ট্রেজার

০১. আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার

ট্রেজার – ক্লাইভ কাসলার
অনুবাদ : মখদুম আহমেদ

লেখকের বক্তব্য

আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব সত্যিই ছিল। যুদ্ধ এবং ধর্মীয় হানাহানির কারণে তা ধ্বংস না হলে প্রাচীন মিসর, গ্রিক এবং রোমান সাম্রাজ্যের বহু তথ্য আজ আমাদের জানা থাকত। শুধু তা-ই নয়, ভূমধ্যসাগরের তীর ছাড়িয়ে বহু দূরে একসময়ে প্রতিষ্ঠিত অনেক অজানা সভ্যতার কথাও জানা যেত। তিনশো একানব্বই খ্রিস্টাব্দে সম্রাট থিওড়োসিয়াস-এর নির্দেশে আলেকজান্দ্রিয়ার সমস্ত পুস্তক, শিল্পকর্ম, মহান গ্রিক দার্শনিকদের মূল্যবান বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কথিত আছে, বেশ কিছু পরিমাণ সংগ্রহ গোপনে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল তখন। কী কী উপকরণ সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, রাখাই বা হয়েছে কোথায়; আজ ষোলোশো শতাব্দী পরেও তা এক রহস্য।

.

.

পূর্বকথা

পনেরোই জুলাই, তিনশো একানব্বই খ্রিস্টাব্দ।
অজানা কোনো স্থান।

গভীর কালো সুড়ঙ্গপথে ছোট্ট, কাঁপা কাঁপা একটা আলো ভুতুড়ে আবহ তৈরি করেছে। লোকটার পরনে আঁটো জামা, উল দিয়ে বোনা, নেমে এসেছে হাঁটু পর্যন্ত। থামল সে, হাতের কুপিটা মাথার ওপর উঁচু করে ধরল। ছোট্ট শিখার আভায় আলোকিত হয়ে উঠল মানুষের একটা দেহ, স্বর্ণ আর স্ফটিকের তৈরি একটা বাক্সের ভেতর রয়েছে ওটা। পেছনের মসৃণ দেয়ালে নৃত্য করছে কিম্ভুতকিমাকার ছায়াগুলো। আঁটো জামা পরা জুনিয়াস ভেনাটর দৃষ্টিহীন চোখজোড়ার দিকে কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর কুপি নামিয়ে আরেক দিকে ঘুরলেন।

দীর্ঘ এক সারিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিশ্চল মূর্তিগুলো যেন মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতার ভেতর; সংখ্যায় এত বেশি যে গুনে শেষ করা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।

হাঁটতে শুরু করলেন জুনিয়াস ভেনাটর, অমসৃণ মেঝেতে তার পায়ের ফিতে বাঁধা স্যান্ডেল খসখস আওয়াজ তুলল। ক্রমে চওড়া হয়ে বিশাল এক গ্যালারিতে মিশেছে। সুড়ঙ্গপথটা। গম্বুজ আকৃতির সিলিংটাকে অবলম্বন দেয়ার জন্য খিলান তৈরি করায় প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু গ্যালারি কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। খানিক পর পর দেয়ালের চুনাপাথর কেটে একটা করে লম্বা ও গভীর দাগ টানা হয়েছে, ওগুলো দিয়ে ছাদের পানি নেমে এসে মেঝের চওড়া নর্দমায় পড়ে। দেয়ালের গায়ে বিভিন্ন আকৃতির গর্ত প্রতিটিতে অদ্ভুতদর্শন, গোলাকৃতি পাত্র, ব্রোঞ্জের তৈরি। খোদাই করা বিশাল এই গুহার মাঝখানে একই আকৃতির বড় বড় কাঠের বাক্সগুলো না থাকলে ভীতিকর জায়গাটাকে রোমের নিচে পাতাল সমাধিক্ষেত্র বলে ভুল হতে পারত।

শেষ প্রান্তে তামার পাতে মোড়া ফিতে রয়েছে প্রতিটি বাক্সের সাথে, পাতগুলোয় বাক্সের নম্বর লেখা। প্যাপিরাস খুলে কাছাকাছি একটা টেবিলে সমান করলেন ভেনাটর, তাতে লেখা নম্বর তামার পাতে লেখা নম্বরের সাথে মেলালেন। বাতাস শুকনো আর ভারী, ঘামের সাথে ধুলো মিশে কাদার মতো জমছে গায়ে। দুঘন্টা পর সম্রষ্ট বোধ করলেন তিনি, প্রতিটি জিনিসের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্যাপিরাসটা গুটালেন, কোমরে জড়ানো কাপড়ের ভাঁজে ঢুকিয়ে রাখলেন সেটা।

ঘুরে ঘুরে গ্যালারির চারদিকে সাজানো সংগ্রহগুলোর দিকে আরেকবার তাকালেন ভেনাটর, অতৃপ্তির একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুকের ভেতর থেকে। জানেন, এসব আর কোনো দিন তার দেখা বা ছোঁয়ার সুযোগ হবে না। ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘুরলেন তিনি, হাতের কুপিটা বাড়িয়ে ধরে এগোলেন ফিরতি পথে।

বয়স হয়েছে ভেনাটরের, কিছুদিনের মধ্যে সাতষট্টিতে পড়বেন। মুখের অনেক ভাঁজ আর রেখা ফুটেছে, ক্লান্ত চরণে আগের সেই ক্ষিপ্রতা নেই, বেঁচে থাকার আনন্দ এখন আর তিনি তেমন উপভোগ করেন না। তবে অনেক দিন পর আজ তার সত্যি ভারি আনন্দ হচ্ছে, তৃপ্তি আর সন্তুষ্টির একটা অনুভূতি প্রাণশক্তির নতুন জোয়ার বইয়ে দিয়েছে তাঁর শরীরে। বিশাল একটা কর্মসূচি সাফল্যের সাথে শেষ করেছেন তিনি। কাঁধ থেকে নেমে গেছে গুরুদায়িত্ব। বাকি আছে শুধু দীর্ঘ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে রোমে ফিরে যাওয়া। কে জানে কী আছে ভাগ্যে, সমুদ্রযাত্রা নিরাপদ হবে কি না, তা শুধু নিয়তিই বলতে পারে।

আরও চারটে সুড়ঙ্গপথ ঘুরে পাহাড়ে বেরিয়ে এলেন ভেনাটর। ইতোমধ্যে একটা সুড়ঙ্গপথ পাথর ধসে বন্ধ হয়ে গেছে। ছাদ ধসে পড়ায় ওখানে বানোজন ক্রীতদাস পাথর চাপা পড়ে মারা গেছে। এখনও সেখানেই আছে তারা, চিড়েচ্যাপ্টা লাশগুলোর কবর হয়ে গেছে পাথরের তলায়। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলেন ভেনাটর। ওদের জন্য দুঃখ করা অযৌক্তিক মনে হলো তার। এখান থেকে ফিরে আবার তো সেই সম্রাটের খনিতেই কাজ করতে হতো ওদেরকে। আধপেটা খেয়ে, রোগ-শোকে ভুগে ধুকে ধুকে মরার চেয়ে এ বরং ভালোই হয়েছে। বেঁচে থাকাই ছিল ওদের জন্য অভিশাপ।

সুড়ঙ্গমুখটা এমনভাবে পাথর কেটে তৈরি যে বড় বাক্সগুলো ভেতরে ঢোকাতে কোনো অসুবিধা হয়নি। পাহাড়ে বেরিয়ে আসছেন ভেনাটর, এই সময় দূর থেকে একটা লোমহর্ষক আর্তচিৎকার ভেসে এল। কপালে উদ্বেগের রেখা নিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন তিনি, আলোয় বেরিয়ে এসে চোখ কোঁচকালেন। থমকে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পের দিকে তাকালেন তিনি, ঢালু একটা প্রান্তর জুড়ে সেটার বিস্মৃতি। অসভ্য কয়েকটা যুবতী মেয়েকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একদল রোমান সৈনিক। সম্পূর্ণ বিবস্ত্র একটা মেয়ে আবার চিৎকার করে উঠে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিল। সৈনিকদের পাঁচিল ভেঙে প্রায় বেরিয়ে এল সে, কিন্তু সৈনিকদের একজন তার লম্বা কালো চুল ধরে হ্যাঁচকা টান দিল, ধুলোর ওপর ছিটকে পড়ল মেয়েটা।

দৈত্যাকার এক লোক ভেনাটরকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল। ক্যাম্পের সবার চেয়ে লম্বা সে, বিশাল কাঁধ, আর শক্তিশালী বাহু, হাতের শেষ প্রান্ত ঝুলে আছে হাঁটুর কাছাকাছি।

গল জাতির লোক লাটিনিয়াস মাসার, ক্রীতদাসদের প্রধান ওভারশিয়ার সে। হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানাল ভেনাটরকে, কথা বলল অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ আর কর্কশ কণ্ঠে, সব দেখলেন?

মাথা ঝাঁকালেন ভেনাটর। হ্যাঁ, তালিকা মেলানো হয়েছে। সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করতে পারো।

ধরে নিন বন্ধ হয়েছে।

ক্যাম্পে কিসের হৈচৈ?

ঘাড় ফিরিয়ে সৈনিকদের দিকে একবার তাকাল মাসার, ঘন ভ্রু জোড়ার ভেতর তার লাল চোখ দপ করে জ্বলে উঠল যেন, একদলা থুথু ফেলে আবার তাকাল ভেনাটরের দিকে। তার কথা থেকে জানা গেল, বোকা সৈনিকরা অস্থির হয়ে পড়েছিল, এখান থেকে পাঁচ লীগ উত্তরের একটা গ্রামে হামলা চালিয়ে এইমাত্র ফিরে এসেছে। এই নির্মম রক্তপাতের কোনো মানে নেই। কম করেও চল্লিশজন অসভ্য মারা গেছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ছিল মাত্র দশজন, বাকি সবাই শিশু আর নারী। লাভ কিছুই হয়নি, কারণ সোনা আর অন্যান্য জিনিস, যা সৈনিকরা লুট করে এনেছে তার মূল্য গাধার বিষ্ঠার সমানও নয়। আর এনেছে কুৎসিত দর্শন কিছু মেয়ে লোক।

চেহারা কঠোর হয়ে উঠল ভেনাটরের। আর কেউ বেঁচে গেছে?

শুনলাম দু’জন পুরুষ নাকি জঙ্গলে পালিয়েছে।

তারা তাহলে অন্যান্য গ্রামে আওয়াজ দেবে। সর্বনাশ, সেভেরাস দেখছি মৌমাছির চাকে ঢিল ছুঁড়েছে!

সেভেরাস! ঘৃণায় কুঁচকে উঠল মাসারের ঠোঁটের কোণ। ওই ব্যাটা সেঞ্চুরিয়ন আর তার দল শুধু ঘুমোয় আর আমাদের মদ সাবাড় করে! পাছায় গরম লোহার হ্যাঁকা দিন, তবে যদি ওদের কুঁড়েমি দূর হয়।

ওরা আমাদের রক্ষা করবে, সেজন্যই ভাড়া করা হয়েছে, মনে করিয়ে দিলেন ভেনাটর।

কার হাত থেকে রক্ষা করবে? ব্যঙ্গের সুরে জিজ্ঞেস করল মাসার। ধর্মহীন বর্বরদের হাত থেকে, যারা পোকা আর সাপ-ব্যাঙ খায়?

ক্রীতদাসদের এক জায়গায় জড়ো করো, তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দাও সুড়ঙ্গমুখ। খুব সাবধান, মাসার, কাজে যেন কোনো খুঁত না থাকে। আমরা চলে যাবার পর অসভ্যরা যেন আবার খুঁড়তে না পারে।

সে ভয় করবেন না। যতটুকু দেখলাম, এই অভিশপ্ত দেশে এমন কেউ নেই যে ধাতুবিদ্যা জানে। মুখ তুলে সুড়ঙ্গপথের মাথার ওপর তাকাল মাসার, গাছের বিশাল কাণ্ড পাশাপাশি সাজিয়ে প্রকাণ্ড মাচা তৈরি করা হয়েছে, মাচার ওপর পাথর, বালি আর মাটির আকাশছোঁয়া স্তূপ। স্তূপটা হেলান দিয়ে রয়েছে পাহাড়ের গায়ে। মাচাটা সরিয়ে নেয়ার পর গোটা পাহাড় ধসে পড়বে, তখন যদি পাঁচশো হাতি থাকে নিচে, একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনার মহামূল্য শিল্পকর্ম চিরকাল অক্ষতই থাকবে, ভেনাটর।

নতুন করে আশ্বস্ত বোধ করলেন ভেনাটর। ওভারশিয়ারকে বিদায় করে দিয়ে রাগের সাথে ঘুরে দাঁড়ালেন, সেভেরাসের তাবুর দিকে যাচ্ছেন।

সামরিক বাহিনীর একটা প্রতীক চিহ্নকে পাশ কাটালেন ভেনাটর, বর্শার মাথায় একটা রুপালি ষড়। একজন প্রহরী বাধা দিতে এগিয়ে এল, এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিয়ে তাঁবুর ভেতর ঢুকলেন তিনি।

তাঁবুর ভেতর একটা ক্যাম্প-চেয়ারে বসে রয়েছে সেঞ্চুরিয়ান, কোলের ওপর নগ্ন অসভ্য নারী। জীবনে বোধ হয় কখনও গোসল করেনি মেয়েটা। সেভেরাসের দিকে মুখ তুলে দুর্বোধ্য কিচিরমিচির শব্দ করছে সে। বয়স নেহাতই কম, পনেরোর বেশি হবে না। সেভেরাসের গায়ে শুধু বুক ঢাকা আঁটো জামা। তার নগ্ন বাহু একজোড়া ব্রোঞ্জের তৈরি বন্ধনী দিয়ে অলংকৃত, দুই বাইসেপ কামড়ে আছে। একজন বীর যোদ্ধার পেশিবহুল বাহু, ঢাল আর তলোয়ার ধরায় যার রয়েছে দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা।

ভেনাটরের আকস্মিক আগমনে মুখ ফিরিয়ে তাকাবারও প্রয়োজন বোধ করল না সেভেরাস।

তাহলে এভাবেই তোমার সময় কাটছে, সেভেরাস? তিরস্কার করলেন ভেনাটর, তার কণ্ঠে শীতল ব্যঙ্গ। বিধর্মী একটা মেয়েকে নষ্ট করে ঈশ্বরের ক্রোধ অর্জন করছো?

কঠিন কালো চোখ ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ভেনাটরের দিকে তাকাল সেভেরাস। দিনটা আজ এত গরম যে আপনার খ্রিস্টীয় প্রলাপ শোনার ধৈর্য হবে না। আমার ঈশ্বর আপনার ঈশ্বরের চেয়ে অনেক বেশি সহনশীল।

সত্যি, কিন্তু তুমি মূর্তি পূজা করো।

যাকে যার খুশি পূজা করতে পারে, প্রশ্নটা একান্তই বাছাইয়ের। আপনি বা আমি, কেউই আমরা নিজেদের ঈশ্বরকে মুখোমুখি কখনও দেখিনি। কে বলবে কারটা খাঁটি?

যিশু হলেন প্রকৃত ঈশ্বরের সন্তান।

হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা দোলাল সেভেরাস। আপনি আমার ব্যক্তিগত সময় দখল করেছেন। সমস্যা কী, বলে বিদায় হোন।

তুমি যাতে বেচারি মেয়েটাকে নষ্ট করতে পারো?

জবাব না দিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল সেভেরাস। বুকে লেপ্টে থাকা মেয়েটাকে বস্তার মতো বিছানার ওপর ছুঁড়ে দিল সে। আমার সাথে যোগ দেয়ার ইচ্ছে আছে আপনার, ভেনাটর? থাকলে বলুন, আপনাকে প্রথম সুযোগ দেব।

সেঞ্চুরিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকলেন ভেনাটর। ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল তাঁর শরীরে। যে রোমান সেঞ্চুরিয়ন একটা পদাতিক বাহিনীকে নেতৃত্ব দেয় তাকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে, কিন্তু এ-লোক নির্দয় পশু। এখানে আমাদের কাজ শেষ হয়েছে, বললেন ভেনাটর। ক্রীতদাসদের নিয়ে সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করে দিচ্ছে মাসার। তাঁবু গুটিয়ে জাহাজে উঠতে পারি আমরা।

মিসর ছেড়েছি আজ এগারো মাস। আনন্দ-ফুর্তির জন্য আরেকটা দিন দেরি করলে কোনো ক্ষতি নেই।

আমরা লুটপাট করতে আসিনি। অসভ্যরা প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ খুঁজবে। আমরা মাত্র কজন, তারা অনেক।

আমাদের বিরুদ্ধে যত অসভ্যই পাঠানো হোক, আমার সৈনিকরা তাদের সামলাতে পারব।

তোমার লোকজন দুর্বল হয়ে পড়েছে।

রণকৌশল তারা ভুলে যায়নি, আত্মবিশ্বাসের হাসি নিয়ে বলল সেভেরাস।

কিন্তু তারা কি রোমের মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মত্যাগ করবে?

কোন দুঃখে, কেন? সাম্রাজ্যের সুদিন এসে আবার চলে গেছে। আমাদের এককালের তিলোত্তমা টাইবার আজ নোংরা বস্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের শিরায় যদি রোমান রক্ত থেকেও থাকে, তা খুবই কম। আমার বেশির ভাগ লোকজন প্রদেশগুলোর আদি বাসিন্দা। আমি একজন স্প্যানিয়ার্ড আর আপনি একজন গ্রিক, জুনিয়াস ভেনাটর। আজকের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এমন একজন সম্রাটের প্রতি আধপোয়া বিশ্বস্ততাও থাকবে কেন, যে সম্রাট বহুদূর পুবের একটা শহর থেকে শাসন করেন? এমনকি শহরটাকে আমরা কেউ দেখিনি পর্যন্ত। না, জুনিয়াস ভেনাটর, না আমার সৈনিকরা যুদ্ধ করবে, কারণ তারা পেশাদার যোদ্ধা, কারণ তাদেরকে যুদ্ধ করার জন্য ভাড়া করা হয়েছে।

কিংবা অসভ্যরা তাদেরকে বাধ্য করবে।

যখনকার সমস্যা তখন। সত্যি যদি অসভ্যদের দুর্মতি হয়…

সংঘর্ষ এড়ানো গেলে সব দিক থেকে ভালো। আমি সন্ধ্যা ঘনাবার আগেই রওনা হতে চাই…

বিকট শব্দে বাধা পেলেন ভেনাটর, পায়ের নিচে থরথর করে কেঁপে উঠল মাটি। এক ছুটে তাবু থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের ওপর দিকে তাকালেন তিনি। মাচার নিচ থেকে অবলম্বনগুলো সরিয়ে নিয়েছে ক্রীতদাসরা, বিশাল আকারে কয়েকশো টন পাথরসহ মাটি আর বালিতে ঢাকা পড়ে গেছে সুড়ঙ্গমুখ। ধুলোর প্রকাণ্ড মেঘ ক্ষীণস্রোত নালার ওপর ছড়িয়ে পড়ল। পতনের প্রতিধ্বনি এখনও শোনা যাচ্ছে, শব্দটাকে ছাপিয়ে উঠল সৈনিক আর ক্রীতদাসদের উল্লাসধ্বনি।

যিশুর কৃপায় কাজটা শেষ হলো, আপন মনে বিড়বিড় করলেন ভেনাটর, তাঁর প্রসন্ন চেহারা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল কী এক পবিত্র আলোয়। বহু শতকের জ্ঞান রক্ষা পেল।

তাঁবু থেকে বেরিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল সেভেরাস। দুঃখের বিষয়, কথাটা আমাদের সম্পর্কে খাটে না।

ঘাড় ফেরালেন ভেনাটর। নিরাপদে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যদি ঘরে ফিরতে পারি, তারপর আর ভয় কিসের?

শারীরিক নির্যাতন আর মৃত্যু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য, চাঁছাছোলা ভাষায় বলল সেভেরাস। আমরা সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। সহজে ক্ষমা করার পাত্র থিয়োডোসিয়াস নন! সাম্রাজ্যের কোথাও আমাদের লুকোবার জায়গা থাকবে না। উচিত কাজ হবে বিদেশে কোথাও আশ্রয় খুঁজে নেয়া।

আমার স্ত্রী আর মেয়ে…এনটিওচ-এর ভিলায় তাদের সাথে আমার দেখা হওয়ার কথা…

ধরে নিন ইতিমধ্যে তাদেরকে সম্রাটের লোকজন বেধে নিয়ে গেছে। হয় মারা গেছে, নয়তো ক্রীতদাস হিসেবে বেঁচে দেয়া হয়েছে।

অসম্ভব! সবেগে মাথা নাড়লেন ভেনাটর, দুচোখে অবিশ্বাস। উঁচু মহলে বন্ধু বান্ধব আছে আমার, আমি না ফেরা পর্যন্ত ওদেরকে তারা রক্ষা করবে।

এমনকি উঁচুমহলের বন্ধুদেরকেও ভয় দেখিয়ে কাবু করা যায়। ঘুষ দিয়ে দুর্বল করাও সম্ভব।

অকস্মাৎ কঠোর হয়ে উঠল ভেনাটরের চেহারা। আমরা যা অর্জন করেছি তার তুলনায় কোনো ত্যাগই বড় নয়। এখন শুধু দেখতে হবে আমরা যাতে অভিযানের রেকর্ড আর চার্ট নিয়ে ফিরতে পারি, তা না হলে সবই নিষ্ফল হয়ে যাবে।

জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল সেভেরাস, কিন্তু সে তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ডকে ছুটে আসতে দেখে চুপ করে থাকল। ঢাল বেয়ে তীরবেগে ছুটে আসছে যুবক নোরিকাস, দুপুরের রোদে চকচক করছে তার ঘামে ভেজা মুখ, হাপরের মতো, হাপাচ্ছে সে, বার বার দূরবর্তী নিচু পাহাড়গুলোর দিকে হাত তুলে কী যেন দেখাবার চেষ্টা করছে।

কপালে হাত তুলে রোদ ঠেকালেন ভেনাটর, পাহাড়শ্রেণীর দিকে তাকালেন। শক্ত কিছু নতুন রেখা ফুটল তাঁর মুখে।

অসভ্যরা, সেভেরাস! বদলা নেয়ার জন্য ছুটে আসছে তারা!

পাহাড়গুলো যেন পিঁপড়েতে ঢাকা পড়ে গেছে। কয়েক হাজার অসভ্য পুরুষ ও নারী ওপরে দাঁড়িয়ে তাদের দেশে অনুপ্রবেশকারী নিষ্ঠুর লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই তারা তীর-ধনুক সজ্জিত, হাতে চামড়ার ঢাল আর বর্শা-বর্শাগুলোর ডগা তীক্ষ্ণ করা হয়েছে কালো কাঁচের মতো আগ্নেয় শিলার টুকরো দিয়ে। কারও কারও হাতে কাঠের হাতলসহ পাথরের কুঠার। পুরুষদের পরনে শুধু কৌপীন। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সবাই, যেন কার ইঙ্গিতের অপেক্ষায়, ভাবলেশহীন, ঝড়ের পূর্ব মুহূর্তের মতো, ভীতিকর, থমথমে।

আরেক দল অসভ্য জড় হয়েছে জাহাজ আর আমাদের মাঝখানে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল নোরিকাস।

ঘাড় ফেরালেন ভেনাটর, চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তোমার বোকামির এই হলো ফল, সেভেরাস। রাগে কেঁপে গেল তার গলা। তুমি আমাদের সবাইকে খুন করলে। মাটিতে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা শুরু করলেন তিনি।

আপনার ঈশ্বরভক্তি অসভ্যদের ঘুম পাড়াতে পারবে না, শুরুদেব, ব্যঙ্গের সুরে বলল সেভেরাস। খেলা দেখাবে শুধুমাত্র তলোয়ার। নোরিকাসের দিকে ফিরে তার একটা বাহু আঁকড়ে ধরল সে, দ্রুত কয়েকটা নির্দেশ দিল, বাদককে বলল বাজনা বাজিয়ে সৈনিকদের জড় করুক। ক্রীতদাসদের হাতে অস্ত্র তুলে দিক লাটিনিয়াস মাসার। শক্ত চৌকো আকৃতি নেয়ার হুকুম দাও সৈনিকদের। নদীর দিকে আমরা ঝাক বেঁধে এগোব।

ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে স্যালুট করল নোরিকাস, ক্যাম্পের কেন্দ্র লক্ষ্য করে ছুটল।

ষাটজন সৈনিক দ্রুত ফাঁপা একটা চৌকো আকৃতি নিল। সিরিয়ান তীরন্দাজরা থাকল আকৃতিটার দুপাশে, সশস্ত্র ক্রীতদাসদের মাঝখানে, বাইরের দিকে মুখ করে। রোমান সৈনিকরা থাকল আকৃতির সামনের আর পেছনে। সৈনিকদের তৈরি পাঁচিলের আড়ালে, চতুর্ভুজের ভেতর, মিসরীয় আর গ্রিক সহকারী ও মেডিকেল দলসহ থাকলেন ভেনাটর। পদাতিকদের জন্য প্রধান অস্ত্র হলো গ্লাডিয়াস-দুমুখো তীক্ষ্ণ ডগা তলোয়ার, বিরাশি সেন্টিমিটার লম্বা। আর আছে ছুঁড়ে মারার জন্য দুমিটার লম্বা বল্লম। শারীরিক নিরাপত্তার জন্য সৈনিকরা লোহার হেলমেট পরেছে, হেলমেটের কিনারা গালের দুপাশে ঝুলে আছে, দুটো প্রান্তকে বাঁধা হয়েছে চিবুকের কাছে। খাঁচা আকৃতির লোহার বেড় দিয়ে বুক, কাধ আর পিঠেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত লম্বা হাড়টাকে রক্ষার জন্য লোহার গার্ড। তাদের ডালগুলো কাঠের তৈরি।

পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে না এসে আস্তে ধীরে কলামটাকে চারদিকে থেকে ঘিরে ফেলল অসভ্যরা। হামলা করার সময়ও তারা ব্যস্ত হলো না। প্রথমে তারা অল্প কজন লোক পাঠিয়ে নিবিড় ঝাঁকটা ভাঙার জন্য একটা খোঁচা দিল। অনেকটা কাছাকাছি এসে দুর্বোধ্য ভাষায় চেঁচামেচি করল তারা, অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে হুমকি দিল। কিন্তু সংখ্যায় নগণ্য হলেও শত্রুপক্ষ ভয় পেল না বা ছুটে পালাল না।

অভিজ্ঞতা মানুষকে নির্ভয় করে, আর সেঞ্চুরিয়ান সেভেরাসের অভিজ্ঞতার কোনো অভাব নেই। লাইন থেকে কয়েক পা এগিয়ে অসভ্য যোদ্ধায় গিজগিজ করা সামনের প্রান্তরটি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল সে। উপহাসের ভঙ্গিতে শত্রুদের উদ্দেশে হাত নাড়ল একবার। অসম যুদ্ধে আগেও বহুবার তাকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। মাত্র ষোলো বছর বয়েসে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় সে। সাধারণ সৈনিক থেকে ধীরে ধীরে উন্নতি করেছে, দানিয়ুবের তীরে গথদের সাথে আর রাইনের তীরে ফ্রাঙ্কদের সাথে যুদ্ধ করে বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পদক পেয়েছে। সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর ভাড়াটে সৈনিক হয়েছে সে, যে বেশি টাকা দেবে তার পক্ষ নিয়ে লড়াই করতে আপত্তি নেই।

নিজের সৈনিকদের প্রতি অটল বিশ্বাস রয়েছে সেভেরাসের। তাদের খাপমুক্ত তলোয়ার আর হেলমেট রোদ লেগে ঝলমল করছে। সবাই তারা শক্তিশালী যোদ্ধা, যুদ্ধ করে অভিজ্ঞ হয়েছে, পরাজয় কাকে বলে জানে না।

বেশির ভাগ গৃহপালিত পশু, তার ঘোড়াটাসহ ঈজিপ্ট থেকে সমুদ্র অভিযানে বেরোনোর পরপরই মারা গেছে। কাজেই চৌকো আকৃতির ঝাঁকের সামনে থাকল সে-হাঁটছে, কয়েক পা এগিয়ে একবার করে ঘুরছে, যাতে চারদিকে দাঁড়ানো শত্রুপক্ষের ওপর নজর রাখা যায়।

পাহাড় প্রাচীর সমুদ্র আছড়ে পড়ার মতো বিকট গর্জন তুলে ধেয়ে এল অসভ্যরা, ঝাঁপিয়ে পড়ল রোমানদের ওপর। জনসমুদ্রের প্রথম ঢেউটাকে লম্বা বর্শা আর তীরের বাধা পেরিয়ে আছাড় খেল ঝাকের গায়ে। কাস্তে দিয়ে গম কাটার মতো সাফ করা হলো তাদের। অসভ্যদের লাল রক্তে তলোয়ালের চকচকে গেল লাটিনিয়াস মাসার ক্রীতদাসরা নিজেদের জায়গা ছেড়ে এক চুল নড়ল তো নাই-ই, শত্রু নিধনেও তারা যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিল।

চারদিক থেকে বৃত্তটা ছোটো করে আনল অসভ্যরা। লোক তারা যা হারিয়েছে, তার দশগুণ নেমে এল পাহাড় থেকে। বাঁধ ভাঙা পানির মতো আসছে তো আসছেই, বিরতিহীন। রোমানদের ঝকটা মন্থরগতিতে সামনে এগোল। অসভ্যদের তৃতীয় আক্রমণ শুরু হলো। সবুজ ঘাসমোড়া ঢালে আবার রক্তস্রোত বইল। অসভ্যদের একটা দল পেছন থেকে হামলা চালালো। সদ্য নিহত বা আহত সহযোদ্ধাদের গায়ে আছাড় খেল তারা, পড়ে থাকা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলে খালি পা, নিজেদের কীভাবে রক্ষা করতে হয় জানে না। ঝাক থেকে বেরিয়ে এসে অপ্রস্তুত অসভ্যদের কচুকাটা করল রোমানরা, কাজ সেরে আবার তারা ফিরে গিয়ে চৌকো আকৃতি নিল।

এবার অন্যদিকে মোড় নিল যুদ্ধ। বিদেশিদের বল্লম, বর্শা আর তীরের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারবে না বুঝতে পেরে পিছিয়ে গেল অসভ্যরা, জড় হলো নতুন করে। এরপর তারা ঝাঁক ঝাঁক ভোঁতা তীর আর বর্শা ছুঁড়তে শুরু করল, মেয়েরা ছুড়ল পাথর।

ঢাল তুলে মাথা বাঁচাল রোমানরা, মন্থর কিন্তু অবিচল ভঙ্গিতে এগিয়ে চলল নদী আর নিরাপদ আশ্রয় জাহাজের দিকে। অসভ্যরা দূরে সরে যাওয়ায় তাদের ক্ষতি যা করার তা শুধু সিরিয়ান তীরন্দাজরাই করতে পারছে। ক্রীতদাসদের জন্য ঢালের সংখ্যা যথেষ্ট নয়, অরক্ষিত অবস্থায় বর্শা আর তীরের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছে বেচারিরা, তার ওপর গুহার ভেতর পাথর খোঁড়ার কাজ করতে হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই পড়ে যাবার পর আর উঠতে পারল না। ঝাক থেকে বেরিয়ে এসে সাহায্য করতে রোমানরা কেউ রাজি নয়। একটু পরই অসভ্যদের হাতে আহত ধরাশীয়দের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।

যুদ্ধ পরিস্থিতি ও শত্রুপক্ষের ভাবসাব লক্ষ করে নতুন একটা নির্দেশ দিল সেভেরাস। স্থির হয়ে গেল সৈনিকের ঝাঁক, সবাই তারা যে যার অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিল। অসভ্যরা ধরে নিল, রোমানরা আত্মসমর্পণ করতে চাইছে। বিকট রণহুঙ্কার ছেড়ে তীরবেগে ছুটে এল তারা। একেবারে যখন কাছে চলে এসেছে অসভ্যদের বিশাল বাহিনী, শেষ মুহূর্তে আরেকটা নির্দেশ দিল সেভেরাস-হ্যাঁচকা টানে সৈনিকরা খাপমুক্ত করল তলোয়ার, পাল্টা হামলা শুরু করল।

দুটো বোল্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে নিপুণ ভঙ্গিতে তলোয়ার চালালো সেঞ্চুরিয়ান, চারজন অসভ্য তার পায়ের সামনে ধরাশায়ী হলো। তরোয়ালের চওড়া দিকটার আঘাতে আরেকজন আছড়ে পড়ল, এক কোপে তার মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করল সে। মাত্র অল্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পিছু হটতে বাধ্য হলো অসভ্যরা, কয়েকশো নিহত সঙ্গীকে ফেলে নাগালের বাইরে চলে গেল আবার।

দম ফেলার ফুরসত পেয়ে হিসাবে মন দিল সেভেরাস। ষাটজন সৈনিকের মধ্যে বারোজন হয় মারা গেছে, নয়তে যেতে বসেছে। আরও চৌদ্দজন বিভিন্ন ধরনের আঘাত পেয়ে অচল হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্রীতদাসরা। অর্ধেকের বেশি হয় মারা গেছে নয়তো নিখোঁজ।

দ্রুত পায়ে ভেনাটরের দিকে এগোল সে। জামা ছিঁড়ে বাহুর একটা ক্ষত বাধার চেষ্টা করছেন তিনি। কোমরে জড়ানো কাপড়ের ভাঁজে এখনও সাহিত্য ও শিল্পকর্মের তালিকাটা বহন করছেন গ্রিক পণ্ডিত। এখনও আমাদের সাথে আছেন তাহলে, গুরুদেব!

মুখ তুলে তাকালেন ভেনাটর, তার দুচোখে উপচে পড়ছে দৃঢ় প্রত্যয়। আমার চোখের সামনে মারা যাবে তুমি, সেভেরাস।

হুমকি, ঈর্ষা, নাকি দিব্যজ্ঞান?

কিছু আসে যায়? দেশে ফিরে যাওয়া আমাদের কারও পক্ষেই আর সম্ভব হবে না।

জবাব দিল না সেভেরাস। হঠাৎ করে আবার শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ, সবাই মিলে অসভ্যরা এত বেশি পাথর আর বর্শা ছুড়ছে যে গোটা আকাশ কালো হয়ে গেল, ঢাল তুলে ঠেকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সৈনিকরা। এক ছুটে চৌকো ঝাকের সামনে পৌঁছে গেল সে।

রোমানরা সাহসের সাথে যুদ্ধ করল, কিন্তু সংখ্যায় তারা কমে গেল। প্রায় সব কজন সিরিয়ান ধরাশায়ী হয়েছে। বিরতিহীন পাথর আর বর্ষা-বৃষ্টি আকৃতিটাকে ছোট করে তুলল। যারা যুদ্ধ করছে তারা সবাই আহত ও ক্লান্ত, রোদ আর পিপাসায় কাতর। তলোয়ার ধরা হাতগুলো ঝুলে পড়তে লাগল, হাতবদল করল বারবার।

ক্লান্ত অসভ্যরাও, তারাও বিপুলহারে ক্ষগ্রিস্ত, তবু তারা নদীর পথে ঢাল ছেড়ে এক ইঞ্চিও নড়ল না। রোমান সৈনিকরা একজন যদি নিহত হয়, অসভ্যরা নিহত হয়েছে বারোজন। ভাড়াটে সৈনিকদের প্রতিটি লাশ পিনকুশনের মতো হয়েছে দেখতে, তীর বিদ্ধ।

দৈত্যাকার ওভারশিয়ার মাসার হাঁটু আর উরুতে দুটো তীর খেয়েছে। এখনও পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও, আঁকের সাথে এগোতে পারছে না সে। পিছিয়ে পড়ল, আর দেখতে না দেখতে বিশজনের একটা অসভ্য বাহিনী ঘিরে ধরল তাকে। ঘুরল সে, অলসভঙ্গিতে, তুলোয়ার চালিয়ে নিখুঁতভাবে দ্বিখণ্ডিত করল তিনজনকে। তার শক্তি দেখে পিছিয়ে গেল বাকি সবাই, নাগালের বাইরে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে লাগল। চিৎকার করে তাদেরকে সামনে এসে পড়ার আহ্বান জানাল মাসার।

ঠেকে শিখেছে অসভ্যরা, এখন আর তারা হাতের নাগালে আসছে না। দূর থেকে মাসারকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুড়ল তারা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাসারের শরীরের পাঁচ জায়গা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোল। বর্শাগুলো ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে খুলে ফেলল মাসার। সে যখন এই কাজে ব্যস্ত, একজন অসভ্য ছুটে কাছে চলে এল, তারপর ছুঁড়ে দিল হাতে বর্শা। সরাসরি মাসারের গলায় বিধল সেটা। ধীরে ধীরে ধুলোর মধ্যে লুটিয়ে পড়ল সে। অসভ্য নারী-বাহিনী উন্মাদিনীর মতো ছুটে এল, পাথর ছুঁড়ে ছাতু বানিয়ে দিল তাকে।

নদীর কিনারায় পৌঁছানোর পথে রোমানদের সামনে একমাত্র বাধা বেলে পাথরের একটা ঢাল। আরও সামনে, হঠাৎ করে দেখা গেল নীল আকাশ রং বদলে কমলা হয়ে গেছে। তারপর ধোয়ার একটা বিশাল স্তম্ভ মোচড় খেতে খেতে মাথাচাড়া দিল, কালো আর ভারী বাতাস বয়ে নিয়ে এল কাঠের পোড়া গন্ধ।

বিস্ময়ের ধাক্কা খেলেন ভেনাটর, তারপর হতাশায় মুষড়ে পড়লেন। জাহাজ! আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। জাহাজে ওরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে?

রক্তাক্ত সৈনিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল, উন্মাদের মতো ছুটল নদীর দিকে। দুদিক থেকে হামলা চালালো এবার অসভ্যরা। বেশ কজন ক্রীতদাস অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল, সাথে সাথে তাদেরকে মেরে ফেলা হলো। বাকিরা একটা গাছের আড়াল থেকে পাল্টা আঘাত হানার চেষ্টা করল, কিন্তু পিছু ধাওয়ারত অসভ্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর, আপাতত প্রাণে বাঁচতে পারল মাত্র একজন।

সেভেরাস আর তার আহত সৈনিকরা যুদ্ধ করতে করতে ঢলের মাথায় পৌঁছল, তারপরই হঠাৎ তারা দাঁড়িয়ে পড়ল, খেয়াল নেই চারদিকে রক্তস্রোত বয়ে যাচ্ছে। ঢাল থেকে নিচে, নদীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল তারা।

আগুনের স্তম্ভগুলো পাক খেতে খেতে উঠে গিয়ে মিশছে কালো ধোয়ার সাথে। জাহাজের বহর, তাদের পালানোর একমাত্র বাহন, নদীর কিনারা ধরে সার সার পুড়ছে। মিসর থেকে নিয়ে আসা বিশাল আকৃতির জাহাজগুলো অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

সৈনিকদের ঠেলে সামনে চলে এলেন ভেনাটর, দাঁড়ালেন সেভেরাসের পাশে। চুপ হয়ে গেছে সেঞ্চুরিয়ান, তার জামা আর লোহার বর্ম রক্ত ও ঘামে পিচ্ছিল। সর্বনাশা আগুনের আভায় জ্বল জ্বল করছে তার চোখ দুটো।

নদীর তীরে নোঙর ফেলা জাহাজগুলো অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। অসভ্যদের বিশাল এক বাহিনী নাবিকদের এক জায়গায় জড় করে পায়ের তলায় পিষে মেরেছে, তারপর আগুন দিয়েছে জাহাজে। তাদের হামলা থেকে বেঁচে গেছে একটা মাত্র ছোট্ট বাণিজ্য জাহাজ। নাবিকরা যেভাবেই হোক অসভ্যদের আক্রমণ এড়িয়ে গেছে। চারজন নাবিক পাল তোলার কাজে ব্যস্ত, বাকি কয়জন দ্রুত বৈঠা চালিয়ে গভীর পানিতে সরে যাবার চেষ্টা করছে।

নিষ্ফল রাগে হাত দুটো শক্ত মুঠো করে দাঁড়িয়ে থাকলেন ভেনাটর। সহস্র বছরের জ্ঞান আর শিল্পকর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতে যাচ্ছে বলে তাঁর সেই আগের দৃঢ় বিশ্বাস কর্পূরের মতো উবে গেছে মন থেকে।

কাঁধে হাতের স্পর্শ পেয়ে মুখ ফেরালেন ভেনাটরন, দেখলেন তাঁর দিকে ফিরে সকৌতুকে হাসছে সেভেরাস।

চিরকালের আশা ছিল মারা যাব, বলল সেঞ্চুরিয়ান, কোলের ওপর সুন্দরী মেয়ে আর হাতে মদের পাত্র নিয়ে।

কে কীভাবে মরবে তা শুধু ঈশ্বরই বলতে পারেন, অস্পষ্টস্বরে বললেন ভেনাটর।

আমি বরং বলব ভাগ্যের একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে।

এত পরিশ্রম, এত সময় ব্যয়, সব বৃথা গেল!

অন্তত আপনার জিনিসগুলো নিরাপদে লুকানো থাকল, বলল সেভেরাস। কেউই পালাতে পারেনি তা তো নয়। নাবিকরা সাম্রাজ্যের সেরা পণ্ডিতদের জানিয়ে দেবে এখানে কী করেছি আমরা।

না, বললেন ভেনাটর। কেউ তাদের রূপকথা বিশ্বাস করবে না। ঘাড় ফিরিয়ে পাহাড়শ্রেণীর দিকে তাকালেন তিনি, ওগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল।

আপনি সাঁতার জানেন?

সেভেরাসের ফিরে এল ভেনাটরের দৃষ্টি। সাঁতার?

আমার সেরা পাঁচজন লোককে আপনার সাথে দিচ্ছি। অসভ্যদের মাঝখানে দিয়ে পথ করে দেবে ওরা। সাঁতার জানলে জাহাজটায় আপনি পৌঁছবার চেষ্টা করতে পারেন।

আমি…আমি ঠিক জানি না।…পানির দিকে তাকালেন ভেনাটর, নদীর কিনারা আর জাহাজের মাঝখানে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে।

পোড়া একটা কাঠ ভেলা হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, ঝঝের সাথে বলল সেভেরাস। যা করার তাড়াতাড়ি করুন। সবাই আমরা আমাদের ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে যাব আর কিছুক্ষণের মধ্যে।

তোমাদের কী হবে?

লড়ার বা দাঁড়বার জন্য ঢালের এই মাথাটা কী?

সেনটিউরিয়ানকে আলিঙ্গন করলেন ভেনাটর। ঈশ্বর তোমার সঙ্গে থাকুন।

তারচেয়ে বরং আপনার সাথে হাঁটুন তিনি। ঝট করে সৈনিকদের দিকে ঘুরল সেভেরাস, প্রায় অক্ষত পাঁচজন শক্তিশালী লোককে বাছাই করল, নির্দেশ দিয়ে বলল, নদীর কিনারা পর্যন্ত ভেনাটরের পথ নির্বিঘ্ন করার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করতে হবে তাদেরকে প্রয়োজনে প্রাণ দিতে হবে। তারপর বাকি সৈনিকদের নিয়ে নতুন করে ছোট্ট একটা ঝাক তৈরি করল। অসম যুদ্ধের শেষাংশে অভিনয় করার জন্য।

পাঁচজন সৈনিক ভেনাটরকে মাঝখানে নিয়ে ছোট্ট একটা বৃত্ত তৈরি করল। সময় নষ্ট না করে নদীর কিনারা লক্ষ্য করে ছুটল তারা। রণহুঙ্কার ছাড়ল, হতচকিত অসভ্যদের মধ্যে সামনে যাকে পেল তাকেই ঘায়েল করল তলোয়ালের আঘাতে। খেপে ওঠা ষাঁড়ের মতো তীরবেগে ছুটল তারা।

এতই ক্লান্ত যে সব রকম অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছেন ভেনাটর, তবে তাঁর হাতে তলোয়ারটা মুহূর্তের জন্যও স্থির হলো না বা একবারও হোঁচট খেলেন না তিনি। একজন পণ্ডিত, রূপান্তরিত হয়েছেন যোদ্ধায়। তার ভেতর শুধু আশ্চর্য একটা জেদ কাজ করছে, মৃত্যুভয় ভুলে গেছেন।

অস্থির অগ্নিশিখার ভেতর দিয়ে যুদ্ধ করতে করতে এগোল তারা। মাংস পোড়ার গন্ধে বমি পেল ভেনাটরের। জামাটা আরেকবার ছিঁড়ে নাকে কাপড় চেপে ধরলেন তিনি। ধোঁয়ায় কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, ঝর ঝর করে পানি ঝরছে চোখ থেকে।

এক এক করে ধরাশায়ী হলো সৈনিকরা, কিন্তু যতক্ষণ নিঃশ্বাস থাকল ততক্ষণ তারা রক্ষা করল ভেনাটরকে। হঠাৎ করে পায়ে ছোঁয়া পেলেন ভেনাটর। চোখে কিছুই দেখছেন না, লাফ দিলেন সামনে। ঝপাৎ করে পানিতে পড়লেন তিনি, সাথে সাথে সাঁতার কেটে দূরে সরে যাবার চেষ্টা করলেন। কাঠের একটা তক্তার স্পর্শ পাওয়া মাত্র আঁকড়ে ধরলেন সেটাকে। ধোয়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন খোলা নদীতে। তক্তার ওপর উঠলেন তিনি, পেছনে তাকাবার সাহস হলো না।

ঢালের মাথায় দাঁড়িয়ে সৈনিকরা এখনও পাথর বর্শা ঠেকাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। চারবার একত্রিত হয়ে রোমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল অসভ্যরা, প্রতিবার সৈনিকদের প্রতিরক্ষা ভেদ করে ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো। নিজেদের অবস্থানে অটল থাকলেও, রোমানদের সংখ্যা কমছে। চৌকা আকৃতিটা ভেঙে পড়ল, অসহায় কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে ঢালের খোলা মাথায়, কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে যুঝছে। তাদের চারপাশে আহতরা কাতরাচ্ছে, এখানে সেখানে স্তূপ হয়ে আছে লাশ। ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে রক্তের স্রোত। তবু লড়ে চলেছে রোমানরা।

এরপর আরও দুঘণ্টা ধরে চলল যুদ্ধ। এখন আগের মতোই শক্তি নিয়ে হামলা করছে অসভ্যরা। বিজয়ের গন্ধ পেয়েছে, শেষ একটা হামলা চালাবার জন্য আবার তারা জড় হলো।

মাংস থেকে ফলাটা বের করতে না পেরে তীরের বেরিয়ে থাকা অংশটা ভেঙে ফেলল সেভেরাস, অক্লান্তভাবে লড়ে যাচ্ছে সে। পাশে মাত্র অল্প কজন সৈনিক। তারারও এবার একে একে পড়ে যাচ্ছে। পাথর, বর্শা, বল্লম ঢেকে ফেলছে তাদেরকে।

সবার শেষে পতন হলো সেভেরাসের। শরীরের নিচে ভাঁজ হয়ে গেল পা দুটো, তলোয়ার ধরা হাতটা নড়াতে পারল না। মাটিতে গেড়ে রয়েছে সে, কাত হয়ে যাচ্ছে। শরীর, তার পরও দাঁড়াবার চেষ্টা করল সে, কিন্তু পারল না। মুখ তুলল আকাশে, বিড়বিড় করে বলল, মা, বাবা, তোমাদের হাতে তুলে নাও আমাকে।

যেন তার আবেদনে সাড়া দিয়েই, ছুটে এসে তার সারা শরীর বর্শা গাঁথল অসভ্যরা। সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে উঠে গেল সেভেরাস।

ওদিকে তক্তার ওপর শুয়ে দ্রুত হাত চালাচ্ছেন ভেনাটর পানিতে, মরিয়া হয়ে জাহাজটার কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু ধীরে ধীরে হতাশা গ্রাস করল তাকে। স্রোত আর বাতাস বাণিজ্য জাহাজটাকে আরও দূরে সরিয়ে নিল।

নাবিকদের উদ্দেশে চিৎকার করলেন ভেনাটর, একটা হাত তুলে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। নাবিকদের একটা দল আর ছোট্ট একটা মেয়ে, পাশে কুকুর নিয়ে, জাহাজের পেছন দিকের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, সবাই তারা তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে, জাহাজ ঘুরিয়ে তাকে উদ্ধারের কোনো চেষ্টাই তারা করছে না। ভাটির দিকে এগিয়ে চলল জাহাজ, যেন ভেনাটরের কোনো অস্তিত্বই নেই।

ওরা তাকে ফেলে যাচ্ছে, ভেনাটর উপলব্ধি করলেন। কেউ তাকে উদ্ধার করবে না। তক্তার ওপর ঘুষি মারলেন তিনি, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ফুঁপিয়ে উঠলেন, স্থির বিশ্বাসে পৌঁছেছেন ঈশ্বর তাকে পরিত্যাগ করেছেন। অবশেষে তিনি ঘাড় ফিরিয়ে তীরের দিকে তাকালেন।

যুদ্ধ শেষ। দুঃস্বপ্নের মতোই নেই হয়ে গেছে সব কিছু।

.

প্রথম পর্ব – নেবুলা ফ্লাইট ১০৬

১২ অক্টোবর, ১৯৯১। হিথরো এয়ারপোর্ট, লন্ডন।

০১.

ভিআইপি লাউঞ্জের ভেতর থেকে বাইরে উপচে পড়েছে ফটোগ্রাফার আর সাংবাদিকদের ভিড়টা। ভিড়ের কিনারা দিয়ে এগোলেও কেউ লক্ষ করল না পাইলটকে। চৌদ্দ নম্বর গেটের ওয়েটিং রুমে আরোহীরা অপেক্ষা করছে, তারাও কেউ খেয়াল করল না যে ব্রিফকেসের বদলে একটা ডাফল ব্যাগ রয়েছে লোকটার হাতে। মাথা সামান্য নিচু করে, চোখের দৃষ্টি নাক বরাবর সামনে, হন হন করে হেঁটে এল সে। বিশ-পঁচিশটা টিভি-ক্যামেরা সচল হয়ে রয়েছে, সতর্কতার সাথে সব কয়টাকে এড়িয়ে গেল। অবশ্য ক্যামেরাগুলোর লক্ষ্য লম্বা এক সুন্দরী। পালিশ করা চকচকে সোনার মতো রং তার গায়ের। আয়নার মতো মসৃণ। কয়লা-কালো চোখ দুটো একাধারে আদেশ ও আবেদন, দুটো ভাব প্রকাশেই সক্ষম। ফটোগ্রাফার, সাংবাদিক আর সিকিউরিটি গার্ডদের ভিড়টা তাকে ঘিরেই।

ঘেরা বোর্ডি র‍্যাম্প বেয়ে উঠে এল পাইলট, সাদা পোশাক পরা দু’জন এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি এজেন্ট তার পথরোধ করে দাঁড়াল। ছ্যাৎ করে উঠল লোকটার বুক, মাত্র কয়েক ফুট দূরে প্লেনের দরজা, কিন্তু মাঝখানে গার্ড দু’জনকে মনে হলো নিরেট পাঁচলি। সহজভঙ্গিতে একটা হাত নেড়ে কাঁধের মৃদু ধাক্কায় তাদেরকে সরিয়ে দিয়ে সামনে এগোবার চেষ্টা করল সে, ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি লেগে রয়েছে। কিন্তু কাজ হলো না, একটা হাত শক্ত করে তার বাহু আঁকড়ে ধরল। এক মিনিট, ক্যাপটেন।

থামল পাইলট, মুখে হাসি আর চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল সে, যেন তাকে বিব্রত করায় কৌতুক বোধ করছে সে। তার চোখের রং জলপাই আর খয়ের মেশানো, দৃষ্টি যেন অন্তর ভেদ করে যায়। নাকটা কয়েকবারই ভেঙেছে। ডান চোয়ালে সরু একটা কাটা দাগ। ক্যাপের নিচে কাঁচাপাকা ঘোট করে ছাঁটা চুল আর মুখের ভাঁজ দেখে বোঝা যায় পঞ্চাশের ওপরই হবে বয়স। লম্বায় সে ছয় ফুট দুইঞ্চি, মোটাসোটা, তবে ভুঁড়িটা বয়সের তুলনায় এখনও ছোটই। ইউনিফর্মের ভেতর কাঠামোটা ঋজু। দেখে মনে হবে, আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার জেট চালায় এমন দশ হাজার এয়ারলাইন পাইলটদেরই একজন সে।

ব্রেস্ট পকেট থেকে পরিচয়পত্র বের করে একজন এজেন্টকে দিল লোকটা। এট্রিপে বোধহয় ভিআইপি কেউ যাচ্ছেন?

কড়া ভাঁজের স্যুট পরা ব্রিটিশ গার্ড মাথা ঝাঁকাল। জাতিসংঘের একটা দল নিউ ইয়র্কে ফিরে যাচ্ছে। ওদের সাথে নতুন সেক্রেটারি জেনারেলও আছে।

হে’লা কামিল?

হ্যাঁ।

এ কি কোনো মেয়েলোকের কাজ!

মার্গারেট থ্যাচার বেলায় সেক্স কোনো বাধা হয়ে দেখা দেয়নি।

তা অবশ্য। কথাটায় যুক্তি আছে।

হে’লা কামিলের মতো বিচক্ষণ, এমন পুরুষই বা আপনি কজন পাবেন? দেখবেন, চমৎকার চালিয়ে নেবেন উনি।

মৃদু শব্দে হাসল পাইলট। তবে কথা কী জানেন, তার নিজের দেশের মুসলিম ধর্মান্ধরা তাকে বাঁচতে দিয়ে হয়। কথার সুরেই বোঝা গেল, পাইলট আমেরিকান।

আইডি কার্ডের ফটো থেকে চোখ তুলে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল ব্রিটিশ সিকিউরিটি এজেন্ট, তবে কোনো মন্তব্য করল না। ফটোর দিকে আবার চোখ রেখে নামটা শব্দ করে পড়ল, ডেইল লেমকে।

কোন সমস্যা?

না, যাতে না হয় সে চেষ্টা করছি, ভারী গলায় বলল গার্ড।

হাত দুটো শরীর থেকে দূরে সরালো ডেইল লেমকে। আমাকে কি সার্চও করা হবে?

দরকার নেই। একজন পাইলট কেন তার নিজের প্লেন হাইজ্যাক করতে যাবে? তবে আপনার কাগজপত্র চেক না করে উপায় নেই, আপনি সত্যি ক্রুদের একজন কি না জানতে হবে।

ইউনিফর্মটা আমি ফ্যাশন শোতে দেখাব বলে পরিনি।

আমরা আপনার ব্যাগটা দেখতে পারি?

কেন নয়, বলে ব্যাগটা মেঝেতে রেখে খুলল পাইলট।

ফ্লাইট অপারেশনস ম্যানুয়ালগুলো তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাল দ্বিতীয় এজেন্ট তারপর একটা মেকানিকাল ডিভাইস বের করে নেড়েচেড়ে দেখল, সাথে ছোট আকৃতির হাইড্রলিক সিলিন্ডার রয়েছে। কিছু যদি মনে করেন, এটা কী বলবেন?

অয়েল-কুলিং ভোর-এর জন্য ওটা একটা অ্যাকটিউয়েটর আর্ম। খোলা অবস্থায় আটকে গেছে। কেনেড়িতে আমাদের মেইন্টেন্যান্সের লোকেরা অনুরোধ করেছে আমি যেন হাতে করে নিয়ে যাই, কেন নষ্ট হলো ভালো করে বুঝে দেখা দরকার।

শক্ত প্যাকেট করা মোটাসোটা একটা জিনিসের গায়ে খোঁচা মারল দ্বিতীয় এজেন্ট। আরে, এখানে এটা আমরা কী দেখছি? মুখ তুলল সে, চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি। এয়ারলাইন পাইলটরা কবে থেকে প্যারাসুট নিয়ে প্লেনে উঠছে?

হাসল ডেইল লেমকে। স্কাইডাইভিং আমার হবি। ছুটি পেলেই জাম্প করার জন্য বন্ধুদের সাথে ক্রয়ডনে চলে যাই।

আপনি নিশ্চয়ই একটা জেটলাইনার থেকে লাফ দেয়ার কথা ভাবেন না?

