তারপর নৌকাটাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে তাতে চড়ে বসলেন। ইঞ্জিন চালু হতেই খুব আস্তে সামান্য গতি বাড়ালেন। অযথা কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান না। আর তাড়াহুড়াও নেই।
ওসাইরিস প্লান্টের এক মাইল ভাটিতে তার অপেক্ষা করার কথা। নোঙ্গর ফেলে সব বাতি জ্বেলে পশ্চিম তীরে বসে থাকতে বলেছে তাকে কার্ট। যদি ওরা কোনো ঝামেলায় না জড়িয়ে সুস্থ দেহে ফিরতে পারে তাহলে সহজেই ওকে খুঁজে পাবে।
পরিকল্পনাটা খুবই সাদামাটা। এরকম পরিকল্পনাই কাজে লাগে সবসময়। বিপদে পড়া বা ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু মনের কোণে খানিকটা খুঁত খুঁত করছে তার। খুবই কম হলেও সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।
শোল্ডার হোলস্টার থেকে একটা রাশিয়ান পিস্তল বের করে আনলেন, তারপর সুট টেনে একটা গুলি চেম্বারে ঢুকিয়ে রাখলেন। আশা করছেন এটা ব্যবহার করতে হবে না। তবে প্রস্তুত থাকতে দোষ নেই।
.
৪৭.
জো আর রেনাটাও কার্টের পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। দ্রুত কিন্তু নীরবে এগোচ্ছে ওরা। একসারি করে ও জেনারেটর রুমটা পার হয়ে খোলা দেয়ালটার কাছে চলে এলো। ওটা ওর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শুরু করেছে।
“ভেতরে ঢোকো।” মাথা নিচু করে অন্ধকারে ঢুকতে ঢুকতে বলল কার্ট। জো আর রেনাটাও বিনা বাক্য ব্যয়ে আদেশ পালন করল। তিনজন ঢোকা মাত্র দরজা বন্ধ হয়ে গেল পিছনে।
দরজাটা বন্ধ হতে আলোর শেষ রেখাটাও মিলিয়ে গেল। দূরেই ট্রামের আলো চোখে পড়ল তবে সেটাও মিলিয়ে গেল একটু পর।
পাশের লাইনেই আরেকটা ট্রাম খালি পড়ে আছে।
“এটা চালু করার চেষ্টা করবো নাকি হেঁটে যেতে চাচ্ছ?” জো বলল।
কার্ট সামনে তাকাল। সামনের গাড়িটার ছোটার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, এখনো থামার নাম নেই।
ওটার ইঞ্জিনের শব্দে দেওয়াল পর্যন্ত কাঁপছে। অদ্ভুত ঘট ঘট শব্দ আর তার প্রতিধ্বনির কারণে দূরত্বটা ঠিক আন্দাজ করা যাচ্ছে না। তবে এই আওয়াজের কারণেই ঐ গাড়ির লোকজন টের পাবে না যে ওদেরকে অনুসরণ করা হচ্ছে।
“গাড়িতেই চল। আজ যথেষ্ট পরিশ্রম হয়েছে।” কার্ট বলল।
জো ট্রাম গাড়িটায় উঠে চালানোর জায়গাটা দেখতে লাগল। রেনাটা গাড়িতে উঠতেই কার্ট গিয়ে সামনের লাইটগুলো ভেঙে দিয়ে গেল।
“অফ সুইচ বলে একটা জিনিস আছে কিন্তু।” জো বলল। “একবার সেটা দিয়ে চেষ্টা করা যেতো।”
কার্ট থেমে গেল, “বুদ্ধিটা খারাপ না।”
জো কয়েকটা সুইচ টিপে লাইট বন্ধ হওয়া নিশ্চিত করলো। একটা ফিউজও কেটে দিল সাবধানতার জন্য। তারপর চালু করলো গাড়িটা। থ্রটল ঠেলতেই সামনে বাড়লো ওটা।
“উঠে পড়ুন সবাই।”
শুনে কার্টও উঠে গেল গাড়িতে। সামান্য গুঞ্জন তুলে গাড়িটা অন্ধকারে ঢুকে পড়ল। ধীরে ধীরে সামনের গাড়িটা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই এগুচ্ছে ওটা।
টানেলটা সোজা এগিয়েছে আর তার সাথে সাথে বামদিকে এগিয়েছে এক সারি পাইপ।
