“কিন্তু ও একা তো এটা পারবে না।” হাসান বলল।
সাকিরও ব্যাপারটা ভেবে দেখলো, “ঠিক বলেছ। নতুন এজেন্টদের একটা গ্রুপ ওর কাছে পাঠিয়ে দাও। ওদেরকে বলে দিও কাজ শেষে হ্যাগেনকেও সরিয়ে দিতে।”
হাসান মাথা ঝাঁকালো। “ঠিক আছে। আমি নিজেই দেখছি ব্যাপারটা। আর এদিকে উনারা চলে এসেছেন। নিচে বাঙ্কারে বসে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে।”
সাকির শব্দ করে শ্বাস ছাড়লো। এখনও তাকে কারো কাছে কৈফিয়ৎ দিতে হয় ভাবতেই বিরক্ত লাগে। ওসাইরিস হলো একটা প্রাইভেট সামরিক দল। লক্ষ্য এমন এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যারা কোনো সরকারকে কৈফিয়ৎ দেবে না, বরং সরকারগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু সেটা এখনও বাস্তবায়নের পথে। আর ওসাইরিস এখনও একটা সংস্থা। সাকির একই সাথে এটার প্রেসিডেন্ট আর সিইও।
আর উনারা হলো, স্টকহোল্ডার আর বোর্ড মেম্বার। এদের প্রত্যেকেরই লক্ষ্য অনেক বড় বড়। বেহিসেবি ধন-সম্পদেও এদের মন ভরেনি। এখন তাদের চোখ পড়েছে ক্ষমতার দিকে। সবাই নিজের সাম্রাজ্য গড়তে চায় আর একমাত্র সাকির-ই তাদেরকে সেটা এনে দিতে পারবে।
.
১৪.
রোদ পড়ে পাইপগুলো ঝিকমিক করছে। পাশেই একটা লম্বা, কালো রঙের কাঠামো। সাকির সেদিকেই এগুলো। ওর অনেক পাম্পিং স্টেশনগুলোর মধ্যে এটা একটা। দুজন লোক দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। সাকিরকে দেখামাত্র দরজা খুলে ধরলো। চোখ সোজা সামনে। সাকিরের চেহারার দিকে তাকানোর দুঃসাহস ওদের নেই। ভেতরে ঢুকে সাকির সোজা ভবনের পিছন দিকে চলে গেল। একটা খনির কাজে ব্যবহৃত এলিভেটরের দরজা খুলে তাতে চড়ে বসলো। এটায় একই সাথে অনেক মানুষ আর ভারী মালামাল বহন করা যায়। সাকির নিচে নামার বোতামে চাপ দিল।
দুই মিনিট পর প্রায় চারশ ফুট নামার পর এলিভেটরের দরজা আবার খুলে গেল এবং সাকির নিচে নেমে এলো। সামনেই মাটির নিচে গুহার মতো একটা ঘর। দেয়াল আর মেঝে জুড়ে অসংখ্য লাইট লুকানো। গুহাটার অর্ধেকটা প্রাকৃতিক। বাকিটা সাকিরের মাইনিং টীম আর ইঞ্জিনিয়ারেরা বানিয়েছে।
লম্বায় প্রায় দুইশো ফুট। বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে প্রকাণ্ড কয়েকটা পাম্প। ছোটখাটো একেকটা ঘরের সমান ওগুলো। সেগুলো থেকে ডজন ডজন পাইপ বের হয়ে এঁকেবেঁকে উঠে গেছে মাটির ওপরে।
সাকির সানগ্লাস খুললো। বরাবরের মতোই আবারও জিনিসটা দেখে মুগ্ধ হলো। ও এসব বিশাল যন্ত্রগুলো পার হয়ে একটা রুমে এসে ঢুকলো। এটা হলো কন্ট্রোল সেন্টার। বিশাল স্ক্রিনে মিসর আর উত্তর আফ্রিকার বেশির ভাগ অংশের মানচিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে বেশ কয়েকটা সমান্তরাল দাগ টানা। সব দেশের ভেতর দিয়েই দাগটা গিয়েছে। প্রতিটা দাগের পাশে চাপ, প্রবাহমাত্রা, আয়তন সব উঠে আছে। সব লাইনের পাশেই ছোট্ট ছোট্ট সবুজ পতাকা জ্বলছে নিভছে। দেখে সন্তুষ্ট হলো সাকির।