পঁয়ত্রিশ হাজার ফুট ওপরে উড়ছে, নিচে আটলান্টিক, গতিবেগ পাঁচশো নট-না! আতকে ওঠার ভান করল পাইলট।

সন্তুষ্ট হয়ে পরস্পরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল এজেন্টরা। ডাফল ব্যাগ বন্ধ করা হলো, ফিরিয়ে দেয়া হলো আইডিকার্ড। আপনাকে দেরি করিয়ে দেয়ার জন্য দুঃখিত, ক্যাপটেন লেমকে।

আলাপটা আমি উপভোগ করেছি।

হ্যাভ আ গুড ফ্লাইট টু নিউ ইয়র্ক।

থ্যাঙ্ক ইউ।

প্লেনে চড়ল ডেইল লেমকে সরাসরি ককপিটে চলে এল। দরজা বন্ধ করে কেবিনের আলো নিভিয়ে দিল সে, এয়ারপোর্ট ভবনের জানালা থেকে কেউ যাতে তাকে দেখতে না পায়। ভালো করে রিহার্সেল দেয়া আছে, তার প্রতিটি নড়াচড়া জড়তাহীন। সিটগুলোর পেছনে হাঁটুগেড়ে বসল সে, পকেট থেকে ছোট একটা টর্চ বের করে খুলে ফেলল ট্র্যাপ-ডোরের ঢাকনি। ককপিটের নিচে ইলেকট্রনিকস বেতে পৌঁছানোর পথ এটা, কবে কে জানে কোনো এক ভঁড় ওটার নাম দিয়েছে হেল হোল। গাঢ় অন্ধকারের ভেতর মইটা নামিয়ে দিল সে। এই সময় ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টদের চাপা গুঞ্জন ভেসে এল, তার সাথে লাগেজ টানা-হাচড়ার শব্দ। মেইন কেবিনটাকে আরোহীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। ট্র্যাপ-ডোর দিয়ে খানিকটা নিচে নামল সে, ডাফল ব্যাগটা টেনে নিল। নিচে নেমে এসে পেনলাইটটা জ্বালল সে। হাতঘড়ি দেখে বুঝলো, ফ্লাইট ক্রুদের পৌঁছানোর আগে তার হাতে সময় আছে পাঁচ মিনিট। প্রায় পঞ্চাশবার অনুশীলন করেছে, প্রতিটি কাজ দ্রুত নিখুঁতভাবে সারতে অসুবিধা হলো না। ফ্লাইট ক্যাপের ভেতর শুকিয়ে নিয়ে আসা মিনিয়েচার টাইমিং ডিভাইসটার সাথে অ্যাকটিউয়েটরটা সংযুক্ত করল। জোড়া লাগানো ইউনিটটা ছোট একটা দরজার কজায় আটকে দিল। এই দরজা শুধু মেকানিকরা ব্যবহার করে। এরপর প্যাকেট থেকে প্যারাসুটটা বের করল সে।

ফাস্ট ও সেকেন্ড অফিসার এসে দেখল, তাদের ক্যাপটেন ডেইল লেমকে পাইলফের সিটে বসে আছে, মুখটা এয়ারপোর্ট ইনফরমেশন ম্যানুয়্যাল-এর আড়ালে। স্বাভাবিক কুশলাদি বিনিময়ের পরপরই তারা রুটিন চেকে ব্যস্ত হয়ে উঠল। কো পাইলট বা প্রকৌশলী, দু’জনের কেইউ খেয়াল করল না যে অন্যান্যবারের চেয়ে তাদের ক্যাপটেন আজ বেশ চুপচাপ ও নির্লিপ্ত। তারা যদি জানত এটাই তাদের জীবনের শেষ ফ্লাইট, তাহলে কি হতো বলা যায় না। অন্তত তাদের দৃষ্টি আর অনুভূতিগুলো যে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ভিআইপি লাউঞ্জে চোখ-ধাঁধানো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর ঝক ঝাক মাইক্রোফোনের দিকে মুখ করে রয়েছেন হে’লা কামিল। মনের অবস্থা যাই হোক, দৃঢ় ও ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, ধৈর্যের প্রতিমূৰ্তি, অনুসন্ধানী রিপোর্টারদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

গোটা ইউরোপজুড়ে ঝটিকা সফর শেষে নিউ ইয়র্কে ফিরছেন হে’লা কামিল, সরকারপ্রধানদের সাথে বিরতিহীন কথা বলেছেন, কিন্তু সে ব্যাপারে খুব কম প্রশ্নেরই উত্তর দিতে হলো তাকে। মৌলবাদী ধর্মীয় নেতারা তাঁর দেশের সরকারকে উৎখাত করার জন্য যে আন্দোলন শুরু করেছে সে সম্পর্কে তার মতামত জানতে চায় সবাই।

মিসরে এই মুহূর্তে ঠিক কী ঘটছে ভালো ধারণা নেই হেলা কামিলের। মৌলবাদীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে আখমত ইয়াজিদ, ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও আইন সম্পর্কে সে একজন পণ্ডিত। গোটা মিসরে ভয়াবহ ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে লোকটা। অধিকারবঞ্চিত লাখ লাখ গ্রামবাসী, যারা নীল নদের তীরে বসবাস করে, আর কায়রো শহরের বস্তিবাসী, যারা মানবেতর জীবন যাপন করে, তাদের মনে কুসংস্কার আর হিংসার আগুন ভালোভাবেই জ্বলতে পেরেছে সে। আর্মি আর এয়ারফোর্সের বড় বড় অফিসাররা কোনো রকম রাখঢাক না করে মৌলবাদীদের সাথে সলাপরামর্শ করছে। কীভাবে সদ্য নির্বাচিত নতুন সরকারপ্রধান নাদাভ হাসানকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। পরিস্থিতি যে ভয়াবহ তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সরকারের কাছ থেকে প্রতি মুহূর্তের বিবরণ হে’লা কামিল পাচ্ছেন না। কাজেই স্পষ্ট করে কিছু না বলে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

দাঁড়ানোর বা কথা বলার ভঙ্গিতে যতই দৃঢ়তা থাকুক, মনে মনে ভীষণ অসহায় ও নিঃসঙ্গ বোধ করছেন তিনি।

এতই সুন্দরী তিনি, যেন রানী নেফারতিতির পুনর্জন্ম হয়েছে। বার্লিন মিউজিয়ামে রানীর যে পোর্টেটি আছে, একই ভঙ্গিতে পোজ দিলে হে’লা কামিল নিঃসন্দেহে উতরে যাবেন। দু’জনেরই মরালগ্রীবা, সরু নাক-আয়ত চোখ, তীক্ষ্ণ মুখাবয়ব-একবার দেখলে ভোলা যায় না। বয়স বিয়াল্লিশ বলা হলেও তাঁকে দেখে তা মনে হয় না। একহারা গড়ন। কালো চোখ। রেশমের মতো কালো চুল কোমর ছাড়িয়েছে। নারীজাতির সমস্ত সৌন্দর্য যেন তার ওপর ঢেলে দেয়া হয়েছে। পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি লম্বা তিনি। এই মুহূর্তে ভাজবহুল স্কার্ট আর কোট পরে আছেন, কোটটার ডিজাইন শুধু তাঁর জন্য করা হয়েছে প্যারিসের বিখ্যাত একটা ডিজাইন সেন্টারে।

বিখ্যাত চারজন ব্যক্তিত্বকে প্রেমিক হিসেবে পেলেও হে’লা কামিল এখনও বিয়ে করেননি। স্বামী-সন্তান তার কাছে অনভিপ্রেত। দীর্ঘমেয়াদি কোনো কিছুর সাথে জড়িয়ে পড়াটাকে তিনি ভালো চোখে দেখেন না। ব্যালের টিকিট কাটার মতোই তার কাছে ভালোবাসার আনন্দ অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী।

কায়রো শহরেই মানুষ হয়েছেন, মা স্কুলশিক্ষয়িত্রী ছিলেন, বাবা ছিলেন ছায়াছবি নির্মাতা। বাড়ি থেকে সাইকেলে আসা-যাওয়া করা যায়, এমন দূরত্বে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের স্কেচ আর খননকাজে কেটেছে তার কৈশোরের অবসর সময়। অত্যন্ত পাকা রাঁধুনি, ছবি আঁকতে পারেন, ভালো গান জানেন, আর রয়েছে মিসরীয় প্রত্নতত্ত্বেও ওপর একটা পিএইচডি। প্রথম চাকরি করেন মিসরের মিনিস্ট্রি অব কালচারে, রিসার্চার হিসেবে। পরে ডিপার্টমেন্টাল হেড হন। তারপর তথ্যমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট মুবারকের নজরে পড়লে তাকে জাতিসংঘের সাধরণ সভায় মিসরের প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করেন তিনি। পাঁচ বছর পর জাতিসংঘের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয় তাকে। এক বছর পর তদানীন্তন মহাসচিব দ্বিতীয় দফার জন্য নির্বাচিত হতে না চাওয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিবের পদটার জন্য বাছাই করা হয় হে’লা কামিলকে। তাঁর সামনে লাইনে আর যারা ছিলেন তাঁরা কেউ দায়িত্ব গ্রহণে রাজি না হওয়াতেই এই সুযোগটা পেয়ে যান তিনি।

কিন্তু সব কিছু এলোমেলো করে দিতে চাইছে তার দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতি। যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে যে তিনিই হবেন জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব, যার কোনো দেশ নেই।

একজন এইড এগিয়ে এসে তার কানে কানে কিছু বলল। মাথা ঝাঁকিয়ে সমবেত সাংবাদিকদের উদ্দেশে একটা হাত তুললেন তিনি। আমাকে বলা হলো, প্লেন টেক-অফ করার জন্য তৈরি, স্বভাবসুলভ হাসিমুখে বললেন তিনি। আমি আর একজনের প্রশ্নের উত্তর দেব।

সাথে সাথে কয়েক ডজন হাত উঁচু হলো, চারদিক থেকে ছুটে এল অসংখ্য প্রশ্ন। দোরগোড়ার কাছে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোকের দিকে হাত তুললেন হে’লা কামিল, ভদ্রলোকের হাতে একটা টেপ রেকর্ডার রয়েছে।

লেই হান্ট, ম্যাডাম কামিল। বিবিসি থেকে। আখমত ইয়াজিদ যদি নাদাভ হাসানের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করেন, আপনি কি দেশে ফিরে যাবেন?

আমি একজন মিসরীয় এবং মুসলিম। আমার দেশের সরকার, তা সে যে সরকারই ক্ষমতায় থাক, যদি চায় আমি দেশে ফিরি তাহলে অবশ্যই ফিরব।

এমনকি আখমত ইয়াজিদ আপনাকে পাপিষ্ঠা ও বেপর্দা মেয়েলোক বলে ঘোষণা করার পরও?

হ্যাঁ, শান্তভাবে জবাব দিলেন হে’লা কামিল।

যদি আয়াতুল্লাহ খোমেনির অর্ধেক পাগলামীও থাকে তার মধ্যে, আপনার দেশে ফেরা মানে আত্মহত্যা করা হতে পারে। কোনো মন্তব্য করবেন?

নিরুদ্বিগ্ন হাসির সাথে মাথা নাড়লেন হে’লা কামিল। এবার আমাকে যেতে হয়। ধন্যবাদ।

সিকিউরিটি গার্ডদের একটা বৃত্ত বোর্ডিং র‍্যাম্পের দিকে নিয়ে চলল তাকে। তার এইডরা আর ইউনেস্কোর বড়সড় প্রতিনিধিদলটা আগেই আসন গ্রহণ করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের চারজন পদস্থ কর্মকর্তা প্যান্টিতে শ্যাম্পেনের বোতল নিয়ে বসেছেন, নিচু স্বরে আলাপ চলছে। বাতাসে জেট ফুয়েল আর বিফ ওয়েলিংটন-এর গন্ধ ভাসছে।

জানালার ধারে একটা শসোফায় বসে সিট বেল্ট বাঁধলেন তিনি। জুতা খুললেন, হেলান দিলেন সোফায়, চোখ বুজলেন। তাকে তন্দ্রায় ঢুলতে দেখে কফি নিয়ে এসেও ফিরে গেল একজন স্টুয়ার্ডেস।

.

জাতিসংঘের চার্টার ফ্লাইট একশো ছয় রানওয়ের শেষ মাথায় চলে এল। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে টেকঅফ-এর অনুমতি পাবার পর থ্রাস্ট লিভার সামনে ঠেলে দিল পাইলট, ভেজা কংক্রিটের ওপর দিয়ে ছুটতে শুরু করল বোয়িং সেভেন-টু-জিরো/বি, হালকা কুয়াশার ভেতর উঠে পড়ল আকাশে।

সাড়ে দশ হাজার মিটার উঁচুতে উঠে এল প্লেন, অটোপাইলট এনগেজ করল ডেইল লেমকে। সিট বেল্ট খুলে সিট ছাড়ল সে। প্রকৃতির ডাক, বলে কেবিনের দরজার দিকে এগোল।

সেকেন্ড অফিসার অর্থাৎ প্রকৌশলী সোনালি চুল ভরা মাথাটা ঝাঁকাল, ইনস্ট্রুমেন্ট প্যানেল থেকে চোখ না তুলেই হাসল একটু। নিশ্চিন্ত মনে সাড়া দিয়ে আসুন, আমি তো আছি।

পাল্টা হেসে প্যাসেঞ্জার কেবিনে বেরিয়ে এল পাইলট। একটু পরই খাবার পরিবেশন করা হবে, তারই প্রস্তুতি নিচ্ছে ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টরা। বিফ ওয়েলিংটন-এর গন্ধে জিভে জল এসে গেল লেমকের। হাত-ইশারায় রুবিনকে একপাশে ডাকল সে।

আপনাকে কিছু দেব, ক্যাপটেন?

শুধু এক কাপ কফি, বলল ডেইল লেমকে। তবে ব্যস্ত হয়ো না, আমি নিজেই নিতে পারব।

না, ঠিক আছে। প্যানট্রিতে ঢুকে কাপে কফি ঢালল।

শোনো হে।

স্যার।

কোম্পানি থেকে বলা হয়েছে, সরকার পরিচালিত একটা আবহাওয়া গবেষণায় আমাদেরকে ভূমিকা রাখতে হবে। লন্ডন থেকে আমরা যখন আটাশ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকব, দশ মিনিটের জন্য পনেরো হাজার মিটারে নামিয়ে আনব প্লেনটাকে-বাতাস আর তাপমাত্রা রেকর্ড করা হবে। তারপর আবার স্বাভাবিক অলটিচ্যুড-এ উঠে যাব। ঠিক আছে?

বিশ্বাস করা কঠিন যে কোম্পানি রাজি হয়েছে। বাপরে বাপ, কী পরিমাণ ফুয়েল নষ্ট হবে ভেবে দেখেছেন, স্যার?

ভেবেছ ম্যানেজমেন্টের টপ বাস্টার্ডরা ওয়াশিংটনে মোটা একটা বিল পাঠাবে না?

সময় হলে আরোহীদের জানাব আমি, তা না হলে ভয় পাবেন ওঁরা।

ঘোষণায় এ কথাও জানিয়ে দিতে পারো যে জানালা দিয়ে কেউ যদি কোনো আলো দেখে, ধরে নিতে হবে ওগুলো আছে মাছ ধরার জাহাজ থেকে আসছে।

ঠিক আছে, স্যার।

চট করে একবার মেইন কেবিনের চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল লেমকে, চঞ্চল দৃষ্টি পলকের জন্য স্থির হলো হে’লা কামিলের ঘুমন্ত মুখের ওপর। তোমার মনে হয়নি, সিকিউরিটি অস্বাভাবিক কড়া? আলাপের সুরে জিজ্ঞেস করল সে। রিপোর্টারদের একজন আমাকে বলল, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড নাকি সন্দেহ করছে মহাসচিবকে অপহরণ করা হতে পারে।

তাই নাকি?

ওদের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে ধুলোর প্রতিটি কণায় সন্ত্রাসবাদীরা ওত পেতে আছে। আমার পরিচয়পত্র দেখে সন্তুষ্ট হয়নি, ব্যাগটাও সার্চ করল।

কাঁধ ঝাঁকাল চিফ স্টুয়ার্ড। খারাপটা কী। শুধু তো আরোহীদের নয়, আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।

প্যাসেজের দুপাশে সিটে বসা আরোহীদের দিকে একটা হাত তুলল লেমকে। অন্তত ওদের কাউকে দেখে সন্ত্রাসবাদী বলে মনে হচ্ছে না।

চেহারা দেখে সবাইকে যদি চেনা যেত!

তা যা বলেছ। কাজেই একটু সাবধান হতে হয়। ককপিটের দরজা তালা দিয়ে রাখছি, বুঝলে। খুব যদি জরুরি কিছু বলতে চাও, ইন্টারকমে ডেকো আমাকে।

ঠিক আছে, স্যার।

কফিতে মাত্র একটা চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখল লেমকে, ফিরে এল ককপিটে। ফার্স্ট অফিসার, তার কো-পাইলট, পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ওয়েলস-এর আরো দেখছে, তার পেছনে কম্পিউটারের সাহায্যে ফুয়েলের খরচ ও মজুদ জেনে নিচ্ছে প্রকৌশলী।

তাদের দিকে পেছন ফিরে কোটের বুক পকেট থেকে ছোট একটা চামড়ার বাক্স বের করল লেমকে। বাক্স খুলে হাতে একটা সিরিঞ্জ নিল, নার্ভ এজেন্ট সারিন ভরল তাতে। ক্রুদের দিকে ফিরল আবার, হাঁটতে শুরু করে হোঁচট খেল, যেন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে, সামলে নেয়ার জন্য খপ করে সেকেন্ড অফিসারের বাহু আঁকড়ে ধরল। দুঃখিত, ফ্রাঙ্ক, কার্পেটে পা বেধে গিয়েছিল।

ফ্রাঙ্ক হার্টলির গোঁফ জোড়া ঘন আর কালো, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, সুদর্শন চেহারা। সূচটা এতই সরু আর তীক্ষ্ণমুখ যে টেরই পেল না তার কাঁধে কিছু ঢুকছে। ইঞ্জিনিয়ারের প্যানেলে সাজানো এক গাদা আলো থেকে চোখ তুলে হাসল সে। বয়স হয়েছে, এবার কিন্তু আপনার মদ খাওয়া কমিয়ে দেয়া উচিত, ক্যাপটেন।

প্লেন তো সোজাই চালাই, হালকা সুরে বলল লেমকে। শুধু হাঁটার সময় তাল পাই না।

মুখ খুলল ফ্রাঙ্ক হার্টলি, যেন কিছু বলতে চায়, কিন্তু হঠাৎ করে ভাবলেশহীন হয়ে পড়ল তার চেহারা। মাথা ঝাঁকাল সে যেন দৃষ্টি পরিষ্কার করতে চাইছে। পরমুহূর্তে উল্টে গেল চোখ জোড়া, স্থির হয়ে গেল শরীর।

হার্টলির গায়ে হেলান দিয়ে থাকল লেমকে, সিট থেকে সে যাতে কাত হয়ে না পড়ে। সিরিঞ্জটা খুলে নিয়ে ব্যাগে ভরল, বের করল নতুন আরেকটা, দ্বিতীয়টাতে আগেই সারিন ভরে রেখেছে। আরে, ফ্রাঙ্কের কিছু হলো নাকি? অমন নেতিয়ে পড়ল কেন!

কো-পাইলটের সিটে ঝট করে ঘুরল প্রকাণ্ডদেহী ফাস্ট অফিসার জেরি অসওয়ার্ল্ড, চোখে প্রশ্ন। সে কি!

এসে দেখো না একবার।

সিট ছেড়ে উঠে এল জেরি অসওয়ার্ল্ড, ক্যাপটেনকে পাশ কাটিয়ে ঝুঁকে পড়ল সেকেন্ড অফিসারের দিকে। সূচ ঢুকিয়ে সিরিঞ্জের মাথায় চাপ দিল লেমকে, তবে জেরি অসওয়ার্ল্ড ব্যথাটা অনুভব করল।

উফ! কী ব্যাপার! ঝট করে ঘুরতেই ক্যাপটেনের হাতে সিরিঞ্জটা দেখতে পেল সে। ফ্রাঙ্ক হার্টলির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী জেরি অসওয়ার্ল্ড, বিষটা সাথে সাথে কাজ শুরু করেনি। নগ্ন সত্য প্রকাশ পাবার সাথে সাথে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল, পরমুহূর্তে দুহাত সামনে বাড়িয়ে ক্যাপটেনকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। কে তুমি? গলাটা দুহাতে ধরে ফেলে গর্জে উঠল। ডেইল লেমকে কোথায়? তার ছদ্মবেশ নিয়ে…

ইচ্ছে থাক বা না থাক, উত্তর দেয়ার উপায় নেই ছদ্মবেশী লোকটার, কারণ জেরি অসওয়ার্ল্ডের বিশাল দুটো হাত তার গলায় এমনভাবে চেপে বসেছে যে দম ফেলতে পারছে না সে। একটা বাল্কহেডের সাথে তাকে চেপে ধরল জেরি অসওয়ার্ল্ড। মারা যাচ্ছে বুঝতে পেরে মরিয়া হয়ে উঠল ছদ্মবেশী পাইলট। ভাঁজ করা হাঁটু দিয়ে জেরি অসওয়ার্ল্ডের তলপেটে প্রচণ্ড গুতো মারল সে। সামান্যই প্রতিক্রিয়া হলো, একবার শুধু গুঙিয়ে উঠল জেরি অসওয়ার্ল্ড। চোখে অন্ধকার দেখছে নকল পাইলট।

তারপর, ধীরে ধীরে, গলার ওপর থেকে কমে এল চাপটা, হোঁচট খেতে খেতে পিছিয়ে গেল জেরি অসওয়ার্ল্ড। মৃত্যু উপস্থিত বুঝতে পেরে আতঙ্কে বিকৃত হয়ে উঠেছে। তার চেহারা। চোখে দিশেহারা ভাব আর ঘৃণা নিয়ে পাইলটের দিকে তাকিয়ে আছে সে। শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে শেষ একটা ঘুষি মাল পাইলটের পেটে।

হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল লেমকের, কুঁজো হয়ে গোঙাতে লাগল। সিধে হতে শুরু করে দেখল সামনেটা ঝাপসা লাগছে। পাইলটের সিটে ধাক্কা খেয়ে কার্পেটের ওপর পড়ে গেল জেরি অসওয়ার্ল্ড, আর নড়ল না। কয়েক সেকেন্ড ককপিটের মেঝেতে বসে থাকল লেমকে, সশব্দে হাঁপাচ্ছে, ব্যথা কমাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে পেটে হাত বুলিয়ে।

খানিক পর আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়াল সে। দরজা, ওদিক থেকে নানা ধরনের শব্দ ভেসে আসছে। মেইন কেবিনে কোনো হৈচৈ নেই বলে মনে হলো তার। ইঞ্জিনের শব্দকে ছাপিয়ে ককপিটের কোনো আওয়াজ দরজার ওদিকে পৌঁছায়নি।

জেরি অসওয়ার্ল্ডকে কো-পাইলটের সিটে বসিয়ে স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধতে ঘেমে গোসল হয়ে গেল সে। ফ্রাঙ্ক হার্টলির সেফটি বেল্ট বাঁধাই আছে, কাজেই তাকে আর ছুঁলো না। অবশেষে পাইলটের সিটে বসে প্লেনের পজিশন দেখল সে।

পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর নির্ধারিত পথ থেকে প্লেনটাকে ঘুরিয়ে আরেক দিকে রওনা হলো ভুয়া পাইলট। নতুন পথটা সুমেরুর দিকে চলে গেছে।

.

০২.

দুনিয়ার সবচেয়ে বন্ধ্যা জায়গার একটা, এখানে কখনও ট্যুরিস্টদের আগমন ঘটেনি। গত কয়েকশো বছরে মুষ্টিমেয় কিছু এক্সপ্লোরার ও বিজ্ঞানী এই অভিশপ্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে হাঁটাচলা করেছেন। উঁচু-নিচু তীর বরাবর সাগর দু এক সপ্তাহ বাদে বছরের বাকি সময় জমাট বেঁধে থাকে, শীতের শুরুতে তাপমাত্রা নেমে যায় ৭৩ ডিগ্রী ফারেনহাইটে। দীর্ঘ শীতের মাসগুলোয় ঠাণ্ডা আকাশটাকে গাঢ় অন্ধকার গ্রাস করে রাখে, এমনকি গরমের দিনেও চোখ ধাঁধানো রোদ এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ভয়াবহ তুষার ঝড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

জায়গাটা গ্রিনল্যান্ডের সর্ব উত্তরে। আরডেনক্যাপল ফিঅ্যারড-এর চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে বরফ ঢাকা পাহাড়। বাতাস এখানে প্রতি মুহূর্তে ঝড়ের মতো বইছে। ভাবতে অবিশ্বাস্য লাগে যে প্রায় দুহাজার বছর আগেও এখনে একদল শিকারি বসবাস করত। ধ্বংসাবশে থেকে পাওয়া রেডিওকার্বন পরীক্ষা করে জানা গেছে দুশে থেকে চারশো খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত লোকবসতি ছিল এখানে। প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে সময়টা তেমন লম্বা নয়, তবে তাদের রেখে যাওয়া গোটা বিশেক বাড়ি উৎসুক বিজ্ঞানীদের জন্য বিরাট কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। হিমশীতল আবহাওয়ায় আজও প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে বাড়িগুলো।

আগে থেকে তৈরি করা অ্যালুমিনিয়ামের কাঠামো হেলিকপ্টার থেকে রশি বেঁধে নামানো হয়েছে প্রাচীন গ্রামটার মাঝখানে, কাঠামোগুলো জোড়া লাগিয়ে নিজেদের জন্য নিরাপদ আস্তানা বানিয়ে নিয়েছে কলোরাডো ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা। জবড়জং চেহারার হিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট আর ফোম-গ্লাস ইনসুলেশন রক্ত হিম করা ঠাণ্ডার সাথে অসম যুদ্ধে লিপ্ত। ঝোড়ো বাতাস বিরতিহীন গোঙালেও তাতে শুধু ভুতুড়ে হয়ে উঠেছে পরিবেশ, গ্রামের বাইরের পাঁচিল টপকে ভেতরে সহজে ঢুকতে পারে না। শীতের শুধুতে আর্কিওলজিকাল দলটিকে চারপাশে কাজ করার বিরাট একটা সুযোগ এনে দিয়েছে এই আশ্রয়।

লিলি শার্প, কলোরাডো ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপিকা, অ্যানথ্রোপলজি পড়ায়। শীত বা তুষার ঝড় গ্রাহ্য করার মেয়ে নয় সে, দলের আর সবাই তাকে এস্কিমোদের বংশধর বলে ঠাট্টা করে। প্রাচীন শিকারিদের একটা ঘরের ভেতর মেঝের ওপর হাঁটুগেড়ে বসেছে সে, হাতে ছোট একটা তোয়ালে জড়িয়ে জমাট বাঁধা মাটি সতর্কতার সাথে আঁচড়াচ্ছে। ঘরের ভেতর সে একা, অতীত খুঁড়ে প্রাচীন যুগের নিদর্শন আবিষ্কারের কাজে মগ্ন।

লোকগুলো ছিল সি-ম্যামল শিকারি, শীতের সময়টা তারা নিজেদের ঘর-বাড়িতে কাটাত। ঘরগুলো আংশিক মাটির ভেতর গাঁথা, পাথরের তৈরি দেয়ালগুলো নিচু, ঘাস বা গাছের পাতা দিয়ে ছাওয়া ছাদ দাঁড়িয়ে আছে তিমির হাড় অবলম্বন করে। তেল দিয়ে কুপি জ্বেলে শরীর গরম রাখত তারা, দীর্ঘ অন্ধকার মাসগুলো ঘরের ভেতর অলস বসে না থেকে নদীর স্রোত থেকে তুলে নেয়া কাঠের টুকরো, হাতির দাঁত আর হরিণের শিং দিয়ে কুদে মূর্তি বানাত।

গ্রিনল্যান্ডের এই অংশে যিশুর জন্মের পর প্রথম শতাব্দীতে আস্তানা গেড়েছিল তারা। তারপর, তাদের সংস্কৃতির বিকাশ যখন তুঙ্গে, হঠাৎ করে পাততাড়ি গুটিয়ে বেমালুম অদৃশ্য হয়ে যায়। এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে অদৃশ্য হলেও এখানে তারা নিজেদের বহু জিনিস ফেলে গেছে। ধ্বংসাবশেষ হিসেবে তা টিকে আছে আজও।

লিলির নিষ্ঠা আর শ্রম বৃথা গেল না। ডিনারের পর অ্যালুমিনিয়াম কাঠামোর ভেতর তার পুরুষ সঙ্গীরা বিশ্রাম নিচ্ছে, আবিষ্কারের আনন্দ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হলো তারা। ঝোড়ো বাতাস উপেক্ষা করে প্রাচীন গ্রামের ভেতর এসে কাজ করায় হরিণের শিংয়ের তৈরি একটা পাতিল পেয়ে গেল সে। হঠাৎ করে লিলির হাতের তোয়ালে কিসে যেন আটকে গিয়েই আবার মুক্ত হলো। একই জায়গায় ভোয়ালেটা আবার ঘষল সে, কান দুটো সজাগ। এবার একটা শব্দও শুনল। গর্তের ভেতর হাত গলিয়ে হাতড়াল, কিন্তু কিছুই পেল না। ভোয়ালে খুলে আঙুলের টোকা দিল মাটিতে। একটা আওয়াজ হলো। পাথরের আওয়াজ চেনা আছে, সে ধরনের নয়। আবার গর্তের ভেতরটা হাতড়াল সে। জিনিসটা একটু যে চ্যাপ্টা, তবে শব্দটা ধাতব। মাটির খানিকটা আবরণ সরাতেই এবার হাতে চলে এল।

সিধে হলো লিলি। ডানে বায়ে ঘুরে, আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে, ঢিল করল পিঠের পেশি। কোলম্যান লণ্ঠনের আলোয়, উলেন ক্যাপের বাইরে, তার দীর্ঘ লাল চুল কোমল অগ্নিশিখার মতো জ্বলজ্বল করছে। মুঠোটা খুলল সে, নীল আর সুবজ মেশানো চোখে চিকচিক করে উঠল কৌতূহল। কয়লা-কালো মাটির প্রলেপ নিয়ে তালুতে পড়ে থাকা ছোট্ট জিনিসটা যেন তার বুদ্ধিমত্তাকে ব্যঙ্গ করল।

এখানে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের নিজেকে মনে করিয়ে দিল লিলি শার্প। লোহা বা : তামার ব্যবহার তারা জানত না।

শান্ত থাকার চেষ্টা করলেও অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের একটা জোয়ার গ্রাস করে ফেলল তাকে। তারপর এল উত্তেজনা, সবশেষে জরুরি তাগাদা। নখের হালকা আঁচড়ে মাটির আবরণ সরিয়ে ফেলল সে, লণ্ঠনের আলোয় চকচক করে উঠল জিনিসটা। হাঁ করে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকল জেনি। আর কোনো সন্দেহ নেই। একটা স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার করেছে সে।

অত্যন্ত পুরনো মুদ্রা, কিনারাগুলো ক্ষয়ে গেছে। মুদ্রার গায়ে খুদে একটা গর্ত রয়েছে, চামড়ার একটা ফিতে ঝুলছে সেটা থেকে। কিছুর সাথে ঝুলিয়ে রাখা হতো ওটা, সম্ভবত ব্যক্তিগত অলঙ্কার হিসেবে কারও গলায়।

পাঁচ মিনিট পর, এখনও মুদ্রাটাকে পরীক্ষা করছে লিলি, রহস্যের কিনারা পাবার চেষ্টা করছে, এই সময় ঘরের দরজা খুলে গেল, ভেতরে ঢুকলেন বিশালদেহী সদয় চেহারার এক ভদ্রলোক, সাথে এক গাদা তুষার কণা নিয়ে। তার নিঃশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসছে সাদা বাস্প। দাড়ি আর ভ্রু তুষারে সাদা হয়ে আছে।

ড. হিরাম গ্রোনকুইস্ট হাসলেন। চারজনের আর্কিওলজিস্ট দলের প্রধান তিনি। বাধা দেয়ার জন্য দুঃখিত, লিলি, ভারী গলায়, মৃদু কণ্ঠে বললেন তিনি। তবে বড় বেশি খাটাখাটুনি করছো তুমি। একটু বিশ্রাম নাও। শেলটারে চলো, তোমাকে ব্র্যান্ডি খাওয়াব।

ডক্টর গ্রোনকুইস্ট, বলল লিলি, উত্তেজনা চেপে রাখার চেষ্টা করলেও গলা কেঁপে গেল তার। আপনাকে আমি অদ্ভুত একটা জিনিস দেখাতে চাই।

এগিয়ে এসে লিলির পাশে দাঁড়ালেন হিরাম গ্রোনকুইস্ট। কী পেয়েছো দেখি?

তাঁর সামনে মুঠোটা খুলল লিলি। দেখুন!

পারকার ভেতর থেকে হাতড়ে চশমাটা বের করে চোখে পরলেন ড. গ্রোনকুইস্ট। মুদ্রাটার ওপর ঝুঁকে পড়লেন তিনি, নাকটা প্রায় ঠেকে গেল সেটার গায়ে। চারদিক থেকে নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করলেন তিনি মুদ্রাটা। তারপর মুখ তুলে লিলির দিকে তাকালেন, কৌতুকে নাচছে চোখের মণি দুটো। আমার সাথে ঠাট্টা করছে, তাই না?

জেদ নিয়ে তাকাল লিলি, তারপর পেশি ঢিল করে দিয়ে মুচকি হাসল। ওহ গড! আপনি ভাবছেন আমি নিজেই এটা এখানে রেখে আবিষ্কারের ভান করছি!

তোমাকেও স্বীকার করতে হবে, ব্যাপারটা পতিতালয়ে কুমারী খুঁজে পাবার মতো।

কিউট।

লিলির কাঁধে মৃদু চাপড় মারলেন ড. গ্রোনকুইস্ট। কংগ্রাচুলেশন্স। দুর্লভ একটা আবিষ্কার।

কিন্তু কীভাবে এটা এল এখানে?

হাজার মাইলের মধ্যে সোনার কোনো মজুদ নেই এদিকে। প্রাচীন লোক যারা, এখানে ছিল তারা খনি থেকে সোনা উদ্ধার করেছিল, তা সম্ভব নয়। পাথুরে যুগের চেয়ে সামান্য উন্নতি করেছিল তারা। মুদ্রাটা অবশ্যই আরও অনেক পরে অন্য কোনো। উৎস থেকে এখানে এসেছে।

কিন্তু যেসব শিল্পকর্ম আমরা উদ্ধার করেছি তার সবই তিনশো খ্রিস্টাব্দের, সেগুলোর সাথে এটা থাকে কীভাবে-এর কী ব্যাখ্যা দেবেন আপনি?

কাঁধ ঝাঁকালেন ড. গ্রোনকুইস্ট। নিজেকে আমার বোকা লাগছে।

ঠিক আছে, বোকার মতোই না হয় একটা কিছু আন্দাজ করুন।

বুদ্ধিতে যতটুকু কুলাচ্ছে-কোন ভাইকিং এটা বিনিময় করে বা হারিয়ে ফেলে।

পূর্ব তীরে ধরে এত দূর দক্ষিণে জলদস্যুদের কোনো জাহাজ এসেছিল, এমন কোনো রেকর্ড নেই।

আচ্ছা, এমন হতে পারে না যে আরও কাছাকাছি সময়ের এস্কিমোদের সাথে দক্ষিণের নর্স বসতি স্থাপনকারীদের বিনিময় বাণিজ্যে হয়েছিল? শিকারের সময় এই প্রাচীন গ্রামটা হয়তো ব্যবহার করা হয়।

আপনি খুব ভালো করেই জানেন, ড. গ্রোনকুইস্ট, চারশো খ্রিস্টাব্দের পর এদিকে লোকবসতির কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি।

ভ্রু কুঁচকে লিলির দিকে তাকালেন ড. গ্রোনকুইস্ট। তুমি দেখছি হাল ছাড়ার পাত্রী নও। মুদ্রাটায় তো এমনকি কোনো তারিখও দেখছি না।

মাইক গ্রাহাম প্রাচীন মুদ্রা বিশেষজ্ঞ, চলুন দেখি সে কী বলে।

পারকার হুড অ্যাডজোস্ট করে নিয়ে কোলম্যান লণ্ঠনটা নিভিয়ে দিল লিলি। টর্চ জ্বাললেন ড. গ্রোনকুইস্ট, দরজা খুলে আগে বেরোতে দিলেন লিলিকে। অন্ধকারে কবরস্থানের ভূতের মতো গোঙাচ্ছে বাতাস। মুখের খোলা অংশে ঠাণ্ডা বাতাস যেন মৌমাছির হুল ফুটাল। একটা রশি ধরে এগোল ওরা, শেষ প্রান্তটা অ্যালুমিনিয়াম শেলটারে বাঁধা আছে। হাঁটতে ওপরে মুখ তুলল জেনিত। পরিষ্কার আকাশ, কালো ভেলভেটের মতো লাগল দেখতে, তারাগুলো নকশা এঁকে রেখেছে। তারার আলোয় পশ্চিমের পাহাড় পরিষ্কার চেনা গেল। খাড়িতে নেমে আসছে তুষার আর বরফ সেখান থেকে উপচে বেরিয়ে আসছে খোলা সাগরে। আর্কটিকের সৌন্দর্য সুন্দরী রমণীর হাতছানির মতো। পুরুষরা কেন যে ভালোবেসে ফেলে বুঝতে তার অসুবিধা হলো না।

টর্চের আলোয় ত্রিশ গজ হেঁটে নিরাপদ আশ্রয়ের স্টর্ম করিডরে পৌঁছল ওরা, আরও দশ ফুট পেরিয়ে দ্বিতীয় দরজা খুলে লিভিং কোয়ার্টারে চলে এল। বাইরের ঠাণ্ডার তুলনায় ভেতরটা উত্তপ্ত তন্দুর মনে হলো লিলির, কফির গন্ধ নাকে পারফিউমের পরশ বুলিয়ে দিল। পারকা খুলে নিজের কাপটা ভরে নিল সে।

স্যাম হসকিন্সের সোনালি চুল কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে, পাকানো রশির মতো গোঁফ, একটা ড্রাফটিং বোর্ডের ওপর ঝুঁকে রয়েছে। নিউ ইয়র্কের একজন আর্কিটেক্স, আর্কিওলজির প্রেমে অন্ধ। দুনিয়ার এমন কোনো সম্ভাব্য জায়গা নেই যেখানে খোঁড়াখুঁড়ির কাজে যেতে রাজি নয় হসকিন্স, নিজের পেশা ছেড়ে প্রতি বছরই দুমাসের জন্য এই কাজে গায়ের হয়ে যায় সে। সতেরোশো বছর আগে প্রাচীন গ্রামটা ঠিক কী রকম দেখতে ছিল, তার আঁকা নকশা থেকে সেটা জানতে পেরেছে ওরা।

মাইক গ্রাহাম দলের চার নম্বর সদস্য। নিজের ছোট্ট খাটে শুয়ে অতি ব্যবহারে মলিন একটা পেপার ব্যাক পড়ছে সে। অ্যাডভেঞ্চার গল্পের পাগল। তার হাতে বা পকেটে একটা বই নেই, এমন কখনও ঘটেছে কি না মনে করতে পারল না লিলি। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা আর্কিওলজিস্টদের একজন সে। অল্প বয়সেই মাথায় মস্ত টাক দেখা দিয়েছে।

ওহে, মাইক গ্রাহাম, ড. গ্রোনকুইস্ট বললেন, লিলি কী পেয়েছে দেখো। মুদ্রাটা তার দিকে ছুঁড়ে দিলেন তিনি। আঁতকে উঠল লিলি। তবে, সময় মতো বই থেকে মুখ তুলে খপ করে সেটা ধরে ফেলল মাইক গ্রাহাম।

কয়েক মুহূর্ত পর মুখ তুলল সে। আমাকে বোকা বানানোর মতলব?

মন খুলে হাসলেন ড. গ্রোনকুইস্ট। তারপর বললেন, না হে। গ্রামের একটা ঘর থেকে সত্যি ওটা খুঁড়ে পেয়েছে লিলি।

ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা বের করল মাইক গ্রাহাম। লেন্সের তলায় ফেলে মুদ্রাটা ভালোভাবে পরীক্ষা করল সে।

কী হলো? লিলি ধৈর্য রাখতে পারছে না। একটা কিছু রায় দাও।

অবিশ্বাস্য, বিড়বিড় করল মাইক, হতভম্ব দেখল তাকে। স্বর্ণমুদ্রা! প্রায় সাড়ে তেরো গ্রাম। আগে কখনও দেখিনি আমি। অত্যন্ত দুর্লভ। একজন কালেক্টর সম্ভবত দশ থেকে পনেরো হাজার ডলারে কিনতে চাইবে।

চেহারাটা কার সাথে মেলে বলতে পারো?

মেলে মানে! রোমান আর বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট থিয়োডোসিয়াস দ্য গ্রেটের মূর্তি ওটা, দাঁড়িয়ে আছে। ঝাপসা হয়ে গেছে, কিন্তু ভালো করে তাকালে দেখতে পাবে সম্রাটের পায়ের কাছে বন্দিরা পড়ে আছে। লক্ষ করেছ সম্রাটের হাতে দুটো জিনিস-একটা গ্লোব আর একটা ব্যানার?

ব্যানার?

ব্যানারটায় পাশাপাশি দুটো গ্রিক অক্ষর রয়েছে, XP একটা মনোগ্রামের আকৃতিতে, যার অর্থ হলো-খ্রিস্টের নামে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর সম্রাট কনস্ট্যানটাইন মনোগ্রামটা গ্রহণ করেছিলেন, তারপর একে একে তার উত্তরাধিকারীরা এটা পেয়ে এসেছে।

উল্টোদিকের লেখাগুলো থেকে কী বুঝছ তুমি? প্রশ্ন করলেন ড. গ্রোনকুইস্ট।

আবার লেন্সে চোখ রাখল মাইক গ্রাহাম। তিনটে শব্দ। প্রথমটা মনে হচ্ছে… TRIVMFATOR বাকি দুটো পড়া যাচ্ছে না, মুছে প্রায় মসৃণ হয়ে গেছে। কালেক্টরস ক্যাটালগ থেকে বর্ণনা আর ল্যাটিন অনুবাদ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সভ্য জগতে ফেরার আগে খোঁজ করতে পারছি না।

সময়টা আন্দাজ করতে পারো?

চিন্তিতভাবে সিলিংয়ের দিকে তাকাল মাইক। থিয়োডোসিয়াসের শাসনকাল, যতদূর মনে হয়, তিনশো উনআশি থেকে তিনশো পঁচানব্বই খ্রিস্টাব্দ।

ঝট করে ড. গ্রোনকুইস্টের দিকে ফিরল লিলি। ঠিক বলেছে!

মাথা নাড়লেন তিনি। চতুর্থ শতাব্দীর এস্কিমোরা রোমান সাম্রাজ্যের সাথে যোগাযোগ করেছিল।

সম্ভাবনার কথা আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না! জেদের সুরে বলল লিলি।

ব্যাপারটা জানাজানি হলে, দুনিয়াজুড়ে হৈচৈ পড়ে যাবে, বলল জোসেফ হসকিন্স, এই প্রথম মুদ্রাটা দেখছে সে।

ব্র্যান্ডির গ্লাসে ছোট্ট একটা চুমুক দিলেন ড. গ্রোনকুইস্ট। প্রাচীন মুদ্রা এর আগেও অদ্ভুত সব জায়গায় পাওয়া গেছে। কিন্তু মুদ্রার তারিখ বা কোথায় পাওয়া গেছে সে সম্পর্কে আর্কিওলজিস্ট মহলকে সন্তুষ্ট করতে পারে এমন প্রমাণ বিরল।

তা হয়তো সত্যি, মৃদুকণ্ঠে বলল মাইক। কিন্তু এটা এখানে কীভাবে এল জানার জন্য আমি আমার মার্সিডিজ কনভার্টিবলটা হারাতে রাজি আছি।

কিছুক্ষণ না বলে মুদ্রাটার দিকে তাকিয়ে থাকল ওরা, সবাই চিন্তিত। অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙলেন ড. গ্রোনকুইস্ট, তার মানে একটা রহস্যের সামনে পড়েছি আমরা। শুধু এটুকুই জানি।

.

০৩.

মাঝরাতের খানিক পর প্লেন ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিল ভুয়া পাইলট। স্বচ্ছ পরিষ্কার বাতাস, কালো মসৃণ সাগর তীরের ওপর স্নান একটা দাগের মতো মাথাচাড়া দিল আইসল্যান্ড। ছোট্ট দ্বীপদেশটার আকৃতি সবুজাভ সুমেরুপ্রভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল ধীরে ধীরে।

ছোটবেলা থেকেই রক্তদর্শনে অভ্যস্ত সে, লাশ দেখে তার চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে না। ভাড়াটে খুনি হিসেবে অবিশ্বাস্য মোটা টাকা পায়, তার সাথে যোগ হয়েছে ধর্মীয় উন্মাদনা। কেউ তাকে অ্যাসাসিন বা আতঙ্কবাদী বললে ভয়ানক খেপে যায়। শব্দ দুটোর মধ্যে রাজনীতি গন্ধ আছে।

বহুরূপী বলতে যা বোঝায়, সে তা-ই। সমস্ত কলাকৌশল জানা আছে, দ্রুত চেহারা বদলানোয় তার জুড়ি মেলা ভার। নিখুঁত কাজ তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, একজন পারফেকমনিস্ট। ভিড় লক্ষ করে ব্রাশ ফায়ার করা বা গাড়িতে বোমা ফিট করা তার কাছে হাস্যকর বোকামি বলে মনে হয়। তার পদ্ধতি আরও অনেক সূক্ষ্ম। আন্তর্জাতিক তদন্তকারীরা তার অনেক কীর্তিকে অ্যাক্সিডেন্ট নয় বলে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কামিলকে খুন করাটা টাকার বিনিময়ে একটা কাজ বলে ভাবছে না সুলমান আজিজ। জাতিসংঘের মহাসচিবকে খুন করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আয়োজনবহুল প্ল্যানটা নিখুঁত করতে পাঁচ মাস সময় নিয়েছে সে। তার পরও ধৈর্য ধরতে হয়েছে সুবর্ণ সুযোগটির জন্য।

প্রায় অপচয়ই বলা যায়, মুচকি হেসে ভাবল সে। হে’লা কামিল রাজরানীর সৌন্দর্য নিয়ে অকালে মারা যাচ্ছে। মেয়েলোকটা বিরাট একটা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ধীরে ধীরে থ্রটল পিছিয়ে আনল সে। একটু একটু করে নিচে নামছে প্লেন। আরোহীরা কিছু টের পাবে না। তাছাড়া, কেবিনের আরোহীরা ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই ঘুমে ঢুলছে। এইবার নিয়ে বারো বার হেডিং চেক করল সে। কম্পিউটর আগেই রিপ্রোগ্রাম দিয়ে রেখেছে, যেখানে সে নামতে চায় সেখানকার দূরত্ব আর সময়ের হিসাব সবই সঠিকভাবে পাচ্ছে। পনেরো মিনিট পর আইসল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলরেখা পেরিয়ে ভেতর দিকে চলে এল প্লেন। কাছাকাছি কোথাও কোনো লোকবসতি নেই। নিচের দৃশ্য বলতে ধূসর রঙের পাথর আর সাদা তুষার। স্পিড় কমাল সুলেমান আজিজ। ঘণ্টায় তিনশো বাহান্ন কিলোমিটার গতিতে ছুটছে প্লেন।

হফসজোকাল গ্লেসিয়ারে একটা বিকন রাখা আছে, সেটা থেকে পাঠানো সঙ্কেত রেডিওতে ধরে, সরাসরি গ্লেসিয়ারের দিকে অটোপাইলট রিসেট করল সুলেমান আজিজ। দ্বীপের মাঝখান থেকে এক হাজার সাতশো সাঁইত্রিশ মিটার উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমবাহ হফসজোকাল। এরপর অলটিচ্যুড সেট করল সে, সংঘর্ষটা যাতে চূড়ার দেড়শো মিটার নিচে ঘটে।

এক এক করে কমিউনিকেশন আর ডাইরেকশন ইন্ডিকেটরগুলো ভাঙল সে। সাবধানের মার নেই, তাই ফুয়েল বিসর্জন দেয়ার কাজটাও শান্তভাবে সারল। হাতঘড়ি দেখল, প্লেনে আর আট মিনিট আছে সে। ট্র্যাপ-ডোর গলে হেল হোল-এ নেমে এল, বিড়বিড় করে গান গাইছে নাকি কলমা পড়ছে সে-ই জানে। মোটা ইলাস্টিকের সোলসহ ফ্রেঞ্চ প্যারাবুট জোড়া আগেই পরে নিয়েছে। ডাফল ব্যাগ থেকে একটা জাম্পস্যুট বের করে ব্যস্ততার সাথে পরে ফেলল, স্কি মাস্ক আর স্টকিং ক্যাপ পরার পর মাথায় আর হেলমেট পরার সুযোগ থাকল না। ব্যাগ থেকে এরপর বেরোল দস্তানা, গগলস আর একটা অলটিমিটার, শেষেরটা কব্জির সাথে স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে নিল। প্যারাসুটের প্রধান অংশটি কোমরের কাছে থাকল, বাকিটুকু থাকল শোল্ডার ব্লেডের ওপর। তৈরি হয়ে নিয়ে আবার হাতঘড়ির দিকে তাকাল সে।

এক মিনিট বিশ সেকেন্ড।

এস্কেপ ভোর খুলল সে। সগর্জনে বাতাস ঢুকল হেল হোলে। সেকেন্ডের কাটার ওপর চোখ রেখে কাউন্ট ডাউন শুরু করল সে।

..পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক, শূন্য। সরু ফাঁকাটা দিয়ে লাফ দিল সে, পা জোড়া সামনের বিমান যেদিকে ছুটছে সেদিকে মুখ। বাতাসের ঘূর্ণি ধেয়ে আসা বরফ ধসের মতো আঘাত করল মুখে, ছো দিয়ে কেড়ে নিল ফুসফুসের সমস্ত বাতাস। কানের পর্দা ফাটানো গর্জন তুলে এগিয়ে গেল প্লেনটা। পরমুহূর্তে হালকা হয়ে গেল শরীর, দীর্ঘ পতন শুরু হয়ে গেছে।

ব্যাঙের মতো হাত-পা ছড়িয়ে নামছে সুলেমান আজিজ, নিচে ঘোর অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। সবচেয়ে খারাপ যেটা ঘটতে পারে সেটাই আন্দাজ করে নিল সে। সঠিক জায়গায় পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে তার সহকারীরা। অন্ধকারে নির্দিষ্ট টার্গেট এলাকা না থাকায় বাতাস কতদূরে বা কোন দিকে তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বোঝার কোনো উপায় নেই। নির্ধারিত জায়গা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়তে পারে সে, পড়তে চোখা কোনো বরফের মাথায়, কিংবা সরু কোনো গভীর ফাটলের ভেতর। কেউ হয়তো তাকে খুঁজেই পাবে না কোনো দিন।

দশ সেকেন্ডে প্রায় তিনশো ষাট মিটার নেমেছে। আলোকিত অলটিমিটারের ডায়ালে কাঁটা লাল ঘরে পৌঁছতে যাচ্ছে। আর তো দেরি করা যায় না। একটা পাউচ থেকে পাইলট শুটটা বের করে বাতাসে ছুঁড়ে দিল সে। আকাশে নোঙর ফেলল সেটা, মেইন প্যারাস্যুটটাকে টেনে খুলে ফেলল। হাত-পা ছড়ানো ব্যাঙের আকৃতি বদলে গেল, খাড়াভাবে নামছে এখন সুলেমান আজিজ।

হঠাৎ করে আলোর ছোট্ট একটা বৃত্ত তার ডান দিকে মাইলখানেক দূরে পিট পিট করে উঠল। তারপর আকাশে উঠে এল একটা ফ্লেয়ার, স্থির হয়ে ঝুলে থাকল বেশ কয়েক সেকেন্ড। বাতাসের গতি আর দিক বোঝার হলো তার। ডান দিকের স্টিয়ারিং টগল টেনে আলোটার দিকে নামতে শুরু করল সে।

আকাশে আরেকটা ফ্লেয়ার উঠল। মাটির কাছাকাছি বাতাস স্থির হয়ে আছে। এতক্ষণে সহকারীদের পরিষ্কার দেখতে পেল সে। আলোর এক জোড়া সরল রেখা তৈরি করেছে ওরা, আগে দেখা বৃত্তটার দিকে চলে গেছে। স্টিয়ারিং টগল টেনে একশো আশি ডিগ্রি বাঁক নিল সুলেমান আজিজ। মাটিতে নামার প্রস্তুতি শেষ করল। তার সহকারীরা জায়গাটা ভালোই বেছেছে। নরম তুন্দ্রায় পা দিয়ে পড়ল সে, বৃত্তের ঠিক মাঝখানে, খাড়াভাবে। কথা না বলে স্ট্র্যাপগুলো খুলল সে চোখ ধাঁধানো আলোর মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসে মুখ তুলল আকাশে।

আকাশ ছোঁয়া হিমবাহের দিকে ছুটে চলেছে প্লেনটা। কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আরোহী বা ক্রুদের কারও কোনো ধারণা নেই। হিমবাহ আর ধাতব মেশিনের মাঝখানের দূরত্ব দ্রুত কমে আসছে।

নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকল সুলেমান আজিজ। জেট ইঞ্জিনের আওয়াজ ক্রমশ মিলিয়ে গেল দূরে। কালো রাতের সাথে মিশে অদৃশ্য হয়ে গেল নেভিগেশন লাইট।

.

০৪.

গ্যালির পেছনে মাথাটা একদিকে কাত করল একজন অ্যাটেনড্যান্ট। ককপিটে কিসের আওয়াজ বলো তো? শুনতে পাচ্ছ?

হাতের কাজ ফেলে প্লেনের নাকের দিকে ঘুরল চিফ স্টুয়ার্ড, গ্যারি রুবিন। ভেঁতা, অবিচ্ছিন্ন গর্জনের মতো একটা আওয়াজ, যেন কাছে পিঠে কোথাও গেল হেল হোলের হ্যাঁচ, সেই সাথে থেমে গেল শব্দটাও।

কই, আর তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না!

কিসের শব্দ ছিল ওটা?

কী জানি। আগে কখনও শুনিনি। একবার মনে হলো, প্রেশার লিক কিনা। অ্যাটেনড্যান্ট তার কাঁধ ছোঁয়া সোনালি চুল নেড়ে মেইন কেবিনের দিকে এগোল। তুমি বরং ক্যাপটেনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও।

ইতস্তত করতে লাগল। জরুরি কোনো ব্যাপার না হলে ক্যাপটেন তাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করেছেন। তবে, ভাবল সে, আগে তাকে প্লেন আর আরোহীদের নিরাপত্তার দিকটা দেখতে হবে। ইন্টারকম ফোনের রিসিভার কানে তুলল সে, চাপ দিল বোতামে। ক্যাপটেন, বলছি। মেইন কেবিনের সামনে থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ শুনলাম আমরা। ওখানে কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছে?

কোনো জবাব এল না। তিনবার চেষ্টা করার পরও সাড়া না পেয়ে দিশেহারা বোধ করল, বারো বছরের চাকরিতে এটা তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন একটা অভিজ্ঞতা। কী করবে ভাবছে, এই সময় প্রায় ছুটতে ছুটতে ফিরে এল ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট, কী যেন বলল তাকে। প্রথমে কান দেয়নি তার কথায়, তারপর ঝট করে তার দিকে ঘুরল। কী বললে?

আমাদের নিচে মাটি।

মাটি?

সরাসরি আমাদের নিচে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মেয়েটা, চোখ পিটপিট করছে। একজন আরোহী আমাকে দেখল।

মাথা নাড়ল। অসম্ভব! সমুদ্রের মাঝখানে থাকার কথা আমাদের। সম্ভবত ফিশিং বোটের আলো দেখেছে সে। আবহাওয়া-সংক্রান্ত গবেষণার জন্য, ক্যাপটেন বলেছেন…

বিশ্বাস না হয় নিজেই দেখো না! তাকে থামিয়ে দিয়ে আবেদনের সুরে বলল অ্যাটেনড্যান্ট। নিচের মাটি দ্রুত উঠে আসছে। আমরা বোধ হয় ল্যান্ড করতে যাচ্ছি।

গ্যালির একটা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, নিচে তাকাল। আটলান্টিকের কালো পানির বদলে সাদা একটা উজ্জ্বল ভাব দেখতে পেল সে। প্লেনের নিচে বরফের বিশাল একটা বিস্তৃতি পেছন দিকে ছুটে যাচ্ছে, খুব বেশি হলে দুশো চল্লিশ মিটার নিচে, নেভিগেশন লাইটের প্রতিফলন পরিষ্কার দেখা গেল। আতকে উঠল, ঘুরে উঠল মাথাটা। এটা যদি ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং হয়, ক্যাপটেন মেইন কেবিনের ক্রুদের জানাননি কেন? সিট বেল্ট বাঁধার বা ধূমপান না করার নির্দেশ দেননি কেন? হতভম্ব চেহারা নিয়ে অ্যাটেনড্যান্টের দিকে ফিরল সে। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

জাতিসংঘের প্রায় সর আরোহীই জেগে রয়েছে, পত্রপত্রিকা পড়ছে বা কথা বলছে। শুধু হে’লা কামিল ঘুমিয়ে পড়েছেন। অর্থনৈতিক সেমিনার শেষ করে বিশ্বব্যাংকের হেডকোয়ার্টারে ফিরছে প্রতিনিধিদল, প্লেনের লেজে একটা টেবিলে জড় হয়েছে তারা সবাই। প্রতিনিধিদলের নেতা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব নিচু গলায় কথা বলছেন, থমথম করছে তার চেহারা। মেক্সিকোর অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে, গোটা দেশ দেউলিয়া হতে আর বেশি দেরি নেই, অথচ আর্থিক সহায়তা লাভেরও কোনো আশা কেউ তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না।

ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, ইমার্জেন্সি প্রসিডিওর শুরু করা উচিত নয়?

আরোহীদের কিছু জানিয়ো না। অন্তত এক্ষুনি নয়। আগে আমাকে ক্যাপটেনের সাথে যোগাযোগ করতে দাও।

কিন্তু তার কি সময় আছে?

না-জানি না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে মেইন কেবিন ধরে হন হন করে এগোল, আরোহীদের কিছু বুঝতে না দেয়ার জন্য মুখের সামনে একটা হাত রেখে হাই তুলল। সামনের পর্দাটা হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে ককপিটের দরজার সামনে থামল সে, হাতল ধরে মোচড় দিল। ভেতর থেকে তালা মারা।

নক করল সে। তারপর ঘুষি মারল। কোনো সাড়া নেই। ক্যাপটেনকে নিয়ে তিনজন রয়েছে ভেতরে, কী করছে তারা? মরিয়া হয়ে দরজার গায়ে লাথি মারল সে। দরজার কবাট হালকা বোর্ড দিয়ে তৈরি, বাইরের দিকে খোলে। দ্বিতীয় লাথিতে সেটা ভেঙে গেল। দোরগোড়া টপকে ভেতরে ঢুকল। ঢুকেই পাথর হয়ে গেল।

অবিশ্বাস, বিস্ময়, ভয় ও আতঙ্ক, বাঁধ ভাঙা পানির মতো একযোগে সবগুলো অনুভূতি গ্রাস করে ফেলল তাকে। ক্রুদের একজন মেঝেতে পড়ে আছে, আরেকজন তার প্যানেলে হুমড়ি খেয়ে রয়েছে। ক্যাপটেন ডেইল লেমকে অদৃশ্য। জেরি অসওয়ার্ল্ডকে টপকাতে গিয়ে তার গায়ে হোঁচট খেল, খালি পাইলটের সিটের ওপর ঝুঁকে উইন্ডশিল্ড দিয়ে বাইরে তাকাল।

পেন্নর নাকের সামনে বিপুল বিস্তার নিয়ে ঝুলে রয়েছে হসজোকাল গ্লেসিয়ারের চূড়া, খুব বেশি হলে মাইল দশেক দূরে। তারার আলোয় সবুজাভ দেখল বরফের গা। কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আতঙ্কে দিশেহারা বোধ করল স্টুয়ার্ড। প্লেন কীভাবে চালাতে হয় সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই তার, তবু পাইলটের সীটে বসে কন্ট্রোল কলামটাকে দুহাতে আঁকড়ে ধরল সে। নিজের কথা ভাবছে না, কিন্তু আরোহীদের বাঁচানোর শেষ একটা চেষ্টা তো করতেই হবে। হুলিটাকে নিজের বুকের দিকে টেনে আনার চেষ্টা করল সে।

কিছুই ঘটল না।

কলাম টিল হতে চাইছে না অথচ আশ্চর্য, অলটিমিটারে দেখা গেল প্লেন ধীরে ধীরে হলেও ওপর দিকে উঠছে। আবার হুইলটা নিজের দিকে টানল সে, এবার আরও জোরে। সামান্য একটু কাছে এল। দৃঢ় চাপ অনুভব করে বিস্মিত হলো সে। তার চিন্তাশক্তি স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করছে না। অভিজ্ঞতা এতই কম যে বুঝতে পারছে না অটোমেটিক পাইলটের ওপর আসুরিক শক্তি খাটাচ্ছে সে, যেখানে মাত্র পঁচিশ পাউন্ড চাপ-ই ওটাকে নত করতে পারে।

স্বচ্ছ ঠাণ্ডা বাতাসে গ্লেসিয়ারটাকে এত কাছে মনে হলো যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। থ্রটল সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে কলামটাকে আবার কাছে টানল সে। থেমে থেমে, জেদ আর অনিচ্ছার ভাব নিয়ে কাছে এল বটে, কিন্তু আবার পিছিয়ে গেল খানিকটা। যেন যন্ত্রণাকাতর মন্থরতার সাথে ওপর দিকে নাক তুলল প্লেন, বরফ আর তুষার ঢাকা চূড়াটাকে টপকাল মাত্র একশো ফুট ওপর দিয়ে।

.

আসল ডেইল লেমকেকে তার লন্ডন ফ্ল্যাটে খুন করেছে সুলেমান আজিজ। ছদ্মবেশ নেয়ার ব্যাপারে সে একজন জাদুকর, বেচারা লেমকের ফ্ল্যাটে বসেই চেহারা বদলে নিয়েছে। এই মুহূর্তে বরফের রাজ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে, চোখে একজোড়া নাইট গ্লাস তুলে তাকিয়ে রয়েছে দূরে। সুমেরুপ্রভা ম্লান হয়ে এলেও আকাশের গায়ে হক্সজোকালের কিনারাগুলো এখনও ঠাহর করা যায়।

উত্তেজনা আর প্রত্যাশায় টান টান হয়ে আছে পরিবেশ। দু’জন টেকনিশিয়ান আলো আর ট্রান্সমিটার বিকন তুলে একটা হেলিকপ্টারে ভরছে বটে, কিন্তু তারাও ঢালের ওপর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে গ্লেসিয়ারের চূড়ার দিকে। পাথুরে মূর্তির মতো স্থির হয়ে রয়েছে সুলেমান আজিজ, এক দুই করে সেকেন্ড গুনছে, আশা যেকোনো মুহূর্তে আগুনের বিস্ফোরণ দেখতে পাবে। কিন্তু কিছুই ঘটল না।

চোখ থেকে বাইনোকুলার নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। গ্লেসিয়ারের নিস্তব্ধতা চারদিক থেকে ঘিরে ধরল তাকে, ঠাণ্ডা আর নির্বিকার। মাথার কাঁচা-পাকা পরচুলা খুলে বরফের ওপর ছুঁড়ে মারল সে। বুট জোড়া খুলল, বুটের ভেতর থেকে বের করল শক্ত মোটা স্পঞ্জ, দৈর্ঘ্য বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে হয়েছিল। সচেতন, পাশে তার অন্ধভক্ত বন্ধু ইবনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আশ্চর্য মেকআপ, সুলেমান আজি, আপনাকে চেনাই যাচ্ছিল না। লম্বা সে, রোগাটে, পাকানো রশির মতো শরীর, মাথায় বাবরি।

ইকুইপমেন্ট সব তোলা হয়েছে?

