এজন্যেই নামার সময় মনে হলো যে মাটিতে বিমান সোজা হয়েই নেমেছে তারপর আস্তে আস্তে বিমানের নাক উঁচু হচ্ছে। অথচ ঘটনা ঘটছে উল্টোটা। তবে যা-ই হোক মাটিতে নামতে পেরেই পল খুশি। মাটিতে নেমেই ও গেল গামায়কে নামতে সাহায্য করতে। দরজা খুলতেই পল হাত বাড়িয়ে দিল। গামায় সেটা ধরে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে নেমে এলো। “দারুণ মজা লেগেছে। এবার দেশে ফিরেই বিমান চালানো শিখবো। জো-ই শিখাতে পারবে।”
“খুবই ভালো।” পল বলল। খুব চেষ্টা করছে সমর্থকের ভঙ্গিটা ধরে রাখতে। “বের বের মরুদ্যানটা দেখেছিলে?” গামায় জিজ্ঞেস করল।
“নাতো কখন দেখা গেল ওটা?” মনে করার চেষ্টা করতে করতে বলল পল।
“চক্কর মারা শুরু করার ঠিক আগে।” রেজা বলল।
“তার মানে ঐ শুকিয়ে যাওয়া এলাকাটা?”
রেজা মাথা ঝাঁকালো।” এক সপ্তাহে। এক সপ্তাহে ওটা এটা স্বর্গোদ্যান থেকে লবণের ঘেরে পরিণত হয়েছে। গাফসাতে যেভাবে হয়েছে ঠিক একই ঘটনা সমগ্র সাহারা জুড়েই ঘটছে।
“এটা কি করে সম্ভব?” পল বলল।
রোদ থেকে বাঁচতে রেজা কপালের ওপর হাত দিয়ে রেখেছে। “চলেন আগে ভেতরে যাই।” বলল ও।
ওরা মেইন বিল্ডিং-এর দিকে এগুলো। রাস্তার পাশেই সারি সারি পাম্প আর পাইপ, সেগুলো বিভিন্ন দূরত্বে ছড়িয়ে গিয়েছে। গন্তব্য বেনগাজী। মরুভূমির দাবদাহে ঝলসে আসার পর এসি রুমে ঢোকা মানে বেহেশতে প্রবেশ করা। ওদের সাথে একদল শ্রমিকের দেখা হয়ে গেল।
“কোনো কিছু হলো?” রেজা জিজ্ঞেস করলেন।
প্রধান প্রকৌশলী মাথা নাড়লেন, “পানি উত্তোলন আরো বিশ ভাগ কমে গিয়েছে। আরো তিনটা পাম্প বন্ধ করে দেয়া লেগেছে। বেশি গরম হয়ে গিয়েছিল আর এগুলো দিয়ে পানির বদলে খালি তৈলাক্ত কাদা বেরুচ্ছে।” শক্ত মুখে বলল সে।
পল ওদের কথা শুনতে শুনতে চারদিকে তাকাল। রুম ভর্তি অনেক কম্পিউটার আর ডিসপ্লে স্ক্রিন। জানালা মাত্র কয়েকটা। সেগুলোও কালো রঙে ঢাকা। রুমটা দেখতে অনেকটা বিমান বন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের মতো।
“পৃথিবীর বৃহত্তম মানব-নির্মিত নদীর সদর দপ্তরে স্বাগতম।” রেজা বলল ওকে। “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প এটাই। এটাসহ আরো কয়েকটা জায়গা থেকে আমরা পানি সংগ্রহ করি, তারপর প্রায় পাঁচশো মাইল মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বেনগাজী, ত্রিপোলি আর তোবরুক শহরে পৌঁছে দেই। পানিটা আসে মূলত নুবিয়ান স্যান্ডস্টোন জলাধার থেকে।”
রেজা একটা ডিসপ্লের স্ক্রীন স্পর্শ করতেই একের পর এক বিভিন্ন বিশাল বিশাল পাম্প, পানি ভরা কৃপ আর পাইপ ভরা পানির স্রোতের ছবি ভেসে আসতে লাগল।
“আপনারা কতটুকু পানি উত্তোলন করেন?” গামায় জিজ্ঞেস করেলল।
“এতোদিন তো করতাম দিনে সাতশো মিলিয়ন কিউবিক মিটার। আমেরিকান হিসেবে ধরেন প্রায় দুই বিলিয়ন গ্যালন।” রেজা জবাব দিল।
পলের নজর বোর্ডের দিকে। সেখানে হলুদ, লাল আর কমলা নির্দেশক জ্বলছে। সবুজ নেই কোথাও।
