পিছনে পল এক হাত দিয়ে মাল বাঁধার একটা ফিতা টেনে ধরলো আর যতটা সম্ভব দরজা থেকে সরে গেল। বিমানটা বাঁকা হতেই ও ট্রলিটা ধাক্কা দিল আর ওটা খোলা দরজা পেরিয়ে কংক্রিটসহ নেমে গেল নিচের দিকে।
তারপর বিমানটা আবার ভারসাম্যে ফিরতেই ও সতর্কতার সাথে দরজা দিয়ে উঁকি দিল। ট্রলি আর কীটের টুকরো দুটো আলাদা আলাদা বোমার মতো সোজা নিচে নেমে যাচ্ছে। ঘুরছে না বা গোত্তা খাচ্ছে না, নিশ্ৰুপে বাতাস কেটে সোজা পড়ছে নিচে।
গামায়ও দ্রুত ফিরে এসে নিচে তাকাল, “এটাই তোমার এযাবত কালের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধি।” পলের গালে একটা চুমু দিয়ে বলল গামায়। পলও মৃদু হেসে ওর বুদ্ধি কতটা কাজে দেয় তা দেখতে লাগল।
রেজা আর বাকিরাও ওগুলো পড়তে দেখেছে।
“ওগুলো পড়ছে। সবাই রেডি?” রেজা বলল।
এখানে চারটা দল আছে। কয়েক একর জায়গা ছেড়ে ওদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সবাই মাটি খুঁড়ে সেখানে সেন্সর লাগিয়েছে। যদি সব কিছু ঠিক থাকে তাহলে কীটের টুকরোটা মাটিকে আঘাত করলে যে কম্পনের সৃষ্টি হবে তা নিচের পাথরে যে প্রতি ধ্বনির সৃষ্টি করবে এই সেন্সরগুলো সেগুলোকে সনাক্ত করবে। আর তার মাধ্যমে আশা করা যায় বের করা যাবে যে বেলে পাথরের নিচে কি আছে।
‘রেডি! একদল বলল।
‘রেডি! বাকি দলগুলোও জানান দিল।
রেজার দলও রেডি। বোর্ডে সবুজ সংকেত দেখাচ্ছে। তার মানে ওর সেন্সরগুলো নিখুঁতভাবে কাজ করছে। উনি আবার শেষ বারের মতো ওপরে তাকালেন জিনিসগুলোর অবস্থান দেখার জন্যে। এবার তাকাতেই দেখে মনে হলো যে সোজা তার দিকেই আসছে জিনিসগুলো।
“চোখের ভুল।” নিজেকে বোঝালেন রেজা।
আরও এক সেকেন্ড অপেক্ষার পর তিনি ঝেড়ে দৌড় দিয়ে পাশের বালির ওপর গিয়ে পড়লেন।
মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে কীটের টুকরোটা পড়লো। কিন্তু সাথে সাথেই সংঘর্ষের প্রচণ্ড শব্দ পুরো মরুভূমি জুড়ে অনুনাদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। মাটিতে পড়ে থাকায় রেজা শুধু তার কানেই শুনলেন না সেটা তার বুক, হাত-পা এসব দিয়েও পুরো অনুভব করতে পারলেন।
ঠিক এই জিনিসটাই চাইছিলেন তারা। তিনি ঝটপট উঠে দাঁড়ালেন, তারপর ধুলোবালির মেঘ ভেদ করে নিজের কম্পিউটার চেক করলেন দ্রুত। তখনো সবুজ বাতি জ্বলছে। তবে স্ক্রিনের গ্রাফটা তখনো ফাঁকা।
“কাম অন, কাম অন।” অনুনয় করতে লাগলেন রেজা। অবশেষে একগাদা আঁকাবাঁকা রেখা গ্রাফ জুড়ে ফুটে ওঠা শুরু হলো। প্রতি সেকেন্ডে বাড়ছেই। বিভিন্ন গভীরতা থেকে বিভিন্ন কম্পন ধরা পড়ছে।
“আমরা পেয়ে গেছি।” চিৎকার করে উঠলেন। “আমরা পেয়ে গেছি।” উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে তিনি মাথার হ্যাট খুলে ওপর দিকে ছুঁড়ে দিলেন। DC-3 তখনো নামছে। ডাটা প্রয়োজন ছিল, সেটা তারা পেয়েছেন। এখন খুঁজে বের করতে হবে এগুলোর মানেটা কি।
.