জি। আমাদের মিশন কি সাকসেলফুল, সুলেমান আজিজ?

হিসেবে ছোট্ট একটা ভুল হয়েছে। যেভাবেই হোক চূড়া টপকে বেরিয়ে গেছে প্লেন। মহান করুণাময় আল্লাহ হে’লা কামিলকে আরও কয়েক মিনিট হায়াৎ দরাজ করেছেন।

সুলেমান আজিজ, সভয়ে বলছি, আখমত ইয়াজিদ কিন্তু মোটেও খুশি হবেন না।

প্ল্যান মোতাবেকই মারা যাবে হে’লা কামিল, আত্মবিশ্বাসের সাথে বল সুলেমান আজিজ। আমার কাজে কোনো ফাঁক থাকে না।

কিন্তু প্লেনটা যে এখনও উড়ছে!

এমনকি আল্লাহও ওটাকে অনন্তকাল আকাশে রাখতে পারবেন না।

আল্লাহর ব্যর্থতা নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে, নতুন একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আগে ব্যাখ্যা করো তুমি কেন ব্যর্থ হলে? চাপা, ক্রুদ্ধ গর্জনের মতো শোনাল কথাগুলো।

ঝট করে ঘুরল সুলেমান আজিজ, মোহাম্মদ ইসমাইলকে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার পিত্তি জ্বলে গেল। শিশুসুলভ নিরীহ ভাব ফুটে আছে প্রায় গোল চেহারায়। কালো মুক্তোর মতো একজোড়া চোখ। শুধু ঘন ভ্রু জোড়া একজন পেশাদার খুনির চেহারাতেই যেন বেশি মানায়। দৃষ্টি কেমন যেন আচ্ছন্ন, যেন শুধু ছুঁয়ে যায়, গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। সুলেমান আজিজের জানা আছে, এ লোক সহজে খুন করতে ভালোবাসে, কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে যেতে চায় না, জানে না হত্যাকাণ্ডকে শিল্পের পর্যায়ে তোলা সম্ভব। সে আরও জানে, মোহাম্মদ ইসমাইলের বিরক্তিকর উপস্থিতি না মেনে নিয়ে তার কোনো উপায় নেই। কায়রো শহরের একজন মোল্লা সে, সুলেমান আজিজের ঘাড়ে প্রায় জোর করে তাকে চাপিয়ে দিয়েছে আখমত ইয়াজিদ। গোড়া মৌলবাদীকে বড় বেশি পছন্দ আর বিশ্বাস করে সে। অবিশ্বাস না করলেও সুলেমান আজিজকে নিয়ে চিন্তিত মনে হয় তাকে। সুলেমান আজিজ, মৌলবাদী রাজনৈতিক নেতাদের যথাযযাগ্য সম্মান দেয় না, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সব সময় কড়া সমালোচনা করে, ইত্যাদি লক্ষ করে সতর্ক হবার প্রয়োজন বোধ করেছে সে। সেই সতর্কতারই ফলশ্রুতি মোহাম্মদ ইসমাইল। তার চোখের সামনে, তার পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে হয় সুলেমান আজিজকে। কোনো রকম প্রতিবাদ না করেই মোহাম্মদ ইসমাইলকে গ্রহণ করেছে সুলেমান আজিজ। ছলচাতুরি তার মজ্জাগত, মোহাম্মদ ইসমাইল নিজেও জানে না সুলেমান আজিজের পক্ষে তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে সে।

শান্তভাবে পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করল সুলেমান আজিজ। যান্ত্রিক ব্যাপারে অনেক ধরনের বিচ্যুতি ঘটতে পারে। তবে যা ঘটতে পারে সবই ধারণার মধ্যে ছিল। ঘাবড়াবার কোনো কারণ নেই। অটোমেটিক পাইলট মেরুর দিকে একটা কোর্সে লক করা আছে। আকাশ সময় খুব বেশি হলে আর মাত্র নব্বই মিনিট অবশিষ্ট আছে।

কিন্তু তার আগেই যদি ককপিটের লাশগুলো কেউ দেখে ফেলে? আর যদি আরোহীদের মধ্যে কেউ প্লেন চালাতে জানে? মোহাম্মদ ইসমাইল নাছোড়বান্দা।

আরোহীদের ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাডি করা হয়েছে। প্লেন চালানোর অভিজ্ঞতা কারও নেই। তাছাড়া রেডিও আর নেভিগেশন ইনস্ট্রুমেন্ট চুরমার করে দিয়েছি আমি। কেউ যদি প্লেনটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়, কোথায় আছে বা কোথায় যাচ্ছে কিছুই টের পাবে না। চিরকালের জন্য আর্কটিক সাগরে হারিয়ে যাবে হে’লা কামিল আর তার জাতিসংঘের হোমরাচোমরা শয্যাসঙ্গীরা।

বলতে চাইছ ওদের বাঁচার কোনো উপায়ই নেই?

নেই, দৃঢ়কণ্ঠে বলল সুলেমান আজিজ। একেবারেই নেই।

০৫. একটা সুইভেল চেয়ার

০৫.

একটা সুইভেল চেয়ারে পেশি ঢিল করে দিয়ে বসে আছে ডার্ক পিট, পা দুটো টানটান লম্বা করে দেয়ায় ছয় ফুট তিন ইঞ্চির আকৃতিটা সমান্তরাল তলে রয়েছে এখন। মস্ত একটা হাই তুলল, কালো ঢেউ-খেলানো চুলে আঙুল চালাল বার কয়েক।

একহারা গড়ন ওর, সুঠাম শক্ত পেশি। রোজ দশ মাইল দৌড়ে বা নিয়মিত মুগুর ভেজে যারা স্বাস্থ্য তৈরির জন্য গলদঘর্ম হয় তাদের দলে পড়ে না ও। বছরের বেশির ভাগই ঘরের বাইরে থাকে, ঘুরে বেড়ায় পাহাড়-পর্বত বন-জঙ্গল আর মরুভূমিতে, রোদে পুড়ে অনেককাল আগেই তামাটে হয়ে গেছে গায়ের চামড়া। গভীর সবুজ চোখ দুটোয় উষ্ণ এবং নিষ্ঠুর অনুভূতি খেলা করে একই সঙ্গে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে সব সময় একটা হাসি।

জীবনযাপনে আশ্চর্য একটা সাবলীল ভঙ্গি আছে পিটের, হীনম্মন্যতায় ভোগে না কখনও, যে কোনো পরিবেশে ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে সপ্রতিভ ও সহজ হতে পারে। অভিজাত আর প্রভাবশালী মহলে অবাধ যাতায়াত ওর। যেকোনো বিষয়ে, সংশ্লিষ্ট পাত্র বা পাত্রী যদি কঠিন হয়, তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে ও।

এয়ারফোর্স একাডেমি থেকে পাস করা সন্তান পিট, মেজর পদে উন্নীত হয়েছিল; প্রায় ছয় বছর হতে চলল ন্যাশনাল আন্ডারওয়াটার অ্যান্ড মেরিন এজেন্সি (নুমা)-তে বিশেষ প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসেবে ধারে কাজ করছে। বাল্যবন্ধু অ্যাল জিওর্দিনোর সঙ্গে পৃথিবীর সব কয়টি সাগর-মহাসাগর চষে বেরিয়েছে পিট, কী পানির উপরে কী নিচে; অনেক মানুষ যে অভিজ্ঞতা সারা জীবনেও অর্জন করতে পারে না, তার দশগুণ বেশি রোমাঞ্চ ও অর্জন করেছে গত অর্ধ দশকে। নিউ ইয়র্কের নিচে হারিয়ে যাওয়া একটা জায়গা থেকে ম্যানহাটন লিমিটেড এক্সপ্রেস ট্রেন খুঁজে বের করেছে সে, সেইন্ট লরেন্স নদীর তলদেশ থেকে জীবিত এক হাজার যাত্রীসহ জাহাজ এম্পায়ার অব দ্য আইল্যান্ড উদ্ধার করেছে। হারিয়ে যাওয়া নিউক্লিয়ার সাবমেরিন স্টারবাককে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে খুঁজে বের করেছে, পিট, ক্যারিবিয়ান সাগরের তলদেশে ভুতুড়ে জাহাজ। সাইক্লপ-এর সমাধি আবিষ্কার করেছে সে। ও হ্যাঁ, টাইটানিক জাহাজ উত্তোলনের পেছনেও তার অবদান ছিল।

জিওর্দিনোর মতে, ও হলো অতীতকে খুঁড়ে আনা ব্যক্তি। মাঝেমধ্যেই ঠাট্টা করে কথাটা বলে সে।

তুমি বোধ হয় এটা দেখতে চাইবে, কামরার আরেক প্রান্ত থেকে বলল অ্যাল জিওর্দিনো।

কালার ভিডিও মনিটরের ওপর আরও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল পিট। সার্ভে শিপ আইসব্রেকার পোলার এক্সপ্লোরার-এ রয়েছে ওরা। খোলের একশো মিটার নিচের দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে ও। পোলার এক্সপ্লোরার ভোতা চেহারার বিশাল জাহাজ, বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে বরফবহুল পানিতে চলার জন্য। বাক্স আকৃতির প্রকাণ্ড সুপারস্ট্রাকচার পাঁচতলা অফিস ভবনের মতো দেখতে। জাহাজটাকে চালায় আশি হাজার ঘোড়ার ইঞ্জিন। দেড় মিটার পুরু বরফ ভেঙে অনায়াসে এগোতে পারে।

মনে হচ্ছে যেন একটা গর্ত এগিয়ে আসছে। সামনে একটা কনসোল নিয়ে বসে রয়েছে অ্যাল জিওর্দিনো, সোনার রেকর্ডার স্টাডি করছে। সব কিছু মিলিয়ে তার চেহারাটা বুলডোজারের কাছাকাছি। আদি নিবাস ইটালিতে। একটা কানে ইয়াররিং লটকানো। শুধু বন্ধু নয়, অনেকক্ষেত্রেই পিটের বীমা পলিসি হিসেবে কাজ করে সে।

একটা কাউন্টারে পা ঠেকাল পিট, ভাঁজ করা হাঁটু সমান করল সজোরে, সুইভেল চেয়ারটা ঘুরল, সেই সাথে চাকাগুলো গড়াতে শুরু করে অ্যাল জিওর্দিনোর পাশে পৌঁছে দিল ওকে। কম্পিউটারের সাহায্য পাওয়া সোনোগ্রাফ-এর দিকে তাকিয়ে থাকল ও, উঁচু কিনারা নিয়ে সত্যি একাটা গর্ত ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। একসময় অন্ধকার গভীর গর্তের ভেতরটারও আভাস পাওয়া গেল। পাশ থেকে অ্যাল জিওর্দিনো মন্তব্য করল, ঝপ করে নেমে গেছে খাদটা।

চট করে একবার ইকো সাউন্ডারের ওপর চোখ বুলালো পিট। একশো চল্লিশ থেকে একবারেই একশো আশি মিটার।

অথচ কিনারা থেকে বাইরের কোনো দিকে ঢাল নেই।

দুশো মিটার, এখনও তল দেখা যাচ্ছে না।

যদি আগ্নেয়গিরি হয়, স্বীকার করতে হবে আকৃতিটা অদ্ভুত। লাভা পাথরের কোনো চিহ্ন নেই।

বায়রন নাইট, সার্ভে ভেসেলের কমান্ডার, দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিলেন। লালমুখো একটা গরিলাই বলা যায় তাকে। পি আর অ্যাল জিওর্দিনো বাদে গোটা জাহাজে তিনিই শুধু ইলেকট্রনিক্স কমপার্টমেন্টে ঢুকতে পারেন। রাত জাগা পাখিদের কিছু দরকার থাকলে বলতে পারে। হাসছেন তিনি।

কফি। ধন্যবাদ, কমান্ডার, বলল পিট, মাথাটা টেনে নিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন বায়রন নাইট।

সোনোগ্রাফে চোখ রেখে আকৃতিটাকে বড় হতে দেখল জিওর্দিনো। ডায়ামিটারে প্রায় দুকিলোমিটার। …

তলাটা সমতল, বলল পিট।

নিশ্চয়ই প্রকাণ্ড একটা আগ্নেয়গিরি ছিল একসময়…

উহু, তা নয়।

পিটের দিকে অদ্ভুতদৃষ্টিতে তাকাল জিওর্দিনো। তাহলে?

উল্কার আঘাত হতে পারে না?

চেহারায় সন্দেহ নিয়ে চিন্তা করল জিওর্দিনো। সাগরের এত গভীরে উল্কার আঘাতে এই প্রকাণ্ড গর্ত তৈরি হতে পারে?

হয়তো কয়েক হাজার বা কয়েক মিলিয়ন বছর আগে পড়েছিল, যখন মি লেভেল অনেক নিচু ছিল।

তোমার এ রকম ভাবার কারণ?

কারণ তিনটে, বলল পিট। গর্তের মুখটা বড় বেশি নিখুঁত, উঁচু-নিচু নয়। বাইরের দিকে কোনো ঢাল নেই। আর, ম্যাগনেটোমিটারের দিকে তাকিয়ে দেখো কাঁটাটা কেমন লাফাচ্ছে, তার মানে নিচে যথেষ্ট লোহা রয়েছে।

হঠাৎ আড়ষ্ট হয়ে গেল জিওর্দিনো। আমরা একটা টার্গেট পেয়েছি!

কোন দিকে?

স্টারবোর্ড সাইডে, দুশো মিটার দূরে। গর্তের ভেতর দিকের ঢালে খাড়াভাবে রয়েছে। রিডিং খুবই আবছা। জিনিসটাকে আংশিক আড়াল করে রেখেছে জিওলজি। কমান্ডারকে খবরটা দাও। ভিডিও ক্যামেরা কি বলে?

মনিটরগুলোর দিকে তাকাল পিট। রেঞ্জের মধ্যে পাচ্ছে না। পরের বার পাশ কাটানোর সময় পাবে।

দ্বিতীয়বার পাশ কাটালে রাশিয়ানরা সন্দেহ করবে না?

রেকডিং পেপারে সোনার ইমেজ এল আবছা। নানা ধরনের পদার্থের আড়াল করা একটা দাগ মাত্র। তারপর এল কম্পিউটর ইমেজ, অনেকটা পরিষ্কার ও বিশদ বিবরণসহ। ইমেজটা ফোঁটানো হলো কালার ভিডিও মনিটরে। এতক্ষণে একটা প্রায় স্পষ্ট আকৃতি পাওয়া গেল। বোম টিপে আকৃতিটাকে আরও বড় করল পিট স্ক্রিন।

টার্গেটের চারদিকে আপনাআপনি একটা চতুষ্কোণ তৈরি হলো, ফলে আরও পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ল জিনিসটার ধাচ আর আকৃতি। একই সময়ে আরেকটা মেশিন থেকে বেরিয়ে এল রঙিন আকৃতি।

হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলেন কমান্ডার নাইট। দিনের পর দিন গোটা এলাকা চষে ফেলেছে পোলার এক্সপ্লারার, নিখোঁজ রাশিয়ান সাবমেরিনের কোনো সন্ধান না পাওয়া হতাশ হয়ে পড়েছিলেন ভদ্রলোক, পিটের আকস্মিক ডাক পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। পেয়েছো? টার্গেট পেয়েছো? রুদ্বশ্বাসে জানতে চাইলেন

পিট বা জিওর্দিনো, দু’জনের কেউই জবাব দিল না, নিঃশব্দে হাসতে লাগল। হঠাৎ বুঝতে পারলেন কমান্ডার নাইট।

গুড গড! সত্যি আমরা পেয়েছি ওটাকে? …।

বিশাল এক গর্তের ভেতর লুকিয়ে আছে, কমান্ডারের হাতে একটা ফটো ধরিয়ে দিয়ে মনিটরের দিকে ইঙ্গিত করল পিট। আলফাক্লাস সোভিয়েত সাবমেরিনের নিখুঁত একটা ইমেজ।

ফটো আর সোনার ইমেজের ওপর চোখ বুলিয়ে মুখ তুললেন বায়রন নাইট। সাগরের এদিকটা কোথাও খুঁজতে বাকি রাখেনি রাশিয়ানরা। পায়নি। কেন?

না পাওয়ার কারণ আছে, বলল পিট। ওরা যখন খোঁজ করে তখন বরফের স্তর অনেক মোটা ছিল। পাশাপাশি সরল রেখা তৈরি করে আসা-যাওয়া করতে পারেনি ওদের জাহাজগুলো। ওদের সোনার বীম শুধু ছায়া দেখাতে পেরেছে। তাছাড়া গর্তের তলায় প্রচুর লোহা থাকায়…

আমাদের ইন্টেলিজেন্স খবর পাওয়া মাত্র ধেই ধেই করে নাচবে।

যদি লাল কমিউনিস্টরা চালাক হয়, তবে আর নাচতে হবে না, জিওর্দিনো বলে। .. আমাদেরকে এই জায়গায় ফিরে আসতে দেখে মনে করেছেন চুপ করে বসে থাকবে। ওদের জাহাজ গ্লোমার এক্সপ্লোরার?

অর্থাৎ তুমি বলছে, সাগরের তলদেশের জিওলজিক্যাল সার্ভের ব্যাপারে আমাদের ঘোষণা তারা বিশ্বাস করেনি? কণ্ঠে কপট বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইল পিট।

তিক্ত একটা দৃষ্টি উপহার দিল জিওর্দিনো, পিটকে। ইন্টেলিজেন্স অদ্ভুত এক ব্যাপার, সে বলে চলে, এই দেয়ালের ওপাশে বসা ত্রুরা জানে না, তুমি আমি কী করতে যাচ্ছি; কিন্তু ওয়াশিংটনে সোভিয়েত চরেরা আমাদের মিশনের উদ্দেশ্য টের পেয়েছে বহু মাস আগে। বাধা দেয়নি, তার একটাই কারণ, আমাদের টেকনোলজি ওদের চেয়ে ঢের উন্নত। ওরা চাইছে, আমরা খুঁজে দেই ওদের জিনিস।

ওদের ধোঁকা দেয়া সহজ হবে না, একমত হলেন নাইট। বন্দর ছাড়ার পর থেকেই ওদের দুটো ট্রলার আমাদের প্রতিটি মুভ অনুসরণ করছে।

সার্ভেইল্যান্স স্যাটেলাইট তো অনুসরণ করছেই, যোগ করে জিওর্দিনো।

এ জন্যই ব্রিজে ফোন করে আমি বলে দিয়েছি, যেই কোর্সে আছে ওটা শেষ করে আবার এই স্থানে ফিরে আসতে, পিট বলে।

ভালো চেষ্টা। কিন্তু আবার এইখানে ফিরে এলে রাশিয়ানরা সন্দেহ করবে।

তা করবে। কিন্তু আমরা একটা নিয়ম ধরে সার্চ করা থামাবো না। ওয়াশিংটনে রেডিওতে আমি জানাব, ইকুইপমেন্টে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে, কী করা উচিত এই ব্যাপারে পরামর্শও চাইব। কয়েক মাইল পর পরই এলোমেলো ঘুরে ওদের ধাঁধায় ফেলে দেবো একদম।

হ্যাঁ বিশ্বাসযোগ্য হবে ব্যাপারটা, টোপটা ওরা গিলতে পারে। ওয়াশিংটনে পাঠান আমাদের মেসেজ অবশ্যই শুনতে পাবে রাশিয়ানরা। বায়রন নাইটের উদ্দেশে বলল জিওর্দিনো।

ঠিক আছে। মেনে নিলেন নাইট। আমরা এখানে থামব না। টার্গেটের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছি, ভাব করছি যেন এখনো সার্চ চলছে।

ত্রিশ মাইল দূরে ভুয়া একটা আবিষ্কারের ব্যাপারে শোরগোল তুলে বিষয়টা আরো ঘোলাটে করা যাবে, পিট পরামর্শ দেয়।

তবে তাই হোক, বায়রন নাইট মুচকি হাসেন।

জাহাজ ঘুরে গেল। পানিতে ডুবে থাকা রোবট, নাম শারলক, একজোড়া মুভি ক্যামেরা আর একটা স্টিল ক্যামেরার সাহায্যে ছবি পাঠাতে শুরু করল। আবার গর্তের কিনারায় ফিরে এসেছে ওরা। গভীর তলদেশের ফটো দেখতে পাচ্ছে। ওই যে, আবার আসছে ওটা! ফিসফিস করে বলল জিওর্দিনো।

সোনোগ্রাফের পোর্টসাইড প্রায় সবটুকু দখল করে রেখেছে রাশিয়ান সাবমেরিন। গর্তের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে ওটা, প্রায় কাত অবস্থায়, গর্তের মুখের দিকে বো। তবে অক্ষত। ১৯৬০ সালে ডুবে যাওয়া মার্কিন সাবমেরিন প্রেসার কিংবা স্করপিয়নের মতো টুকরো টুকরো হয়ে যায়নি। নিখোঁজ হবার পর দশ মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনও ওটার গায়ে শ্যাওলা বা মরচে ধরেনি। আলফা-ক্লাস যে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, বিড়বিড় করে বললেন বায়রন নাইট। পারমাণবিক শক্তিচালিত, খোলটা টাইটানিয়ামে তৈরি, লবণাক্ত পানিতে মরচে ধরে না, ননম্যাগনেটিক।

সাথে লেটেস্ট সাইলেন্ট-প্রপেলার টেকনোলজিও আছে, বলল জিওর্দিনো। ওটার মতো দ্রুতগামী সাবমেরিন আর নেই কোথাও।

সোনার রেকর্ড আর ভিডিও ফটো আগেপিছে আসছে। ঘন ঘন ঘাড় ফেরাচ্ছে ওরা, যেন টেনিস ম্যাচ দেখছে সবাই। ধীরে ধীরে ক্যামেরার আওতা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে রাশিয়ান সাবমেরিন। দেড়শো ক্রু নিয়ে ডুবে যাবার পর আজই প্রথম ওটার ওপর কোনো মানুষের চোখ পড়ল, ভাবতে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল ওরা।

রেডিও অ্যাকটিভিটির অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছ? জিজ্ঞেস করল পিট।

সামান্য একটু বেড়েছে, বলল জিওর্দিনো। সম্ভবত সাবমেরিনের রিয়্যাক্টর থেকে।

সাবমেরিনের কিছু গলে যায়নি?

রিডিং তা বলছে না।

গলুইয়ের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয়, বায়রন নাইট বললেন, মনিটরগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে তিনি। পোর্ট ডাইভিং প্লেন ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে। পোর্ট বটমে গভীর দাগ, প্রায় বিশ মিটার লম্বা।

বেশ গভীর, বলল পিট। ব্যালাস্ট ট্যাংক ভেদ করে ইনার প্রেশার-হাল-এ ছুঁয়েছে। গর্তের ভেতর নামার সময় মুখের কোথাও বাড়ি খেয়েছিল। ক্যামেরার রেঞ্জ থেকে হারিয়ে গেল সাবমেরিনটা।

তার পরও মনিটরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল ওরা, কারও মুখে কথা নেই, তাকিয়ে আছে সাগরতলের দিকে, ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে স্ক্রিন। প্রায় আধ মিনিট চুপ করে থাকল ওরা। তারপর ঢিল পড়ল পেশিতে, যে যার চেয়ারে হেলান লি সবাই। পিট আর জিওর্দিনোর কাজ বলতে গেলে শেষ হয়েছে। খড়ের গাদার ভেতর একটা সূচ খুঁজে পেয়েছে ওরা।

পিটকে নির্লিপ্ত চেহারা নিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাতে দেখে জিওর্দিনো বুঝতে পারল, কী ভাবছে ও। চ্যালেঞ্জ নেই, কাজেই ভালো লাগাও নেই। এবার অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে যাবার তাড়না অনুভব করছে দুঃসাহসী লোকটা।

দারুণ দেখালে, ডার্ক, আর তুমিও, অ্যাল, উচ্ছ্বাসের সুরে বললেন নাইট। তোমরা নুমার লোকেরা ভাই সেরা। নিজেদের কাজ বোঝে।

আরে, এখনই খুশি হচ্ছেন কেন? পিট বলে। কঠিন কাজ পড়ে আছে। রাশিয়ানদের নাকের ডগা থেকে ওটা উত্তোলন করবেন কীভাবে? গ্লোমার এক্সপ্লোরারের সাহায্য তো আর পাচ্ছেন না। পানির তলে সমস্ত কাজ সারতে হবে

মনিটরের দিকে ফিরল জিওর্দিনো, এক সেকেন্ড পরই চেঁচিয়ে উঠল সে, ওটা আবার কী! মোটাসোটা একটা জগের মনে হচ্ছে না?

আরে তাই তো! বিস্ময় প্রকাশ করলেন কমান্ডার নাইট। কী হতে পারে?

দীর্ঘক্ষণ মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকল পিট, চিন্তিত। হঠাৎ করে কুঁচকে উঠল জোড়া। জিনিসটা খাড়া হয়ে রয়েছে। সরু গলার দুইপাশে বেরিয়ে রয়েছে দুটো হাতল, ক্রমশ চওড়া হয়ে গোল আকৃতি পেয়েছে। মুখ খুলল ও, ওটা একটা টেরাকোটা জার। রোমান আর গ্রিকরা ওগুলোয় তেল রাখত।

আমার ধারণা তুমি ঠিকই বলেছ, মন্তব্য করলেন বায়রন নাইট। মদ বা তেল নেয়ার জন্য গ্রিক আর রোমানরা ব্যবহার করত ওগুলো। ভূমধ্যসাগরের বহু জায়গায় এ ধরনের অনেক জার পাওয়া গেছে।

ওটা এখানে, গ্রিনল্যান্ড সাগরে কি করছে? জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো। ওই যে, আরেকটা উঁকি দিচ্ছে, ছবির বাঁ দিকে।

তারপর একসাথে আরও তিনটে জার বেরিয়ে গেল ক্যামেরার তলা দিয়ে। এরপর আরো পাঁচটি।

পিটের দিকে ফিরলেন বায়রন নাইট। তুমি তো বেশ কয়েকটা পুরনো জাহাজ উদ্ধার করেছ, এ ব্যাপারটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবে?

উত্তর দেয়ার আগে ঝাড়া দশ সেকেন্ড চুপ করে থাকল পিট। যখন কথা বলল, মনে হলো দূর থেকে ভেসে আসছে ওর গলা।

আমার ধারণা, প্রাচীন কোনো বিধ্বস্ত জাহাজ থেকে এসেছে ওগুলো। কিন্তু ইতিহাস বলছে, জাহাজটার এই এলাকায় আসার কোনো কারণ নেই।

.

০৬.

অসম্ভব কাজটা থেকে মুক্তি পাবার জন্য নিজের আত্মা বিক্রি করতেও রাজি আছে রুবিন। ঘামে ভেজা হাত স্টিয়ারিং হুইল থেকে তুলে নিতে চায় সে, ক্লান্ত চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে চায় মৃত্যুকে, কিন্তু আরোহীদের প্রতি দায়িত্ববোধ তাকে হাল ছাড়তে দিল না।

নেভিগেশন ইনস্ট্রমেন্টের কোনোটাই কাজ করছে না। প্রতিটি কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট অচল। আরোহীদের কেউ জীবনে কখনও প্লেন চালায়নি। ফুয়েল গজের কাটা শূন্যের ঘরের কাছে কাঁপছে। দুঃস্বপ্নও বোধ হয় এমন ভয়ংকর হয় না। সামান্য ভুলের ফলে পঞ্চাশজন লোকের সলিল সমাধি ঘটবে অজানা এক সমুদ্রের তলদেশে। ঠিক হলো, নিজের মনেই বলল রুবিন, মোটেও ঠিক হলো না ব্যাপারটা।

অনেক প্রশ্ন মাথা কুটছে রুবিনের মনে। পাইলট কোথায় গেলেন? ফ্লাইট অফিসারদের মৃত্যুর কারণ কী? এই সর্বনাশের পেছনে কার হাত আছে?

একটাই সান্ত্বনা রুবিনের। সে একা নয়। ককপিটে আরেক লোক তাকে সাহায্য করছে। এডুরাডো ইয়াবারা, মেক্সিকো প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য, একসময় তার দেশের এয়ারফোর্সে মেকানিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। মান্ধাতা আমলের একটা প্লেনে কাজ করার পর পেরিয়ে গেছে ত্রিশটা বছর, তবে কো-পাইলটের সিটে বসার পর ভুলে যাওয়া কারিগরি জ্ঞান একটু একটু করে মনে পড়ল তার। ইনস্ট্রমেন্টের রিডিং জানাচ্ছে সে কে, থ্রটলের দায়িত্ব নিয়েছে।

স্যুট পরিহিত এডুরাডো ছোট্টখাটো মানুষ, গায়ের রং তামাটে, মুখটা প্রায় গোল। ককপিটে তাকে একেবারেই বেমানান লাগছে। আশ্চর্য, একটুও ঘাবড়ায়নি সে, কপালে ঘাম ফোটেনি। কোট তো খোলেইনি, এমনকি টাইয়ের নটটা পর্যন্ত ঢিল করেনি। একটা হাত তুলে উইন্ডশিন্ডের বাইরে, আকাশ দেখল সে। তারা দেখে যতটুকু বুঝতে পারছি, উত্তর মেরুর দিকে যাচ্ছি আমরা।

সম্ভবত পূর্বদিকে রাশিয়ার ওপর দিয়ে, থমথমে গলায় বলল। কোর্স বা দিক, কিছুই জানা নেই।

কিন্তু পেছনে ওটা আমরা একটা দ্বীপ ফেলে এসেছি।

গ্রিনল্যান্ড হতে পারে?

মাথা নাড়ল এডুরাডো ইয়াবারা। গত কয়েক ঘণ্টা আমাদের নিচে পানি রয়েছে। দ্বীপটা গ্রিনল্যান্ড হলে এতক্ষণে আমরা আইসক্যাপের ওপর পৌঁছে যেতাম। আমার ধারণা, আইসল্যান্ডকে পেরিয়ে এসেছি।

মাই গড, তাহলে কতক্ষণ ধরে আমরা উত্তর দিকে যাচ্ছি?

লন্ডন-নিউ ইয়র্ক কোর্স থেকে ঠিক কখন সরে আসেন পাইলট কে জানে।

তাৎক্ষণিক মৃত্যু থেকে আরোহীদের প্রায় অলৌকিকভাবে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিপদ কাটেনি। সামনে উত্তর মেরু-হিমশীতল মৃত্যুফাঁদ। বেপরোয়া মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, ও তাই নিল। পোর্টের দিকে নব্বই ডিগ্রি বাঁক নেব আমি।

শান্তভাবে সায় দিল ইয়াবারা। আর কোনো উপায় দেখছি না।

প্লেন যদি বরফের ওপর আছড়ে পড়ে, দুএকজন বাঁচলেও বাঁচতে পারে। কিন্তু পানিতে পড়ে ডুবে গেলে কারও কোনো আশা নেই। আর যদি মিরাকল ঘটে, অক্ষত অবস্থায় নামাতে পারি প্লেনটাকে, আরোহীরা যে ধরনের কাপড় পরে আছে, কয়েক মিনিটের বেশি বাঁচবে না কেউ।

বোধ হয় অনেক দেরি করে ফেলেছি, মেক্সিকো প্রতিনিধিদলের সদস্য বলল। ইনস্ট্রুমেন্ট প্যানেলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে সে। লাল ফুয়েল ওয়ার্কিং লাইট ঘন ঘন জ্বলছে আর নিভছে। আকাশে ভেসে থাকার সময় শেষ হয়েছে আমাদের।

লাল আলোটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। তার জানা নেই, দেড় হাজার মিটার ওপরে দুশো নট গতিবেগে বোয়িং প্লেন যে পরিমাণ ফুয়েল হজম করে, সাড়ে দশ হাজার মিটার ওপরে পাঁচশো নট গতিবেগেও সেই একই পরিমাণ ফুয়েল হজম করে। সে ভাবল, যা আছে কপালে। পশ্চিম দিকে যেতে থাকি, তারপর যেখানে খুশি পড়ক গে। ঈশ্বর ভরসা।

হাতের তালু ট্রাউজারের পায়ায় মুছে নিয়ে শক্ত করে কন্ট্রোল কলাম ধরল সে। গ্লেসিয়ারের চূড়া টপকাবার পর এই প্রথম আবার প্লেনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিল। বড় করে একটা শ্বাস টেনে চাপ দিল অটোপাইলট রিলিজ বোতামে। ধীর ভঙ্গিতে ঘোরাতে শুরু করল প্লেন।

প্লেনের নাক আবার সরল একটা কোর্স ধরতেই সে বুঝতে পারল, কোথাও কোনো গোলযোগ ঘটে গেছে। চার নম্বর ইঞ্জিনের আরপিএম নামছে, কেঁপে গেল ইয়াবারার গলা। ফুয়েলের অভাবে অচল হয়ে যাচ্ছে ওটা।

ইঞ্জিনটা তাহলে বন্ধ করে দেয়া উচিত নয়?

নিয়মটা আমার জানা নেই, শুকনো গলায় বলল ইয়াবারা।

হায় ঈশ্বর, কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করল রুবিনের, এক অন্ধ আরেক অন্ধকে পথ দেখাচ্ছে। অলটিমিটারে দেখা গেল প্লেন আর সাগরের মাঝখানে দূরত্ব কমে আসছে দ্রুত। তারপর, হঠাৎ করে, কন্ট্রোল কলাম হাতের মুঠোর ভেতর নড়বড়ে হয়ে গেল, কাঁপতে লাগল থরথর করে।

প্লেন স্টল করছে! চেঁচিয়ে উঠল ইয়াবারা, এই প্রথম ভয় পেল সে। নাকটা নিচে নামান!

কন্ট্রোল কলাম সামনের দিকে ঠেলে দিল রুবিন, জানে অবধারিত মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করছে সে। ফ্ল্যাপ নামাও, ইয়াবারাকে নির্দেশ দিল।

ফ্ল্যাপস কামিং ডাউন, বলল ইয়াবারা।

বিড়বিড় করল, দিস ইজ ইট।

খোলা ককপিটের দরজায় একজন স্টুয়ার্ডের দাঁড়িয়ে রয়েছে, চোখ দুটো বিস্ফারিত চেহারা কাগজের মতো সাদা। জানতে চাইল, আমরা কি ক্র্যাশ করছি? কোনো রকমে শোনা গেল।

ব্যস্ত, তাকানোর সময় নেই, কর্কশকণ্ঠে বলল, হ্যাঁ, সিটে বসে বেল্ট বাঁধো যাও!

ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটল স্টুয়ার্ডেস, পর্দা সরিয়ে মেইন কেবিনে ঢোকার সময় হোঁচট খেল একবার। তার আতঙ্কিত চেহারা দেখে ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট আর প্যাসেঞ্জাররা বুঝল, উদ্ধার পাবার কোনো আশা নেই। আশ্চর্যই বলতে হবে, কেউ ফুঁপিয়ে বা চেঁচিয়ে উঠল না। লোকজন প্রার্থনাও করছে নিচু গলা।

ককপিট থেকে ঘাড় ফিরিয়ে মেইন কেবিনের দিকে তাকাল এডুরাডো ইয়াবারা। বৃদ্ধ এক লোক নিঃশব্দে কাঁদছে, তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন হে’লা কামিল। মহাসচিবের চেহারা সম্পূর্ণ শান্ত। সত্যি আশ্চর্য এক মহিলা, ভাবল ইয়াবারা। দুঃখজনকই বটে যে তার সমস্ত সৌন্দর্য খানিক পরই নিঃশেষে মুছে যাবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনস্ট্রুমেন্ট প্যানেলের দিকে ফিরল সে।

দুশো মিটারের ঘর ছাড়িয়ে নেমে এসেছে অলটিমিটারের কাঁটা। বিরাট একটা ঝুঁকি নিয়ে অবশিষ্ট তিনটে ইঞ্জিনের ফুয়েল খরচ বাড়িয়ে দিল ইয়াবারা। বেপরোয়া একজন মানুষের অর্থহীন কাণ্ড। ইঞ্জিনগুলো এখন শেষ কয়েক গ্যালন ফুয়েল তাড়াতাড়ি পুড়িয়ে অচল হয়ে যাবে। আসলে ইয়াবারার চিন্তা-ভাবনায় এই মুহূর্তে যুক্তির কোনো অবদান নেই। কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকতে পারছে না সে। একটা কিছু করার তাগাদা অনুভব করছিল সে, তাতে যদি তার নিজের মৃত্যু হয় তো হোক।

বিভীষিকাময় পাঁচটা মিনিট পেরিয়ে গেল যেন এক পলকে। প্লেনটাকে খামচে ধরার জন্য বিদ্যুৎ বেগে ওপর দিকে ছুটে এল কালো সাগর। আ-আলো! অবিশ্বাস আর উত্তেজনায় তোতলালো রুবিন। আমি আ-আলো দেখতে পাচ্ছি! নাক বরাবর সামনে!

উইন্ডশিন্ডের ভেতর থেকে হঠাৎ করেই ইয়াবারা দেখতে পেল সেই আলো। জাহাজ! চেঁচালো সে। একটা জাহাজ।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, আইসব্রেকার পোলার এক্সপ্লোরার-এর ওপর দিয়ে উড়ে গেল বোয়িং, দশ মিটারের জন্য রাডার মাস্টের সাথে ধাক্কা খেল না।

.

০৭.

রাডার আগেই সাবধান করে দিয়েছিল ক্রুদের, একটা প্লেন আসছে। ব্রিজে দাঁড়ানো লোকজন বোয়িংয়ের গর্জন শুনে নিজেদের অজান্তেই মাথা নামিয়ে আড়াল খুঁজল। জাহাজের মাস্তুল প্রায় ছুঁয়ে গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের দিকে ছুটে গেল প্লেনটা।

কমান্ডার বায়রন নাইটের সাথে ঝড়ের বেগে ব্রিজে ঢুকল পিট আর জিওর্দিনো। অপসয়মান প্লেনটার দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। হোয়াট দ্য হেল ওয়াজ দ্যাট ডিউটিরত অফিসারকে জিজ্ঞেস করলেন কমান্ডার।

অজ্ঞাতপরিচয় একটা প্লেন, ক্যাপটেন।

সামরিক?

না, স্যার। মাথার ওপর দিয়ে যাবার সময় ডানার তলাটা দেখেছি আমি। কোনো মার্কিং নেই।

সম্ভবত একটা স্পাই প্লেন!

মনে হয় না। সব কটা জানালায় আলো ছিল।

অ্যাল জিওর্দিনো মন্তব্য করল, কমার্শিয়াল এয়ার লাইনার?

বিস্মিত কমান্ডার বললেন, লোকটা পাইলট, নাকি গাড়োয়ান? আমার জাহাজকে বিপদে ফেলতে যাচ্ছিল! ব্যাটা এদিকে কী করছে, শুনি? কমার্শিয়াল ফ্লাইটের পথ থেকে কয়েকশো মাইল দূরে রয়েছি আমরা!

প্লেনটা নিচে নামছে, বলল পিট, পুবদিকে তাকিয়ে ক্রমশ ছোটো হয়ে আসা নেভিগেশন লাইটগুলো দেখছে ও। আমর ধারণা, নামতে বাধ্য হচ্ছে ওরা।

এই অন্ধকারে ল্যান্ড করতে যাচ্ছে? জিওর্দিনো ক্রস চিহ্ন আঁকল বুকে। ঈশ্বর ওদের সহায় হোন। কিন্তু তাহলে ল্যান্ডিং লাইট জ্বালেনি কেন?

ডিউটি অফিসার বলল, বিপদে পড়লে পাইলট তো ডিসট্রেস সিগন্যাল পাঠাবে। কমিউনিকেশন রুম কিছুই শোনেনি।

তুমি সাড়া পাবার চেষ্টা করেছ? জিজ্ঞেস করলেন বায়রন নাইট।

হ্যাঁ, রাডারে ধরা পড়ার সাথে সাথে। কোনো রিপ্লাই পাইনি।

জানালার সামনে সরে গিয়ে বাইরে উঁকি দিলেন কমান্ডার। জানালার কাছে চার সেকেন্ড আঙুল নাচালেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলেন ডিউটি অফিসারের। যেখানে আছি সেখানেই থাকছি আমরা।

কেউ কোনো কথা বলল না দেখে পিটই মুখ খুলল, সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার নিঃসন্দেহে আপনারই, তবে সমর্থন বা প্রশংসা করতে পারছি না।

তুমি একটা নেভি শিপে রয়েছে, পিট, অহেতুক কর্কশ স্বরে বললেন বায়রন নাইট। আমরা কোস্ট গার্ড নই। তুমি জানো, এখানে এই মুহূর্তে আমরা একটা দায়িত্ব পালন করছি।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মৃতুকণ্ঠে, অনেকটা যেন জনান্তিকে বলল পিট, প্লেনটায় বাচ্চা আর মহিলাও থাকতে পারে।

দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তা কে বলবে? এখনও প্লেনটা আকাশে রয়েছে। উদ্ধার করে বলে কোনো সাহায্যও তারা চাইছে না। তুমি তো একজন পাইলট, তুমিই বলো, বিপদেই যদি পড়ে থাকে, পোলার এক্সপ্লোরারকে ঘিরে চক্কর দেয়নি কেন ওরা?

মাফ করবেন, ক্যাপটেন, ডিউটি অফিসার বলল, বলতে ভুলে গেছি, ল্যান্ডিং ফ্ল্যাপস নামানো ছিল।

তাতেও প্রমাণ হয় না যে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, জেদের সুরে বললেন বায়রন নাইট।

রাখেন আপনার যুক্তি-তর্ক, ফুল স্টিম অ্যাহেড! ঠাণ্ডা স্বরে বলে পিট। এখন যুদ্ধ চলছে না। মানবতার খাতিরে আমরা না গিয়ে পিরবো না। সময়মত তৎপর হইনি বলে যদি একশো মানুষ মারা পড়ে, কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না আমি। ফুয়েল খরচ যতো হয়, হোক।

খালি চার্ট রুমের দিকে ইঙ্গিত করলেন ক্যাপটেন, পিট আর জিওর্দিনো ঢোকার পর দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আমাদের নিজেদের একটা মিশন আছে, শান্তস্বরে নিজের মতামত জানালেন তিনি। অনুসন্ধান বন্ধ রাখা এক কথা, আর স্পট ছেড়ে চলে যাওয়া সম্পূর্ণ অন্য কথা-রাশিয়ানরা সন্দেহ করবে তাদের সাবমেরিন আমরা খুঁজে পেয়েছি। আমরা চলে যাবার সাথে সাথে এলাকাটা চষে ফেলবে ওরা।

আপনার কথায় যুক্তি আছে, বলল পিট। সেক্ষেত্রে আমাদের দু’জনকে আপনি ছেড়ে দেন।

বলল, আমি শুনছি।

আফটার ডেক থেকে নুমার একটা কপ্টার নিয়ে আমি আর জিওর্দিনো রওনা হয়ে যাই, সাথে একটা মেডিকেল দল আর দু’জন ক্রু থাকুক। ঘুরে দেখে আসি প্লেনটা কোথায় পড়েছে। যদি সম্ভব হয় উদ্ধারকাজ চালানো হবে। পোলার এক্সপ্লোরার তার অনুসন্ধান চালু রাখুক।

আর রাশিয়ান সার্ভেইল্যান্স? তারা কী ভাববে?

প্রথমে ওরা মনে করবে কোনো কোইনসিডেন্স। ইতিমধ্যে নির্ঘাত ব্যাপারটা নিয়ে দ্বিধায় ভুগছে ওরাও। কিন্তু ঈশ্বর না করুন, ওটা যদি সত্যি বাণিজ্যিক এয়ারলাইনার হয়, সেক্ষেত্রে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে যেতে হবে আপনাকে। উদ্ধার শেষে আবার নিজের কাজে ফিরে যাবে পোলার এক্সপ্লোরার।

তোমাদের হেলিকপ্টারের গতিপথ ওরা পর্যবেক্ষণ করবে, জানো তো।

আমি আর অ্যাল খোলা চ্যানেলে আমাদের কথাবার্তা চালাব, এতে করে ওরা বুঝবে আমরা আসলেই উদ্ধারকাজে চলেছি।

এক মুহূর্ত শূন্য চোখে তাকিয়ে কিছু একটা চিন্তা করলেন বায়রন নাইট। এরপর মুখ খুললেন, তাহলে দেরি করছো কেন? ভ্রু কুঁচকালেন কমান্ডার। জলদি কপ্টারে গিয়ে ওঠো তোমরা, বাকি সবাইকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

.

পোলার এক্সপ্লোরারকে ঘিরে চক্কর না দেওয়ার পেছনে রুবিনের বেশ কয়টি কারণ আছে। প্রথমত, দ্রুত উচ্চতা হারাচ্ছিল বিমান, আর দ্বিতীয়ত, তার নিজের পাইলট জ্ঞান অত্যন্ত স্বল্প। নিমিষে বরফের রাজ্যে প্লেন ক্রাশ করে সব শেষ করে দেওয়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার।

জাহাজের আলো যেন আশার আলো জ্বাললো মনে। এখন অন্তত একটা উদ্ধারকারী দল পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

অকস্মাৎ দেখা গেল কালো সাগর নয়, ওদের নিচে জমাট বাঁধা নিরেট বরফ। তারার আলোয় কাছ থেকে নীলচে চকচকে দেখল আদিগন্ত বরফের রাজ্য। সংঘর্ষ, স্পর্শ বা পতন, যাই বলা হোক, আর মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার। এই সময় হঠাৎ রুবিনের মনে পড়ল ইয়াবারাকে ল্যান্ডিং আলো জ্বালার কথা বলা দরকার।

আলো জ্বলে ওঠার সাথে সাথে হতচকিত একটা মেরু ভালুককে দেখতে পেল ওরা। এক পলকে প্লেনের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল সেটা। যিশুর মায়ের দিব্যি, বিড়বিড় করে উঠল ইয়াবারা, ডান দিকে পাহাড় দেখতে পাচ্ছি আমি। সাগর পেরিয়ে জমির ওপর চলে এসেছি আমরা।

অবশেষে ভাগ্যের দাঁড়িপাল্লা রুবিন আর আরোহীদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। পাহাড় একটা নয়, এক সারিতে পাশাপাশি অনেকগুলো, গ্রিনল্যান্ডের উপকূল বরাবর দুদিকে একশো মাইল পর্যন্ত ওগুলোর বিস্তৃতি। তবে সেদিকে প্লেনের নাক ঘোরাতে ব্যর্থ হলো রুবিন, নিজের অজান্তে আরডেনক্যাপল ফিরড-এর মাঝখানে নামিয়ে আনছে নিজেদের। লোয়ার দ্য ল্যান্ডিং গিয়ার! নির্দেশ দিল সে।

নিঃশব্দে নির্দেশ পালন করল ইয়াবারা। সাধারণ ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংয়ের সময় এই পদ্ধতি সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, তবে অজ্ঞতাবশত হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে রুবিন। বরফে ল্যান্ড করার সময় দক্ষ একজন পাইলটও এই সিদ্ধান্ত নিত। ল্যান্ডিং গিয়ার নামানোর ফলে দ্রুত নিচে নামছে প্লেন। রুবিন বা ইয়াবারা, কারও কিছু করার নেই আর। দু’জনের কেউই জানে না যে নিচের বরফ মাত্র এক মিটার পুরু, একটা বোয়িং সাতশো বি-র ভার সহ্য করার জন্য যথেষ্ট নয়।

ইনস্ট্রুমেন্ট প্যানেলের প্রায় সব আলো লাল সঙ্কেত দিচ্ছে। ওদের মনে হলো কালো একটা পর্দা ছিঁড়ে সাদা পাতালে প্রবেশ করল প্লেন। কন্ট্রোল কলাম ধরে টানল। বোয়িংয়ের গতি কমে গেল, সেই সাথে শেষবারের মতো উঁচু হলো নাকটা-আবার আকাশের উঠতে চাওয়ার দুর্বল প্রচেষ্টা।

আতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে ইয়াবারা। তার মাথা ঠিকমত কাজ করছে না। থ্রটল টেনে কাছে আনার কথা মনে থাকল না, মনে থাকল না ফুয়েল সাপ্লাই বন্ধ করা দরকার, অফ করা দরকার ইলেকট্রিক সুইচগুলো।

তারপর সংঘর্ষ ঘটল।

চোখ বুজে হাত দিয়ে নিজেদের মুখ ঢাকল ওরা। চাকা বরফ স্পর্শ করল, পিছলে গেল, গভীর জোড়া দাগ তৈরি হলো বরফের গায়ে। পোর্ট সাইডের ইনবোর্ড ইঞ্জিন দুমড়েমুচড়ে মাউন্টি থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল, ছিটকে পড়ে ডিগবাজি খেল বরফের ওপর। স্টারবোর্ডের দুটো ইঞ্জিনই গেঁথে গেল বরফের ভেতর, মোচড় খেয়ে বিচ্ছিন্ন হলো ডানাটা। পরমুহূর্তে সমস্ত পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেল, নেমে এল ঘোর অন্ধকার।

বরফ ঢাকা খাড়ির ওপর দিয়ে ধূমকেতুর মতো ছুটে চলেছে প্লেনটা, পেছনে ছড়িয়ে যাচ্ছে উত্তপ্ত ধাতব টুকরো। প্যাক আইস পরস্পরের সাথে সংঘর্ষের সময় একটা প্রেশার রিজ তৈরি হয়েছিল, সেটাকে ধুলোর মতো উড়িয়ে দিল বোয়িং। নাকের গিয়ার চ্যাপ্টা হয়ে ঢুকে গেল সামনের পেটের ভেতর, ছিঁড়ে ফেলল হেল হোল-এর আবরণ। নিচু হলো বো, বরফ খুঁড়তে খুঁড়তে এগোল, প্রতি মুহূর্তে ভেতর দিকে তুবড়ে মোটা অ্যালুমিনিয়াম শিট ককপিটে ঢুকে যাচ্ছে। অবশেষে নিজস্ব গতিবেগ হারিয়ে বিকলাঙ্গ বোয়িং স্থির হলো। বরফ ঢাকা তীর মাত্র ত্রিশ মিটার দূরে, ওখানে বড় আকারের পাথরের স্তূপ।

কয়েক মুহূর্ত মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা অটুট থাকল। তারপর বরফ ফাটার জোরাল শব্দের সাথে শোনা গেল ধাতব গোঙানি। ধীরে ধীরে বরফের আবরণ ভেঙে খড়ির পানিতে নেমে যায় বোয়িংটা।

.

০৮.

খাড়ির দিকে প্লেনটার উড়ে যাওয়ার শব্দ আর্কিওলজিস্টরাও শুনতে পেল। আশ্রয় থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে প্লেনটার ল্যান্ডিং লাইট দেখতে পেল তারা। আলোকিত কেবিনের জানালাগুলো ধরা পড়ল তাদের চোখে। তার পরই কানে এল পতনের শব্দ, সেই সাথে পায়ের তলায় অবিচ্ছিন্ন বরফের মেঝে কেঁপে উঠল। খানিক পর আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকে গাঢ় হয়ে নামল অন্ধকার। বাতাসের গোঙানি ছাড়া কিছু শোনা গেল না।

গুড লর্ড! অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙলেন, ড. গ্রোনকুইস্ট, খাড়িতে বিধ্বস্ত হয়েছে ওটা।

ভয়াবহ! লিলির গলায় অবিশ্বাস আর বিস্ময়। একজনও বাঁচবে না!

বোধহয় পানিতে ডুবে গেছে, সেজন্যই কোনো আগুন দেখা গেল না, মন্তব্য করল গ্রাহাম।

হকিন্স জিজ্ঞেস করল, কী ধরনের প্লেন, কেউ দেখেছ?

মাথা নাড়ল গ্রাহাম। চোখের পলকে বেরিয়ে গেল। তবে বেশ বড়সড়। সম্ভবত একাধিক ইঞ্জিন। বরফ জরিপের জন্য এসে থাকতে পারে।

দূরত্ব আন্দাজ করে দেখি, আহ্বান জানালেন ড. গ্রোনকুইস্ট।

স্নান চেহারা নিয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে লিলি। কথা বলে সময় নষ্ট করছি। আমরা। ওদের সাহায্যে দরকার।

ঠিক, সায় দিলেন ড. গ্রোনকুইস্ট। এসো, আগে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচি।

আশ্রয়ে ফিরে এসে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল ওরা, সেই সাথে প্ল্যানটাও তৈরি করল। লিলি বলল, কম্বল লাগবে, অতিরিক্ত সবগুলো গরম কাপড় সাথে নাও। আমি মেডিকেল সাপ্লাই নিচ্ছি।

মাইক গ্রাহাম, ড. গ্রোনকুইস্ট নির্দেশ দিলেন, রেডিওতে ডেনবর্গ স্টেশনকে জানাও। থিউল-এর এয়ারফোর্স রেসকিউ ইউনিটকে খবর পাঠাবে ওরা।

বরফ খুঁড়ে আরোহীদের বের করতে হতে পারে, সাথে কিছু টুলস থাকা দরকার, প্রস্তাব দিল হকিন্স।

নিজের পারকা আর গ্লাভস চেক করে নিয়ে মাথা ঝাঁকালেন ড. গ্রোনকুইস্ট। আর কি দরকার হতে পারে ভেবে দেখো। একাটা সোমোবাইলের সাথে স্লেড বেঁধে নিচ্ছি আমি।

ঘুম ভাঙার পর পাঁচ মিনিটও পেরোয়নি, বিবেকের আহ্বান সাড়া দিয়ে গভীর অন্ধকার রাতে হিম বরফের রাজ্যে বেরিয়ে পড়ল দলটা। একটা শেডের ভেতর রয়েছে স্নোমোবাইলগুলো, শেডের ভেতর তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে বিশ ডিগ্রি বেশি রাখা হয়েছে হিটার জ্বেলে, তার পরও প্রথম স্নোমোবাইলটা পাঁচবারের চেষ্টায় স্টার্ট নিল, দ্বিতীয়টা নিল বত্রিশ বারের মাথায়। ইতোমধ্যে জিনিসপত্র নিয়ে আশ্রয় থেকে বেরিয়ে এসেছে অন্যান্যরা। ড. গ্রোনকুইস ছাড়া সবার পরনে পা পর্যন্ত লম্বা জাম্পস্যুট। সবাইকে একটা করে হেভি-ডিউটি ফ্ল্যাশ লাইট দিলেন তিনি। রওনা হয়ে গেল দলটা। লিলির কোমর ধরে স্নোমোবাইলে তুলে নিলেন ভদ্রলোক। দ্বিতীয়টায় উঠল মাইক গ্রাহাম আর জোসেফ হসকিন্স।

খাড়ির ওপর বরফের আবরণ এবড়োখেবড়ো, ঝাঁকি খেতে খেতে এগোল স্নোমোবাইল, প্রতি মুহূর্তে বিপদের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকল আরোহীরা। বরফের পাতলা আবরণ ভেঙে যেতে পারে। প্রেশার রিজগুলো আগে থেকে চেনা কঠিন, ঢাল বেয়ে ওঠার পর টের পাওয়া যায়। ড. গ্রোনকুইস্টের বিশালবপু এক হাতে বেড় দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে লিলি শার্প, চোখ বন্ধ, মুখ গুঁজে দিয়েছে দলনেতার কাঁধে। মাঝেমধ্যে মুখ তুলে গতি কমাবার জন্য চিৎকার করছে সে, কিন্তু তার কথায় কান না দিয়ে ফুলম্পিডে স্লোমোবাইল চালাচ্ছেন ড. গ্রোনকুইস্ট। ঘাড় ফিরিয়ে একবার পেছন দিকে তাকাল লিলি। পিছু পিছু আসছে ওরা।

দ্বিতীয় স্নোমোবাইল স্লেড টানছে না, কাজেই প্রথমটাকে পাশ কাটিয়ে গেল অনায়াসে, দেখতে দেখতে বরফের রাজ্যে হারিয়ে গেল মাইক আর হসকিন্স।

বেশ খানিক পর স্নোমোবাইলের আলোর শেষ প্রান্তে বড়সড় একটা ধাতব আকৃতি মাথাচাড়া দিচ্ছে দেখে পেশিতে টান পড়ল ড. গ্রোনকুইস্টের। হঠাৎ করে হ্যান্ডগ্রিপটা বাঁ দিকে ঘুরিয়ে আটকে দিলেন তিনি। সামনের স্কি-গুলোর কিনারা বরফের ভেতর গেঁথে গেল, প্লেনের একটা বিচ্ছিন্ন ডানা এক মিটার দূরে থাকতে আরেক দিকে ঘুরে গেল স্নোমোবাইল। বাহনটাকে সিধে করার প্রাণান্ত চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু একবার কাত হতে শুরু করায় স্লেডটাকে আর সিধে করা গেল না, জিনিসপত্র নিয়ে উল্টে পড়ল সেটা, হ্যাঁচকা টান খেয়ে আরও কাত হয়ে গেল স্লেমোবাইলেও। তারপর কী ঘটল দু’জনের কেউই বলতে পারবে না। কামানের গোলার মতো ছিটকে পড়লেন ড. গ্রোনকুইস্ট, তার আর্তনাদ শুনতে পেল লিলি। অন্ধকার শূন্যে সেও ছিটকে পড়েছে, কিন্তু কোথায় কোনো ধারণা নেই। স্লেডটা ধেয়ে এল তার দিকে, কয়েক ইঞ্চির জন্য ধাক্কা দিল না। কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল সেটা। স্নোমোবাইল ওল্টাতে গিয়েও ওল্টায়নি, ছুটে এসে লিলির পাশে থামল সেটা, এখনও কাত হয়ে রয়েছে। তারপর সেটা পড়ল। সরাসরি লিলির একটা পায়ের ওপর। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল সে।

পেছনের দুর্ঘটনা সম্পর্কে সাথে সাথে কিছু টের পায়নি মাইক আর হসকিন্স। পেছনে ওদেরকে কতদূর ফেলে এসেছে জানার কৌতূহল নিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাল মাইক। বহু পেছনে ওদের আলো নিচের দিকে মুখ করে স্থির হয়ে রয়েছে দেখে তাজ্জব বনে গেল সে। হসকিন্সের কাঁধে হাত দিয়ে চিৎকার করে বলল ওরা বোধহয় বিপদে পড়েছে!

প্ল্যানটা ছিল, প্লেনের চাকার দাগ ধরে অকুস্থলে পৌঁছবে ওরা। সেই দাগ খোঁজার কাজে ব্যস্ত ছিল হসকিন্স। তাই নাকি! বলেই বিরাট একটা বৃত্ত রচনা করে স্লোমোবাইল ঘোরাতে শুরু করল সে। একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার ফলে চোখ ব্যথা করছে, তার, ফলে ভালো করে দেখতে পায়নি সামনেটা। প্লেনের চাকার রেখে যাওয়া গভীর গর্তটা যখন দেখতে পেল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। দুমিটার ফাঁকাটার কিনারা থেকে শূন্যে উঠে গেল ওদের বাহন। দু’জন আরোহীর ভার থাকায় বাহনের নাকটা নুয়ে পড়ল নিচের দিকে, সংঘর্ষ ঘটল গর্তের অপর প্রান্তের দেয়ালের সাথে, শব্দ শুনে মনে হলো পিস্তলের গুলি ছোঁড়া হয়েছে। ভাগ্য ভালো বলতে হবে, গর্তের কিনারা টপকে বরফের ওপর আছাড় খেয়ে স্থির হয়ে গেল দু’জনেই, যেন অযত্নে ফেলে রাখা কাপড়ের তৈরি একজোড়া পুতুল।

ত্রিশ সেকেন্ড পর অশীতিপর বৃদ্ধের মতো নড়ে উঠল হকিন্স। হাঁটু আর কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হলো সে। তারপর বসল, কিন্তু আচ্ছন্ন ভাবটা কাটল না। এখনও বুঝতে পারছে না এখানে কীভাবে এল সে। হিস হিস শব্দ শুনে ঘাড় ফেরাল।

পিঠ বাঁকা করে বসে রয়েছে মাইক, দুহাতে পেট চেপে ধরে গোঙাচ্ছে।

প্রথম দস্তানাটা খুলে নাকে আঙুল বুলালো হসকিন্স। না, ভাঙেনি। তবে ফুটো দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, ফলে মুখ দিয়ে বাতাস টানতে হচ্ছে ওকে। অন্য কোনো হাড়ও ভাঙেনি, কারণ মোটা গরম কাপড়ে মোড়া ছিল শরীরটা। হামাগুড়ি দিয়ে উইনফিল্ডের কাছে চলে এল সে। কী ঘটেছে? প্রশ্ন করেই বুঝল বোকামি হয়ে গেল।

প্লেনের চাকা বরফের গায়ে একটা গর্ত রেখে গেছে…

লিলি আর ড. গ্লোনকুইস্ট…?

