এখন আবার উত্তেজনা থিতিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত। যারা বেঁচে গেছে তারা আবার চাইছে হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে।
“আশা করি রাস্তায় কারো কোনো কষ্ট হয়নি। সাকির বলল।
“এসব সৌজন্যতার সময় নেই এখন। অপারেশন শুরু হবে কখন বলুন। আমরা সবাই-ই খুব টেনশনে আছি।” কথাটা বলল একজন মিসরীয়। মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে তার। পরনে ওয়েস্টার্ন স্যুট, হাতে ব্রিটলিং ঘড়ি। লোকটা মিসরীয় বিমান বাহিনীর কাছ থেকে পানির দামে বিমান কিনে সেগুলো বাইরে বেচে বেচে এত টাকা কামিয়েছে।
সাকির একজন কর্মচারীর দিকে ফিরে বলল, “পাম্পিং স্টেশনগুলো রেডি?” লোকটা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল, তারপর সামনের কি-বোর্ডে চাপ দিতেই স্ক্রিনে কন্ট্রোল রুমে দেখা আফ্রিকার ম্যাপটা ফুটে উঠল।
“আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, নেটওয়ার্ক গঠন পুরো শেষ,” শাকির বলল। “আমাদের কাজকর্ম কেউ টের পায়নি তো?” লিবিয়ার সাবেক একজন জেনারেল প্রশ্ন করলেন।
‘না! তেলের পাইপ বসানোর কাজ করার হুঁতো ধরার কারণে কেউ সন্দেহও করেনি যে আমরা সাহারার তলদেশের জলাধারের গভীর আর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হাত দিচ্ছি। এখান থেকে শুরু করে পশ্চিম আলজেরিয়ার শেষ মাথা পর্যন্ত সব মরুদ্যান আর গাছপালার জীবনের উৎস এটাই।”
“অগভীর জলাধারগুলোর কি হবে? আমাদের দেশের লোকেরা তো ওগুলোর ওপরই নির্ভরশীল।” লিবিয়ার দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল কথাটা।
“আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে মিষ্টি পানির সব উৎস-ই এসব গভীর জলাধারের ওপর নির্ভরশীল। যদি আমরা ওগুলো থেকেই প্রচুর পরিমাণ পানি তুলে নেয়া শুরু করি তাহলে ওগুলোও টিকবে কি-না সন্দেহ।” সাকির বলল।
“আমি চাই ওগুলো একেবারেই শুকিয়ে যাক।” তিউনিসিয়ার প্রতিনিধি বলল।
“পুরোপুরি শুকিয়ে ফেলা অসম্ভব। তবে এটা হচ্ছে মরুভূমি। যখন হঠাৎ করেই একদিন তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া আর লিবিয়া দেখবে যে তাদের পানির সংগ্রহে টান পড়েছে তখনই তারা আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। আশি-নব্বই ভাগ ঘাটতি হলেই হবে। পুরোটা শুকোতে হবে না। বিদ্রোহীদেরও পানির প্রয়োজন হয়। পানির সরবরাহ তখনই আবার নিশ্চিত করা হবে যখন আবার আপনারা ক্ষমতা ফিরে পাবেন। তারপর সবাই একসাথে মিলে ওসাইরিসের মাধ্যমে আমরা সমগ্র উত্তর-আফ্রিকাকে নিয়ন্ত্রণ করবো।
“আচ্ছা পানিটা তুলে রাখবেন কোথায়? আপনি দিনে দুপুরে বিলিয়ন বিলিয়ন গ্যালন পানি তুলবেন আর কারো চোখে পড়বে না তা-তো হয় না।” আলজেরিয়ান লোকটা বলল।
