পল কাধ ঝাঁকালো। পরিবারের কাউকে তো অন্তত শক্তিশালী হতেই হবে। আর কাউকে হতে হবে বাহানা বাজ। “আমার মনে হয় আমাদের একটু রেস্ট নিলে ভালো হয়।” বলল ও।
“কাম অন পল। আর অল্প একটু আছে। আর একটা পাহাড় পার হলেই তুমি পৃথিবীর সবচে নতুন লেকের অলৌকিক পানিতে গোসল করতে পারবে আর গাফসা বীচে রেস্ট নিতে পারবে।”
রোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকেই গাফসা আর এর আশপাশের এলাকাটা ভ্রমণকারীদের জন্য তীর্থ স্থান। ঝরণা, হাম্মামখানা, আর আয়ুর্বেদিক পুকুরে এলাকাটা ভর্তি। বেশির ভাগই নানান ধরনের আজব আজব চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়। পল আর গামায়ও এখানকার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গবেষণা আর বিখ্যাত কাসাবাহ খোঁজার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন ঝরণা আর পুকুরে রিলাক্স করেছে।
“হোটেলেও যথেষ্ট অলৌকিক পানি ছিল।” পল মজা করল।
“হ্যাঁ, তবে ওসব লেকের পানি হাজার বছর ধরে ওখানে আটকে আছে। আর এই লেকটা মাত্র ছয় মাস আগে মাটি খুঁড়ে উদয় হয়েছে। তাতেও তোমার একটু কৌতূহল হচ্ছে না?”
পল একজন ভূতত্ত্ববিদ। বড় হয়েছে ম্যাসাচুসেটস-এ। সেখানে ওর প্রচুর সময় কেটেছে পানিতে সাঁতার কেটে আর বিখ্যাত উডস হোল সমুদ্রতত্ত্ব ইনস্টিটিউট এর আশেপাশে ঘুরঘুর করে। শেষমেশ ও স্ক্রিপস সমুদ্রতত্ত্ব ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়। আর মেরিন জিওলজিতে পি. এইচ ডি, লাভ করে। ওর গবেষণার বিষয় ছিল গভীর সমুদ্র তলের গঠন। সমুদ্র তলার ভূতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করার জন্য বেশ কিছু প্রযুক্তিও আবিষ্কার করেছে ও। তাই স্বাভাবিকভাবেই হঠাৎ করে বলা নেই কওয়া নেই মাটি খুঁড়ে একটা লেক উদয় হওয়ার ঘটনা তাকে কৌতূহলী করছে বটেই। কিন্তু ঘণ্টাখানেক রাস্তা নামক খানাখন্দে গাড়ি চালানোর পর তিরিশ মিনিট এই জ্বলন্ত সূর্যের তাপেই সে কৌতূহল উবে গেছে।
“এই তো চলে এসেছি।” গামায় চিৎকার করে বলল সামনে থেকে। পল বিস্ময়ের দৃষ্টিতে ওর স্ত্রীর দিকে তাকাল। ক্লান্তি বলে যে কোনো কিছু নেই ওর। সব সময় কিছু না কিছু করছেই। এমন কি বাসায়ও ওকে কখনো স্থির দেখা যায় না। ও ডক্টরেট করেছে মেরিন বায়োলজিতে। তবে এর বাইরে ও আরো অনেক বিষয়ে ওর ডিগ্রি আছে। বহু দিনের পরিচয়ের কারণে পল জানে, কোনো কিছুতে দক্ষতা এসে গেলেই গামায় এর কাছে সেটা আর ভালো লাগে না। তাই নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ খুঁজে বেড়ায়।
একবার পলকে চোখ টিপে বলেছিল, পলকে নাকি বহু চেষ্টা করে যাচ্ছে সোজা করার। কিন্তু পল ওকে বারবার হতাশ করেই আছে। এটাই নাকি ওদের দীর্ঘ আর সুখী দাম্পত্য জীবনের রহস্য। আর দুজনেই অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। এ কারণেই NUMA’র অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি নিজেরাও ছুটিছাটা পেলেই বেরিয়ে পড়ে কোথাও না কোথাও।