দুশো মিটার পেছনে রয়েছে ওরা, বলল মাইক। গর্তটাকে ঘুরে যেতে হবে আমাদের, ওদের বোধহয় সাহায্য দরকার।

ব্যথায় গোঙাতে গোঙাতে কোনোরকমে দাঁড়াল হসকিন্স। এক পা এক পা করে গর্তের কিনারায় এসে থামল সে। অদ্ভুত কাণ্ড, সোমোবাইলের হেডল্যাম্প এখনও জ্বলছে। ল্যাম্পের ম্লান আলোয় গর্তের ভেতর তলাটা দেখতে পাওয়া গেল। খাঁড়ির পানিতে অসংখ্য বুদ্বুদ, লাফ দিয়ে উঠে আসছে বরফের মেঝে ছাড়িয়ে ছফুট ওপরে। তার পাশে এসে দাঁড়াল মাইক। একযোগে পরস্পরের দিকে তাকাল ওরা।

মানবতার সেবক! ঝঝের সাথে বলল হসকিন্স। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ব্যাকুল। যার যা কাজ তাই তার করা উচিত, বুঝলে! আমরা আর্কিওলজি বুঝি, তাই নিয়ে থাকা উচিত ছিল!

চুপ! হঠাৎ তাগাদা দিল মাইক। শুনতে পাচ্ছ? একটা হেলিকপ্টার! ফিয়র্ডের দিক থেকে এদিকেই আসছে।

একটা ঘোর আর বাস্তবতার মাঝখানে ভাসছে লিলি।

সে বুঝতে পারছে না, সহজ-সরলভাবে চিন্তা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে কেন। মাথা তুলে ড. গ্রোনকুইস্টের খোঁজ করল সে। কয়েক মিটার দূরে অনড় পড়ে রয়েছেন তিনি। চিৎকার করে ডাকল লিলি, কিন্তু তিনি নড়লেন না, যেন মারা গেছেন। হাল ছেড়ে দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল সে, একটা পা সমস্ত অনুভূতি হারিয়ে ফেলার সাথে সাথে তার ইচ্ছে হলো ঘুমিয়ে পড়ে।

লিলি জানে, মাইক আর হসকিন্স যেকোনো মুহূর্তে ফিরে আসবে। কিন্তু সময় ধীরগতিতে বয়ে চলল। কারও দেখা নেই। ঠাণ্ডায় কাঁপছে সে। ভীষণ ভয় লাগছে। তারপর তন্দ্রা মতে এল। এই সময় শব্দটা শুনতে পেল সে। হঠাৎ করে চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল কালো আকাশ। ঝুরঝুরে তুষার উড়ল তার চারপাশে। যান্ত্রিক শব্দটা থেমে গেল একসময়। আলো ঘেরা অস্পষ্ট একটা মূর্তি এগিয়ে এল তার দিকে।

মূর্তিটা ধীরে ধীরে ভারী পারকায় মোড়া একটা মানুষের আকৃতি নিল। মানুষটা প্রথমে তাকে ঘিরে ঘুরল একবার, যেন পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করল। তারপর একটানে তার পায়ের ওপর থেকে তুলে ফেলল স্নোমোবাইলটা। আবার তার চারদিকে ঘুরল মানুষটা, এবার তার মুখে আলো পড়ায় চেহারাটা পরিষ্কার দেখতে পেল লিলি। এই বিপদেও বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠল তার, এমন ঝকঝকে সবুজ চোখ জীবনে দেখেনি সে। কাঠিন্য, কোমলতা, আন্তরিক উদ্বেগ সব যেন খোলা বইয়ের মতো পড়া গেল মুখটায়। সে একটা মেয়ে দেখে আগন্তুকের চোখ একটু সরু হলো। লিলি ভাবল, এই লোক এল কোত্থেকে?

কী বলবে ভেবে না পেয়ে শুধু বলল সে, তোমাকে দেখে কী যে খুশি লাগছে আমার!

আমার নাম ডার্ক পিট, হাসিখুশি কষ্ঠ থেকে জবাব এল। খুব যদি ব্যস্ততা না থাকে, কাল রাতে আমার সাথে ডিনার খেতে আপত্তি আছে?

.

০৯.

পিটের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল লিলি, সন্দেহ হলো শুনতে ভুল করেছে। কোথাও যাবার অবস্থা আমার বোধ হয় নেই।

পারকার হুড মাথার পেছনে সরিয়ে দিয়ে লিলির পাশে হাঁটু গেড়ে বসল পিট, তার গোড়ালিতে হাত দিয়ে টিপে টিপে দেখল। হাড় ভাঙেনি, কোথাও ফুলেও নেই, সহাস্যে বলল ও। ব্যথা?

ঠাণ্ডায় অবশ হয়ে গেছি, ব্যথা লাগলেও টের পাব না।

স্লেড থেকে ছিটকে পড়া একটা কম্বল তুলে নিয়ে লিলিকে ঢাকল পিট। তুমি প্লেনের প্যাসেঞ্জার নও। এখানে এলে কীভাবে?

নিজেদের পরিচয় দিল লিলি, প্লেনের শব্দ শোনার পর থেকে যা যা ঘটেছে সব বলল। সবশেষে একটা হাত তুলে উল্টে পড়া স্লেডটা দেখল পিটকে

হেলিকপ্টারের আলোয় দুর্ঘটনার ছবিটা চট করে দেখে নিল পিট। এই প্রথম নজরে পড়ল, দশ মিটার দূরে আরেকজন পড়ে রয়েছে। প্লেনের বিচ্ছিন্ন ডানাটাও দেখতে পেল। এক মিনিট।

হেঁটে এসে ড. গ্রোনকুইস্টের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল পিট। বিশালদেহী আর্কিওলজিস্ট নিয়মিত নিঃশ্বাস ফেলছেন। ব্যস্ত হাতে তাকে পরীক্ষা করল ও। তীক্ষ্ণ চোখে ওকে লক্ষ করছে লিলি, জিজ্ঞেস করল, উনি কি মারা গেছেন?

আরে না! মাথায় চোট পেয়েছেন, তা-ও সামান্য।

উইনফিল্ডের পিছু পিছু খোঁড়াতে খোঁড়াতে এল হকিন্স, ঠিক যেন একজোড়া তুষারদানব। নিঃশ্বাস বরফ হয়ে যাওয়ায় দু’জনের ফেস মাস্কই ঝাপসা হয়ে গেছে। নিজের মাস্কটা তুলল হসকিন্স, রক্তাক্ত মুখ নিয়ে তাকাল পিটের দিকে, আড়ষ্টভঙ্গিতে হাসল সে। স্বাগতম, আগন্তুক। এক্কেবারে যথাসময়ে পৌঁছেছেন।

আপনারা…?

ওদের কথাই বলছিলাম, লিলি জানাল। আমরা একই দলে। ওরা সামনে ছিল, তাই আমরা যে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছি ওরা জানে না…

তোমরাও জানো না যে আমরাও একই দুর্ভাগ্যের শিকার, হেসে উঠে বলল মাইক।

আপনারা প্লেনটা দেখেছেন? হসকিন্সকে জিজ্ঞেস করল পিট।

নামতে দেখেছি, তবে কাছে যাবার সুযোগ হয়নি। ড. গ্রোনকুইস্টের দিকে এগোল হকিন্স, তার পিছু নিল মাইক। কী রকম চোট পেয়েছেন উনি? সিরিয়াস? লিলির দিকে তাকাল সে। তুমি?

জবাব দিল পিট, এক্স-রে করার পর নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।

ওদের সাহায্য দরকার। আশা করি…

হেলিকপ্টারে মেডিকেল দল আছে, কিন্তু…

পিটকে থামিয়ে দিয়ে প্রায় ধমকের সুরে চিৎকার করে হসকিন্স বলল, তাহলে ছাই আপনি অপেক্ষা করছেন কী মনে করে? ডাকুন ওদের! পিটকে পাশ কাটিয়ে নিজেই হেলিকপ্টারের দিকে এগোল সে, কিন্তু লোহার মতো শক্ত একটা মুঠো তার কব্জি চেপে ধরল।

আপনার বন্ধুদের অপেক্ষা করতে হবে, দৃঢ়কণ্ঠে বলল পিট। প্লেনটা খাড়িতে ডুবে গেছে বলে সন্দেহ করছি আমরা। কেউ যদি বেঁচে থাকে, সবার আগে তার চিকিৎসা দরকার। আপনাদের ক্যাম্প এখান থেকে কত দূরে?

দক্ষিণ দিকে এক কিলোমিটার, অভিযোগের সুরে জবাব দিল হকিন্স।

স্নোমোবাইল এখনও চালানো যাবে। সঙ্গীকে সাথে নিয়ে স্লেডটা উদ্ধার করুন। আহতদের নিয়ে ফিরে যান ক্যাম্পে। সাবধানে যাবেন, কারণ ওদের শরীরের ভেতর কোথাও চোট লেগে থাকতে পারে। নিশ্চয়ই রেডিও আছে?

গম্ভীর হসকিন্স মাথা ঝাঁকাল।

থারটি-টু ফ্রিকোয়েন্সিতে কান রেখে তৈরি থাকবেন, বলল পিট। প্লেনটা যদি প্যাসেঞ্জার ভরা কমার্শিয়াল জেটলাইনার হয়, নরক সাফ করার দায়িত্ব চাপবে আমাদের ঘাড়ে।

আমরা তৈরি থাকব, পিটকে আশ্বাস দিল মাইক।

হেঁটে লিলির কাছে চলে এল পিট। মেয়েটার একটা হাত ধরে মৃদু চাপ দিল ও, বলল, দেখো, ডিনারের কথা আবার ভুলে যেয়ো না! পারকা হুড মাথায় পড়ে ঝট করে ঘুরল ও, দীর্ঘ পদক্ষেপে ফিরে চলল হেলিকপ্টারের দিকে।

.

জ্ঞান ফেরার পর ভাঙা পায়ের ব্যথায় অস্থির হয়ে উঠল রুবিন। শীতল বরফের প্রচণ্ড একটা চাপ অনুভব করল সে, তাকে পেছন দিকে ঠেলছে। চোখ মেলে চারদিকে অন্ধকার দেখল সে, তবে অন্ধকারটা ধীরে ধীরে সয়ে এল। ভাঙা উইন্ডশিল্ড দিয়ে তুষার আর বরফের ধস ঢুকছে ভেতরে, ধীরে ধীরে তার নিচে চাপ পড়ে যাচ্ছে সে। একটা পা ভেঙেছে, তুষারের নিচে কিসের সাথে যেন আটকে আছে সেটা। তার মনে 1 হলো, পা-টা পানিতে ডুবে আছে। পানি নয়, ভাবল সে, তার নিজের রক্ত।

আসলে পানি। বরফের আবরণ ভেদ করে খড়ির পানিতে তিন মিটার ডুবে গেছে প্লেনটা, কেবিনের মেঝেতে থই থই করছে পানি, অনেকগুলো সিটও ডুবে গেছে।

ইয়াবারার কথা মনে পড়ল চিফ স্টুয়ার্ডের। অন্ধকারের ভেতর ডান দিকে ঘাড় ফেরাল সে। প্লেনের বো, স্টারবোর্ডা সাইডে, ভেঙেচুরে ভেতর দিকে দেবে গেছে প্রায় ইঞ্জিনিয়ারের প্যানেল পর্যন্ত। বিধ্বস্ত টেলিস্কোপ আর তুষারের ভেতর থেকে ইয়াবারার শুধু একটা মোচড়ানো হাত বেরিয়ে থাকতে দেখল সে।

অসুস্থ বোধ করায় চোখ ফিরিয়ে নিল। বিপদের সময় তার পাশে ছিল লোকটা, তার মৃত্যু বড় একটা আঘাত হয়ে বাজল বুকে। উপলব্ধি করল, কেউ যদি উদ্ধার না করে, ঠাণ্ডায় জমে সেও মারা যাবে খানিক পর।

ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল রুবিন।

তোবড়ানো প্লেনটার মাথার ওপর চলে এল ওদের হেলিকপ্টার। একটা ডানা নেই, অপরটা মোচড় খেয়ে ফিউজিলাজের সাথে সেঁটে আছে। লেজের দিকটাও এমনভাবে তুবড়েছে যে চেনা যায় না। অবশিষ্ট অংশটাকে দেখে মনে হলো সাদা চাদরের ওপর স্থির হয়ে আছে পেটমোটা একটা ছারপোকা। ফিউজিলাজ বরফ ভেঙে পানিতে ডুবে রয়েছে, বলল পিট। আমি বলব, এক-তৃতীয়াংশ।

আগুন ধরেনি, পিটের পাশ থেকে বলল অ্যাল জিওর্দিনো। প্লেনের ওপর পড়া, হেলিকপ্টারের উজ্জ্বল আলোর প্রতিফলনে চোখ ধাধিয়ে গেল তার। নেহাতই ভাগ্য। গা কেমন চকচক করছে দেখছ? যত্নের ছাপ। আমি বলব, ওটা একটা বোয়িং সাতশো বি। প্রাণের কোনো লক্ষণ, পিট?

দেখছি না, বলল পিট। ভালো ঠেকছে না, অ্যাল।

আইডেনটিফিকেশন মার্কিং?

খোলের গয়ে তিনটে ফিতের মতো মোটা রেখা; হালকা নীল আর নীলচে বেগুনির মাঝখানে উজ্জ্বল সোনালি।

পরিচিত এয়ার লাইনের সাথে রংগুলো মেলে না।

আরও নিচে নেমে চক্কর দাও, বলল পিট। তুমি ল্যান্ডিঙের জন্য জায়গা খোঁজো, আমি লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করি।

দুবার চক্কর দিতেই পিট বলল, নেবুলা। নেবুলা এয়ার।

জীবনে কখনও শুনিনি, বলল জিওর্দিনো, বরফের ওপর স্থির হয়ে আছে দৃষ্টি।

শুধু ভিআইপিদের বহন করে। চার্টার করতে হয়।

কমার্শিয়াল ফ্লাইটের পথ ছেড়ে এখানে এটা এল কেন?

বলার জন্য কেউ বেঁচে থাকলে একটু পরই জানতে পারব। পেছনে বসা আটজন লোকের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকাল ও হেলিকপ্টারের গরম পেটে আরাম করে বসে আছে সবাই। আর্কটিক আবহাওয়ার উপযোগী নেভি-ব্লু পোশাক সবার পরনে। একজন সার্জেন, তিনজন মেডিকেল সহকারী। বাকি চারজন ড্যামেজ-কন্ট্রোল এক্সপার্ট। ওদের পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে মেডিকেল সাপ্লাইয়ের বাক্স, কম্বল, স্ট্রেচার আর আগুন নেভানোর উপকরণ ও যন্ত্রপাতি।

প্রধান দরজার উল্টোদিকে একটা হিটিং ইউনিট রয়েছে, মোটা কেবল-এর সাথে সংযুক্ত, কেবলের অপর প্রান্ত মাথার ওপর ঝুলে থাকা উইঞ্চের সাথে জড়ানো। ওটার পাশেই রয়েছে ঘেরা কেবিনসহ একটা স্নোমোবাইল।

পিটের ঠিক পেছনে বসেছেন ডাক্তার জ্যাক গেইল। সদালাপী সদাহাস্যময় ভদ্রলোক মৃদু হেসে জানতে চাইলেন, নিজেদের বেতন হালাল করার সময় এল বলে!

ডাক্তারের হাসিখুশি মনোভাব কখনোই পাল্টায় না।

নামার পর বুঝতে পারব, বলল পিট। প্লেনের চারধারে কিছুই নড়ছে না। তবে আগুনে ধরেনি। ককপিট ডুবে আছে। ফিউজিলাজ তোবড়ালেও কোথাও ফুটো হয়নি বলে মনে হচ্ছে। মেইন কেবিনে প্রায় এক মিটার উঁচু পানি উঠেছে।

আহত লোক যদি ভিজে গিয়ে থাকে, ঈশ্বর তার সহায় হোন। ডাক্তার গেইল গম্ভীর হলেন। ফ্রিজিং ওয়াটারে আট মিনিটের বেশি বাঁচার কথা নয়।

ওরা যদি ইমার্জেন্সি একজিট খুলতে না পারে, প্লেনের গা কেটে ভেতরে ঢুকতে হবে।

লেফটেন্যান্ট কর্ক সিমোন, ড্যামেজ-কন্ট্রোল টিমের নেতা, বলল, কাটিং ইকুইপমেন্ট থেকে আগুনের ফুলকি বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন ধরে যেতে পারে। ভালো হয় আমরা যদি মেইন কেবিনের দরজা দিয়ে ঢুকি। স্ট্রেচার ঢোকানোর জন্য চওড়া জায়গা লাগবে ডাক্তার গেইলের।

আপনার কথায় যুক্তি আছে, বলল পিট। তবে মেইন কেবিনের দরজা খুলতে অনেক সময় লাগবে। আমাদের প্রথম কাজ যেকোনো একটা ফাঁক দিয়ে হিটারের ভেন্ট পাইপ ভেতরে ঢোকানো।

হেলিকপ্টার ল্যান্ড করল সমতল বরফের ওপর, প্লেনের কাছ থেকে সামান্য দূরে। নামার জন্য তৈরি হলো সবাই। রোটর ব্লেডের বাতাসে চারদিকে তুলোর মতো উড়ছে তুষার। লোডিং ডোর এক ঝটকায় খুলে লাফ দিয়ে নিচে নামল পিট, নেমেই প্লেনের দিকে ছুটল। মেডিকেল সাপ্লাই নামানোর কাজে সহায়তা করলেন ডাক্তার গেইল। বাকি সবাই ধরাধরি করে স্নোমোবাইল আর হিটিং ইউনিট বের করছে।

এক ছুটে প্লেনের ফিউজিলাজটাকে একবার চক্কর দিয়ে এল পিট। প্রতি মুহূর্তে সজাগ থাকতে হলো কোনো ফাটলে যেন পা গলে না যায়। জেট ফুয়েলের গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। ককপিটের জানালা ছাড়িয়ে উঁচু হয়ে আছে তুষারের একটা স্তূপ, সেটার ওপর চড়ল ও। হাত দিয়ে তুষার সরিয়ে ককপিটের দিকে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করার চেষ্টা করল। একটু পরই সম্ভব নয় বুঝতে পেরে নিচে নেমে এল আবার। আলগা তুষার জমাট বেঁধে শক্ত বরফ হয়ে গেছে, হাত দিয়ে ভাঙতে কয়েক ঘন্টা লাগবে।

হন হন করে অবশিষ্ট ডানার দিকে এগোল ও। মূল অংশটা মোচড় খেয়ে সাপোর্টিং মাউন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, ডগাটা লেজের দিকে তাক করা। পানিতে ডুবে থাকা ফিউজিলজের পাশে লম্বা হয়ে রয়েছে গোটা ডানা, জানালাগুলোর এক হাত নিচে। আবরণহীন পারিন ওপর ডানাটাকে সেতু হিসেবে ব্যবহার করল পিট, একটা জানালার সামনে হাটুগেড়ে বসে ভেতরে উঁকি দিল। হেলিকপ্টারের আলো প্লেক্সিপ্লাসে প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাধিয়ে দিল ওর, দুই হাত দিয়ে চোখ দুটোকে আড়াল করতে হলো।–

প্রথম কিছুই দেখল না পিট। শুধু অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা। তারপর হঠাৎ, জানালার উল্টোদিকে কিম্ভুতকিমাকার একটা অবয়ব উদয় হলো, পিটের মুখ থেকে মাত্র দেড় ইঞ্চি দূরে। নিজের অজান্তেই পিছিয়ে এল ও।

একটা নারীমুখ, একটা বন্ধ চোখের নিচে লালচে কাটা দাগ, রক্তে ভিজে গেছে শরীরের একটা দিক। প্রায় ভূত দেখার মতোই চমকে উঠল পিট।

তারপর মুখের অক্ষত অংশটার ওপর চোখ পড়ল। উঁচু চোয়াল, লম্বা কালো চুল, ধারাল নাক, অলিভ বাদামি চোখ। সুন্দরী যে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

জানালার কাছে নাক ঠেকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল ও, ইমার্জেন্সি হ্যাঁচ খুলতে পারবেন?

সুন্দর একটা ভ্রু সামান্য উঁচু হলো, কিন্তু অক্ষত চোখে কোনো ভাব ফুটল না।

আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?

ঠিক সেই মুহূর্তে লে. সিমোন্সের লোকজন অক্সিলিয়ারি পাওয়ার ইউনিট চালু করল, চারদিকে উজ্জ্বল আলোর বন্যা বইয়ে দিয়ে জ্বলে উঠল কয়েকটা ফ্লাডলাইট। হিটার ইউনিটে পাওয়ার সংযোগ দেয়া হলো, বরফের ওপর দিয়ে টেনে আনা হলো ফ্লেক্সিবল হোস।

এদিকে, ডানার ওপর, হাত নেড়ে লোকগুলার দৃষ্টি আকর্ষণ করল পিট। জানালা ভাঙার জন্য কিছু একটা আনো।

জানালার দিকে ফিরল ও, কিন্তু ভদ্রমহিলা ইতোমধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।

হিটারের হোস নিয়ে ডানায় উঠল লোকগুলো, চোখে-মুখে গরম বাতাস পেল পিট।

আমাদের মনে হয় দরজা কেটে ঢুকতে হবে, বলল ও। ওকে একপাশে সরে দাঁড়াতে বলে কোটের পকেট থেকে ব্যাটারিচালিত একটা যন্ত্র বের করল কর্ক সিমোন। সুইচ অন করতেই শেষ প্রান্তে একটা চাকা ঘুরতে শুরু করল। আমেরিকান নেভির সৌজন্য। অ্যালুমিনিয়াম আর প্লেক্সিগ্নাস মাখনের মতো কাটতে পারে। শুধু কথায় নয়, আড়াই মিনিটের মধ্যে কাজটা করেও দেখল সে।

কোমর বাঁকা করে ঝুঁকল পিট, সদ্য ভাঙা জানালার ভেতর হাত গলিয়ে দিয়ে টর্চ জ্বালল। প্লেনের ভেতর ভদ্রমহিলার ছায়া পর্যন্ত নেই কোথাও। খড়ির ঠাণ্ডা পানিতে টর্চের আলো চকচক করছে। ছোট ছোট লাফ দিয়ে কাছাকাছি খালি সীটগুলোয় ওঠার চেষ্টা করছে মন্থরগতি ঢেউ। পিটের আর সিমোন দু’জন মিলে জানালা দিয়ে হোসটা ঢোকাল, তারপর ছুটল প্লেনের সামনের দিকে। ইতোমধ্যে নেভির লোকজন পানির নিচে হাত ডুবিয়ে মেইন একজিট ভোর ভোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। যা ভয় করা হয়েছিল তাই, আটকে গেছে ওটা। ব্যস্ততার সথে দরজার গায়ে ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো তৈরি করা হলো, ফুটোয় ঢোকানো হলো স্টেনলেস স্টিলের হুক, প্রতিটি হুক সোমোবাইলের সাথে কেবল দিয়ে যুক্ত। স্নোমোবাইল চালু করে খোলা হলো দরজাটা।

প্লেনের ভেতর গাঢ় অন্ধকার। কেমন যেন একটা অশুভ পরিবেশ। চেহারায় ইতস্ত ত ভাব নিয়ে পেছন দিকে তাকাল পিট। ডাক্তার গেইল তার দলবল নিয়ে ওর ঠিক পেছনেই রয়েছেন। লে, সিমোন্সের লোজন পাওয়ার ইউনিটের কেবল খুলছে প্লেনের ভেতর আলোর ব্যবস্থা করার জন্য। চলুন, ঢোকা যাক, বলল ও।

খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল পিট। পানিতে পড়ল, ডুবে গেল হাঁটু পর্যন্ত। অনুভব করল যেন এক হাজার সুই হঠাৎ করে বিধে গেছে পায়ে। বাল্কহেড ঘুরে মাঝখানের আল ধরে এগোল ও, আলের দুপাশে প্যাসেঞ্জার কেবিনের সারি সারি সিট। ভৌতিক নিস্তব্ধতা ওর হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে দিল। ঠিক ধরতে পারছে না, কিন্তু অনুভব করছে, ভয়ংকর কী যেন একটা ঘটে গেছে এখানে। পানি ঠেলে এগোচ্ছে, শুধু তারই শব্দ পাচ্ছে, আর কোনো আওয়াজ নেই।

তারপর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল পিট, সবচেয়ে বীভৎস ভয়টা বিষাক্ত ফুলের পাপড়ির মতো উন্মুক্ত হতে শুরু করল।

পিটের দুপাশে ওগুলো যেন সব ভূতের মুখ, ফ্যাকাসে আর সাদা। কেউ নড়ছে না, কারও চোখে পলক নেই, কেউ কথা বলছে না। যার যার সিটে স্ট্র্যাপ দিয়ে নিজেকে আটকে রেখেছে, পিটের দিকে তাকিয়ে আছে সারি সারি লাশ।

১০. হিমেল বাতাস

১০.

হিমেল বাতাসের চেয়ে ঠাণ্ডা একটা শিরশিরে অনুভূতি হলো পিটের ঘাড়ের পেছনে। বাইরের আলো জানলো দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে, দেয়ালগুলোয় কিম্ভুতকিমাকার ছায়া নড়াচড়া করছে। এক এক করে সিটগুলো দিকে তাকাল ও, যেন আশা করছে চোখচোখি হলে হঠাৎ কেউ হাত বাড়াবে বা কথা বলে উঠবে। কিন্তু না, পাতাল সমাধিতে রাখা মমির চুপচাপ বসে থাকল সবাই।

আরোহীদের একজনের ওপর ঝুঁকে পড়ল পিট। তার লালচে সোনালি চুল মাথায় ঠিক মাঝখানে দুভাগ করা। আলোর কিনারায় একটা সিটে বসে আছে সে। তার চেহারায় ব্যথা, ভয় বা বিস্ময়ের কোনো চিহ্ন নেই। চোখ দুটো আধখোলা, যেন ধুমে ঢলে পড়ার আগের মুহূর্তে রয়েছে। ঠোঁট জোড়া স্বাভাবিকভাবে জোড়া লাগানো। চেয়াল সামান্য একটু ঝুলে পড়া।

তার অসাড় একটা হাত ধরল পিট। পালস্ পেল না। হার্ট বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু বুঝছ? জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তার গেইল, পিটকে পাশ কাটিয়ে আরেক আরোহীকে পরীক্ষা করছের তিনি।

মারা গেছেন ভদ্রলোক, জবাব দিল পিট।

ইনিও।

মৃত্যুর কারণ?

এক্ষুনি বলতে পারছি না। আঘাতের কোনো চিহ্ন দেখছি না। মারা গেছে খুব বেশিক্ষণ হয়নি। প্রচণ্ড ব্যথা বা হাত-পা ছোঁড়ার কোনো লক্ষণ নেই। চামড়ার রং দেখে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে মারা গেছেন বলেও তো মনে হচ্ছে না।

সেটারই সম্ভাবনা বেশি, বলল পিট। অক্সিজেন মাস্কগুলো এখনও ওভারহেড প্যানেলে রয়েছে।

একের পর এক আরোহীদের পরীক্ষা করে চলেছেন ডাক্তার গেইল। আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করে বলতে পারব।

দোরগোড়ার মাথায় একটা আলো জ্বালার ব্যবস্থা সেরে ফেলল লে, সিমোন। বাইরের দিকে ফিরিয়ে একটা হাত আঁকাল সে। প্লেনের ভেতরটা দিনের মতো আলোকিত হয়ে উঠল।

কেবিনের চারদিকে তাকাল পিট। চোখে পড়ার মতো ক্ষতি শুধু সিলিংয়ের হয়েছে, কয়েক জায়গায় তুবড়ে গেছে সেটা। প্রতিটি সিট খাড়া অবস্থা রয়েছে, প্রত্যেক আরোহীর সিট বেল্ট বাঁধা। বরফজলে অর্ধেক ডুবে বসে ছিল, নড়াচড়া না করে হাইপোথারমিয়ায় মারা গেছে, এ অবিশ্বাস্য। এক স্বর্ণকেশী বৃদ্ধাকে তার খোলা হাতের তালুতে লাল একটা গোলাপ।

বোঝাই যাচ্ছে প্লেন বরফ স্পর্শ করার আগেই মারা গেছে সবাই, বললেন ডাক্তার গেইল।

সার সার সিটের ওপর আবার চোখ বুলালো পিট। কিন্তু কেন?

বিষাক্ত গ্যাস মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

কোনো গন্ধ পাচ্ছেন?

না।

আমিও না।

আর কী হতে পারে?

খাদ্যে বিষ?

ঝাড়া তিন সেকেন্ড পিটের দিকে তাকিয়ে থাকলেন ডাক্তার গেইল। নিঃশ্বাস ফেলছে এমন কাউকে দেখতে পেয়েছ তুমি? কোথায়?

দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার আগে, বলল পিট, জানালা দিয়ে এক ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়েছিয়েন। কোনো সন্দেহ নেই তাকে আমি জীবিত দেখছি। কিন্তু এখন কেন যে দেখছি না…।

ডাক্তার গেইল কিছু বলার আগে পানি ঠেলে এগিয়ে এল লে, সিমোন। ভয়ে আর বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে আছে তার চোখ। ওহ্ গড! সিটে বসা আরোহীদের দিকে পেছন ফেরার জন্য ঘন ঘন একদিক থেকে আরেক দিকে ঘুরে দাঁড়াল সে। মানুষ এভাবে মারা যায়! সত্যিই কি লাশ ওগুলো, নাকি মমি?

লাশ, মৃদুকণ্ঠে বলল পিট। তবে একজন অন্তত বেঁচে আছে। হয় ককপিটে, নয়তো লুকিয়ে আছে পেছনের কোনো বাথরুমে।

তাহলে আমার চিকিৎসা দরকার তার, ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ডাক্তার গেইল।

আপনি বরং এখানেই আরোহীদের পরীক্ষা করুন, প্রস্তাব দিল পিট। দেখুন সবাই মারা গেছে কিনা। সিমোন ককপিটে চলে যান, আমি বাথরুমগুলো দেখি।

এত লাশ, বলল লে, সিমোন, কী করে সরানো হবে? কমান্ডার নাইটকে জানানো দরকার না?

যেখানে আছে সেখানেই থাকুক, দৃঢ়কণ্ঠে, নির্দেশের সুরে বলল পিট।

রেডিওর ধারেকাছে যাবেন না। ক্যাপটেনকে আমার নিজেরা গিয়ে রিপোর্ট করব। আপনার লোকজনদের সবাইকে বাইরে রাখুন, কেউ যেন প্লেনের ভেতর না ঢোকে। ভালো হয় দরজাটা সিল করে দিলে। আপনার মেডিকেল দল সম্পর্কেও একই কথা, ডাক্তার গেইল। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ কিছু স্পর্শও করবে না।

কিন্তু…., প্রতিবাদের সুরে শুরু করল লে. সিমোন।

আমাদের বোধবুদ্ধির বাইরে একটা কিছু ঘটেছে এখানে, তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল পিট, দুর্ঘটনার খবর এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এয়ার ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেটর আর রিপোর্টাররা ভিড় জমাবে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ না করা পর্যন্ত কেউ আমরা কারও কাছে মুখ খুলব না।

আবার কিছু বলতে গেল লে, সিমোন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল সে। ঠিক আছে, মি. পিট।

তাহলে চলুন দেখা যাক কেউ বেঁচে আছে কি না।

বিশ সেকেন্ডের পথ বাথরুমগুলো, পানি ঠেলে পৌঁছতে দুমিনিট লাগল পিটের। এরই মধ্যে ওর পা অসাড় হয়ে গেছে। আধাঘণ্টার মধ্যে গরম করে না নিলে ওগুলো যে ফ্রস্টবাইটের শিকার হবে তা জানার জন্য ডাক্তার গেইলের উপদেশ দরকার নেই ওর।

প্লেনের ধারণক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা হলে আরও বহু লোক মারা যেত। অনেক সিট খালি থাকা সত্ত্বেও তিপ্পান্নটি লাশ গুনল পিট। পেছনের বাল্কহেড ঘেঁষে সিটে বসা একজন মহিলা ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টকে পরীক্ষা করল ও। তার মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, পানিতে ঝুলে পড়েছে সোনালি চুল। পালস নেই।

একটা কম্পার্টমেন্টের ভেতর ঢুকল পিট, এটার ভেতরই বাথরুমগুলো। তিনটে দরজার মাথায় খালি চিহ্ন দেখে ভেতরে উঁকি দিল ও। কেউ নেই ভেতরে। চার নম্বরটা রয়েছে খালি নয় চিহ্ন, ভেতর থেকে বন্ধ। তার মানে ভেতরে কেউ আছে। সজোরে কয়েকবার নক করল ও, তারপর ডাকাল, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? ইংরেজিতে করল প্রশ্নটা। ভাষা ঠিক আছে? আমরা আপনাদেরকে সাহায্য করার জন্য এসেছি। প্লিজ, দরজা খোলার চেষ্টা করুন।

কবাটে কান ঠেকালো পিট। মনে হলো কেউ যেন ফুঁপিয়ে উঠল নিচু গলায়। তার পরই শোনা গেল ফিসফিসে আওয়াজ, যেন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে দু’জন মানুষ।

গলা চড়াল পিট, পিছিয়ে যান। দরজা ভাঙছি।

ভেজা পা তুলে দরজার গায়ে লাথি মারল পিট। খুব জোরে নয়, শুধু হুড়কো বা ছিটকিনি ভাঙতে চায়। কবাট ভেঙে পড়লে ভেতরে যারা আছে তারা আহত হতে পার। দ্বিতীয় লাথিতে কাজ হলো।

বাথরুমের পেছনের একটা কোণে, টয়লেট প্ল্যাটফর্মের ওপর, দু’জন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে। একজন থরথর করে কাঁপছে, পরনে ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টের ইউনিফর্ম, দ্বিতীয় ভদ্রমহিলাকে আঁকড়ে ধরে আছে সে। এক ভেঙে গেছে ইউনিফর্ম পরিহিতার, বুঝল পিট।

অপরজনের চেহারায় সন্দেহ আর কাঠিন্য ফুটে থাকতে দেখল পিট। চিনতে পারল ও, এঁকেই জানালায় দেখেছিল। তখন অবশ্য মাত্র একটা চোখ খোলা ছিল, এখন দুটোই খোলা। ঘৃণা আর সাহস নিয়ে পিটের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। মুখের একপাশ শুকনো রক্তের চাদরে ঢাকা। তার গলার সুরে মারমুখো ভাব লক্ষ করে অবাক না হয়ে পারল না ও। কে আপনি? কী চান? বিশুদ্ধ ইংরেজি, উচ্চারণ ভঙ্গি খানিকটা আঞ্চলিক।

আমার নাম ডার্ক পিট, বলল পিট, আমেরিকার জাহাজ পোলার এক্সপ্লোরার থেকে এসেছি। যা বললেন প্রমাণ করতে পারবেন?

দুঃখিত, ড্রাইভিং লাইসেন্সটা ফেলে এসেছি বাড়িতে। দরজার গায়ে হেলান দিল পিট। প্লিজ, ভয় পাবেন না, সম্মানের সুরে নরম গলায় বলল আবার। আমরা সাহায্য করতে এসেছি করতে এসেছি, ক্ষতি করতে নয়।

ভদ্রমহিলার কাঁধ থেকে মাথা তুলে হিস্টিরিয়াগ্রস্থের হাসি হাসল ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট, তার পরই আবার কী মনে করে ফুঁপিয়ে উঠল।

ওরা সবাই মারা গেছে, খুন!

হ্যাঁ, জানি, শান্ত সুরে বলল পিট, একটা হাত বাড়িয়ে দিল। ধরুন। আপনাদের চিকিৎসা দরকার। আমাদের সাথে ডাক্তার আছেন। এই ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে থাকলে….

বুঝব কীভাবে আপনি টেরোরিস্টদের একজন নন? আগের মতোই কঠিন সুরে জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রমহিলা।

শব্দখেলায় বিরক্ত হয়ে পড়েছে পিট। সামনে এগিয়ে গিয়ে এক কাঁধে তুলে নিল ফ্লাইট অ্যাটেনপেন্টকে।

পেশি ঢিল দিন, মনে করুন, আপনি নায়িকা আর আমি নায়ক- উদ্ধার পেতে যাচ্ছেন এ যাত্রা। পিট বলে।

নিজেকে নায়িকা ভাবতে পারছি না, চেহারা-পোশাকের যা অবস্থা।

আমার কাছে তো ভালোই লাগছে, সহাস্যে পিট বলে। চলুন না হয়, ডিনারে যাই একদিন?

আমার স্বামী আসতে পারবে তো?

যদি উনি বিল দেন, তবে।

আমি হাঁটতে পারব বলে মনে হয় না, বলে পিটের ঘাড় জড়িয়ে ধরল মেয়েটা। হাসি গোপন করে তাকে দুহাতের ওপর তুলে নিল উদ্ধার কর্তা। ঘাড় ফিরিয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকাল ও। দয়া করে ভুলেও পানিতে নামতে যাবেন না। এক্ষুনি আপনার জন্য ফিরে আসছি আমি।

এই প্রথম হে’লা কামিল উপলব্ধি করলেন, তিনি নিরাপদ। ভয়ংকর সময়টাতে স্থির থাকলেও এখন, এই মুহূর্তে কান্না পেল তার।

.

রুবিন জানে, সে মারা যাচ্ছে। ঠাণ্ডা বা ব্যথা, কিছুই অনুভব করছে না। অচেনা কণ্ঠস্বর, আকস্মিক আলো, এসবের কোনো অর্থ খুঁজে পেল না সে। নিজেকে তার বিচ্ছিন্ন, বিচ্যুত বলে মনে হলো। অলস মস্তিষ্কে চিন্তাশক্তি লোপ পেতে যাচ্ছে। যা কিছু ঘটছে সব যেন অতীত থেকে উঠে আসা অস্পষ্ট স্মৃতি, কবে যেন ঘটেছিল।

বিধ্বস্ত ককপিট হঠাৎ সাদা উজ্জ্বলতায় ভরে উঠল। কোনো কোনো মানুষ দাবি করে মৃত্যুর পর পৃথিবীতে আবার ফিরে এসেছে তারা, তাহলে সেও কি তাই আসছে? শরীরবিহীন একটা কণ্ঠস্বর কাছ থেকে কথা বলে উঠল, শক্ত হোন, সাহস করুন, সাহায্য এসে গেছে।

চোখ মেলে অস্পষ্ট মূর্তিটাকে চেনার চেষ্টা করল।

আপনি কি ঈশ্বর?

মুহূর্তের জন্য ভাবলেশহীন হয়ে গেল লে, সিমোন্সের চেহারা। তারপর সকেতুকে হাসল সে। না। স্রেফ মরণশীল একজন মানুষ, ঘটনাচক্রে আপনাদের প্রতিবেশী।

আমি মারা যাইনি?

দুঃখিত, বয়স আন্দাজ করতে যদি ভুল না করে থাকি, আপনাকে আরও পঞ্চাশ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

আমি নড়তে পারছি না। পা দুটো যেন পেরেকের সাথে আটকে আছে। বোধ হয় ভেঙে গেছে…প্লিজ, বের করুন আমাকে।

ধৈর্য ধরুন, আপনাকে উদ্ধার করতেই এসেছি আমি, চামড়ার দস্তানা পরা হাত দিয়ে ব্যস্ততার সাথে প্রায় এক ফুট তুষার আর বরফ সরিয়ে ফেলল লে, সিমোন, রুবিনেরর বুক আর পেট মুক্ত হলো, ছাড়া পেল হাত দুটো। এবার আপনি নাক চুলকাতে পারবেন। শাবল আর যন্ত্রপাতি নিয়ে এক্ষুনি ফিরব আমি।

মেইন কেবিনে ফিরে এসে সিমোন দেখল, ফ্লাই অ্যাটেনড্যান্টকে বুকে নিয়ে ভেতরে ঢুকছে পিটও। গেইলের হাতে মেয়েটাকে তুলে দিল ও।

ডাক্তার গেইল, বলল সিমোন। ককপিটে একজন বেঁচে আছে।

এই এলাম বলে।

পিটের দিকে তাকাল সিমোন, আপনার সাহায্য পেলে ভালো হয়…

মাথা ঝাঁকাল পিট। দুমিনিট সময় দিন। বাথরুম থেকে আরো একজন কে নিয়ে আসে আগে।

.

হাঁটু ভাঁজ করে নিচু হলেন হে’লা কামিল, ঝুঁকে আয়নার দিকে তাকালেন। নিজের প্রতিবিম্ব দেখার জন্য আলোর আভা যথেষ্টই রয়েছে বাথরুমে। যে মুখটা তার দিকে পাল্টা দৃষ্টি ফেলল, হঠাৎ দেখে তিনি চিনতে পারলেন না শুকনো, নির্লিপ্ত চেহারা, চোখে কোনো ভাষা নেই। ভাগ্যহত রাস্তার মেয়েদের একজন বলে মনে হলো, পুরুষের হাতে বেদম মারধর খেয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে।

র‍্যাক থেকে টেনে কয়েকটা পেপার টাওয়েল নামালেন তিনি, ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে মুখ থেকে রক্ত আর লিপস্টিক মুছলেন। মাসকারা আর আইশ্যাডো ও চোখের চারপাশে লেপে মুছে একাকার হয়ে গেছে, তাও পরিষ্কার করলেন। চুল মোটামুটি ঠিকঠাকই আছে, শুধু আলগা প্রান্তগুলো হাত দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় সরিয়ে দিলেন।

আয়নায় চোখ রেখে ভাবলেন, এখনও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে চেহারা। পিটকে ফিরে আসতে দেখে জোর করে একটু হাসলেন তিনি, আশা করলেন নিজেকে অন্তত পরিবেশনযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন।

দীর্ঘ এক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকল পিট, তারপর কৌতুক করার লোভ সামলাতে না পেরে সবিনয় কোমল সুরে জিজ্ঞেস করল, মাফ করবেন, গর্জিয়াস ইয়াং লেডি, এদিকে কোনো বুড়ি ডাইনিকে দেখেছেন নাকি?

চোখে পানি বেরিয়ে এলেও হে’লা কামিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসলেন। আপনি চমৎকার মানুষ, মি. পিট। থ্যাঙ্ক ইউ।

আই ট্রাই, গড নোজ, আই ট্রাই।

কয়েকটা কম্বল এনেছে পিট, সেগুলো মহাসচিবের গায়ে জড়িয়ে দিল। তারপর একটা হাত রাখল তার হাঁটুর নিচে, আরেকটা তার কোমরের চারদিকে, অনায়াস ভঙ্গিতে তুলে নিল শরীরটা বাথরুম প্ল্যাটফর্ম থেকে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আইল ধরে এগোল ও, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে।

পিট একবার হোঁচট খেতেই হে’লা কামিল উদ্বেগের সাথে জানতে চাইলেন, আপনি ঠিক আছেন?

শুধু জ্যাক ডেনিয়েলসের গরম হুইস্কি পেটে পড়লে সব ঠিক, সহাস্যে জানাল পিট।

পুরো এক বাক্স উপহার দেব, প্রতিশ্রুতি দিলেন হে’লা কামিল।

বাড়ি কোথায়?

আপাতত নিউ ইয়র্কে।

পরের বার আমি যখন নিউ ইয়র্কে যাব, আপনি আমার সাথে ডিনার খাবেন?

দুর্লভ একটা সম্মান বলে মনে করব, মি. পিট।

উল্টোটাও সত্যি, মিস কামিল।

ভ্রু জোড়া একটু ওপরে তুললেন মহাসচিব। এই বিধ্বস্ত চেহারায় আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?

মানে, একটু যখন পরিবেশনের যোগ্য করেছেন চেহারাটা, তখন আর কি চিনতে পেরেছি।

আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য সত্যি আমি দুঃখিত। আপনার পা নিশ্চয়ই অবশ হয়ে গেছ?

লোককে বলতে পারব ইউ,এন, সেক্রেটারি জেনারেলকে দুহাতে বয়ে এনেছি, তার তুলনায় কষ্টটুকু কিছুই নয়।

অদ্ভুত, সত্যি অদ্ভুত, ভাবল পিট। আজ কার মুখ দেখে ঘুম ভেঙেছিল ওর? এমন সাফল্য রোজ জোটে না ভাগ্যে। একই দিনে তিন তিনটে সুন্দরী মেয়েকে ডিনার খাবার প্রস্তাব দেয়ার সুযোগ কয়জন পায়। কোনো সন্দেহ নেই, এটা একটা রেকর্ড। সভ্যতা থেকে দুহাজার মাইল দূরে, জনমানবহীন বরফের রাজ্যে, মাত্র ত্রিশ মিনিট সময়সীমার ভেতর এই সাফল্য-ভাবা যায় না। রাশিয়ান সাবমেরিন খুঁজে পাবার চেয়ে ঢের বড়ো সাফল্য এটা।

পনেরো মিনিট পর। আর ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টের সাথে হেলিকপ্টারে আরাম করে বসে আছেন হে’লা কামিল { ককপিটের সামনে দাঁড়িয়ে আল উদ্দেশে হাত নাড়ল পিট, অ্যাল জিওর্দিনো পাল্টা সঙ্কেত দিল। ঘুরতে শুরু করল রোটর, তারপর তুষারের ঝড় তুলে আকাশে উঠে পড়ল কপ্টার। একশো আশি ডিগ্রী বাক নিয়ে ছুটে চলল আইসব্রেকার পোশর এক্সপ্লোরার অভিমুখে। এতক্ষণে খোঁড়াতে খোঁড়াতে হিটিং ইউনিটের দিকে এগোল পিট।

পানি ভরা বুট আর ভিজে ভারী ওঠা মোজা খুলে ফেলল ও, পা দুটো ঝুলিয়ে রাখল এগজস্টের ওপর। রক্ত চলাচল নতুন করে শুরু হতে ব্যথা অনুভব করল, সহ্য করল মুখ বুঝে। খেয়াল করল, পাশে এসে দাঁড়াল লে, সিমোন।

বিধ্বস্ত প্লেনটাকে দেখছে সিমোন। জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল? অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল সে। আসলেও কি তাই?

কয়েকজন ছিলেন সাধারণ পরিষদের সদস্য, বলল পিট। বাকি সবাই জাতিসংঘের বিভিন্ন এজেন্সির ডিরেক্টর বা এইড। হে’লা কামিল জানালেন, ফিল্ড সার্ভিস অর্গানাইজেশনের একটা টুর থেকে ফিরছিলেন ওঁরা।

ওঁদের মেরে কার কী লাভ?

মোজা জোড়া হিটার টিউবের ওপর শুকাতে দিল পিট। কী করে বলব?

মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসবাদীরা দায়ী? সিমোন নাছোড়বান্দা।

তারা বিষ খাইয়ে মানুষ মারতে শুরু করেছে, এটা আমার কাছে নতুন খবর।

আপনার পা কেমন?

ঠিকই আছে। আপনার?

নেভি ইস্যু ফাউল-ওয়েদার বুট জোড়াকে ধন্যবাদ। পা দুটো গরম টোস্টের মতো শুকনো। আমার ধারণা, আবার প্রসঙ্গে ফিরে এল সিমোন, জীবিত তিনজনের একজন দায়ী।

মাথা নাড়ল পিট। সত্যি যদি প্রমাণ হয় যে বিষক্রিয়াতেই মারা গেছেন ওঁরা, তাহলে ধরে নিতে হবে প্লেনে তোলার আগে ফুড সার্ভিস কিচেন থেকে বিষ মেশানো হয়েছে খাবারে।

কেন, চিফ স্টুয়ার্ড বা ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট গ্যালিতে বসে কাজটা করতে পারে না?

কারও চোখে ধরা না পড়ে পঞ্চাশ-ষাটজন লোকের খাবারে বিষ মেশানো অত্যন্ত কঠিন।

খাবার না হয়ে, ড্রিংকেও তো হতে পারে।

আপনি দেখছি দারুণ গোঁয়ার-গবিন্দ মানুষ- তর্ক করেই যাচ্ছেন।

মনে মনে ভারি খুশি হলো সিমোন, তার একটা ধারণা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে বলে। তাহলে বলুন তো দেখি, মি. পিট, তিনজনের মধ্যে কাকে আপনার সবচেয়ে বেশি সন্দেহ হয়?

তিনজনের একজনকেও নয়।

তার মানে কি আপনি বলতে চাইছেন জেনেশুনে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে কালপ্রিট? তাজ্জব হয়ে জানতে চাইল সিমোন।

না, আমি চার নম্বর লোকটার কথা বলছি, যে এখন বেঁচে আছে।

চার নম্বর! হাঁ হয়ে গেল সিমোন। কিন্তু আমরা তো মাত্র তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করেছি!

প্লেন ক্র্যাশ করার পর। তার আগে চারজন ছিল ওরা।

আপনি নিশ্চয়ই ছোট্ট মেক্সিকান লোকটার কথা বলছেন না, ককপিটের সিটে যাকে দেখলাম?

হ্যাঁ, আমি তার কথাই বলছি।

হতভম্ব হয়ে পিটের দিকে তাকিয়ে থাকল লে, সিমোন। এই উপসংহারে পৌঁছনোর পক্ষে অকাট্য কোনো যুক্তি দেখাতে পারবেন আপনি, মি, পিট?

উঁচুদরের রহস্য কাহিনী পড়া নেই আপনার? মুচকি হাসল পিট। জানেন না, রহস্য বা হত্যাকাণ্ডের ঐতিহ্য হলো সবচেয়ে যাকে কম সন্দেহ করা যায়, সেই শেষ পর্যন্ত খুনি প্রমাণিত হয়?

.

১১.

এমন জঘন্য তাস কে বাটল?

চেহারায় অসন্তোষ নিয়ে প্রশ্ন করলেন রাজনৈতিক সচিব জুলিয়াস শিলার। কার্ডের ওপর চোখ বুলাচ্ছেন তিনি, কার্ডের কিনারা দিয়ে চুরি করে তাকাচ্ছেন অন্যান্য খেলোয়াড় সঙ্গীদের দিকে, চোখে চিকচিক করছে কৌতুক।

পোকার টেবিলে বসে পাঁচজন খেলছেন ওঁরা। কেউ ধূমপান করছেন না, তবে শিলারের হাতে একটা চুরুট রয়েছে, এখনও ধরাননি। ইয়টটা শিলারের, পঁয়ত্রিশ মিটার দীর্ঘ, নোঙর ফেলেছে পটোম্যাক নদীতে, সাউথ আইল্যান্ডের কাছাকাছি আলেকজান্দ্রিয়া, ভার্জিনিয়ার ঠিক উল্টোদিকে।

অপর সঙ্গীদের মধ্যে একজন হলেন সোভিয়েত মিশন-এর ডেপুটি চিফ আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো। দৈহিক গড়নের দিক থেকে লম্বায় একটু কম কিন্তু চওড়ায় বিশাল। ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সমাজে তার হাসিখুশি চেহারা অত্যন্ত পরিচিত। জুলিয়াস শিলার অসন্তোষ প্রকাশ করায় তিনিই প্রথম তাঁকে সমর্থন করলেন।

আমাদের দেশে সাইবেরিয়া বলে চমৎকার একটা জায়গা আছে, খেলাটা যদি মস্কোয় হত তাহলে ডিলারকে সেখানে পাঠানোর ব্যাপারে তদ্বির করতাম আমি।

জুলিয়াস শিলার ডিলারের দিকে তাকালেন।

পরের বার, ডেইল, কার্ড ভালো করে ফেটে নিয়ো, বুঝলে হে! আলেক্সেই তোমাকে সাইবেরিয়ায় পাঠাতে চাইছে, আর জর্জ হয়তো চাইবে সামরিক আইনে তোমার বিচার করতে।

কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সাথে ঘেৎ ঘোৎ করে ডেইল নিকোলাস, মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ অ্যাসিস্ট্যান্ট বললেন, এতই যদি খারাপ হয় কার্ড, রেখে দিলেই তো পারো!

সিনেটের পররাষ্ট্র-সম্পর্ক বিষয়ক বিভাগের সভাপতি, সিনেটের জর্জ পিট উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের জ্যাকেট খুলে ফেললে। চেয়ারের হাতলে ওটা বিছিয়ে রেখে ইউরি ভয়স্কির দিকে তাকালেন।

বুঝলাম না, এরা কেন কমপ্লেইন করছে, তুমি আর আমি তো একদম জিতিনি।

সোভিয়েত দূতাবাসের আমেরিকা বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা মাথা ঝাঁকালেন, মনে হচ্ছে, পাঁচ বছর আগে শেষ একটা ভালো হাত পেয়েছিলাম।

শিলারের ইয়টে সেই ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার চলে এই পোকার খেলা। কালক্রমে শুধু তাস খেলা নয়, বন্ধুদের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে এই আসর। বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলোর প্রতিনিধিরা এক জায়গায় মিলিত হয় এখানে। কোনো অফিশিয়াল ব্যাপার নেই, প্রেসের ঝুট-ঝামেলা নেই- সবমিলিয়ে বিশ্বশান্তির জন্য এই অনাড়ম্বর বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বৈকি।

পঞ্চাশ সেন্টে শুরু করছি আমি, বললেন জুলিয়াস শিলার।

বাড়িয়ে এক ডলার করলাম ওটাকে, বললেন আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো।

বোবঝা এবার! রাশিয়ানদের বিশ্বাস করতে নেই! ব্যঙ্গের সুরে মন্তব্য করলেন ডেইল নিকোলাস।

জুলিয়াস শিলার, আলেক্সেই কোরোলেঙ্কোর দিকে না তাকিয়েই তাকে একটা প্রশ্ন করলেন মিসরে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়তে পারে কি পারে না, এর ওপর ভবিষ্যদ্বাণী করো তো, হে।

প্রেসিভেট নাদাভ হাসানকে ত্রিশ দিনের বেশি সময় দেব না, এরই মধ্যে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে আখমত ইয়াজিদ।

তুমি প্রলম্বিত যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছ না?

না, বিশেষ করে সামরিক বাহিনী যদি সমর্থন করে আখমত ইয়াজিদকে।

তুমি আছ, সিনেটর? জিজ্ঞেস করলেন ডেইল নিকোলাস।

শেষ পর্যন্ত।

ইউরি?

পটে তিনটে চিপস ফেললেন ভয়স্কি, প্রতিটি পঞ্চাশ সেন্টের।

মোবারক পদত্যাগ করার পর যেদিন থেকে হাসান ক্ষমতা পেয়েছেন, অল্প দিন। হলেও, ইতোমধ্যে স্থিতিশীলতার একটা পর্যায় পর্যন্ত তুলে আনতে পেরেছেন মিসরকে, বললেন জুলিয়াস শিলার। আমার ধারণা, তিনি টিকে যাবেন।

তুমি তো ইরানের শাহ সম্পর্কেও এই কথাই বলেছিলে, হে। অভিযোগের সুরে বললেন কোরোলেঙ্কো।

মানলাম, হারু পার্টির পক্ষে বাজি ধরেছিলাম, জুলিয়াস শিলার তাস ফেলে গম্ভীর সুরে বললেন, আমাকে দুটো তাস দাও।

আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো নিজের কার্ড তুলে নিয়ে বললেন, তোমাদের বিপুল সাহায্য তলাবিহীন ঝুড়িতে ফেলা হচ্ছে কি না, সেটাই হলো প্রশ্ন। মিসরীয় জনতা অভুক্ত থাকার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এমন উৎকট অভাবের কারণেই তো বস্তি আর গ্রামগুলোয় ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছে আগুনের মতো। এটা-সেটা করে খোমনিকে যেভাবে বেশি বাড়াবাড়ি করতে দাওনি, যদি ভেবে থাকো আখমত ইয়াজিদকেও কেটেছেটে সাইজে রাখতে পারবে তাহলে হয়তো ভুল করবে তোমরা।

আমার জানার কৌতূহল, মস্কোর ভূমিকা কী হবে? প্রশ্ন করলেন সিনেটর পিট।

আমরা অপেক্ষা করব, শান্তভাবে বললেন আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো। আগুন না নেভা পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা।

নিজের কার্ডের ওপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে জুলিয়াস শিলার বললেন, যাই ঘটুক না কেন, কেউ লাভবান হবে না।

কথাটা ঠিক, হারব আমরা সবাই। তোমরা হয়তো মৌলবাদীদের দৃষ্টিতে মহা শয়তান, কিন্তু কমিউনিস্ট হিসেবে আমাদেরকেও ভালোবাসা হয় না। তোমাকে বলার দরকার পড়ে না, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ইসরায়েলের। ইরানের কাছে ইরাকের পরাজয় এবং সাদ্দাম হোসেনকে মেরে ফেলার চেষ্টার পর, এখন ইরান আর সিরিয়ার পথ খোলা। ওরা মুসলিম বিশ্বকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে ইন্ধন জোগাবে। এবারে ইহুদিরা শেষ।

সন্দেহপূর্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন সিনেটর। মধ্যপ্রাচ্যে সেরা যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে ইসরায়েলের। ওরা জিতে যাবে।

দুই মিলিয়ন আরব যখন একসাথে হামলা করবে, আর জিততে হবে না। ভয়স্কি সতর্ক করে দিয়ে বললেন। দক্ষিণে রওনা হবে আমাদের বাহিনী, আর ইয়াজিদের মিসরীয় বাহিনী উত্তর দিকে সিনাই পর্বতের দিকে আক্রমণ শানাবে। এবারে ইরানের সেনাবাহিনীর সাহায্যও পাবে তারা। যতই শক্তিশালী হোক, ইসরায়েল শেষ।

দক্ষযজ্ঞ থেমে যেতে, গম্ভীর স্বরে বলল আলেক্সেই, মুসলিম বিশ্ব ইচ্ছে মতো ছড়ি ঘোরাবে আমাদের ওপর। তেলের দাম বাড়াতে থাকবে তারা।

তোমার বেট, জুলিয়াস শিলারকে বললেন ডেইল নিকোলাস।

দু’ডলার।

চারে তুলে দিলাম, বললেন আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো।

ভয়স্কি হাতের কার্ড টেবিলে ফেলে দিলেন, আমি নেই।

আমিও চার, বললেন সিনেটর।

চারদিকে নাগিনেরা ফেলিতেছে নিঃশ্বাস, হাসলেন ডেইল নিকোলাস। আমি নেই।

নিজেদের বোকা বানিয়ে লাভ নেই, সিনেটর বলে চলেন, কোনো সন্দেহ নেই, চাপে পড়লে নিউক্লিয়ার বোমা ব্যবহার করবে ইসরায়েলিরা।

বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শিলার। ওটা নিয়ে ভাবতেও ভয় লাগে।

নক হলো দরজায়, ভেতরে ঢুকল বোটের স্কিপার। মি. শিলার, আপনার একটা জরুরি ফোন।

এক্সকিউজ মি, বলে চেয়ার ছাড়লেন জুলিয়াস শিলার। ইয়টে খেলতে বসে সবাই কয়েকটা শর্ত মেনে চলেন, তার মধ্যে একটা হলো, ভয়ানক জরুরি ফোন ছাড়া, সেটা উপস্থিত সবার জন্য জরুরি হতে বরে, কেউ টেবিল ছেড়ে উঠতে পারবেন না।

তোমার বাজি, আলেক্সি, সিনেটর বললেন।

আরও চার ডলার।

আই কল।

অসহায় ভঙ্গিতে কার্ড উল্টো করে টেবিলে মেলে দিলেন আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো। শুধু একজোড়া চার রয়েছে তার।

মুচকি হেসে একজোড়া ছয় দেখালেন সিনেটর।

ওহ, গুড লর্ড! হায় হায় করে উঠলেন ডেইল নিকোলাস। একজোড়া কিং নিয়ে অফ গেছি আমি!

