.
২২.
DC-3 আবারো ধুলো ভরা রানওয়ে ধরে ছুটছে। পাম্পিং স্টেশনগুলো পার হতেই নাক উঁচু করে উঠে গেল আকাশে। দুটো কার্টিস-রাইট সাইক্লোন ইঞ্জিন সর্বোচ্চ গতিবেগে গর্জন করে চলার পরও এই গরম বিকেলে ওটার দরকারি উচ্চতা অর্জন করতে ঘাম ছুটে গেল। এই ধরনের ইঞ্জিন এখন আর ব্যবহার হয় না। প্রতিটার কর্মক্ষমতা এক হাজার হর্স পাওয়ার। কিন্তু যতোই যত্ন নেয়া হোক না কেন সত্তর বছর পর ইঞ্জিন থেকে এতোটা শক্তি পাওয়ার আশা করাটা বোকামি। তারপরও কম করে হলেও বিমানটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল, মুখ দক্ষিণে। দশ হাজার ফুট ওপরে উঠতেই বাতাস শুষ্ক আর ঠাণ্ডা হয়ে এলো। সেখানে কিছুক্ষণ স্থির থাকার পর সেটা আবার রানওয়ের দিকে ছুটলো।
রেজার পাইলট বিমান সামলাতে ব্যস্ত। আর পল ও গামায় কেবিনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। একটা চাকাওয়ালা ঠেলাগাড়ির দু’প্রান্ত ধরে সামলানোর চেষ্টা করছে।
ধাতব ঠেলাটার চাকা চারটা। তার ওপর একটা চারধার উঁচু সমতল ডেক। আর তার দুপাশে হাতল লাগানো। এর ওপর প্রায় চারশো পাউন্ড ওজনের কষ্ক্রিটের টুকরো ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখা। পল আর গামায় প্রাণপণ চেষ্টা করছে যাতে কীট বা ঠেলা কোনোটাই যাতে ঘুরে না যায়।
গামায় একটা ফিতা খুলতে খুলতে বলল, “সবার শেষে তো তুমিই ধরবে না?”
পল হাঁটু মুড়ে বসে শক্ত করে ঠেলাটার পা ধরে রেখেছে যাতে ওটা বিমানের লেজের দিকে চলে যেতে না পারে।
“আর দুই মিনিট আছে।” পাইলট চেঁচিয়ে জানান দিল।
“দেখা যাক কাজ করে কি-না। আস্তে, এখন।” বলল পল।
গামায় হাতলটা ধরলো আর পল ওর দিক থেকে টেনে ধরে ধরে ঠেলাটাকে বিমানের লেজের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। ওখানকার সিট, দরজা সব খুলে ফেলা হয়েছে। বিশাল ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ফাঁকা জায়গা দিয়েই গামায় আর পল ঠেলাটাকে ঠেলে ফেলে দেবে। সাথে সাথে ওরাও না পড়ে গেলেই হয়।
খোলা দরজার পাঁচ ফুট পর্যন্ত ওরা নিরাপদেই গেল, তারপরই বাঁধলো ঝামেলা। ওরা বিমানের পিছনে পৌঁছাতেই বিমানের নাক উঁচু হয়ে গেল। কীটের টুকরো আর ঠেলাগাড়িটা মিলিয়ে ওরা বিমানের সামনে থেকে প্রায় সাতশো পঞ্চাশ ফুট পিছনে ঠেলে নিয়ে এসেছে। ফলে বিমানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছে। লেজ হয়ে গেছে বেশি ভারি আর নাক উঠে গিয়েছে ওপরে।
“সামনের দিকে নামান।” গামায় চিৎকার করে বলল।
“আমার ধারণা উনি এটা জানেন।” বহু কষ্টে ঠেলাটা ওল্টে পরা থেকে আটকে রেখেছে ও।
“তাহলে করছে না কেন?” গামায় জিজ্ঞেস করল।
