প্লীজ, বসুন, সিনেটর। শান্ত হোন, ঠাণ্ডা সুরে বলল সুমা। আপনাদের কালচারের অনেক খারাপ দিকের এটা একটা, ধৈর্য হারানো। সে জন্যেই আমাদের কালচার আপনাদের তুলনায় এতো উন্নত।
আপনি একটা ভুত, গাল দিলেন সিনেটর, রাগে কাঁপছেন। ভূতের আবার কালচার কি?
মনে মনে হিদেকি সুমার প্রশংসা না করে পারল না পিট। তার চেহারায় রাগ বা উত্তেজনার চিহ্নমাত্র নেই। দৃষ্টি দেখে মনে হলো, সিনেটরকে সে অবোধ শিশু বলে মনে করছে।
ঘৃণা দেখতে হলে তাকাতে হবে কামাতোরির দিকে। শরীরের পাশে হাত দুটো মুঠো করে রেখেছে সে, বাহু পর্যন্ত কাঁপছে রাগে। দেখে মনে হলো পাগলা একটা শেয়াল, লাফ দেয়ার জন্যে তৈরি হয়ে আছে।
কামাতোরি যে বিপজ্জনক খুনী, প্রথমবার তাকে দেখেই বুঝে নিয়েছে পিট। টেবিলের দিকে শান্ত পায়ে এগোল ও, ট্রে থেকে জিন ভর্তি একটা গ্লাস তুলে নিল। ফিরে এসে দাঁড়াল কামাতোরি আর সিনেটরের মাঝখানে। কাজ হলো তাতে। সিনেটরকে দেখতে না পেয়ে পিটের দিকে তাকিয়ে থাকল কামাতোরি, সমস্ত রাগ ওর ওপর পড়ল তার। ঠিক এ সময় দুই হাঁটুর মাঝখানে হাত দুটো রেখে মাথা নত করল তোশি, ঘোষণা করল, ডিনার রেডি।
ডিনারের পর আলোচনায় বসব আমরা, বলল সুমা।
টেবিলে সবার শেষে বসল পিট ও কামাতোরি। পরস্পরের দিকে এখনো ওরা নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন দুজন বক্সার পরস্পরের ওজন নিচ্ছে লড়াই শুরুর আগে। কামাতেরির কপাল লালচে হয়ে আছে, থমথম করছে চেহারা। ঠোঁটে হিংস্র হাসি ফুটিয়ে তুলে তাকে আরো খেপিয়ে তুলছে পিট।
একটা কথা দুজনেই জানে। তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি, একজন আরেকজনকে খুন করবে ওরা।
.
৪৭.
এটা আসলে প্রাচীন জাপানি রন্ধন শিল্পের নাটকীয় একটা ধরণ। সমতল কাঠের তক্তার ওপর পড়ে রয়েছে বড় একটা টুনি মাছ, দেখেই চিনতে পারল পিট। ওস্তাদ শিকিবোচো-র সাথে পরিচয় করিয়ে দিল হিদেকি সুমা। তক্তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল লোকটা, পরে আছে সিল্ক ব্রোকেড়ে তৈরি পোশাক, মাথায় মানার আকৃতির টুপি। ইস্পাতের চপস্টিক ও কাঠের হাতল সহ লম্বা ছুরি নিয়ে কিছুক্ষণ খেলা কসরৎ দেখালো সে, বলা যায় মাছ কাটার পাঁয়তারা কষছে বা প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কর্তন পর্বটা দর্শনীয় বটে। লোকটার হাত দুটো এতো দ্রুত নড়ে উঠল যে ঝাপসা লাগল চোখে নড়াচড়াটা চোখ দিয়ে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। চোখের পলকে মাছটাকে নির্দিষ্ট কয়েকটা টুকরোয় ভাগ করল সে। রীতি, অনুসারে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে মাথা নোয়াল, তারপর বেরিয়ে গেল ডাইনিং রুম থেকে।
ওই কি আপনার শেফ? জানতে চাইল কংগ্রেস সদস্য লরেন স্মিথ।
মাথা নাড়ল হিদেকি সুমা। ও শুধু মাছ কাটা অনুষ্ঠানের প্রধান। সী ফুড সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আমার অন্যতম একজন শেফ এখন মাছটাকে নতুন করে সাজাবে, পরিবেশন করা হবে হজমি হিসেবে।
আপনার কিচেনে তাহলে একাধিক শেফ রয়েছে?
