“তাহলে এই ব্যাপারে ওনার কোনো নাম শোনা যায় না কেন?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
“সম্ভবত ভিয়েনেভ তাকে এটা গোপন রাখতে বলছিলেন।” কার্ট অনুমান করল। “এটা নতুন একটা অস্ত্র আবিষ্কার সংক্রান্ত ব্যাপার। এসব ব্যাপার ফাস হোক তা কেউই চাইবে না।”
“তার ওপর তখন ব্রিটিশরা মিসরের নিয়ন্ত্রণে ছিল আর একজন ফ্রেঞ্চ অ্যাডমিরালের সাথে এমিলের বন্ধুত্ব নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ করতো ওরা।” ইটিয়েন বললেন। “আসল ব্যাপারটা…” উনি অন্য চিঠিগুলোও ঘাটা শুরু করলেন।
“এখানেই কোথাও আছে।”
“কি আছে এখানে?”
“এটা…” আরেকটা কাগজ তুলে বললেন ইটিয়েন, “এটা হলো ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক এমিলের বিদেশ ভ্রমণের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। ১৮০৫ সালের শুরুর দিকে তিনি আবারো মিসর ফিরে গিয়ে গবেষণা শুরু করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। মাল্টার প্রাদেশিক গভর্নর সেটা অনুমোদন করলেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সেটা নাকচ করে দেয়।”
কার্ট চিঠিটা দেখলো। দেখেই বোঝা যায় অফিসিয়াল চিঠি, “আমরা এই মুহূর্তে মিসরের ভেতরে আপনার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবো না।” পড়ল কার্ট। “উনি যেতে চাচ্ছিলেন কোথায়?”
“জানি না।” ইটিয়েন বললেন।
“ইশ! জানতে পারলে কাজে দিতো,” রেনাটা বলল।
“উনি আর কখনো চেষ্টা-চরিত্র করেননি।” কার্ট জিজ্ঞেস করল।
“না, দুঃখের বিষয় হলো সেই সুযোগই পাননি। এর কিছুদিনের মাঝেই তিনি আর ভিয়েনেভ দুজনেই মারা যান।”
“দুজনেই?” সন্দেহের সুরে জিজ্ঞেস করল জো, “কীভাবে?”
“এমিল স্বাভাবিকভাবেই মারা যান। মাল্টাতেই। ঘুমের মাঝে মারা যান তিনি। ধারণা করা হয় তার হার্টে সমস্যা ছিল। রিয়ার অ্যাডমিরাল ভিয়েনেভ মারা যান একমাস পর ফ্রান্সে। তার মৃত্যুটা অবশ্য এরকম স্বাভাবিক ছিল না। তার বুকে সাতবার ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। সেটাকে আত্মহত্যা বলে রায় দেয়া হয়।”
‘আত্মহত্যা? সাতবার ছুরি মেরে? আমি বহু সন্দেহজনক রিপোর্ট পড়েছি কিন্তু এটা তো পুরোই হাস্যকর।” রেনাটা বলল।
ইটিয়েনও সম্মতি জানালেন, “বিশ্বাস করা শক্ত। এমনকি সেই সময়েও এটা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে।
“ভিয়েনেভের না বসন্তে সম্রাটের সাথে দেখা করার কথা ছিল?”
ইটিয়েন মাথা ঝাঁকালেন, “হ্যাঁ। আর বেশির ভাগ ইতিহাসবিদেরই ধারণা অ্যাডমিরালের মৃত্যুর পিছনে নেপোলিয়নের হাত আছে। হয় তিনি ভিয়েনেভের কথা বিশ্বাস করেননি। অথবা হয়তো তাকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করতে পারেননি।”
দুটোই হতে পারে বলে কার্টের মনে হলো। তবে ওর দরকার হচ্ছে মিসরীয় লিপির সেই আনুবাদগুলো। “যদি ভিয়েনেভের কাছে তখন অনুবাদটা থেকে থাকে তাহলে তার মৃত্যুর পর সেগুলোর কী হয়? উনার সহায় সম্পত্তির কী করা হয়েছিল জানেন নাকি?”
