“আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে ওসাইরিস এই কৃত্রিম পানি সংকট সৃষ্টি করেছে, যাতে করে একটা অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে?” রেনাটা বলল।
“যদি কারণটা মানব সৃষ্ট হয় তাহলে আমার চোখে এমন কাজ করার ইচ্ছা বা সামর্থ্যওয়ালা আর কেউ পড়ছে না।” কার্ট জবাব দিল।
“আর পিওলা?”
“উনি লিবিয়ায় আবার প্রভাব বিস্তার করতে চান। তার জন্য প্রচুর টাকার দরকার হবে। হয় উনি এখানে ঋণ শোধ করতে এসেছেন না হয় পাওনা টাকা বুঝে নিতে এসেছেন। যেভাবেই হোক উনিও এর সাথে জড়িত। আর খরা হওয়ায় ওনার সুবিধাই হচ্ছে।”
জো এতোক্ষণ পাইপটা দেখছিল। “পল যা বলল তেমনটা করতে হলে ঠিক কতখানি পানি উত্তোলন করতে হবে কে জানে।”
“পাইপটা কিন্তু অনেক বড়।” কার্ট মনে করিয়ে দিল।
“অবশ্যই! কিন্তু অতো বড় না।” জো বলল।
“এরকম উনিশটা যদি হয়? ওসাইরিসের এরকম আরো আঠারোটা পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। সবই চালু আর নীলনদের ঠিক পাশে। যদি ওগুলোর সব একসাথে জলাধার থেকে পানি ভোলা শুরু করে?” কার্ট বলল।
জো মাথা ঝাঁকালো, “নদীর পানিতেই যেটুকু কারেন্ট দরকার তা পেয়ে যাচ্ছে। জিনিয়াস।”
“তার মানে এই সবকিছুই এক সুতোয় গাঁথা। ব্লাক মিস্ট, খরা–সব কিছুরই পিছনে.ওসাইরিস।”
আরো দশ মিনিট পরে গিয়ে আশেপাশের চেহারা খানিকটা পরিবর্তন হলো। “সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলো দেখা গেল অবশেষে।” নিচু স্বরে বলল রেনাটা। কার্টের কেন যেন মনে হলো, এটা আসলে সুড়ঙ্গের শেষ মাথা না। সুড়ঙ্গের মাঝখানের একটা জায়গা মাত্র।
প্রায় বিশ মিনিট ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে পথ চলছে ওরা। আলো বলতে ছিল কন্ট্রোল প্যানেল আর সামনের গাড়ির পিছনের লাইটের টিমটিম আলো।
“ওরা থামছে।” জো বলল।
“বেশি কাছে যেও না। ওরা থেমে গেলে আমাদের ব্রেকের শব্দ কানে যেতে পারে। কার্ট সাবধান করল।
জো গাড়ির গতি একদমই কমিয়ে আনলো। ওদের সামনের গাড়ির গতি আরো কমেছে। আরেকটু সামনে এগিয়ে ওটা সুড়ঙ্গ ছেড়ে পাশের দিকে ঢুকে গেল।
জো প্রায় একশো গজ দূরে গাড়ি থামালো। তারপর ওরা তিনজন নেমে পায়ে হেঁটে এগুতে লাগল।
সুড়ঙ্গের ধারে পৌঁছে কার্ট উঁকি মেরে দেখলো জায়গাটা। যা দেখলো তাতে অবাক হলো খুব। তারপর ঘুরলো বাকি দুজনের দিকে।”
“কি দেখলে? কেউ কী আছে?” জো জিজ্ঞেস করল।
“যদি একজোড়া শেয়াল মুখো আট-ফুটি দানবকে বাদ দাও তাহলে কেউ নেই।” কার্ট বলল।
“মানে? মিসরীয় দেবতা আনুবিস নাকি?”
