টু শব্দটিও না করে কার্ট সামনে এগুলো। ওর প্রপালসন-ইউনিটের মৃদু ঘূর্ণের শব্দ শোনা যায় না বললেই চলে। ধ্বংসাবশেষের বাম দিকেই কাজ চলছে বেশি। এদিকে কমপক্ষে পাঁচটা লাইট জ্বলছে। সাথে ভ্যাকুয়ামের কাজ করা। ডুবুরিগুলো তো আছেই। ডানদিকে মাত্র দুটো লাইট দেখে ও সেদিকেই এগুলো।
চারদিকে ঘোলা পানি দেখেই বুঝলো যে ডুবুরিরা জাহাজটার ফসিল হয়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ ফুটো করে কিছু একটা বের করতে চাচ্ছে। NUMA-র অভিযানগুলো বাদে অন্যসব পানির নিচের অভিযানের মতোই এরা জাহাজটাকে আক্ষরিক অর্থেই কোপাচ্ছে। ভেঙে টুকরো টুকরো করে সেগুলো পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে।
“মাথায় বন্দুক ধরা থাকলে অবশ্য এতো সব সংরক্ষণ-টংরক্ষণ মাথায় থাকে না।” ভাবলো কার্ট।
এতোদূর থেকে কার্ট জোকে রেডিওতে কোনো খবর পাঠাতে পারবে না। তার মানে এখন যা করার ওকে একাই করতে হবে।
“লিখিত কথোপকথন চালু করো।” ফিস ফিস করল কার্ট।
হেলপেটের ডিসপ্লেতে একটা সবুজ বক্স আবির্ভূত হলো। এক কোণায় T অক্ষরটা জ্বলছে নিভছে।
অনেক কথাই মাথায় আসছে। কি লিখবে কি লিখবে করে শেষমেশ সবচেয়ে সহজ কথাটাই লিখলো। “আমি এসেছি তোমাদের সাহায্য করতে।”
ওর হাতের স্ক্রীনটা জ্বলে উঠতেই ও আবার সামনে বাড়লো। কাছে পৌঁছে ও সবচে কাছের ডুবুরিটার কাঁধে টোকা দিল। ভেবেছিল লোকটা ভয় পেয়ে বা অবাক হয়ে ফিরে তাকাবে। কিন্তু এদিকে ভ্রূক্ষেপ-ই না করে ও নিজের কাজই করতে লাগল।
কার্ট আরো জোরে টোকা দিল এবার। তাও কিছু হলো না। তখন কার্ট ডুবুরিটার ঘাড় ধরে জোর করে নিজের দিকে ফিরালো।
এবার ডুবুরিটার চোখে দেখা গেল নিখাদ বিস্ময়। কার্ট দেখলো লোকটার চেহারা নীল হয়ে গিয়েছে। চোখ অর্ধেক বোজা। তার মানে লোকগুলো পানির নিচে দীর্ঘক্ষণ ধরে কাজ করছে।
কার্ট নিজের হাতের স্ক্রিনটা দেখালো।
লোকটা লেখাটা পড়ে ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকালো। তারপর ওর কাছে থাকা একটা সাদা বোর্ড তুলে নিয়ে তাতে লিখলো, “যত দ্রুত সম্ভব খোঁড়ার চেষ্টা করছি।” তারপর আবার কাজে মন দিল।
“লোকটা আমাকে শয়তানগুলোর একজন ভাবছে। তার মানে ওদের কাজ কর্মে খেয়াল রাখার জন্যে এখানে কেউ আছে।” ভাবলো কার্ট। তারপর আবার লোকটাকে ধরে লিখলো, “আমি আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি। লোকটা চোখ পিটপিট করে দেখলো লেখাটা। চোখটা আগের চেয়ে খুললো আরো একটু। এতোক্ষণে সম্ভবত ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। লোকটা হঠাৎ এতোটা ক্ষেপে গেল যে কার্টের তাকে চেপে ধরে রাখতে হলো।
“কয়জন লোক ওদের?” কার্ট লিখলো।
লোকটা লিখলো ৯।
“সবাই কি নিচে?”