“পাইপটা কিসের?” নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল রেনাটা। এটা তো নদী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।”
“হয়তো জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্যে বসিয়েছে। অতিরিক্ত পানি যাতে বের হয়ে যেতে পারে।” জো বলল।
“এখানে তো ঠিকমতো বৃষ্টিই হয় না। জলাবদ্ধতা আসবে কোত্থেকে? আর হলেও এত বড় পাইপ কেন? রেনাটাই বলল আবার।
“হতে পারে সমস্ত শহরের সব পাইপ এক জায়গায় এসে মিলে তারপর এই বড় পাইপ দিয়ে নদীতে পড়েছে।”
“এটা কোনো জলাবদ্ধতার পাইপ না। গত কয়েক সপ্তাহে মিসরে বৃষ্টি হয়নি। অথচ এটা দিয়ে ঠিকই পানি আসছে।” বলল কার্ট।
“তাহলে পানি আসছে কোথা থেকে?” জো জিজ্ঞেস করল।
“জানিনা।”
“হয়তো অন্য কোনো ওসাইরিস প্রজেক্ট থেকে,” বলল রেনাটা।
“হতে পারে।” বলে কার্ট প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল। “স্যুট পরা লোকটাকে আরব একজন পিওলা বলে ডাকলো। আপনি সম্ভবত ওনাকে চেনেন। কে উনি?”
“সম্ভবত, আলবার্তো পিওলা আমাদের একজন সংসদ সদস্য। উনি মিসরে বিশেষ করে লিবিয়ায় আমেরিকার নাক গলানোর কঠোর সমালোচনাকারী। লিবিয়া উনার কাছে শুধু উনি না আমাদের অনেকের কাছেই খুব স্পর্শকাতর একটা বিষয়। একসময় আমাদের কলোনী ছিল তো তাই।”
“উনি এখানে কি করছেন? বিশেষ করে অর্ধেক মহাদেশ পতনের দ্বার প্রান্তে। কার্ট জিজ্ঞেস করল।
“যা শুনলাম তাতে তো মনে হলো কি নিয়ে আলোচনা করতে এসেছেন। কিন্তু আসল ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না। আপনি যা জানেন আমিও তা।”
“আমার মনে হয় উনি এখানে এসেছেন ওসাইরিসের হয়ে দালালি করতে।” কার্ট বলল।
“দালালি?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
“ভেবে দেখুন, কর্ণেল ইদো আমাদেরকে বলেছিলেন মনে আছে? ওসাইরিস একেবারে শূন্য থেকে এসে এখন মহাশক্তি ধর হয়ে বসেছে। এটার পরিচালক সাকির নিজেকে রাজা তৈরির কারিগর ভাবা শুরু করেছে। সে আবার গোয়েন্দা পুলিশে ছিল একসময়। মাত্র কয়েক বছর হয় বরখাস্ত হয়েছে। সে কি-না এখন এই সব দেশের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সে এতো দ্রুত এতো ওপরে উঠেছে যেটা কেউ কল্পনাও করেনি। আর এই সবকিছুকেই মদদ দিচ্ছে হঠাৎ দেখা দেয়া খরা। যার ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই।”
কার্ট বাকি দুজনের দিকে তাকাল। ওরা আরো শোনার জন্যে লুকিয়ে আছে।
“পল আর গামায় ওদের ছুটিতে একজন লিবিয়ান পানি উন্নয়ন বিশারদের সাথে কাজ করছিল। এখানে আসার পথে ওদের রিপোর্টটা পড়েছি। কিন্তু পলের করা কিছু টেস্ট বলছে যে লিবিয়াতে যে জলধারগুলো আছে তার নিচে আরো একটা বিশাল জলাধার আছে। মূলত ওটা থেকেই ওপরেরগুলোতে পানি আসতো। কিন্তু হঠাৎ অজানা কোনো কারণে ওটার পানি সরে যাওয়া আরম্ভ করে। আর তার ফলে ওপরের জলাধারগুলোর পানি শুকিয়ে যায়। আর এই মুহূর্তে আমরা এমন এক সারি পাইপের পাশে বসে আছি যার ভেতর দিয়ে একটা ট্রাক পর্যন্ত চলে যেতে পারবে। আর যেটার পক্ষে প্রতি মুহূর্তেই টনকে টন পানি উঠিয়ে নীল নদে এনে ফেলা সম্ভব।”