“হ্যাঁ”
কার্ট একপাশে সরে গিয়ে বাকি দুজনকেও ঘরের ভেতরেরটা দেখার সুযোগ করে দিল। বিশাল বড় একটা গুহা ওটা। দেয়ালটা বালির রঙের পাথরে তৈরি। তাতে অসংখ্য বাতি জ্বলছে। একদিকে প্রাচীন মিসরীয় চিত্রকর্ম আর হায়ারোগ্লিফ দেখা গেল। অন্য পাশটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। একটু দূরেই একটা মানুষ নির্মিত সুড়ঙ্গের প্রবেশ মুখে বিশাল মূর্তি দুটো বসানো।
“আমরা কোথায়?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
“কোথায় না বলে কখন বলা উচিত না? আমরা একটা আধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যাত্রা শুরু করলাম আর এসে নামলাম প্রাচীন মিসরে। আমার তো মনে হচ্ছে সময় ভ্রমণ করে চার হাজার বছর পিছনে চলে এসেছি।” বলল জো।
পাইপের সারি আর সুড়ঙ্গ দুটোই দেখা গেল পশ্চিম দিকে এগিয়েছে। কার্ট স্যাটেলাইটে তোলা ওসাইরিস প্লান্টের ছবিটা মনে করার চেষ্টা করল। ওর মনে পড়ল যে প্লান্টের পশ্চিমে শুধু কিছু সরু রাস্তা, দোকান পাট, গোলাঘর আর অফিস বাদে কিছুই নেই। আরো পশ্চিমে আসলে শুরু হয় অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং আর ঘোট ঘোট ঘর-বাড়ির সারি, তারপরেই মরুভূমি, যেখানে…
“তোমার ধারণা কিন্তু কাছাকাছিই গিয়েছে।” কার্ট বলল।
“আরে ওটুকুই বা কজনে পারে।” জো জবাব দিল।
“ট্রামের যে গতি ছিল তাতে আমরা নদীর পশ্চিমে পাঁচ কি ছয় মাইল। এসেছি।” তারপর ও রেনাটার দিকে ঘুরলো। “সম্ভবত আপনার আশা পূরণ হচ্ছে।”
“কোন আশা?”
“কাছ থেকে পিরামিড দেখার আশা। হিসাব বলছে আমরা এখন ঠিক ওগুলোর নিচে।”
.
৪৮.
“পিরামিডের নিচে?” প্রশ্ন করল রেনাটা।
“বা অন্তত গিজা মালভূমি।” কার্ট বলল।
“কত নিচে?”
“বলা সম্ভব না। তবে আমরা আসার পথে আস্তে আস্তে নিচেই নামছিলাম আর গিজা নদী থেকে প্রায় দুইশ ফুট ওপরে। আমরা সম্ভবত পাঁচশো ফুট বা এর আশে পাশের গভীরতায় আছি এখন।”
“তাহলে আর পিরামিড দেখা হলো কোথায়?”
কার্ট রুমের চারপাশে তাকাল। ওরা যে সুড়ঙ্গটা দিয়ে এসেছে সেটা বাদে ওখানে ঢোকা বা বের হওয়ার জন্যে আর একটাই রাস্তা আছে। সেটা হলো ঐ আনুবিসের পাহারা দেয়া সুড়ঙ্গটা।
“ট্যুরের বাকিদেরকে দৌড়ে ধরতে পারলেই দেখার সুযোগ পাওয়া যেতেও পারে।”
“অবাক লাগছে কোনো গার্ড নেই দেখে।” রেনাটা বলল।
“গার্ডরা পাহারা দেয় বাইরে। আমরা তো একেবারে ওদের খাঁচার ভেতরেই ঢুকে পড়েছি।” কার্ট জবাব দিল।
সুড়ঙ্গটায় আলো নেই বললেই চলে। সত্তর ফুট পরপর অল্প ওয়াটের একটা বাল্ব লাগানো। জায়গায় জায়গায় সুড়ঙ্গটাকে প্রাকৃতিক মনে হচ্ছে, আবার জায়গায় বোঝাই যাচ্ছে যে সেই আগের আমলের হাতুড়ি-ছেনী দিয়ে কেটে বসানো, আবার কোথাও দেখে মনে হলো আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সুড়ঙ্গটা বানানো।
সুড়ঙ্গটা প্রথমে ঢালু হয়ে কিছুদূর নেমে গিয়ে তারপর সমতল হয়ে সোজা চলে গিয়েছে সামনে। মাঝে মাঝেই দেওয়ালের খানিকটা অংশ ভেতরে ঢোকানো। দেখে রোমের ভূগর্ভস্থ সমাধির কথা মনে পড়ে যায়। তবে এখানে কোনো মানুষের মৃতদেহ নেই। আছে মমি করা বিভিন্ন প্রাণীর দেহ। কুমির, বিড়াল, পাখি, ব্যাঙ। শত শত ব্যাঙ।
