“মিসরীয়রা সব কিছুকেই মমি করে ফেলতো।” জো বলল। “কুমির তো অনেক বড়। প্রায় সামাধিতেই পাওয়া যায়। কারণ সে নাকি ওদের দেবতা সোবেক-এর বাহক। বিড়াল দেখা যায়। কারণ ওরা অশুভ আত্মা তাড়াতে পারে। পাখিও একই কাজ করে। পিরামিডগুলোর পাশেই মাটির নিচে বিশাল একটা ঘর আছে। নাম পাখির সমাধি। ওর ভেতর শত শত পাখির মমি। কোনো মানুষের নেই।”
কার্ট একটা অর্ধেক খোলা ব্যাঙ দেখতে দেখতে বলল, “ব্যাঙ কিসের জন্য? ব্যাঙ দেবতা বা এরকম কিছু আছে নাকি?”
জো কাঁধ ঝাঁকালো, “আমার জানা নেই।”
আর কিছুদূর পরই ওরা আলোকিত একটা ঘরের দরজায় এসে পৌঁছুলো। কার্ট আস্তে সেদিকে উঁকি দিল। ওর কাছে মনে হচ্ছে ও একটা অপেরা হাউজের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। অডিটোরিয়ামের ঠিক মাঝ ওপরে আর মঞ্চের একপাশে। নিচের গুহাটা অনেক বড়। ছোট খাটো একটা সম্মেলন চালিয়ে দেয়া যাবে অনায়াসেই। শুধু লাইটগুলোই আধুনিক। বাকি সব কিছু প্রাচীন আমলের।
দেওয়াল মসৃণ আর বিভিন্ন চিত্রকর্ম ও হায়ারোগ্লিফে ভরা। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক আনুবিস এক ফারাওয়ের সেবা করছে। আরেকটায় দেখা গেল সবুজ চামড়ার এক দেবতা এক মৃত ফারাওকে শূন্যে উঠিয়ে আনছে। পরের ছবিটায় একদল মানুষ দেখা গেল যাদের মাথা কুমিরের মতো। তারা ব্যাঙ বা কচ্ছপ ধরছে।
কার্ট জোকে ইশারা করল, “তুমি হলে উপস্থিত মিসর বিশেষজ্ঞ। এগুলো কী বল দেখি?”
“জাদুঘরে যেমন দেখেছিলাম এই সবুজ চামড়ার লোকটা সেটাই। ও হলো ওসাইরিস। পরকালের দেবতা। কে মরে যাবে আর কে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে সেই সিদ্ধান্ত ও-ই নেয়। মাঠের ফসলের ফলন আর মৌসুম শেষ সেগুলো পাকবে কি-না সেটাও ওরই এখতিয়ার।”
“ওসাইরিস মৃতকে আবার জীবিত করে। একেবারে খাপে খাপ।” কার্ট বলল।
“ওই কুমির মানবগুলো হলো সোবেক-এর প্রতিনিধি। সোবেকও মৃত্যু আর পুনর্জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একবার ওসাইরিসকে বাঁচিয়ে ছিল ও। ওসাইরিসকে ধোঁকা দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল ওর শক্ররা।” জো বলল।
কার্ট মাথা ঝাঁকিয়ে আবার ঘরটায় মন দিল। একবারে মাঝ বরাবর অনেক পাথরের কফিন সারি করে রাখা। একদম শেষ মাথায় ছোট্ট একটা স্ফিংস মূর্তি। স্বর্ণের পাতা আর জ্বলজ্বলে একটা নীলকান্তমণি দিয়ে ঢাকা। অন্য পাশে মানে ওদের ঠিক নিচে একটা ছোট্ট জলামত। কয়েক ফুট পানি তাতে। আর তার মধ্যে আছে সত্যিকার চার পেয়ে কুমির।
“কেন যেন এগুলোর চেয়ে মমিগুলোকেই বেশি ভালো লেগেছে আমার।” কার্ট বলল।
“ওগুলো আরো ছোট ছিল।” জো বলল।
দেখে মনে হচ্ছে এটাও একটা সমাধিই ছিল তবে আরো কয়েক ফুট খোঁড়া হয়েছে যাতে কুমিরগুলোর থাকতে কোনো সমস্যা না হয়। কারণ একটা লোক ওদের পাশ দিয়ে হেঁটে পাশের আরেকটা সুড়ঙ্গে ঢুকে গেল কিন্তু ওগুলো সামান্য নড়লোও না।
