কোত্থেকে কিছু মাছি উড়ে এসে ভো ভো করতে লাগল চারপাশে। এর বাইরে আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না আশে পাশে। শেষমেশ দক্ষিণী মহিলা আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলেন না। গাইড লোকটার কাঁধে টোকা দিয়ে ফেরার পথে হাঁটা দিলেন। তবে তার আগে বললেন, “মনে হয় কেউ বোধহয় এটার প্লাগ খুলে দিয়েছে। তাই এই অবস্থা।”
অন্যরাও তাদের অনুসরণ করল। কাদা ভরা গর্ত দেখার কারোর-ই খুব বেশি আগ্রহ নেই। গাইড পুরো বকবক করে বোঝানোর চেষ্টা করল দুইদিন আগেও লেকটা কিরকম পানিতে টইটম্বুর ছিল। আর তাই যদিও এখন এটা আর নেই কিন্তু পয়সা ফেরত দেয়া হবে না। পল অবশ্য ফিরতে একটু দেরি করল। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে। হঠাৎ একদল বাচ্চাকে দেখা গেল কাদা মাড়িয়ে লেকের শেষ পানিটুকু সংগ্রহের জন্য।
আর থেকে লাভ নেই, তাই পা চালিয়ে ফিরতি পথ ধরলো ও। গামায় এর কাছে এসে বলল, “মহিলার কথা কিন্তু ঠিক।”
“কোন কথা?”
“ঐ যে কেউ যেন প্লাগ খুলে দিয়েছে মনে হচ্ছে সেটা। এই ধরনের ঝর্ণাগুলো প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন জলাধার থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত মাটির নিচের পাথরগুলো যখন ভেঙে সরে যায় তখন ওটার মাঝে পানি আটকা পড়ে আর একটা লেক সৃষ্টি হয়। এখানেও সম্ভবত একই ব্যাপার ঘটেছিল। কখনো কখনো পানির প্রবাহ চলতেই থাকে অবিরাম আবার কখনো একবার পানি জমেই পানি আসা বন্ধ হয়ে যায়। তবে যদি এমন হয় যে পাথর আবারো সরে গিয়ে ঝর্ণার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে তখনও সাধারণত পানি সেখান থেকে সাথে সাথে উধাও হয় না। আস্তে আস্তে সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে লেকটা শুকিয়ে যায়। কিন্তু সেও কয়েক মাসের ব্যাপার। যেহেতু এই লেকটা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে, তার মানে পানি আসলে অন্য কোথাও সরে গিয়েছে। কিন্তু জায়গাটা একটা বাটির মতো। এটার সাথে অন্য কোনো কিছুর সংযোগ নেই।”
“তার মানে যেহেতু একটা বাষ্প হয়নি বা আশে পাশে চলে যায়নি, সেহেতু এটা আসলে মাটির ভেতর ঢুকে গেছে। এটাই আপনার মত, তাই না মি. ট্রাউট” গামায় বলল।
পল মাথা ঝাঁকালো, “যেখান থেকে এসেছিল, সেখানেই ফিরে গেছে।“ “এরকম কখনো হয় নাকি? শুনেছো কখনো?”
