সবাই ফিনিশিং লাইন পার হলে সাকির একটা ঘোষণা দিল,
“তোমরা সবাই বিজয়ী। এ থেকে একটা শিক্ষা কিন্তু সবাই পেয়েছে, তা হলো কখনো হাল ছাড়া যাবে না। তোমাকে যে কোনো মূল্যে জিততে হবে। এক্ষেত্রে দয়ামায়া দেখালে চলবে না।”
“বাকিদের কী হবে?” হাসান জিজ্ঞেস করল।
সাকির ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ। দুজন ড্রাইভার তখনো বালিয়াড়িতে রয়ে গেছে। আছাড় খাওয়ার পর তারা আর উঠে দৌড়ায়নি। আর সেই ভচকে যাওয়া গাড়ি দুটোর ড্রাইভারেরাও বাকি আছে।
“ওদেরকে হটিয়ে সবচে কাছের চেকপয়েন্টে নিয়ে যাও।”
“হাঁটিয়ে? সবচে কাছেরটাও এখান থেকে তিরিশ মাইল।” অবাক হয়ে বলল হাসান।
“সেক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি রওনা দিলেই ভালো হবে।”
“এখান থেকে চেক পয়েন্ট পর্যন্ত বালি বাদে আর কিছু নেই। এরাতো সবাই মারা পড়বে।” হাসান বলল।
“গেলে যাক। তবে যদি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়, তাহলে তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাবে আর তখনই আমি ভেবে দেখবো ওদেরকে দলে নেয়া যায় কি-না।”
হাসান হলো সাকিরের ঘনিষ্ঠতম সহচর। সিক্রেট সার্ভিসে চাকরির সময় থেকেই দুজনের সখ্যতা। মাঝে মাঝে হঠাৎ তাই সাকির হাসানের পরামর্শ কানে তোলে কিন্তু আজ না, “যা বলেছি করো।”
হাসান রেডিও তুলে কথাটা জানিয়ে দিল। সাকিরের কালো পোশাক পরা একদল সৈন্যকে দায়িত্ব দেয়া হলো ঐ চারজনকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এতোক্ষণ পরে চার নম্বর ড্রাইভার তার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ফিনিশিং লাইনের দিকে এগুলো।
হাসান ওকে পানি দিতে গেল কিন্তু সাকির বাধা দিলো, “না, ওকেও হাঁটতে হবে।”
“কিন্তু ওতো জিতেই গিয়েছিল,” হাসান আপত্তি করল।
“হ্যাঁ, আর সে ফিনিশিং লাইনের এতো কাছে থেকেও হাল ছেড়ে দিয়েছে। আমার কোনো লোকের এমন স্বভাব আমি বরদাশত করবো না। ও বাকিদের সাথে হেঁটে যাবে। আমি যদি খবর পাই যে, কেউ একে সাহায্য করেছে। তাহলে ঐ লোকের উচিত হবে আত্মহত্যা করা নাহলে আমি এমন সাজা দেবো, যা হবে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর।”
চার নম্বর ড্রাইভার অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সাকিরের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু ওর দৃষ্টিতে ভয় নেই। কেমন অবজ্ঞা।
সাকিরও ওর দৃষ্টির রাগটাকে পছন্দ করল। একবার তো ভেবেই বসলো যে শাস্তি মওকুফ করে দেবে। পরমুহূর্তেই আবার সিদ্ধান্তে ফিরে এসে বলল,
“হাটা শুরু করো।”
চার নম্বর হাসানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা এগিয়ে হাঁটা শুরু করলো। একটা কথাও বলল না বা একবার ফিরেও তাকাল না।
লোকটা হাঁটা শুরু করতেই একজন এসে সাকিরকে একটা সরকারি ঘোষণা পত্র ধরিয়ে দিল। সেটা পড়ে সাকির স্বগোক্তি করল, “খবর তো খারাপ।”
“কি হয়েছে?” হাসান জিজ্ঞেস করল।
“আম্মন তা মারা গেছে। দুজন আমেরিকান নাকি ওকে মেরেছে। ইতালিয়ান ডাক্তারের কাছে যেতেও পারেনি।”
“আমেরিকান?”