তিনজন। একজন ফিশ ডিশ সম্পর্কে এক্সপার্ট। মাংস ও তরি-তরকারির জন্যে আলাদা একজন শেফ। আরেকজন শুধু মেধা খাটায় সুপের পেছনে।
মাছ পরিবেশেনের আগে গরম নোতা চা দেয়া হলো, সঙ্গে মচমচে মিষ্টি বিস্কিট। লেবুর গরম রসে ভেজা তোয়ালে এলো হাত ধোয়ার জন্যে, ধোয়া উঠছে এখনো। এরপর কিচেন থেকে ফিরিয়ে আনা হলো মাছ, টুকরোগুলো প্রতিটি যার যার জায়গামতো রয়েছে, খাওয়া হলো হজমি হিসেবে কাঁচা।
কাঠি দিয়ে খেতে হিমশিম খাচ্ছে অ্যাল ও সিনেটর ডিয়াজ, লক্ষ করে কৌতুক অনুভব করল সুমা। তবে জোড়া আইভরির সাহায্যে খাবারগুলো দ্রুত মুখে পুরছে পিট ও লরেন, দেখে কিছুটা বিস্মিতও হলো সে।
প্রতিটি কোর্স পরিবেশন করল এক জোড়া রোবট। ওদের লম্বা হাত আশ্চর্য দ্রুত টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল ডিশগুলো। এক কণা খাবার খসে পড়ল না, টেবিলে ডিশগুলো রাখার সময় কোনো শব্দ হলো না। কথা বলল শুধু নির্দিষ্ট কোনো কোর্স শেষ হয়েছে কিনা জানার জন্যে।
যান্ত্রিক মানুষের ওপর আপনি দেখছি একটু বেশি নির্ভর করেন, সুমাকে বলল পিট।
আপনি বোধহয় জানেন না, জাপানে আমরা একটা রোবোটিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে যাচ্ছি। নাগোয়াতে আমার যে ফ্যাক্টরি আছে, ওটাই দুনিয়ার সবচেয়ে বড়। ওখানে কমিউটারাইজড, রোবোটিক মেশিনের সাহায্যে প্রতি বছর ২০ হাজার স্বয়ংসম্পূর্ণ রোবট তৈরি করছি আমরা।
একটা আর্মি আরেকটা আর্মি তৈরি করছে, বলল পিট।
নিজের অজ্ঞাতে আসল ব্যাপারটা ধরে ফেলেছেন আপনি, ডার্ক। এরই মধ্যে আমরা জাপানের রোবোটিক মিলিটারি ফোর্স গঠন করছি। আমার এঞ্জিনিয়াররা রক্ত-মাংসের ক্রু ছাড়া পুরোপুরি অটোম্যাটেড যুদ্ধজাহাজের ডিজাইন তৈরি করেছে, উৎপাদনের কাজও শুরু হয়ে গেছে। প্লেনের ব্যাপারেও একই কথা, একই কথা ট্যাংক সম্পর্কে এ-সবই পরিচালিত হবে রোবটদের দ্বারা, রোবটগুলো পরিচালিত হবে রিমোট কন্ট্রোলে। শুনে হয়তো আশ্চর্য হবেন, যুদ্ধ করার জন্যে সৈনিক বোটও তৈরি করেছি আমরা। ওগুলো আর্মারড মেশিন, শক্তিশালী অস্ত্রে সজ্জিত, এক লাফে পঞ্চাশ মিটার পেরিয়ে যেতে পারে, ঘণ্টায় ছুটতে পারে ষাট কিলোমিটার।
ওগুলো সহজেই মেরামত করা যায়। দশ বছরের মধ্যে পৃথিবীর কোনো সেনাবাহিনী আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না। জাপান ছাড়া বাকি সবাই যুদ্ধ। করে প্রাণ হারাবে, আহত হবে, কিন্তু বড় মাপের যে-কোনো যুদ্ধে একজন জাপানিকেও আমরা হারাব না।
