প্রণালির মেঝেতে তিনকোণা উঁচু উঁচু বেশ কিছু জিনিস দেখা গেল। ওগুলো বসানো হয়েছে স্রোতের জোর বাড়ানোর জন্যে। ও ওগুলো পার হয়ে ভেতরের দেয়ালের দিকে এগুলো। তারপর পা নাড়ানোও বন্ধ করে দিল পুরোপুরি। এখন শুধু স্রোতের টানে ভাসছে। পাশের দেয়ালের ছায়ায় পৌঁছার আগ পর্যন্ত নিশ্বাস পর্যন্ত নিলো না। কারণ নিশ্বাসের বুদবুদ ওপর থেকে কেউ দেখে ফেলতে পারে।
প্রথম ধাপের টারবাইনগুলো দেখা গেল এরপরেই। হঠাৎ এমনভাবে উদয় হলো যেন কুয়াশা ভেদ করে কোনো জাহাজ এগিয়ে আসছে। হালকা ধূসর আর কেমন অস্পষ্ট দেখাচ্ছে দেখে কার্টের 747 বিমানের ইঞ্জিনের কথা মনে পড়ল। টারবাইনের ব্যাস প্রায় ১৫ ফুট। আর তাতে প্রায় কয়েক ডজন পাখা। দেখতে অনেকটা ফ্যানের মতোই। পাখাগুলো অলস ভঙ্গিতে হালকা হালকা ঘুরছে আর একটা টিক টিক শব্দ হচ্ছে।
কার্ট ভেতরের দেয়ালটার দিকে আরো খানিকটা সরে এলো আর দেয়াল আর টারবাইনের মাঝখানের ফাঁক গলে টারবাইনের অপর পাশে চলে এলো। ঘুরে বাঁকিয়ে দেখে জো আর রেনাটাও সেটা পেরিয়ে এসেছে নিরাপদেই।
প্রণালিটার মাঝামাঝি পৌঁছাতেই দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলো অভিযানের। কার্ট গতি আরো কমিয়ে আনলো। মাঝে মাঝে পানিতে হালকা লাথি মারছে যাতে করে দেয়ালের ধার ঘেষে থাকতে পারে। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ঐ মইটা পার হয়ে যেতে চায় না।
খানিক পরেই আরো একটা শব্দ শোনা যেতে লাগল। এবারের কম্পনটা অবশ্য আরো তীব্র আর ভয় ধরানো। ঠিক দূরবর্তী কোনো জাহাজের প্রপেলারের ধপ ধপ শব্দ।
আসল টারবাইনটা সামনেই আছে তা বোঝা গেল। এটার আয়তন আগেরটার প্রায় দ্বিগুণ। প্রণালির প্রায় পুরোটা দখল করে ফেলেছে। এটার পাখাগুলো পুরো দেখা না গেলেও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে ভালোই। একটু পরেই ডিফ্লেকটর গেটের কিনারটা দেখা গেল।
যেমনটা আশা করেছিল তেমনটাই হয়েছে। গেটটা বন্ধ, মানে ভেতরে ঢোকানো। দেয়ালের সাথে মিশে রয়েছে। ক্ষয় এড়ানোর জন্য ওটার ধাতব মুখে হলুদ রঙ করা। যদিও পানির ভেতরে রঙটা কেমন মরা দেখাচ্ছে কিন্তু পাশের দেয়ালের সাথে তুলনা করলে যথেষ্ট উজ্জ্বল।
ওটার পাশে ভাসতে ভাসতে কার্ট মইটা খুঁজতে লাগল। আরেকটু সামনে এগুতেই চোখে পড়ল ওটা। দেরি না করে দুহাতে আকড়ে ধরলো মইটা। মইয়ের ধাপগুলো কালো স্টিলে বানানো। প্রতিটাই ঝালাই করে গেটের সাথে বসানো। মজবুত, তাই ধরাও সহজ।
কার্ট নিচু হয়ে ওর পায়ের ফিনগুলো খুলে ফেলে স্রোতে ভাসিয়ে দিল। টারবাইনের ওপাশে হারিয়ে গেল ওগুলো।