তোমার লাঞ্চের টাকাগুলো গচ্চা খেল, আলেক্সি, সহাস্যে বললেন ভয়স্কি।

তাহলে দু’জনই পরস্পরকে ব্লাফ দিয়েছি। এই মুহূর্তে একটা তাগাদা অনুভব করছি, কে.জি.বি. চিফকে সাবধান করে দেয়া দরকার সে যেন ভুলেও তোমার সাহায্য না চায়।

সে সাবধান হবে না, ডেইল নিকোলাস হেসে উঠে বললেল। কারণ উল্টোটাই সত্যি বলে জানে সে।

রুমে ফিরে এসে টেবিলে আবার বসলেন জুলিয়াস শিলার। যেতে হয়েছিল বলে দুঃখিত। কিন্তু ব্যাপার হলো, এইমাত্র আমাকে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘের চার্টার করা একটা প্লেন গ্রিনল্যান্ডের উত্তর উপকূলে বিধ্বস্ত হয়েছে। লাশ উদ্ধার করা হয়েছে পঞ্চাশের ওপর। কেউ বেঁচে আছ কি না এখনও জানা যায়নি।

কোনো সোভিয়েত প্রতিনিধি ছিল? প্রশ্ন করলেন ভয়স্কি।

আরোহীদের তালিকা এখনও আসেনি।

সন্ত্রাসবাদীদের বোমা নাকি?

এক্ষুনি বলা সম্ভব নয়, তবে প্রাথমিক আভাস বলা হয়েছে ব্যাপারটা দুর্ঘটনা নয়।

কোন ফ্লাইট?

লন্ডন টু নিউ ইয়র্ক।

উত্তর গ্রিনল্যান্ড? চিন্তিতভাবে পুনরাবৃত্তি করলেন ডেইল নিকোলাস। কোর্স ছেড়ে হাজার মাইল দূরে সরে গেল!

হাইজ্যাকিঙের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, বললেন ভয়কি।

উদ্ধারকারী দল, পৌঁছেছে, ব্যাখ্যা করলেন জুলিয়াস শিলার। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আরও খবর পাওয়া যাবে।

থমথম করছে সিনেটরের চেহারা, এতক্ষণে চুরুটটা ধরালেন তিনি। আমার সন্দেহ হচ্ছে, ওই ফ্লাইটে হে’লা কামিল আছেন। সামনের সপ্তায় সাধারণ পরিষদের অধিবেশন, ইউরোপ থেকে হেডকোয়ার্টারে ফেরার কথা তার।

জর্জ বোধ হয় ঠিকই সন্দেহ করছে, বললেন ভয়স্কি। আমাদেরও দু’জন প্রতিনিধি তাঁর পার্টির সাথে ভ্রমণ করছে।

এ স্রেফ পাগলামি, বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে মাথা নাড়লেন জুলিয়াস শিলার। অর্থহীন পাগলামি। প্লেনভর্তি জাতিসংঘ প্রতিনিধিকে মেরে কার কী লাভ?

কেউই সাথে সাথে উত্তর দিল না। দীর্ঘ একটা নিস্তব্ধতা জমাট বাঁধতে শুরু করল। আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো তাকিয়ে আছেন টেবিলের মাঝখানে। অনেকক্ষণ পর শান্ত সুরে তিনি শুধু উচ্চারণ করলেন, আখমত ইয়াজিদ।

সিনেটর জর্জ পিট রুশ ডিপ্লোম্যাটের চোখে সরাসরি তাকালেন। তুমি জানতে।

অনুমান।

তোমার ধারণা আখমত ইয়াজিদ, হে’লা কামিলকে খুন করার নির্দেশ দিয়েছে?

আমাদের ইন্টেলিজেন্স জানতে পারে, কায়রোর একটা মৌলবাদী উপদল হে’লা কামিলকে খুন করার প্ল্যান নিয়ে ভাবছে।

অথচ চুপচাপ দাঁড়িয়ে মজা দেখেছ, লাভের মধ্যে পঞ্চাশজন নিরীহ মানুষ মারা গেল!

হিসেবের গরমিল, স্বীকার করলেন আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো। কখন বা কোথায় খুন করার চেষ্টা করা হবে তা আমরা জানতে পারিনি। ধরে নেয়া হয়েছিল, হে’লা কামিল শুধু যদি মিসরে ফেরেন তাহলে বিপদ হবে তার। না, ইয়াজিদের তরফ থেকে নয়, বিপদ হবে তার ফ্যানাটিক অনুসারীদের দ্বারা। সন্ত্রাসবাদী কোনো তৎপরতার সাথে কখনোই জড়ানো সম্ভব হয়নি আখমত ইয়াজিদকে। তার সম্পর্কে তোমাদের আর আমাদের রিপোর্টে কোনো পার্থক্য নেই। প্রতিভাবান এক ধর্মীয় নেতা, নিজেকে যে মুসলিম গান্ধী বলে মনে করে।

এই হলো কে. জি. বি. আর সি.আই.এ-র দৌড়! ক্ষোভের সাথে বললেন ভয়স্কি।

হ্যাঁ, যা ভাবা হয়েছিল, লোকটা তার চেয়ে অনেক বড় সাইকো কেস।

জুলিয়াস শিলার সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকালেন। দুঃখজনক ঘটনাটার জন্য দায়ী হতে হবে আখমত ইয়াজিদকেই। তার সমর্থন ছাড়া অনুসারীরা এত বড় একটা ক্রাইম করতে পারে না।

তার মোটিভ আছে, বললেন নিকোলাস। হে’লা কামিল এমন একটা আকর্ষণ, তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা মিসরীয়দের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি তাঁর একার যোগ্যতায় গোটা মিসরকে সারা দুনিয়ার চোখে দুর্লভ একটা সম্মানের আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। শুধু জনসাধারণের মধ্যে নয়, সামরিক বাহিনীতেও তার জনপ্রিয়তা প্রেসিডেন্ট হাসানের জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই আখমত ইয়াজিদ তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে। হে’লা কামিল মারা যাবার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চরমপন্থী মোল্লারা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে।

কিন্তু হাসানের পতন হবার পর? ঠোঁটে ধারালো হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আলেক্সেই কোরোলেঙ্কো। হোয়াইট হাউস তখন কী করবে?

জুলিয়াস শিলার আর ডেইল নিকোলাস দৃষ্টি বিনিময় করলেন। কেন, রাশিয়ানরা যা করবে আমরাও তাই করব, বললেন জুলিয়াস শিলার। আগুন না নেভা পর্যন্ত অপেক্ষা।

কিন্তু যদি চরমপন্থী মিসরীয় সরকার অন্যান্য আরব দেশগুলোকে সাথে নিয়ে ইসরায়েলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আলেক্সেই কোরোলেঙ্কোর গলা তীক্ষ্ণ হলো।

অবশ্যই ইসরায়েলকে আমরা সাহায্য করব, অতীতে যেমন করেছি।

তোমরা কি মার্কিন সৈন্য পাঠাবে?

বোধ হয় না।

আর চরমপন্থী নেতারা সেটা জানে, কাজেই তারা হাতে ক্ষমতা পেলে নির্ভয়ে ইসরায়েলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

সৈন্য পাঠাব না তা ঠিক, গম্ভীর সুরে বললেন জুলিয়াস শিলার, কিন্তু এবার আমরা নিউক্লিয়ার উইপন ব্যবহার করতে ইসরায়েলকে বাধাও দেব না। খুব সম্ভব ওদেরকে আমরা কায়রো, দামেস্ক আর বৈরুত দখল করতে দেব।

তুমি বলতে চাইছ, ইসরায়েলিরা পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করতে চাইলে তোমাদের প্রেসিডেন্ট আপত্তি করবেন না?

অনেকটা তাই, নির্লিপ্ত সুরে বললেন জুলিয়াস শিলার। ডেইল নিকোলাসের দিকে ফিরলেন তিনি। কার ডিল?

বোধ হয় আমার, বললেন সিনেটর, ওদের আলাপ শুনলেও তার চেহারা সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন।

পঞ্চাশ সেন্ট।

ধীর কণ্ঠে ভয়কি বললেন, আমার কাছে ব্যাপারটা উদ্বেগজনক বলে মনে হলো।

মাঝেমধ্যে ভূমিকা বদলানোর দরকার পড়ে, নতুন কিছু একটা ঘটা উচিত, অজুহাত খাড়া করার সুরে বললেন ডেইল নিকোলাস। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দারুণ ফল পেয়েছি আমরা। আমাদের তেলের রিজার্ভ এখন আশি বিলিয়ান ব্যারেল। প্রতি ব্যারেল যেহেতু পঞ্চাশ ডলারে উঠে যাচ্ছে আমাদের তেল কোম্পানিগুলো এখন বিশাল জায়গাজুড়ে তেল খোঁজার খরচ জোগাতে পারবে। তাছাড়া, মেক্সিকো আর দক্ষিণ আমেরিকার রিজার্ভ থেকেও প্রচুর তেল পাব আমরা। মোদ্দা কথা হলো, তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করার কোনো দরকার নেই আমাদের। সোভিয়েত রাশিয়া যদি উপহার চায়, গোটা আরব জাহানই নিয়ে যেতে পারে তারা।

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না আলেক্সেই। আমেরিকার নীতি তার পিলে চমকে দিয়েছে।

সিনেটর পিটের মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, তেলে আমেরিকা স্বয়ংসম্পূর্ণতা পাবে কি না। মেক্সিকো কি আসলে আমেরিকার বন্ধু? সন্দেহ আছে।

মিসরে রয়েছে ধর্মান্ধ নেতা আখমত ইয়াজিদ। কিন্তু মেক্সিকোতেও তো রয়েছে উগ্র মৌলবাদী নেতা, টপিটজিন। আজটেক সাম্রাজ্যের মতো মেক্সিকোয় জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান চায় সে। ইয়াজিদের মতোই তার দেশেও টপিটজিনের রয়েছে বিশাল সমর্থন। বর্তমান সরকারকে উৎখাত করা এখন সময়ের ব্যাপার।

সমস্ত উন্মাদ, ধর্মান্ধ নেতাগুলো আচমকা কোত্থেকে উদয় হচ্ছে? এই শয়তানগুলোকে কে নাচাচ্ছে? হাতের কাঁপুনি বন্ধ করতে বেগ পেতে হলে সিনেটর জর্জ পিটকে।

.

১২.

গভীর রাতের ভৌতিক নিস্তব্ধতার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে প্রকাণ্ড মূর্তিগুলো, চোখহীন কোটর মেলে তাকিয়ে আছে দুর্গম অনুর্বর পাহাড় আর প্রান্তরের দিকে, যেন অপেক্ষা করছে তাদের পাষাণ শরীর প্রাণ সঞ্চার করার জন্য অজানা কোনো অস্তিত্বের উপস্থিতি ঘটবে। নগ্ন, আড়ষ্ট মূর্তিগুলো, এক একটা দোতলা বাড়ির সমান উঁচু, গম্ভীর মুখের চেহারা উদ্ভাসিত হয়ে আছে গোল চাঁদের উজ্জ্বল আলোয়।

এক হাজার বছর আগে মূর্তিগুলো একটা মন্দিরের ছাদের অবলম্বন হিসেবে ছিল। মন্দিরটা ছিল পাঁচ ধাপে ভাগ করা একটা পিরামিডের মাথায়। কোয়েটজালকোটল পিরামিড আজও টিকে আছে, তবে কালের আঁচড়ে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে মন্দিরটা। জায়গাটা টুলার টলটেক শহরে। নিচু একটা পাহাড়শ্রেণীর পাশেই এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, হারিয়ে যাওয়া শখের দিনে এই শহরে বাস করত ষাট হাজার মানুষ।

খুব কম টুরিস্টই আসে এদিকে, একবার এলে দ্বিতীয়বার কেউ আসতে চায় না জায়গাটার ভৌতিক পরিবেশ আর নির্জনতার জন্য। বিধ্বস্ত শহরের আনাচেকানাচে বেটপ ছায়াগুলো মনে সন্দেহের উদ্রেক করে, গোঙানির শব্দটা বাতাসের কি না ঠিক বোঝা যায় না। এসব কিছু অগ্রাহ্য করে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ পিরামিডের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে চূড়ায় বসানো মূর্তিগুলোর দিকে। ভদ্রলোকের পরনে থ্রিপিস স্যুট, হাতে একটা লেদার অ্যাটাচি কেস।

পাঁচটা টেরেসের প্রতিটিতে থেমে জিরিয়ে নিলেন তিনি, পাথুরে দেয়ালের গায়ে খোদাই করা শিল্পকর্ম দেখলেন। বিশাল সরীসৃপের হাঁ করা মুখ থেকে উঁকি দিচ্ছে মানুষের মুখ, ঈগলের ঠোঁটে ক্ষতিবিক্ষত হচ্ছে মানুষের হৃৎপিণ্ড। আবার উঠতে শুরু করলেন ভদ্রলোক, পেরিয়ে এলেন মানুষের খুলি আর হাড় খোদাই করা একটা বেদি। এগুলো প্রাচীন প্রতীক চিহ্ন, ক্যারিবিয়ান জলদস্যুরা ব্যবহার করত।

পিরামিডের মাথায় উঠে চারদিকে তাকালেন তিনি। ঘামছেন, হাঁপিয়ে গেছেন। না, নিঃসঙ্গ নন ভদ্রলোক। ছায়া থেকে বেরিয়ে এল দুটো মানুষ্য মূর্তি, সার্চ করল তাঁকে। তারপর তারা হাত ইশারায় অ্যাটাচি কেসটা দেখল। বিনীত ভঙ্গিতে সেটা খুললেন ভদ্রলোক। ভেতরের জিনিসপত্র এলোমেলো করল লোক দু’জন, কোনো অস্ত্র না পেয়ে নিঃশব্দে ঘুরে দাঁড়িয়ে মন্দির মঞ্চের কিনারা লক্ষ করে হাটা ধরল।

পেশিতে ঢিল পড়ল গাই রিভাসের। অ্যাটাচি কেসের হাতলে লুকানো বোতামে চাপ দিলেন তিনি, ঢাকনির ভেতর আড়াল করা ছোট্ট টেপ রেকর্ডারটা চালু হলো।

দীর্ঘ এক মিনিট পর মূর্তিগুলোর একটা ছায়া থেকে বেরিয়ে এল একজন লোক। মেঝে পর্যন্ত লম্বা সাদা কাপড়ের আলখেল্লা পরে আছে সে। লম্বা চুল ঘাড়ের কাছে বাধা। চোখ আর নাকের ওপর গোটা কপালজুড়ে বহুরঙা নকশা করা মখমলের গোল একটা চাকতি, চাকতির দুধার থেকে দুটো চওড়া ফিতে বেরিয়েছে, পেঁচিয়ে আছে কানের ওপর দিয়ে মাথার পেছনটাকে। মাথার সামনের অংশে রেশম আর পাখির পালক খাড়া করে বাঁধা। পা দুটো আলখেল্লার ভেতর, তবে চাঁদের আলোয় বাহুতে পরা বৃত্তাকার ব্যান্ড দুটো পরিষ্কার দেখা গেল, সোনার ওপর মণিমুক্তোখচিত।

তেমন লম্বা নয় সে, মসৃণ গোল ধাচের মুখাবয়ব ইন্ডিয়ান পূর্বপুরুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। কালো চোখ দিয়ে সামনে দাঁড়ানো ভদ্রলোককে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল সে। লোকটার বয়স ত্রিশের বেশি না। লোকটা বুকের ওপর হাত দুটো ভাঁজ করে বলল,

আমি টপিটজিন।

আমার নাম গাই রিভাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁর বিশেষ দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন আমাকে। রিভাস আশা করেছিলেন আরও বয়স্ক হবে টপিটজিন।

নিচু একটা পাঁচিলের দিকে তাকাল টপিটজিন। কথা বলার জন্য ওখানে আমরা বসতে পারি।

মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে গেলেন রিভাস, পাঁচিলের মাথায় বসলেন। সাক্ষাৎদানের জন্য অদ্ভুত একটা জায়গা বেছে নিয়েছেন আপনি।

হ্যাঁ, তার কারণও আছে টুলা আমার উদ্দেশ্য পূরণ করবে। কোনো কারণ নেই, হঠাৎ করে তার চেহারা আর গলার সুরে আক্রোশ ও ঘৃণা ফুটে উঠল। তোমার প্রেসিডেন্ট আমাদের সাথে প্রকাশ্যে আলোচনায় বসতে ভয় পায়। সে একটা কাপুরুষ, সে তার মেক্সিকো সিটির বন্ধুদের অসন্তুষ্ট করতে সাহস পায় না।

টোপ এড়িয়ে যাবার অভিজ্ঞতা রয়েছে রিভাসের। তিনি নরম সুরে বললেন, আপনি আমাকে সাক্ষাৎদানের রাজি হওয়ায় প্রেসিডেন্ট বলেছেন আমি যেন তার কৃতজ্ঞতা আপনার কাছে পৌঁছে দিই।

আমি আশা করেছিলাম আপনার চেয়ে আরও উঁচু পদের কেউ আসবে।

আপনার শর্ত ছিল কথা বলবেন শুধু একজন লোকের সাথে। স্বভাবতই আমরা ধরে নিই, আপনি চান না আমাদের সাথে কোনো দোভাষী থাকুক। আর, আপনি যেহেতু স্প্যানিশ বা ইংরেজি বলতে রাজি নন, অগত্যা আমাকেই পাঠানো হলো। কর্মকর্তা পর্যায়ে আমিই একমাত্র অফিসার যে প্রাচীন আযটেক ভাষা নাহুয়াটল জানে।

বলতে বেশ ভালোই পারেন।

এসকামপো শহর থেকে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন আমাদের পরিবার। খুব যখন ছোট আমি, তখন শিখেছি।

এসকামপো আমি চিনি। ছোট্ট একটা গ্রাম, দপূর্ণ ওখানকার লোকেরা। কিন্তু আয়ু কম।

আপনি দাবি করেন, মেক্সিকো থেকে দারিদ্য চিরতরে হটিয়ে দেবেন। আমাদের প্রেসিডেন্ট আপনার প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানতে অত্যন্ত আগ্রহী।

সে কি সেজন্যই আপনাকে পাঠিয়েছে?

মাথা ঝাঁকালেন রিভাস। তিনি যোগাযোগের একটা মাধ্যম খুলতে চান?

গম্ভীর একটুকরো হাসি ফুটে উঠল টপিটজিনের মুখে।

অর্থনৈতিক অবস্থা যেহেতু ভেঙে পড়েছে, কাজেই তিনি জানেন আমার আন্দোলনের তোড়ে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়ে যাবে। আমার ক্ষমতায় আসার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে, তাই আগেভাগে সুসম্পর্কে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার ওদিকে সরকারের সাথেও হাত মেলানো হচ্ছে। মেক্সিকোয় আপনাদের স্বার্থ আছে, সেটা থেকে বঞ্চিত হতে চান না, এই তো?

প্রেসিডেন্টের মনের কথা পড়া আমার সাধ্যের অতীত।

সে খুব তাড়াতাড়িই জানতে পারবে যে মেক্সিকোর নির্যাতিত মানুষ শাসকশ্রেণী আর ধনীদের অনুগ্রহ নিয়ে বেঁচে থাকতে রাজি নয় আর। দুর্নীতি আর রাজিৈনতক ধোঁকাবাজি ধৈর্যের শেষ সীমায় এনে ফেলেছে তাদেরকে। বস্তি এলাকার মানুষের দুর্দশা চোখে দেখা যায় না। গ্রামে সাধারণ মানুষের কোনো কাজ নেই। কিন্তু না, আর তারা সহ্য করবে না। তাদের চুপচাপ বসে থাকার দিন শেষ হয়েছে।

আপনি চান, আযটেক ধুলো থেকে আদর্শ একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবেন?

আমি বলি, আপনাদের উচিত পূর্বপুরুষদের হাতে দেশ ফিরিয়ে দেয়া।

পুরো আমেরিকায় আযটেকরা ছিল সবচেয়ে বড় কসাই। এ রকম বর্বর একটা সভ্যতার ওপর ভিত্তি করে আপনি আধুনিক দেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন… থেমে পড়েন রিভাস। বেশ কষ্টকল্পনা নয় কি?

টপিটজিনের গোলাকার মুখাবয়বে ছায়া ঘনায়। আপনার তো জানা আছে, শয়তান স্পেনীয়রা আযটেকদের উৎখাত করেছিল। ওরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের জবাই করেছে।

এ রকম স্পেনীয়রা ও মুরের কথা বলবে।

আপনার প্রেসিডেন্ট কী চায় আমার কাছে?

তিনি শুধু মেক্সিকোর শান্তি আর উন্নতি চান, জবাব দিলেন রিভাস। এবং একটা প্রতিশ্রুতি-আপনি কমিউনিজমের দিকে এগোবেন না।

আমি মার্ক্সিস্ট নই। কমিউনিজমকে সে যতটুকু ঘৃণা করে, আমি তার চেয়ে কম করি না। আমার অনুসারীদের মধ্যে সশস্ত্র গেরিলা একজনও নেই।

শুনে তিনি খুশি হবেন।

আমাদের নতুন আযটেক জাতি গৌরব ও মহত্ত্ব অর্জন করবে কালো টাকার মালিক, দুর্নীতিপরায়ণ অফিসার, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য আর সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বলি দেয়ার পর।

রিভাসের মনে হলো তিনি শুনতে বা বুঝতে ভুল করেছেন। আপনি কি হাজার হাজার মানুষকে খুন করার কথা বলছেন?

খুন? কর্কশ শব্দে হেসে উঠল টপিটজিন। আরে না, মি, গাই রিভাস, না! আমি আমাদের দেবতাদের উদ্দেশ্য বলি দেয়ার কথা বলছি। কোয়েকজালকোটল, হুইটজিলোপোকটলি, টেক্যাটলিপোকা-আপনি তো জানেনই, এ রকম আরও অনেক দেবতা আছে আমাদের। অনেক যুগ পেরিয়ে গেছে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি উৎসর্গ করা হয় না। আমার দ্বারা সেই শুভ কাজটা এবার সম্পন্ন হবে, কথা দিচ্ছি।

না! এই একটা শব্দ ছড়া গাই রিভাস আর কিছু বলতে পারলেন না।

আমাদের আটেক রাষ্ট্রের নাম হবে টেনোচটিকলান। আইনের অনুশাসন হবে। ধর্মভিত্তিক। নাহুয়াটল হবে রাষ্ট্রীয় ভাষা। কঠোর ব্যবস্থায় কমিয়ে আনা হবে জনসংখ্যা। বিদেশি পুঁজি বা শিল্প হবে রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সীমান্তের ভেতর বাস করতে পারবে শুধু নেটিভরা। বাকি সবাইকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে।

স্তম্ভিত বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে থাকলেন গাই রিভাস। তারা চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।

বিরতি না নিয়ে বলেই চলেছে টপিটজিন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো পণ্য কেন হবে না। আপনাদের কাছে এক ফোঁটা তেলও আমরা বিক্রি করব না। বিশ্বব্যাংকে আমাদের সমুদয় দেনা পরিশোধযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করা হবে। ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো আর আরিজানায় আমাদের যেসব জায়গা আপনারা দখল করে রেখেছেন, সেগুলো ফেরত চাওয়া হবে। ফেরত পাবার স্বার্থে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে সীমান্ত পেরোবার জন্য লং মার্চ করব আমরা।

যদি ঠাট্টা না হয়, বিভাস বললেন, তাহলে বলব নেহাতই পাগলামি। এ ধরনের উদ্ভট দাবির কথা শুনতে চাইবেন না আমাদের প্রেসিডেন্ট।

ধীরে ধীরে পাঁচিল থেকে নেমে দাঁড়াল টপিটুজিন, নত হয়ে আছে অলকৃত মাথা, চোখ নিস্পলক, বেসুরো গলায় বিড়বিড় করে বলল, তাহলে তো তাকে একটা মেসেজ পাঠাতে হয়, যাতে বিশ্বাস করে?

সে তার মাথার ওর তুলল হাত দুটো, গোটা বাহু গঢ়ি আকাশের দিকে খাড়া হলো। যেন সঙ্কেত পেয়ে পাথুরে মূর্তিগুলোর গভীর ছায়া থেকে বেরিয়ে এল চারজন মানুষ, মাথায় পট্টি ছাড়া গায়ে কোনো আবরণ নেই। চারদিক থেকে এগিয়ে এসে গাই রিভাসকে ঘিরে ফেলল, ভয় আর অবিশ্বাসে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন তিনি। চারজন মিলে ধরল তাকে, নিজেদের মধ্যে ধরাধরি করে নামিয়ে আনল পাথরে বেদিতে, যেখানে মানুষের খুলি আর হাড় খোদাই করা রয়েছে পাঁচিলের গায়ে। বেদির ওপর শোয়ানো হলো তাকে। হাত আর পা ধরে থাকল চারজন।

কী ঘটতে যাচ্ছে উপলব্ধি করে আরও কয়েক সেকেন্ড বোবা হয়ে থাকলেন গাই রিভাস। তারপর বাঁচার আকুতিতে চিৎকার করে উঠলেন, ওহ্ গড়, নো! নো। নো নো!

আতঙ্কিত আমেরিকানকে গ্রাহ্যই করল না টপিটজিন, বেদির একপ্রান্তে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল সে। খানিক পর একবার শুধু মাথা ঝাঁকাল।

লোকগুলো রিভাসের কোট আর শার্ট খুলে নিল। বেরিয়ে পড়ল নগ্ন বুক।

টপিটজিনের হাতে হঠাৎ করে উদয় হলো লম্বা একটা ছোর। মাথার ওপর উঁচু করে ধরল সেটা। চাঁদের আলোয় চকচক করে উঠল কালো ফলা। এগিয়ে এল সে।

আর্তনাদ করে উঠলেন গাই রিভাস, সেটাই তার শেষ চিৎকার।

পরমুহূর্তে ছোরার ফলাটা গেঁথে গেল বুকে।

সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু মূর্তিগুলো নির্লিপ্ত। হাজার বছর ধরে এ ধরনের অমানুষিক নিষ্ঠুরতা বহুবার দেখেছে তারা নির্লিপ্ত চোখে।

তখনও লাফাচ্ছে গাই রিভাসের হৃৎপিণ্ড, বুকের ভেতর থেকে সেটাকে যখন বের করা হলো।

.

১৩.

চারপাশে লোকজন ও ব্যস্ততা থাকলেও হিম উত্তরের গভীর নিস্তব্ধতা পিটের গোটা অস্তিত্বে যেন চেপে বসেছে। আর্কটিকের ঠাণ্ডা ওকে বিবশ করে ফেলছে একদম। এত শান্ত সুনসান নীরবতা- সমস্ত আওয়াজ শুষে নিচ্ছে যেন। পিটের মনে হতে লাগল ও বুঝি কোনো রেফ্রিজারেটরের মধ্যে রয়েছে।

অবশেষে দিনের আলো ফুটল, ধূসর রঙের অদ্ভুত কুয়াশা ভেদ করে এত স্নান যে সে আলোয় ছায়া পড়ে না। আরও একটু বেলা হতে কোমল কমলা-সাদা রং নিল আকাশ, হিম কুয়াশা পোড়াতে শুরু করেছে সূর্য। খাড়ির ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে চূড়াগুলোকে তুষারের সাদা বোরখা ঢাকা নারীমূর্তি মনে হলো।

অকুস্থলের চারদিকে এখন অন্য রকম চেহারা। প্রথমে পৌঁছেছে পাঁচটা এয়ারফোর্স হেলিকপ্টার, সাথে করে এনেছে আর্মি স্পেশাল সার্ভিস ফোর্স। লোকগুলো সশস্ত্র, থমথমে কঠিন চেহারা, গোটা এলাকা তারা নিশ্চিদ্রভাবে ঘিরে ফেলল। এক ঘন্টার পর পৌঁছুল ফেডারেল এভিয়েশন ইনভেস্টিগেটররা, বিধ্বস্ত প্লেনের বিচ্ছিন্ন অংশ কী কী সংগ্রহ করা হবে সব চিহ্নিত করে ফেলল তারা। তাদের পিছু পিছু এল প্যাথোলজিস্টদের একটা দল, লাশগুলো হেলিকপ্টারে তুলে নিয়ে চলে গেল এয়ারফোর্স বেস থিউল-এর মর্গে।

নেভির পক্ষ থেকে রইলেন কমান্ডার বায়রন নাইট, পোলার এক্সপ্লোরার পৌঁছেছে অকুস্থলে। ওটার ভেঁপুর গুরুগম্ভীর আওয়াজে সচকিত হলো সবাই।

সাইরেন বাজিয়ে ধীরে ধীরে খাড়ির মুখে ঢুকল পোলার এক্সপ্লোরার। গথিক দুর্গের মতো লাগল জাহাজটাকে। আইসপ্যাক ভেঙে অনায়াসে পথ করে নিল সেটা, অকুস্থল থেকে মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরে থামল। কমান্ডার বায়রন নাইট ইঞ্জিন বন্ধ করলেন, সিঁড়ি বেয়ে বরফের ওপর নেমে এলেন। নেমেই তিনি উপস্থিত উদ্ধারকর্মীদের প্রয়োজনে জাহাজের সুবিধাদি ব্যবহার করার অনুরোধ জানালেন। কৃতজ্ঞচিত্তে তার প্রস্তাব গ্রহণ করল সবাই। কাজে বিরতি দিয়ে ছুটল তারা জাহাজের দিকে।

সিকিউরিটির অবস্থা দেখে পিট মুগ্ধ। কোনো খবর এখনো চাউড় হয়নি। কেবল কেনেডি।

আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট জানে জাতিসংঘের ফ্লাইট বিলম্ব করছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য সমস্ত খবর জানাজানি হয়ে যাবে।

মনে হচ্ছে, চোখের মণি জমে যাবে হে, বিষণ্ণ চিত্তে জিওর্দিনো বলে। নুমার হেলিকপ্টারের পাইলটের সিটে বসে এক কাপ কফি খাওয়ার চেষ্টা করছে সে।

তুমি তো সারা দিন-রাত ককপিটেই বসে আছো, পিট কটাক্ষ হানে।

আরে, বাইরের অবস্থা দেখে এখানে বসেই আমরা ফ্রস্টবাইট হয়ে যাচ্ছে, জিওর্দিনো সিরিয়াস চোখে জানায়।

বাইরে তাকিয়ে কমান্ডার বায়রন নাইটকে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে আসতে দেখল পিট। ঝুঁকে, দরজাটা খুলে মেলে ধরল সে। ঠাণ্ডায় আরো এক দপা গুঙিয়ে উঠল জিওর্দিনো।

শুভেচ্ছা জানিয়ে পারকার পকেট থেকে একটা কনিয়াকের বোতল বের করলেন নাইট।

চুরি করে এনেছি বোতলটা। ভাবলাম, তোমাদের প্রয়োজন হতে পারে।

বোতলটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে পিট বলল, আপনি এইমাত্র অ্যালকে স্বর্গে পাঠিয়ে দিলেন।

বোতলটা নিয়ে ঠাণ্ডায় হি হি করতে করতে জিওর্দিনো বলল, তারচেয়ে আমি নরক পছন্দ করব। ছিপি খুলে কয়েক ঢোক ব্র্যান্ডি খেল সে। বোতলটা পিটকে ফিরিয়ে দিল।

জাহাজে ওঁরা কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করল পিট।

মিস কামিল বিশ্রাম নিচ্ছেন। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, আমাকে দুবার ডেকে তিনি দেখা করতে চেয়েছেন তোমাদের সাথে। নিউ ইয়র্কে ডিনার না কী যেন একটা ব্যাপারে।

ডিনার? পিটের চেহারায় কৌতুক।

মজার ব্যাপার, ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টের হাঁটুর চামড়ায় ওষুধ লাগানোর পর সে নাকি বলেছে, তোমার সাথে তারও একটা ডিনার ডেট ঠিক হয়ে আছে।

ধোয়া তুলসী পাতার চেহারা নিয়ে পিট বলল, আমার ধারণা, ওদের নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে।

পিটের হাত থেকে বোতলটা ছো দিয়ে কেড়ে নিল জিওর্দিনো, বলল, কেন যেন মনে হচ্ছে, এ গান আগেও আমি শুনেছি!

আর চিফ স্টুয়ার্ড?

তার অবস্থা বেশ খারাপই বলব, পিটের প্রশ্নের জবাব দিলেন নাইট। তবে ডাক্তার বলছেন, সেরে উঠবে। তার নাম রুবিন। ওষুধের প্রভাবে ঘুমিয়ে পড়ার সময় বিড়বিড় করে কি বলল, ভুল বকছে কিনা বুঝলাম না-ফাস্ট আর সেকেন্ড অফিসারকে খুন করেছে পাইলট, তারপর উড়ন্ত প্লেন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে…

বোধ হয় ভুল বকছে না, বলল পিট। পাইলটের লাশ এখনও পাইনি আমরা। নাইটের দিকে তাকাল ও রাশিয়ান সাবমেরিন নিয়ে কী করা হবে?

আপাতত এটা নিয়ে আমরা কোনো খবর জানাচ্ছি না। ভাগ্যই বলতে হয়, এই প্লেন ক্রাশ আমাদের কাজের দিক থেকে সবার চোখ সরিয়ে দিয়েছে। তবে কতক্ষণ চাপা থাকবে সংবাদটা, তাই চিন্তার বিষয়।

বেশি খুশি না হওয়াই ভালো, অ্যাল জিওর্দিনো বলে। রাশিয়ানরা এত গাধা নয়। কখন দেখবেন সব বুঝে গেছে, তারপর দুনিয়ার জাহাজ আর উদ্ধারকারী বার্জ নিয়ে চলে এসেছে অকুস্থলে। ওরা দারুণ চতুর। জাহাজের পেছনে বেঁধে সোজা রাশিয়ায় নিয়ে থামবে সাবমেরিনটা।

যদি ধ্বংস করে দেয়? পিট জানতে চায়।

সোভিয়েতদের ভালো উদ্ধারকারী টেকনোলজি নেই। ওরা বরঞ্চ এতেই খুশি, কেউ যেন ওদের সাবমেরিন পরীক্ষা করে দেখতে না পারে।

কনিয়াকের বোতল পিটের হাতে ধরিয়ে দেয় জিওর্দিনো। এখানে বসে তর্ক না করে, চলো গিয়ে জাহাজের গরম হাওয়া খাই?

হ্যাঁ, কমান্ডার নাইট সায় দিলেন। তোমরা যথেষ্ট করেছে এখানে।

পারকা গায়ে দিয়ে নেয় পিট। আমার অবশ্য একটু স্কি করার শখ জেগেছে মনে।

তার মানে এখন জাহাজে আসছে না?

এই আর কী। ওই আর্কিওলজির দলটাকে একটু দেখে আসি।

অযথা। ডাক্তার তার কয়েকজন সাঙ্গ-পাঙ্গ পাঠিয়েছে ওখানে। ওরা ভালোই আছে।

তাহলে ওরা কী খুঁড়ে বের করল, তাই না হয় দেখি, পিট নাছোরবান্দা।

হ্যাঁ, যাও, গ্রিক দেবী-টেবিও পেয়ে যেতে পারো।

অসম্ভব কী! হাসল পিট।

কিন্তু প্লেন আর আরোহীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কী বলবে ওদেরকে?

আমরা এখানে একটা জিওলজিক্যাল সার্ভে প্রজেক্টে কাজ করছি, বলল পিট। আরোহীরা ফিউজিলাজে আটকা পড়ে, হাইপথারমিয়ায় মারা গেছে।

আমার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, বলে রওনা হলো পিট।

তাজ্জব ব্যাপার! অ্যান্টিকস সম্পর্কে ওর আগ্রহ দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। জানতাম না, এই বিষয়েও ওর আগ্রহ আছে। নাইট বললেন।

আরে, ও-ই কি ছাই জানত নাকি! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে অ্যাল।

.

বরফের মাঠ শক্ত আর সমতল, খাড়ির ওপর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে পিট। উত্তর পশ্চিম দিকে কালো মেঘ, সেদিকে একটা চোখ রেখে এগোচ্ছে ও। রোদে ঝলমলে প্রকৃতি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চেহারা পাল্টে রুদ্রমূর্তি ধরতে পারে, শুরু হয়ে যেতে পারে ঝড়-ঝঞ্ঝার তাণ্ডব নৃত্য, জানা আছে ওর। অন্ধকার হয়ে এলে দিক চেনার কোনো উপায় থাকে না, সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বরফের রাজ্যে পথ হারালে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে দেখা দেবে।

দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে পিট। তীররেখা পেরিয়ে এল। ধোয়ার একটা ক্ষীণ রেখা পথ দেখাচ্ছে ওকে। সন্দেহ নেই, আর্কিওলজিস্টদের আশ্রয় থেকে উঠছে ধোঁয়াটা।

আশ্রয় যখন আর মাত্র দশ মিনিটের পথ, এই সময় ঝড়ের কবলে পড়ল পিট। বিশ মিটার দূরে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল, এখন পাঁচ মিটার দূরের বরফও পরিষ্কার নয়। জগিং করার ভঙ্গিতে ছুটল ও, ব্যাকুলতার সাথে আশা করছে সরল একটা রেখা ধরেই সামনে এগোচ্ছে সে। কোনোকোনি ছুটে এসে বাম কাঁধে আঘাত করছে তুষারকণা আর বাতাস, বাতাসের গায়ে সামান্য হেলান দিয়ে ছুটল ও।

বাতাসের গতিবেগ বাড়ল। হেলান দিয়ে থাকা সত্ত্বেও ঠেলে ফেলে দিতে চাইছে। ওকে। সামনে এখন প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ও। মাথা নিচু করে পায়ের দিকে চোখ রেখেছে, প্রতিটি পদক্ষেপ গুনছে, হাত দুটো মাথার দুপাশে ভাঁজ করা। জানে, কিছু দেখতে না পেয়ে হাঁটা মানে বৃত্তাকারে ঘোরা। হয়তো আর্কিওলজিস্টদের আশ্রয়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে, টেরও পাবে না। সবশেষে, ক্লান্ত শরীর নেতিয়ে পড়বে বরফের ওপর।

বাতাস যতই তীব্রগতি আর ঠাণ্ডা হোক, ভারী কাপড়গুলো গরম রাখছে শরীরটাকে। হার্টবিটের শব্দ শুনে বুঝতে পারছে, এখনও সে মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েনি।

আশ্রয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে মনে হতে দাঁড়িয়ে পড়ল পিট। এবার সাবধানে এগোল। ত্রিশ পা এগিয়ে থামল আবার। ডান দিকে ঘুরল, এগোল তিন মিটারের মতো। উল্টোদিক থেকে ধেয়ে আসা তুষার ঝড়ের ভেতর ফেলে আসা পায়ের চিহ্ন অস্পষ্টভাবে চিনতে পারল ও। ঘুরল, ফেলে আসা পথের সমান্তরাল রেখা ধরে এগোল এবার, এভাবে ত্রিশ মিটার পরপর দিক বদলে, একটা নকশা তৈরি করে গোটা এলাকা চষে ফেলার উদ্দেশ্য।

পাঁচবারে পাঁচটা রেখা তৈরি করল ও। আশ্রয়ের কোনো সন্ধান পেল না। তৈরি করা রেখাগুলো ধরে ফিরে এল মাঝখানে, অর্থাৎ তিন নম্বর রেখায়। এবার আড়াআড়িভাবে হাঁটা ধরল ও। তিনটে নতুন রেখা তৈরি শেষ করতে যাচ্ছে, এই সময় তুষারপে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার উপক্রম করল, হাতে ঠেকল একটা ধাতব দেয়াল।

দেয়াল ধরে দুবার দুটো কোণ ঘুরল পিট, হাতে চলে এল একটা রশি, রশিটা পৌঁছে দিল একটা দরজায়। ঠেলা দিতেই খুলে গেল সেটা। উপলব্ধিটুকু উপভোগ করল ও, তার প্রাণ সংশয় দেখা দিয়েছিল, তবে নিজেকে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে। সে। ভেতরে ঢুকতে হতাশ বোধ করল পিট।

এখানে কেউ বসবাস করে না। মেঝেতে স্তূপ হয়ে আছে পাথর আর মাটি, চারদিকে গর্ত। হিমাংকের খুব একটা ওপরে হবে না তাপমাত্রা। তবে ঝড়ের হাত থেকে বাঁচা গেছে, কৃতজ্ঞচিত্তে ভাবল ও।

আলো আসছে শুধু একটা কোলম্যান লণ্ঠন থেকে। প্রথমে ভাবল, কাঠামোটার ভেতর কেউ নেই। তারপর গর্ত থেকে ধীরে ধীরে উঁচু হলো একজোড়া কাঁধ আর একটা মাথা। শরীরটা ঝুঁকে আছে, পিটের দিকে পেছন ফিরে, গর্তের ভেতর একদৃষ্টে তাকিয়ে কী যেন গভীর মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করছে।

ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে গর্তের ভেতর উঁকি দিল পিট। তুমি কি তৈরি?

চরকির মতো আধপাক ঘুরল লিলি, যতটা না চমকে উঠেছে তার চেয়ে বেশি। হতভম্ব। কিসের জন্য তৈরি?

শহরে যাবার জন্য?

এতক্ষণে সচেতন হলে লিলি। লণ্ঠনটা গর্ত থেকে তুলল সে, ধীরে ধীরে সিধে হলো। পিটের চোখে তাকিয়ে থাকল দুই সেকেন্ড। হিসহিস শব্দ করছে কোলম্যান। সময় পেয়ে তার গাঢ় লাল চুল দেখে মনে মনে প্রশংসা করল পিট। মি. ডার্ক পিট, সত্যি তো? দস্তানা খুলে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল লিলি।

পিটও একটা হাতের দস্তানা খুলে, মৃদু চাপ দিয়ে করমর্দন করল। সুন্দরী মেয়েরা আমাকে শুধু ডার্ক বললে খুশি হই।

অপ্রতিভ ছোট্ট খুকির মতো লাগল নিজেকে, মেকআপ করা হয়নি বলে আরও অস্বস্তিবোধ করল লিলি। তারপর লক্ষ করল, কাপড়ে আর হাতে মাটি লেগে রয়েছে। পরিস্থিতি রীতিমত সঙ্গীন হয়ে উঠল চেহারা লালচে হয়ে উঠছে বুঝতে পেরে।

শার্প…লিলি, থেমে থেমে বলল সে। আমার সঙ্গীদের সাথে আলাপ করছিলাম, কাল রাতে যে সাহায্যে তোমার কাছ থেকে পেয়েছি, অন্তত মৌখিক একটা ধন্যবাদ। দিয়ে আসা উচিত। আমরা হয়তো যেতাম, নিজে চলে এসে ভালো করেছ। ডিনারের প্রস্তাবটা ঠাট্টা মনে করেছিলাম। সত্যি যে আসবে ভাবিনি।

শুনতেই পাচ্ছ বাইরে কী ঘটছে, বলল পিট, একটা তুষার ঝড়ও আমাকে বাধা দিয়ে রাখতে পারেনি।

তুমি নির্ঘাত একটা উম্মাদ।

না, স্রেফ বোকা বলতে পারো এইজন্য যে ভেবেছিলাম আর্কটিক ঝড় আমার সাথে পাল্লা দিয়ে পারবে না।

দু’জনেই হেসে উঠল একসাথে, সেই সাথে আড়ষ্ট ভাবটা দূর হয়ে গেল। গর্ত থেকে উঠতে গেল লিলি, তার একটা হাত ধরে সাহায্য করল পিট। ব্যথা পেয়ে উফ করে উঠল লিলি, সাথে সাথে তার হাত ছেড়ে দিল পিট। পা এখনও ব্যথা করছে, তাই না? হাঁটাচলা করা উচিত হচ্ছে না।

একটু আড়ষ্ট হয়ে আছে, নীলচে হয়ে আছে কয়েক জায়গায়, তোমাকে দেখানো যাবে না। তবে মরব না এক্ষুনি।

লিলির হাত থেকে লণ্ঠনটা নিয়ে কাঠামোর চারদিকে আলো ফেলে দেখল পিট। কী পেয়েছ এখানে?

এস্কিমোদের একটা গ্রাম, এক থেকে পাঁচশো খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এখানে তারা বাস করত।

নামকরণ হয়েছে?

সাইটের নাম রেখেছি গ্রোনকুইস্ট বে ভিলেজ। ড. হিরাম গ্রোনকুইস্ট, আমাদের দলনেতা। জায়গাটা তিনি পাঁচ বছর আগে আবিষ্কার করেন।

তিনজনের মধ্যে একজন, কাল রাতে যাদের দেখলাম?

প্রকাণ্ড মানুষটা, অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।

কেমন আছেন তিনি?

মাথায় বড় একটা কালচে দাগ থাকলেও কিরে-কসম খেয়ে বলছেন, কোনো ব্যথা নেই। ঘর থেকে বেরোবার সময় দেখে এসেছি, একটা হাঁস রোস্ট করতে বসেছেন।

হাঁস? হেসে উঠল পিট। তার মানে তোমাদের সাপ্লাই সিস্টেম প্রথম শ্রেণীর।

মিনার্ভা প্লেন, ভার্টিক্যাল লিফট। এক প্রাক্তন ছাত্র ইউনিভার্সিটিকে ধার হিসেবে দিয়েছে। থিউল থেকে দুসপ্তাহ পরপর আসে।

এমন কিছু পেয়েছে, যা পাবার কথা নয়?

ঝট করে মুখ তুলে পিটের দিকে তাকাল লিলি। কেন, এ প্রশ্ন কেন করলে?

কৌতূহল।

মাটি খুঁড়ে আমরা প্রি হিস্টোরিক এস্কিমোদের হাতে তৈরি কয়েকশো শিল্পকর্ম পেয়েছি। লিভিং কোয়ার্টারে আছে সব, ইচ্ছে করলে পরীক্ষা করতে পারো।

হাঁসের রোস্ট খেতে খেতে?

চমৎকার হয়। গ্রোনকুইস্ট দারুণ রাঁধেন।

ভেবেছিলাম তোমাদের সবাইকে জাহাজের গ্যালিতে দাওয়াত দেব, কিন্তু হঠাৎ ঝড় শুরু হওয়ায় আমার প্ল্যান ভেস্তে গেছে।

টেবিলে নতুন মুখ দেখতে পেলে আমরা সবাই ভারি খুশি হই।

অস্বাভাবিক কিছু আবিষ্কার করেছ তোমরা তাই না? হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করল পিট।

সন্দেহে বিস্ফারিত হয়ে উঠল চোখজোড়া। কীভাবে বুঝলে? তীক্ষ্ণকণ্ঠে প্রশ্ন করল লিলি।

গ্রিক নাকি রোমান?

রোমান এমপায়ার, বাইজানটিয়াম।

বাইজানটিয়াম কি? পিটের চঞ্চল দৃষ্টি লিলির মুখে কী যেন খুঁজল। কত পুরনো?

একটা স্বর্ণমুদ্রা, চতুর্থ শতাব্দীর।

পেশিতে ঢিল পড়ল পিটের। বড় করে শ্বাস টানল, ছাড়ল ধীরে ধীরে। লিলি ওর দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, চেহারায় অস্বস্তি।

সে বেসুরো গলায় বলল, কিছু বলতে চাও?

যদি বলি, ধীরে ধীরে শুরু করল পিট, সাগর আর খাড়ির মাঝখানের একটা পথে রোমান আমলের জাহাজ ছড়িয়ে আছে?

জাহাজ! সবিস্ময়ে পুনরাবৃত্তি করল লিলি।

আন্ডারওয়াটার ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও টেপে জারগুলোর ফটো তুলে নিয়েছি আমরা।

গড! ওহ্, ডিয়ার গড! তার মানে এসেছিল! ওরা এসেছিল! লিলি যেন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। সত্যি ওরা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল। ভাইকিংদের আগে রোমানরা পা রেখেছিল গ্রিনল্যান্ডে!

প্রমাণ দেখে তাই তো মনে হচ্ছে, আস্তে করে লিলির কোমর পেঁচিয়ে ধরে তাকে দরজার দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল পিট। ঝড়ের মধ্যে এখানে আমরাটকা পড়েছি, নাকি রশিটা তোমাদের লিভিং কোয়ার্টারের দিকে গেছে?

মাথা ঝাঁকাল লিলি। গেছে। ঘাড় ফিরিয়ে মেঝের গর্তগুলো আরেকবার দেখল সে। পাইথেয়াস, গ্রিক নেভিগেটর, খ্রিস্টের জন্মের তিনশো পঞ্চাশ বছর আগে একটা মহতি অভিযান শেষ করেন। কিংবদন্তি আছে, তারা উত্তর দিকে জাহাজ চালিয়ে আটলান্টিকে এসেছিলেন, সবশেষে পৌচেছিলেন আইসল্যান্ডে। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, আরও সাতশো বছর পর এত উত্তর আর পশ্চিমে রোমানরা এসেছিল কি না সে সম্পর্কে কোনো রেকর্ড বা কিংবদন্তি নেই।

পাইথথয়াস ভাগ্যবান, গল্পটা বলার জন্য তিনি দেশে ফিরতে পেরেছিলেন।

তোমার ধারণা, রোমান যারা এখানে এসেছিল তারা ফেরার পথে জাহাজডুবিতে মারা যায়?

না, আমার ধারণা, এখনও তারা এখানেই আছে। লিলির দিকে চোখ নামিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসল পিট। তুমি আর আমি, সুন্দরী, খুঁজে বের করব ওদেরকে।

.

দ্বিতীয় পর্ব – দ্য সেরাপিস

১৪ অক্টোবর ১৯৯১, ওয়াশিংটন, ডি.সি,

১৪.

ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে সতেরো পেনিসিলভানিয়া এভিনিউয়ে থামল ট্যাক্সিটা, পুরনো এক্সিকিউটিভ অফিস বিল্ডিংয়ের ঠিক সামনে। ডেলিভারিম্যান-এর ইউনিফর্ম পরা এক লোক পেছনের সিট থেকে নেমে ড্রাইভারকে অপেক্ষা করতে বলল। ট্যাক্সির ভেতর ঝুঁকে লাল সিল্কে মোড়া একটা প্যাকেট বের করল সে। ফুটপাত পেরিয়ে কয়েকটা ধাপ টপকাল, দোরগোড়া হয়ে ঢুকে পড়ল মেইলরুমের রিসেপশন অংশে।

প্রেসিডেন্টের জন্য, ইংরেজিতে বললেও তার বাচনভঙ্গি স্প্যানিশ।

পোস্টাল সার্ভিসের একজন সহকারী প্যাকেটের গায়ে সময় লিখে সই করল। মুখ তুলে হাসল সে। এখনও বৃষ্টি হচ্ছে?

ঝিরঝিরে। বলেই চলে গেল ডেলিভারিম্যান।

প্যাকেটটা নিয়ে ফ্লুরোস্কোপ-এর নিচে রাখল পোস্টাল সহকারী। পিছিয়ে এসে স্ক্রীনের দিকে তাকাল সে, প্যাকেটের ভেতর কী আছে দেখতে পাচ্ছে।

একটা ব্রিফকেস। কিন্তু ছবিটা তাকে অবাক করে দিল। ব্রিফকেসের ভেতর কোনো কাগজ বা ফাইল নেই, নির্দিষ্ট কাঠামো বা কিনারাসহ কোনো শক্ত জিনিস নেই। বিস্ফোরক ধরনের কিছু হলে চেনা যেত, তাও নয়। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করল সে।

দুমিনিটের মধ্যে কুকরের চেইন হাতে করে একজন সিকিউরিটি অফিসার হাজির হলো। কি, মাতাহারির কোনো খোরাক? সহাস্যে জানতে চাইল এজেন্ট।

ইঙ্গিতে প্যাকেটটা দেখিয়ে দিল পোস্টাল সহকারী। স্কোপে জিনিসটা কেমন যেন দেখাচ্ছে।

মাতাহারি ট্রেনিং পাওয়া জার্মান কুকুর। মোটাসোটা, ছোটখাট; খয়েরি চোখ দুটো। বিশাল। যেকোনো বিস্ফোরকের গন্ধ চিনতে পারে সে। লোক দু’জন তাকিয়ে থাকল, প্যাকেটটাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে কুকুরটা। চেহারা বিকৃত করল, গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চাপা গর্জন।

অবাক হলো এজেন্ট লোকটা। কী ব্যাপার, মাতাহারি তো কখনও এ রকম করে না!

ওটার ভেতর অদ্ভুত কিছু আছে।

কার নামে এসেছে?

প্রেসিডেন্টের।

এগিয়ে গিয়ে ফোনের রিসিভার তুলে নিল এজেন্ট।

এখানে আমাদের জিম গেরহাটকে দরকার।

হোয়াইট হাউসের ফিজিকাল সিকিউরিটির চার্জে রয়েছে স্পেশাল এজেন্ট জিম। গেরহার্ট। লাঞ্চ ফেলে ছুটে এল সে। দেখল প্যাকেটটাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে কুকুরটা। কিন্তু আমি তো কোনো ওয়্যারিং বা ডিটোনেশন ডিভাইস দেখছি না।

না, বোমা নয়, পোস্টাল সহকারী বলল।

ঠিক আছে, এসো খোলা যাক।

সিল্ক আবরণ সাবধানে ভোলা হলো। বেরিয়ে এল কালো চামড়ার একটা কেস। কেসের গায়ে কোনো চিহ্ন নেই, এমনকি মডেল নম্বর বা প্রস্তুতকারকের নাম পর্যন্ত নেই। কমবিনেশন লকের বদলে চাবি ঢোকানোর জন্য দুটো ফুটো রয়েছে। ফুটোর পাশে ইস্পাতের বোতামে চাপ দিতেই ক্লিক করে একজোড়া শব্দ হলো। সত্যি উন্মোচিত হবার মুহূর্ত উপস্থিত! সতর্ক হাসি ফুটল এজেন্টের মুখে। ঢাকনির দুই কোণে দুটো হাত রেখে ধীরে ধীরে ওপর দিকে তুলল সে। ঢাকনি ভোলা হয়েছে, ভেতরে কী রয়েছে সবাই ওরা দেখতে পেল।

জেসাস!

পোস্টাল সহকারী আঁতকে উঠে পেছন ফিরল। হোঁচট খেতে খেতে টয়লেটের দিকে ছুটল সে নাকে-মুখে হাত চাপা দিয়ে রেখেছে যাতে বমি না করে ফেলে।

ওহ্, গড! রুদ্ধশ্বাসে বলল গেরহার্ট। সশব্দে ঢাকনিটা বন্ধ করে দিল সে। রক্তশূন্য চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এজেন্টের দিকে তাকাল।

এক্ষুনি এটাকে জর্জ ওয়াশিংটন হাসপাতালে পাঠিয়ে দাও।

আসল জিনিস, নাকি এর মধ্যে কোনো চাতুরি আছে? রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল এজেন্ট।

আসল জিনিস, গম্ভীর সুরে বলল গেরহার্ট।

.

হোয়াইট হাউসে তার নিজের অফিসে রয়েছেন ডেইল নিকোলাস, এবার নিয়ে তিনবার পড়া শেষ করলেন ফোল্ডারটা। এটা তাঁর কাছে পাঠিয়েছেন ল্যাটিন আমেরিকা বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সিনিয়র ডিরেক্টরদের একজন, আরমান্দো লোপেজ।

ডেইল নিকোলাস ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছিলেন, প্রেসিডেন্ট বারবার অনুরোধ করায় হোয়াইট হাউসে তার বিশেষ অ্যাসিস্ট্যান্ট হতে হয়েছে ভদ্রলোককে। অনিচ্ছার সাথে দায়িত্বটা গ্রহণ করলেও, কাজ শুরু করার পর তিনি আবিষ্কার করেছেন যে হোয়াইট হাউসের আমলাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর দুর্লভ একটা প্রতিভা এত দিন সুপ্ত ছিল তার ভেতর।

তাঁর কফি-ব্রাউন রঙের চুল মাথার ঠিক মাঝখানে দুভাগ করা। চশমার কাঁচ গোল আর ছোট, তারের ফ্রেম। হাতের কাজটি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিষয়ে মাথা ঘামাতে অভ্যস্ত নন তিনি। ভদ্রলোক পাইপ টানেন, তবে বন্ধুবর শিলারের সাথে দেখা হলেই প্রতিজ্ঞা করেন, ধূমপান তারা দু’জন একসাথে ছেড়ে দেবেন। যদিও ছাড়ার কোনো চেষ্টা দু’জনের কারও মধ্যেই দেখা যায় না।

ফোল্ডারে মেক্সিকান সংবাদপত্রের প্রচুর কাটিং রয়েছে। সেগুলোর ওপর আবার চোখ বুলাতে শুরু করলেন ডেইল নিকোলাস, পড়তে পড়তেই পাইপে আগুন ধরালেন। ফোল্ডারের বিষয় একটাই।

টপিটজিন।

মেক্সিকান সাংবাদিকরা তার সাক্ষাৎকার নিতে পারলেও আমেরিকান সাংবাদিক বা সরকারি প্রতিনিধির সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি সে। দেহরক্ষীদের তৈরি পাঁচিল ভেদ করে কেউ তারা তার সামনে পৌঁছতে পারেনি।

স্প্যানিশ ভাষাটা ভালোই জানা আছে ডেইলের, শান্তি মিশনের সঙ্গে দুই বছর পেরু ছিলেন তিনি। কাজেই লেখাগুলো পড়তে তার অসুবিধা হলো না। এবার পড়ার সময় একটা প্যাড় আর কলম টেনে নিলেন তিনি, নোট রাখবেন।

‘এক। টপিটজিনের দাবি, দরিদ্রস্য দরিদ্রদের মধ্যে থেকে উঠে এসেছে সে। মেক্সিকো সিটিতে যেখানে আবর্জনা ফেলা হয়, সেই আস্তাকুড়ের কিনারায় আস্তাকুঁড় দিয়ে তৈরি একটা ঝুপড়ির ভেতর জন্ম হয়েছে তার। জন্মতারিখ, মাস বা বছর, কিছুই মনে নেই। কীভাবে সে বেঁচে গেছে বলতে পারবে না, তবে একটু বড় হবার সাথে সাথে শিখেছে কীভাবে মাছি, আবর্জনা, নর্দমা, দুর্গন্ধ, শীত আর খিদে নিয়ে বেচেঁ থাকতে হয়।

দুই। স্বীকার করে, কোনো দিন স্কুলে যায়নি। ছেলেবেলা আর টলটেক/ আযটেক ধর্মের স্বঘোষিত অবতার হওয়ার মাঝখানের সময়টা সম্পর্কে তার কোনো ইতিহাস জানা যায় না।

তিন। তার মধ্যে দিয়ে দশম শতাব্দীর ধর্মীয় গুরু ও টলটেকদের শাসক টপিন্টজিন পুনরায় ধরাধামে ফিরে এসেছেন বলে দাবি করে সে। কিংবদন্তির দেবতা কয়েটজালকোটল আর টপিটজিনকে এক বলে ধারণা করা হয়।

চার। প্রাচীন সংস্কৃতি আর ধর্মের সংমিশ্রণে রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করে টপিটজিন, যার মূল কথা হলো কোনো দল নয়, মাত্র একজন ধর্মীয় গুরু বা অবতার রাজ্য শাসন করবে। টপিটজিনের উচ্চাশা, মেক্সিকান জনসাধারণের সর্বজন শ্রদ্ধেয় পিতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে সে। কীভাবে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে আবার চাঙ্গা করবে জিজ্ঞেস সে সম্পর্কে আলোচনা করতে রাজি নয়।

পাঁচ। ভাষণে জাদু আছে। মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। দোভাষীর সাহায্য নিয়ে শুধু প্রাচীন আযটেক ভাষায় কথা বলে সে। মধ্য মেক্সিকোয় এই ভাষা এখনও অনেকে ব্যবহার করে।

ছয়। বেশির ভাগ সমর্থক ফ্যানাটিক। বাঁধ ভাঙা স্রোতের মতো গোটা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তার জনপ্রিয়তা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস, জাতীয় নির্বাচনে টপিটজিন আর তার দল শতকরা ছয় ভাগ আসনে জয়লাভ করবে। অথচ নির্বাচনে অংশগ্রহণে রাজি নয় সে। তার বক্তব্য, তা যথার্থও বটে, যে নির্বাচনে হারলেও দুর্নীতিপরায়ণ সরকার ক্ষমতা ছাড়বে না। জনসাধারণকে সাথে নিয়ে সরকারকে উৎখাত করাই তার লক্ষ্য।’

নিভে যাওয়া পাইপটা অ্যাশট্রেতে রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকালেন ডেইল নিকোলাস। তারপর মন্তব্য লিখতে শুরু করলেন তিনি।

‘সারাংশ : টপিটজিন হয় অকাট মূর্খ নয়তো অসম্ভব প্রতিভাবান ব্যক্তি। নিজের সম্পর্কে যা বলে, যদি সে সত্যিই সেই রকম হয়, তবে টপিটজিন একজন গর্দভ। আর যদি তার সমস্ত কাজের পেছনে কোনো উদ্দেশ্যে থেকে থাকে এবং নিজস্ব কোনো উপায় তবে সে একজন অসামান্য প্রতিভাধর ব্যক্তি। সমস্যা! সমস্যা! সমস্যা!’

