প্রথমে লোকটা ভেবেছিল ব্রিজটা বুঝি হেলে পড়বে। কিন্তু এটা স্থির হয়ে গেল আর ধুলোবালিও পরিষ্কার হলো দ্রুতই। সে আবার তার গুলি করার ছিদ্রটার দিকে মনোযোগ দিল।
সোনালি চুলের আমেরিকানটার হাসিমুখ দেখা গেল সেদিক দিয়ে। হাতে APS রাইফেল।
“উঁহু!” আমেরিকান বলল।
লোকটা তাও চেষ্টা করল। যতদূর সম্ভব নিজের রাইফেলের ব্যারেলটা নিচে নামাতে। কিন্তু যথেষ্ট দ্রুত হলো না সেটা। একটা অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল নিচে। লোকটা শব্দটা চিনতে পারলো। APS রাইফেলের বোল্টের শব্দ। যদিও এটা পানিতে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এখন বাতাসেই গুলি করা হয়েছে। তবে চিন্তাটা মুহর্তের বেশি স্থায়ী হলো পাঁচ ইঞ্চি ধাতব খণ্ডটা সেটা সেখানেই থামিয়ে দিল চিরতরে।
.
৩৬.
দক্ষিণ লিবিয়া
পলের ছুটি শেষ হয়েছে দুই দিন হয়। কিন্তু এখনই ওর দম ফেলবার ফুরসত নেই। এই ভূতাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল দেখছে, আবার কম্পিউটারে NUMA থেকে ডাউনলোড করা একটা সফটওয়ারে শব্দ তরঙ্গ বিশ্লেষণ করছে। আর তার সাথে কফি বানানো আর খাওয়া তো চলছেই। রেজা’র আসল যে ভূতাত্ত্বিক ছিল সে কয়েকদিন ধরে লাপাত্তা। হয় সে কিডন্যাপ হয়েছে নয়তো নিজেই পালিয়ে গিয়ে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিয়েছে। সেই থেকে সব হ্যাপা পল একাই সামলাচ্ছে।
“এটা দেখুন। শেষমেশ শব্দ তরঙ্গগুলোর একটা অর্থ কম্পিউটার বের করতে পেরেছে। সেটার একটা প্রিন্ট আউট বের করে ও ডাকলো সবাইকে। গামায় ফিরে তাকাল, চোখ ঝাপসা দেখাচ্ছে। “কি এটা, আরো বেশ আঁকাবাঁকা লাইন? দারুণ!”
“তোমার আগ্রহে দেখি ভাটা পড়েছে,” পল জবাব দিল।
“আমরা এসব হাবিজাবি কয়েক ঘণ্টা ধরে দেখছি।” গামায় বলল। “একের পর এক খালি আঁকাবাঁকা দাগ। তথ্য উপাত্ত যা পাচ্ছি সেগুলো ঘাটাঘাটি করে বা কম্পিউটারে চালিয়ে দেখে পৃথিবীর অন্য কোথাওকার এসব আঁকাবাঁকা দাগের সাথে মিলাচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে তুমি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছ। মানসিক সুস্থতার কথা বাদই দিলাম।”
“হুম! তবে পরীক্ষায় যে পাস করছে না বোঝাই যাচ্ছে, খোঁচা মেরে বলল পল।
“তাহলে আমি তোমাকে খুন করলেও দোষ হবে না। বলবো মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলাম। যাই হোক, কি দেখাতে ডাকলে?”
“এটা হলো বেলে পাথর, প্রিন্ট আউটটার এক জায়গা দেখিয়ে বলল পল। “কিন্তু এটা হলো তরল পদার্থের একটা স্তর। বেলেপাথরের ঠিক নিচেই। নিচে এখনো পানি আছে।”
“তাহলে পাম্পে পানি উঠছে না কেন?”
“কারণ পানিটা স্থির না। এটা সরে যাচ্ছে। আরো নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির স্তর।”
“মানে?”
“যদি আমার ধারণা ঠিক হয়, তাহলে নুবিয়ান জলাধারের নিচে আরো একটা জলাধার আছে।”
“আরেকটা জলাধার?”