নদী আর এখানকার পানির গতি একই রকম তবে পানির ঘনত্ব বাতাসের চেয়ে অনেক বেশি। তাই স্রোতের বিপরীতে এভাবে নিজেকে ধরে রাখা অনেকটা প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসে পড়ার মতোই।
মুহূর্ত পরে জো আর রেনাটাও চলে এলো সেখানে। প্রথমে পৌঁছুলোনা রেনাটা। কার্ট যে ধাপটা ধরেছে, সেটা ধরেই থামালো নিজেকে। জো এসে ধরলো ঠিক নিচের ধাপটা। কার্টের মতো ওরাও দ্রুত পায়ের ফিন খুলে ফেলল তারপর পাও ঢুকিয়ে দিল মইয়ের ভেতর যাতে স্থির থাকতে পারে।
জো বুড়ো আঙুল তুলে দেখালো। কাট রেনাটার মুখোশের দিকে তাকাল। খুশিতে জ্বল জ্বল করছে। রেনাটা আঙুল দিয়ে ওকে দেখালো।
নিজের ডক্সা ঘড়িটার সময় পরীক্ষা করে বুঝলো বেশ তাড়াতাড়িই পৌঁছে গিয়েছে। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। আরো তিন মিনিট পর ইদো লেসার দিয়ে ক্যামেরাকে অকেজো করে দেবেন।
.
ইদো ততোক্ষণে জায়গামতো পৌঁছে গিয়েছেন। ব্যাগ থেকে ট্রাইপডটা বের করে জায়গামতো বসিয়েও ফেলেছেন। এটা আসলে জরিপের কাজে ব্যবহারের জন্যে বানানো। তবে মিলিটারির টার্গেটিং সিস্টেমের চেয়ে খুব বেশি আলাদা না।
লেজারটা ঠিকমতো বসানোর পর ওটার দূরবীন দিয়ে তাকিয়ে ক্যামেরাটা খুঁজে বের করলেন, তারপর ওটার লেন্স বরাবর লেন্সটা তাক করে দাঁড়ালেন।
ঘড়িতে দেখলেন আরো দুমিনিট বাকি। এখন শুধু সুইচ টেপার অপেক্ষা। সিগারেটের তেষ্টা পাচ্ছে তার। সময় কাটছে না তাই। নদীটা এখন পুরো খালি কিন্তু হঠাৎ একটা শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে আসতে লাগল। শব্দটা একটা হেলিকপ্টারের।
একটু পরই দেখা গেল আকাশ হতে এক টুকরো আলো ওসাইরিস বিল্ডিং এর দিকে যাচ্ছে। ইদো আরো কিছুক্ষণ দেখে নিশ্চিত হলেন যে ওটা ওসাইরিসেই নামছে। এতো রাতে ওসাইরিসে কার কি কাজ থাকতে পারে ভেবে পেলেন না তিনি।
তবে পানির তিরিশ ফুট নিচে মইতে ঝুলতে ঝুলতে জো, কার্ট বা রেনাটা কেউই হেলিকপ্টার আগমন টের পেল না। এদিকে ওদের ওখানেও ঝামেলা লেগে গিয়েছে একটা। হঠাৎ করে পানির স্রোতও বেড়ে গিয়েছে। ওদের অবস্থান থেকে একটু সামনেই দেওয়ালে বসানো একটা পোর্টের মুখ খুলে গেল। সুয়ারেজের পাইপগুলোর মতোই বড় ওটার মুখ। মুখটা খুলতেই ওটা দিয়ে হুড়মুড় করে পানি বেরিয়ে এলো আর স্রোতের বেগ বেড়ে গেল বহুগুণ।
ওরা মইটাকে প্রায় জড়িয়ে ধরে থাকল। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে তাতে। টান লেগে মনে হচ্ছে হাতটা ছিঁড়েই যাবে। ওর মাঝেও কার্ট এক ঝলক দেখলো ঘড়িটা, আরো এক মিনিট।
হঠাৎ আরেকটা ঝাঁকুনি ওদের কাঁপিয়ে দিল পুরোপুরি। ওদের ধরা মইটা জুড়েই শুরু হয়েছে কম্পন। ডিফ্লেক্টর গেটটা নড়া শুরু করেছে।