গামায় গাইডেরও আগে চূড়ায় পৌঁছে গেল। পৌঁছে থেমে কিছুক্ষণ চারপাশ দেখলো তারপর নিতম্বে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকল।
গাইডও সেখানে পৌঁছালো এক সেকেন্ড পর। কিন্তু তার চোখে প্রশংসার বদলে কেমন যেন সন্দেহ। মাথায় হ্যাট নামিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা চুলকাতে লাগল।
পলও চুড়াটার কাছে পৌঁছাতেই কারণটা ধরতে পারলো। যা ছিল পাথরে ঘেরা বিশাল একটা লেক, সেটা এখন প্যাঁচপেচে কাদায় ভর্তি ছোট্ট একটা ডোবায় পরিণত হয়েছে। মাঝখানে মাত্র দশ ফুট ব্যাসার্ধের একটা বৃত্তাকার জায়গায় কালচে একটু পানি জমে আছে। শুধু চারপাশের পাথরের গায়ে একটা মলিন দাগ দেখে বোঝা গেল পানি ঐ পর্যন্ত ছিল।
পলের পরেই আরো কিছু পর্যটক ওখানে পৌঁছালো। ওর মতো তারাও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এখানে আসার আগে এই জায়গাটার দুর্দান্ত কিছু ছবি দেখেছিল সবাই। মূলত সেটা দেখেই মরুভূমি পেরিয়ে এখানে আসা। সেই জিনিসের এই দশা কেউ আশা করেনি।
“কি বিশ্রী। আমাদের এলাকায় তো কেউ এখানে মাছও ধরবে না।” এক মহিলা বলল। কণ্ঠে দক্ষিণাঞ্চলের টান।
স্থানীয় যে গাইডটা ওদের নিয়ে এসেছে তাঁকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। “কিছুই তো বুঝতে পারছি না। এটা কীভাবে সম্ভব? দুদিন আগেও লেকের পানি ঐ পর্যন্ত ছিল।” পাথরের দাগ দেখিয়ে বলল লোকটা।
“বাষ্প হয়ে গেছে সব পানি। যা গরম এখানে।” স্কটল্যান্ডের এক পর্যটক বলল কথাটা।
কাদার দিকে তাকাতেই পল ওর সব ব্যথা বেদনা ভুলে গেল। ও জানে যে ওরা এক রহস্যের দিকে তাকিয়ে আছে। লেক হঠাৎ গজিয়ে ওঠাকে তাও মেনে নেয়া যায় কারণ আশে পাশে প্রচুর ঝরণা আছে। ঝরণার পানির ধাক্কায় প্রায়ই দেখা যায় এখানে সেখানে মাটি সরে পানি জমে যাচ্ছে। কিন্তু এক রাতে পুরো লেকই আবার উধাও হয়ে যাওয়া…সেটা সম্পূর্ণ আরেক জিনিস।
আশে পাশে ভালো করে দেখে লেকটার আয়তন আর গভীরতা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিয়ে নিলো। “এতোখানি পানি দুই দিন তো দূরে থাক দুই মাসেও বাষ্প হওয়া সম্ভব না।”
“তাহলে গেল কোথায়?” দক্ষিণী মহিলাটি জিজ্ঞেস করল।
“বোধহয় কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। এই এলাকায় এখন খরা চলছে।” স্কটিশ লোকটা জবাব দিল।
লোকটার কথা সত্য। উত্তর আফ্রিকার মধ্যে তিউনিসিয়ার অবস্থাই সবচেয়ে খারাপ। কিন্তু এক হাজার ট্যাংকার ট্রাক আসলেও তো এতো বড়ো লেকের পানি ফুরোনোর কথা না। পল লেকের দেয়ালে কোথাও ফাটল আছে কি-না খুঁজতে লাগল। কিন্তু সেরকম কিছুই চোখে পড়ল না।