“পানি আসবে এসব পাইপের ভেতর দিয়ে।” সাকির মানচিত্রের লাইনগুলো দেখিয়ে বলল।” তারপর এসব চ্যানেল দিয়ে সোজা গিয়ে পড়বে নীল নদে। তারপর সেখান থেকে চলে যাবে সাগরে।”
রুমের সবাই একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। “দারুণ!” প্রশংসা করল একজন।
“আর যেসব ইউরোপিয়ান আর আমেরিকান আমাদের বিরোধিতা করবে?” লিবিয়ান জিজ্ঞেস করলেন।
সাকির হাসলো, “ইতালিতে আমাদের লোক সেটার ব্যবস্থা করছে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এরা কোনো সমস্যা-ই করবে না।”
“খুব ভালো। তা সেটা কখন শুরু হচ্ছে? আর আপনার কি আর কিছু লাগবে?” লিবিয়ান-ই বললেন আবার।
এদের এই প্রবল আগ্রহই শাকিবের প্রধান পুঁজি। ক্ষমতার স্বাদ একবার পাওয়ায়, এরা সেটা ফিরে পেতে এতোটাই মরিয়া যে যা খুশি করতে রাজি। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সাকির যথেষ্ট টাকা আর সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। এবার তার প্রতিদান দেয়ার পালা।
“বেশির ভাগ পাম্প-ই কয়েক মাস ধরে চলছে। পানি তোলার কাজও খুব দ্রুত শুরু হয়ে যাবে। তারপরই বাকি সবই হবে পরিকল্পনা মতো।” সাকির সবার উদ্দেশ্যে বলল। তারপর টেকিনিশিয়ানের দিকে ফিরে বলল, “অন্যান্য স্টেশনকে খবর দাও। সব পাম্প চালু করতে বলো।”
টেকনিশিয়ান কয়েকটা বোম চাপতেই পাম্পগুলো জ্যান্ত হয়ে উঠল। ঘড় ঘড় শব্দে ভরে গেল চারপাশ। কয়েক মুহূর্ত পরেই শব্দ এতো বেড়ে গেল যে মুখের কথা আর শোনা-ই যায় না। সাকির তাই দ্রুত সভার শেষ টানলো।
“মরুভূমিতে গরম বাতাসকে বলে সিরোক্কো। আজ আমরা নিজেরাই গরম বাতাসের সৃষ্টি করলাম। এই বাতাস সমগ্র আফ্রিকা জুড়ে ভেসে ভেসে আরব বসন্তের সমাপ্তি ঘটাবে। তারপরই শুরু হবে সবচেয়ে দীর্ঘ আর সবচেয়ে জ্বলন্ত গ্রীষ্ম।
.
১৫.
গাফসা, তিউনিসিয়া
পল ট্রাউট দরদর করে ঘামছে। আজ বিকেলে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। মাথায় বিশাল একটা সময়েরা (দক্ষিণ আমেরিকার চওড়া কিনারওয়ালা টুপি), তারপরও মনে হচ্ছে মুখটা ঝলসে যাচ্ছে। সূর্য আরেকটু নিচে নামতেই এবার সূর্যের রশ্মি সরাসরি ওর মুখে পড়ে চামড়ায় কামড় বসাতে লাগল। যেন বলতে চাইছে সাদা চামড়ায় ইংলিশ লোকজনের এদিকে থাকার যোগ্যতা নেই।
পলের উচ্চতা ছয় ফুট আট। এই দলটার মধ্যে ওই সবচে লম্বা। ওরা হচ্ছে একটা হাইকারের দল। একটা পাথুরে পাহাড় বেয়ে উঠছে ওরা। পথের ধারে একটা আগাছা পর্যন্ত নেই। দলের মধ্যে ও-ই অবশ্য সবচেয়ে হ্যাংলা। কয়েক কদম সামনেই হাঁটছে ওর স্ত্রী গামায়। সে এমন দক্ষতায় পাহাড় বেয়ে উঠছে যেন কুকুর নিয়ে বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছে। তার পরনে দৌড়বিদদের পোশাক আর একটা চামড়া রঙের গোল ক্যাপ। লাল চুল পনিটেইল করে পেছনে বাধা। সেটা আবার ক্যাপের ছিদ্র দিয়ে বাইরে বের করা। গামায় সামনে বাড়লেই ওটা এপাশ ওপাশ দুলছে।