লেখা শেষ হয়েছে, ঝন ঝন শব্দে বেজে উঠল টেলিফোন। রিসিভার তুললেন ডেইল নিকোলাস।

এক নম্বরে প্রেসিডেন্ট, স্যার, সেক্রেটারি ঘোষণা করল।

বোতাম চাপ দিলেন নিকোলাস। ইয়েস, মি. প্রেসিডেন্ট।

গাই রিভাসের কোনো খবর পেলেন?

না, কোনো খবর নেই।

প্রেসিডেন্টের প্রান্তে কয়েক সেকেন্ডের বিরতি। তারপর শোনা গেল, আমার সাথে তার দেখা করার সময় দুঘণ্টা হলো পেরিয়ে গেছে। আমি উদ্বেগ বোধ করছি। তার যদি কোনো সমস্যা হয়ে থাকে, এতক্ষণে পাইলটের একটা খবর পাঠানোর কথা।

তিনি হোয়াইট হাউসের কোনো জেট নিয়ে মেক্সিকো সিটিতে যাননি, ব্যাখ্যা করলেন ডেইল নিকোলাস। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কমার্শিয়াল এয়ারলাইনারে গেছেন, কোচ ক্লাসে, ট্যুরিস্ট হিসেবে।

বুঝলাম, বললেন প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো যদি জানতে পারেন ব্যক্তিগত একজন প্রতিনিধিকে তার বিরোধীপক্ষের সাথে আলোচনা করতে পাঠিয়েছি, ব্যাপারটাকে তিনি অপমান বলে মনে করবেন, ফলে আগামী সপ্তাহর আরিজানা কনফারেন্সটা ভুল হয়ে যেতে পারে।

ইয়েস, মি. প্রেসিডেন্ট।

ইউ, এন, চার্টার ক্র্যাশ সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে আপনাকে? হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলালেন প্রেসিডেন্ট।

না, স্যার, জবাব দিলেন ডেইল নিকোলাস। আমি যে একমাত্র তথ্যটি জানি, হে’লা কামিল বেঁচে গেছেন।

তিনি আর ক্রুদের দু’জন সদস্য। বাকি সবাই বিষক্রিয়ার মারা গেছেন।

বিষ? গলায় অবিশ্বাস।

ইনভেস্টিগেটররা তাই বলছে। তাদের বিশ্বাস, সবাইকে বিষ খাওয়ানোর চেষ্টা করে প্যারাসুট নিয়ে আইসল্যান্ডে নেমে গেছে পাইলট!

তাহলে নিশ্চয়ই লোকটা ভুয়া হবে।

একটা লাশ না পাওয়া পর্যন্ত হা-না কিছুই বলা যাচ্ছে না।

গড, ইউ এন, প্রতিনিধিদলকে মেরে কোনো আতঙ্কবাদী গ্রুপ কি অর্জন করবে?

এখনও কেউ কৃতিত্ব দাবি করেনি। সি.আই.এ থেকে মারটিন ব্রোগান বলছেন, এটা যদি আতঙ্কবাদীদের কাজ হয়, তাহলে মনে করতে হবে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলেছে।

হতে পারে হে’লা কামিলই টার্গেট ছিলেন। আখমত ইয়াজিদ বহুবার বলেছে, তাকে সে দেখে নেবে।

সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

প্রেস কিছু জানতে পেরেছ?

এক ঘণ্টার মধ্যে গোটা দুনিয়া জানবে। চেপে রাখার কোনো কারণ আমি দেখছি না।

আপনি আমাকে বিশেষ কিছু করতে বলেন, মি. প্রেসিডেন্ট?

শুধু এইটুকু জানতে পারলে ভালো হয়। ইউ.এন. ফ্লাইটে মেক্সিকোর এগারোজন নাগরিক ছিলেন-ডেলিগেট ও এজেন্সি প্রতিনিধি। আমার নামে শোকবাণী পাঠান, সাহায্যের প্রস্তাব দিন। ও, হ্যাঁ, ভালো কথা, স্টেট ডিপার্টমেন্টের জুলিয়াস শিলারকে সব জানাবেন।

ঠিক আছে।

আর, মি. গাই রিভাসের কাছ থেকে খবর পাওয়া মাত্র আমাকে জানাবেন।

ঠিক আছে, মি, প্রেসিডেন্ট।

রিসিভার রেখে দিয়ে ফোল্ডারটার দিকে আবার তাকালেন ডেইল নিকোলাস। ভাবলেন, ইউ. এন হত্যাকাণ্ডের সাথে টপিটজিন কোনোভাবে জড়িত নয় তো?

আসলে ঠিক কী অর্জন করতে চাইছে টপিটজিন? আযটেক মেক্সিকো? অতীতের পুনরুত্থান? সেকেলে শাসনব্যবস্থা আধুনিক যুগে অচল, এটা বোঝার মতো জ্ঞান তার নেই তা বিশ্বাস করা যায় না। তাহলে?

আসলে ডেইল নিকোলাস ডিটেকটিভ নন। তিনি বুঝতে পারছেন বটে অন্য একটা কিছু পরিচালিত করছে বা শক্তি জোগাচ্ছে টপিটজিনকে, কিন্তু সেটা কী হতে পারে কোনো ধারণা করতে পারছেন না। তিনি শুধু টপিটজিনকে একজন ভিলেন হিসেবে বিবেচনা করতে পারছেন।

আর্য রক্তের শ্ৰেত্বের স্বপ্নে উঁদ ছিল হিটলার। আয়াতুল্লাহ খোমেনি চেয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা। লেনিন চেয়েছিল কমিউনিজমের ক্রুসেড।

টপিটজিন কী চায়?

দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল তার সেক্রেটারি, ডেস্কের ওপর একটা ফাইল ফোল্ডার রাখল। সি. আই.এ. থেকে যে রিপোর্টাটা চেয়েছিলেন, স্যার। আর, তিন নম্বরে আপনার একটা কল অপেক্ষা করছে।

কে?

জিম গেরহার্ট নামে এক ভদ্রলোক, বলল মেয়েটা।

হোয়াইট হাউস সিকিউরিটি। কি চায় বলেছে?

জরুরি।

ফোনের রিসিভার তুলে বোতামে চাপ দিলেন ডেইল নিকোলাস। হ্যাঁ!

জিম গেরহা …

জানি, বলুন।

খুব ভালো হয় আপনি যদি জর্জ ওয়াশিংটন হাসপাতালের প্যাথোলজি ল্যাবে চলে আসেন, স্যার।

ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে? কেন?

আমি বরং ফোনে আর কিছু বলব না, স্যার।

আমি অত্যন্ত ব্যস্ত, মি. গেরহার্ট। আপনাকে আরও খোলসা করে বলতে হবে।

ক্ষণিক নীরবতা। ব্যাপারটা আপনার ও মি. প্রেসিডেন্টের জন্য উদ্বেগের বিষয়, স্যার। শুধু এইটুকু বলতে পারি।

কোন আভাস দিতে পারেন না?

প্রশ্নটার জবাব না দিয়ে জিম গেরহার্ট বলল, আপনার অফিসের বাইরে আমার একজন লোক অপেক্ষা করছে, স্যার। সে আপনাকে ল্যাবে নিয়ে আসবে। ওয়েটিংরুমে দেখা হবে আমাদের।

আমার কথা শুনুন, গেরহার্ট…। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, আর কিছু বলা হলো না।

.

ল্যাবের ওয়েটিংরুমেই পাওয়া গেল জিম গেরহার্টকে। এসেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ, আনুষ্ঠানিক সুরে বলল সে, করমর্দনের কোনো আগ্রহ দেখল না।

আমি এখানে কেন? সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন ডেইল নিকোলাস।

শনাক্ত করার জন্য, স্যার।

হঠাৎ বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল, ফিসফিস করে জানতে চাইলেন, কাকে?

দেখে নিয়ে আপনিই বলুন, স্যার।

লাশ দেখায় আমি অভ্যস্ত নই।

ঠিক লাশ নয়, স্যার। তবে শক্ত হতে হবে আপনাকে।

কাঁধ ঝাঁকালেন ডেইল নিকোলাস। ঠিক আছে, চলুন সেরে ফেলা যাক।

করিডর পেরিয়ে একটা কামরায় ঢুকল ওরা। কামরার মাঝখানে একটাই স্টেনলেস স্টিলের টেবিল। সাদা, স্বচ্ছ প্লাস্টিক দিয়ে মোড়া রয়েছে লম্বা কী যেন। টেবিলের গা থেকে এক ইঞ্চির বেশি নয় জিনিসটার উচ্চতা। চেহারায় বিহ্বল ভাব নিয়ে গেরহার্টের দিকে তাকালেন নিকোলাস। কী শনাক্ত করতে হবে আমাকে?

কথা না বলে প্রাস্টিক আবরণ সরিয়ে নিল গেরহার্ট। তার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল সেটা।

টেবিলে পড়ে থাকা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন নিকোলাস, চিনতে পারছেন না। প্রথম মনে হলো, কাগজ কেটে মানুষের আকৃতি তৈরি করা হয়েছে। তারপর প্রচণ্ড ঘুষির মতো ধাক্কার সাথে উপলব্ধি করলেন। দুপা পিছিয়ে দেয়ালে হেলান দিলেন তিনি, কোমর বাঁকা করে হাঁপাচ্ছেন। তাড়াতাড়ি কামরা থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটু পরই ফিরে এল গেরহার্ট, হাতে ফোল্ডিং একটা চেয়ার ও তোয়ালে। প্রেসিডেন্টের বিশেষ অ্যাসিস্ট্যান্টকে চেয়ারটায় বসতে সাহায্য করল সে, হাতে ধরিয়ে দিল তোয়ালেটা।

প্রায় দুমিনিট চেয়ারে বসে থাকলেন ডেইল নিকোলাস। মুখে তোয়ালে চেপে ধরে শুকনো বমি করলেন। খানিকটা শান্ত হয়ে মুখ তুললেন তিনি। গুড লর্ড! ওটা তাহলে…?

চামড়া, বলল গেরহার্ট। গা থেকে ছাড়ানো মানুষের চামড়া।

টেবিলের দিকে জোর করে আবার তাকালেন নিকোলাস। চুপসানো বেলুনের কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। ছালটা কাটা হয়েছে মাথার পেছন থেকে গোড়ালি পর্যন্ত, শরীর থেকে চামড়া উঠে এসেছে ঠিক যেমন পশুদের আসে। লম্বা একটা চেরা দাগ রয়েছে বুকে, সেলাই দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে সেটা। চোখ নেই, তবে সবটুকু চামড়া আছে, হাত আর পায়েরও।

বলতে পারেন, স্যার, কে হতে পারে? শান্তভাবে জানতে চাইল গেরহাট।

মুখ খুলতে গিয়েও খুললেন না ডেইল নিকোলাস। আবার অসুস্থ লাগল নিজেকে। শুধু চুলগুলো তার চেনা চেনা ঠেকছে। তবু তিনি জানেন? গাই রিভাস, ফিসফিস করে বললেন তিনি।

কথা না বলে ডেইল নিকোলাসকে ধরে দাঁড় করাল গেরহার্ট, পাশের কামরায় নিয়ে এসে একটা সোফায় বসাল। এক মিনিট পর তার হাতে গরম কফির একটা কাপ ধরিয়ে দিল সে। খান, এক্ষুনি আসছি আমি।

একটা অ্যাটাচি কেস নিয়ে ফিরে এল গেরহার্ট। নিচু টেবিলের ওপর রাখল সেটা। চামড়াটা এটার ভেতরে করে আনা হয়েছে। ভাঁজ করা ছিল। প্রথমে মনে করেছিলাম, কোনো সাইকোর কাজ হবে। কিন্তু সার্চ করতে গিয়ে মিনি একটা টেপ রেকর্ডার পেয়ে গেলাম।

চালিয়েছেন?

কিছুই বুঝিনি। দু’জনের কথা রেকর্ড করা হয়েছে, যেন সাংকেতিক ভাষায় কথা বলছে তারা।

রিভাসের সাথে আমার সম্পর্ক আপনি আবিষ্কার করলেন কীভাবে?

ছাড়ানো চামড়ার ভেতর ভদ্রলোকের আইডি কার্ড ছিল। তার অফিসে গিয়ে সেক্রেটারিকে জেরা করি। সেখান থেকে জানতে পারি, এয়ারপোর্টের উদ্দেশে রওনা হবার আগে প্রেসিডেন্ট ও আপনার সাথে দুঘণ্টা কথা বলেছেন তিনি। কোথায় গিয়েছিলেন, সেক্রেটারি বলতে পারেনি। ধরে নিলাম ক্লাসিফায়েড কোনো মিশনে গিয়েছিলেন। তারপর আপনার সাথে যোগাযোগ করি।

টেপ করা কথা কিছুই তুমি বোঝোনি?

একেবারে কিছু বুঝিনি তা নয়। চামড়া ছাড়ানোর সময় মি. রিভাস যে চিৎকার করেন তাও টেপে আছে।

চোখ বুজলেন ডেইল নিকোলাস, মন থেকে ছবিটা মুছে ফেলার চেষ্টা করলেন।

তাঁর পরিবারকে জানাতে হবে, বলল গেরহার্ট। স্ত্রী আছেন?

চার-চারটে ছেলেমেয়ে নিয়ে একা হয়ে গেল বেচারি। নিঃশব্দে কেঁদে ফেললেন নিকোলাস।

এই প্রথম গেরহার্টের পাথুরে চেহারা নরম হলো। আমি দুঃখিত, স্যার।

তার কথা ডেইল নিকোলাস শুনতে পেলেন না। দুঃস্বপ্ন দেখার আতঙ্ক কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। এখন আর তার বমি পাচ্ছে না। গাই রিভাস তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন। তার এই পরিণতি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তাঁর। এত রাগ কখনও তার হয়নি। হঠাৎ করে ডেইল নিকোলাস উপলব্ধি করলেন, তিনি দুর্বল নন। হোয়াইট হাউসের মুষ্টিমেয় যে কজন লোক প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী, তিনি তাদেরই একজন। অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনা তিনি ঘটাতে পারেন, অনেক স্বাভাবিক ঘটনা তিনি ঘটতে না দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, এই নিমর্ম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তার সবটুকু ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। এমনকি দরকার হলে অন্যায়ভাবেও।

টপিটজিনকে মরতে হবে।

১৫. মিসরীয় শহর

১৫.

মিসরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়া থেকে বিশ কিলোমিটার দক্ষিণে এটা একটা ব্যক্তি মালিকানাধীন এয়ারপোর্ট। ছোট্ট একটা বিচক্রাফট এক্সিকিউটিভ জেট ল্যান্ড করল। সবুজ একটা ভোলভো গাড়ির পাশে থামল প্লেন, গাড়ির দরজায় ইংরেজিতে ট্যাক্সি লেখা। ইঞ্জিনের শব্দ থেমে যাবার সাথে সাথে ওপর দিকে উঠে খুলে গেল প্যাসেঞ্জার ডোর।

সাদা স্যুট পরা লোকটা নেমে এল নিচে। গাঢ় নীল শার্টের সাথে ম্যাচ করা টাই পরেছে সে। ছয় ফুটের সামান্য কম হবে লম্বায়, একহারা গড়ন, এক মুহূর্ত থেকে টাকা শুরু হওয়া চওড়া কপাল রুমাল দিয়ে মুছল, একটা আঙুল দিয়ে সিধে করে নিল লম্বা আর ঘন গোফ জোড়া। গাঢ় রঙের সানগ্লাসের আড়ালে রয়েছে চোখ দুটো, হাতে পরেছে সাদা লেদার গ্লাভস।

লন্ডন থেকে একশো ছয় ফ্লাইটে যে পাইলট উঠেছিল, তার সাথে সুলেমান আজিজের চেহারার কোনো মিল নেই।

শান্ত, দৃঢ় পদক্ষেপে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল সে। হুইলের পেছন থেকে সদ্য নেমে আসা ড্রাইভারকে বলল, গুড মর্নিং, ইবনে। ফেরার পর কোনো সমস্যা হয়েছে?

সব ঠিকঠাক আছে, সুলেমান আজিজ, উত্তর দিয়ে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ধরল সে, শোল্ডার হোলস্টারের পিস্তলাকৃতি শটগানটা গোপন করার কোনো চেষ্টা করল না।

ইয়াজিদের কাছে নিয়ে চলো আমাকে। গাড়িতে উঠে নির্দেশ দিল সুলেমান আজিজ। নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাল ইবনে।

গাঢ় টিনটেড গাড়ির কাঁচ আর বডি বুলেটপ্রুফ। আরামদায়ক নিচু একটা চেয়ার বসেছে সুলেমান আজিজ, তার সামনে একটা ডেস্ক কেবিনেট, তাতে একগাদা ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে একজোড়া টেলিফোন, একটা রেডিও ট্র্যান্সমিটার ও টিভি মনিটর, একটা কম্পিউটর। ভেতরে বার আর একজোড়া রাইফেলসহ র‍্যাকও রয়েছে।

আলেকজান্দ্রিয়ার জনাকীর্ণ পথে এঁকে-বেঁকে চলে সমুদ্রতীরবর্তী রাস্তায় পড়ল গাড়ি, প্রতিটি মুহূর্তে টেলিফোন ব্যস্ত থাকল সুলেমান আজিজ। ডজনখানেকের ওপর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তার পুঁজি খাটছে। তার সম্পদের হিসাব একমাত্র সেই জানে। বুদ্ধিমত্তার চেয়ে নিষ্ঠুরতাই বরং তাকে ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দিয়েছে। যদি কোনো সরকারি অফিসার বা প্রতিদ্বন্দ্বী তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, হঠাৎ করে একদিন নিখোঁজ হয়ে যায় লোকটা, তারপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না।

বিশ কিলোমিটার ছুটে এসে একটা গেটের সামনে থামল ভলভো গাড়ি। ভেতরে ছোটো একটা ভিলা, পাহাড়ের গায়ে। ভিলা থেকে বালুময় সৈকত দেখা যায়।

কম্পিউটরের লাভের হিসাব করছিল সুলেমান আজিজ, বোতাম টিপে সেটা বন্ধ করল সে, দরজা খুলে নেমে দাঁড়াল। বালি রঙের ইউনিফর্ম পরা চারজন গার্ড ঘিরে ধরল তাকে, খুঁটিয়ে সার্চ করল। তারপর তাকে একটা এক্স-রে ডিটেকটর-এর সামনে দিয়ে হাঁটতে বলা হলো। এ ধনের ডিটেকটর শুধু এয়ারপোর্টগুলোতেই দেখা যায়।

গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সিঁড়ি বেয়ে ভিলায় উঠল সুলেমান আজিজ। ধাপ বেয়ে ওঠার সময় কংক্রিটের ছোট একটা উঠানকে পাশ কাটাল সে। উঠানে বসে রয়েছে ইয়াজিদের দেহরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। অলংকৃত খিলানটাকে পাশ কাটিয়ে এগোবার সময় আপনমনে হাসল সুলেমান আজিজ। খিলানের দরজা শুধুমাত্র সম্মানিত অতিথিদের জন্য খোলা হয়। পাশের ছোট্ট একটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হলো তাকে। অপমানবোধ করলেও মন থেকে তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল অনুভূতিটা। সে জানে, কোনো কোনো ব্যাপার অত্যন্ত নীচ মানসিকতার পরিচয় দেয় আখমত ইয়াজিদ। যারা তার নোংরা কাজগুলো করে দেয়, তাদের প্রতি নির্লিপ্ত অবহেলাসূচক আচরণ করে সে, তাকে ঘিরে প্রিয় ফ্যানাটিকদের যে বৃত্তটা আছে সেখানে তাদের স্থান হয় না।

পথ দেখিয়ে তাকে একটা নগ্ন নির্জন কামরায় পাঠানো হলো। ভেতরে একটাই মাত্র কাঠের টুল। বদ্ধ বাতাস অত্যন্ত গরম লাগল সুলেমান আজিজের। একদিকের দেয়ালজুড়ে কালো কার্পেট ঝুলছে। ঘরে কোনো জানালা নেই, আলো আসছে শুধু মাথার ওপর ভেন্টিলেটর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে গার্ড।

হাই তুলল সুলেমান আজিজ, হাতঘড়িটা এমনভাবে তুলল যেন সময় দেখছে। এরপর সানগ্লাস খুলে চোখ দুটো রগড়াল সে। চোরা চোখে টিভি ক্যামেরার খুদে লেন্সটা দেখে ফেলল সে, ঝুলন্ত কার্পেটের সাথে ফিট করা রয়েছে।

প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো তাকে। এরপর কার্পেট সরিয়ে নিচ একটা খিলানের তলা দিয়ে ভেতরে ঢুকল আখমত ইয়াজিদ।

মিসরীয় মুসলমানদের আধ্যাত্মিক নেতা ইয়াজিদের বয়স বেশি নয়, পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি হবে। ছোটখাট আকৃতি, সুলেমান আজিজের দিকে তাকানোর জন্য ওপর দিকে মুখ তুলতে হলো তাকে। তার চেহারায় মিসরীয় বৈশিষ্ট্য নেই বললেই চলে। চিবুক আর চোয়ালের গঠনে কোমল ভাব রয়েছে, প্রায় গোল। সাদা সিঙ্কের পাগড়ি কপাল আর মাথাটাকে ঢেকে রেখেছে, আঁটার হাতলসদৃশ শরীর ঢেকেছে সাদা ঢোলা হাতা জামা। ছায়া থেকে আলোয় বেরিয়ে আসার সাথে সাথে তার চোকের রং কালো থেকে গাঢ় খয়েরিতে বদলে গেল।

দাঁড়াল সুলেমান আজিজ। শ্রদ্ধা জানাবার ভঙ্গিতে মাথাটা মৃদু আঁকাল। তাকিয়ে আছে সরাসরি ইয়াজিদের চোখে।

ভালো তো, দোস্ত? আবেগের সাথে বলল আখমত ইয়াজিদ। তোমাকে ফেরত পেয়ে আমি খুশি।

যেখানেই যাই, যত দূরেই যাই, বলল সুলেমান আজিজ, সেও কম খেলুড়ে নয়, আপনার কাছে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকি, জনাব। আপনার পাশে থাকার সুযোগ হলে নিজেকে আমার ধন্য মনে হয়।

প্লিজ, বসো! অনুরোধ নয়, আদেশের মতো শোনাল কথাটা।

কাঠের টুলে বসল সুলেমান আজিজ, এবার ওপর থেকে তার দিকে তাকাতে পারবে আখমত ইয়াজিদ। সুলেমান আজিজের মনে হলো, এটাও তাকে অপমান করার জন্য। কোনো বিরতি ছাড়াই ভাষণ দেয়ার সুরে কথা বলতে শুরু করল আখমত ইয়াজিদ, টুলটাকে ঘিরে পায়চারি করছে সে, ফলে টুলে বসা অবস্থায় প্রতি মুহূর্তে তার দিকে ঘুরতে হলো সুলেমান আজিজকে।

প্রতি সপ্তায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে মেরুদণ্ডহীন প্রেসিডেন্ট হাসানকে। তার পতন ঠেকিয়ে রেখেছে সামরিক বাহিনীর বিশ্বস্ততা। সাড়ে তিন লক্ষ সৈনিকের ওপর এখনও তার কর্তত্ব আছে। তবে ডিফেন্স মিনিস্টার আবু হামিদের সাথে কথা হয়েছে আমার। সে আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছে, ইসলামিক রিপাবলিক গঠনে আমাদের আন্দোলনকে পুরোপুরি সমর্থন দেবে সে, যদি আমরা রক্তপাত না ঘটিয়ে জাতীয় রেফারেন্ডাম অর্জন করতে পারি।

লক্ষণ খারাপ, নাকি ভালো? চেহারায় অজ্ঞতার ভাব ফুটিয়ে জানতে চাইল সুলেমান আজিজ।

তার দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকাল আখমত ইয়াজিদ। লোকটার হাত পাতা অভ্যেস। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহায্য পেয়ে লোভী হয়ে উঠেছে। মহাকাপরুষ আমেরিকান এইড ছাড়া দেশ চালানো সম্ভব নয় বলে তার ধারণা। আরও জেট প্লেন, হেলিকপ্টার গানশিপ আর ট্যাংক দরকার তার। ভয় পাচ্ছে, মিসরের পরিণতি ইরানের মতো না হয় আবার। হাঁদাটা বোঝাতে চেষ্টা করছে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করা গেলে বিদেশি সাহায্য যেমন আসছে তেমনি আসতে থাকবে। তা না হলে বিশ্বব্যাংকের পোন আর মার্কিন অনুদান বন্ধ হয়ে যাবে।

গাঢ় চোখ মেলে সুলেমান আজিজের দিকে তাকিয়ে থাকল আখমত ইয়াজিদ, যেন অপেক্ষা করছে প্রতিবাদের সুরে কিছু বলবে সুলেমান আজিজ।

সুলেমান আজিজ কথা বলল না।

আবু হামিদ আরও দাবি করছে, আমাকে কথা দিতে হবে হে’লা কামিলের ব্যাপারে আমি চোখ বন্ধ করে রাখব। জাতিসংঘের মহাসচিব থাকবে সে।

কিন্তু তাহলে যে আপনি আমাকে অর্ডার করলেন তাকে খুন করার জন্য? সুলেমান আজিজের চোখে কৌতূহল।

আখমত ইয়াজিদ হাসল। রক্তমাংসের মুখ নয়, যেন একটা মুখোশ হাসল।

জালিম সরকারকে উৎখাত করে দেশে ইসলামিক শাসনব্যবস্থা চালু করতে হলে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে, সুলেমান আজিজ। কথা তো দিয়েইছি। আবু হামিদ জানবে আমি আমার কথা রেখেছি। সেজন্যই তো দায়িত্বটা দেয়া হয়েছিল তোমার মতো যোগ্য লোককে, যাতে কাকপক্ষীও টের না পায় যে কাজটা আমার নির্দেশে ঘটেছে।

কিন্তু কেন, জনাব? মৃদু কণ্ঠে জানতে চাইল সুলেমান আজিজ। হে’লা কামিলকে খুন করে কী লাভ হলো আমাদের?

লাভ এই যে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় জাতিসংঘের মহাসচিবের পদটা ব্যবহার করছে হে’লা কামিল। তার একার চেষ্টায় সারা দুনিয়ায় আমার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। খোলাখুলিভাবে ওকে মারলে আবু হামিদ খেপে যেত আমার ওপর। এই জন্যই তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, সুলেমান, আর তুমি কি না সে বাদে বাকি সবাইকে মারলে।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সুলেমান আজিজ। কী বলছেন, জনাব? হে’লা কামিল বেঁচে আছে?

রাগে থরথর করে কাঁপলেও, চোখ জোড়া শীতল হয়ে গেল ইয়াজিদের। এক ঘণ্টাও হয়নি খবরটা পৌঁছেছে ওয়াশিংটনে। প্লেনটা বিধ্বস্ত হয়েয়ে গ্রিনল্যান্ডে। দু’জন ক্রু আর হে’লা কামিল বাদে বাকি সবাই বিষক্রিয়ায় মারা গেছে।

বিষক্রিয়ায়? হাঁ হয়ে গেল সুলেমান আজিজ।

মার্কিন নিউজ মিডিয়ায় আমাদের বেতনভুক সোর্স আছে, রিপোর্টটা কনফার্ম করেছে তারা। কী ভাবছ, সুলেমান আজিজ? তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে, প্লেনটা সাগরে তলিয়ে যাবে।

তারা কি জানিয়েছে কীভাবে প্লেনটা গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছল?

প্লেন গ্রিনল্যান্ডে নামার কিছুক্ষণ আগে থেকে যা যা ঘটেছিল, প্রতি ঘটনার প্রায়। নিখুঁত বর্ণনা দিল আখমত ইয়াজিদ।

স্তম্ভিত বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেল সুলেমান আজিজ। ব্যর্থতায় অভ্যস্ত নয় সে। এত পরিশ্রমের ফসল প্ল্যানটা বানচাল হয়ে গেছে ভাবতে গিয়ে মাথাটা ঘুরে উঠল তার।

নিশ্চয় বুঝতে পারছ যে যা ঘটেছে তার জন্য আমাকে দায়ী করা হবে? কর্কশস্বরে জিজ্ঞেস করল আখমত ইয়াজিদ।

ঘটনার সাথে আপনাকে বা আমাকে জড়ানো যায় এমন কোনো প্রমাণ আমি রেখে আসিনি, দৃঢ়তার সাথে জানাল সুলেমান আজিজ।

হয়তো, কিন্তু মানুষের মুখে হাতচাপা দেবে কীভাবে? পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এককভাবে আমাকে দায়ী করবে। এ থেকে রক্ষা পাবার একটাই পথ খোলা আছে আমার সামনে। তোমাকে অভিযুক্ত করা। অর্থাৎ তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তা কার্যকরী করলে আমার নির্দোষিত প্রমাণ হয়।

নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল সুলেমান আজিজ। অত্যন্ত দুঃখজনক একটা অপচয় হবে সেটা। গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আমিই এখনও সেরা খুনি।

মজুরিও পাও সবচেয়ে বেশি।

অসমাপ্ত কাজের জন্য মজুরি নিতে অভ্যস্ত নই আমি, জনাব।

অসমাপ্ত কাজের জন্য মজুরি দিতে আমিও কি অভ্যস্ত? উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ঝট করে ঘুরল আখমত ইয়াজিদ, দীর্ঘ পদক্ষেপে কালো কার্পেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, এক ঝটকায় সেটা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে, কী মনে করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সুলেমান আজিজের দিকে। প্রার্থনার জন্য তৈরি হতে হবে আমাকে, সুলেমান আজিজ। তুমি যেতে পারো।

কিন্তু হে’লা কামিল? কাজটা যে অসমাপ্ত রয়ে গেল!

তাকে সরানোর দায়িত্ব আমি মোহাম্মদ ইসমাইলকে দিচ্ছি।

ইসমাইল? ক্ষীণ আড়ষ্ট হাসি নিয়ে তাকাল সুলেমান আজিজ। মোহাম্মদ ইসমাইল তো একটা নির্বোধ।

তাকে বিশ্বাস করা যায়?

হ্যাঁ, সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল সুলেমান আজিজ। নর্দমা পরিষ্কার করার কাজে।

কঠিন চোখে গনগনে আগুন নিয়ে আখমত ইয়াজিদ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে সুলেমান আজিজের দিকে, তারপর বলল, হে’লা কামিলের কথা ভুলে যাও। মিসরে, আমার পাশে থাকছ তুমি। আমাদের আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের সাথে আরেকটা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আমার কথা চলছে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে আবার আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার একটা সুযোগ তুমি পেতে যাচ্ছ।

টুল ছেড়ে দাঁড়াল সুলেমান আজিজ। মেক্সিকান ডেলিগেট, প্লেন চালাতে কে সাহায্য করেছে যে লোকটা। সেও কি বিষক্রিয়ায় মারা গেছে?

মাথা নাড়ল আখমত ইয়াজিদ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্লেন বিধ্বস্ত হওয়ায় মারা গেছে সে। পর্দার ওদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। আগের জায়গায় ঝুলে পড়ল কালো পর্দা।

ধীরে ধীরে টুলের ওপর আবার বসল সুলেমান আজিজ। একটু একটু করে ব্যাপারটা উপলব্ধি করল সে। তার রাগ হওয়ার কথা। কিন্তু রাগ নয়, তার বদলে ঠোঁট ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। তাহলে জল্লাদ আমরা দু’জন ছিলাম, খালি ঘরে বিড়বিড় করে উঠল সে। দ্বিতীয় জল্লাদ খাবারে বিষ মিশিয়েছে। বিফ ওয়েলিংটনে। হে খোদা, তোমার মহিমা বোঝে কার সাধ্য!

.

১৬.

সোনার রেকর্ডিং পেপারে ছোট্ট একটা ঝাপসা দাগ, প্রথমে কেউ পাত্তাই দিল না।

ছয় ঘণ্টা অনুসন্ধান চালিয়ে মানুষের তৈরি অনেক জিনিসই খড়ির তলায় দেখল ওরা। তিন বছর আগে ডুবে যাওয়া একটা প্লেনের ভগ্নাংশ চেনা গেল। চেনা গেল ডুবন্ত একটা ফিশিং ট্রলার। ঝড়ের মুখে অনেক জেলে নৌকা খাড়িতে আশ্রয় নিতে আসে, তাদের ফেলা হরেক রকম জিনিস রয়েছে তলায়। প্রতিটি জিনিস শনাক্ত করা সম্ভব হলো ভিডিও ক্যামেরার সাহায্য।

ঝাপসা দাগটা, যেমন আশা করা যায়, খাড়ির মেঝেতে নয়। জিনিসটা রয়েছে ছোট একটা ইনলেট-এ, খাড়া পাহাড়প্রাচীর দিয়ে চারদিকে থেকে ঘেরা। জিনিসটার মাত্র একটা অংশ স্বচ্ছ পানিতে বেরিয়ে আছে, বাকি সব বরফ পাচিলের নিচে চাপা পড়েছে।

তাৎপৰ্যটা প্রথমে ধরতে পারল পিট। রেকর্ডারের সামনে বসে আছে ও, ওকে ঘিরে রয়েছে অ্যাল জিওর্দিনো, কমান্ডার বায়রন নাইট ও আর্কিওলজিস্টরা। ট্রান্সমিটারে কথা বলল পিট। মাছটাকে ঘোরাও, বেয়ারিং ওয়ান-ফাইভ-জিরো ডিগ্রি।

বরফ ঢাকা খাড়িতে এখনও স্থির হয়ে রয়েছে আইসব্রেকার পোলার এক্সপ্লোরার। লেফটেন্যান্ট কর্ক সিমোন্সের নেতৃত্বে একদল লোক আইসপ্যাকের ওপর, নেমে পড়েছে, পিটের নির্দেশ মতো পানির এখানে সেখানে ডোবাচ্ছে সেনসিং ইউনিট। মাছ, অর্থাৎ সেনসিং ইউনিট, অত্যন্ত ধীরগতিতে ঘোরানো হয়, যাতে তিনশো ষাট ডিগ্রি আওতার ভেতর যা কিছু আছে সব রেকর্ড করা যায়। আইসপ্যাকের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে দলটা, জাহাজ থেকে কেবল ছাড়া হচ্ছে।

পিটের নির্দেশ মতো কাজ করল কর্ক সিমোন। মাছের সোনার প্রোব দেড়শো ডিগ্রী ঘুরে গেল। হয়েছে?

এক্কেবারে টার্গেটের ওপর, জাহাজ থেকে জবাব দিল পিট। রেকর্ডিং পেপার জিনিসটা এখন আগের চেয়ে স্পষ্ট। ফেল্ট পেন দিয়ে দাগটার চারদিকে একটা বৃত্ত আঁকল ও। আমার ধারণা, একটা কিছু পেয়েছি আমরা।

ড. গ্রোনকুইস্ট পিটের কাঁধের ওপর হুমড়ি খেলেন। চেনার মতো স্পষ্ট নয় এখনও। আপনার কী মনে হচ্ছে?

পাহাড়ের মাথা থেকে অনেক জিনিস পড়েছে নিচে, সবগুলো বরফে প্রায় ঢাকা, বলল পিট। এটারও তাই, তবে যে অংশটুকু বেরিয়ে আছে, আমার মনে হচ্ছে…ওটা একটা কাঠের তৈরি জাহাজ। ভালো করে দেখুন, চারকোণা একটা আকৃতি বেরিয়ে আছে, স্টার্নপোস্ট হতে পারে।

পিটের আরেক কাঁধের ওপর হুমড়ি খেয়ে রয়েছে লিলি। চেঁচিয়ে উঠল সে, হ্যাঁ, ঠিক তাই! গড! ওহ্ গড! ওগুলো চতুর্থ শতাব্দীর বাণিজ্য জাহাজে দেখা যেত!

উত্তেজিত হবেন না, সাবধান করে দিলেন কমান্ডার বায়রন নাইট। অত পুরনো আমলের নাও হতে পারে!

ড. গ্রোনকুইস্ট পরামর্শ দিলেন, আমরা একটা ক্যামেরা নামিয়ে স্পষ্ট ছবি পাবার চেষ্টা করতে পারি।

অ্যাল জিওর্দিনো সন্দেহ প্রকাশ করল, বরফের ভেতর লুকানো অংশটার ছবি আপনি ক্যামেরা থেকে পাবেন না।

পুরুষ কর্মীর অভাব নেই আপনাদের, বলল লিলি। নিচের বরফ ভাঙা কোনো সমস্যা নয়।

ব্রিজের ইলেকট্রনিক কমপার্টমেন্টে চলে গেলেন ড. গ্রোনকুইস্ট ফিরলেন আধ মিনিট পর। ধ্বংসাবশেষের ওপর জমাট বরফ তিন মিটার পুরু, বললেন তিনি। ভাঙতে কম করেও দুদিন লাগবে।

আমাদের ছাড়াই আপনাদের খননকাজ চালাতে হবে, বললেন কমান্ডার নাইট, ঠিক ১৮০০ ঘণ্টার আগে আমাকে চলে যেতে বলা হয়েছে। এত দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাজে লাগা সম্ভব হবে না।

চমকে গেছেন গ্রোনকুইস্ট। সে তো মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পর!

কিছু করার নেই, অর্ডার, অসহায়ের মতো বললেন কমান্ডার।

রেকর্ডিং পেপারে কালো ছায়াটা মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করল পিট, এরপর বায়রন নাইটের দিকে ফিরে বলল, যদি আমি প্রমাণ করতে পারি, নিচে ওটা ফোর্থ সেঞ্চুরির রোমান জাহাজ, কর্তৃপক্ষের কাছে আরো দুই-এক দিন সময় চাইতে পারবেন আপনি?

চোখ সরু করে তাকালেন নাইট, কী বলতে চাও?

আগে বলুন, সময় চাইবেন কি না? পিট নাছোড়বান্দা।

অবশ্যই। কিন্তু আগে নিঃসন্দেহভাবে প্রমাণ করো, ওটা হাজার বছর আগের জাহাজের ধ্বংসাবশেষ।

ঠিক তো?

কীভাবে কী করবে?

খুব সহজ, আমুদে কন্ঠে পিট জানায়, বরফের নিচে ডুব দিয়ে দেখে আসব।

.

চেইন লাগানো করাত দিয়ে প্রথমে নিরেট আইসপ্যাকের বুকে এক মিটার গভীর একটা গর্ত করা হলো। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ানো হলো গর্তের পরিধি। অবশেষে স্লেজহ্যামারের আঘাতে গর্তের নিচের বরফ ভাঙা হলো, টুকরোগুলো ভোলা হলো গ্যাপলিং হুকের সাহায্যে। এবার নিরাপদে ডুব দিতে পারবে পিট।

কাজ শেষ করে ক্যানভাস ঢাকা একটা তাবুতে ঢুকল কর্ক সিমোন। ভেতরে হিটিং সিস্টেম কাজ করছে। একপাশে ডাইভিং ইকুইপমেন্ট দেখা গেল। সঙ্গী আর্কিওলজিস্টদের সাথে আলোচনা করছে লিলি। ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছে তারা। কাগজে ড্রইং আঁকছে পিট। আঁকার দায়িত্ব নিজে নিয়ে পিটকে ডাইভের জন্য তৈরি হবার তাগাদা দিল লিলি।

ভেতরে ঢুকে সিমোন বলল, গর্ত আপনার জন্য তৈরি, মি. পিট।

আর পাঁচ মিনিট, বলল অ্যাল জিওর্দিনো। মার্ক ওয়ান-এর নেভি ডাইভার মাস্কের ভালভ আর রেগুলেটর পরীক্ষা করছে সে।

স্পেশাল ড্রাই স্যুটটা পরে নিল পিট। মাথায় পরল হুড, কোমরে জড়াল কুইক রিলিজ ওয়েট বেল্ট। সেই সাথে প্রাচীন জাহাজের কাঠামো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত জ্ঞানার্জন করছে ড. গ্রোনকুইস্টের কাছ থেকে।

খোল-এর জন্য সাধারণত তারা ওক ব্যবহার করত।

কাঠ চিনি, কিন্তু কোনোটা কোনো গাছের বুঝি না।

তাহলে খোলটা পরীক্ষা করবেন। প্রাচীন খোলের বৈশিষ্ট্য হলো…

তাঁর কথার মাঝখানে কথা বলল জিওর্দিনো, রিজার্ভ এয়ার বটল লাগবে তোমার পিট?

ড. গ্রোনকুইস্টের কথায় কান, উত্তরে শুধু মাথা নাড়ল পিট। ওর মাথায় মার্ক ওয়ান মাস্কটা পরিয়ে দিল জিওর্দিনো, ওটার সাথে কমিউনিকেশন লাইন আছে।

নেভির একজন কর্মী এয়ার সাপ্লাই হোস ও কমিউনিকেশন লাইন ঢিলে করছে, পিটের কোমরে একটা ম্যানিলা লাইফলাইন বেঁধে দিল জিওর্দিনো, তারপর হেডসেট মাইক্রোফোনে পিটকে জিজ্ঞেস করল, পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছ?

পরিষ্কার, তবে আস্তে, বলল পিট। আওয়াজ বাড়াও একটু।

অল সেট?

ওকে সংকেত দিল পিট। সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে এসে পিটকে আলিঙ্গন করল লিলি শার্প, মাস্কের ভেতর পিটের চোখে চোখ রেখে বলল, গুড হান্টিং, অ্যান্ড বি কেয়ারফুল।

উত্তরে চোখ মটকাল পিট। বেরিয়ে এল তাবু থেকে। পেছনে লাইনে নেভির দু’জন কর্মী।

তাঁবু থেকে বেরোতে যাচ্ছে জিওর্দিনো, তার হাত চেপে ধরল লিলি। ওর গলা আমরা সবাই শুনতে পাব?

পাবেন। স্পিকারের সাথে ওর যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছি, বলল জিওর্দিনো আপনি আর ড. গ্রোনকুইস্ট এখানেই থাকুন, কখন কী বলে পিট, শুনবেন। জরুরি কোনো মেসেজ থাকলে জানাবেন আমাকে, পিটকে পাঠিয়ে দেব আমি।

দ্রুত বরফের গর্তের কাছে পৌঁছে গেল পিট। বাতাসের তাপমাত্রাই শূন্যের নীচে।

কমান্ডার নাইট এসে কাঁধে একটা হাত রাখলো। এক ঘণ্টা তেইশ মিনিট বাকি। বুঝেছো?

কোনো কথা বলে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে পানিতে তলিয়ে গেল পিট।

পানির নিচে দৃষ্টিসীমা নাক বরাবর আশি মিটারের মতো। তিন মিটার লম্বা একটা দাড়িওয়ালা সিল চোখে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। তার উদ্দেশ্য একটা হাত লম্বা করে দিয়ে নাড়ল পিট, পালিয়ে গেল সীল।

খাড়ির তলায় পা ঠেকল পিটের। মুখ তুলে ওপর দিকে তাকাল। বরফের গর্ত স্নান আভার মতো লাগল। কম্পাস চেক করল ও। ঝামেলা হবে ভেবে ডেপথ গজ আনেনি সাথে। কথা বলো আমার সাথে, যান্ত্রিক গলা পেল।

তলায় পৌঁছে গেছি, বরর পিট। সবগুলো সিস্টেম চমৎকার কাজ করছে। সবুজ পানির ভেতর দিয়ে তাকালও। জিনিসটা আমার উত্তরে দশ মিটার দূরে। যাচ্ছি ওদিকে। লাইন ঢিঠ দাও।

ধ্বংসাবশেষের পেছনটা ধীরে ধীরে ওর চোখের সামনে উন্মোচিত হলো। পুরু শেওলায় ঢাকা পড়ে রয়েছে পাশগুলো। গ্লাভস পরা হাত দিয়ে খানিকটা শেওলা সরাল, সবুজ মেঘ তৈরি হলো সামনে। পানি আবার স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো ওকে। প্রায় এক মিনিট পর বলল, লিলি আর ড. গ্রোনকুইস্টকে জানাও, স্টার্ন রাডার ছাড়াই একটা ভোলা দেখতে পাচ্ছি আমি, তবে স্টিয়ারিং-এর জন্য কোনো দাঁড় নেই।

জানাচ্ছি।

একটা ছুরি বের করে খোলের নিচে, কিল-এর কাছে খোঁচা মারল পিট। বেরিয়ে পড়ল নরম ধাতু। খোলের তলাটা সিসা দিয়ে মোড়া, ঘোষণার সুরে বলল ও।

লক্ষণ নাকি খুব ভালো, জবাবে বলল জিওর্দিনো। ড. গ্রোনকুইস্ট জানতে চাইছেন স্টার্নপোস্টে কোনো খোদাই করা লেখা আছে কি না।

হোল্ড অন। খানিক পর আবার বলল পিট, স্টার্নপোস্টে ঢোকানো রয়েছে শক্ত কাঠের ফলকের মতো কী যেন একটা। অক্ষরগুলো পড়তে পারছি না। একটা মুখও দেখছি।

মুখ?

মাথায় কোঁকড়ানো চুল, প্রচুর দাঁড়ি।

পড়ার চেষ্টা করো।

কী আশ্চর্য, গ্রিক আমি পড়ব কীভাবে?

গ্রিক, ল্যাটিন নয়? তীক্ষ্ণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।

ল্যাটিন নয়, গ্রিক।

ঠিক জানো?

আরে ভাই, গ্রিক এক মেয়ের সাথে বেশ কিছুদিন সম্পর্ক ছিল আমার!

রাগ কোরো না, রাগ কোরো না! আর্কিওলজিস্টদের মাথা খারাপ করে দিয়েছ তুমি! দুমিনিট পর আবার গলা শুনতে পেল পিট, ড. গ্রোনকুইস্ট বলছেন, তোমার মতিভ্রম ঘটেছে। তবে মাইক গ্রাহাম বলছেন, কলেজে তিনি ক্লাসিকাল গ্রিক পড়েছেন, জানতে চাইছেন তুমি অক্ষরগুলোর বর্ণনা দিতে পারবে কি না।

প্রথম অক্ষরটা ইংরেজি এস-এর মতে, যেন আকাশের বিদ্যুৎ আঘাত হানতে যাচ্ছে। তারপর একটা এ, তবে সেটার ডান পা নেই। এরপর পি-সামান্য লেজ আছে। পি-র পর পঙ্গু আরেকটা এ, তারপর উল্টানো এল বা ফাঁসিকাঠ। এবার আই, এবং শেষ অক্ষর আরেকটা বিদ্যুৎ আকৃতি এস।

তাঁবুতে বসে স্পিকারের মাধ্যমে পিটের গলা শুনছে মাইক গ্রাহাম, লিখে নিচ্ছে কাগজে। অক্ষরগুলো পাশাপাশি সাজানোর পর দাঁড়াল :

লেখাটার দিকে কয়েক মুহূর্ত ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকল মাইক। কী যেন একটা ঠিক মিলছে না। স্মৃতির পাতা ওল্টাতে শুরু করল সে। তারপর মনে পড়ল। অক্ষরগুলো ক্লাসিকাল, তবে ঈস্টার্ন গ্রিক। চিন্তিত ভাব বদলে গিয়ে তার চেহারায় অবিশ্বাস ফুটে উঠল। কাগজের ওপর খস খস করে কিছু লিখল সে, একটানে ছিঁড়ে লিলির দিকে সিধে করে ধরল। আধুনিক ইংরেজি অক্ষরে লেখা শব্দটা হলো : SARACIL

চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল লিলি। এর কি বিশেষ কোনো অর্থ আছে?

উত্তর দিলেন ড. গ্রোনকুইস্ট, আমার ধারণা, ওটা এক গ্রিক ঈজিপশিয়ান দেবতার নাম।

ভূমধ্যসাগরের আশপাশে অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবতা উনি, একমত হলো হসকিন্স। আধুনিক বানানো সাধারণত লেখা হয় এস-এর পর ই দিয়ে।

তাহলে আমাদের জাহাজ সেরাপিস, বিড়বিড় করে উঠল লিলি।

আমাদের বিদ্যালয় কুলোবে না, ড. গ্রোনকুইস্ট বললেন। একজন মেরিন আর্কিওলজিস্ট বলতে পারবেন, বিশেষ করে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় জাহাজ সম্পর্কে যদি তার জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা থাকে।

বরফের নিচে জাহাজটাকে ঘিরে সাঁতার কাটল পিট। এক জায়গায় বরফ ভেতর দিকে দেবে থাকতে দেখে পায়ের ফিন দিয়ে বারকয়েক আঘাত করল ও। বরফের আবরণ আরও ভেতর দিকে দেবে গেল। একটা হাত গলাল ও। কী যেন ঠেকল হাতে। সম্ভবত খোলের একটা তক্তা। সেটা ধরে নিজের দিকে টানতে শুরু করল ও।

অনেক্ষণ চেষ্টার পর তক্তাটা বাঁকা হলো, কিন্তু ভাঙল না। হাল ছেড়ে দেবে কি না ভাবছে পিট, এই সময় তক্তাটাই পরাজয় স্বীকার করল, ভাঙা অংশটা নিয়ে পেছন দিকে আছাড় খেল ও আদর্শ একজন আর্কিওলজিস্ট উপস্থিত থাকলে পিটের চির শত্রুতে পরিণত হতেন। এ ধরনের প্রাচীন শিল্পকর্ম ভাঙা আর সাতটা খুন করা প্রায় একই কথা।

পাথরে ধাক্কা খাওয়ায় কাঁধটা ব্যথা করছে পিটের। ঠাণ্ডাও অসহ্য মনে হচ্ছে। নিচে আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। খোলের একটা জায়গা ভাঙতে পেরেছি, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ও। একটা ক্যামেরা পাঠাও।

উঠে এসো, দেয়া যাবে, বলল জিওর্দিনো।

গর্তের মুখে উঠে এল পিট। দেখল, ক্যামেরা নিয়ে গর্তের কিনারায় শুয়ে রয়েছে জিওর্দিনো। আন্ডারওয়াটার ভিডিও ক্যামেরা/রেকর্ডারটা ওর হাতে ধরিয়ে দিল সে। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফিরে এসো। যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছ।

কমান্ডার নাইট কী বলেন?

একটু দাঁড়াও। ওকে দিচ্ছি লাইনে।

ইয়ারফোনে ভেসে এল নাইটের গলা, ডার্ক?

বলুন, বায়রন।

তুমি কি নিশ্চিত, এক হাজার বছর পুরনো একটা জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পেয়েছি আমরা?

বেশ শক্ত প্রমাণ আছে তো।

কিন্তু কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে হলে বেশ অকাট্য প্রমাণ লাগবে। নিদেনপক্ষে একটা দুটো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

ঠিক আছে, দেখি কিছু আনতে পারি কি না।

ঢেউ তুলে আবারো তলিয়ে যায় পিট।

নিচে নেমে এসে সাথে সাথে কাটা দিয়ে জাহাজের ভেতর ঢুকল না ও। এক কী দুমিনিট ইতস্তত করল। কেন, তা নিজেও বলতে পারবে না। হতে পারে কঙ্কালের একটা হাত ওকে অভ্যর্থনা জানাবে, এই আশঙ্কায়। হতে পারে মনে ভয় রয়েছে ভেতরে তেমন কিছু হয়তো পাওয়া যাবে না, শেষ পর্যন্ত বোধ হয় প্রমাণিত হবে জাহাজটা অত পুরনো নয়।

অবশেষে মাথা নোয়াল পিট। কাঁধ শক্ত করল। তারপর ধীরে ধীরে ফিন নেড়ে ঢুকে পড়ল জাহাজটার ভেতর।

অচেনা অন্ধকার একটা জগৎ আলিঙ্গন করল ওকে।

.

১৭.

জাহাজের ভেতর ঢোকার পর থামল পিট, স্থির ঝুলে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে ভাঁজ করা হাঁটু নামিয়ে তল পাবার চেষ্টা করল, বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধুকধুক শুনতে পাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে এজগস্ট ভালভ থেকে বুদ্বুদ বেরোবার শব্দ। একটু একটু করে চারপাশের তরল জগৎ ঠাহর করতে পারল ক্ষীণ আভায়।

জানে না কী পাবে বলে আশা করছে ও। বাল্কহেডের কয়েকটা শেলফে টেরাকোটা জার, বড় আকারের কলসি, কাপ আর পিরিচ সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে। ভাঙা তক্তার ভেতর দিয়ে ঢোকার সময় হাতে ঠেকেছিল তামার পাত্র। কালের আঁচড়ে খোলের দেয়ালগুলো সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে।

প্রথমে ভাবল, হাঁটু দুটো ডেকের শক্ত মেঝেতে রয়েছে। কিন্তু হাতড়াতে গিয়ে দেখল টালি বিছানো চুলোর মেঝেতে হাত বুলাচ্ছে। মুখ তুলে ওপরে তাকাল ও, বুদ্বুদগুলো উঠে গিয়ে এক জায়গায় গতি হারাচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। পা লম্বা করে দিয়ে সিধে হলো পিট, মাথা আর কাঁধ উঠে এল খাড়ির পানি ছেড়ে পরিষ্কার বাতাসে।

জাহাজের ভেতর ঢুকছি আমি, বরফের ওপর রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষারত দলটাকে জানাল ও। ওপরের অর্ধেকটা শুকনো। ক্যামেরা সচল।

ঠিক আছে, বলল জিওর্দিনো।

পরের কমিনিট গ্যালির ভেতর, পানির ওপর আর নিচটা, ভিডিও-রেকর্ডারে বন্দি করার কাজে ব্যস্ত থাকল পিট, প্রতিটি নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে অনর্গল বলে গেল জিওর্দিনোকে। খোলা একটা আলমিরা দেখল, ভেতরে দারুণ সুন্দর সব কাঁচের পাত্র। একটা হাতে নিয়ে ভেতরে উঁকি দিল-মুদ্রায় ভর্তি। দস্তানা পরা আঙুল দিয়ে ঘষে শ্যাওলা পরিষ্কার করল, একটা মুদ্রার। চকচক করে উঠল মুদ্রাটা। একটু লালচে সোনালি।

রোমাঞ্চ আর বিস্ময়ে নেশা ধরে গেল পিটের। তাড়াতাড়ি চারদিকে তাকাল, যেন আশা করছে নাবিকদের আত্মা বা ভূত-টুত দেখতে পাবে। অন্তত এক-আধটা কঙ্কাল পানি ঠেলে এগিয়ে আসার বিচিত্র কিছু নয়, তাদের সংরক্ষিত গোপন জিনিসে হাত, দিয়ে ফেলেছে পিট। কিন্তু না, ক্রুদের কাউকে দেখা গেল না। ও একা। এই একই ডেকে একদিন যারা হাটাচলা করেছে, খাবার বেঁধে খেয়েছে এখানে, তারা আজ থেকে ষোলোশো বছর আগে মারা গেছে।

আজ তারা কোথায়? কী ঘটে থাকতে পারে তাদের ভাগ্যে? এ রকম আরও অনেক প্রশ্ন জাগল পিটের মনে। এ-ধরনের অভিযান সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণাই ছিল না, তারা এত উত্তর হিমাঞ্চলে এলই বা কেন? মৃত্যুর কারণ যদি ধরে নেয়া হয়। এক্সপোজার, তাহলে তাদের লাশগুলো গেল কোথায়?

তুমি বরং এবার উঠে এসো, ওপর থেকে বলল জিওর্দিনো। নেমেছ তো আধঘণ্টা হয়ে এল।

আর কিছুক্ষণ, জবাব দিল পিট। আধঘণ্টা, ভাবল ও। যদিও মনে হচ্ছে, পাঁচ মিনিট। আঙুল গলে বেরিয়ে যাচ্ছে সময়। ঠাণ্ডা এতক্ষণে ওর ব্রেনটাকে প্রভাবিত করছে। মুদ্রাটা কাঁচের পাত্রে রেখে আবার ঘুরে ফিরে দেখতে শুরু করল চারদিকে।

মাথার ওপর মেইন ডেক, সেটাকে ছাড়িয়ে আধ মিটার উঠে গেছে গ্যালির সিলিং। ছোটো আকারের খিলান আকৃতির জানালা, সাধারণত রোদ আর বাতাস চলাচলের কাজ করে, ফরওয়ার্ড বাল্কহেডের মাথার দিকে থেকে তক্তা মেরে বন্ধ করা হয়েছে। খানিক চেষ্টা করে একটা তক্তা ভাঙতে পারল পিট, ওপারে নিরেট বরফের দেয়াল।

মনে মনে একটা হিসাব করল। গ্যালির সামনের দিকটায় পানির গভীরতা বেশি হবে। তার মানে জাহাজের বা আর মাঝখানের অংশটা নিশ্চয়ই পানিতে ডোবা নয়।

আর কিছু পেলে? অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল জিওর্দিনো, কৌতূহলে মরে যাচ্ছে।

যেমন?

ক্রুদের অবশিষ্ট বা…?

দুঃখিত, কোথাও কোনো হাড় দেখছি না, পানির নিচে ডুব দিল পিট, নিশ্চিত হবার জন্য ডেকের ওপর চোখ বুলালো। ডেক খালি, কোথাও কিছু পড়ে নেই।

তারা সম্ভবত আতঙ্কিত হয়ে জাহাজ ত্যাগ করেছিল, আন্দাজ করল জিওর্দিনো।

তারও কোনো প্রমাণ দেখছি না, জানাল পিট। গ্যালির সব কিছু গোছানো রয়েছে। ব্যস্ততার ছাপ নেই।

জাহাজের বাকি অংশে যাওয়া যায়?

ফরওয়ার্ড বাল্কহেড একটা হ্যাঁচ আছে। ওপারে কী আছে দেখব। কুঁকল পিট, সরু আর নিচু ফাঁকটা গলে ধীরে ধীরে সামনে বাড়ল, সতর্কতার সাথে লাইফ-লাইন আর এয়ার হোসটা সাথে রাখছে। ঘোর অন্ধকার, ভয় লাগারই কথা। ওয়েট বেল্ট থেকে ডাইভ লাইটের হুক খুলল ও, আলো ফেলে দেখল ছোট একটা কমপার্টমেন্টে রয়েছে। এটা বোধ হয় একটা স্টোররুম। পানির গভীরতা কম এখানে, শুধু হাঁটু জোড়া ডুবেছে। যন্ত্রপাতি দেখতে পাচ্ছি-হা-কাঠমিস্ত্রীর যন্ত্রপাতি, অতিরিক্ত নোঙর, বড়সড় একটা দাঁড়িপাল্লা…

দাঁড়িপাল্লা!

