“আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা শুধু আদেশ পালন করি মাত্র।”
“হুম! নাজীদেরও কিছু করার ছিল না। যাই হোক, আশা করি বুঝতে পারছেন যে আমরা কেন এসেছি আর কি খুঁজছি?” বলল কার্ট।
গোলনার আস্তে মাথা ঝাঁকালো। “হ্যা! আপনারা যা চান তা দিচ্ছি।”
জীববিজ্ঞানী ওদেরকে ল্যাবের অন্য পাশে নিয়ে গেলেন। পুরো টানেলটার সাথে এই অংশটার কোনো মিলই নেই। চারপাশে উজ্জ্বল আলো সাথে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি–সেন্ট্রিফিউজ, ইনকিউবেটর, মাইক্রোস্কোপ। মেঝে, দেয়াল, সিলিং সবই চকচকে অ্যান্টিসেপটিক প্লাস্টিকে মোড়া। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলেও খুব সহজেই জীবাণু মুক্ত হওয়া যায়। এককোণে একটা কাঁচে ঘেরা বায়ুরোধী ছোট্ট ঘর। ল্যাবের অন্য অংশ থেকে আলাদা।
গোলনার সেটার কাছে এগিয়ে কাঁচের গায়ে লাগানো কীপ্যাডের দিকে হাত বাড়ালো।
“সাবধান।” লোকটার পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে বলল কার্ট।” লিভার ছাড়াই বাঁচতে না চাইলে কোনো চালাকি করা ঠিক হবে না।
জীববিজ্ঞানী হাত তুললো আবার, “আমি মরতে চাই না।”
“তার মানে আজকের সফরে আপনিই প্রথম যাকে দেখে উন্মাদ মনে হচ্ছে না।”
কার্ট ঘাড় ঘুরিয়ে জো আর রেনাটার দিকে ফিরে বলল। “গার্ডগুলোকে বেঁধে রেখে ওদের পোশাকগুলো পরে নাও। কেন যেন মনে হচ্ছে এখান থেকে খুব তাড়াতাড়ি আমাদের ভাগতে হবে। নিজেদেরকে এখানকারই একজন বানিয়ে ফেলতে পারলে কাজটা সহজ হবে।
ওরা মাথা ঝাঁকিয়ে জিয়া আর বাকি দুজনকে ল্যাবের আরো ভেতরে নিয়ে গেল। কার্ট আবার জীববিজ্ঞানীর দিকে ফিরে বলল, “ঠিক আছে। এবার আপনি শুরু করুন।”
লোকটা একটা কোড টিপতেই হিসস করে দরজাটা খুলে গেল। তারপর সে ভেতরে পা দিল, কার্টও ঢুকলো পিছনে।
কার্ট ভেবেছিল যে ভেতরে দেখবে বিশাল বিশাল রেফ্রিজারেটর। তাতে থাকবে বায়োহ্যাজার্ড চিহ্ন যুক্ত সারি সারি ঘোট ঘোট বোতল আর টেস্ট টিউব। কিন্তু ওরা আরেকটা দরজা পেরিয়ে ধুলো-ময়লা রা আরেকটা বড় রুমে চলে এলো। প্রচণ্ড গরম এখানে। চারপাশের সবই কেমন রসকষহীন ছিবড়ে দেখাচ্ছে। চারপাশে লাল রঙের হিট ল্যাম্প জ্বলছে। তাতে রুমটাকে মঙ্গলের পৃষ্ঠের মতো মনে হয়।
ল্যাবের কিছু দূরেই প্রধান কন্ট্রোল রুমে সাকির, হাসান আর আলবার্তো পিওলা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনের দেয়াল জুড়ে অনেক কম্পিউটারের স্ক্রিন। ওগুলোতে গভীর জলধারা থেকে পানি তুলে নীল নদে ফেলছে যেসব পাম্প, কৃপ আর পাইপ সেগুলো দেখা যাচ্ছে।
পাশের আর এক দেয়ালে অন্য আর একটা প্রকল্পের নানান ছবি, নকশা, মানচিত্র ইত্যাদি ঝোলানো। এটার জন্য সাকিবের লোকজনকে ওদের চারপাশের গোলক ধাঁধার মতো সুড়ঙ্গের সবটাকে এখানে দেখাতে হয়েছে।
“জায়গাটা দেখে তো মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সুড়ঙ্গগুলো কত বড়?” পিওলা জিজ্ঞেস করল।
“আমাদের ঠিক জানা নেই। আমরা যতদূর খুঁড়েছি তার পরও ওটা শেষ হয়নি। ফারাওয়েরা এখান থেকে স্বর্ণ আর রুপা উত্তোলন করতো। তারপর লবণ আর ন্যাট্রন। এখনও শত শত টানেল খুঁজে দেখা বাকি রয়ে গিয়েছে। আর ঘোট ঘোট গুহা আর ফাটলের কথা বাদই দিলাম।” জবাব দিলেন সাকির।
পিওলা এর আগে এখানে আসেনি। সাকির ওকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য দেবে বলে কথা দিয়েছেন। তবে পুরো ব্যাপারটাই বিশ্বাসের ওপর। লিখিত কিছু নেই। আপনারা যখন এটা খুঁজে পান তখন পুরোটাই পানির নিচে ডুবে ছিল?”
