“আপনি কী নিশ্চিত যে এটা একটা ফাঁদ না?” ইদো জিজ্ঞেস করলেন। “এখানে একবার ঢুকলে কিন্তু দুনিয়ার কারো পক্ষেই আর আপনাদের সাহায্য করা সম্ভব হবে না।”
“জানি।” বলল কার্ট। “তবে বিশ্বাস করুন আমি বহু ভেবেও বের করতে পারছি না। কেন হাসান ওখানে বসে বসে কতখানি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো সেটা দেখছে। কিন্তু সিগনাল আসা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওখান থেকেই সর্বশেষ সিগনালটা আসে। আর যদি ওখানে ও নাও থেকে থাকে ওসাইরিসের অবশ্যই ওখানে কিছু একটা আছে। তার মানে একবার জায়গাটা ঘুরে আসলে ক্ষতি নেই।”
“বলিহারি সাহস আপনাদের! তা আপনারা ভেতরে ঢোকার পর আমি কী করবো?” ইদো জিজ্ঞেস করলেন।
“নদীর ভাটিতে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবেন। যদি আমরা হাসানকে খুঁজে পাই তাহলে তাকে ধরে আনবো, আর যদি না পাই জায়গাটা ঘুরে টুরে দেখে বাড়ি ফিরে আসবো।”
.
৪৪.
কয়েক ঘণ্টা পর আবার ওরা নীলনদে নৌকা ভাসালো। নৌকাটা ইদোর এক বন্ধুর। তিন জনের জন্য ডুবুরির সরঞ্জাম আর একটা ট্রাইপডে বসানো লেজারও জোগাড় হয়েছে।
ইতোমধ্যে চারদিকে আঁধার জেকে বসেছে ভালোভাবেই। তাই নদীর দুধারে দিনের মতো একদমই ভিড় নেই। আকাশে চাঁদ নেই তবে দুধারের উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের আলো পড়ে নদীর পানি ঝিকমিক করছে।
ওসাইরিস কর্পোরেশনের কাছাকাছি পৌঁছতেই কার্ট নদীর ভাটিতে তাকাল। “প্রণালির শেষ মাথায় এখন পানি আস্তে আস্তে বইছে।”
“তার মানে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে।” রেনাটা বলল।
“যাক বাচলাম।” বলল জো।
“যদি এখনো একটা ব্যাপার বুঝে আসছে না। তবে পানি শান্ত থাকায় প্রণালিতে ঢোকা আর বিল্ডিংটার ভেতরে অনুপ্রবেশ সহজ হবে। কার্ট বলল।
জো একটা নাইট ভিশন স্কোপ দিয়ে প্রণালিটা পরীক্ষা করে বলল, “সম্ভবত গেটগুলো এখন বন্ধ-ই আছে।”
ইদে নৌকাটা আরো উজানে নিয়ে আসলেন তারপর দিক বদলে পশ্চিম তীরের দিকে এগোলেন। নৌকাটা জায়গা মতো পৌঁছতেই কার্ট, জো আর রেনাটা পানিতে নামার জন্য রেডি হয়ে গেল।
আসার আগেই ওরা কাপড়ের নিচে কালো রঙের ডুবুরির পোশাক পরে নিয়েছিল। ঝটপট তাই ওপরের কাপড় খুলে প্লবতা প্রতিরোধী কমপ্রেসর। BCD (Buayancy Control Device); অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ইত্যাদি জায়গা মতো পরে নিলো। তারপর সব চেক করে দেখলো ঠিকঠাক চলছে কি-না। অক্সিজেনের সিলিন্ডারগুলো বেশি চকচকে না, তার ওপর রঙ করা আছে। তাই ওটায় বেশি পানি প্রতিফলিত হবে না। মাছের লেজের মতো ফিন পরেছে পায়। কয়েকটা ওয়াটার প্রুফ ব্যাগও নিয়েছে আর আছে কয়েকটা লাইট। পানির নিচে কে কোথায় আছে তা দেখতে কাজে লাগবে এটা।
.
৪৫.