হ্যাঁ-হুক থেকে ঝুলছে একটা ব্যালেন্স স্কেল।

বুঝেছি।

আরও রয়েছে কয়েক ধরনের কুঠার, লিড ওয়েট, মাছ ধরার জাল। দাঁড়াও, আগে ফটো ভোলা হোক।

কাঠের মইটা ওপর দিকে উঠে গেছে মেইন ডেকের ফোকর গলে ফটো ভোলা শেষ হতে মইটা পরীক্ষা করল পিট। কাঠে এখনও পচন ধরেনি দেখে অবাক হলো। ধাপ বেয়ে ধীরে ধীরে উঠল ও। ফোকরের ভেতর গলিয়ে দিল মাথাটা। একটা বিধ্বস্ত ডেক কেবিন দেখতে পেল। বরফের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।

নিচে নেমে এসে আরেকটা মই ব্যবহার করল পিট। এটা উঠে গেছে কার্গো হোল্ডে। ওপরে উঠে এসে স্টারবোর্ড থেকে পোর্টের দিকে ডাইভ লাইটের আলো ফেলল ও। বিস্ময়ের ধাক্কায় পাথর হয়ে গেল সাথে সাথে।

জায়গাটা শুধু কার্গে হোল্ড নয়।

এটা একটা লুকানোর জায়গাও বটে।

চরম ঠাণ্ডা শুকনো কার্গো হোল্ডটাকে ক্রাইয়াজিনিক চেম্বারে পরিণত করেছে। জাহাজের বো-র দিকে মাঝখানে একটা লোহার তৈরি স্টোভ নিয়ে গোল হয়ে বসে আছে ওরা। আটজন মানুষ, প্রায় সম্পূর্ণ সংরক্ষিত অবস্থায়। বরফের আবরণ প্রত্যেককে ঢেকে রেখেছে, দেখে পিটের মনে হলো, সবাই ওরা নিজেদেরকে প্লাস্টিক শিট দিয়ে মুড়ে রেখেছে।

মুখের অবয়ব শান্ত, যেন শান্তিতে সময় কাটাছিল। চোখ খোলা সবার, খোলা অবস্থায় স্থির হয়ে গেছে, যেন কোনো দোকানের জানালায় সাজানো ম্যানিকিন। সবাই বসে আছে, তবে প্রত্যেকের ভঙ্গি আলাদা। চারজন একটা টেবিলে বসে খাচ্ছে, এক হাতে প্লেট, আরেক হাতে ধরা কাপ মুখের কাছে ভোলা। দু’জন খোলের গায়ে হেলান দিয়ে পাশাপাশি বসে আছে, গুটানো কাগজ বা পার্চমেন্ট খুলে কী যেন পড়ছে বলে মনে হলো। একজন একটা কাঠের তৈরি বাক্সের ওপর ঝুঁকে রয়েছে, শেষ ব্যক্তি নিচের দিকে ঝুঁকে কী যেন লিখছে।

পিটের মনে হলো, যেন একটা টাইম মেশিনে ঢুকেছে ও। ভাবতে গিয়ে প্রচণ্ড বিস্ময়বোধ করল, চোখের সামনে যাদের দেখতে পাচ্ছে তারা একসময় রোম সাম্রাজ্যের নাগরিক ছিল। প্রাচীন নাবিক ওরা, যারা এমন সব বন্দরে জাহাজ ভিড়িয়েছিল, পরবর্তী সভ্যতার আবর্জনার নিচে সেসব বন্দর চাপা পড়ে গেছে, অতীত থেকে উঠে আসা ষাটটি প্রজন্ম আগেকার পূর্বপুরুষ।

আর্কটিক আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুতি ছিল না ওদের। কারও পরনে ভারী পোশাক নেই। কর্কশ কম্বল জড়িয়েছে সবাই গায়ে। পিটের তুলনায় ওদেরকে ছোটখাটো লাগল। ছোট্ট একটা মানুষের টাক রয়েছে, শুধু মাথার দুপাশে সাদা কিছু চুল। আরেকজনের মাথায় কঁকড়া লাল চুল, মুখে চাপ দাড়ি। দাড়ি প্রায় সবারই কামানো। বরফের আবরণ থাকলেও, বয়স আন্দাজ করতে পারল পিট। সবচেয়ে যে ছোট তার বয়স আঠারোর মতো হবে, সবচেয়ে বয়স্ক লোকটা চল্লিশের ঘরে।

লিখতে বসে যে লোকটা মারা গেছে তার মাথায় চামড়ার একটা ক্যাপ রয়েছে, পায়ে লম্বা তুলো জড়ানো। একটা ফোল্ডিং টেবিলের ওপর ঝুঁকে রয়েছে সে, অমসৃণ টেবিলের ওপর পড়ে রয়েছে কয়েকটা মোম ট্যাবলেট। লোকটার ডান হাতে এখনও ধরা রয়েছে সূচিমুখ শলাকা অর্থাৎ কলম।

নাবিকদের দেখে মনে হলো না খাদ্যের অভাবে বা ঠাণ্ডায় ধীরে ধীরে মারা গেছে। মৃত্যু আসে হঠাৎ করে, অপ্রত্যাশিতভাবে।

কারণটা আন্দাজ করল পিট। ঠাণ্ডা ঠেকাবার জন্য সবগুলো হ্যাঁচ কভার নিশ্চিদ্রভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। ভেন্টিলেশন-এর জন্য একমাত্র হ্যাঁচটা ভোলা ছিল সেটা বরফ জমে বন্ধ হয়ে যায়। শেষবার রান্না করা খাবারটা এখনও স্টোভের ওপর পাত্রে রয়েছে। উত্তাপ বা ধোয়ার বাইরে বেরিয়ে যাবার কোনো পথ ছিল না। মারাত্মক কার্বন মনোক্সাইড জমা হতে থাকে বদ্ধ কার্গো হোল্ডের ভেতর। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই অজ্ঞান হয়ে পড়ে ওরা। যে যেখানে বসেছিল সেখানে বসেই মারা গেছে।

মোম ট্যাবলেটগুলো বরফের আবরণ ভেঙে টেবিল থেকে তুলল পিট। বরফ খুব। সাবধানে ভাঙল ও, যেন ভয় করছে লোকগুলো জেগে উঠবে। ড্রাই স্যুটের একটা পকেট খুলে ট্যাবলেটগুলো রেখে দিল। ও যে কাঁপছে, রোমকূপ দিয়ে বেরিয়ে আসছে ঘাম, এসব খেয়ালই করল না। করুণ দৃশ্যটা এমনভাবে টেনে রেখেছে ওকে, বারবার ডাকাডাকি করেও ওর কোনো সাড়া পেল না জিওর্দিনো।

এখনও তুমি আমাদের সাথে আছ? পাঁচবারের বার জিজ্ঞেস করল সে। জবাব দাও, ধেত্তেরি ছাই!

দুর্বোধ্য কয়েকটা শব্দ অস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করল পিট।

আবার বলো! তোমার বিপদ হয়েছে?

উদ্বেগে ব্যাকুল গলা শুনে অবশেষে ধ্যান ভাঙল পিটের কমান্ডার নাইটকে জানাও, বলল ও। জাহাজের অ্যান্টিক মূল্য নিভেজাল। আর, তুমি একথাও বলতে পারো যে ওঁরা যদি সাক্ষী চান, নাবিকদের হাজির করতে রাজি আছি আমি।

.

১৮.

তোমার ফোন, কিচেনের জানালা দিয়ে বললেন জুলিয়াস শিলারের স্ত্রী।

বাড়ির পেছনের আঙিনায় বার-বি-কিউ রত শিলার ঘুরে তাকালেন। নাম বলেছে?

না। তবে মনে হলো, ডেইল নিকোলাস।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে, স্টাডিতে ঢুকে দরজা আটকে ফোন উঠালেন শিলার।

কে?

আমি ডেইল, জুলিয়াস।

কী খবর?

হে’লা কামিল। তাঁর একটা ডুপ্লিকেট পাওয়া গেছে।

তার মানে ওয়াল্টার রীড হাসপাতালে তার মতো দেখেতে অন্য একটা মেয়ে?

হ্যাঁ, কড়া পুলিশি প্রহরায়।

কে মেয়েটা, মানে হেলা বলমিলের ভূমিকায়?

অভিনেত্রী টেরি রুনি, আবার কে! তার নাকে নাক না ঠেকালে তুমি বুঝতেই পারবে না যে সে আসল হে’লা কামিল নয়, এতই চমৎকার হয়েছে তার মেকআপ। ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ডাক্তারদের দিয়ে একটা প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে, তারা হে’লা কামিলের আশঙ্কানক অবস্থা ব্যাখ্যা করবেন।

আর হে’লা কামিল? তিনি কী করছেন? জানতে চাইলেন আন্ডার সেক্রেটারি।

গ্রিনল্যান্ড থেকে এয়াফোর্সের যে প্লেনে ফিরে এসেছেন সেটা থেকে নামেননি তিনি, প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী বললেন। আবার ফুয়েল নিয়ে ডেনভারের কাছে বাকলি ফিল্ডে চলে গেছে প্লেনটা। ওখান থেকে হে’লা কামিলকে নিয়ে যাওয়া হবে ব্রেকেনরিজ-এ।

কলোরাডোর স্কি রিসর্টে?

হ্যাঁ, সিনেটর জর্জ পিটের বাড়িতে। হে’লা কামিল দুএক জায়গায় সামান্য চোট পেয়েছেন, এখন অবশ্য ভালোই আছেন।

আমরা তাঁর দায়িত্ব নেয়ায় ভদ্রমহিলার প্রতিক্রিয়া?

বলা হয়েছে, আমরা শুধু নিরাপদে তাঁকে জাতিসংঘে পৌঁছে দিতে চাই, অধিবেশনের উদ্বোধন উপলক্ষে সেখানে তিনি ভাষণ দেবেন। না, আমাদের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করেননি। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে আভাস পাওয়া গেছে, ভাষণে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে জোরাল বক্তব্য থাকবে। কিন্তু সমস্যা হলো, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পাঁচ দিন পর। হে’লা কামিলকে থামাবার জন্য পাঁচ দিন চেষ্টার কোনো ত্রুটি করবে না আখমত ইয়াজিদ।

মঞ্চে পা রাখার আগের মুহূর্তে পর্যন্ত কোথায় আছেন তিনি তা যেন কাকপক্ষীও টের না পায়।

মিসর সরকারের তরফ থেকে তোমার দপ্তর কিছু জানতে পারল? ডেইল নিকোলাস প্রশ্ন করলেন।

হে’লা কামিলের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট হাসান আমাদেরকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন, জানালেন জুলিয়াস শিলার। দেশের অর্থনীতি নতুন করে ঢেলে সাজানোর কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত তিনি, বলা যায় চব্বিশ ঘণ্টা মিটিংয়ের মধ্যে আছেন। ভদ্রলোক আন্তরিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাষণ দেয়ার আগেই যদি ইয়াজিদের পাঠানো অ্যাসাসিনের হাতে হে’লা কামিল মারা যান, তাহলে ধরে নিতে পারো, এক মাসের মধ্যে আরেকটা ইরান পাবেন।

শান্ত হও, আশ্বাস দিলেন ডেইল নিকোলাস। হে’লা কামিল কোথায় আছেন, আখমত ইয়াজিদ বা তার পাঠানো খুনিরা জানতেই পাববে না।

প্রহরার ব্যবস্থা যথেষ্ট…

সিক্রেট সার্ভিসের একদল এজেন্ট খোঁজখবর রাখছে।

জুলিয়াস শিলার বললেন, আরও নিশ্চিন্ত হতে পারতাম কাজটায় যদি এফ. বি. আই, সাহায্য করত।

হোয়াইট হাউসের সিকিউরিটি স্টাফেরা সব দিক ভেবেই এই ব্যবস্থা করেছে। তাছাড়া, প্রেসিডেন্ট চাইছেন না পাঁচমিশালি একটা আয়োজন করা হোক।

দেখো, ডেইল, সাবধান-ব্যাপারটা লেজে গোবরে করে ফেলো না।

আরে, চিন্তা কোরো না, তো! কথা দিলাম, হে’লা কামিল নির্দিষ্ট দিনে সম্পূর্ণ বহাল তবিয়তে জাতিসংঘ সদর দফতরে পৌঁছবেন।

সত্যি যেন পৌঁছান।

সূর্য যদি পশ্চিমে ওঠে, তবুও পৌঁছবেন।

ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখলেন জুলিয়াস শিলার। কোনো কারণ নেই, তবু অস্বস্তিবোধ করছেন তিনি। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন, খারাপ কিছু যেন না ঘটে। তারপর ভাবলেন, হোয়াইট হাউস যা করছে নির্ঘাত সব দিক ভেবে-চিন্তেই করছে।

.

রাস্তার ওপারে একটা ফোর্ড কোম্পানির ভ্যানে তিনজন লোক বসে আছে। ভ্যানের গায়ে লেখা-ক্যাপিটাল প্লামবিং, টোয়েন্টি ফোর আওয়ার ইমার্জেন্সি সার্ভিস। ভেতরে অত্যাধুনিক আড়িপাতা যন্ত্র গিজগিজ করছে।

তিনজনই ওরা সাবেক কাউন্টার এসপিওনাজ এজেন্ট, চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে চুক্তিভিত্তিক স্বাধীন ব্যবসায় নেমেছে। এ ধরনের এজেন্টরা সাধারণত সরকারি ছাড়া অন্য কোনো কাজ গ্রহণ করে না। তবে এদের কথা আলাদা। এরা তিনজন অল্প দিনে কোনো কাজ গ্রহণ করে না। তবে এদের কথা আলাদা। এরা ইত্যাদি বিসর্জন দিয়েছে তারা। যে বেশি টাকা দেয় তার কাছেই এরা ক্লাসিফায়েড ইনফরমেশন বিক্রি করে।

শিলারের জানালার রঙিন কাঁচের দিকে বাইনোকুলার তাক করে তাদের একজন বলল, লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন উনি।

দ্বিতীয় লোকটা মোটাসোটা, কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ঝুঁকে রয়েছে রেকর্ডিং মেশিনের দিকে, বলল, কথাবার্তা সব থেমে গেছে।

তৃতীয় লোকটার বিশাল গোফ, সে একটা লেয়ার প্যারাবোলিক অপারেট করছে। জিনিসটা স্পর্শকাতর মাইক্রোফোন, ঘরের ভেতরের কণ্ঠস্বর রিসিভ করে জানালার কাঁচে কম্পন থেকে, তারপর সেটাকে ফাইবার অপটিক্স-এর মাধ্যমে ম্যাগনিফাই করে সাউন্ড চ্যানেলে পাঠিয়ে দেয়।

ইন্টারেস্টিং কিছু? প্রথমজন জানতে চাইল।

মোটাসোটা দ্বিতীয়জন এয়ারফোন নামিয়ে কপালের ঘাম মুছল। একটা ফিশিং বোট কেনার টাকা বোধ হয় এবার পেয়ে গেলাম।

গোঁফে তা দিয়ে তৃতীয় লোকটা জানতে চাইল, তথ্যটার সম্ভাব্য ক্রেতা কে হতে পারে?

এক উন্মাদ ধনী আখমত ইয়াজিদকে সাহায্য করতে চায়।

.

১৯.

নিজের ডেস্কের পেছন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সিআইএ প্রধান, মার্টিন ব্রোগানের উদ্দেশে ইশারা করলেন প্রেসিডেন্ট।

মাথার রুপালি চুলে হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, আজ সকালে গুরুত্বপূর্ণ কী খবর আছে আমার জন্য?

কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্রেসিডেন্টের বসার অপেক্ষায় রইলেন ব্রোগান। এরপর লেদার মোড়া একটা ফাইল এগিয়ে দিলেন তার দিকে। মস্কোর সময় সকাল নয়টায় সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জর্জি অ্যান্টেনভ তার স্ত্রীর সাথে প্রেম করেছেন গাড়ির ব্যাক সিটে!

তার দিন শুরুর কায়দা দেখে আমি ঈর্ষান্বিত, চওড়া হেসে বললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ওনার গাড়ির ফোন থেকে দুটো কল করেছেন তিনি; একটি রাশিয়ার মহাকাশবিষয়ক প্রোগ্রামের প্রধানকে, অপরটি নিজের ছেলেকে। মেক্সিকো সিটির বাণিজ্যিক অংশে দূতাবাসে কাজ করে সে। পেজার নম্বর চার আর পাঁচে তাদের আলাপচারিতার একটা বর্ণনা পাবেন।

চোখে রিডিং গ্লাস এঁটে চার এবং পাঁচ নম্বর পাতায় চোখ বোলালেন প্রেসিডেন্ট।

দিনের বাকি সময় কী করল জর্জি?

বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে। তার অবস্থা বেশ নাজুক। সোভিয়েত অর্থনীতির অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। সেনাবাহিনীতে তার সমর্থন কম। ওদিকে রাশিয়ার জনতা এখন অনেক বেশি সরব। শোনা যাচ্ছে, আগামী গ্রীষ্মের আগেই জর্জি অ্যান্টেনভের পদত্যাগ করতে হতে পারে।

আমার নিজেরও ওই অবস্থা হতে পারে, যদি না নিজের পক্ষে জনমত জোরাল করতে পারি।

এই কথায় স্বাভাবিকভাবেই নিশ্চুপ রইলেন ব্রোগান।

মিসর থেকে সাম্প্রতিক কী খবর পাওয়া গেল? এবারে প্রসঙ্গ বদল করে জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট।

নাদাভ হাসান এখনও ক্ষমতায় টিকে আছেন শুধুমাত্র এয়ারফোর্সের সমর্থন নিয়ে ব্যাপক রদবদল সত্ত্বেও সেনাবাহিনীতে তার ক্ষমতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সামরিক নেতৃবৃন্দ যেকোনো মুহূর্তে ইয়াজিদের পক্ষ অবলম্বন করতে পারেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আবু হামিদ, পোর্ট সাঈদ-এ গোপনে ইয়াজিদের সাথে বৈঠক করেছেন। সি.আই.এ এজেন্টরা জানতে পেরেছে, ক্ষমতাশালী একটা পদ না পেলে আখমত ইয়াজিদকে সমর্থন দিতে রাজি হননি আবু হামিদ। মৌলবাদী মোল্লাদের অধীনে থাকার কোনো ইচ্ছে তার নেই।

কী মনে হয়, ইয়াজিদ হাল ছেড়ে দেবে?

মাথা নাড়লেন ব্রোগান। কাউকে ক্ষমতার ভাগ দেয়ার কোনো ইচ্ছে ইয়াজিদের নেই। তাঁর নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করছেন আবু হামিদ। তিনি জানেন না, তবে সি.আই.এ, জানে যে আবু হামিদের প্রাইভেট প্লেনে বোমা ফিট করার একটা ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ষড়যন্ত্রটা ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে। আবু হামিদকে ব্যাপারটা জানানোর জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমতি প্রার্থনা করলেন সি.আই.এ. ডিরেক্টর।

হে’লা কামিলকে বহনকারী জাতিসংঘ বিমানের দুর্ঘটনার সঙ্গে ইয়াজিদকে বাঁধা যায়?

প্রেসিডেন্টের প্রশ্নের উত্তরে মারটিন ব্রোগান জানালেন, জাতিসংঘ প্লেন বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে ইয়াজিদের হাত থাকলেও তা প্রমাণ করা যাচ্ছে না। জানা গেছে, প্লেনটাকে গ্রিনল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী হলো ভুয়া পাইলট, সুলেমান আজিজ। কিন্তু আরোহীদের খাবারে বিষ মেশানোর কাজটা তার কীর্তি নয়। এই কাজের জন্য এডুরাডো ইয়াবারা নামে একজন মেক্সিকান প্রতিনিধিকে সন্দেহ করা হচ্ছে, প্লেন বিধ্বস্ত হবার সময় মারা গেছে সে। হে’লা কামিল বাদে সে-ই একমাত্র আরোহী, যে, প্লেনে ওঠার পর কোনো খাদ্য গ্রহণ করেনি। ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট যে মেয়েটা বেঁচে গেছে তার ভাষ্য অনুসারে, এডুরাডো ইয়াবারাকে খাবার সাধা হয়েছিল, কিন্তু পেট ভালো নেই বলে এড়িয়ে যায় সে।

এমন তো হতে পারে, সত্যি তার পেট খারাপ ছিল? বললেন প্রেসিডেন্ট।

না, নিজের ব্রিফকেস থেকে তাকে একটা স্যান্ডউইচ খেতে দেখেছে বেঁচে যাওয়া ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট।

তাহলে তো সে জানত, খাবারে বিষ আছে।

তাই তো মনে হয়।

সে ছাড়া সবাই মরবে, এটা জানার পরেও বিমানে উঠল কেন ব্যাটা?

ব্যাক আপ পরিকল্পনা হিসেবে। যদি তার টার্গেট বিষ বিশ্রিত খাবার নায় খায় তাই সে ছিল ওখানে।

চেয়ারে হেলান দিয়ে সিলিংয়ে তাকালেন প্রেসিডেন্ট।

তো, কামিল হলো ইয়াজিদের পথের কাটা। সুলেমান আজিজের মাধ্যমে তাঁকে নিকেশ করতে চেয়েছিল সে। কিন্তু পরিকল্পনা ভেস্তে গেল-গ্রিনল্যান্ড উপকূলে বিধ্বস্ত হলো, বিমান, আর্কটিকে তলিয়ে গেল না। বেশ রহস্যজনক। মিসরের যোগাযোগ না হয় বুঝলাম। কিন্তু মেক্সিকান প্রতিনিধির কামিলকে মেরে কী লাভ? এতগুলো লোক মেরে কী অর্জন করতে চায় তারা? এখন তো প্রমাণের অভাবে কিছুই করা সম্ভব নয়।

ব্রোগান বললেন, মেক্সিকোতে কোনো রকম সন্ত্রাসী তৎপরতার রিপোর্ট নেই।

টপিটজিনকে ভুলে গেলে?

ভুলিনি। গাই রিভাসের পরিণতির কথাও মনে আছে। একটু সুযোগ পেলেই ওকে ধরব।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রেসিডেন্ট। লোকটা একটা রক্তপিপাসু উন্মাদ! মেক্সিকোর ক্ষমতা যদি পায় সে, খবর আছে আমাদের।

রিভাসের মরণ-চিৎকারের টেপটা আপনি শুনেছেন? জানতে চাইলেন ব্রোগান, উত্তর তার ভালো করেই জানা।

চারবার। দুঃস্বপ্ন দেখছি সেই থেকে।

মারটিন ব্রোগান এৰারে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বললেন, কিন্তু যদি মেক্সিকোর বৈধ সরকারকে উৎখাত করে টপিটজিন ক্ষমতা দখল করে, তখন কী হবে? আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা কজা করার হুমকি দিয়েছে সে। মেক্সিকানরা যদি মিছিল করে সীমান্ত পেরোতে শুরু করে?

প্রেসিডেন্ট মৃদু গলায়, শান্তভাবে জানালেন, আমেরিকার মাটিতে কেউ অনুপ্রবেশ করলে তাকে গুলি করার নির্দেশ দেব আমি। বিদেশি আগ্রাসন আমি সহ্য করব না।

.

সিআইএ সদর দপ্তর, ল্যাংলিতে ফিরে এলেন মার্টিন ব্রোগান। নেভির অ্যাসিস্যান্ট সেক্রেটারি, এলমার শ অপেক্ষা করছিল তার জন্য।

বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু ইন্টারেস্টিং খবর আছে আমার কাছে।

বসো। কী ব্যাপার?

আমাদের সার্ভে জাহাজ, পোলার এক্সপ্লোরার, আর্কটিকে হারিয়ে যাওয়া আলফা ক্লাস সোভিয়েত সাবমেরিন খুঁজছিল-

হ্যাঁ, জানি, থামিয়ে দিয়ে বললেন সিআইএ প্রধান।

ওটা খুঁজে পেয়েছে তারা।

চোখ দুটো বড় বড় হলো মার্টিন ব্রোগানের, টেবিলে চাপড় দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করলেন তিনি।

চমৎকার! দারুণ কাজ দেখিয়েছে তোমাদের লোকজন।

এখনো অবশ্য আমরা কোনো হাত দিইনি ওটায়, শ’ বললেন।

রাশিয়ানরা? ওরা কি খোঁজ পেয়ে গেছে?

সম্ভবত, না। আসলে, জাতিসংঘের বিমান দুর্ঘটনার কারণে ওটা উদ্ধার করতে যায় আমাদের দল। এতে করে ভালো একটা ডাইভারশন পেয়ে যাই আমরা। নিশ্চিদ্র গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে।

এখন কী পরিকল্পনা?

পানির তলায় একটা উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা, দশ মাস সময় লাগবে ওতে। এদিকে আরো একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। সোভিয়েতরা পুরো দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বে এতে করে।

মানে?

বলা যায়, দৈবাৎ, একটা পুরনো রোমান জাহাজ আবিষ্কার করেছে নুমার কর্মীরা, বরফের তলায়।

গ্রিনল্যান্ডে? ব্রাগানের চোখে অবিশ্বাস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সন্দেহ নেই। আমরা পোলার এক্সপ্লোরারকে ওখানে, রেখেই একটা উদ্ধার অপারেশন চালাবো, এতে করে রাশিয়ানরা ভাববে, হয়তো পুরনো জাহাজ নিয়েই আমাদের মাথাব্যথা। ওদের সাবমেরিন খুব কাছেই।

রোমান জাহাজটা থেকে কি পাব বলে আশা করছি আমরা? প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা? অমূল্য শিল্পকর্ম?

অতি পুরনো কিছু থেকে সবাই তো আমরা গুপ্তধন আশা করি।

দু’জনের কেউই জানেন না, বিষয়টা শুধু ইতিহাস আর গুপ্তধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। থাকবে না, আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ওদের সবার ঘুম হারাম করে দেবে।

২০. আর্কিওলজিস্টরা নির্দেশ আর পরামর্শ দিল

২০.

আর্কিওলজিস্টরা নির্দেশ আর পরামর্শ দিল, আইসব্রেকার পোলার এক্সপ্লোরারের ক্রুরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বরফ ভেঙে খাঁড়ির তলায় পড়ে থাকা প্রাচীন জাহাজ সেরাপিসের টপ ডেক পর্যন্ত পৌঁছল। ধীরে ধীরে বরফ-মুক্ত হলো স্টার্নপোস্ট থেকে বো পর্যন্ত সবটুকু।

খাড়ির সবাই দেখার জন্য ভিড় করেছে এক জায়গায়, কৌতূহল আর বিস্ময়ে প্রত্যেকে সম্মোহিত। শুধু পিট আর লিলিকে কোথাও দেখা গেল না।

মোম ট্যাবলেট পরীক্ষার জন্য পোলার এক্সপ্লোরার-এ রয়ে গেছে ওরা।

প্রাচীন জাহাজটাকে সম্পূর্ণ বরফ-মুক্ত করার পর কার্গো হ্যাঁচ খুলে নিচে নামল অ্যাল জিওর্দিনো, মাইক গ্রাহাম আর জোসেফ হসকিন্স। বরফের আবরণসহ মূর্তিগুলো ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হলো গায়ে হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে এক্ষুনি সবাই জ্যান্ত হয়ে উঠবে। বো-র দিকে, এক কোণে, আরও দুটো মূর্তি রয়েছে, পিটের চোখে এড়িয়ে গেছে ওগুলো। দুটোর মধ্যে একটা কুকুর, অপরটি ছোট্ট এক মেয়ে।

.

পোলার এক্সপ্লোরার-এর ডেকে একটা নুমা হেলিকপ্টার নামল। সবুজ সোয়েটার পরা দীর্ঘদেহী এক লোক নেমে এলেন প্যাসেঞ্জার কেবিন থেকে। চারদিকে তাকিয়ে পিটের ওপর স্থির হলো ভদ্রলোকের দৃষ্টি, পিট হাত নাড়তে মৃদু হাসলেন তিনি। এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল পিট, ড. রেডফান?

আপনি ডার্ক পিট?

মাথা ঝাঁকিয়ে পিট বলল, ব্যস্ততার মধ্যেও সময় সরে আসতে পেরেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ, ড. রেডফার্ন।

ঠাট্টা করছেন। আপনার আমন্ত্রণ পেয়ে ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে উঠেছিলাম, তা জানেন? আপনি যা আবিষ্কার করেছেন, তার সাথে জড়াবার জন্য যেকোনো আর্কিওলজিস্ট তার একটা চোখ হারাতেও পিছপা হবে না। আমার তর সইছে না, কখন দেখাবেন?

দশ মিনিটের মধ্যে অন্ধকার হয়ে যাবে। আপনি বরং কাল সকালে দেখতে চাইলে ভালো হয়। তার আগে ড. গ্রোনকুইস্ট ব্রিফ করবেন আপনাকে। মেইন ডেক থেকে যেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে, সেসব আজই দেখানো যেতে পারে।

ড. মেল রেডফার্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেরিন আর্কিওলজিস্ট, পিটের আমন্ত্রণ পেয়ে এথেন্স থেকে রিকিয়াভিক-এ চলে আসেন প্লেনে চড়ে, সেখান থেকে আল জিওর্দিনো তাকে হেলিকপ্টারে তুলে নেয়। হ্যাঁচ গলে পোলার এপ্লারারের পেটে নেমে এল ওরা। খোলের ভেতর কী কী পেয়েছেন, বলবেন, মি. পিট?

ক্রুদের দেহ ছাড়া কার্গো হোল্ডে আর কিছু পাইনি।

কিন্তু মেসেজে আপনি জানিয়েছেন, জাহাজটা প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

হ্যাঁ, তা সত্যি। কিছু কিছু মেরামতের কাজ শেষ করতে পারলে, বৈঠা ঠেলে ওটাকে নিউ ইয়র্ক বন্দরে নিয়ে যেতে পারবেন।

ড. গ্রোনকুইস্ট কি ওটার সময়কাল নির্ধারণ করতে পেরেছেন?

মুদ্রাগুলো তিনশো নব্বই খ্রিস্টাব্দের। এমনকি জাহাজটার নামও জানি আমরা। সেরাপিস, স্টার্নপোস্টে গ্রিক ভাষায় খোদাই করা আছে।

সম্পূর্ণ সংরক্ষিত চতুর্থ শতাব্দীর বাইজেন্টাইন বাণিজ্য জাহাজ, বিড়বিড় করে বললেন ড. রেডফার্ন। যুগান্তকারী আবিষ্কার। হ্যাঁ, ছুঁয়ে দেখার জন্য হাত দুটো নিশপিশ করছে আমার।

অফিসার্স ওয়ার্ডরুমে চলে এল ওরা। টেবিলে বসে মোম ট্যাবলেটে পাওয়া অক্ষরগুলো একটা কাগজে কপি করছে লিলি শার্প। ওদের পরিচয় করিয়ে দিল পিট। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল লিলি, হাতটা বাড়িয়ে দিল ড. রেডফানের দিকে। বলল, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে সম্মানিত বোধ করছি, ড. রেডফার্ন। আমি মাটিতে কাজ করলেও, পানির নিচে আপনার কৃতিত্ব সম্পর্কে সব খবরই আমার জানা আছে, আমি আসলে আপনার একজন ভক্ত।

সম্মানটুকু আমার, বললেন ডক্টর।

ডক্টর, কী খেতে ইচ্ছে করেন? পিট জানতে চায়।

এক গ্যালন গরম চকোলেট আর পাঁচ কেজি স্যুপ হলেই চলবে।

হেসে ফেলে স্টুয়ার্ডকে ডাকল লিলি।

আমরা একটা ধাঁধায় পড়েছি, ড. রেডফার্নকে বলল পিট। আপনার ল্যাটিন কেমন?

চালিয়ে নিই। কিন্তু আপনি বললেন, জাহাজটা গ্রিক।

গ্রিকই, পিটের বদলে জবাব দিল লিলি। তবে ক্যাপটেন মোম ট্যাবলেটে তাঁর লগ লিখেছেন ল্যাটিনে। ছয়টা ট্যাবলেটে অক্ষর পেয়েছি। সাত নম্বরটায় একটা ম্যাপ। জাহাজের ভেতর প্রথমবার ঢুকে এগুলো উদ্ধার করেছে পিট। অক্ষরগুলো কাগজে টুকেছি আমি।

একটা চেয়ারে বসে একটা মোম ট্যাবলেট তুলে নিলেন ড. রেডফার্ন। নেড়েচেড়ে দেখে রেখে দিলেন। তারপর চোখ বুলালেন লিলির লেখা কাগজটায়।

গরম চকোলেট আর অ্যাপ দিয়ে গেল স্টুয়ার্ড। অনুবাদ করায় এতই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ড. রেডফার্ন, যে তার আর খিদে থাকল না। যন্ত্রচালিত রোবটের মতো কাপটা মুখে তুললেন, চোখ স্থির হয়ে আছে হাতে লেখা কাগজটার ওপর। দশ মিনিট পর নিঃশব্দে চেয়ার ছাড়লেন তিনি, পায়চারি শুরু করলেন, বিড়বিড় করে ল্যাটিন শব্দ আওড়াচ্ছেন, বিস্মৃত দর্শকদের উপস্থিতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই যেন নেই।

চুপচাপ বসে থাকল পিট আর লিলি। এক চুল নড়ল না কেউ, শুধু চোখ দুটো অনুসরণ করল ড. রেডফার্নকে। টেবিলে ফিরে এসে কাঁপা হাতে কাগজগুলো আবার পরীক্ষা করলেন ড. রেডফার্ন। প্রত্যাশায় আর উত্তেজনায় টান টান হয়ে উঠল পরিবেশ। আরও প্রায় পাঁচ মিনিট পর কাগজগুলো টেবিলে রেখে ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে তাকালেন ড. রেডফার্ন, তার চোখে আচ্ছন্ন দৃষ্টি।

কী ব্যাপার, ড. রেডফার্নং জিজ্ঞেস করল পিট।

কী? রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল লিলি। কী পেয়েছেন আপনি?

ড. রেডফার্নের গলা কোনো রকমে শুনতে পেল ওরা। মাথা নিচু করলেন তিনি, ফিসফিস করে বললেন, সম্ভব। হ্যাঁ, সম্ভব। আপনারা সম্ভবত দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য আর শিল্পকর্মের সংগ্রহ আবিষ্কার করেছেন।

.

২১.

আরেকটু খুলে বলবেন, প্লিজ? শুকনো গলায় তাগাদা দিল পিট।

বারকয়েক ঘন ঘন নেড়ে মাথাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করলেন ড. রেডফার্ন। গল্পটা…গল্প না বলে রূপকথা বললেই যেন বেশি মানায়। গোটা ব্যাপারটা এমনই অবিশ্বাস্য আর অদ্ভুত অথচ বাস্তব সত্য যে আমার ঠিক হজম হচ্ছে না।

লিলি জানতে চাইল, ট্যাবলেটগুলো কী বলছে, গ্রিক-রোমান একটা জাহাজ বাড়ির পানি ছেড়ে এত দূর কেন চলে এল?

গ্রিক-রোমান নয়, বাইজেন্টাইন, রেডফার্ন সংশোধন করলেন। সেরাপিস যখন নোঙর তুলে রওনা হয়, তার আগেই সাম্রাজ্যের সিংহাসন কনস্ট্যানটাইন দ্য গ্রেটের দ্বারা রোম থেকে বসফরাসে স্থানান্তর করা হয়ে গেছে-বসফরাস, এক সময় যেখানে বাইজেন্টিয়াম শহর দাঁড়িয়ে ছিল।

পরে যেটা কনস্টানটিনোপল হয়, বলল পিট।

তারপর ইস্তাম্বুল, লিলির দিকে ফিরে বললেন ড. রেডফার্ন। সরাসরি উত্তর দিচ্ছি না বলে দুঃখিত। তবে হ্যাঁ, ট্যাবলেটগুলো বলছে বটে কেন ও কীভাবে জাহাজটা এদিকে আসে। পুরোটা কাহিনী ব্যাখ্যা করতে হলে আগে আমাদের মঞ্চটা সাজাতে হবে, সেই মঞ্চে যে নাটকটা আমরা দেখব তার সূচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব তিনশো তেইশ সাল, যে বছর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ব্যাবিলনে মারা গেলেন। তার সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিলেন জেনারেলরা। তাদের একজন, টলেমি, সাম্রাজ্য থেকে। কেটে নিলেন মিসরকে হলেন রাজা। তিনি আলেকজান্ডারের লাশও দখল করতে সমর্থ হলেন, সোনা আর স্কটিক দিয়ে তৈরি কফিনে মুড়ে রাখলেন সেটা। পরে লাশটা তিনি একটা মন্দির তৈরি করে সমাধিস্থ করলেন, মন্দিরের চারদিকে গড়ে তুললেন আশ্চর্য সুন্দর একটা শহর, যে সৌন্দর্য এথেন্সকেও হার মানিয়ে দিল। টলেমি শহরটা নাম রাখলেন আলেকজান্দ্রিয়া।

কিন্তু এসবের সাথে সেরাপিসের কী সম্পর্ক? অবাক হয়ে জানতে চাইল লিলি।

প্লিজ, আমাকে শেষ করতে দিন, আবেদনের সুরে বললেন ড. রেডফার্ন। ছিটেফোঁটা সংগ্রহ থেকে বিশাল একটা মিউজিয়াম আর লাইব্রেরি গড়ে তুললেন টলেমি। সংগ্রহের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে উঠল। তার উত্তরসূরিরা, ক্লিওপেট্রাসহ বাকি সবাই, এই মিউজিয়াম আর লাইব্রেরিতে নিজেদের সংগ্রহ জমা করেছেন। মিউজিয়ামটা হয়ে উঠল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগ্রহশালা। শুধু শিল্পকর্ম নয়, তৎকালীন ও অতীত যুগের বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, কারিগরি বিদ্যা ইত্যাদির সমস্ত নিদর্শন এই লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামে ঠাই পেল। জ্ঞানের এই বিশাল ভাণ্ডার কিন্তু মাত্র তিনশো একানব্বই খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টিকল।

সে বছর, সম্রাট থিয়োডাসিয়াস ও আলেকজান্দ্রিয়ার গির্জাপতি থিয়োডোসিয়াস সিদ্ধান্ত নিলেন, সদ্য প্রবর্তিত খ্রিস্টান নীতি ও আদর্শের সাথে মেলে না এমন সমস্ত শিল্পকর্ম সাহিত্য পৌত্তলিকতা দোষে দুষ্ট বলে মনে করতে হবে এবং তা অবশ্যই ধ্বংস করে ফেলতে হবে। লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামে ছিল পাথর ও ধাতব মূর্তি, মার্বেল ও ব্রোঞ্জের তৈরি শিল্পকর্ম, সোনা আর আইভরির তৈরি খেলনা, অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যের সাথে তৈরি পেইন্টিং, ভেড়ার চামড়া বা প্যাপিরাস কাগজে লেখা অসংখ্য বই, বহু জ্ঞানী গুণীর সংরক্ষিত লাশ, এমনকি সম্রাট আলেকজান্ডারের লাশও ছিল-ঠিক হলো, সব ধ্বংস করে ফেলা হবে। হয় ভেঙেচুরে ধুলোর সাথে মিলিয়ে ফেলা হবে নয়তো পুড়িয়ে ছাই করা হবে।

ঠিক কী ধরনের হবে সংখ্যায়?

শুধু বই ছিল কয়েক লাখ।

হতাশায় মাথা নাড়ল লিলি। কী ভয়ানক ক্ষতি!

শুধু বাইবেল আর চার্চের যাবতীয় লেখা বাদ দিয়ে, বলে চললেন ড. রেডফার্ন, লাইব্রেরি আর মিউজিয়ামের বাকি সব সংগ্রহ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়।

কয়েকশো বছর ধরে সংগ্রহ করা অসংখ্য মূল্যবান মাস্টারপিস হারিয়ে গেল!

হারিয়ে গেল, সায় দিলেন ড. রেডফার্ন। এতকাল পর্যন্ত ঐতিহাসিকরা সেই বিশ্বাসই পোষণ করে এসেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে যা পড়লাম তা যদি সত্যি হয়, সংগ্রহের সার অংশটুকু হারিয়ে যায়নি। সেসব কোথাও লুকানো আছে।

লিলি হতভম্ব।

আজও সেগুলোর অস্তিত্ব আছে? তার মানে কি পুড়িয়ে ফেলার আগে সেরাপিসে তুলে পাচার করা হয়েছিল?

মোম ট্যাবলেটে সে-কথাই লেখা আছে।

সন্দেহ প্রকাশ করল পিট, সেরাপিস ছোট্ট জাহাজ, সংগ্রহের কতটুকুই বা আনতে পারে। আপনি যে বিপুল সংখ্যার কথা বলছেন…।

প্রাচীন জাহাজ সম্পর্কে আপনার দেখছি ভালোই ধারণা আছে, পিটের দিকে সমীহের দৃষ্টিতে তাকালেন ড. রেডফার্ন।

আচ্ছা, তার আগে জানা যাক, গ্রিনল্যান্ডে কী করতে এল সেরাপিস।

লিলির কপি করা একটা কাগজ তুলে নিলেন ড. রেডফার্ন। চতুর্থ শতাব্দীর ল্যাটিন, আক্ষরিক অনুবাদ করতে গেলে আপনাদের বিরক্তি বাড়ানো হবে, বড় বেশি আড়ষ্ট আর আনুষ্ঠানিক। সহজ ইংরেজিতে ভাষান্তর করার চেষ্টা করছি। প্রথম এন্ট্রি জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তেসরা এপ্রিল, তিনশো একানব্বই খ্রিস্টাব্দ।

আমি, কুকিয়াস রাফিনাস, সেরাপিসের ক্যাপটেন, গ্রিক জাহাজ ব্যবসায়ী নিসিয়াস এর কর্মচারী, আলেকজান্দ্রিয়ার জুলিয়াস ভেনাটরের কার্গো পরিবহনে সম্মত হয়েছি। আলোচ্য সমুদ্র অভিযানটি দীর্ঘ এবং বিপদসংকুল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং ভেনাটর আমাদের গন্তব্য সম্পর্কে মুখ খুলতে রাজি নয়। আমার মেয়ে, হাইপেশিয়া, এই অভিযানে আমার সঙ্গিনী হচ্ছে, তার মা দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণে অত্যন্ত, উদ্বেগের মধ্যে থাকবে। তবে ভেনাটর স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে বিশ গুণ বেশি দিচ্ছে, ফলে নিসিয়াস লাভবান হবার সাথে সাথে আমি এবং আমার ক্রুরাও লাভবান হব।

জাহাজে কার্গো তোলা হলো রাতের অন্ধকারে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। কার্গো তোলার সময় ক্রুসহ আমাকে ডকে থাকার নির্দেশ দেয়া হলো। সেঞ্চুরিয়ান ডোমিটিয়াস সেভেরাসের অধীনে চারজন সৈনিককে জাহাজে পাঠানো হলো, তারাও আমাদের সাথে অভিযানে শামিল হলো।

গোটা ব্যাপারটা আমার একদম পছন্দ হলো না, কিন্তু ভেনাটর ভাড়ার টাকা অগ্রিম দিয়ে ফেলায় চুক্তি বাতিল করা আমার দ্বারা সম্ভব হলো না।

বুদ্ধিমান ও সৎ লোক, বলল পিট। কার্গোটা কী, বুঝতে পারেনি কেন?

সে প্রসঙ্গে পরে লিখেছে সে। পরের কয়েক লাইন অভিযানের লগ। প্রথম বন্দরের থামার পর থেকে পড়ছি আমি।

আমাদের ঈশ্বর সেরাপিসকে ধন্যবাদ। একটানা চৌদ্দ দিন নিরাপদে জাহাজ চালিয়ে কারথাগো নোভায় পৌঁছেছি আমরা, সেখানে আমরা পাঁচ দিন যাত্রাবিরতি করি এবং স্বাভাবিক সময় যে পরিমাণ সাপ্লাই তুলি তার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি তুলেছি জাহাজে। এখানে আমরা ভেনাটরের আর সব জাহাজের সাথে যোগ দিই। সেগুলো বেশিরভাগ এক একটা দুশো টনি, কোনো কোনোটার বহন ক্ষমতা তিনশো টনের ওপর। ভেনাটরের ফ্ল্যাগশিপসহ সংখ্যায় আমরা ষোলোটা জাহাজ হলাম। ঝাঁকের মধ্যে আমাদের সেরাপিস সবচেয়ে ছোট।

এক ঝাক জাহাজ! চেঁটিয়ে উঠল লিলি, চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে তার। তার মানে সংগ্রহগুলো সত্যিই রক্ষা পেয়েছে!

সবটুকু না হলেও, সহাস্যে বললেন ড. রেডফার্ন, একেবারে কমও নয়। ধরুন, দুটো জাহাজে রসদ আর লোকজন ছিল। বাকি চৌদ্দটা জাহাজ মানে দুহাজার আটশো টন, লাইব্রেরির এক-তৃতীয়াংশ বই আর মিউজিয়ামের বেশ বড় একটা অংশে ঠাই হবার জন্য যথেষ্ট।

গ্যালি কাউন্টার থেকে কফি নিয়ে এল পিট। লিলির সামনে একটা কাপ রেখে ডোনাট খেতে খেতে আনমনে শুনতে লাগল।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে ড. রেডফার্ন বললেন, লগের শেষ দিকে কার্গো সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছে রাফিনাস ছোটখাটো মেরামতের কথা লিখেছে, লিখেছে ডক এলাকার গুজব সম্পর্কে, কারথাগো নোভার বর্ণনা দিয়েছে, এখন যেটা স্পেনে, কার্টানো নামে পরিচিত। কিন্তু আশ্চর্য, বন্দর ত্যাগ করার তারিখ সম্পর্কে কিছু লেখেনি সে। আসলে সবার চোখ এড়িয়ে, গোপনে এসব লিখতে হয়েছে তাকে। কী লিখেছে পড়ছি।

আজ আমরা মহাসাগরের দিকে জাহাজ ছাড়লাম। দ্রুতগতি জাহাজগুলো বাকিগুলোকে টেনে নিয়ে চলল। আর লিখতে পারছি না। সৈনিকরা আমার ওপর নজর রাখছে। ভেনাটরেরর কঠোর নির্দেশ, অভিযানের কোনো রেকর্ড রাখা যাবে না।

নিশ্চয়ই আরও কিছু আছে, জেদের সুরে বলল লিলি। আমি জানি, এর পরও কপি করেছি আমি।

লিখেছে, হ্যাঁ, তবে নয় মাস পর, আরেকটা কাগজ তুলে নিয়ে বললেন ড. রেডফার্ন।

ভীতিকর অভিযান সম্পর্কে এখন আমি স্বাধীনভাবে, নির্ভয়ে লিখতে পারি। ভেনাটর আর তার ক্রীতদাস বাহিনী, সেভেরাস আর তার সৈনিকদল, সবগুলো জাহাজের সব কয়জন ক্রু, অসভ্যদের হাতে মারা পড়েছে, আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে জাহাজগুলো। সেরাপিস বিপদ এড়িয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে, কারণ ভেনাটর সম্পর্কে আমার সন্দেহ আমাকে সতর্ক থাকতে সাহায্য করেছিল।

জাহাজগুলোর কার্গো কী জিনিস, কোথা থেকে আনা হয়, পাহাড়ের কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে, এখন আমি সব জানি। এ ধরনের গোপন ব্যাপার মরণশীল মানুষের কাছে গোপন রাখাই শ্রেয় বলে ভেবেছিল ভেনাটর। দেশে ফেরার পথে বিশ্বস্ত কয়েকজন সৈনিক ও একটা জাহাজের কয়েকজন কুকে বাদ দিয়ে ভেনাটর আর সেভেরাস বাকি সবাইকে খুন করবে বলে সন্দেহ করেছিলাম আমি।

আমি আমার মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে উঠি। আমার ক্রুদের সশস্ত্র থাকার নির্দেশ দিই, বলি তারা যেন প্রতিটি মুহূর্তে জাহাজের কাছাকাছি থাকে, যাতে বেঈমানির আভাস পাওয়া মাত্র নোঙর তুলতে পারি। কিন্তু ভেনাটর বেঈমানি করার আগেই অসভ্যরা হামলা করে বসল, কচুকাটা করল ভেনাটরের ক্রীতদাস আর সেভেরাসের সৈনিকদের। আমাদের প্রহরীরাও মারা পড়ল যুদ্ধে, তবে বিপদ ঘটার আগেই দড়িদড়া ছিঁড়ে গভীর পানিতে সেরাপিসকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারলাম আমরা। ছুটে এসে পানিতে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করল ভেনাটর। উদ্ধার পাবার জন্য তার ব্যাকুলতা আমরা লক্ষ করলাম। কিন্তু আমার মেয়ে ও ক্রুদের প্রাণের ওপর ঝুঁকি নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। জাহাজ ঘুরিয়ে তাকে উদ্ধার করার কোনো চেষ্টাই আমরা করলাম না। স্রোতের বিরুদ্ধে কাজটা করতে গেলে সবাইকে নিয়ে আত্মহত্যা করা হতো।

এই পর্যায়ে এসে একটু বিরতি দিলেন ডক্টর রেডফার্ন। এখানে এসে রাফিনাস আচমকা পেছনের ঘটনা বর্ণনা শুরু করেছে, সেই কার্টাজেনা বন্দর থেকে।

এর পেছন থেকে আমাদের গন্তব্য সেই অদ্ভুত জগতে পৌঁছতে আটান্ন দিন লাগল। পিঠে বাতাসের ধাক্কাসহ আবহাওয়া ছিল অনুকূল। আমাদের ভাগ্যকে এই সহায়তাদানের বিনিময়ে দেবতা সেরাপিস উৎসর্গ দাবি করলেন। অচেনা রোগে মারা গেল আমাদের দু’জন ক্রু।

নির্ঘাত স্কার্ভি, বলল লিলি।

স্পেনীয়দের দীর্ঘ যাত্রার আগে স্কার্ভির প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি। অন্য যেকোনো রোগ হওয়া বিচিত্র না, জানাল পিট।

বাধা দেওয়ার জন্য দুঃখিত। প্লিজ, পড়ে যান, লিলি ক্ষমা প্রার্থনা করে।

প্রথমে আমরা বড় একটা দ্বীপে পা ফেললাম, সেখানকার অসভ্যরা সেদিয়ানদের মতো দেখতে, তবে গায়ের রং আরও অনেক কালো। তারা আমাদের সাথে বন্ধুর মতো ব্যবহার করল, সাহায্য করল জাহাজ মেরামতের কাজে, রসদ সংগ্রহেও সহযোগিতা কর।

আরও দ্বীপ দেখলাম আমরা। তবে ফ্ল্যাগশিপ থামল না। একমাত্র ভেনাটর জানে জাহাজগুলো কোথায় যাচ্ছে। অবশেষে আমরা নমানবশূন্য একটা সৈকত দেখতে পেলাম, জাহাজ নিয়ে পৌঁছলাম একটা নদীর চওড়া মুখে। আমাদের অনুকূলে বাতাস বইবে, এই অপেক্ষায় পাঁচ দিন পাঁচ রাত অপেক্ষা করলাম আমরা। তারপর পাল তুলে নদী বরাবর এগোলাম, মাঝেমধ্যে বৈঠা চালালাম, যতক্ষণ না পৌঁছলাম রোমের পাহাড়ে।

রোমের পাহাড়! অন্যমনস্কভাবে বিড়বিড় করল লিলি। ধাঁধা মনে হচ্ছে।

আসলে বোধ হয় রোমের পাহাড়ের সাথে তুলনা করেছে রাফিনাস, ধারণা করল পিট।

কঠিন ধাঁধা, স্বীকার করলেন ড. রেডফার্ন।

ওভারশিয়ার ল্যাটিনিয়াস মাসেরের অধীনস্থ ক্রীতদাসরা নদীর ওপর পাহাড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করল। আটমাস পর জাহাজগুলো থেকে লুকানোর জায়গায় বয়ে নিয়ে যাওয়া হলো কার্গো।

লুকানোর জায়গার বর্ণনা দিয়েছে? জিজ্ঞেস করল পিট।

একটা কপি তুলে নিয়ে মোম ট্যাবলেটের লেখার সাথে মেলালেন ড. রেডফার্ন। একজোড়া শব্দ অস্পষ্ট। আন্দাজ করে নিয়ে পড়তে হবে।

এভাবে গোপন জিনিসের গোপনীয়তা ক্রীতদাসদের তৈরি করা সুড়ঙ্গের ভেতর সুরক্ষিত করা হলো। বেড়া থাকায় জায়গাটা দেখতে পাওয়া যায় না। কার্গোর প্রতিটি জিনিস পাহাড়ের ভেতর ঢোকানোর পর অসভ্য হামলাকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। সময়মতো সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল কি না আমি বলতে পারব না। সৈকত থেকে ঠেলে আমার জাহাজটাকে পানিতে নামানোর কাজে ব্যস্ত ছিলাম আমরা।

দূরত্ব জানাতে ব্যর্থ হয়েছে রাফিনাস, বলল পিট। দিকনির্দেশও দেয়নি। কে জানে অসভ্যরা পাহাড় খুঁড়ে সংগ্রহগুলো নষ্ট করেছে কি না।

এত হতাশ হয়ো না তো! ধমকের সুরে বলল লিলি। ভেনাটর নিশ্চয়ই সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করেছিলেন। এই বিপুল সংগ্রহ এমনভাবে হারিয়ে যেতে পারে না যেন সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অন্তত কিছু কিছু নিশ্চয়ই উদ্ধার করা যাবে।

জায়গাটা কোথায়, নির্ভর করছে তার ওপর, বলল পিট। সেরাপিস টাইপের জাহাজ, আটান্ন দিনে চার হাজার নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিতে পারে।

যদি সোজা একটা রেখা ধরে এগোয়, বললেন ড. রেডফার্ন। কিন্তু রাফিনাস জানায়নি তারা তীর ঘেঁষে গিয়েছিল কি না। শুধু লিখেছে আটান্ন দিন পর প্রথ একটা দ্বীপে পা ফেলে। তবে আমার ধারণা, সম্ভাব্য একটা জায়গা হতে পারে পশ্চিম আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূল। ফিফথ সেঞ্চুরি বি. সি-তে একদল ফিনিশিয়ান ক্রু ঘড়ির কাটা ঘোরার আদলে আফ্রিকাকে চক্কর দিয়ে এসেছিল। রাফিনাসের সময়ে এলাকাটার বেশির ভাগই চার্ট করা হয়ে গেছে। স্ট্রেইটস অভ জিব্রালটার পেরোবার পর ভেনাটর তার জাহাজগুলোকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে যায়, এটাই যেন যুক্তিসংগত বলে মনে হয়।

কিন্তু রাফিনাস দ্বীপের কথা বলছে, মনে করিয়ে দিল পিট।

মদেইরা হতে পারে, হতে পারে ক্যানারি বা কেপ ভার্দ দ্বীপপুঞ্জ।

চিড়ে ভিজছে না, হেসে উঠে বলল পিট। আফ্রিকার ডগা থেকে অর্ধেক দুনিয়া। ঘুরে সেরাপিস গ্রিনল্যান্ডে চলে এল, এর কী ব্যাখ্যা দেবে? তুমি আট হাজার মাইল দূরত্বে কথা বলছ।

মি. পিট ঠিক বলছেন, নিজের ভুল ধরতে পারলেন ড. রেডফার্ন।

তাহলে উত্তরের পথ ধরেছিল ওরা, বলল লিলি। দ্বীপগুলো হতে পারে শেটল্যান্ড বা ফারো। তাই যদি হয়, যে পাহাড়টার কথা বলা হয়েছে সেটা নরওয়ের উপকূলে বা আইসল্যান্ডে কোথাও থাকতে পারে।

আমি তোমাকে চ্যালেঞ্জ করছি না, বলল পিট। এ থেকে হয়তো ওদের গ্রিনল্যান্ডে আটকা পড়ার একটা ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসবে।

এরপর কী বলছে রাফিনাস, অসভ্যদের হাত থেকে বাঁচার পর কী ঘটল? চকোলেটের কাপে চুমুক দিলেন ড. রেডফার্ন। পড়ি।

.

খোলা সাগরে পৌঁছলাম আমরা। জাহাজ চালানো কঠিন হয়ে উঠল। নক্ষত্রগুলোকে অচেনা অবস্থানে দেখতে পেলাম আমরা। সূর্যও তার প্রকৃতি বদলেছে। দক্ষিণ দিকে ধেয়ে এল ভীষণ ঝড়। দশ দিনের দিন একজন কু পানির তোড়ে ভেসে গেল। আগের মতোই উত্তর দিকে চলেছি আমরা। একত্রিশ দিন পর আমাদের দেবতা পথ দেখিয়ে নিরাপদ একটা বে-তে নিয়ে এল আমাদের। এখানে আমরা মেরামতের কাজ সারলাম। তীর থেকে যতটুকু যা রসদ পাওয়া যায় ভোলা হলো। জাহাজে আমরা কিছু পাথর তুললাম, অতিরিক্ত ব্যালাস্ট হিসেবে। সৈকত থেকে খানিকটা সামনে খর্বকায় পাইনগাছের বন দেখলাম। লাঠির সামান্য খোঁচা দিতেই বালি থেকে মিষ্টি পানি বেরোল।

ছদিন নির্বিঘ্ন জাহাজ চালাবার পর আবার একটা ঝড় আঘাত হানল। আমাদের পাল ছিঁড়ে গেল। ভেঙে গেল মাস্তুল। ভেসে গেল দাঁড়। নির্দয় বাতাসের ধাক্কায় অনেকগুলো দিন অসহায়ের মতো ভেসে চললাম আমরা। দিনের হিসাব হারিয়ে ফেললাম। ঘুমানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচণ্ড শীত অনুভব করছি, এমন আবহাওয়ার কথা কেউ আমরা কখনও শুনিনি। ডেকের ওপর বরফ জমে যাচ্ছে। জাহাজ স্থির রাখা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ঠাণ্ডায় কাতর ও ক্লান্ত ক্রুদের নির্দেশ দিলাম, পানি আর মদের জারগুলো জাহাজ থেকে ফেলে দাও।

এই জারগুলোই তুমি পেয়েছে সমুদ্রের তলে, রেডফার্ন পিটের উদ্দেশ্যে বললেন। সেই দীর্ঘ বে-তে ঢোকার কিছু সময় পর সৈকতে জাহাজ ভেড়াতে সমর্থ হলাম আমরা, তারপর দুদিন দুরাত মড়ার মতো ঘুমালাম।

দেবতা সেরাপিস নিষ্ঠুর হলেন। শীত এসে গেল, বরফে আটকা পড়ল জাহাজ! সাহসে বুক বেঁধে গ্রীষ্মের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকল না। বে-র ওপারে অসভ্যদের গ্রাম, তারা আমাদের সাথে বিনিময় বাণিজ্যে রাজি হলো। আমরা খাবার সংগ্রহ করলাম। তারা আমাদের স্বর্ণমুদ্রা তুচ্ছ গহনা হিসেবে ব্যবহার করল, ওগুলোর আসল মূল্য সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাদের কাছ থেকে শিখলাম দৈত্যাকার কটা মাছের তেল পুড়িয়ে কীভাবে গরম থাকতে হয়। আমাদের সবার পেট ভরা, আশা করি এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারব।

সময় পেলেই প্রতিদিন কিছু কিছু লিখছি। আজ আমি স্মরণ করব সেরাপিসের হোল্ড থেকে ভেনাটর কী ধরনের কার্গো তার ক্রীতদাসদের দিয়ে বের করেছিল। গ্যালি থেকে লুকিয়ে সব আমি দেখেছিলাম। জিনিসটা ছিল প্রকাণ্ড, সেটাকে বের করার সাথে সাথে সবাই হাঁটু গেড়ে সম্মান প্রদর্শন করে।

কী বোঝাতে চেয়েছে রাফিনাস? প্রশ্ন করল লিলি।

ধৈর্য ধরুন, বললেন ড. রেডফার্ন। শুনুন।

তিনশো বিশটা তামার টিউব, জিওলজিকাল চার্ট লিখে চিহ্নিত করা। তেষট্টিটা পর্দা। সোনা আর কাঁচ দিয়ে তৈরি কফিনের সাথে ছিল ওগুলো। কফিনটা আলেকজান্ডারের। আমার হাঁটু কাঁপতে লাগল। আমি তার মুখ দেখতে পেলাম…

খতম, আর কিছু লেখেনি রাফিনাস, বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন ড. রেডফার্ন। এমনকি বাক্যটিও শেষ করেনি সে। শেষ মোম ট্যাবলেটে একটা নকশার সাহায্যে দেখানো হয়েছে তীর আর সৈকতের সাধারণ আকৃতি আর নদীর গতিবিধি।

আলেকজান্ডার দি গ্রেটের নিখোঁজ কফিন, ফিসফিস করে বলল লিলি। তাহলে কি আজও তিনি কোনো এক পাহাড়ের ভেতর সুড়ঙ্গে শুয়ে আছেন?

আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির মাঝখানে? প্রশ্নটা যোগ করলেন ড. রেডফার্ন। আশা করতে দোষ কী!

পিটের প্রতিক্রিয়া অন্য রকম হলো। চেহারায় দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল, আশা জিনিসটা শুধু দর্শকদের জন্য। আমরা ধারণা, চেষ্টা করলে ত্রিশ দিনের মধ্যে লাইব্রেরিটা খুঁজে বের করা সম্ভব,..না, বিশ দিনের মধ্যেই পারা যাবে।

ড. রেডফার্ন আর লিলির চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। পিট যেন রাজনৈতিক নেতা, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে দ্রব্যমূল্য কমাবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ওরা কেউ তার কথা বিশ্বাসই করল না।

পিট বলল, অমন হা করে তাকিয়ে থেকো না এটাকে একটা কাজ হিসেবে দেখলে অসম্ভবের কিছু নেই। দেখি তো নকশাটা।

মোম ট্যাবলেট দেখে নকশাটা বড় করে এঁকেছে লিলি, তার আঁকাটাই পিটের হাতে ধরিয়ে দিলেন ড. রেডফার্ন। তেমন কিছু নেই ওতে, আঁকাবাঁকা কয়েকটা রেখা ছাড়া। এ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে বলে মনে করি না, বললেন তিনি।

নকশাটা দেখে মুখ তুলল পিট। এই-ই যথেষ্ট, দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলল ও। এটাই আমাদের সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।

.

