি পাওয়া যায়নি। কারণ, আমাদের সাথে সৈনিকরা রয়েছে। আবহাওয়ার ভয়ঙ্কর রূপের সামনে জাহাজ খুব বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। দীর্ঘ শ্বাস ফেলল ওয়াতানাবি। অধিকাংশ সৈনিক সাঁতার জানত না। আর যারা জানত তারাও সুবিধে করতে পারেনি। এত এত পানি আর ঢেউ। ৪০, ৫০ ফুট উঁচু ঢেউ এলে আসলে কিছু করার থাকেও না। ওর মধ্যে কারও বেঁচে যাওয়াটা রীতিমতো অলৌকিক ঘটনা। ওভারলোড হয়ে লাইফবোট ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করল জাপানিজ। তারপর এলো হাঙরের দল।
