“আমার ধারণা তারা শেষ পর্যন্ত লরিয়েন্টে পৌঁছতে পারেন নি।” কার্ট বলল।
“না। তারা আরেকটা জাহাজে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এটার নাম আপনাদের ভাষায় উইলিয়াম টেল বা ফরাসি ভাষায় গুইলামো টেল।”
কার্ট তার জীবনের অর্ধেকটাই নৌ-যুদ্ধ সম্পর্কে পড়াশোনা করে কাটিয়েছে। নামটা ওর পরিচিত, “গুইলামো টেল হচ্ছে অ্যাডমিরাল ভিয়েনেভ-এর জাহাজ।”
“রিয়ার অ্যাডমিরাল পিয়েরে-চার্লস ভিয়েনেভ ছিলেন নৌ-বহরের সেকেন্ড ইন কমান্ড। সেদিন তার দায়িত্বে ছিল চারটা জাহাজ। কিন্তু যুদ্ধে তার সঙ্গীদের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে পড়লেও তিনি যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান।”
এটিয়েন সামনে এগিয়ে এসে অন্য জাহাজগুলো থেকে দূরবর্তী একটা জাহাজ দেখিয়ে বলেন, “এটা হলো ভিয়েনেভের জাহাজ। সব দেখেও চুপচাপ বসেই আছে। সকাল হতেই যুদ্ধের গতি তাদের প্রতিকূলে থাকলেও স্রোতের গতি তাদের অনুকূলেই ছিল। ভিয়েনেভ তাই নোঙ্গর তুলে জাহাজ সেদিকে ভাসিয়ে দেন। তার চারটা জাহাজ আর আমার পর-দাদার পর-দাদাকে নিয়ে পালিয়ে আসেন।”
এতটুকু বলে তিনি চিত্রকর্ম থেকে মুখ ঘুরিয়ে কার্টের দিকে তাকালেন, “সত্যি কথা হলো সব সময়ই আমার ভেতর ভিয়েনেভের কাজটার ব্যাপারে একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে। একদিকে তার কাজটার কারণেই ফরাসিদের সাহস আর esprit de corps যেমন হাসির পাত্র হয়েছে। আবার উনি সেদিন পালিয়ে আসলে হয়তো আমি আজ পৃথিবীতে থাকতাম না।”
“অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নেয়াটাই সাহসের পরিচয়।” রেনাটা বলল কথাটা। “তবে আমি নিশ্চিত যে বহরের বাকিরা ব্যাপারটা এভাবে ভেবে দেখেননি।”
“না, তারা ব্যাপারটা সহজভাবে নেয়নি।” ইটিয়েন বললেন।
কার্ট মনে মনে খণ্ডগুলো জোড়া দিচ্ছে। মনের ভাবনাকেই জোরে জোরে বলল, “যুদ্ধের পর ভিয়েনেভ মাল্টা ফিরে আসেন। আর তারপর ব্রিটিশরা যখন দ্বীপটা দখল করে তখন তাদের হাতে বন্দী হন।”
“ঠিক।” ইটিয়েন বললেন।
“আমি সাধারণত এসব নৌ-বিজয় গাথা শুনতে খুবই পছন্দ করি।” জো বলল, “কিন্তু আপনার পূর্বপুরুষের কথাটা আর একটু বলা যায়? মিসরে উনি কী খুঁজতে গিয়েছিলেন?”
