পিটার মাথা ঝাঁকালো। “তার মানে সবাই ট্যাপ ছেড়ে যদি দেখে যে পানি পড়ছে না, তাহলে আপনারা খুব বিপদে পড়বেন।”
“ইতোমধ্যে পড়ে গিয়েছি।” রেজা পলকে নিশ্চিত করল।
“আপনারা বাদে আর কেউ এবিষয়ে খোঁজ-খবর করছে?” গামায় জিজ্ঞাসা করল।
রেজা কাঁধ ঝাঁকালেন, “সেভাবে না। আসলে করার মতো যোগ্য লোকই নেই। আর বুঝতেই পারছেন যে দেশে এখনো গৃহযুদ্ধ চলছে। তাই সরকার এখন এর চেয়েও বড় বড় সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে। বা তাদের ধারণা সেরকম। ওরা শুধু জিজ্ঞেস করেছে যে এটা কী বিদ্রোহীদের কাজ কি-না? উচিত ছিল মিথ্যে করে হ্যাঁ বলা। তাহলে ওরা দেশের সমস্ত সম্পদ এদিকে দিতো সমস্যার সমাধানের জন্যে। কিন্তু আমি না বলে দিলাম। সাথে এও বললাম যে এরকম চিন্তা করাটা হাস্যকর।” ব্যাপারটা মনে পড়তেই রেজার চেহারা মলিন হয়ে গেল। একটা কথা মনে রাখবেন ভুলেও কখনো কোনো রাজনীতিকের প্রশ্নকে হাস্যকর বলবেন না। অন্তত আমার দেশের কোনো রাজনীতিককেও না।”
“কেন?”
“আমার কাছে সেটাই মনে হয়েছে।”
“না, ওটা না, বিদ্রোহীদের দ্বারা এমন কাজ সম্ভব নয় কেন?” গামায় খুলে বলল।
“বিদ্রোহীরা সবকিছু বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় কিন্তু এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। সম্ভবত কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসছে। তার ওপর সবারই পানির দরকার হয়। যদি পানিই শেষ হয়ে যায় তাহলে যুদ্ধ করবে কিসের জন্যে?” রেজা ব্যাখ্যা করল।
“দেশটা তাহলে টিকে আছে কীভাবে?” পল জিজ্ঞেস করল।
“এখন পর্যন্ত বেনগাজী, সার্তে আর ত্রিপোলির বাইরের জলাধারগুলোই সবদিক সামাল দিচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেই ভাগ করে করে দেয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আশেপাশের সব পাম্প-ই কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। আর তা যদি হয় তাহলে আবার মানুষ বেপরোয়া হয়ে উঠবে। আবার এদেশটায় চরম অরাজকতা শুরু হবে।
“আপনাদের সরকারকে এসব প্রমাণ দেখাচ্ছেন না কেন? এগুলো দেখলে তো আপনার কথা শোনার কথা।” গামায় বুদ্ধি দিল।
“দেখিয়েছি। ওরা শুধু বলে আমাকেই সমস্যার সমাধান করতে। না হলে সব দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে অব্যস্থাপনার অভিযোগে আমাকে বরখাস্ত করা হবে। আবার তাদের সাথে দেখা করার আগে আমাকে একটা সমাধান বের করতেই হবে। অন্তত কেন এরকম হচ্ছে সেটা অন্তত জানতে হবে।”
“এই নুবিয়ান স্যান্ডস্টোন জলাধারটা কত বড়?” পল জিজ্ঞেস করল। রেজা খনন কাজের একটা প্রস্থচ্ছেদের ছবি আনালেন, “বেশির ভাগ কৃপই গভীরতায় পাঁচশো থেকে ছশো মিটার।”
“আরো গভীরে খোঁড়া যায় না?”