“নিচের দিকটা ছিল। আমরা পানি পাম্প করে সরিয়ে ফেলতেই দেখি প্রাচীন কিছু চিত্র কর্মে দেখানোই আছে যে, নির্দিষ্ট সময় পরপর জায়গাটা এ রকম পানি দিয়ে ডুবে যায়। জলাধারটাও এভাবেই খুঁজে পেয়েছিলাম। এই জায়গাটায় জলাধারাটা মাটির খুব কাছে। কিন্তু পশ্চিম দিকে আস্তে আস্তে এটা গভীরে নেমে গিয়েছে। সাকির জবাব দিলেন।
পিওলার চোখ সরু হয়ে এলো, “তার মানে জলাধারটা পুরো সাহারা জুড়েই বিস্তৃত?”
“ওটার চেয়ে সাহারা পুরো জলাধারটা জুড়ে বিস্তৃত বলাটা বেশি যুক্তিযুক্ত। তবে হ্যাঁ, জলাধারটা একেবারে মরোক্কোর সীমানা পর্যন্ত চলে গিয়েছে।”
“অন্য কোনো দেশ যে এটা খুঁজে পাবে না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হচ্ছেন কীভাবে? অন্যদের চাইতেও আরো গভীরে খুঁড়ে দেখেছেন, তাই?”
“ভূতাত্ত্বিক কারণেই এটা খুঁজে পাওয়া কষ্ট হবে। তবে এক সময় না একসময় তো খুঁজে পাবেই।” বললেন সাকির। তারপর কাঁধ উঁচিয়ে এমন একটা ভাব করলেন যে তাতে তার কিছুই যায় আসে না।” তবে ততোদিনে ওসব দেশের ক্ষমতা আমাদের হাতেই থাকবে। লোহিত সাগর থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত সেই সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ আর পরিচালনা করবো আমি। এমনকি মরক্কোও আমরা দখল করে নেবে। পুরো উত্তর আফ্রিকা আমার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। আর উপযুক্ত মূল্য দিলে আপনি আর আপনারা যা চান তা-ই পাবেন।”
“অবশ্যই।” খুশিতে দাঁত বেরিয়ে গেল পিলার। বেশ কয়েকটা মাইনিং আর তেল কোম্পানিতে শেয়ার আছে তার। তবে সেটা কেউ জানে না। কিন্তু একবার ঠিকঠাক ঠিকাদারি পেলেই আঙুল ফুলে কলা না একেবারে বটগাছ হয়ে যাবে সে।
“আচ্ছা এই সমাধিটাই বা খুঁজে পেলেন কীভাবে? গত কমপক্ষে একশো বছর ধরে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান তো কম হয়নি।” জিজ্ঞেস করল পিওলা।
“ঠিক, তবে এই জায়গাটার কথা কোথাও উল্লেখ নেই। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এক লোক কয়েক টুকরো ছেঁড়া প্যাপিরাস কোত্থেকে আনার পর আমরা জায়গাটা সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। ব্রিটিশ আর ফ্রেঞ্চ যেসব জিনিস নিয়ে গিয়েছিল। আমরা সেগুলো খোঁজা শুরু করি, তবে আসল জিনিসটা আমরা খুঁজে পাই আবুকির উপসাগরের তলদেশে। ওখানে লেখা ছিল কীভাবে আখেন আতেন সমাধিক্ষেত্র থেকে প্রথম দিকের ফারাওদের লাশ সারিয়ে আর এক জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে নাকি তারা উদয়রত সূর্যের আলোয় আলোকিতত হতো। আর কীভাবে ওসাইরিসের পুরোহিতরা এটাকে খুবই খারাপ কাজ বলে গণ্য করল। ওরা আখেন আতেনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বারোজন রাজার কফিন সেখান থেকে চুরি করে এখানে নিয়ে আসে।”