রাতের বেলা পানিতে ডুব দেয়া খুবই কঠিন কাজ। এমনকি সর্বোচ্চ অনুকূল পরিস্থিতিতেও। আর যদি তীব্র স্রোত, পাথর আর বালির চাকা ভরা একটা নদীর তল দিয়ে সাঁতরানো লাগে তাহলে তো কথাই নেই। তবে যতক্ষণ ওরা পশ্চিম তীরের কাছাকাছি আছে ততোক্ষণ ওদের রাস্তা হারানোর ভয় নেই।
কার্ট শুধু ওর পা ব্যবহার করে সাঁতরাচ্ছে। তাও খুব আস্তে আস্তে। হাত দুটো শরীরের দুপাশে স্থির। স্রোতের অনুকূলে থাকায় ওদের গতি এখন মোটামুটি তিন নটের মতো। তার মানে প্রণালিটার মুখে পৌঁছাতে দশ মিনিটের মতো লাগবে। কাট ধীরে ধীরে পানির গভীরে নেমে যাচ্ছে। এক সময় ওর আশপাশের পানি আলকাতরার মতো কালো হয়ে এলো ওপরে তাকালে হালকা দু-এক ঝলক ঝিকিমিকি বাদে আর কিছুই দেখা যায় না। নদীর পাড় থেকে তাকালে ওকে আর দেখতে পাবে না। তবে এইটুকু আলোও না থাকলে ওর পক্ষে আশপাশের কিছু ঠাহর করা সম্ভব হবে না।
ও সামান্য বামে ঘুরে পিছনে তাকাল। অন্ধকারের ভেতরেই দুটো LED লাইট জ্বলজ্বল করছে। জো আর রেনাটার কবজিতে ওগুলো বাধা। ওরা দুজন পাশাপাশি সাঁতরাচ্ছে। আর কাটের লাইটের মুখ ওদের দিকে যাতে ওরা ওটা দেখে এগুতে পারে।
সামনেই একটা হালকা আলোর রেখা দেখা গেল। কন্সট্রাকশন সাইটের ফ্লাডলাইট এগুলো। নদীর পানির ওপর পড়ছে। তার মানে ঠিক পথেই আছে ওরা। নদীর পানি ভেদ করে এতো নিচেও আলো চলে আসছে দেখে কার্ট আরো একটু গভীরে চলে গেল।
আলোকিত এলাকাটা পার হতেই প্রণালির মুখের কংক্রিটের পিলারটা চোখে পড়ল। এরপর থেকেই প্রণালির দেয়াল শুরু আর এটাই নদী থেকে আলাদা করেছে প্রণালিটাকে। ওকে এখন বামে ঘেষে থাকতে হবে, না হলে পানির চোরা স্রোতে পড়ে আরেকদিকে চলে যেতে পারে।
একটা জিনিসই নেই, তা হলো ওদের প্রপালসন ইউনিট আর পানির নিচের কমিউনিকেশন সিস্টেম। ঐ বাতি জ্বেলে সংকেত দিতে হবে।
“চলে এসেছি।” ইদো বললেন।
কার্ট মাথা ঝাঁকালো, তারপর ও আর জো পানিতে নেমে নৌকার এক পাশ ধরে ভেসে রইলো। রেনাটা আরো একবার ও আইপ্যাড চেক করে যোগ দিল ওদের সাথে।
“এখনও সময় আছে। ফিরে যাবেন?” কার্ট বলল।
“না। একবার শুধু দেখে নিলাম যে হাসান ঐ বিল্ডিং ছেড়ে বের হয়েছে কি-না?”
“সিগনাল পাওয়া যাচ্ছে না নিশ্চয়ই?”
রেনাটা মাথা ঝাঁকালো।
“তাহলে আর দেরি কিসের। চলুন যাই।” কার্ট বলল। তারপর ওর মুখোশ টেনে জায়গামতো পরে নিলো। রেগুলেটরটা জায়গামতো কামড়ে ধরে ডুব দিল পানিতে।
প্রণালিতে ঢুকতে ওর কোনো সমস্যা হলো না। সোত তেমন নেই এর ভেতরে তবে চারপাশের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। খানিক সামনেই আবার আলোকিত একটা জায়গা পড়ল। আর তাতে কার্ট ওর ডানপাশের দেয়াল আর নিচের পাকা মেঝে স্পষ্ট দেখতে পেল।
