কার্ট আবারো ঘুরলো। কিন্তু আরেকটা বর্শার হুশ শব্দের বদলে কেমন ভোতা একটা আওয়াজ শুনতে পেল। যেন রাইফেলের গুলি। শব্দটা অনেকটা একে-৪৭-এর মতো লাগল ওর কাছে।
ওর কাঁধে লাগানো একটা পাখা ভেঙে গুড়ো হয়ে গেল। তবে কার্ট সামনে এনো থামল না। প্রাণপণে বালিতে লাথি দিচ্ছে যাতে ওকে ঠিকমতো খেয়াল না হয়।
প্রপালসনের ধাক্কায় অল্প পরেই ও ধ্বংসাবশেষের পিছনে চলে এলো। “জো, আমার কথা কী শুনতে পাচ্ছ? যদি শুনতে পাও তাহলে শোনো আমার জরুরি সাহায্য দরকার এখুনি। ওরা তিনজন, আমি একা। আর ওরা আন্ডার ওয়াটার রাইফেল ব্যবহার করছে। ওদের প্রপালসন ইউনিটগুলো দেখলাম রাশিয়ান, তার মানে রাইফেলগুলোও সেরকমই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”
কার্টের যতদূর মনে পড়ে রাশিয়ানরা ওদের ডুবুরি আর স্পোজ (রাশিয়ান স্পেশাল ফোর্স) কমান্ডোদের জন্য দুই ধরনের রাইফেল বানিয়েছিল। একটাকে বলা হয় APS. এগুলো বোল্ট নামের বিশেষ স্টিলে বানানো গুলি ছুঁড়তে পারে। গুলিগুলো একেকটা পাঁচ ইঞ্চি করে লম্বা। এগুলো সীসার তৈরি বুলেটের চেয়ে পানির ভেতর অনেক ভালো কাজ করতে পারে। তবে তারপরও পানির ঘনত্বের কারণে এগুলোর পাল্লা খুব বেশি না। কার্ট যে গভীরতায় আছে সেখানে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ থেকে ষাট ফুট হবে। কিন্তু কার্টের পিঠের ব্যথাই প্রমাণ করছে নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে মেরে ফেলতে না পারলেও আঘাত ভালোই করতে পারে।
“জো, শুনতে পাচ্ছ? জো?”
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে পানির ঘনত্ব পৃথিবীর সর্বাধুনিক কমিউনিকেশন সিস্টেমকেও অকেজো করে দিতে পারে। জো ওর কাছে-পিঠে নেই। কার্ট সোফি সেলিন-এর পিছনের দিকে তাকাল। সেদিক থেকে আলো এগিয়ে আসছে। ডানে তাকিয়ে দেখে সেদিকেও একই অবস্থা।
“তিনজন আসছে আমাকে মারতে, আর আমার হাতে বর্শা মাত্র দুটো। পরের বার বস্তা ভরে স্পিয়ার গান নিয়ে আসবো।” কার্ট বিড়বিড় করল।
কার্ট স্পিয়ার গানটা দুহাতে ধরে ডান দিকে এগুলো। আবছায়ার ভেতর থেকে ডুবুরিটার আলো স্পষ্ট হলো। কার্ট সেদিকে তাক করে বর্শা ছুঁড়লো। বর্শাটা লোকটার কলার বোনের ঠিক নিচ দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
বঁড়শিতে গাঁথা টুনা মাছের মতো লোকটা মোচড়ানো শুরু করল। আশপাশটা ভরে গেল বুদবুদ আর ঘূর্ণিতে। কিন্তু মাটিতে পড়ার বদলে লোকটা ক্ষতস্থান চেপে ধরে রাইফেলটা ফেলে দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
কার্ট লোকটাকে যেতে দিল। ওর লক্ষ্য রাইফেলটা। কিন্তু নিচে পড়ে অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে।
“লাইট অন করো।” কার্ট বলল।
