“হতেই পারে। আধুনিক যুগ এটা। মেয়েরাও চাইলে যা খুশি হতে পারে।” কাৰ্ট চোখ মুখ শক্ত করে মাথা নাড়লো আর গ্লাসে আরেক চুমুক দিল। লিকারের ঠাণ্ডা আগুন তার সাথে কপালের সাথে ঠাণ্ডা গ্লাস চেপে রাখার কারণে ব্যথাটা এখন মোটামুটি সয়ে এসেছে। মাথাটাও পরিষ্কার লাগছে এতোক্ষণে।
“সব সমস্যার গোড়া কিন্তু ঐ জাদুঘর। কেনসিংটন বলেছেন যে লোকগুলো কি সব মিসরীয় পুরাকীর্তি খুঁজছে। ওগুলো নাকি একদমই ফালতু। কিন্তু সত্যি কথা বলছিলেন কি-না কে জানে। একবার আমাদের দেখা দরকার। তার মানে আমি আর জো পার্টিতে যাচ্ছি।”
“সাজুগুজু করলে আমাকে ভালোই লাগে।” জো বলল।
“আস্তে। এখনি সেলুনে দৌড়াতে হবে না। আমরা খুব বেশি সেজেগুজে যাবো না। আর আজকের ঘটনার পর সরাসরি নিজেদের চেহারা আর কোথাও না দেখানোই ভালো হবে।”
“তার মানে ছদ্মবেশ?”
“তার চেয়েও ভালো। কার্ট এটুকু বলেই থেমে গেল।
“পার্টি এখনও হবে নাকি? আমিতো ভাবলাম বাদ হয়ে গিয়েছে।” রেনাটা বলল অবাক হয়ে।
কার্ট মাথা নাড়লো, “আমিও তা-ই ভেবেছিলাম। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু কিছু ব্যাপার বুমেরাং হয়ে যায়। শুনলাম এই ঘটনার কারণে নাকি সবার আগ্রহ কমা তো দূরে থাক আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়েছে। বিপদের আশংকা সবাইকে আরো বেশি উত্তেজিত করে তুলছে। তাই পার্টি বাতিল না করে ওরা নিরাপত্তা তিনগুণ করেছে, সেই সাথে আরো কয়েকজনকে দাওয়াত দিয়েছে।”
“আর আমরাও নাচতে নাচতে গেলেই ঢুকতে দেবে? ঐ তিন স্তরের নিরাপত্তা রক্ষীদের যদি ব্যাপারটা পছন্দ না হয়?” জো বলল।
“শুধু পছন্দই করবে না, সেই সাথে ওরা নিজেরা আমাদেরকে পাহারা দিয়ে ভেতরে নিয়ে যাবে। রহস্যের হাসি হেসে কার্ট জবাব দিল।
২১. দক্ষিণ লিবিয়া
২১. দক্ষিণ লিবিয়া
পুরনো DC-3 বিমানের ককপিটটা থরথর করে কাঁপছে। মরুভূমির প্রায় পাঁচশো ফুট ওপর দিয়ে দুশো নট গতিতে চলাটা ওর বুড়ো হাড়ে সহ্য হচ্ছে না। পল ট্রাউট অনুমান করল হয় প্রপেলারগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই নয়তো ওগুলো সামান্য ভারসাম্যহীন। এগুলোর একটা যদি হঠাৎ করে খুলে নিচের মরুভূমিতে পড়ে যায় বা বন বন করতে করতে এই কেবিনের ভেতর-ই ঢুকে পড়ে তাহলে তাহলে যে কি হবে সেই ভাবনাতেই আতঙ্কিত হয়ে কাঠ হয়ে বসে আছে ও।
যথারীতি গামায় এসব কোনো ব্যাপারেই ভয় পাচ্ছে না। সে বসেছে পাইলটের পাশের কো-পাইলটের সিটে। বাইরের মনোরম দৃশ্য উপভোগের পাশাপাশি এত নিচু দিয়ে এত জোরে উড়ে যাওয়ার কারণে দারুণ উত্তেজনা অনুভব করছে।
ওদের নিমন্ত্রণ দাতা রেজাও পাইলটের সিটের পেছনে পলের সাথে বসা।
“মাটির এতো কাছ দিয়ে এতো জোরে যাওয়ার কোনো দরকার আছে?” পল জিজ্ঞেস করল।
“এভাবেই নিরাপদ বেশি, না হলে বিদ্রোহীরা গুলি করে এটাকে নামিয়ে ফেলবে।” রেজা জবাব দিল।
পল অবশ্য এরকম কোনো জবাব আশা করেনি, “বিদ্রোহী?”
