একটু পরেই ওরা সিক্স অক্টোর ব্রিজ পেরিয়ে আসলো। ওপরে গাড়ি ঘোড়ার প্রচণ্ড আওয়াজ। হর্ণ বাজছে। গাড়ির ধোঁয়া ব্রীজ থেকে নিচে নেমে আসছে।
“নাহ! নৌ-বিহারটা ঠিক রোমান্টিক হলো না।” রেনাটা বলল, “আমি ভেবেছিলাম মাছ ধরার কাঠের নৌকা দেখবো, পালতোলা নৌকা দেখবো। লোকজনকে ছোট ছোট জাল দিয়ে মাছ ধরতে দেখবো।”
“একবার ম্যানহাটনের কাছে হাডসন নদীতেও সেটাই ভেবেছিলাম আমি। কায়রো শুধু মিসরের না, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শহর। আশি লক্ষ মানুষের বাস এখানে।
“যাই হোক, ভালো লাগল না।” রেনাটা জানালো।
“সামনে অবশ্য এতোটা আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। শুনেছি নাসের হ্রদে নাকি কুমিরও দেখা যায় আজকাল। তবে এতদূর যাওয়া লাগবে না আশা করি।” কার্ট কথা দিল।
“রোমান্স চান? তাহলে এদিকে দেখুন।” জো ডাক দিল।
একটু দূরেই শহরের কোলাহলের ওপর দিয়ে গিজার পিরামিডটা দেখা যাচ্ছে। বিকেলের আকাশে তখন কমলা রঙ ধরেছে আর পিরামিডগুলো দেখাচ্ছে চকচকে রুপালি। এই অনুজ্জ্বল আলোতেও ওটা জ্বলজ্বল করছে।
দৃশ্যটা দেখে রেনাটার দুঃখ আরো বাড়লো। “সবসময় ইচ্ছে ছিল কাছে থেকে পিরামিড দেখবো। বিল্ডিংগুলোর ওপর দিয়ে তো ঠিকমতো দেখাই যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে স্ফিংস-এর নাকের গোড়া থেকেই ওরা শহরটা বানানো শুরু করেছে।”
কার্টও অবাক হয়েছে ব্যাপারটায়, “ছোটবেলায় যখন এখানে এসেছিলাম, তখন বেয়ে বেয়ে একেবারে খুফু’ পিরামিডের মাথায় উঠে গিয়েছিলাম। তখন তো ওখান থেকে নদী পর্যন্ত কিছুই ছিল না। শুধু সারি সারি খেজুর গাছ দেখেছিলাম। আর ফসলের মাঠ।”
কার্টের মাঝে মাঝেই অবাক লাগে যে কখনো যদি এমন হয় যে পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি মাটি ইটের নিচে চাপা পড়ে গেল। ও বেঁচে থাকতে যেন এমনটা না হয়। প্রসঙ্গ বদলাতে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের বন্ধুর কি অবস্থা?”
“এখনো দক্ষিণ দিকেই যাচ্ছে। তবে এখন সম্ভবত নদী পার হচ্ছে। অন্য পাড়ে যাবে।” রেনাটা নিচু স্বরে জানালো।
কার্ট শিস বাজিয়ে মাঝিকে ডাকলো তারপর আঙুল দিয়ে অপর পাড় দেখিয়ে বলল, “ঐ পাড়ে নিয়ে যান।”
মাঝি নৌকা ঘুরিয়ে সোজা অন্যপাড়ের দিকে রওনা দিল। দেখে মনে হবে ওরা সরাসরি পিরামিডের দিকে ছুটছে। পশ্চিম পাড়ের কাছাকাছি পৌঁছতেই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষটার আড়ালে আকাশ ঢাকা পড়ে গেল। তবে আরো একটা নতুন জিনিস চোখে পড়ল। নদীর ধারেই বিশাল কিছু একটা বানানো হচ্ছে। ক্রেন, বুলডোজার, সিমেন্ট ট্রাকে এলাকাটা গিজগিজ করছে।
তীরের লম্বা একটা অংশ পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।
কয়েকটা ভবন, পার্কিং স্পেস আর সামনে একটা পার্ক মতো এর মধ্যেই বানানো শেষ। পুরো জায়গাটা বেড়া দিয়ে ঘেরা। তাতে আরবি আর ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখা “ওসাইরিস কন্সট্রাকশন।”
