কার্ট রেনাটার দিকে তাকাল। ভয় পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। অবশ্য পাওয়ার-ই কথা। আসলেই মারাত্মক বিপদে পড়তে যাচ্ছে ওরা। গেটটা আস্তে-আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। তার মানে পানির স্রোত এখন আরো বাড়বে।
টারবাইনটা আরো জোরে ঘোরা আরম্ভ করেছে। ধপ ধপ শব্দটাও বেড়ে গিয়েছে অনেক। গেটটা পুরো খুলে গেলে ওদের আর মই আকড়ে থাকা সম্ভব হবে না। টারবাইনের পাখায় ঢুকে কুচি কুচি হয়ে যাবে।
কার্ট ওপরে ইঙ্গিত করতেই রেনাটা মাথা ঝাঁকালো। কার্ট ওর BCD-গুলো খুলে স্রোতের দিকে পাশ ফিরলো তারপর টান দিয়ে কাঁধ ওপরে তুলে এনে সিঁড়িতে উঠে গেল। BCD, অক্সিজেন ট্যাঙ্ক আর মুখোশটা সাথে সাথে স্রোতের টানে গা থেকে খুলে ভেসে গেলো। তারপর একটা একটা করে ধাপ বেয়ে উঠতে লাগল। প্রতিটা ধাপেই উঠতে প্রচুর শক্তি ব্যয় করা লাগছে। প্রতিবার হাত বা পা বাড়ানো মানেই হচ্ছে প্রচণ্ড পানির ওজনের বিরুদ্ধে লড়াই করা।
কার্ট সিঁড়ির ওপরে পৌঁছে নিচে তাকাল। রেনাটা আর জোও চলে এসেছে প্রায়। আরেকবার তাকাল ঘড়ির দিকে। দশ সেকেন্ড বাকি।
গোনা শুরু করল কার্ট।
তিন…দুই…এক।
এবার বের হওয়া যায়।
পানির ওপরে মাথা তুলেই ডিফ্লেকটর গেটের একেবারে ওপরে এলো কার্ট। পানির কবল থেকে মুক্তি পেয়ে ভালোই লাগছে তবে আসল বিপদ সামনেই। গেটটা মাত্র তিন ফুট চওড়া আর পানিতে থাকতে থাকতে ওটার গা একদম পিছল হয়ে আছে।
কার্ট হামাগুড়ি দিয়েই পড়ে রইল কিছুক্ষণ। একদম স্থির। গেটের পাশে পানির উচ্চতা আরো খানিকটা বাড়লো কারণ পানি এখানে টারবাইনে বাড়ি খেয়ে বেঁকে যাচ্ছে। আবার গেটের পিছনেই পানির উচ্চতা কয়েক ফুট কম। ফেনা আর ঘূর্ণি দেখা যাচ্ছে সেখানে। গেটের মুখটার একটু পরেই পরিষ্কার পানি প্রচণ্ড বেগে ঘুরছে। আর ওটার ভয়ানক শব্দ সারা প্রণালি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
এতো বেশি শব্দ যে চিৎকার করেও লাভ নেই। তাই রেনাটা পানি থেকে মাথা তুলতেই কার্ট ইঙ্গিতে দেখালো। ওর মতো রেনাটাও ডুবুরির মতো যন্ত্রপাতি যা ছিল সব খুলে ফেলেছে। রেনাটা মাথা ঝাঁকিয়ে গেটের ওপরে উঠে এলো। এরপর এলো জো। ওরও ঝাড়া হাত-পা। তারপর রেনাটার নেতৃত্বে ওরা গেটটার মাথা বেয়ে ফুটপাথের কাছে চলে এলো। তারপর সেটা ঘেষে দরজার দিকে এগুলো।
দূরে কোথাও থেকে একটা সবুজাভ রশ্মি চোখে পড়ল কার্টের। ক্যামেরার লেন্সে লেজার প্রতিফলিত হয়ে আসছে আলোটা।
“সাবাস, ইদো। মনে মনে বলল ও।
“গেটটা ওরকম হঠাৎ করে খুলে যাবে চিন্তাও করিনি।” জো বলল।
“আমার বেশি অবাক লেগেছে ঐ পানি বের হওয়া দেখে। নকশায় কিন্তু ওরকম কোনো বাইপাস পাইপ চোখে পড়েনি।” কার্ট জানালো।