পল মাথা ঝাঁকালো। “মাটির সাত হাজার ফুট নিচে। এই দাগগুলোতে বোঝা যাচ্ছে যে জলাধারটা পানি দিয়ে ভরা, তবে এখানে আর এখানে বিচ্যুতি থেকে বোঝা যায় যে পানিটা স্থির না, নড়ছে।”
“মাটির নিচের নদীর মতো?”
“হতে পারে। কম্পিউটারের তথ্য অনুযায়ী ওটা পানি এটা শুধু নিশ্চিত।” পল বলল।
“তা আপনি যাচ্ছে কোথায়?” গামায় বলল। ক্লান্তি নেই চোখে মুখে আর। “জানি না।”
“তা এটা নড়ছে কেন?”
পল কাঁধ ঝাঁকালো, “এসব আঁকাবাঁকা লাইন থেকে শুধু নড়ছে যে সেটাই জানা যায়, আর কিছু না।”
হঠাৎ প্রচণ্ড একটা শব্দে ওদের কানে তালা লেগে গেল। আকস্মিকতায় দুজনই দাঁড়িয়ে পড়ল।
“মরুভূমিতে কখনো বজ্রপাত হয় না,” ঠাণ্ডা স্বরে বলল গামায়।
“মনে হয় প্লেনের শব্দ। বিমান ঘাটির কাছে যখন থাকতাম তখন প্রায়ই এরকম শুনতাম।” পল বলল।
আরো দুবার হলো শব্দটা। তারপরই শোনা গেল মানুষের চিৎকার আর বন্দুকের আওয়াজ।
পল হাতের কাগজটা নামিয়ে জানালার কাছে ছুটে গেল। মরুভূমির ভেতর আরেকটা ঝলক দেখা গেল আর আরেকটা পাম্পিং টাওয়ার কমলা আগুনে ঢাকা পড়ল। তারপর একপাশে হেলে পড়ে গেল।
“হচ্ছে কি?” গামায় জিজ্ঞেস করল।
“বিস্ফোরণ।” পল জবাব দিল।
এক সেকেন্ড পরই হন্তদন্ত হয়ে রেজা প্রবেশ করলেন ঘরে। “পালাতে হবে এক্ষুণি! বিদ্রোহীরা হামলা করেছে।”
কিন্তু পল আর গামায়ের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না।
“তাড়াতাড়ি। বিমানে উঠতে হবে আমাদের।” পাশের রুমে দৌড়ে যেতে যেতে বলল রেজা।
পল আর গামায় প্রিন্ট আউটগুলো তুলে নিয়ে রেজার পিছু পিছু ছুটলো। সবাই একসাথে হতেই সিঁড়ির দিকে এগুলো সবাই। রাস্তার ওপাশেই DC-3 কে স্টার্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ওটার বুড়ো ইঞ্জিন কাশছে আর ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে চালু হলো অবশেষে।
“বিমানে সবারই জায়গা হবে, তবে আমাদেরকে যেতে হবে খুব দ্রুত।” রেজা বললেন।
সবাই দৌড়ে রাস্তাটা পার হয়ে DC-3’র মাল ওঠানোর দরজাটা দিয়ে ঢুকে পড়ল। সাথে সাথে বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা গেল কাছে। রকেটের আঘাতে কন্ট্রোল সেন্টারটা উড়ে গিয়েছে।
“চালানো শুরু করুন।” সবার ওঠা শেষ হওয়া মাত্র পল চিৎকার করে বলল। রেজা মাথা গুনলেন। মোট একুশজন সাথে পাইলট। এর মধ্যে পল আর গামায় বাদে সবাই এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারী।
“চালাও!” আদেশ দিলেন তিনি।
পাইলট থ্রটল সামনে ঠেলে দিতেই প্লেন রানওয়ে ধরে ছুটলো। এদিকে ওদের পিছনে বোমা ফুটেই চলেছে।
পল রেজার দিকে তাকাল, “আপনি না বললেন বিদ্রোহীদেরও পানি খেতে হয়?”