“সবার প্রথমেই এই বুদ্ধিটা এসেছিল। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে এক হাজার মিটার পর্যন্ত খুড়ে দেখেছি। কাজ হয়নি। এরপর দুই হাজার মিটার খুড়েছি। তাও দেখি শুকনো।”
পল নকশাটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। ছবি অনুযায়ী মাটির ওপরের ছোট ছোট খোপওয়ালা দালানটায় ওরা এখন অবস্থান করছে। এটার রঙ ধূসর। কূপগুলোর রঙ উজ্জ্বল সবুজ। ফলে সহজেই দেখা যাচ্ছে। কীভাবে কূপগুলো মাটি আর পাথরের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে লাল লাল বেলে পাথরের ভেতর আটকে পড়া সেই বরফ যুগের পানিকে উত্তোলন করে। বেলে পাথরের ঠিক নিচেই কালো একটা স্তর। এটা মাটির নিচে প্রায় আরো এক হাজার মিটার পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। তার নিচের অংশটুকু ধূসর কিন্তু চিহ্নিত করা নেই।
“বেলে পাথরের নিচে এগুলো কী পাথর?” পল জিজ্ঞেস করল।
রেজা কাঁধ ঝাঁকালো, “আমরা আসলে নিশ্চিত না। দুই হাজার মিটারের নিচে কি আছে তা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। আমার মনে হয় পুরোটাই পাললিক শিলা।”
“আমার মনে হয় একবার পরীক্ষা করে দেখা দরকার। হয়তোবা সমস্যা। আপনার এই বেলে পাথরে না। সমস্যা এটার নিচে।” পল বলল। “তাহলে অন্তত একটা ভূকম্পনজনিত নিরীক্ষা তো চালানোই যায়।” পল প্রস্তাব দিল। রেজা বুকে দু হাত ভাজ করে দাঁড়ালেন তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, কাজটা করতে পারলে আমিও খুশি হতাম। কিন্তু এতো নিচে আর এতো পাথর ভেদ করে কম্পন পাঠানোর জন্যে খুব শক্তিশালী একটা আঘাত লাগবে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের সমস্ত গোলাবারুদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
“বুঝতে পারছি কেন। সরকার চায়না বিদ্রোহীদের হাতে বিস্ফোরক গুলি পড়ক।” গামায় বলল।
“আরে সরকার না, বিদ্রোহীরাই ওগুলো নিয়ে গিয়েছে। তারপর সরকার আর ওগুলোর বদলে নতুন দেয়নি। মোদ্দাকথা হলো, আমার এখানে এমন কিছু নেই যা দিয়ে এতো শব্দ বানানো সম্ভব যে ভূমি থেকে দু’হাজার ফুট নেমে আবার ফিরে আসবে এবং স্পষ্টভাবে সেটাকে ধরা যাবে।”
এক মুহূর্তের জন্যে পল দিশাহারা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়। বুদ্ধিটা পুরোপুরি পাগলামি। কিন্তু যদি কাজ করে তাহলে এটাই কাজ করবে। ও গামায় এর দিকে তাকাল, “এখন আমি জানি নতুন কোনো বুদ্ধি বের করতে পারলে কার্টের কেমন লাগে। এটা হলো একই সাথে মেধা আর পাগলামির সমন্বয়।”
গামায় চুকচুক করল, “তবে কার্টের ক্ষেত্রে এ দুটোর মধ্যে ভারসাম্য থাকে না।”
আশা করি আমার বেলায় সেটা হবে না।” তারপর রেজার দিকে ফিরে বলল, “আপনার কী শব্দ তরঙ্গ রেকর্ড করার মতো যন্ত্রপাতি আছে?”
“পৃথিবীর সেরা যন্ত্রপাতিগুলোই আছে।”
“ওগুলো রেডি করুন। আর বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না তাও বলছি, আপনার ও লক্কর-ঝক্কর বিমানটায় তেল ভরুন। ওটাকে নিয়ে একটু চক্কর মারতে যাবো।”