৫ …….৪।
তার মানে পাঁচ জন ওপরে আর চারজন পানির নিচে। ঝামেলা হয়ে গেল তাহলে। নিচে এতোজন থাকবে কার্ট সেটা চিন্তা করেনি।
“কে কে দেখিয়ে দিন।” কার্ট লিখলো।
কিন্তু লোকটা কার্টকে কিছু দেখানোর আগেই ওদের ওপর আলো এসে পড়ল। ডুবুরিটার চোখ দেখেই কার্ট বুঝে ফেলল লাইটটা কোন পক্ষ ফেলেছে। ও ঘুরতেই দেখে বর্শা বাগিয়ে একটা লোক ওদের দিকেই আসছে।
.
৩২.
কার্ড ডুবুরিটাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে নিজের পিকাসো তুলে ধরলো। কিন্তু আক্রমণকারী ডুবুরিটা খুবই কাছে চলে এসেছে ততোক্ষণে তাই কেউই বর্শা ছুঁড়তে পারলো না। তার বদলে দুজন দুজনকে জাপটে ধরে একদিকে কাত হয়ে গেল।
লোকটার মাথায় পুরো মুখ ঢাকা হেলমেট। গায়ের স্যুটটাও বেশ শক্ত। নাহলে কার্ট শুধু টান দিয়ে লোকটার মুখোশ খুলে দিতে। কিন্তু তার বদলে ওরা মোচড়া-মুচড়ি করে গড়ান দিতে লাগল একজন আরেকজনের ওপর। শেষমেশ কার্ট লোকটার মাথা চেপে ধরতে পারলো। তারপরই প্রপালশন চালু করে সোফি সি এর ভাঙ্গা কাঠামোর দিকে চলা শুরু করল।
আক্রমণকারী লোকটা স্পিয়ারগান ফেলে একটা ছুরি বের করল। কিন্তু সেটা ব্যবহারের আগেই কার্ট ওকে জাহাজের কাঠামোর ওপর তুলে ওর মাথার পিছন দিকটা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে একটা বের হওয়া অংশের গায়ে বাড়ি দিল। সাথে সাথে লোকটার হাত থেকে ছুড়ি খসে পড়ল আর দুহাত ছড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল বালির ওপর। মারা না গেলেও অজ্ঞান হয়েছে নিশ্চিত।
অন্যপাশ থেকে আরো দুজন লোককে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। প্রথম জনের মতো এদেরও মুখ ঢাকা হেলমেট পরা তবে এদের পিঠে প্রপালশসন ইউনিট লাগানো। ফলে গতি তুলনামূলক দ্রুত।
কার্টের পাশ কেটে একটা বর্শা চলে গেল। বুদবুদ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। কার্ট একপাশে লাফ দিয়ে পড়ল, তারপর লাথি দিয়ে বালি ছড়িয়ে পানি ঘোলা করে দিল যাতে ওকে দেখা না যায়।
তারপর ও নিজের প্রপালসন ইউনিট ঠিকঠাক করে ফুল স্পিডে চালানো শুরু করল। ফলে বালির মেঘে ঢেকে গেল চারপাশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক পাইলটের কাছ থেকে শোনা একটা কথা মনে পড়ল কার্টের : “আকাশ বা পানি যেখানেই ঘোলা হোক না কেন সব সময় বামে ঘুরবে।” কেন বামে বা কেন ডানে না সে কথা ও জানে না। তবে কথাটা যদি দুপুর বেলার আকাশের ক্ষেত্রে খাটে, তাহলে সমুদ্রের নিচেও খাটবে।
ও প্রপালশনের গতি একটুও না কমিয়ে বামে ঘুরলো, পা বালিতে বাধানো যাতে বালি আরো ওড়ে। কিছুক্ষণের জন্যে কৌশলটা ভালোই কাজে দিল। কিন্তু একটু পরেই ধুলোর মাঝেও এক জনের লাইটের আলো পৌঁছে গেল লোকটা কার্টকে দেখে অস্ত্র তুললো।
