“তুমি এমন একজনকে পাঠিয়েছ যে কি-না প্রথমবার ব্যর্থ হয়েছিল। এমন একজনকে পাঠিয়েছ যে কি-না তিনদিন আগে মরুভূমিতেই মরে পড়ে আছে বলে আমি জানতাম। প্রচণ্ড রেগে বললেন সাকির।
“ও যে মারা গিয়েছে এ কথা আমি কখনোই বলিনি।”
“বেচে যে আছে সেটাও জানাওনি। দুটোই একই কথা।” সাকির বললেন।
“না। সে বেঁচে গিয়েছিল। আপনি খোঁজ পাননি। আপনিই নির্দেশ দিয়েছিলেন যে যদি কেউ চেক পয়েন্টে বেঁচে ফিরতে পারে তাহলে তাকে আরেকটা সুযোগ দেয়া হবে। আমি শুধু সেই আদেশ পালন করেছি মাত্র।”
নিজের কথাই নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে দেখে সাকিরের মুখ কালো হয়ে গেল, “হ্যাঁ, কিন্তু চেক পয়েন্ট পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে কারো বেঁচে থাকা সম্ভব না। শুধু তিরিশ মাইল-ই না। ওপরে গনগনে সূর্য, নিচে তপ্ত বালু, পানি নেই, ছায়া নেই। তার ওপর কয়েক সপ্তাহ ধরেই চলা কঠিন প্রতিযোগিতা তো আছেই।”
“আমিতো বললামই যে ও পেরেছে। আর কারো সাহায্য ছাড়াই। ওর মুখের দিকে দেখেছেন? হাতের দিকে দেখেন। মরে যাচ্ছে মনে করে ওকে বালিতে গর্ত করে পুঁতে দেয়া হয়। সেখানে ও সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তারপর সূর্য ডুবলে গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। হাসান বলল।
সাকিরও ক্ষতগুলো খেয়াল করেছে। মনে মনে ছেলেটার বুদ্ধির তারিফ না করে পারলো না। তো আমার লোকেরা খবর পাঠায়নি কেন?”
“ও যখন পৌঁছায় তখন চেক পয়েন্টে কেউ ছিল না। আপনার মতোই সবাই ভেবেছিল যে কেউ বেঁচে ফিরতে পারবে না। চার নম্বর তালা ভেঙে ঢুকে আমার সাথে যোগাযোগ করে। ওর শক্তি আর দৃঢ় সংকল্প দেখে বুঝতে পারি যে আমাদের লোকের ওপর ওর নজরদারির জন্যে ওর চেয়ে ভালো আর কেউ হবে না। ওকে কেউ চেনে না। ওকে আদেশ দেই যে যদি কেউ ধরা পড়ে যা আমাদের খবর ফাঁস হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা দেয়া মাত্র তাকে সরিয়ে দিতে হবে।” প্রশ্নাতীতভাবে সাকিরই ওসাইরিস এর একচ্ছত্র অধিপতি। তবে নিজের ভুল স্বীকার করতে সে দ্বিধা করে না। যদি হাসান সত্যি কথাই বলে থাকে তাহলে চার নম্বরই একটা পদ পাওয়ার একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি। তবে তার আগে ওকে একটা নাম দিতে হবে।
হাসানকে চুপ থাকতে বলে সাকির স্যাটেলাইট চার নাম্বারের সাথে কথা বলল কিছুক্ষণ। কথাগুলো হাসানের সাথে হুবহু মিলে না গেলেও কাছাকাছিই ছিল। এ কারণেই সাকির বিশ্বাস করলেন যে দুজনে মিলে গল্পটা বানায়নি, সত্য কথাই বলছে ওরা।
তারপর হাসানের পিছনে থাকা প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন, “ওকে ছেড়ে দাও।” প্রহরীরা সরে যেতেই হাসান উঠে দাঁড়ালো। সাকির আবার চার নম্বরের দিকে মনোযোগ দিলেন।