“আমাদের দেশে এখনও হালকা-পাতলা গৃহযুদ্ধ চলছে। এখানে বেশ কিছু ভাড়াটে সৈন্যবাহিনী আছে। এরা মাঝে মাঝে আমাদের হয়ে কাজ করে, আবার মাঝে মাঝে আমাদের বিপক্ষে কাজ করে; বিদেশি গুপ্তচর দিয়ে দেশটা ভরে গেছে। মিসর, মুসলিম ব্রাদারগুড এমনকি গাদ্দাফির দলের লোকেরাও ক্ষমতার জন্য এখনও লড়েই যাচ্ছে। ইদানীং লিবিয়ায় খুব বেশি গণ্ডগোল চলছে।” রেজা ব্যাখ্যা করল।
হঠাৎ পলের মনে হলো আরো একদিন তিউনিসিয়া থেকে গিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেই ভালো হতো। এতোক্ষণে বারান্দায় বসে পাইপ টানতে টানতে রেডিও শুনতে পারতো। এভাবে জান হাতের মুঠোয় নিয়ে চলতে হতো না। “চিন্তা করবেন না। এতো পুরনো একটা বিমানে মিসাইল মারার মতো বোকামি ওরা করবে না। ওরা সাধারণত জায়গায় বসে রাইফেল দিয়ে গুলি করে। আর এখন পর্যন্ত একটা গুলিও লাগাতে পারেনি। রেজা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল। তারপর ককপিটের পিছনের কাঠের দেয়ালে টোকা দিল। DC-3 র মতো এই জিনিসটাও অন্য আরেক যুগের জিনিস। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে লোকজন ককপিটে ঢোকা আর বের হওয়ার সময় এটায় পাড়া দিয়ে আসছে।
বিমানের কন্ট্রোলও আগের মতোই আছে। ক্ষয় হয়ে যাওয়া। বিশাল লম্বা লম্বা কয়েকটা দণ্ড ইতস্তত বেরিয়ে আছে। যুগের পর যুগ ধরে কত পাইলট-ই না এগুলো ব্যবহার করে আসছে।
পাইলটের হাতের স্টিয়ারিং মাঝখানে বাঁকা। গামায় এর সামনে যেটা আছে সেটার চেহারা অবশ্য একটু ভালো।
“আমাদের গাড়িতে করে আসাই ভালো ছিল।” পল বলল।
“ট্রাকে করে গেলে আট ঘণ্টা লাগতো আর আকাশ পথে মাত্র দেড় ঘণ্টা। আর ওপরের দিকে গরমও কম।” রেজা বলল।
পল ঘড়ি দেখতে দেখতে ভাবলো বাপরে বাপ দেড় ঘণ্টা।” তবে ঘড়ি দেখে কিছুটা স্বস্তি ফিরলো মনে। যাক প্রায় চলে এসেছে।
বাইরে বালির ভেতর প্রায়ই বিশাল বিশাল পাথর বের হয়ে আছে। দেখে মনে হয় যেনো সমুদ্র থেকে বিশাল কোনো দানব লাফ দিচ্ছে। আরো কিছু দূর দক্ষিণে যাওয়ার পর একটা লবণ ঘেরের মতো জায়গায় কয়েকটা চক্কর দিয়ে তারপর নামতে শুরু করল। জায়গাটা দেখে পলের মনে হলো কোনো তেল ক্ষেত্র। বিশাল বিশাল টাওয়ার, চিমনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আশে পাশে। কয়েকটা ভবনও দেখা গেল।
নামতে অবশ্য কোনো সমস্যা হলো না। মাত্র একটা ঝাঁকুনি খেয়েই বিমানের গতি কমতে শুরু করল। আগেরকালের বেশিরভাগ বিমানের মতো DC-3’র লেজের দিকে ওজন বেশি। পাখা দুটোর নিচে বড় বড় দুটো চাকা আছে এটার আর একদম পিছনে ছোট্ট লেজের নিচেই ছোট্ট আর একটা চাকা।
