তবে এই মুহূর্তে ঘর আর লাইব্রেরি দুটোরই তছনছ অবস্থা। দ্য শ্যাম্পেনদের ভয় দেখাতে এই কাজ করেছে আক্রমণকারীরা।
নিকোল দ্য শ্যাম্পেন এসেই এগুলো পরিষ্কার করা শুরু করলেন কিন্তু তার স্বামী বাধা দিলেন। “এখন না, ডিয়ার। আগে পুলিশ আর ইস্যুরেন্সের লোকজন আসুক, তারপর।”
“তা ঠিক, তবে অগোছালো দেখলে আমার ভালো লাগে না।” তারপর সোফায় বসে কার্ট, জো আর রেনাটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদেরকে উদ্ধার করার জন্যে অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞ আমি।”
“আমিও।” তার স্বামী বললেন।
“আসলে এটা আমাদেরই দায় ছিল। আমরা এখানে আসাতেই আপনারা বিপদে পড়েছেন। কার্ট জবাব দিল।
“না, আপনারা আসার দুদিন আগেই এই লোকগুলো এসেছিল।” ইটিয়েন বললেন। তারপর একটা রূপার ট্রে থেকে একটা স্ফটিকের পাত্র তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কগন্যাক (ফরাসি মদ) চলবে?”
কার্ট না করল।
তবে জো আগ্রহ নিয়ে বলল, “হাত-পা গরম করা দরকার।”
একটা টিউলিপ আকৃতির গ্লাসে সোনালি তরলটা ঢাললেন এটিয়েন তারপর জোকে এগিয়ে দিলেন। জো তাকে ধন্যবাদ দিয়ে গ্লাসে চুমুক দিল তারপর চোখ বন্ধ করে আমেজটা উপভোগ করতে লাগলো। স্বাদ আর গন্ধ দুটোই অতুলনীয়। মুখেও সেটাই বলল ও, “অসাধারণ।”
“সেরকমই হওয়ার কথা,” পাত্রটার দিকে তাকিয়ে কার্ট বলল, “যদি ভুল না হয়, তাহলে এটা একটা ডেলামে লি ভয়াজ। এক বোতলের দাম আট হাজার ডলার।”
জো হঠাৎ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কিন্তু ইটিয়েন সেটাকে পাত্তা দিলেন না। “যে আমার জীবন বাঁচিয়েছে তার জন্য এইটুকু আর এমন কি।”
“একদম ঠিক,” নিকোল সমর্থন দিলেন।
আসলেই একদম ঠিক। কার্ট তার বন্ধুর জন্যে গর্বিত। সামান্য পরিচয়েই জো ওর হৃদয় খুলে দিতে পারে।
ইটিয়েন নিজের গ্লাস ঢেলে নিয়ে পাত্রটা আবার ট্রেতে রেখে দিলেন। তারপর আগুনের সামনে বসে তারিয়ে তারিয়ে সেটা উপভোগ করতে লাগলেন।
“এত সুন্দর মুহূর্তটা নষ্ট করার জন্যে দুঃখিত।” কার্ট বলল। কিন্তু ঐ লোকগুলো আপনাদের কাছে চাচ্ছিলো কী? ঐ মিসরীয় পুরাকীর্তিগুলোয় কী এমন আছে যে এতোগুলো মানুষ মারতেও ওদের আটকালো না?”