“আমারো না। কিন্তু এটা যদি বাইপাস টানেল না হয়, তাহলে ঐ পানি আসছে কোত্থেকে?” জো জিজ্ঞেস করল।
“ওটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে।” ঘড়ি দেখতে দেখতে বলল কার্ট। তারপর রেনাটার দিকে ফিরলো। “ইদোর লেজার বন্ধ করতে আর এক মিনিট বাকি।”
রেনাটা অবশ্য ইতোমধ্যেই নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে। “যথেষ্ট সময়।” জবাব দিল ও।
ওয়াটার প্রুফ ব্যাগটা খুলে কয়েকটা তালার কাঠি বের করল। তারপর সেগুলো দিয়ে তালায় খানিক কারিগরি ফলাতেই সেটা খুলে গেল।
দরজার দশ ফুট দূরেই অ্যালার্ম সিস্টেমের একটা প্যানেল পাওয়া গেল। ও সেটার ঢাকনা খুলে ডাটা স্লটে ছোট একটা ডিভাইস ঢুকিয়ে দিল। প্যানেলের ডিসপ্লেতে হাজার হাজার সংখ্যা আর বর্ণ দেখা গেল বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে চলেছে। কয়েক মিলিয়ন কোড চালানোর পর অ্যালার্ম ডি-অ্যাকটিভেট হয়ে গেল। পাঁচ সেকেন্ড পরেই প্যানেলের বাতি সবুজ হয়ে গেল।
“হয়ে গিয়েছে। অ্যালার্মও বন্ধ আর ভেতরের ক্যামেরাগুলোও কাজ করবে না আর। পরের পঁচিশ মিনিট আগের রেকর্ড করা একটা ভিডিও চলবে ওগুলোয়। ততোক্ষণে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না।” রেনাটা বলল।
“গত বসন্তে বেশ টাকা খরচ করে এরকম অ্যালার্ম সিস্টেম লাগিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে টাকাটা জলে গেল।” কার্ট বলল।
“কুকুর কিনতে হবে একটা। সেটাই ভালো কাজে দেবে।” জো বলল।
রেনাটা মাথা ঝাঁকিয়ে জিনিসপত্র আবার ওর ব্যাগে ভরে রাখলো।
“যাওয়া যাক।” কার্ট বলল।
রাস্তা ধরে সামনে এগুতেই একটা সিঁড়ি খুঁজে পেল। তিন ধাপ নামার পরেই গমগমে একটা আওয়াজ ভেসে এলো।
“জেনারেটর রুম” জো বলল।
কার্ট দরজাটা ফাঁক করে ভেতরে তাকাল। ওরা তখনো সর্বশেষ তলা থেকে এক তলা ওপরে। এই রুমটাও বিশাল বড়। লম্বায় কয়েকশো ফুট তো হবেই। আর উচ্চতায়ও ষাট ফুট। ঘরের ঠিক মাঝখানে এক সারি গোল গোল থাম দেখা গেল। প্রজেক্টার ব্যাস কমপক্ষে তিরিশ ফুট আর লম্বাও ওটার অর্ধেক মতো হবে।
“হুভার বাঁধের ভেতরটা দেখতে এরকম।” জো বলল। “এটা তো দেখি আসলেই একটা পাওয়ার স্টেশন।” কার্ট বলল।
“আপনি কী আর কিছু ভেবেছিলেন নাকি?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
“কি জানি। কেন যেন মনে হচ্ছিলো হাসান যখন এটায় ঢুকেছে তার মানে অন্য কিছুও হতে পারে।” কাট জবাব দিল।
“আমার কাছে অবশ্য অন্যরকম লাগছে না।” বলল জো, “পানির স্রোতের সাহায্যে ঐ টারবাইনগুলো ঘোরে, ওগুলো আবার এই ডায়নামোগুলোর সাথে লাগানো।”
“আমি জানি।” কার্ট বলল। “কিন্তু এটা একদমই খালি। হাসান কেন কেউই তো নেই। সম্ভবত ও ফোনটা বন্ধ করে চলে গিয়েছে। আমরা যে ওকে অনুসরণ করছিলাম সেটা কী ওরপক্ষে জানা সম্ভব?”
