“আপনার জায়গায় আমি থাকলে ওসাইরিসকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করতাম না।” ইদো সাবধান করলেন।
“কেন? কারা ওরা?” জো বলল।
“ওরা কারা না, সেটা হচ্ছে কথা। ওরা হলো গুরুত্বপূর্ণ সবাই।” ইদো জবাব দিলেন।
“আরেকটু খোলাসা করে বললে ভালো হয়।” ভজা বলল।
“আগের বিপ্লবের সময় যাদেরকে সেনাবাহিনী থেকে ছাটাই করা হয়েছিল তারা মিলে বানিয়েছে এটা। সেই ১৯৫২ সাল থেকে সেনাবাহিনীই মিসরের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ওরাই ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের ডান হাত। নাসের ছিল মিলিটারি, সাদাত ছিল মিলিটারি, মুবারকও মিলিটারি। তাঁরাই সব চালাচ্ছে। তবে ভেতরের কাহিনী আরো গভীর। মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স বলে একটা কথা আছে শুনেছেন তো? মিসরে সেই ব্যাপারটাকে একটা নতুন রূপ দেয়া হয়েছে। এখানকার বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরই মালিক ছিল মিলিটারির লোক। তারাই ঠিক করতো কাকে চাকরি দেবে। ওরাই বন্ধুদের পুরস্কার দিত। শত্রুদের সাজা দিতো। কিন্তু বিপ্লবের পর থেকে ব্যাপারগুলো অনেকটাই বদলে যায়। ফলে চাইলেও আর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সেখান থেকেই ওসাইরিসের জন্ম। তারেক সাকির নামের এক লোক চালায় এটা। উনি আগে গোয়েন্দা পুলিশের কর্ণেল ছিলেন। বর্তমানে দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেন উনি। কিন্তু উনি জানেন যে ওনার অতীত সেটা হতে দেবে না। তাই অন্যদের সহায়তা নিয়ে এই বাঁকা রাস্তা ধরেছেন। ওসাইরিস মিসরের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থা। সব কাজের ঠিকাদারি ওরা পায়। শুধু সরকারি না বেসরকারিগুলোও। সবাই ওদেরকে ভয় পায়। এমনকি ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরাও।”
“তার মানে সাকির রাজা বানায় কিন্তু নিজে রাজা না।” জো বলল।
ইদো মাথা ঝাঁকালো। “সে কখনোই আড়াল থেকে সামনে আসবে না কিন্তু এর মধ্যেই দেশে বা দেশের বাইরে তার ব্যাপক ক্ষমতা। লিবিয়া, তিউনিসিয়া আর আলজেরিয়াতে কি হয়েছে তা তো দেখেছেনই।”
“হ্যাঁ।” জো বলল।
“ওসব দেশের নতুন সরকারের সব লোকই সাকিরের বন্ধু। ওর সহচর।” ইদো বললেন।
“শুনেছি ওরাও নাকি বিপ্লবের আগে যার যার দেশে ক্ষমতাসীন ছিল।” জো বলল।
“হ্যাঁ। দুয়ে দুয়ে চারটা কীভাবে মিলছে বুঝছেন আশা করি।”
জো স্পষ্ট বুঝতে পারছে প্রতি পদক্ষেপে ওরা ওদের ধারণার চেয়েও গভীর কিছু একটায় ঢুকে পড়ছে। ঠিক যেন ওরা ছোট একটা মাছ বঁড়শিতে গেঁথেছে আর সেটা আবার খেয়েছে আরেকটু বড় একটা মাছ। এখন বিশাল একটা হাঙ্গর বড় মাছটাকে তাড়া করছে।