“অবশ্যই।” ইটিয়েন জবাব দিলেন, “তার ডায়রি থেকে যতটুকু জেনেছি তা হলো উনি মিসরের বেশ কিছু মন্দির আর স্থাপনায় অভিযান চালান। বিশেষ করে ফারওদের যেখানে সমাহিত করা হয় সেসব জায়গায়। আর উদ্ধার অভিযান মানে হলো। নেপোলিয়নের লোকজন বহনযোগ্য যা কিছু পেতো সব কিছু তুলে নিয়ে আসতো : চিত্রকর্ম, লিপি, ওবেলিস্ক খোদাই কর্ম, সব। দরকার হলে দেয়াল থেকে খুলে খুলে আনতে। তারপর সেগুলো পাঠিয়ে দিতে লরিয়েন্টে। দুর্ভাগ্যক্রমে উদ্ধার করা জিনিসের প্রায় সবই লরিয়েন্টেই ছিল। সেগুলো সহ-ই ওটা বিস্ফোরিত হয়।”
“প্রায় সব, তবে সব না।” কার্ট বলল।
“অবশ্যই ঠিক ধরেছেন,” ইটিয়েন বললেন। “শেষ চালানটা আমার দাদার সাথেই ছিল। সাম্পানের মাঝির সাথে তার এনিয়ে ঝগড়াও হয়। দাদা চাচ্ছিলেন আদেশ মতো লরিয়েন্টের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্রুয়েসের কাছে সব পৌঁছে দিতে। তবে ততোক্ষণে তিনটা ব্রিটিশ জাহাজ ওটাকে ঘিরে ফেলে, তাই সেটা আর সম্ভব হয়নি।”
ইটিয়েন রেনাটার দিকে তাকালেন, “আবারো অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নেয়াটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাই তারা সবচেয়ে কাছের নিরাপদ জাহাজগুলোর দিকে ছুটে যান আর মিসরীয় পুরাকীর্তি ভরা শেষ ট্যাঙ্কটা ভিয়েনেভের হাতে পড়ে যায়। আর তিনি মাল্টায় পালিয়ে আসায় এগুলো তখনকার মতো ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়।”
“আর তারপর সেগুলো কয়েক মাস পর সোফি সি.-তে তুলে দেয়া হয়।” কার্ট বলল।
“সেরকমই ধারণা করা হয়। তবে আসল ঘটনা কেউ জানেনা। আর এসব জিনিসপত্রই আমাদের মারমুখী বন্ধুরা যে কোন মূল্যে দেখতে চাচ্ছিলো। মিসর থেকে এমিল যা যা এনেছে সব। বিশেষ করে অ্যাবাইতোস বা সিটি অফ ডেড থেকে আনা জিনিসগুলো।”
“সিটি অফ ডেড।” আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কার্ট বলল, তারপর জোর দিকে ফিরলো। ল্যাম্পেড়সাকেও জো ঠিক এই নামেই ডেকেছিল। অবশ্যই ওটা ছিল মৃতদের দ্বীপ বা প্রায় মরাদের দ্বীপ। “আচ্ছা এই পুরাকীর্তি গুলোর সাথে কী প্রাণঘাতি কোনো রহস্যময় কুয়াশার কোনো সম্পর্ক আছে?”
ইটিয়েন কেমন হতভম্ব হয়ে গেলেন সেটা শুনে। “সত্যি কথা হলো, জিনিসগুলো ব্লাক মিস্ট নামের একটা জিনিসের সাথে সম্পৃক্ত।”
কার্টও তেমনটাই ভেবেছিল।
“কিন্তু এখানেই শেষ না।” ইটিয়েন বললেন, “এমিলের অনুবাদে আরও একটা জিনিস পাওয়া যায়। ওটাকে বলে অ্যাঞ্জেলস ব্ৰেথ, নামটা অবশ্যই পশ্চিমারীতিতে করা। মিসরীয় ভাষায় এটাকে বলে মিস্ট অফ লাইফ : কুয়াশাটার উৎস এই জগৎ না, অন্য কোনো জগৎ-পরজগৎ। সেখানে দেবতা ওসাইরিস এটা যাকে ইচ্ছা আবার বাঁচিয়ে তুলতেন। আক্ষরিক অর্থে দাঁড়ায়। এই অ্যাঞ্জেল ব্রেথ মৃতদেহে আবার জীবন সঞ্চার করতে পারে।”
.
৩৮.
“মৃতদেহে জীবন সঞ্চার করতে পারে?” কার্ট আবার বলল কথাগুলো। ও সাথে সাথে বুঝে গিয়েছে পুরো ব্যাপারটা। এটাই হলো ব্লাক মিস্টের প্রতিষেধক। এটার কারণেই হ্যাগেন আর ঐ আক্রমণকারী লোকটার কোনো ক্ষতিই হয়নি। আর সবাই কোমায় চলে গেলেও।
“এটাই সেই প্রতিষেধক।” এবার মুখে বলল ও।