পাইলট আসলেই বিমান সামনের দিকে নামানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সব কাজ করছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। সে আরো জোরে লিভারটা চেপে ধরলো। ফলে এবার ফল হলো উল্টো। নাক নেমে এলো ঠিক কিন্তু নেমেও গেল খানিকটা বেশি। ফলে এবার ঠেলাগাড়িটা গামায়কে চাপা দিয়ে ককপিটের দিকে ছুটে আসার চেষ্টা করল।
“পল।” চেঁচিয়ে ডাকলো গামায়।
কিন্তু চেষ্টা করা ছাড়া পলের আর কিছুই করার ছিল না। বহু কষ্টে ও গামায় এর ওপর পড়ার হাত থেকে টুকরোটাকে আটকালো। কিন্তু ততক্ষণে গামায় বাকি সিটগুলোর গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে।
এবার ওজন আবার সামনের দিকে ফিরে আসায় প্লেনের নাক আরো নিচে নেমে গেল আর ওটা প্রচণ্ড গতিতে নিচে নামতে লাগল। গামায় এর মনে হচ্ছে ও পুরো চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। ও সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলাগাড়িটা ঠেলে সামনে পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, “এটা হচ্ছে দুনিয়ার জঘন্যতম বুদ্ধি। কার্টের সব বাজে বুদ্ধিকেও হারিয়ে দিতে পারবে।” চিৎকার করে বলল গামায়।
পলও ওর সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলাগাড়িটা টানছে যাতে গামায় এর ওপর চাপটা কমে। সব দেখে শুনে ও-ও কথাটায় সায় দিল।
“টেনে ওঠান, টেনে ওঠান। ও নিজেই এখন পাইলটকে নির্দেশ দিতে লাগল। রেজা আর ওর লোকজন মাটিতে সেন্সর পুঁতে বিমানটা ফেরার অপেক্ষা করছে। বিমানের শব্দ পেয়ে ওরা তাকিয়ে দেখে বিমানটা পিঠ বাঁকিয়ে সোজা নিচে নেমে আসছে। ইঞ্জিন প্রচণ্ড শব্দ করছে। নিচ থেকে মনে হয় যে একটা রোলার কোস্টার।
“ওরা করছে টা কী?” একজন লোক রেজাকে জিজ্ঞেস করল।
“আমেরিকানরা সবাই পাগল।” আরেকজন বলল।
.
বিমানে বসে পলও একই কথা ভাবছিল। বিমানের নাক আবারো সোজা হতেই ঠেলাটা আবার নাড়ানো গেল। আর ওরা আবার ওটা টেনে পিছনে নিয়ে গেল। এবার পাইলট আগে থেকেই রেডি ছিল। তাই খুব বেশি সমস্যা হয়নি।
পল দাঁড়িয়ে আছে খোলা দরজার কাছে। ঠেলার এক প্রান্ত ধরে আছে, আর চিন্তা করছে যে কীভাবে নিজে না পড়ে শুধু কীটসুদ্ধ ঠেলাটাকে নিচে ফেলতে পারবে।
জোরে ধাক্কা দেয়া যায়, কিন্তু তাহলে ওকে আটকাবে কে?
“চলে এসেছি প্রায়।” পাইলট চেঁচিয়ে জানালো।
পল গামায়ের দিকে তাকাল, “যখন ভেবেছিলাম তখন তো অনেক সহজ ই লেগেছিল কাজটা।”
“আমার একটা বুদ্ধি এসেছে।” গামায় বলল। তারপর পাইলটের দিকে ফিরে বলল, “বামে মোড় নিন।”
পাইলট ঘুরে তাকাল, “কী?”
গামায় হাত দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে মুখেও বলল। কিন্তু পাইলট বুঝলো বলে মনে হলো না। তবে পল ঠিকই বুঝেছে, “দারুণ বুদ্ধি। তুমি ওনাকে দেখিয়ে দিয়ে আসো।”
গামায় ট্রলিটা ছেড়ে দৌড়ে ককপিটে চলে গেল। সে কো-পাইলটের সিটে বসে পড়ল তারপর হুইল ধরে বলল, “এভাবে!” ও হুইলটা বামে ঠেলে দিল। পাইলটও ওর দেখা দেখি একই কাজ করল আর DC-3 একদিকে কাত হয়ে গেল।