ইটিয়েন কাধ নাচালেন। “আমি আসলে নিশ্চিত না। ফরাসি নৌবাহিনীর বেইজ্জত অ্যাডমিরালদের কোনো জাদুঘর নিশ্চয়ই নেই। আর শেষ দিকে এসে ভিয়েনেভ একেবারেই কপর্দকহীন হয়ে পড়েন। বেনের একটা বোর্ডিং-এ থাকতেন। সম্ভবত মারা যাওয়ার পর বাড়িওয়ালাই সবকিছুর দখল নিয়ে নেয়।”
“এমনও তো হতে পারে যে ভিয়েনেভ নেপোলিয়নকে অনুবাদটা দেয়ার পরই তাকে খুন করা হয়। রেনাটা বলল।
“কেন যেন আমার সেটা মনে হয় না। কার্ট বলল, “ভিয়েনেভ খুবই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন লোক ছিল। জীবনের প্রতিটা বিপদ সে দক্ষতার সাথে কাটিয়ে এসেছে।”
“শুধু যখন ট্রাফালগারে নেলসনের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল তখন বাদে।” জো মনে করিয়ে দিল।
“হ্যাঁ, তবে সেখানেও কিন্তু তার সব পদক্ষেপ মাপা-ই ছিল।” কার্ট জবাব দিল, “যতদূর মনে পড়ে উনার কাছে খবর পৌঁছেছিল যে নেপোলিয়ন তাকে আর চাচ্ছেন না। আর সম্রাটের কাছে গেলেই তাকে গ্রেফতার, জেল এমনকি গিলেটিনে পর্যন্ত দিতে পারেন। এতকিছু বিবেচনা করেই কিন্তু ভিয়েনেভ তার শেষ চালটা চালেন। তিনি যুদ্ধ করতে গেলেন। খুব ভালোই জানতেন যদি যুদ্ধে জয় হয় তাহলে তিনি বীর হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং বাকি সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন। আর যদি তিনি হারেন তাহলে হয় মারা যাবেন না হয় ব্রিটিশদের হাতে বন্দী হবেন। সেক্ষেত্রে তাকে নিরাপদে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হবে। সেটাই কিন্তু হয়েছিল।”
“সর্বস্ব দিয়ে বাজি ধরা। জিতলে সব ফেরত পাবে, হারলে সব যাবে।” জো বলল। “চালটা কিন্তু ভালোই খেলেছিলেন। ব্রিটিশরা আবার তাকে ফ্রান্স ফেরত পাঠিয়েই গোলমালটা বাধালো।” রেনাটা মন্তব্য করল।
“সব চাল তো আর জেতা যায় না। তবে লোকটার চিন্তাধারা আর প্রতি পদক্ষেপে যে ধূর্ততা উনি দেখিয়েছেন। তাতে আমার মনে হয় না যে নেপোলিয়নের সাথে দেখা করেই ওনার একমাত্র বাঁচার অবলম্বনটা তার হাতে তুলে দেবেন। বরং নেপোলিয়নকে জিনিসটার সামান্য অংশ দেখিয়ে লোভ লাগাবেন আর বাকিটা কোথাও লুকিয়ে রাখাটাই তার সাথে যায়। কারণ একমাত্র এটাই তার জীবন রক্ষা করতে পারতো।” কার্ট বলল।
“তাহলে নেপোলিয়ন ওনাকে মারলেন কেন?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
“কে জানে? হয়তো ভিয়েনেভের কথা তার বিশ্বাস হয়নি। হতো প্রতিবার অ্যাডমিরালের এসব বকোয়াজ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ভিযেনেভের কারণে তাকে বহুবার বেইজ্জত হতে হয়েছে। আর হয়তো সহ্য হয়নি।” কার্ট অনুমান করল।
