একজন গাড়ির সামনের ইঞ্জিনের হুড তুলে বোঝার চেষ্টা করল সমস্যাটা কি। আরেকজন সজোরে লাথি হাকালো নিজের গাড়ির গায়ে। দামি মার্সিডিজ SUv-এর গা ডেবে গেল খানিকটা। অন্যরাও হতাশ হয়ে একই কাজ করল। ক্লান্তি আর অবসন্নতায় তাদের বুদ্ধি লোপ পেয়েছে।
“ওরা হাল ছেড়ে দিচ্ছে।” সাকির বলল।
“সবাই না,” হাসান জবাব দিল।
একজন লোককে দেখা গেল সাকিরের মন মতো কাজ করছে। সে প্রথমে অন্যদের দিকে তাকাল তারপর সেখান থেকে বালিয়াড়ির মাথায় শেষ প্রান্তটা একবার পরখ করল তারপরই আচমকা দিল দৌড়।
লোকটা কি করতে চাচ্ছে সেটা বুঝতে বুঝতে বাকিদের কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল। সে দৌড়ে রেস শেষ করে পুরস্কার জিততে চায়। ফিনিশিং লাইন এখান থেকে মাত্র পাঁচশো গজ আর একবার বালিয়াড়ির মাথায় উঠতে পারলেই হবে, বাকিটা ঢালু রাস্তা।
অন্যরাও ঝেড়ে দৌড় দিল পিছু পিছু। কিছুক্ষণ পরই দেখা গেল পাঁচজন লোক পড়িমড়ি করে বালিয়াড়ি ভেঙে ছুটছে।
কিন্তু বালি বেয়ে ওঠার চেয়ে নামা আরো কঠিন। বাতাসে বাতাসে ধাক্কা খেয়ে বালিয়াড়ির ধারটা একেবারে খাড়া হয়ে গেছে। দুজন লোক সেটা বেয়ে নামার চেষ্টা করতেই মুখ থুবড়ে পড়ল, তারপর গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। একজন টের পেল যে পিছলে পিছলে নামলে আরো দ্রুত নামা যাবে। সে বালিয়াড়ির ধারে পৌঁছতেই লাফ দিল সামনে তারপর বুকে পিছল খেয়ে ষাট গজ মতো এগিয়ে গেল।
“যাক, শেষ পর্যন্ত একজন বিজয়ী পাওয়া যাবে তাহলে।” সাকির হাসানকে বলল। তারপর পাইলটকে বলল, “ফিনিশিং লাইনের কাছে নিয়ে চলো।”
হেলিকপ্টার আবারো ঘুরে নিচে নামতে শুরু করল। একটা বিশাল লম্বা রেখার দিকে এগুলো। রেখাটা মরুভূমিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। ওটার নাম “জানদ্রিয়ান পাইপ লাইন।” ওটার কাছেই একটা তেলের পাম্পকে ফিনিশিং লাইন হিসেবে ঠিক করা হয়েছে।
গ্যাজেলটা ওটার ঠিক পাশেই নামলো। মুহূর্তেই একটা ছোটখাটো ধূলি ঝড় উঠে গেল চারপাশে। সাকির ওর কান থেকে হেডসেট খুলে দরজা খুললো। তারপর মাথা নিচু করে সামনে বাড়লো। সামনেই হাসানের মতোই পোশাক পরা কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।
সাকির চাইলে অনায়াসে একজন মুভি স্টার হতে পারতো। লম্বা একহারা গড়ন। রোদে পোড়া চামড়া, ঘন বাদামি চুল আর চৌকো থুতনি। দেখে মনে হয় থুতনিতে উটের লাথি খেলেও কিছু হবে না। রোদে পোড়া মানুষদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হলে ওযে পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন মানবের খেতাব জিতবে তাতে সন্দেহ নেই। ওর চেহারা দেখেই বোঝা যায় দারুণ আত্মবিশ্বাসী ও। আর যদিও ও বাকি লোকগুলোর মতো একই পোশাক পরা, কিন্তু ওর আর ওদের মধ্যে তফাত বিস্তর। রাজা আর প্রজার মধ্যে তফাত যতটুকু ততটুকু।
বহুদিন ধরে সাকির মিসরীয় গোয়েন্দা পুলিশ বাহিনীর হয়ে কাজ করেছে। মোবারকের শাসনামলে সে ছিল এই বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড। দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়ে গেছে আর সমস্ত ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে একের পর এক। তারপর হোসনী মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হলো। লোকেরা এটাকে বলে “আরব বসন্ত।” দেশ জুড়ে শুরু হলো একের পর এক পরিবর্তন, ঘটনা দুর্ঘটনা। সাকির আর ওর মতোই আরো কয়েকজন আড়ালে থেকে কলকাঠি নেড়ে গেল। ওরা এখনো শিল্পপতির ছদ্মবেশে দেশের সকল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।
গোয়েন্দা পুলিশে কাজ করার সময় অর্জিত দক্ষতা দিয়ে সাকির একটা সংস্থা গড়ে তুলেছে। নাম ওসাইরিস। অল্প সময়েই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে সে। কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে এটার বিন্দুমাত্র নাম গন্ধ নেই এবং সম্মান এবং সুখ্যাতির সাথে ওসাইরিস কাজ করে যাচ্ছে। সাকিরের ধারণা যদি ঠিক হয় তাহলে অচিরেই ওসাইরিস শুধু মিসর না, বরং পুরো উত্তর-আফ্রিকাই নিয়ন্ত্রণ করবে।
আপাতত ওর মনোযোগ পুরো এই রেসের দিকে। মারাত্মক কষ্টকর এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল বিশ জনকে নিয়ে। একে অপরের সাথে লড়াই করে টিকে থাকবে একজন। তাকেই সাকির নিজের দলে নেবে। ইতোমধ্যে তার কয়েক ডজন তোক উত্তর-আফ্রিকা আর ইউরোপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু সফল হওয়ার জন্যে তার আরো লোকবল দরকার। নতুন নতুন, তরুণ উদ্যোমী লোক দরকার ওর, যারা আসলেই বুঝবে ওর সংগঠনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।
এদিকে বালিয়াড়িতে এক আর চার নাম্বার ড্রাইভারকে দেখা গেল অন্য তিনজনের চেয়ে এগিয়ে গিয়েছে। বালিয়াড়ি পেরিয়ে সমতলে আসতেই সবাই পাম্পটার দিকে ছুটলো। এক নম্বর ড্রাইভারই তখনো এগিয়ে। কিন্তু হাসানের ব্যক্তিগত পছন্দের চার নাম্বার ওকে প্রায় ধরেই ফেলেছে। মনে হচ্ছিলো শেষ পর্যন্ত হাসানের কথা-ই ঠিক হবে। কিন্তু চার নম্বর একটা মারাত্মক ভুল করে বসলো। সে আসলে এই প্রতিযোগিতার আসল ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। এখানে জেতার জন্য সবকিছু করা জায়েজ। এমনকি অন্যকে খুনও করা যাবে।
চার নম্বর এগিয়ে গেল, কিন্তু এগিয়ে যেতেই অন্য ড্রাইভারটা পেছন থেকে ওকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিল। লোকটা মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল আর পিছনের লোকটা ওর পিঠের ওপর পাড়া দিয়ে সামনে চলে গেল।
চার নম্বর আবার উঠতে উঠতে খেলা শেষ। এক নম্বর ড্রাইভার জিতে গিয়েছে। বাকিজনও ওকে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে চলে গেল কিন্তু সে তিক্ত মন নিয়ে সেখানেই বসে রইল।