তারপর সে ঢুকলো কনফারেন্স রুমে। রুমটা যে কোনো আকাশচুম্বী ভবনের ওপর বানানো কর্পোরেট অফিস টাওয়ারকে হারিয়ে দিতে পারবে। রুমের মাঝখানে একটা সেগুন কাঠের টেবিল। চারপাশ ঘিরে আছে মখমলে মোড়া চেয়ার। সেগুলোতে বসে আছে হোকা সাইজের কয়েকজন মানুষ। দেয়ালের স্ক্রিনে ওসাইরিসের লোগো ঝুলছে।’
সাকির টেবিলের মাথায় একটা চেয়ারে বসলো, তারপর বাকিদেরকে এক নজর দেখলো ভালো করে। পাঁচজন মিসরীয়, তিনজন লিবিয়ান, দুজন আছে আলজেরিয়ান, আর সুদান আর তিউনিসিয়ার প্রতিনিধি আছে একজন করে। মাত্র কয়েক বছরেই সাকির ওসাইরিসকে শূন্য থেকে এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ আন্ত র্জাতিক সংস্থায় রূপায়িত করেছে। সাফল্যের জন্যে কয়েকটা জিনিস লাগে : পরিশ্রম, ধূর্ততা, যোগাযোগ আর অবশ্যই টাকা। অন্য লোকের টাকা।
সাকির আর ওর সিক্রেট সার্ভিসের সাঙ্গাত্র প্রথম তিনটা জিনিসের যোগান দিয়েছে, আর শেষেরটার যোগান দিয়েছে এই লোকগুলো। এরা সবাই প্রচণ্ড ধনী এবং একসময় অনেক ক্ষমতাবানও ছিল। ছিল। কারণ আরব বসন্তে সাকির-এর চেয়েও এরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত তিউনিসিয়ায়। সেখানে এক গরিব হকার পুলিশ কর্তৃক বছরের পর বছর নিগৃহীত হওয়ার পর একদিন সহ্য করতে না পেরে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
কেউ হয়তো বিশ্বাসই করবে না যে এই ঘটনার এতো বড় প্রভাব পড়বে। এরকম কত জনই তো প্রতিদিন পুড়ে বা গুলি খেয়ে মরছে। কিন্তু দেখা গেল লোকটা শুধু নিজের গায়েই আগুন ধরায়নি, পুরো আরব বিশ্বের গায়েই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। প্রায় অর্ধেক আরব জ্বালিয়ে তারপরেই থেমেছে ওটা।
প্রথমেই পতন হয় তিউনিসিয়ার। আর ওখানকার শাসকরা পালিয়ে যায় সৌদি-আরবে। এরপর শুরু হয় আলজেরিয়ায়। তারপর আগুন ছড়িয়ে পড়ে লিবিয়ায়। মুয়াম্মার গাদ্দাফি সেখানে ৪২ বছর ধরে কঠিন হাতে শাসন করে আসছিলেন। তার কাছের লোকজন সবাই তেল বেচে কোটিপতি হয়ে গিয়েছিল। গৃহযুদ্ধ বাধার পরে আর তারা জীবন বাঁচাতে পারেনি। তবে বুদ্ধি করে অনেকেই আগে আগে টাকা আর পরিবার পরিজনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তারা বেঁচে গেছে। তবে তারপরও দেশ না ছেড়ে পারেনি। কিছুদিনের মধ্যেই তারা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে।
এরপরে মিসর হয়ে জাগরণের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেন, সিরিয়া আর বাহরাইনে। আর এই বিশাল অগ্নিকুন্ত্রে সূচনা হয়েছিল এই সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকে।
