“আর এই প্রফেসরের মতো দেখতে লোকটা কে?”
“মাল্টা সামুদ্রিক যাদুঘরের কিউরেটর।”
“বুঝলাম না। যাদুঘরের কিউরেটররা কখনো সন্ত্রাসীদের সাথে হাত মিলিয়ে নার্ভ গ্যাস আমদানি করছে এমনটা কখনো শুনিনি। আপনি কি ওনার ব্যাপারে নিশ্চিত?”
“আমরা কোনো ব্যাপারেই নিশ্চিত না।” রেনাটা স্বীকার করল। শুধু এটুকু জানি যে হ্যাগেন লোকটার সাথে নিয়মিত দেখা করে আসছে। আর যাদুঘর থেকে একটা পুরাকীর্তি কেনার চেষ্টা করছে। জিনিসটা দুদিন পরেই একটা গালা পার্টিতে নিলামের জন্য ভোলা হবে।”
কার্টের ব্যাপারটা যুক্তিসঙ্গত লাগছে না, “প্রত্যেকেরই শখের কিছু ব্যাপার-স্যাপার থাকে। সন্ত্রাসী হোক আর যা-ই হোক।”
“কিন্তু প্রাচীন-পুরাকীর্তি সংগ্রহ হ্যাঁগেনের বাতিক না। তাকে এর আগে কখনোই এসবের প্রতি আগ্রহী দেখা যায়নি।”
“বুঝলাম। কিন্তু লোকটা নিশ্চয়ই এতটা বোকা না যে, এই ঘটনার পর আবার মাল্টায় গিয়ে উঠবে।” কার্ট বলল।
“আমিও সেটা ভেবেছিলাম। কিন্তু খবর পাওয়া গেছে কেউ একজন সম্প্রতি হ্যাঁগেনের অ্যাকাউন্টে দুই লাখ ইউরো জমা দিয়েছে। অ্যাকাউন্টটা খোলা হয়েছিল কিউরেটর লোকটার সাথে দেখা করার পরদিন। আর টাকা জমা হয়েছে ল্যাম্পেডুসার ঘটনাটা ঘটার কয়েক ঘণ্টা পর। ইন্টার পোল টাকা জমার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছে।”
এবার কার্টের কাছে ব্যাপারটা গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। ডা. হ্যাগেন বেঁচে আছে। আর ঘটনার পর সে ল্যাম্পেডুসা থেকে পালিয়ে গিয়েছে এবং মাল্টায় নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে ফেলেছে। কারণটা যা-ই হোক, পলাতক ডাক্তার যে মালটা সামুদ্রিক যাদুঘরের কিউরেটরের সাথে আরো একবার দেখা করবে সেটা নিশ্চিত।
রেনাটা ফাইলটা বন্ধ করে পায়ের ওপর পা তুলে বলল, “কথা হচ্ছে যে আপনি কি কষ্ট করে একবার মাল্টায় যাবেন ব্যাপারটা দেখতে?”
“দেখার চেয়েও বেশি কিছু করবো।” কার্ট কথা দিল।
রেনাটা খুশি হলো কথাটা শুনে। “আমি এখানকার সব রোগীর পর্যাপ্ত সেবার ব্যবস্থা করেই আপনার সাথে এসে দেখা করবো। একটা অনুরোধ, দয়া করে আমি আসার আগ পর্যন্ত কিছু করবেন না।”
কার্টের মুখেও এখন চওড়া হাসি, “শুধু দেখবো আর বলে যাবো, ওয়ান টু-র কাজ।”
ওরা দুজনেই জানে কার্ট মিথ্যে বলছে। হ্যাগেনকে পেলে কার্ট যে ছেড়ে দেবে না এটা নিশ্চিত। তাতে ঝামেলা যতই বাঁধুক না কেন।
.
১৩.
