“সম্ভবত আমার ধারণা ভুল।”
ইঞ্জিন ততোক্ষণে পূর্ণ শক্তিতে গর্জাতে আরম্ভ করেছে। রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে সহজেই হর্স পাওয়ার বেড়ে যাচ্ছে। গতি বেশি থাকলেও বিমানটা এখন পুরো ভরা। আর বিমানের ওজন বেশি হলে টেক অফের জন্যেও বেশি সময় লাগা। তাই রানওয়ের শেষ মাথায় পৌঁছে পাইলটের আর কিছু করার ছিল না।
বিমানটা আকাশে উঠানোর জন্যে যতদূর সম্ভব সে থ্রটলটা টেনে উঠাল, তারপর বিমানের নাকটা নিচু করে, বিমানের চাকা ঢুকিয়ে ফেলল। পরবর্তী তিরিশ সেকেন্ড ওরা বিশ ফুট মতো ওপরে ভেসে রইল। পাইলটরা একে বলে “গ্রাউন্ড ইফেক্ট” মাটির কাছাকাছি থাকলেই মনে হয় ওড়ার সময় খানিকটা ধাক্কা দেয় মাটি। ফলে পুরো স্পিড় তোলার জন্যে বিমান কিছুটা সময় পায় আর উচ্চতা বাড়াতেও খুব কাজে লাগে জিনিসটা। কিন্তু আজকের গ্রাউন্ড ইফেক্ট ওদের বিমানকে সরাসরি মেশিনগান বসানো একগাদা পিক-আপ ট্রাকের ওপর নিয়ে এলো।
“সাবধান,” পাইলট চিৎকার করে বিমানটা ডানে ঘুরিয়ে দিল, সেই সাথে ওপরে তোলার চেষ্টা তো আছেই।
ওরা কোনো গুলির আওয়াজ পায়নি, অবশ্য প্লেনের ইঞ্জিনের যে গর্জন তাতে পাওয়ার কথাও না। কিন্তু হঠাৎ করেই কেবিনের ভেতরটা ধাতব তারা। বাতি আর জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গে ভরে গেল।
“পল।” গামায় ডাক দিল।
“আমি ঠিক আছি, তুমি?” পল জবাব দিল।
গামায় নিজেকে দেখে-টেখে বলল, “লাগেনি কোথাও।” pc.3’র গতি বাড়ছে ধীরে ধীরে। এতে ওপরে আর গুলি পৌঁছবে না। কেবিনের সবাই ভয়ে কাঁপছে, তবে একজন বাদে কারো কিছু হয়নি।
“রেজা!” কেউ চিৎকার করে উঠল।
রেজা দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন।
পল আর গামায়-ই তার কাছে প্রথম পৌঁছলো। পা আর পেট থেকে রক্ত পড়ছে।
“রক্তপাত থামাতে হবে।” পল বলল।
সবাই চিৎকার করে উঠল।
গামায় বলল, “আমাদেরকে ওনাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। কাছে। পিঠে কোনো শহর আছে?”
সবাই মাথা নাড়লো।
বেনগাজী, বেনগাজী যেতে হবে।” বহু কষ্টে রেজা-ই বললেন।
পল মাথা ঝাঁকালো। নব্বই মিনিট লাগবে। হঠাৎ এটাকে এক অপরিমেয় সময় বলে মনে হলো পলের কাছে।
“ধৈর্য ধরুন।” গামায় রেজার হাত ধরে অনুরোধ করল, “প্লিজ আর একটু সহ্য করুন।”
.
৩৭.