ইদো-ই কথা বললেন আবার, “ওসাইরিসের নিজস্ব সেনাবাহিনী আছে। মিসরের সেনাবাহিনী বা স্পেশাল ফোর্স বা গোয়েন্দা পুলিশের গুপ্তঘাতকদের মধ্য থেকে তাদের বাছাই করে নেয়া হয়। সরকারি মিলিটারিতে যারা ব্রাত্য হয়ে পড়ে তারা সবাই যোগ দেয় ওসাইরিসে।”
জো কপাল ঘষলো। “কিন্তু আমাদের ঐ বিল্ডিংটার ভেতরে যাওয়াটা জরুরি। আর আমন্ত্রণ পেয়ে ওটার ভেতর যাওয়ার মতো সময়ও নেই। হাজার হাজার মানুষের জীবন-মরণ নির্ভর করছে এর ওপর।”
ইদো অ্যাশট্রেতে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি শুরু করলেন। জো’র মনে হলো ইদো’র দৃষ্টিতে কেমন একটা পরিবর্তন হয়েছে। অনেক হিসেবী সে দৃষ্টি। ইদো দেয়ালে হাত রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেখে মনে হচ্ছে এই অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে উনি আটকা পড়ে গিয়েছেন। কিন্তু তার মতো মানুষকে শুধু চার দেয়ালের মাঝে মানায় না।
দীর্ঘক্ষণ পর তিনি জোর দিকে ফিরলেন, “ওসাইরিসের শত্রুদের সাহায্য করা আর নিজের পায়ে কুড়াল মারা একই কথা। তবে আপনার কাছে আমি ঋণী। মিসর আপনার কাছে ঋণী।” তারপর সিগারেটের গোড়াটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে বললেন, “আর তাছাড়া এই ব্যবসাটা আমার পোষাচ্ছে না। দুলাভাইয়ের অধীনে কাজ করাটা যে কত ঝামেলার তা আপনাকে বলে বোঝানো যাবে না। আর্মির চেয়েও খারাপ।”
জো হাসলো, “সাহায্যের জন্যে চির কৃতজ্ঞ থাকব।”
ইদো মাথা ঝাঁকালেন, “তা কীভাবে আপনারা ওসাইরিসের বিল্ডিংয়ে ঢুকতে চাচ্ছেন? সরাসরি আক্রমণ বা হেলিকপ্টার থেকে লাফিয়ে নামা নিশ্চয়ই সম্ভব না।”
জো রিসেপশনে বসা কার্ট আর রেনাটার দিকে ইঙ্গিত করল। ওরা কম্পিউটারে ডাউনলোড করা ম্যাপ আর নকশায় চোখ বুলাচ্ছে। “আমি এখনো জানিনা, আমার বন্ধুরা নিশ্চয়ই এতোক্ষণে কিছু একটা উপায় বের করে ফেলেছে। শুনে দেখি আগে।”
ইদো হাত নেড়ে ওদেরকে ডাকলো। পরিচিতি পর্বের পরেই ওরা আসল কথায় চলে এলো।
“আমার সহকর্মীরা আমাকে ওসাইরিস প্লান্টের একটা নকশা পাঠিয়েছে।” রেনাটা বলল। তারপর সামনে এগিয়ে আইপ্যাডটা ডেস্কের ওপর রাখলো যাতে সবাই দেখতে পায় ঠিক মতো। “যদি এই নকশাগুলো ঠিক হয় তাহলে একটা পথ বোধহয় পাওয়া গিয়েছে।”
কয়েকবার স্ক্রিনে স্পর্শ করতেই একটা হাই-রেজুলুশন ছবি ফুটে উঠল। নদীসহ বিল্ডিংটার আশপাশ দেখা যাচ্ছে তাতে। “রাস্তার দিকে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় আছে। ওদিক দিয়ে ঢাকা তাই মোটামুটি অসম্ভব। তার মানে আমাদের একমাত্র উপায় হলো নদীর দিক থেকে ঢোকা। আমাদের একটা নৌকা লাগবে। সাথে তিনজনের জন্য ডুবুরির সরঞ্জাম আর একটা মধ্যম তরঙ্গের লেজার গান–সবুজ হলে সবচেয়ে ভালো হয়। তবে মিলিটারীরা টার্গেটিংয়ের জন্যে যে লেজার ব্যবহার করে সেরকম হলেই চলবে।”
