কথাগুলোর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পুরো এক মিনিট সময় নিল অতিথিরা। গোটা ব্যাপারটা কল্পনায় ধারণা করা কঠিন বলেই মনে হলো। পুরোপুরি রোবোটিক সেনাবাহিনীর ধারণা আগেও অনেক সময় বিশেষজ্ঞদের মাথায় এসেছে, কিন্তু কোনো রাষ্ট্রই সেরকম একটা সেনাবাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করে নি। জাপান কি তার ব্যতিক্রম? হিদেকি সুমা কি মিথ্যে গর্ব করছে, নাকি সব সত্যি?
একা শুধু অ্যাল জিওর্দিনোকে নিরুদ্বিগ্ন দেখালো।
আমরা বিশ্বাস করি ঈশ্বরের আশীর্বাদস্বরূপ সমস্ত বস্তুই একটা করে আত্মা পেয়েছে, এমন কি যে-কোনো জড় পদার্থও। এদিক থেকে পশ্চিমাদের চেয়ে এগিয়ে আছি আমরা। আমাদের হাতিয়ারকে আমরা, তা সে ইন্ডাস্ট্রিয়াল টুলই হোক বা সামুরাই তলোয়ার, হিউম্যান হিসেবে শ্রদ্ধা ও পবিত্র জ্ঞান করি। আমাদের, এমন কি, এমন মেশিনও আছে যেগুলো আমাদের অনেক কর্মীকে মেশিনের মতো আচরণ করতে শেখায়।
এ যেন নিজেদের লোককে বেকার করার চেষ্টা, মন্তব্য করল পিট।
এটা আসলে একটা সেকেলে ধারণা, ডার্ক, জবাব দিল সুমা, হাতের আইভরি জোড়া টেবিলের ওপর টুকল। জাপানে মানুষ ও মেশিন ঘনিষ্ঠ একটা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। নতুন শতাব্দীর শুরুতে এক মিলিয়ন রোবটকে ব্যবহার করতে যাচ্ছি আমরা, যারা দশ মিলিয়ন মানুষের সমান কাজ করবে।
আর ওই দশ মিলিয়ন মানুষ? তারা কী করবে?
ওদেরকে আমরা আন্যান্য দেশে রফতানি করব, ঠিক যেভাবে জাপানে তৈরি অন্যান্য পণ্য রফতানি করি, শান্ত গলায় বলল হিদেকি সুমা। নতুন দেশে শিকড় গাড়বে তারা, আইন মেনে চলবে, যদিও তাদের আনুগত্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরিই বজায় থাকবে জাপানের সাথে।
সান ডিয়াগোয় এরকম একটা ব্যাপার লক্ষ আর্কিটেক্ট থেকে শুরু করে শ্রমিক পর্যন্ত সবাই ছিল জাপানি, বিল্ডিং তৈরির সাজ-সরঞ্জামও জাপান সরকার সরবরাহ করে, জাপানি জাহাজে করে।
কাঁধ ঝাঁকাল সুমা, তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে। অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো নিয়মনীতি নেই। থামল সে, হাত-ইশারায় রোবট দুটোকে দেখালো। গুড়, পরবর্তী কোর্স এসে গেছে।
কাঠের ট্রেতে করে খোসা না ছাড়ানো এপ্রিকট পরিবেশন করা হলো, পাশে পাইন গাছের কাটা। তার সঙ্গে রয়েছে পাহাড়ের মতো উঁচু শুক্তি। একটু পরই পরিবেশন করা হলো ফ্লাওয়ার সুপ_স্বচ্ছ, একটি মাত্র অর্কিড ভাসছে প্রতিটি বড় আকারের পেয়ালায়।
লরেন ভাবল, ডিনারের অর্ধেকটা বোধহয় পরিবেশন করা হয়ে গেছে। আসলে সবেমাত্র শুরু হয়েছে। সুস্বাদু ডিশগুলো একের পর এক স্রোতের মতো আসতে থাকল। সিসে, সস-এর সঙ্গে ডুমুর, পুদিনা দিয়ে রান্না করা ভাত, ডিমের কুসুম দিয়ে বানানো আরেক প্রস্থ সুপ, নিখুঁতভাবে ছাল ছাড়ানো সামুদ্রিক বানমাছ, ব্যাঙের ছাতার সাথে ডিম ভরা সামুদ্রিক শামুক, সামুদ্রিক গুল্ম ও আগাছ দিয়ে মোড়া বহুরঙা কোলাজের মতো দেখতে বিভিন্ন ধরনের মাছ সূক্ষ্মভাবে কাটা ঝিনুকের সাথে জলপদ্মের শিকড় শসাসহ তরিতরকারির শীষ। তারপর আবার সুপ দেওয়া হলো, চাল তরিতরকারি ও সিসেম দিয়ে তৈরি। সবেশেষে পরিবেশিত হলো ফল ও চা।
ফাঁসির আসামীদের জন্যে শেষ ভুরিভোজ? জানতে চাইলেন সিনেটর ডিয়াজ।
মোটেই না, অমায়িক হেসে বলল হিদেকি সুমা। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার প্রাইভেট জেটে চড়ে ওয়াশিংটনে ফিরে যাচ্ছেন আপনারা আপনি ও মিস লরেন।
এখুনি নয় কেন?