২৩.
তারিক সাকির যে ঘরটায় দাঁড়িয়ে আছেন। সেটা এক সময় শুধু ফারাও আর তাদের পুরোহিতদের জন্যেই সংরক্ষিত ছিল। এটা একটা লুকানো মন্দির। লাশ চোরেরা এটার হদিস না পাওয়ায় এখনো এটা চোখ ধাঁধানো সব অলঙ্কার আর সহায় সম্পদে রা। এখানকার জিনিসপত্র তুতেন খামেনের সমাধিতে আবিত জিনিসপত্রের চেয়েও বেশি। প্রথম দিকের রাজাদের আমলের চিত্রকলা আর হায়রোগ্নিফে দেয়াল ভরা। একটা ছোট স্ফিংসমর্তি একপাশে, সোনার তৈরি পাতা আর নীল রঙের দামি পাথরে ঢাকা। রুমটার ঠিক মাঝখানে ডজন খানেক পাথরের কফিন। প্রতিটার ভেতর একজন করে ফারাওয়ের লাশ পাওয়া যাবে। এতোদিন সবার ধারণা ছিল এগুলো চুরি করে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে আরো হাজার বছর আগেই। কফিনগুলোর চারপাশে নানান জীব জন্তুর মমি। মিসরীয়দের ধারণা ছিল পরকালেও এরা তাদের মনিবের কাজে লাগবে। ওগুলোর পাশেই একটা কাঠের নৌকার কঙ্কালটা পড়ে আছে।
পৃথিবীর খুব বেশি মানুষ এই কক্ষটার কথা জানে না। কাউকেও জানানোরও ইচ্ছে সাকিরের নেই। তবে ও প্রায়ই বিশেষজ্ঞ এনে এনে এখানকার জিনিসপত্র পরীক্ষা করিয়েছেন। আর শুধু ও আর ওর লোকেরাই এই প্রাচীন গৌরবের সৌন্দর্য একা একা উপভোগ করার বিপক্ষে কোনো যুক্তি খুঁজে পাননি।
তার ওপর উনি যদি সফল হন, তাহলে উত্তর আফ্রিকা জুড়ে তার নিজেরই সৃষ্ট নতুন এক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হবে।
কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি একটা ঝামেলায় পড়েছেন।
সমাধি কক্ষটা ছেড়ে তিনি কন্ট্রোল রুমের দিকে এগুলেন। সেখানে তার বিশ্বস্ত সহচর হাসান হাঁটুমুড়ে বসে আছে। কপালে তাক করা পিস্তল। সাকির-ই এটা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
“তারিক এসব কেন করছেন? হয়েছেটা কি?” হাসান জিজ্ঞাসা করল।
সাকির এক পা সামনে বেড়ে শাসানোর ভঙ্গিতে একটা আঙুল তুললেন। হাসান তা দেখে চুপ করে গেল, “এখনই দেখতে পাবে সেটা।” বললেন সাকির।
একটা রিমোট টিপতেই দূরের দেয়ালে একটা স্ক্রিন ফুটে উঠল। ছবি আসতেই চার নাম্বারের ফোস্কা পড়া মুখটা ভেসে উঠল।
“মাল্টা থেকে রিপোর্ট এসেছে। হ্যাগেন আর তোমার বেছে নেয়া দুজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আমেরিকানগুলোকে সরিয়ে দেয়ার। একজন ওদের হাতেই মারা যায়, হ্যাগেন ধরা পড়ে আর একজন পালিয়ে যায়। আমাদের কোনো লোকই যাতে ধরা না পড়ে সেটা নিশ্চিত করা যে কতো জরুরি তা তুমি জানো।”
“জানি। আর জানিই বলেই তো”
