এমিলকে দেখে মনে হলো তিনি বলবেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেটা চেপে গেলেন, “এটা…এটা সম্ভব না। কিন্তু…আমি শুধু জানি এমনটাই হয়েছে।”
.
৩৯.
দ্য চ্যাম্পিয়নের পড়ার ঘরের দরজাটা ভেঙে একপাশে ঝুলছে। উনি সেটাকে পাত্তা না দিয়ে ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বাকিরাও ঢুকলে পিছু পিছু।
ইটিয়েন ভেতরে ঢুকেই এক কোণায় একটা ছোট আলমিরার দিকে এগিয়ে গেলেন। কাত হয়ে পড়ে আছে সেটা।
“এখানে।” ডাকলেন সবাইকে। “হঠাৎ করেই একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। বহুদিন ধরে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে মরেছি।”
কার্ট আর জো ওনাকে সাহায্য করল ভারি আলমিরাটা সোজা করতে। সাথে সাথেই দ্য চ্যাম্পিয়ন ওটার ভেতর ঘাটাঘাটি আরম্ভ করলেন।
“ওরা এটা থেকে তেমন কিছু নেয়নি।” সাবধানে একটা একটা কাগজ বের করতে করতে বললেন ইটিয়েন। উনি একটা একটা কাগজ বের করছেন তারপর এক নজর দেখেই পাশে রেখে দিচ্ছেন। “ওদের লক্ষ্য ছিল শুধু পুরাকীর্তিগুলো ও এমিলের মিসরে থাকাকালীন আঁকা ছবি আর নোটপত্র। বাকিগুলোর প্রতি ওদের তেমন আগ্রহ ছিলো না। কারণটা কী বলেন তো?”
বিদ্রূপের একটা হাসি হেসে বললেন ইটিয়েন, “কারণ ওরা ফ্রেঞ্চ পড়তে পারে না। বেকুবের দল!”
কার্ট আর জো পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করল। ওরাও ফ্রেঞ্চ পড়তে পারে না। তবে সেকথা মুখে বলল না।
ইটিয়েন তখনো খুঁজেই চলেছেন। তারপর একটা ফাইল মতো বের করলেন। ভেতরে এক তাড়া পুরনো কাগজপত্র।
“পেয়েছি।” উনি কাগজগুলো নিয়ে টেবিলে আসতেই কার্ট মেঝে থেকে একটা ল্যাম্প তুলে এনে জ্বেলে দিল। তারপর পুরো দলটাই হামলে পড়ল কাগজগুলোর ওপর। জিনিসটা একটা হাতে লেখা চিঠি।
ইটিয়েন সবার জন্যে অনুবাদ করে শোনালেন সেটা। “প্রিয় বন্ধু এমিল, আপনার চিঠি পেয়ে খুব ভাল লাগছে। ট্রাফালগারের সেই দুর্দশা আর ব্রিটিশদের কাছে বন্দী থাকার পর আমি আবার আমার সম্মান ফিরে পাবো ভাবিনি।”
“ট্রাফালগার?” রেনাটা জিজ্ঞেস করল।
কার্ট ব্যাখ্যা করল, “আবুকির বন্দর ছাড়াও, ভিয়েনেভ ট্রাফালগারের যুদ্ধেও ফ্রেঞ্চ নৌ-বহরের দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে নেলসন ফ্রান্স আর স্পেনের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে প্রমাণ করেন ইংল্যান্ডকে দখল করার ক্ষমতা কারো নেই। এরপর নেপোলিয়নের ইংল্যান্ড আক্রমণের যেটুকু ইচ্ছা ছিল সেটুকুও চলে যায়।”
ব্যাপারটায় রেনাটা দারুণ চমৎকৃত হয়েছে বোঝা যায়। আমি যদি ভিয়েনেভ হতাম তাহলে ব্রিটিশদের সাথে বিশেষ করে নেলসনের সাথে যেকোনো যুদ্ধ আমি এড়িয়ে চলতাম।”
জো হাসলো, “লোকটা নিশ্চয়ই নেলসনকে মারাত্মক ঘৃণা করতো।”