“খরায় আপনাদের ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে?” পল জিজ্ঞেস করল।
“আমাদের পরিমাণ ইতোমধ্যে সত্তর ভাগ কমে গিয়েছে। দিনে দিনে আরো কমছে।” রেজা বলল।
“ইদানীং কী কোনো ভূমিকম্প হয়েছে? মাঝে মাঝে ভূমিকম্প হলে জলাধারের অবস্থান সরে যায়। ফলে তখন আর পানি উঠতে চায় না।”
“না, ওরকম কিছু হয়নি। সামান্য কাঁপা কাপিও না। ভূতাত্ত্বিকভাবে এই এলাকাটা খুবই সুস্থির। যদিও রাজনৈতিকভাবে উল্টো।”
পল পুরোপুরি হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে। শেষমেশ একটা কথাই ওর কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হলো, “আমি জানি কেউই হয়তো বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু জলাধারগুলো কী শুকিয়ে যেতে পারে না?”
“চমৎকার প্রশ্ন।” রেজা জবাব দিল। এখানকার যে ভূনিম্নস্থ পানি সেটার অস্তিত্ব সেই বরফ যুগ থেকে বিদ্যমান। আমরা যে পানি তুলছি সেটুক আর ফেরত যাচ্ছে না। কিন্তু যেটুকু পানি আছে সেটুকুও আগামী পাঁচশো বছর নিশ্চিন্তে চলে যাওয়ার কথা। যদি খুব বেশি বেশি করেও ভোলা হয় তাতেও একশো বছরের আগে কিছু হওয়ার কথা না। আর আমরা পানি তুলছি মাত্র পঁচিশ বছর হয়েছে। তাই আসলে যে কী হচ্ছে সেটার উত্তর আপনার মতো আমারো জানা নেই। পানি কোথায় যাচ্ছে আল্লাহ মালুম।”
“আপনারা জানেন কী তাহলে?” গামায় জিজ্ঞেস করল।
রেজা একটা মানচিত্র টেনে আনলেন, “আমি শুধু জানি খরা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আস্তে আস্তে অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। খরার বিস্তার পশ্চিম দিকে বাড়ছে। প্রথম কূপ শুকায় এখানে। আর এটা হচ্ছে পূর্ব সীমানা।” রেজা মানচিত্রে টোবরুক এর দক্ষিণে লিবিয়া আর মিসরের সংযোগস্থলের একটা জায়গা দেখালো।” ঘটনাটা ঘটে নয় সপ্তাহ আগে। তার কয়েকদিন পরেই সারির, টাজেরবো এলাকার কূপগুলো শুকানো শুরু করে। আর তিরিশ দিন আগে আমাদের পশ্চিমাঞ্চলে, ত্রিপোলির দক্ষিণের কূপগুলোর পানির সংগ্রহ যে, কমে গিয়েছে তা আমরা টের পাই। কয়েকদিনেই পাম্প করা পানির পরিমাণ অর্ধেকে নেমে আসে। এজন্যেই আমি গাফসা-তে গিয়েছিলাম।
“কারণ গাফসা হচ্ছে আরো পশ্চিমে।” পল বলল।
রেজা মাথা ঝাঁকালো। “প্রভাবটা কী আরো বাড়ছে কি-না তা আমার দেখার দরকার ছিল। এবং দেখলাম বাড়ছে। আলজেরিয়াতেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু এসব দেশের কোনোটাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর আমাদের মতো এতোটা নির্ভরশীল না। গত পঁচিশ বছরে লিবিয়ার জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। সেচ-নির্ভর কৃষির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার গুণ। শিল্পক্ষেত্রে পানির প্রয়োজন বেড়েছে পাঁচশো গুণ। সবাই এই পানির ওপর নির্ভরশীল।”