সাকির মাথা ঝাঁকালো, “NUMA” নামের একটা সংস্থার সদস্য।
“NUMA!” হাসানও নামটা একবার বলল।
দুজনেই নামটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উচ্চারণ করল। সিক্রেট সার্ভিসে থাকার সময় এই সংস্থা সম্পর্কে নানান গুজব ওরা শুনেছে। ওরা হচ্ছে সমুদ্রবিদ বা এই ধরনের কিছু একটা।
“ব্যাপারটা তো ভালো মনে হচ্ছে না, এরা তো CIA-র চেয়েও খারাপ।” হাসান-ই বলল আবার।
সাকির মাথা ঝাঁকালো, “যদূর মনে পড়ে NUMA-র একজন সদস্য-ই কয়েক বছর আগে আপ্যান বাধ ধসে পড়া আটকিয়ে মিসরের মস্ত উপকার করেছিল।
“তখন তো আমরা সবাই একই দলে ছিলাম। ওরা কি কিছু বের করতে পেরেছে?”
সাকির আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা নাড়লো।” জাহাজ বা আম্মন তা কোনো কিছুতেই ওরা কোনো কিছুর হদিস পাবে না দিয়ে আমাদের সন্দেহ করতে পারে।”
“হ্যাগেনের কি অবস্থা? আম্মন তার তো ওর কাছেই ব্লাক মিস্ট ডেলিভারি দেয়ার কথা ছিল। পরে ইউরোপের কিছু সরকারের সাথে ওটা দিয়ে বোঝাঁপড়া করা যেতো।”
সাকির তখনও কাগজটা পড়ছে, “হ্যাগেন পালিয়ে মাল্টা চলে গেছে। ও নিলামের আগেই আরো একবার পুরাকীর্তিটা কেনার চেষ্টা করবে। যদি না পারে তো চুরি করবে। দুদিনের মধ্যেই বিস্তারিত জানাবে বলেছে।
“একমাত্র হ্যাগেন-ই আমাদের কথা জানে। ওকে এখুনি সরিয়ে দেয়া দরকার।”
“হ্যাঁ, তবে আগে পুরাকীর্তিগুলো জোগাড় করুক। আমি ঐ শিলালিপি দুটো হয় আমার হাতের মুঠোয় চাই নাহলে ধ্বংস করে দিতে চাই যাতে আর কেউ ওটা আবার জোড়া দিতে না পারে।”
“আসলেই কি জিনিসটার গুরুত্ব আছে? আমরা তো জানিও না যে ওটায় কি আছে।” হাসান বলল।
হাসানের এতো বেশি প্রশ্নে সাকির বিরক্ত হয়ে গেল, রাগতস্বরে বলল, “আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমরা ইউরোপের সব নেতাদের এমনভাবে ঘুম পাড়িয়ে দেবো যে কোনো রকম প্রতিক্রিয়া ছাড়াই এই মহাদেশের সব গুরুত্ব পূর্ণ অংশ আমরা দখল করে ফেলতে পারবো। যদি কেউ ঐ শিলালিপি থেকে কোনো প্রতিষেধক বানানোর সূত্র পেয়ে যায়–যদি কেউ ব্লাক মিস্ট এর প্রভাব নষ্ট করে দেয়ার উপায় বের করে ফেলে–তাহলে আমাদের পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। এই সহজ কথাটা তোমার মাথায় ঢোকে না কীভাবে?
“তা তো বুঝেছিই। কিন্তু ঐসব পুরাকীর্তিতেই যে প্রতিষেধক বানানোর সূত্র আছে এ তথ্য আপনি কোথায় পেলেন?” হাসানও পাল্টা জবাব দিল।
“কারণ নেপোলিয়নও এই জিনিসটাই খুঁজছিল। উনি এই ব্লক মিস্টের খবর শুনেছিলেন তখন “সিটি অফ ডেড”-এ লোক পাঠান খুঁজে দেখার জন্য। তারা যা যা পেয়েছিল সব ওখান থেকে নিয়ে যায়। এটা আমাদের ভাগ্য যে যেটুকু ছিল সেটুকু দিয়েই আমরা প্রতিষেধকটা বের করে ফেলতে পেরেছি। এটার মানে হলো বেশিরভাগ শিলালিপি-ই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের পর দাদাদের কাছ থেকে ইউরোপিয়ানরা চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। এখন আবার আমাদের বিরুদ্ধেই সেটাকে আমি ব্যবহার করতে দেবো না। যদি ঐ শিলালিপিগুলোয় প্রতিষেধকটা বের করার সামান্যতম কোনো সূত্র থেকে থাকে তা হলেও এগুলোকে ওদের হাতে পড়ার আগেই ধ্বংস করতে হবে। আর সেটা করা হয়ে গেলে হ্যাগেনকেও সরিয়ে দেয়া হবে।