“আপনি নিশ্চিত যে আমরা একটা পিরামিডের ভেতরে না?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
জো মাথা নাড়লো, “আমি তিনবার গিজায় এসেছি। কোনো বারই এরকম কোনো রুমে আসিনি।”
“আমার কিন্তু দারুণ লাগছে।” কার্ট বলল। “সবসময় টিভিতে এসব পিরামিডের নিচের গুপ্ত গুহা আর ঘরের কথা শুনে এসেছি। এখানে অবশ্য বলে যে এলিয়েনরা নাকি এসে এসে এসব বানিয়ে রেখে গিয়েছে।”
“আচ্ছা বানিয়েছে কীভাবে এই জিনিসটা? অন্ধকারে কাজ করতে কীভাবে?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
জো নিচু হয়ে মাটি থেকে কয়েকটা ঝামা পাথর তুলে নিলো। গুহার বেশিরভাগটাই এই পাথরে ঢাকা। এটা হলো সোডিয়াম কার্বনেট। মিসরীয়রা এটাকে বলে ন্যাট্রন। জিনিসটা মমি শুকানোর কাজে ব্যবহার করা হতো, কিন্তু একটা বিশেষ তেলের সাথে মিশালে ধোয়াহীন আগুন তৈরি হয় এটা থেকে। এটা দিয়েই মশাল বানিয়ে ওরা খনি বা সমাধিতে খোঁড়াখুড়ি করতো। এই জায়গাটা সম্ভবত দুটোই।”
“সমাধি আবার খনি?”
জো মাথা ঝাঁকালো, “সচরাচর এমনটা অবশ্য দেখা যায় না। ন্যাট্রন সাধারণত এমন জায়গায় পাওয়া যায় যেখানে পানি ঢুকে পরে শুকিয়ে যায়।”
“হয়তো পাম্প করে বের করে ফেলা হয়েছে।” রেনাটা বলল।
“এটাকে একটা সমাধি বানানোর কারণ কী?” কার্ট বলল।
“এক ঢিলে দুই পাখি মারা আরকি। এখানেই সমাধি বানানোয় ওরা প্রথমেই লবণ আর ন্যাট্রন উত্তোলন করল আর তারপর মৃতদেহ এনে এখানকার জিনিস দিয়েই আবার সেগুলো মমি করে ফেলল।”
“চিন্তা করেছেন। তুতেন খামেনের সমাধির চাইতেও সমৃদ্ধিশালী একটা সমাধি। অথচ কেউ এটার কথা জানেনা।” রেনাটা বলল।
“কারণ ওসাইরিস ইন্টারন্যাশনাল এটা। প্রথম খুঁজে পেয়েছে। ব্লাক মিস্টের সাথে এই জায়গাটার কোনো না কোনো সম্পর্ক না থেকে পারে না।” কার্ট বলল।
“ওরা হয়তো এখানেই দ্য শ্যাম্পেন আর ভিয়েনেভ যেটা খুঁজছিলেন সেটা পেয়েছে।”
“হতেই পারে। আর যখনই ওরা ব্যাপারটা জানলো আর নিশ্চিত হলো যে আসলেই কাজ করে তখন ওরা জায়গাটা ঢেকে দিল আর অন্য দিক থেকে একটা সুড়ঙ্গ খুড়ে নিশ্চিত করল যাতে আর কেউ এটার খোঁজ না পায়।” বলল কার্ট।
হঠাৎ নিচ থেকে একটা ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো। কার্ট আবার দ্রুত পিছনে সরে ছায়ায় ঢুকে গেল। একটু পরেই একটা বড় চাকার ATV (All terain Vehicle) আসতে দেখা গেল। সামনে দুটো সিট ওটায়। আর পিছনেই একটা তাক মতো বসার জায়গা। সামনের দুই সিটে কালো ইউনিফর্ম পরা দুজন বসা। তাদের পিছনেই ল্যাব কোট পরা দুজন লোক বসা দেখা গেল। দুজনেই এক হাত দিয়ে পাশের হাত চেপে ধরে আছে যেন স্থির হয়ে বসতে পারছে না।