কারণ আমার উচ্চাশা, লক্ষ্য গন্তব্য সম্পর্কে আপনাদের একা ধারণা দিতে চাই আমি। আমি নিজে আপনাদেরকে ড্রাগন সেন্টারটা ঘুরিয়ে দেখাব, তাহলে বুঝতে পারবেন নতুন জাপানের শক্তির উৎসটা কী রকম।
ড্রাগন সেন্টার মানে?
নিউক্লিয়ার গাড়ি-বোমা সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন না, সিনেটর? জিজ্ঞেস করল পিট। ওরা ওগুলো এরই মধ্যে অনেক দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।
হাঁ হয়ে গেলেন সিনেটর। গাড়ি-বোমা? নিউক্লিয়ার গাড়ি-বোমা? মানে?
মি. সুমার নীল নকশা, বড় ভাইদের সাথে বাজাবাজি করতে চান। ড্রাগন সেন্টারের বাকি কাজ শেষ হলেই বোতামে চাপ দিয়ে গাড়িবোমাগুলো ফাটিয়ে নিতে পারবেন তিনি। গাড়িগুলো রোবট চালায়, প্রতিটি গাড়িতে একটা করে অ্যাটম বোমা আছে।
চোখ দুটো বিস্ফারিত, একটা ঢোঁক গিলে লরেন বলল, সত্যি? জাপান গোপনে আটম বোমা বানিয়েছে?
ইঙ্গিতে সুমাকে দেখালো পিট। ওঁকে জিজ্ঞেস করছ না কেন?
পিটের দিকে তাকিয়ে আছে সুমা, একটা সাপের দিকে বেজি যেভাবে তাকায়। আপনি খুব জেদি মানুষ, ডার্ক। অত্যন্ত বুদ্ধিমান। শুনলাম গাড়ির কোথায় বোমাগুলো রেখেছি তা নাকি আপনিই মার্কিন সরকার ও ইন্টেলিজেন্সকে জানিয়েছেন।
এয়ারকন্ডিশনারের কমপ্রেসর-এর বোমা লুকিয়ে রাখার বুদ্ধিটা যার মাথা থেকেই বেরুক, তার প্রশংসা না করে পারা যায় না, বলল পিট। দুর্ঘটনাবশত অটো ট্রান্সপোর্ট শিপে প্রথমে একটা বোমা না ফাটলে আপনার অপারেশন অবশ্যই সফল হতে, কেউ আপনাকে ঠেকাতে পারত না।
লরেন হতভম্ব ভাটা কাটিয়ে উঠতে পারছে না, জানতে চাইল, এ থেকে কী পাবার আশা করেন আপনি?
গত তিনশো বছর ধরে ঘৃণ্য ওরিয়েন্টাল জাতি হিসেবে অবজ্ঞা করা হয়েছে জাপানিদের, বলল সুমা। শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে আমাদের উন্নতি পশ্চিমা জগৎ সহ্য করতে পারছে না। পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই সময়। কেইটেন প্রজেক্টের উদ্দেশ্যে হলো, আত্মরক্ষার জন্যে জাপানকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো।