“না। এরকম হতে কখনো শুনিনি আমি।” পল জবাব দিল।
হঠাৎ ওদের দিকে একটা লোককে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। লোকটাকে ওরা লেকের পাড়ে দেখেছিল। তবে ওদের পাড়ে না, অন্য পাশে। ওদের মতোই ছবি তুলছিল লেকটার। লোকটা কিছুটা খাটো। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতা। মাথায় একটা দোমড়ানো ক্যানভাসের হ্যাট। মুখে কয়েক দিনের না কামানো দাড়ি। কাঁধে ব্যাকপ্যাক, হাতে লাঠি আর গলায় ঝোলানো বাইনোকুলার দেখেই বোঝা যাচ্ছে ইনিও হাইকার। কিন্তু হাতে একটা হলুদ কালো চিহ্ন পলের নজর এড়ালো না। চিহ্নটা জরিপকারীদের প্রতীক।
কাছে এসে ক্যাপটা একটু ওপরে ঠেলে দিয়ে বলল, “হ্যালো। আমি পাশ থেকে লেকের পানি উধাও হওয়া সম্পর্কে আপনার মন্তব্যটা শুনে ফেলেছি। সারাদিন দেখলাম লোকজন আসছে, আর হতাশ হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে ফিরে যাচ্ছে। আপনাকেই প্রথম দেখলাম যে কি-না কি হয়েছে আর পানি কোথায় গিয়েছে তা নিয়ে ভাবতে। আপনি কি ভূতাত্ত্বিক নাকি?”
“ভূতত্ত্ব নিয়ে কিছু পড়াশোনা আছে। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল, “পল ট্রাউট। এই হলো আমার স্ত্রী গামায়।”
লোকটা পল আর গামায় দুজনের সাথেই হ্যান্ডশেক করল। তারপর বলল, “আমার নাম রেজা আল-আগ্রা।”
“কেমন লাগছে এখানে?” গামায় জিজ্ঞেস করল।
“খুব বেশি ভালো না।” স্বীকার করল রেজা।
পল জরিপকারীদের প্রতীকটা দেখিয়ে বলল, “আপনি কী লেকটার মাপজোক নিতে এসেছেন নাকি?
“সেরকম কিছু না আসলে। আপনার মতো আমিও চেষ্টা করছিলাম লেকের পানি কীভাবে আর কোথায় উধাও হলো বের করতে। তাই প্রথমেই চেষ্টা করছিলাম এখানে কতটুকু পানি ছিল সেটা খুঁজে বের করার।”
“আমরা অবশ্য মনে মনেই অনুমান করেছিলাম খানিকটা।” পল বলল। কাদা নিয়ে জরিপ ওর কাছে বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে।
“হ্যাঁ,…কিন্তু আমার আসলে শুধু অনুমান করে বলার সুযোগ নেই। আমি লিবিয়া সরকারের পানি সম্পদ বিভাগের পরিচালক। আমার তাই কাটায় কাটায় আসল হিসাব দরকার।”
“কিন্তু এটা তো তিউনিসিয়া।” গামায় ভুলটা ধরিয়ে দিল।
“জানি। কিন্তু আমিও সরেজমিনে দেখতে এসেছি। আমার পেশার দিক থেকে পানি উধাও হয়ে যাওয়া খুব খারাপ লক্ষণ।” রেজা জবাব দিল।
“মরুভূমির মধ্যে এটাতো একটা ছোট্ট লেক।” গামায় বললো আবার।
“হ্যাঁ, কিন্তু এটাই উধাও হওয়া একমাত্র লেক না। আমাদের দেশে প্রায় একমাস ধরে পানির পরিমাণ শুধু কমছেই। ঝর্ণা বাহিত লেকগুলো সব শুকিয়ে গিয়েছে। নদীর ধারাও শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গিয়েছে। দেশের সব মরুদ্যান শুকিয়ে কাঠ। কার্থেজদের আমল থেকে যেসব মরুদ্যান সতেজ ছিল সেগুলোও আজ শুকিয়ে গেছে। এত দিন ধরে তাও মাটি থেকে পানি পাম্প করে চালাচ্ছিলাম, কিন্তু ইদানীং পাম্পেও বেশি পানি আর উঠছে না। প্রথমে ভেবেছিলাম এটা বুঝি শুধু আমাদেরই সমস্যা কিন্তু এই লেকটার কথা শুনলাম সেদিন, তারপর আজ দেখে বিশ্বাস হলো যে যা ভেবেছিলাম ব্যাপারটা তার চেয়েও আরো অনেক বেশি জটিল। সম্ভবত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মক নিচে নেমে গিয়েছে।”