“আসলে তিনি ইংল্যান্ডে বন্দী থাকা অবস্থায় নেলসনের শেষকৃত্যেও যোগ দিয়েছিলেন।” ইটিয়েন বললেন।
“সম্ভবত আসলেই মরেছে কি-না সেটা দেখতে গিয়েছিলেন।” রেনাটা বলল। ইটিয়েন আবার চিঠি পড়ায় মন দিলেন, “আপনি প্রায়ই বলেন যে, জাহাজ নিয়ে নীল নদ থেকে পালিয়ে আসার মাধ্যমে আমি আপনার জীবন বাঁচিয়েছি। একথা বললেও ভুল হবে না যে আপনিও একই কাজের মাধ্যমে তার প্রতিদান দিয়েছেন। এই সুযোগে আমি আরো একবার নেপোলিয়নের সাথে দেখা করবো। আমার বন্ধুরা অবশ্য বলেছে যে নেপোলিয়ন নাকি আমাকে জীবিত দেখতে চান না। কিন্তু আমি যখন এই মহা অস্ত্র-মৃত্যুর কুয়াশা–তার হাতে তুলে দেবো তখন তিনি আমার দুই গালে চুমু খেয়ে পুরস্কৃত করবেন। আর আমি পুরস্কৃত করবো আপনাকে। তবে সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার হলো আমরা বাদে কথাটা যেন আর কেউ না জানে। তবে আমি আমার ইজ্জতের কসম খেয়ে বলছি, বিজ্ঞ হিসেবে আপনার পাওনা আপনি পাবেন এবং বিপ্লব আর সাম্রাজ্যের দুটোরই নায়ক হিসেবে প্রাপ্য সম্মানও আপনাকে দেয়া হবে। আপনার পাঠানো আসল আর সামান্য রূপান্তরিত দুটোই আমার কাছে আছে। দয়া করে দ্রুত অ্যাঞ্জেলস ব্রেথ বানানো শেষ করে আমাকে পাঠান যাতে করে আমাদের শত্রুরা এই বিষে আক্রান্ত হলেও আমরা নিরাপদ থাকি। বসন্তের দিকে সম্রাটের সাথে দেখা করবে বলে আশা রাখি। এবার পাওনা শোধ করবো। ২৯ থার্মিডোর, সাল 13, পিয়েরে চার্লস ভিয়েনেভ।”
“রূপান্তরের আরেক অর্থ কিন্তু অনুবাদও হয়।” রেনাটা বলল। “এই ঘটনাটা কখনকার?” কার্ট জিজ্ঞেস করল।
রেনাটা বের করার চেষ্টা করল সালটা। নেপোলিয়নের অদ্ভুত ক্যালেণ্ডারটার পুরোটা মনে আসছে না। তার শাসনামলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেণ্ডারের বদলে এই ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হতো। “১৩ সালের ২৯ থার্মিডর মানে হলো…”
ইটিয়েন এর আগে বের করে ফেললেন, “১৭ আগস্ট, সালটা হলো ১৮০৫।”
“সেটাও তো রোজেটা স্টোনের রহস্যভেদের এক যুগ আগে।” কার্ট বলল।
“অবিশ্বাস্য জো বলল। “আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, কিছু কিছু লোক শব্দটার অর্থ বোঝে হলো বিশ্বাসযোগ্য না।”
“এমিলের ডায়রিটা পাওয়া গেলেই সব প্রমাণিত হয়ে যেতো।” ইটিয়েন বললেন, ভেতরে অনেক ছবি, হায়ারোগ্লিফ আর সম্ভাব্য অনুবাদ লেখা ছিল। এমনকি একটা ছোট ডিকশনারীর মতোও বানিয়েছিলেন উনি। কিন্তু এই সময়ের আগে পরের ব্যাপারটা কখনো আমি ধরতে পারিনি।”
কার্ট জানে যে এরকমই হয়। ইতিহাস যুগে যুগে বদলে যায়। একসময় চোখ বুজে সবাই মানতো যে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু এখন স্কুলে পড়ানো হয় যে ভাইকিংসরা তার বহু আগেই কাজটা সেরে ফেলেছিল।