“তোমাকে একটা গল্প বলি শোনো। আমি যখন ছোট, তখন আমার পরিবার থাকতো কায়রোর শহরতলীতে। আমার বাবা ভাঙ্গারির লোহা সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। দুবেলা পেটভরে খাবার জুটতো না নিয়মিত। একদিন হঠাৎ বাসায় একটা বিছে ঢুকে পড়ে। আমাকে কামড়ও দেয়। আমি রেগে ওটাকে একটা ইট দিয়ে থেতলে দিতে যাই। কিন্তু বাবা আমার হাত ধরে ফেলেন। তিনি বলেন আমাকে একটা জিনিস শেখাতে চান। তাই আমরা বিছেটাকে একটা পাত্রে রেখে সেটাকে পানি দিয়ে ভরে দিলাম। প্রথমে গরম পানি, তারপর ঠাণ্ডা পানি। তারপর ওটাকে একটা কাঁচের পাত্রের মধ্যে রেখে রোদের মধ্যে ফেলে রাখলাম কয়েকদিন। তারপর ওটার ওপর স্পিরিট ঢেলে দিলাম। ওটা সাঁতার কাটার অনেক চেষ্টা করল কিন্তু না পেরে শেষ পর্যন্ত পাত্রের নিচেই পড়ে থাকল। পরের দিন আমরা বিছেটাকে বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। ওটা মরে তো নি উল্টো সাথে সাথে আমাদেরকে আক্রমণ করল। কিন্তু আমার কাছে পৌঁছার আগেই বাবা ওটাকে বাড়ি দিয়ে দূরে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, “এই বিছেরাই আমাদের ভাই। জেদি, বিষাক্ত আর সহজে মরেও না। বিছেরা উন্নত হৃদয়ের অধিকারী।”
স্ক্রিনে দেখা গেল চার নম্বর হালকা মাথা ঝোকালো।
“তুমি তোমার যোগ্যতা প্রমাণ করেছ। এখন থেকে তুমি আমাদের একজন। আমাদের ভাই। তোমার কোড নেম হবে স্করপিয়ন (বিছে)। কারণ তুমি জেদি। মারাও শক্ত সেই সাথে উন্নত হৃদয়ের অধিকারী। তুমি সেদিন নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাও নি। একটা বার ভয়ও পাওনি। সেজন্য আমি খুবই খুশি হয়েছি।
স্ক্রিনে দেখা গেল সদ্য নাম পাওয়া লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন গ্রহণ করেছে।
“মুখের ক্ষতগুলোকে গর্বের সাথে লালন করবে।” সাকির বললেন।
“অবশ্যই।”
“এখন কি করবো আমরা?” হাসান জিজ্ঞেস করল। কথাবার্তা বলে আবার স্বাভাবিক হতে চাইছে ও। তবে আপাতত বেঁচে থাকতে পেরেই খুশি।
“যা বলেছিলাম সেটাই। লোকজনের সামনে আসার আগেই শিলালিপিগুলো চরি করবে আর যাদুঘর থেকে ওটার অস্তিত্বের সব প্রমাণও মুছে ফেলবে। আর এবার তুমি নিজে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সব তত্ত্ববধান করবে।” সাকির বললেন।
.
২৪.
মাল্টা
সন্ধ্যা ৭টা
একটা ডেলিভারি ট্রাক বিশাল একটা গুদাম ঘরের মালপত্র ওঠানামার জায়গাটায় ঢুকতেই একটা কর্কশ শব্দ রাত্রির নিস্তব্দতা ভেঙে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। গুদাম ঘরটার মালিক মালটা সমুদ্রতাত্ত্বিক যাদুঘর। এখানেই মূলত তাদের নতুন নতুন মালামাল এনে রাখা হয় বা পুরনো জিনিস এনে ঝড়াপোছা করা হয়। গুদাম ঘরের গেট থেকেই দুজন সিকিউরিটি গার্ড গাড়িটাকে আসতে দেখলো।