মিসরের হোয়াইট মরুভূমি, পিরামিডের সাত মাইল পশ্চিম
সকাল ১১ : ৩০ মিনিট
একটা ফ্রান্সে বানানো SA1342 গ্যাজেল হেলিকপ্টার মরুভূমির পাঁচশো ফুট ওপর দিয়ে উড়ে গেল। ওটার আওয়াজে মরুভূমির স্বাভাবিক নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে গেছে।
কপ্টারটা মরুভূমির ক্যামোফ্লেজে রঙ করা। মডেলটা অবশ্য পুরনো। এক সময় এটা মিসরীয় সেনাবাহিনীর ছিল। তাদের কাছ থেকে বর্তমান মালিক কিনে নিয়েছে।
মরুভূমির সবচে উঁচু বালিয়াড়িটা পার হতেই ওটা গতি কমিয়ে দিক পরিবর্তন করল। হঠাৎ বাক পরিবর্তনের কারণেই দূরের মরুভূমির মধ্য দিয়ে ধেয়ে আসা গাড়ির বহরটা তারিক সাকির-এর চোখে পড়ল। গাড়ি মোট সাতটা কিন্তু চলছে পাঁচটা। বাকি দুটো একটা আরেকটার সাথে বাড়ি খেয়ে ভচকে গেছে। ফলে আর চলার ক্ষমতা নেই। দুটো বালিয়াড়ির মাঝে আটকে আছে।
সাকির ওর দামি সানগ্লাসটা খুলে চোখে একটা বাইনোকুলার ধরলো। “দুটো অলরেডি গেছে। উদ্ধার করতে লোক পাঠাও। বাকিগুলো ঠিক আছে।” পাশের আরেকজনকে বলল সাকির।
বাকি গাড়িগুলো বালিয়াড়ি পেরিয়ে আসছে। পিছনে টায়ারের লম্বা দাগ পড়ে আছে। বালিতে টায়ার ঠিকমত কামড় বসাতে না পারায় ইঞ্জিন মারাত্মকভাবে গো গো করছে।
একটা গাড়িকে দেখা গেল অন্যদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। সম্ভবত শক্ত কোনো বালির চাপড়ার খোঁজ পেয়েছে।
“চার নাম্বার। আগেই বলেছিলাম এই লোক নাছোড়বান্দা।” সাকিরের হেডফোনে কেউ বলল কথাটা।
সাকির হেলিকপ্টারের পেছনের কেবিনটার দিকে তাকাল। কালো রঙের সামরিক পোশাক পরা এক খাটো লোক বসা সেখানে। দাঁত বের করে হাসছে।
“এখনই এতো নিশ্চিত হয়ো না হাসান। শুধু গতি বেশি হলেই সবসময় রেস জেতা যায় না।” ভর্ৎসনার সুরে বলল সাকির।
তারপর রেডিওর সুইচটা টিপে বলল, “সময় হয়েছে। পিছনেরগুলোকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দাও তারপর সবটাকেই বন্ধ করে দাও। দেখি কার কত সাহস।”
কলটা রিসিভ করল গাড়িগুলোর ঠিক পেছনেই আসতে থাকা একটা গাড়ি। কথা শুনেই গাড়িতে বসা টেকনিশয়ান তার ল্যাপটপে দ্রুত কয়েকটা বোতাম টিপে ENTER চাপলো।
সাথে সাথে সবার সামনে থাকা SUv-টার ইঞ্জিন থেকে ধোঁয়া বেরুনো শুরু হলো। কয়েকবার বালিতে ঝাঁকি খেয়ে থেমে গেল পুরোপুরি। অন্যরা পিছন থেকে দেখে একপাশে সরে গেল তারপর ওটাকে পাশ কাটিয়ে বালিয়াড়ির অপর পাশ দিয়ে ছুটলো, এটাই শেষ বালিয়াড়ি। এটার পরেই ফিনিশিং লাইন। গত কয়েক মাস ধরে চলা কঠিন কঠিন সব পরীক্ষার এটাই শেষ ধাপ। পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই সাকিরের দলের উচ্চপদ লাভ করবে।
“এটা কিন্তু দুই নম্বুরী।” পিছন থেকে হাসান চেঁচালো।
“জীবনটাই একটা দুই নম্বুরী।” “আমি শুধু একটু বাটপারি করলাম। এখন দেখা যাবে কে আসলেই উপযুক্ত, কার বুকের পাটা কত চওড়া।”
বাকি গাড়িগুলোও দেখা গেল একইভাবে বন্ধ হয়ে গেল। আর কিছুক্ষণ আগেই যেখানে ইঞ্জিনের গো গো আর টায়ার বালির ঘর্ষণের শব্দে ভরা ছিল, সেটাই এখন ধুপধাপ বন্ধ দরজা, গালাগাল আর অভিসম্পাতে ভরে গেল। ড্রাইভারগুলো সবার-ই ঘামে ভিজে গোসল হয়ে গেছে; গায়ে রঙচঙে পোশাক। দেখে মনে হচ্ছে মাত্র যুদ্ধ থেকে ফিরেছে, বা নরকের দুয়ার থেকে ঘুরে এসেছে। হঠাৎ গাড়িগুলোর এহেন আচরণে সবাই হতবুদ্ধি হয়ে গেছে।