দ্য শ্যাম্পেন দম্পত্তি দৃষ্টি বিনিময় করলেন, “ওরা আমার পড়ার ঘর তছনছ করে ফেলেছে, লাইব্রেরি ভেঙে চুরে খান খান করে দিয়েছে।”
কার্ট বুঝলো দ্য শ্যাম্পেনরা আসলে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন না। “মাফ করবেন, কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব তাতে পাইনি। জবাবটা আমাদের দরকার। আমরা আপনাদের জীবন বাঁচিয়েছি এজন্য না, দয়া করে মানবতার স্বার্থে আমাদেরকে ব্যাপারটা জানান। হাজার হাজার মানুষের জীবন মরণ নির্ভর করছে এর ওপর। হয়তো আপনারাই বাঁচাতে পারবেন তাদের। প্লিজ সত্যিটা বলুন।”
ইটিয়েনকে দেখে মনে হলো কথাটায় তিনি আহত হয়েছেন। পাথরের মতো মুখ করে বসে রইলেন। নিকোল জামার কোণা ধরে পাচাতে আর খুলতে লাগলেন।
কার্ট উঠে ফায়ারপ্লেসের পাশে একটা জায়গায় গিয়ে বসলো। বুড়োবুড়ি ভাবুক কি বলবে। আগুনের ঠিক পাশেই একটা বড় চিত্রকর্ম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ব্রিটিশ নৌবহর বন্দরে নোঙ্গর করা একটা ফরাসি যুদ্ধ জাহাজের ওপর আক্রমণ করছে।
কার্ট নীরবে ছবিটা দেখতে লাগল। বর্তমান পরিস্থিতি আর ইতিহাস মিলিয়ে হঠাৎ-ই বুঝে ফেলল কিসের ছবি এটা : নীলনদের যুদ্ধ।
“The boy stood on the burning deck,
whence all but he had fled;
The flame that lit the battle’s wreck
Shone round him o’er the dead.”
কার্ট ফিসফিস করেই চরণগুলো আবৃত্তি করল, কিন্তু রেনাটা শুনে ফেলল।
“কি এটা?”
“কাসাবিয়াঙ্কা” কার্ট বলল। “ইংরেজ কবি ফেলিসিয়া হেমানস-এর বিখ্যাত কবিতা। কবিতাটা ১২ বছরের এক ছেলেকে নিয়ে। সে ছিল লরিয়েন্টের কমাণ্ডারের ছেলে। যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সে নিজের জায়গা ছেড়ে একচুলও নড়েনি। শেষমেশ গানপাউডারে আগুন লেগে জাহাজটা বিধ্বস্ত হয়।”
কার্ট ইটিয়েনের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, “এটা আবু বকর বন্দর তাই না?”
“হ্যাঁ, আপনি আপনার ইতিহাস জানেন। কবিতাও।” ইটিয়েন জবাব দিলেন। “একজন ফরাসি অভিজাতের বাসায় ছবিটা ঠিক মানানসই না। আমাদের মাঝে বেশির ভাগই আমাদের পরাজয়গুলোকে স্মরণ করতে চাই না।” কার্ট বলল।
“আমার করার কারণ আছে।”
ছবিটার নিচের কোণায় আঁকিয়ের নাম স্বাক্ষর করা : এমিল দ্য শ্যাম্পেন।
“আপনার পূর্ব-পরুষ?”
“হ্যাঁ, উনি নেপোলিয়নের বিজ্ঞসভার সদস্য ছিলেন। উনিই মিসরীয় রহস্য সমাধানের আশায় নেপোলিয়নের সাথে এসেছিলেন।”
“যদি উনি এটা এঁকে থাকেন, তাহলে উনি যুদ্ধের পরও বেঁচে ছিলেন। উনি নিশ্চয়ই বেশ কিছু ভনিয়ার এনেছিলেন সাথে।” কার্ট বলল। দ্য শ্যাম্পেন দম্পতি আবার দৃষ্টি বিনিময় করলেন। শেষমেশ নিকোল মুখ খুললেন, “ওদের বলে দাও ইটিয়েন। আমাদের আর কিছু লুকানোর নেই।”
ইটিয়েন মাথা ঝাঁকালেন, তারপর হাতের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে সেটা নামিয়ে রাখলেন। “এমিল যুদ্ধটা থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন আর সেটা স্মরণ করেই ছবিটা আঁকেন। কোণায় উনার স্বাক্ষরের ঠিক উল্টো পাশেই একটা ছোট সাম্পান দেখা যাচ্ছে। ওটাতেই ছিলেন উনি। যুদ্ধ শুরুর পর তারা লরিয়েন্টে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।”