বাম কাঁধেরটা তো আগেই ভেঙে চুরে গিয়েছিল তবে ডান কাঁধেরটা সাথে সাথেই জ্বলে উঠল। আলোতে রাইফেলটা যেমন দেখলো কার্ট, ঠিক তেমনি ওর শত্রুরাও ওর অবস্থান জেনে গেল।
কার্ট সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপ দিল সাথে সাথেই শুনলো আরেকটা রাইফেলের আওয়াজ। ওর ঠিক সামনের বালিতে বোল্ট বিধতে লাগলো। এখন হয় কার্টকে ফিরতে হবে না হয় বোল্ট খেয়ে মরতে হবে।
বাকি ডুবুরি দুজন এগিয়ে আসছে। কার্ট নিজেকে সুস্থির করে শেষ বর্শাটা ছুড়লো। লক্ষ্য যে লোকটার হাতে রাইফেল আছে সে। একেবারে সরাসরি গলা ভেদ করে চলে গেল বর্শাটা। মুহূর্তে লোকটা হাত-পা ছড়িয়ে নিজের রক্তে নিজেই ডুবতে আরম্ভ করল।
কার্ট আবার রাইফেলটা যেদিকে পড়েছে মনে হয়েছিল সেদিকে ঝাঁপ দিল। কিন্তু ও পৌঁছতেই দেখে বাকি ডুবুরিটাও সেখানে পৌঁছে গিয়েছে।
দুইজনেই রাইফেলটা চেপে ধরলো। কার্ট ধরেছে হাতলের দিকের অংশটা, আর ওর প্রতিপক্ষ ধরেছে নলের অংশটা। ফলে টানাটানিতে কাটই জিতলে শেষমেশ।
কার্ট ওটাকে টেনে এনে গুলি করার চেষ্টা করল কিন্তু অন্যজন একেবারে ওর সাথে মিশে দাঁড়িয়ে আছে। সে কার্টের হেলমেটের পিছনদিকটা হাতড়াতে লাগল। বাতাসের পাইপটা টেনে খোলার ইচ্ছা।
কার্ট হাঁটু দিয়ে লোকটার পেটে গুঁতো দিল। লোকটা ওর বাতাসের পাইপ ছেড়ে দিল কিন্তু আরো মারাত্মক একটা জিনিস বের করল হাতে। একটা বিস্ফোরকের কাঠি। এগুলো সাধারণত হাঙ্গর মারতে ব্যবহার হয়। এর গায়ে স্পর্শ লাগলেই বিস্ফোরণ ঘটে। কার্ট লোকটার হাত আটকে কবজি চেপে ধরলো যাতে কাঠিটার মাথা ওর গায়ে লাগতে না পারে। যেখানেই লাগবে সেখানেই ফুটো হয়ে যাবে। এগুলোর একবার মাত্র স্পর্শে পনের ফুট লম্বা হাঙ্গর পর্যন্ত ধরাশায়ী হয়ে যেতে দেখছে কার্ট। ওর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। এভাবে মরার–বা কোনোভাবেই মরার ইচ্ছে নেই।
দুজন দুজনকে চেপে ধরে গোত্তা খেতে লাগল শুধু। কার্টের কাঁধের আলো লোকটার মুখোশে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে দুজনের কেউই চোখে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু তারপরও কেউ কাউকে ছাড়ছে না।
কার্ট এতোক্ষণে টের পেয়েছে যে লোকটা আকারে ওর চেয়ে কত বড়। কার্টের কাঁধ চেপে ধরতে পারায় লোকটা কিছুটা সুবিধা পেয়ে গেল। আর কার্টের প্রাণপণ চেষ্টার পরও ইঞ্চি ইঞ্চি করে কাঠিটা ওর পাজরের দিকে এগুতে লাগল। কার্টের মৃত্যু এখন সময়ের ব্যাপার। লোকটাও সেটা টের পেয়েছে। কার্ট লোকটার মুখে কেমন একটা অপ্রকৃতিম্ভের মতো হাসি দেখতে পেল। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি কার্টের আয়ুর। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ ওদেরকে আলোর বন্যায় ভাসিয়ে একটা ঝাপসা হলুদ মতো জিনিস ছুটে এলো। আর একটা প্রচণ্ড গতির বাসের মতো কার্টকে আক্রমণকারী লোকটাকে আঘাত করল।