মাটিতে যা বানানো হয়েছে সেটা অবশ্যই দারুণ সুন্দর, তবে কার্টের মনোযোগ কাড়লো নদীর একটা জিনিস।
ওরা যেখানে আছে ওখান থেকেই দেখা যাচ্ছে নদী থেকে ছোট্ট একটা খাল কাটা হয়েছে। খালটা কমপক্ষে একশো ফুট চওড়া আর আধা মাইল লম্বা। রেনাটার আইপ্যাডের স্যাটেলাইট ছবি দেখে আরো নিশ্চিত হওয়া গেল। খালটার দুপাশেই কংক্রিটের দেয়াল সেটাকে নদী থেকে আলাদা করে রেখেছে। দূর থেকেই তাতে পানির কলকল শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
“এটা আবার কী?” জো জিজ্ঞেস করল।
“দেখে তো মনটানার পানি শোধনাগারের মতো লাগছে।” কার্ট বলল।
“সঠিক উত্তরটা দিল নৌকার মাঝি। “পানি বিদ্যুৎ। ওসাইরিস পাওয়ার এন্ড লাইট বানাচ্ছে এটা।”
রেনাটা সাথে সাথেই নেটে সেটা নিয়ে ঘাটা শুরু করল। “মাঝি ঠিকই বলেছে। নেটে বলা হচ্ছে যে পানি নদী থেকে এই প্রণালিটায় জোর করে প্রবেশ করানো হয়। তার ফলে পানির নিচের টারবাইনগুলো ঘোরে আর বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম এটা। ওদের ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে এরকম আরো ১৯টা প্রকল্প আছে ওদের। সবই নদীর তীরে। ভবিষ্যতে মিসরের বিদ্যুৎ নিয়ে আর সমস্যা হবে না।”
“বুদ্ধিটা খারাপ না। বড় বড় বাধ দিলেই আনুষঙ্গিক সব ঝামেলা কমে যায়। আর নদীর ক্ষয়ক্ষতিও তখন আর চোখে পড়ে না।” জো বলল।
কার্টও একমত। দ্রুত একবার নজর বুলাতেই ওর মনে হলো ওরা রোমান জাহাজটা উদ্ধারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে উপায় অবলম্বন করেছিলো এটা অনেকটা সেরকম-ই। কিন্তু কিছু একটা ঘাপলা আছেই। মিনিট খানেকের মধ্যেই সেটা ধরতে পারলে ও, “কিন্তু তাহলে প্রণালির শেষে জল প্রপাতের দরকারটা কী?”
“আমি কোনো জলপ্রপাত দেখতে পাচ্ছি না।” রেনাটা বলল।
“নায়াগ্রা ফলস খুঁজলে তো পাবেন না। ভালো করে দেখুন। নদীর পানির উচ্চতা আর প্রণালি থেকে বেরিয়ে আসা পানির উচ্চতায় ফারাক আছে। কমপক্ষে কয়েক ফুট।” রেনাটা আর জো দুজনেই চোখ বড় বড় করে দেখার চেষ্টা করল ব্যাপারটা।
“তোমার কথাই ঠিক। পানি নিচে নামছে। ওই প্রণালির ভেতরে ঢোকার পর মনে হচ্ছে যে পানির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।” জো বলল।
“বাধ দিলে কী এরকম হয় নাকি?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
“আমার ধারণা এখানে কোনো বাঁধই নেই। কার্ট জবাব দিল। “প্রবাহী পদার্থের ধর্ম অনুযায়ী ঐ প্রণালি আর নদীর পানির উচ্চতা একই হওয়ার কথা। শুধু সেটাই না, প্রণালির পানির স্রোত নদীর স্রোতের চেয়ে কম হবে। কারণ প্রণালির পানিকে বিশাল বিশাল টারবাইনে বাধা পেয়ে পেয়ে তারপর আসতে হচ্ছে। এত বড় প্রকল্পে সাধারণত দেখা যায় পানি উল্টো দিকে বইছে। এরকম এতো বেশি পানি আসে না কখনো।