গোজো দ্বীপ, মালটা
অগভীর উপসাগরটার তলায় বসে জো ওর ট্যাঙ্ক থেকে দ্য চ্যাম্পিনদের অক্সিজেন আর নানানভাবে তাদেরকে ঠাণ্ডা রাখছিল। শেষমেশ রেনাটা আর কার্ট বহু কষ্টে ওদের পানির ওপর তুলে আনলো।
ওদেরকে ডুবুরি নৌকায় তুলে আনাটাই ছিল বেশি কষ্ট, কারণ ওদের হাত পা সবই ছিল বাঁধা। তবে শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় সবাই-ই উদ্ধার হলো। কিন্তু তখনই দেখা গেল আরেকটা সমস্যা।
“নৌকা ডুবে যাচ্ছে।” জো বলল।
নৌকাটায় যথেষ্ট গুলি লেগেছে আজ। সবচে বেশি আঘাত লেগেছে কার্ট যখন এটা দিয়ে ব্রিজটায় ধাক্কা দেয় তখন।
“সামনের দিকটা পুরো পানিতে ভরে গিয়েছে।” রেনাটা জানালো।
“ভাগ্য ভালো যে আমরা তীরের খুব কাছেই।” কার্ট বলল।
তারপর তীরের উদ্দেশ্যে নৌকার মুখ ঘুরিয়ে দিল। সামান্য পরেই ফুটো নৌকাটা তীরের বালির ওপর উঠে এলো। সবাই তীরের অগভীর পানিতে নেমে বালিয়াড়িতে উঠে এলো।
“রাস্তাটা ধরে যাই চলল, গাড়ি-ঘোড়া একটা পেয়েও যেতে পারি।” কার্ট প্রস্তাব দিল।
ওরা বালি পেরিয়ে উঠে এলো। আশেপাশেই পরাজিত গুণ্ডার দল পড়ে আছে।
“সবাই মারা গিয়েছে। যেটার পায়ে গুলি করলাম সেটাও।” রেনাটা বলল।
“কেউ পিছনে পড়ে থাকবে না।” লোকগুলো এই মতবাদে বিশ্বাসী। জো বলল, “তবে কথাটার অর্থ এদের কাছে ভিন্ন।”
কার্ট পায়ে গুলি করা লোকটাকে ভালো করে দেখলো। মুখ ভরা ফেনা।
“সায়ানাইড। এরা তো দেখি একেকটা উন্মাদ। সম্ভবত আদেশ দেয়া-ই আছে যে ধরা পড়া চলবে না।”
“এরকম নির্দেশ দেয়া তো সহজ কিন্তু পালন করা তো চাট্টিখানি কথা নয়।” দ্য শ্যাম্পেন বললেন।
“সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো কঠিন। কিন্তু এরা যে কোন ধরনের সংগঠন কে জানে?” কার্ট বলল।
“আতঙ্কবাদী?” মি, দ্য শ্যাম্পেন বললেন।
“আতঙ্ক এরা ভালোই ছড়াতে সক্ষম, তবে আমার মনে হয় শুধু আতঙ্ক ছড়ানোই এদের উদ্দেশ্য না।” রেনাটা বলল।
কার্ট লাশটা পরীক্ষা করল, পরিচয় পাওয়া যায় এমন কিছুই নেই। কোনো তাবিজ কবজ, গয়না বা ট্যাটু বা কাটা দাগ কিছুই নেই। লোকটা কে বা কার হয়ে কাজ করতো জানার কোনো উপায়ই নেই।
“মাল্টা সরকারকে একটা খবর দিন। ওরা গোয়েন্দা সংস্থা বা সেনাবাহিনী থেকে এ ব্যাপারে সাহায্য নিতে পারে। লোকে বলে “মৃত মানুষ মুখ খোলে না।” কথাটা সম্পূর্ণ ভুয়া। এদের অস্ত্র, কাপড়, আঙুলের ছাপ এসব থেকেও অনেক কথা জানা যায়। এসব লোক মাটি খুঁড়ে উদয় হয়নি। ভালো মতো খুঁজলে কোনো না কোনো পরিচয় বেরুবেই। আর যেভাবে ওরা লড়ছিল তাতে স্পষ্ট যে এরা অতীতে ধোয়া তুলসী ছিল না। কোথাও না কোথাও রেকর্ডে নাম থাকবেই।”
রেনাটা মাথা ঝাঁকালো, “সোফি সি. থেকে যে দুটোকে ধরা হয়েছে ওদের কাছ থেকেও কিছু জানা যাবে।”
“ওরাও এতক্ষণে বিষ খেয়েছে কি-না কে জানে।” কার্ট বলল।
দলটা ধীরে ধীরে রাস্তাটায় উঠে এলো, পিছনে পড়ে থাকল পরিত্যক্ত হোটেল, আর ব্রিজ।
.
কয়েক ঘণ্টা পর ওদেরকে দেখা গেল দ্য শ্যাম্পেনদের বাড়ির বসার ঘরে। সবাই গোসল-টোসল সেরে পরিষ্কার জামা পরেছে। সন্ধ্যা তখন ছুঁই ছুঁই। ঘর জুড়ে দামি আর কারু কার্যে ভরা আসবাব, দেয়ালটা চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য আর একটা লাইব্রেরি সমান বই দিয়ে ঠাসা। বামদিকে একটা ব্যালকনি। এক পাশের দেয়ালের ঠিক মাঝখানে একটা ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে।