ভোর চারটের সময় পিটের ঘুম ভাঙানো হলো।

ঘুমজড়িত চোখে পিট বুঝল, কেউ একজন আলো জ্বেলেছে ওর কক্ষের।

দুঃখিত, বাছা, তোমাকে এখনই ঘুম ভেঙে ছুটতে হচ্ছে।

হাসলেন কমান্ডার নাইট।

কেন?

ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে। এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে উড়তে হবে তোমাকে।

কেন?

কেন বলেনি, ওরা হলো গে পেন্টাগন, সিআইএ- কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়।

উঠে বসে, খাটের পাশে পা ঝুলিয়ে বসল পিট। আমি আরো ভাবলাম, এখানে থেকে একটু জাহাজ উত্তোলনের ব্যাপারটা দেখব।

ভাগ্য খারাপ- তুমি, অ্যাল আর ডক্টর শার্পকে এখনই চলে যেতে হচ্ছে।

লিলি? উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙে পিট। সোভিয়েত সাবমেরিনের কারণে আমাকে আর অ্যালকে দরকার, বুঝলাম। কিন্তু লিলিকে দিয়ে ওদের কী দরকার?

এই বিষয়ে আমিও তোমার মতো অজ্ঞ।

যাওয়ার কী ব্যবস্থা?

রেডফার্ন যেমন করে এলেন। হেলিকপ্টারে করে এস্কিমো গ্রাম, আবহাওয়া স্টেশন। নেভি বিমানে করে আইসল্যান্ড, এরপর এয়ারফোর্সের বি ৫২ বোমারু বিমানে করে ওয়াশিংটন।

টুথ ব্রাশ দিয়ে মাথায় টোকা দিল পিট। একটা বুদ্ধি এসেছে। ওদের জানান, অর্ধেক পথ নুমার হেলিকপ্টার দিয়ে পাড়ি দিয়ে থিউল এয়ারফোর্স বেজে দেখা করব আমরা। সরকারি জেট বিমান ছাড়া ওখান থেকে আমি যাব না।

লাভ নেই, পিট।

হতাশার ভঙ্গি করে হাত উঁচায় পিট। কেন যেন আমার প্রতিভার উপযুক্ত মর্যাদা পেলাম না কখনো!

.

২২.

সারাটা পথ শুধু আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির কথা ভেবেছে পিট। ভেবেছে সেরাপিসের বরফে পরিণত ক্রুদের কথা। স্কিপার রাফিনাস, তার মেয়ে হাইপেশিয়া। অন্ধকার হোন্ডের অন্ধকার কোণে হাইপাতিয়া আর তার সঙ্গী কুকুরটাকে দেখতে পায়নি পিট, তবে ভিডিও ক্যামেরায় ঠিকই ধরা পড়েছিল। লম্বা চুলো এক কুকুরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট এক মেয়ে।

হাইপেশিয়াকে হয়তো শেষ পর্যন্ত একটা মিউজিয়ামে ঠাই পেতে হবে, যুগ যুগ ধরে কৌতূহলী মানুষ দেখতে তাকে। তারপর পিট নকশাটার কথা ভেবেছে। মোমের গায়ে আঁকা, আবহাওয়ার কারণে সেটা বিকৃত অবস্থায় পেয়ে থাকতে পারে ওরা। ড. রেডফার্ন আর লিলির সন্দেহই হয়তো ঠিক, আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির সন্ধান কোনো দিন না-ও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মনের বল আগের মতোই অটুট আছে ওর। চেষ্টা করে দেখবে ও। খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানের ভাণ্ডার। রীতিমতো একটা চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে পিট। প্রতিদ্বন্দ্বী সময় আর প্রকৃতি।

এন্ড্রু এয়ারফোর্স বেসে নামল প্লেন। ওদের জন্য একটা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে একজন ড্রাইভার।

প্ল্যানটা কী হে? ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে জানতে চাইল পিট।

অ্যাডমিরাল স্যানডেকারের ক্লাবে তার সাথে ডিনার।

অ্যাডমিরালটা আবার কে? লিলি জানতে চায়।

নুমায় আমাদের বস, জিওর্দিনো বলল। নির্ঘাত সাবাশি দেওয়ার জন্য ডাকছেন। যা কাজ দেখালাম এবার!

জর্জটাউনের একটা আবাসিক এলাকায় যখন ঢুকল গাড়ি, ততক্ষণে অন্ধকার ঘনিয়েছে। পাঁচ ব্লক পেরিয়ে লাল ইটের ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের একটা বাড়ির খোয়া বিছানো উঠানে থামল ড্রাইভার।

সিল্ক স্যুট পরিহিত একজন ছোট্ট মানুষ এগিয়ে এলেন ওদের দিকে। রাজকীয় হাবভাব চলাফেরায়, মাথাভর্তি গাঢ় লাল চুল।

বাছারা, তোমাদের দেখে ভালো লাগছে, গর্জে উঠে ঘোষণা করলেন অ্যাডমিরাল জেমস স্যানডেকার।

লিলির সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিল পিট।

বসো, সবাই বসো, লিলির সাথে করমর্দন শেষ করে বললেন অ্যাডমিরাল।

আপনারা কথা বলুন, আমি একটু লেডিস রুম থেকে তাজা হয়ে আসি।

ডান দিকে প্রথম দরজাটা, হাত ইশরায় দেখিয়ে দিলেন অ্যাডমিরাল।

লিলি অদৃশ্য হবার সাথে সাথে পিট আর জিওর্দিনোকে নিয়ে ছোট্ট রুমটায় বসে, দরজা আটকে দিলেন।

তোমরা রাশিয়ার সাবমেরিনটা আবিষ্কার করে দারুণ কাজ দেখিয়েছে, সাধুবাদ জানাই। নেভির সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে কিছুক্ষণের মধ্যে রওনা হব আমি। প্রেসিডেন্ট নিজে তোমাদের ধন্যবাদ জানাতে বলেছেন।

রাশান সাবমেরিনের উদ্ধারকাজ শুরু করব কবে থেকে?

আমাদের কর্তৃপক্ষ চাইছেন ওটা নিয়ে তাড়াহুড়ো না করতে, অ্যাডমিরাল জানালেন।

কতদিন অপেক্ষা করতে চাইছেন তারা?

হয়তো, এক বছর। ওটা নয়, তোমাদের দু’জনের জন্য ভালো একটা কাজ পেয়েছি আমি।

সোভিয়েত নেভির মারণাস্ত্র থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি হতে পারে? চিন্তাপূর্ণ স্বরে বলল পিট।

এই ধরো একটা স্কি হলিডে! আগামীকাল সকালে একটা বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ডেনভার রওনা হচ্ছে তোমরা, ড. শার্প থাকবে সাথে।

পিটের দিকে চাইল জিওর্দিনো, কাঁধ ঝাঁকিয়ে পিট জানতে চাইল, পুরস্কার না নির্বাসন?

ধরে নাও, ওয়ার্কিং হলিডে। বাকি ব্যাপারস্যাপার সিনেটর পিট বুঝিয়ে বলবেন।

বাবা?

এই সন্ধ্যায় তোমাকে বাড়িতে আশা করছেন উনি। পকেট থেকে সোনার ঘড়ি বের করে সময় দেখলেন অ্যাডমিরাল। একজন ভদ্রমহিলাকে অপেক্ষায় রাখা ঠিক হচ্ছে না।

দরজার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন জেমস স্যানডেকার। কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পিট আর অ্যাল।

কথা পেটে রেখে লাভ হবে না, অ্যাডমিরাল। পুরোটা না শুনে এক পাও নড়ছি না আমি, ঘোষণার সুরে বলল পিট। অ্যাল জিওর্দিনো সায় দেয়।

আসল কথা হলো, পিট, জেমস স্যানডেকার ভ্রু উঁচালেন। রাশিয়ান সাবমেরিন নয়, তোমার আগ্রহ আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি নিয়ে। নয় কি?

আপনার ধারণা নির্ভুল, পিট বলে। আমি চেয়েছিলাম সেরাপিসের লগ বইয়ে চোখ বোলাতে। এখন দেখছি, কেউ আমাকে হারিয়ে দিয়েছে।

কমান্ডার নাইট। ড. রেডফার্নের অনুবাদ নেভি হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়েছেন তিনি, সেখান থেকে জানানো হয়েছে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সিকে। তারপর প্রেসিডেন্টকে। জাদুর বাক্স খুঁজে বের করেছো তুমি। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির রাজনৈতিক ভুমিকা কম নয়। তোমার বাবা, সিনেটর পিট, সব ব্যাখ্যা করবেন।

এখানে লিলি এল কোথা থেকে?

তোমাদের ছদ্মবেশের একটা অনুষঙ্গ হিসেবে। কেজিবি সন্দেহ করছে, হয়তো সাবমেরিনটা পাওয়া গেছে। মার্টিন ব্রোগান চাইছে, তোমাদের সাথে একজন সত্যিকারের প্রত্নতত্ত্ববিদ রেখে পুরো ব্যাপারটাকে আরো গ্রহণযোগ্য করতে। এজন্যই ক্লাবে দেখা করলাম তোমার সাথে। তোমার বাবা, বাসায় বসে বলবেন। তোমাদের আচরণে কোনো অফিশিয়াল ব্যাপার যেন না থাকে।

বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে।

ব্যুরোক্রেসি বেশ রহস্যময় উপায়ে কাজ করে। চলো, টেবিলে যাই। ক্ষিধেয় পেট ডাকছে।

ডিনার শেষে জেফারসন হোটেলে তুলে দিল ওরা লিলিকে। বিদায় দেয়ার মুহূর্তে আলিঙ্গন করল সে ওদের দু’জনকে, তারপর পোর্টারের পিছু পিছু হোটেলের লবি ধরে এগালো।

লিলির হোটেল থেকে বেরিয়ে নুমা হেডকোয়ার্টারে চলে এল পিট। কম্পিউটার সেকশনটা টপ ফ্লোরে, উঠে এসে এক কামরা থেকে আরেক কামরায় ঘুর ঘুর করতে লাগল। প্রতিটি কামরায় ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট আর কম্পিউটর হার্ডওয়্যার গিজগিজ করছে। পরিচিত অনেকের সাথে দেখা হলো, অন্যমনস্কতার ভান করে সবাইকে এড়িয়ে গেল পিট। তারপর যাকে খুঁজছে পেয়ে গেল তাকে।

কি হে, জাদুকর, দিনকাল কেমন কাটছে?

একটা মিনি টেপ রেকর্ডার নাড়াচাড়া করছিল হিরাম ইয়েজার। ঝট করে মুখ তুলেই হাসল সে। আরে পিট যে! তারপর অবাক হলো সে। তুমি ওয়াশিংটনে! তা কীভাবে সম্ভব!

ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালি নামে এক কম্পিউটর কারখানা থেকে হিরাম ইয়েজারকে ভাগিয়ে এনেছেন স্যানডেকার। আজ নুমার যে ডাটা কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে তা ইয়েজারের একক অবদান বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। দুনিয়ার সমুদ্র নিয়ে যত গবেষণা বা বই লেখা হয়েছে, সেগুলোর সমস্ত তথ্য রয়েছে ইয়েজারের কাছে। বোম টিপে যেকোনো তথ্য মুহূর্তেই সরবরাহ করতে পারে সে।

ওটা নিয়ে কী করছো? জিজ্ঞেস করল পিট।

আছাড় মেরে ভেঙে ফেলব কি না ভাবছি, রাগের সাথে বলল ইয়েজার, ঠকাস করে টেবিলে রেখে দিল রেকর্ডারটা। ইচ্ছে করলে রান্নাঘরের জিনিসপত্র দিয়ে ওরকম একটা তৈরি করতে পারি, কিন্তু মেরামত করতে পারছি না।

গোটা কমপ্লেক্স ভোমার হাতে গড়া, আর বলছ কী যে সামান্য একটা টেপ রেকর্ডার মেরামত করতে পারো না?

কাজটায় আমার মন নেই, স্নান গলায় বলল ইয়েজার। যদি কখনও উৎসাহ পাই, ওটাকে আমি বদলে একটা টকিং ল্যাম্প বানাব।

উৎসাহ পাবে এমন একটা কাজ করতে চাও? প্রসঙ্গটা তুলল পিট।

পিটের দিকে একদৃষ্টে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল ইয়েজার। কী ধরনের কাজ?

রিসার্চ।

টেবিলের দেরাজ খুলে কাগজপত্র হাতড়াতে শুরু করল ইয়েজার। একটা কাগজ তুলে নিয়ে বিড়বিড় করে কী পড়ল বোঝা গেল না। সেরাপিস সম্পর্কে, তাই না? মুখ তুলে প্রশ্ন করল সে।

তুমি জানো?

দুনিয়ার সমস্ত পত্রপত্রিকা ওটা নিয়ে লেখালেখি করছে।

আমার হাতে এটা ড. রেডফার্নের অনুবাদ।

কী করাতে চাও আমাকে দিয়ে?

চাই নকশাটা সাথে নিয়ে ওই কাগজটাই ভালো করে দেখো।

অনুবাদ আর নকশার ফটো কপি পাশাপাশি রেখে ঝুঁকে পড়ল ইয়েজার। তুমি জিওগ্রাফিকাল লোকেশন খুঁজছে?

যদি সন্ধান দিতে পারো।

এতে খুব একটা কিছু নেই, বলল ইয়েজার। কী এটা?

একটা সাগরের তীররেখা আর একটা নদী।

কবে আঁকা হয়েছে?

তিনশো একানব্বই খ্রিস্টাব্দে।

আমাকে বরং আটলান্টিকের রাস্তাগুলোর নাম কী জিজ্ঞেস করতে পারতে।

কেন, তোমার ইলেকট্রনিক খেলনাগুলো দিয়ে জাহাজটার কোর্স বের করাতে পারো না, ভেনাটরের ফ্লিট কার্টাজেনা ত্যাগ করার পর? কিংবা জাহাজটা গ্রিনল্যান্ডে যেখানে অচল হয়ে পড়ল, সেই জায়গা থেকে পেছন দিকের কোর্সটা বের করতে পারো না?

তুমি বুঝতে পারছ, নদীটার অস্তিত্ব আজ আর না-ও থাকতে পারে?

ভেবেছি।

অ্যাডমিরালের অনুমতি লাগবে আমার।

কাল সকালে পেয়ে যাবে।

ঠিক আছে, চেষ্টা করে দেখতে পারি। সময়সীমা?

সাফল্য না আসা পর্যন্ত চেষ্টা করে যাও, বলল পিট। ওয়াশিংটনের বাইরে যেতে হচ্ছে আমাকে, কাল বাদে পরশু খবর নেব কেমন এগোচ্ছে তোমার কাজ।

একটা প্রশ্ন করব?

হ্যাঁ, করো।

ব্যাপারটা কী গুরুত্বপূর্ণ?

সম্ভবত আমি আর তুমি যা ভাবছি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

.

২৩.

ম্যাসাচুসেটসট এভিনিউয়ে খাকি একটা সোয়েটার পরিহিত সিনেটর জর্জ পিট তার মেরিল্যান্ডের বাড়ির দরজা খুললেন। দামি বেশভূষার জন্য ইতোমধ্যে সিনেটে বেশ নাম কিনেছেন তিনি।

ডার্ক! ছেলেকে উষ্ণ আলিঙ্গন করলেন সিনেটর। কত কম আজকাল দেখা হয় আমাদের, ভেবে দেখেছো!

বাপের কাঁধে হাত জড়িয়ে রাখল পিট। বাপ-পেটা মিলে এবারে হেঁটে গেল বাড়ির ভেতরে। মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত উঁচু হয়ে আছে সিনেটরের বইয়ের সংগ্রহ- ভারী ওক কাঠের শেলফে।

ছেলেকে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে ছোট্ট বারের দিকে হেঁটে গেলেন সিনেটর।

বোম্বে জিন-মার্টিনি-তাই না?

জিন খাবার জন্য আবহাওয়াটা একটু বেশি ঠাণ্ডা; তার চেয়ে বরঞ্চ একটা কড়া জ্যাক ডেনিয়েলস দাও।

ঠিক আছে।

মা-র কী খবর?

ক্যালিফোর্নিয়ায় গেছে, তোমার নানির ফার্মে। ওজন কমানোর জন্য হাঁটাহাঁটি করবে নাকি। নিশ্চিত জানি, কাল যখন ফিরবে, দেখব, দুই পাউন্ড ওজন বেড়েছে উল্টো!

মা কখনো হাল ছাড়ে না।

ছেলেকে বুরবন ধরিয়ে দিয়ে নিজের গ্লাস উঁচু করে ধরেন সিনেটর পিট। কলোরাভোয় সফল একটা সফরের কামনায়।

ভ্রু কুঁচকে গেল পিটের। আমাকে কি করতে পাঠানোর চমৎকার পরিকল্পনাটা মূলত কার?

আমার।

জ্যাক ডেনিয়েলস থেকে এক চুমুক দিয়ে কঠোর চোখে বাপের দিকে তাকায় পিট। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির আর্টিফ্যাক্ট নিয়ে তোমার এত মাথাব্যথা কেন?

দারুণ মাথা ব্যাথা, যদি সত্যিই ওগুলোর অস্তিত্ব থাকে।

নাগরিক হিসেবে বলছো, নাকি কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে?

একজন দেশপ্রেমিকের দৃষ্টিকোণ থেকে।

ঠিক আছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিট বলে, বলো তো, ধ্রুপদী শিল্পকর্ম, সাহিত্য-কর্ম, আলেকজান্ডারের কফিন দিয়ে আমেরিকার কী লাভ?

ওগুলোর কোনোটাতেই লাভ নেই, সিনেটর জর্জ পিট বললেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার খনিজ সম্পদের মানচিত্র। ফারাওদের হারিয়ে যাওয়া সোনার খনি, পান্নার খনি, যেটা ক্লিওপেট্রার বলে দাবি করা হয়। গোপন রহস্যে ভরা উপকথার সেই পাট নগরী-রুপো, সুর্মা আর অদ্ভুত সবুজাভ সোনার জন্য বিখ্যাত-দুই তিন হাজার বছর আগে নগরীর অবস্থান জানা থাকলেও আজ মানুষ তার ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছে। তারপর ধরো, অফি-র রাজ্যের কথা। শুধু গুজব নয়, রাজ্যের বিপুল সম্পদ আর মহামূল্যবান দুর্লভ পাথর রেকর্ড করা ঐতিহাসিক সত্য সেটারও অবস্থান নিয়ে নানাজনের নানা মত। কোথায় গেল রাজা সলোমনের খনিগুলো? ব্যাবিলনের নেবুচাঁদনেজার? সাবা-র রানী, শেবার ঐশ্বর্য আর রাজ্য আজ শুধু অতীত স্মৃতি। এককালে এসবের অস্তিত্ব ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের মাটির নিচে আজও সেসব নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও লুকানো আছে।

বুঝলাম, মানচিত্রে খনিজ সম্পদের উল্লেখ আছে। পুরনো দিনের খনি বা সম্পদ যাই পাওয়া যাক, তাতে আমাদের সরকারের কি লাভ?

দরাদরি করার জন্য দরকার আছে, বলে চলেন সিনেটর। যদি ওগুলোর হদিশ আমাদের হাতে থাকে, তো যৌথ উদ্ধার অভিযানের ব্যাপারে আলাপ করা যাবে। বিভিন্ন জাতীয় নেতার সাথে আলাপচারিতার সুযোগ মিলবে।

মাথা নেড়ে যেন ধ্যানে মগ্ন হয় পিট। কংগ্রেস বিভিন্ন দেশের সাথে সুসম্পর্কের জন্য এতকিছু করছে। আমি ঠিক হজম করতে পারছি না। নিশ্চই অন্য কোনো ব্যাপার আছে।

ছেলের অন্তদৃষ্টিতে মনে মনে গর্ব বোধ করলেন সিনেটর। অবশ্যই অন্য ব্যাপার আছে। স্ট্রাটিগ্রাফিক ট্র্যাপ কথাটা শুনেছ কখনও? জানো বিষয়টা কী নিয়ে?

আমারই তো জানা উচিত, মুচকি হাসে পিট। কয়েক বছর আগে কুইবেক প্রদেশে, ল্যাব্রাডোর সাগরের নিচে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম ও রকম একটা।

হ্যাঁ। সম্ভবত ডুডলবার্গ প্রজেক্টে।

আবিষ্কারের অপেক্ষায় ভয়ানক দুর্গম তেল খনি, তাকে বলা হয় স্ট্র্যাটিগ্রাফিক ট্র্যাপ। সাধারণ সাইজমিক এক্সপ্লোরেশনের সাহায্যে ওগুলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ কয়েক জায়গায় আবিষ্কার হওয়ার পর দেখা গেছে প্রতিটি খনিতে বিপুল পরিমাণ তেল রয়েছে।

এখানেই বিটুমিনের কথা এসে যায়। হাইড্রোকার্বনের মতো টার বা অ্যাসফলট, পাঁচ হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় ব্যবহার করা হতো-বাড়িঘরের ছাদে, রাস্তায়, এমনকি ক্ষতস্থানেও। আরও পরে, উত্তর আফ্রিকার উপকূলের কথা লিখে গেছে গ্রিকরা, গোটা উপকূলে তেলের স্রোত বইত। রোমানরা সিনাই-এ একটা জায়গার সন্ধান পায়, নাম ছিল পেট্রল মাউন্টেইন। বাইবেলে দেখোনি, ঈশ্বর জ্যাকবকে নির্দেশ দিয়ে বলছেন, চকমকি পাথরে মুখ দিয়ে তেল চোষো। বাইবেলেই বর্ণনা দেয়া আছে, সিদ্দিম উপত্যকায় আঠালো পদার্থ ভরা বহু গভীর গর্ত আছে, আমরা ধরে নিতে পারি ওগুলো আসলে টার খনি।

এসব এলাকা ইতিমধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি বা ড্রিল-ও করা হয়নি? পিটের প্রশ্ন।

ড্রিল করা হয়েছে, তবে আজ পর্যন্ত তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। জিওলজিস্টরা

দাবি করছে, শুধু ইসরায়েলের মাটিতেই পাঁচশো মিলিয়ন ব্যারেল ক্রুড পেট্রোলিয়াম পাবার শতকরা নব্বই ভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। দুঃখজনক যে পুরনো দিনের সাইটগুলো হারিয়ে গেছে, চাপ পড়ে গেছে কয়েকশো বছরের ভূমিকম্পে।

তো, প্রধান উদ্দেশ্যে ইসরায়েলে তেলের বিশাল খনি আবিষ্কার?

হ্যাঁ, তাই।

চুপচাপ বসে রইল বাপ-বেটা। এক মিনিট কোনো কথা নেই। ইয়েজার তার কম্পিউটারের মাধ্যমে কোনো সূত্র খুঁজে না পেলে এগোনোর কোনো উপায় নেই, পিট ভাবল। শিল্পকর্ম আর সাহিত্য নয়, তেল আর সোনায় ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিদের উৎসাহ, এটা সে বিলক্ষণ বুঝেছে।

বেজে উঠল টেলিফোন। উঠে গিয়ে ফোন ধরলেন সিনেটর। কিছুক্ষণ নীরবে শুনে ফিরে এলেন চেয়ারে।

কলোরাডোতে হারানো লাইব্রেরি খুঁজে পাব বলে মনে করার কোনো কারণ নেই, শুষ্ণ গলায় মন্তব্য করে পিট।

পেলেই বরঞ্চ আমরা সবাই অবাক হব, সিনেটর দমে যাবার পাত্র নন। একজন বিশেষজ্ঞের সাথে তোমার দেখা করার ব্যবস্থা করেছি। কলোরাডো ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসিকাল হিস্ট্রি পড়ান ভদ্রলোক, আমার পরিচিত, বলতে গেলে সারাটা জীবন আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি নিয়ে গবেষণা করছেন। লাইব্রেরিটা খুঁজে বের করার ব্যাপারে তিনি তোমাকে সাহায্য করতে পারবেন। ভদ্রলোকের নাম ডক্টর বেরট্রাম রোথবার্গ।

আমার তার কাছে যেতে হবে কেন? বরঞ্চ তিনি ওয়াশিংটনে এলেই ল্যাঠা চুকে যায়। একগুয়ের মতো বলে পিট।

অ্যাডমিরাল স্যানডেকারের সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার?

হ্যাঁ।

নিশ্চই বুঝতে পারছো, তোমার আর অ্যালের এই মুহূর্তে সোভিয়েত সাবমেরিনের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। এইমাত্র যে ফোনটা পেলাম, সেটা এফবিআই এর একজন এজেন্ট করেছিল, সে একজন কে.জি.বি.এজেন্টকে ফলো করছে। কে.জি.বি. এজেন্ট লোকটা তোমাকে ফলো করছিল।

নিজের জনপ্রিয়তার কথা শুনে ভালোই লাগছে।

সন্দেহজনক কোনো কাজ করবে না তুমি।

মাথা ঝাঁকায় পিট। বেশ, বুঝলাম। কিন্তু যদি রাশিয়ানরা টের পায় আমাদের মিশনের কথা? আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি খুঁজে পেলে ওরাও তো লাভবান হবে?

হতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনা খুবই কম। মোমের টেবলেটগুলো হেফাজতে রেখেছি আমরা।

আরেকটা প্রশ্ন আছে আমার।

বলো।

আমার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, পিট বলে। সেক্ষেত্রে, ডক্টর রোথবার্গের কাছে যাওয়ার সময় যদি কেজিবি অনুসরণ করে আমাকে?

আমরা তো তা-ই চাই।

অর্থাৎ, আমার এই যাত্রা লোক-দেখানো?

ঠিক তাই।

কিন্তু কেন?

তোমার এল-২৯ কর্ড গাড়িটার জন্য।

আমার গাড়ি?

ডেনভারে যে ক্লাসিক গাড়িটা রেখেছো তুমি। যে লোকটা তোমার গাড়িটা ভাড়ায় খাটাচ্ছিল, সে গতকাল ফোন করে জানিয়েছে, কাজ ফুরিয়েছে তার। গাড়ির অবস্থাও টিপটপ।

আচ্ছা। সবার সামনে দিয়ে কলোরাডো ভ্রমণ করব আমি, নিজের অ্যান্টিক গাড়ি দিয়ে দৃষ্টি কাড়ব, স্কি করব বরফের ঢালে, আর পার্টি করব ডক্টর শার্পের সঙ্গে।

ঠিক তাই, জোর দিয়ে বললেন সিনেটর। ব্রেকেনরিজ হোটেলে উঠবে তুমি। ডক্টর রোথবার্গের সাথে কেমন করে দেখা করবে, সেই সম্পর্কিত একটা বার্তা পাবে ওখানে।

বুরবন শেষ করে হাতের গ্লাসটা ম্যান্টলের ওপর নামিয়ে রাখলো পিট। আমাদের পারিবারিক লজটা ব্যবহার করতে পারি?

বরঞ্চ দূরে থাকো ওটা থেকে।

আশ্চর্য, ওটা আমার নিজের বাড়ি!

মোটেও আশ্চর্য নয়, সিনেটর বললেন। সদর দরজা খুলে ঢোকার সাথে সাথে গুলি করা হবে তোমাকে।

.

পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর। নিজের অদ্ভুত বাসস্থান, একটা প্লেন হ্যাঁঙারে রয়েছে পিট। গায়ে রোব জড়িয়ে টিভি দেখছিল। এমন সময় ইন্টারকম বেজে উঠল। অ্যাল জিওর্দিনোর গলা শুনবে মনে করে, স্পিকার অন করল পিট।

কে?

গ্রিনল্যান্ড খাদ্য-পরিবহন, নারী কণ্ঠ উত্তর দেয়।

হেসে, সুইচ টিপে সাইড ডোর খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় পিট।

বড় একটা পিকনিক ঝুড়ি সঙ্গে নিয়ে হেঁটে আসছে লিলি। চারপাশের অ্যান্টিক গাড়িগুলো দেখে থমকে গেছে ও।

অ্যাডমিরাল স্যানডেকার অবশ্য বলেছিল, জায়গাটা অদ্ভুত, এখন দেখছি তিনি কিছুই বলতে পারেননি।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল পিট। পিকনিক ঝুড়িটা নিতে গিয়ে ফেলে দিয়েছিল প্রায়। বাপরে! এত ভারী! ভেতরে কী?

ডিনার।

লিলির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হাসি হাসল পিট। প্রাণবন্ত মুখ, চোখ দুটো উজ্জ্বল। চুলগুলো সমান করে আঁচড়ানো, পিঠ খোলা কালো একটা পোশাক পরনে। গ্রিনল্যান্ডের সেই ভারী কোট না থাকায়, দারুণ ভরাট লাগছে বুক জোড়া। পাতলা কোমড়। লম্বা পায়ে মোহনীয় ভঙ্গিমা।

লিভিং রুমে ঢুকে হাতের ঝুড়ি নামিয়ে রাখলো পিট। হাত ধরল লিলির। পরে খেলে হয় না? নরম স্বরে বলল ও।

ধীরে, দৃষ্টি নিচে নামিয়ে আবার পিটের চোখে চোখ রাখে লিলি। খুব দুর্বল বোধ হতে লাগল তার, যেন পা দুটো ওজন বইতে পারছে না। কেঁপে উঠল।

লজ্জা পাচ্ছে কেন? নিজের কাছেই অবাক লাগছে লিলির। এ সব কিছুই তো ওর পরিকল্পনা করা ওয়াইন, পোশাক, কালো লেস দেয়া ব্রা আর প্যান্টি। তবে?

ধীরে, ওর পোশাকের ফিতে খুলে দেয় পিট। ঝলমলে কালো পোশাকটা লিলির গোড়ালির কাছে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকে। ওর কোমর আর হাঁটুর নিচে হাত রেখে কোলে তুলে নেয় পিট।

শোবার ঘরের দিকে যখন এগোচ্ছে পিট, ওর বুকে মুখ ডুবিয়ে লিলি বলল, নিজেকে আমার ঝকঝকে বেশ্যা মনে হচ্ছে!

যত্ন করে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তাকায় পিট। নিজের ভেতরে কামনার আগুন জ্বলছে।

ভালোই হলো, রুদ্ধ স্বরে ও বলে, দেখি তো, ওদের মতো পারো কি না!

.

২৪.

নিজের ভিলার খাবার ঘরে প্রবেশ করল ইয়াজিদ।

বন্ধুরা, আশা করি খানাটা উপভোগ করেছেন। তার ভারী কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল।

মোহাম্মদ আল-হাকিম, প্রখ্যাত মৌলানা ও ইয়াজিদের ছায়া হিসেবে পরিচিত, চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। আপনার আতিথেয়তার কোনো তুলনা হয় না, জনাব ইয়াজিদ। তবে আমরা আপনার সম্মানজনক উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

পেট ভরা থাকলে আল্লাহ তার ইচ্ছা আমার কাছে প্রকাশ করেন না, ক্ষীণ হাসির সাথে বলল আখমত ইয়াজিদ। পালা করে টেবিল ঘিরে দাঁড়ানো পাঁচজন লোকের দিকে তাকাল সে। তার প্রতি শ্রদ্ধায় আর ভক্তিতে মাথা নত করে আছে সবাই।

তাদের মধ্যে দু’জনের পোশাক একই রকম। কর্নেল নাগিব বশির, সামরিক বাহিনীতে ইয়াজিদের যারা সমর্থক সেই সব অফিসারদের নেতা সে, পরে আছে ভোলা আলখেল্লা, কাপড়ের বাড়তি অংশটুকু দুই কাঁধ থেকে উঠে এসে মুখ ঢেকে রেখেছে। কায়রো থেকে আসার সময় চেহারা গোপন করার দরকার ছিল। তার মাথার সাদা পাগড়িটাও সাহায্য করেছে এ কাজে। মোহাম্মদ আল-হাকিমের পরনেও আলখেল্লা, তার পাগড়িটা সোনালি।

মুসা মোহইদিন পরেছে ট্রাউজার আর স্পোর্টস শার্ট। সে একজন সাংবাদিক ইয়াজিদের প্রধান প্রচারিবদ। খালেদ ফৌজি, জেহাদ আহ্বানকারী কমিটির সামরিক উপদেষ্টা, তার পরনে ব্যাটল ফেটিগ। একা শুধু সুলেমান আজিজের পরনে সাফারি সুট।

আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, কেন আজ আমি হঠাৎ করে জরুরি মিটিং ডেকেছি, টেবিলের মাথায় চেয়ারটা খালি পড়ে ছিল, সেটায় বসল আখমত ইয়াজিদ, তার ইঙ্গিতে বাকি সবাইও আসন গ্রহণ করল। আপনারা তো জানেনই আল্লাহ আমাকে বিশেষ সুনজরে দেখেন। তিনি স্বয়ং আমাকে একটা প্ল্যান দিয়েছেন-একটি মাত্র আঘাতে আমরা অযোগ্য নাদাভ হাসান আর তার দুর্নীতিপরায়ণ মন্ত্রিসভার সদস্যদের উৎখাত করতে পারব। প্লিজ, কফি খেতে শুরু করুন আপনারা।

কেউ কফির কাপে চুমুক দিল, কেউ দিতে যাচ্ছে, এই সময় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আখমত ইয়াজিদ। তার সম্মানে আবার সবাইকে দাঁড়াতে হলো। শান্ত পায়ে হেঁটে একটা দেয়ালের সামনে চলে এল সে। হাত বাড়িয়ে চাপ দিল বোতামে। বড় একটা রঙিন ম্যাপ সিলিং থেকে মেঝের দিকে নেমে এল। চিনতে পারল সুলেমান আজিজ, দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্র-উরুগুয়ের উপকূল শহর পান্টা ডেল এসটে-কে লাল বৃত্ত এঁকে দেখানো হয়েছে। ম্যাপের বাকি অর্ধেকের নিচে টেপ দিয়ে আটকানো একটা আধুনিক প্রমোদতরীর এনলার্জ করা ফটো।

টেবিলে ফিরে এসে আখমত ইয়াজিদ বসল আবার, দেখাদেখি অন্যান্যরাও। প্রত্যশায় ও উত্তেজনায় মনে মনে সবাই অস্থির হলেও, কেউ নল না বা কথা বলল না। সবাই তাকিয়ে আছে ইয়াজিদের দিকে, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত তাদের নেতা কী বলে শোনার আশায় উন্মুখ। ইয়াজিদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে কোনো খাদ নেই। শুধু সুলেমান আজিজ তার মনোভাব গোপন রাখল। তার বাস্তব বুদ্ধি এতই প্রখর যে পবিত্র আধ্যাত্মিক শক্তি, আল্লাহর বিশেষ রহমত ইত্যাদি সে একদমই বিশ্বাস করে না।

আজ থেকে ছয় দিন পর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পান্টা ডেল এসটে শহরে, আবার গমগম করে উঠল ইয়াজিদের কণ্ঠস্বর। ঋণগ্রস্ত দেশগুলো একজোট হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মিসর বাদে, সব ধরনের বকেয়া ঋণ পরিশোধ করতে অস্বীকার করবে তারা। সেই সাথে একটা নিষেধাজ্ঞা জারি করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশ থেকে লভ্যাংশ নিয়ে যেতে বাধা দেবে। ঘোষণা দুটো জারি হলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকশো ব্যাংক রাতারাতি লালবাতি জ্বালবে।

পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধি আর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা বৈঠক করছে আসন্ন সর্বনাশ ঠেকানোর জন্য। তাদেরকে সাহায্য করছে পুঁজিবাদীদের পা-চাটা কয়েকটা কুকুর, তাদের মধ্যে আমাদের প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান একজন। হাসান ঋণগ্রস্ত তৃতীয় বিশ্ব ও মুসলিম দেশগুলোকে বোঝাতে চেষ্টা করছে, আরে ভাই, পাওনা টাকা শোধ না দিলে আল্লাহ নারাজ হবেন-টাকা শোধ দাও, তারপর আবার চড়া সুদে ঋণ নাও। নাদাভ হাসান একজন অন্তর্ঘাতক, তার ষড়যন্ত্র আমরা সফল হতে দিতে পারি না। মিসর পুঁজিবাদী দুনিয়ার দালালি করবে, এ অসহ্য।

আমি বলি কী, অত্যাচারীকে খুন করে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা হোক, আক্রোশে কেঁপে গেল খালেদ ফৌজির গলা। তার বয়স কম, কৌশল জ্ঞানের ভারি অভাব। নবিশ বিপ্লবীদের দ্বারা অসময়ে একটা অভ্যুত্থান ঘটাতে গিয়ে এরই মধ্যে সত্তরজনের প্রাণহানি ঘটিয়েছে সে। তার সদা চঞ্চল দৃষ্টি টেবিলের চারদিকে থেকে ঘুরে এল। হাসানের প্লেন উরুগুয়ের পথে আকাশে ওঠার সাথে সাথে একটা গ্রাউন্ড-টু-এয়ার মিসাইল ছুঁড়ে দিই, খেল খতম!

তাতে শুধু প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ক্ষমতা দখলের সুযোগ করে দেয়া হবে, কারণ দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার তা এখনও শেষ করিনি আমরা, বিরোধিতা করল মুসা মোহাইদিন। সে একজন জনপ্রিয় লেখকও বটে, বয়স পঞ্চান্ন, টেবিলে যারা উপস্থিত তাদের মধ্যে একমাত্র তাকেই শ্রদ্ধা করে সুলেমান আজিজ।

কর্নেল নাগিব বশিরের দিকে তাকাল আখমত ইয়াজিদ। কথাটা কি ঠিক, নাগিব?

মাথা ঝাঁকাল কর্নেল। মুসা ঠিক বলেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হামিদ, জনগণের ম্যান্ডেট গ্রহণের শর্ত দিয়ে আসলে আপনাকে দেরি করিয়ে দিচ্ছে। সে যে উচ্চাভিলাষী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার স্বপ্ন, সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়া।

মুসা মোহাইদিন বলল, আমার কাছে তথ্যও আছে। আবু হামিদের ঘনিষ্ঠ একজন অফিসার গোপনে আমাদের আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, জনসাধারণের সমর্থন পাবার জন্য চমৎকার একটা বুদ্ধি বের করেছে আবু হামিদ। হে’লা কামিলের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাবে সে।

কীভাবে?

হে’লা কামিলের পাণিপ্রার্থী হয়ে, তাকে বিয়ে করে!

ঠোঁট টিপে হাসল আখমত ইয়াজিদ। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বালির দুর্গ গড়তে চাইছে। বিয়ের আসরে হে’লা কামিলকে পাবে না সে।

কথাটা কি নিশ্চয় করে বলা যায়? জিজ্ঞেস করল সুলেমান আজিজ।

হ্যাঁ, যায়, আধবোজা চোখে, মৃদুকণ্ঠে বলল আখমত ইয়াজিদ, তার চেহারায় তৃপ্তির একটা ভাব ফুটে উঠল। আল্লাহ ইচ্ছে করেছেন, কাল সূর্য ওঠার আগেই হে’লা কামিলকে তিনি দুনিয়ার বুক থেকে তুলে নেবেন।

হে শ্রদ্ধেয় নেতা, হে মহা বুজর্গ পীর, দয়া করে সব কথা আমাদেরকে খুলে বলুন! ব্যাকুল কণ্ঠে অনুরোধ জানাল ইয়াজিদের ছায়া অর্থাৎ মৌলানা আল-হাকিম।

ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করল আখমত ইয়াজিদ। বিশ্বস্ত মেক্সিকো সূত্র থেকে জানতে পেরেছে সে, ট্যুরিস্টদের অপ্রত্যাশিত ভিড় হওয়ায় পাল্টা ডেল এসটে-তে অভিজাত কোনো হোটেল খালি নেই। জায়গার অভাবে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে রাজি নয় উরুগুয়ে সরকার, তাই বন্দরে নোঙর করা একটা জাহাজ ভাড়া করেছে তারা। ব্রিটিশ প্রমোদতরী লেডি ফ্ল্যামবরোয় অবস্থান করবে প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান ও তার সহকারীরা। তার সাথে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো ও স্টাফরাও থাকবে জাহাজে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার পর আখমত ইয়াজিদ চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন হবার ভান করল, তারপর থেমে থেমে বলল, পরম করুণাময় আল্লাহ স্বয়ং আমার কাছে এসেছেন। তিনি এসে আমাকে আদেশ করেছেন, আমি যেন জাহাজটা কব্জা করি।

সকল প্রশংসা আল্লাহর! হুঙ্কার ছাড়ল খালেদ ফৌজি।

বাকি সবাই চেহারায় অবিশ্বাস নিয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর তারা, সবাই প্রায় একযোগে, চোখে প্রত্যাশা নিয়ে ইয়াজিদের দিকে তাকাল, তবে কেউ কোনো প্রশ্ন উচ্চারণ করল না।

তোমাদের হাবভাব দেখে বুঝতে পারছি, শিষ্য এবং বন্ধুরা, আমার দিব্যদৃষ্টি সম্পর্কে তোমাদের সন্দেহ আছে।

সন্দেহ নেই বা কোনো কালে ছিল না, বলল মোহাম্মদ আল-হাকিম। কারণ আমরা জানি আপনি সদা সত্য কথা বলেন। তবে আমরা ভাবছি, আল্লাহর নির্দেশ আপনি বুঝতে ভুল করেননি তো?

না, আদেশটা স্পষ্ট ছিল, শুনতে আমার ভুল হয়নি। প্রেসিডেন্ট হাসানসহ জাহাজটাকে অবশ্যই দখল করতে হবে।

কী উদ্দেশ্য? প্রশ্ন করল মৌলানা আল-হাকিম।

দৃশ্যপট থেকে হাসানকে সরিয়ে রাখার জন্য, যাতে সে কায়রোয় ফিরতে না পারে, আর সেই সুযোগে আল্লাহর প্রিয় ইসলামিক ফোর্স ক্ষমতা দখল করবে।

কর্নেল নাগিব বশির বলল, কিন্তু নিশ্চিতভাবে আমি জানি যে নিজে ছাড়া আর কেউ ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করলে আবু হামিদ তার সেনাবাহিনী নিয়ে বাধা দেবে।

মানুষের ঢল আর স্রোতকে ঠেকাবে কীভাবে আবু হামিদ? জিজ্ঞেস করল আখমত ইয়াজিদ্র। নাগরিক অসন্তোষ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ঋণ শোধ করতে হচ্ছে, এই অজুহাতে সব রকম সাবসিডি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে সরকার, ফলে সাধারণ মানুষ সুদখোর ঋণ-দাতাদের ওপর ভয়ানক খেপে আছে। ঋণদাতা সংস্থাগুলোর নিন্দা না করে নিজেদের গলায় ফাঁস পরেছে হাসান আর আবু হামিদ। সবাই জানে, মিসরকে এখন শুধু নির্ভেজাল ইসলামী আইন রক্ষা করতে পারে।

লাফ দিয়ে চেয়ার ছাড়ল খালেদ ফৌজি মুঠো করা হাত তুলল মাথার ওপর, বজ্রকণ্ঠে বলল, আমাকে শুধু হুকুম করুন, হে ইসলামের খেদমতগার! আপনার এক কথায় বিশ লাখ মানুষকে আমি রাস্তায় মিছিল করাব। আপনি শুধু তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিন, হে আল্লাহর পেয়ারা দোস্ত!

সারা মুখে পবিত্র হাসি নিয়ে চুপ করে থাকল আখমত ইয়াজিদ। ধর্মীয় ভাবাবেগে একটু একটু কাঁপছে সে। তারপর সে বলল, জনতা, নেতৃত্ব দেবে। আমি তো গরিবের বন্ধু। জনতা নেতৃত্ব দেবে, আমি তাদের অনুসরণ করব।

আল্লাহ আমার গুনাহ মাফ করুন! প্রায় কেঁদে ফেলল মৌলানা আল-হাকিম। তাঁর নেক বান্দা জনাব আখমত ইয়াজিদকে আমি ভুল বুঝেছিলাম!

তুমি মৌলানা একটা কাপুরুষ! খালেদ ফৌজি চেঁচিয়ে বলল।

মোহাম্মদ আল-হাকিম তোমার চেয়ে জ্ঞানী, শান্তভাবে বলল খালেদ ফৌজি। তিনি জানেন, ঢিল একবার ছোঁড়া হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকে না। আল্লাহর নির্দেশ যখন এসেছে, সেটা নিখুঁতভাবে পালন করতে হলে নানা দিক খতিয়ে চিন্তা করার দরকার আছে।

কর্নেল নাগিব বশির কথা বলল, সন্ত্রাসবাদীদের মতো পাইকারি হত্যাকাণ্ড ঘটালে আমাদের আন্দোলনের জন্য তা মঙ্গল ডেকে আনবে না।

কর্নেল, তুমি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে চাও? সরাসরি প্রশ্ন করল আখমত ইয়াজিদ, চেহারা দেখে মনে হলো ভারি বিস্মিত হয়েছে সে।

সবাই একযোগে কথা বলতে শুরু করল, প্রত্যেকেই নিজের কথা ছাড়া আর কিছু শুনতে আগ্রহী নয়। একা শুধু সুলেমান আজিজ নির্লিপ্ত থাকল। সব কয়টা গাধা, ভাবল সে, সব কয়টা। মুখ ফিরিয়ে ম্যাপের গায়ে সাঁটা প্রমোদতরীর দিকে তাকাল সে। মাথার ভেতর কাজ চলছে।

আমরা শুধু মিসরীয় নই, বলে চলেছে কর্নেল নাগিব বশির, সেই সাথে আমরা আরবও। আমরা যদি আমাদের অফিসারদের পাইকারিভাবে খুন করি, অন্যান্য আরব দেশগুলো আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে। আল্লাহর নির্দেশ ইত্যাদি বলে তাদেরকে বোঝানো যাবে না, ব্যাপারটাকে তারা রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখবে।

মুসা মোহাইদিন ইঙ্গিত মৌলানা আল-হাকিমকে দেখল। মৌলানার কথায় যুক্তি আছে। বিদেশি একজন প্রেসিডেন্টের সামনে হাসানকে খুন করার চেয়ে তাকে বরং দেশের মাটিতে খুন করা হোক।

খুনটা করতে গিয়ে যদি বিদেশি প্রেসিডেন্ট বা তার সহকারীরা মারা পড়ে, সারা দুনিয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে কথা উঠবে, চিন্তিত সুরে বলল মৌলানা আল-হাকিম।

খালেদ ফৌজি চিৎকার করে বলল, আপনারা সবাই আৰু হামিদের দালাল! আমি আবারও বলছি, জাহাজটা আক্রমণ করা হোক, দুনিয়া দেখুক আমরা কতটা শক্তি। রাখি। যদিও মারমুখো তরুণের কথায় কান দিল না কেউ।

আপনি বুঝতে পারছেন না, জনাব ইয়াজিদ? আবেদনের সুরে বলল কর্নেল ইয়াদানী। পান্টা ডেল এসটে-র সিকিউরিটি পেনিট্রেট করা প্রায় অসম্ভব। চারদিকে গিজগিজ করবে উরুগুয়ের পেট্রল বোট। প্রত্যেকটি জাহাজে, যেগুলোয় নেতারা থাকবেন, সশস্ত্র গার্ড থাকবে। আপনি কি সুইসাইড স্কোয়াড পাঠাবার কথা ভাবছেন?

আমি কি ভাবছি না সব যদি তোমাদেরকে জানাতে পারতাম! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল আখমত ইয়াজিদ। আল্লাহর গোপন ইচ্ছে জানার এই হলো বিপদ, মন খুলে সব কথা বলা যায় না। শুধু এইটুকু তোমাদেরকে জানাই, একটা বিশেষ উৎস থেকে সাহায্যের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে আমাকে। সুলেমান আজিজের দিকে ফিরল সে। তুমি, সুলেমান আজিজ, আন্ডারকাভার অপারেশন সম্পর্কে একজন এক্সপার্ট। কারও চোখে ধরা না পড়ে আমাদের সেরা যোদ্ধাদের একটা দলকে যদি লেডি ফ্ল্যামবোরোয় তুলে দেয়া সম্ভব হয়, তারা কি জাহাজটা দখল করতে পারবে, দখল করার পর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, যতক্ষণ না আমরা মিসরকে ইসলামিক রিপাবলিক বলে ঘোষণা করি?

হ্যাঁ, জবাব দিল সুলেমান আজিজ, এখনও তাকিয়ে আছে ম্যাপে সাঁটা লেডি ফ্ল্যামবোয়রীর দিকে। তার গলা শান্ত, তবে বিশ্বাসে দৃঢ়। দরকার হবে দশজন অভিজ্ঞ যোদ্ধা আর পাঁচজন অভিজ্ঞ নাবিক। যদি বিস্ময়ের ধাক্কা দিতে পারা যায়, কোনো রক্তপাত ঘটবে না।

আখমত ইয়াজিদের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। জানতাম! জানতাম, তোমার ওপর ভরসা করা যায়।

অসম্ভব! প্রতিবাদ জানাল কর্নেল নাগিব। সন্দেহ না জাগিয়ে উরুগুয়েতে এতগুলো লোককে তুমি পাচারই করতে পারবে না। আর যদি জাদু দেখিয়ে জাহাজটা তুমি দখল করতেও পারো, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিমা দুনিয়ার অ্যাসল্ট দলগুলো খুঁজে বের করে ফেলবে ওটাকে। জিম্মিদের খুন করার হুমকি দিলেও তারা থামবে না।

এস তাহলে বাজি হয়ে যাক, প্রস্তাব দিল সুলেমান আজিজ। আমি দুসপ্তাহর জন্য গায়ের করে দেব লেডি ফ্ল্যামবোরোকে।

মাথা নাড়ল কর্নেল নাগিব। তুমি স্বপ্নের জগতে বাস করছে।

কী করে সম্ভব, বলবে আমাদের? জিজ্ঞেস করল খালেদ ফৌজি। উরুগুয়ে সরকার যে কড়া সিকিউরিটির ব্যবস্থা করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রহরার দায়িত্ব নেবে উরুগুয়ে সেনাবাহিনীর কমান্ডো ইউনিট। তারা অভিজ্ঞ, তাই না? কীভাবে তুমি তাদের সাথে লড়ে জিততে চাও?

কে বলল আমি লড়তে চাই, লড়ে জিততে চাই? মুচকি হেসে পাল্টা প্রশ্ন করল সুলেমান আজিজ।

একি পাগলামি বলল আখমত, বিব্রত বোধ করছে।

পাগলামি নয়, আশ্বস্ত করল সুলেমান আজিজ। কৌশল জানা থাকলে পানির মতো সহজ।

কৌশল?

অবশ্যই, আবার ঠোঁট টিপে হাসল সুলেমান আজিজ। বুঝতেই পারছেন, আমার প্ল্যান হলো-লেডি ফ্ল্যামবোরোকে, তার ক্রু ও প্যাসেঞ্জারসহ, গায়েব করে দেয়া।

২৫. আনঅফিশিয়াল ভিজিট

২৫.

আমার এটা আনঅফিশিয়াল ভিজিট, হে’লা কামিলকে বললেন জুলিয়াস শিলার, সিনেটর পিটের স্কি লজের সিটিংরুমে ঢুকলেন ওঁরা। সবাই জানে এই মুহূর্তে কী ওয়েস্টে মাছ ধরছি আমি।

বুঝতে পারছি, হে’লা কামিল বললেন। কুক আর সিকিউরিটি গার্ডদের সাথে কত আর কথা বলা যায়, আপনি আসায় আমি খুশি হয়েছি। আইসল্যান্ডে তৈরি খয়েরি রঙের সোয়েটার জ্যাকেট আর ম্যাচ করা প্যান্ট পরে জুলিয়াস শিলারকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন তিনি, জুলিয়াস শিলার যেমন স্মরণ করতে পারেন তার চেয়ে অনেক কম লাগল বয়স।

পরনে বিজনেস স্যুট, তার সাথে পায়ে ছুঁচাল উগার জুতো আর হাতে অ্যাটাচি কেস থাকায়, স্কি রিসর্ট-এ কেমন যে বেমানান লাগছে ভদ্রলোককে। আপনার নিরাপদ সময়টা আরও সহনীয় করার জন্য আমার যদি কিছু করার থাকে, মিস কামিল…

না, ধন্যবাদ। কোনো কাজে হাত দিতে পারছি না, এটাই অস্থির করে তুলেছে আমাকে।

আর তো মাত্র কয়টা দিন।

আপনাকে কিন্তু মোটেও আশা করিনি, দাঁড়িয়ে পড়লেন হে’লা কামিল, সরাসরি তাকালেন শিলারের দিকে।

মিসরের স্বার্থ আছে এমন একটা ব্যাপারে কথা বলতে চাই আপনার সাথে। আমাদের প্রেসিডেন্ট ভাবছেন, সব কথা আপনাকে জানানো দরকার।

ইঙ্গিতে একটা সোফা দেখিয়ে বসলেন হে’লা কামিল। চোখে প্রশ্ন, নির্লিপ্ত চেহারা।

আপনার সহযোগিতা পেলে তিনি ভারি কৃতজ্ঞ বোধ করবেন।

কোন ব্যাপারে?

সোফায় বসে হাঁটুর ওপর রেখে অ্যাটাচি কেসটা খুললেন জুলিয়াস শিলার, ভেতর থেকে একটা ফোল্ডার বের করে বাড়িয়ে দিলেন হে’লা কামিলের দিকে। বেয়ারা চা দিয়ে গেল।

ফোল্ডারের শেষ পাতাটি পড়া শেষ করে মুখ তুললেন হে’লা কামিল। তার চোখে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। এটা কি এখন পাবলিক নিউজ?

মাথা ঝাঁকালেন জুলিয়াস শিলার। আজ বিকেলে ঘোষণা করা হবে যে, জাহাজটা পাওয়া গেছে। তবে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির কথাটা গোপন রাখা হচ্ছে।

জানালা দিয়ে বাইরে, দূরে তাকালেন হে’লা কামিল। ষোলোশো বছর আগে আমাদের লাইব্রেরি হারানো আর আজ আপনাদের ওয়াশিংটন আর্কাইভ ও ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি পুড়িয়ে দেয়া দুটো প্রায় সমর্থক, তাই না?

মাথা ঝাঁকালেন জুলিয়াস শিলার। সমার্থক।

প্রাচীন বইগুলো উদ্ধার পাবার কোনো আশা আছে?

এখনও আমরা জানি না। মোম ট্যাবলেগুলো অস্পষ্ট কিছু সূত্র দিতে পারছে। মাত্র। আইসল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকার মাঝখানে যেকোনো জায়গায় লাইব্রেরিটা থাকতে পারে।

তবে আপনারা খুঁজে দেখতে চাইছেন, বললেন হে’লা কামিল, আগ্রহের সাথে সিধে হয়ে বসলেন তিনি।

হ্যাঁ, একটা দল গঠন করা হয়েছে, কাজও শুরু করেছে তারা।

আর কে জানে?

প্রেসিডেন্ট, আমি, টিমের লোকজন, সরকারি দুচারজন কর্মকর্তা, আমাদের এক কী দু’জন বিশ্বস্ত বন্ধু।

আমাদের প্রেসিডেন্টকে না জানিয়ে আমাকে জানানোর কথা ভাবলেন কেন?

সোফা ছেড়ে কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেন জুলিয়াস শিলার, তারপর হে’লা কামিলের দিকে ফিরলেন। প্রেসিডেন্ট হাসান অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতায় না-ও থাকতে পারেন। তাকে জানানোর চেষ্টা করা হলে তথ্যটা ভুল লোকের হাতে পৌঁছে যেতে পারে।

আখমত ইয়াজিদ।

সত্যি কথা বলতে কি, হ্যাঁ।

কিম্ভ পর হলেও আখমত ইয়াজিদকে তথ্যটা আপনারা জানাবেন। লাইব্রেরির খোঁজ পাওয়া গেলে সেটা মিসরকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানাবে সে। প্রতিটি মিসরবাসীর দাবি হবে সেটা। আমিও তাই চাইব।

ব্যাপারটা আমরা বুঝি, বললেন জুলিয়াস শিলার। সে ব্যাপারে কথা বলার জন্যই আপনার কাছে আমার আসা। আমাদের প্রেসিডেন্ট চান, আপনার ভাষণে আবিষ্কারের কথাটা আপনি ঘোষণা করুন।

কঠোর হলো হে’লা কামিলের দৃষ্টি। তাতে কী লাভ?

আমরা চাইছি আবিষ্কারটা যেন আপানাদের বর্তমান প্রেসিডেন্টের পক্ষে জনমত তৈরিতে সাহায্য করে। মিসরকে কয়েকশো বিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদের নকশা উপহার দিতে পারে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি।

রাগে লালচে হলো হে’লা কামিলের চেহারা। খোঁজ পেতে যেখানে কয়েক বছর লাগতে পারে, সেখানে কি করে আপনারা আশা করেন দেশবাসীকে আমি বলব, দাঁড়াও, তোমাদের সুদিন এসে গেছে, আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির বদৌলতে আমরা ধনী হয়ে গেছ? মি. শিলার, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে অনেক বাজে খেলা খেলেছেন আপনারা, এটাও সে রকম একটা নোংরা খেলা। মিসরবাসীকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আমাকে আপনারা খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, এতটা আশা করে বসে আছেন?

ধীরে ধীরে ফিরে এসে সোফায় আবার বসলেন জুলিয়াস শিলার। কোনো প্রতিবাদ করলেন না।

আপনি ভুল করেছেন, মি, শিলার। আমি আমার সরকারের পতন দেখব, মোস্তাফা ইয়াজিদের পাঠানো খুনিদের হাতে মারা যাবার ঝুঁকি নেব, কিন্তু দেশবাসীকে মিথ্যে তথ্য সরবরাহ করতে পারব না।

মহৎ ভাবাবেগ, শান্তকণ্ঠে বললেন জুলিয়াস শিলার। আপনার নীতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি। তবে, এখনও আমার বিশ্বাস, প্ল্যানটা সব দিক থেকে ভালো।

দেশের কাছে আমি মিথ্যেবাদিনী হয়ে যাব, বুঝতে পারছেন না? শেষ পর্যন্ত যদি লাইব্রেরিটার সন্ধান পাওয়া না যায়? পাওয়া না গেলে আপনারাও দুর্নামের ভাগীদার হবেন। এমনিতেও আপনাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি।

একটা হাত তুলে বাধা দিলেন জুলিয়াস শিলার। হ্যাঁ, কিছু ভুল আমরা করেছি। কিন্তু, মিস কামিল, এখানে আমি আপনার সাথে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে কথা বলতে আসিনি।

দুঃখিত। আপনাকে আমি কোনো সাহায্য করতে পারলাম না।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে জুলিয়াস শিলার বললেন, বেশ। প্রেসিডেন্টকে আপনার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানাব আমি। তিনি যে ভীষণ হতাশ হবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অ্যাটাচি কেস হাতে নিয়ে সোফা ছাড়লেন তিনি, দরজার দিকে পা বাড়ালেন।

দাঁড়ান! তীক্ষ্ণ আদেশের সুরে বললেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

দাঁড়ালেন জুলিয়াস শিলার, ধীরে ধীরে ঘুরলেন। প্লিজ?

সোফা ছেড়ে দাঁড়ালেন হে’লা কামিল, কিন্তু এগিয়ে এলেন না। প্রমাণ করুন, লাইব্রেরির সন্ধান পাবার মতো পজিটিভ সূত্র আপনাদের হাতে আছে, হোয়াইট হাউসের অনুরোধ রক্ষা করব আমি। সূত্রগুলো নির্ভেজাল কি না সেটা আমি নিজে বুঝব।

ভাষণে উল্লেখ করবেন?

হ্যাঁ।

কিন্তু ভাষণের আর মাত্র চারদিন বাকি। এত অল্প সময়ে…

ওটাই আমার শর্ত।

গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকালেন জুলিয়াস শিলার। ঠিক আছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে হন হন। করে এগোলেন তিনি।

.

শিলারের গাড়িটা প্রাইভেট রোড থেকে হাইওয়ে নাইনে বেরিয়ে এল। গাড়ি বা আরোহীকে চিনতে না পারলেও, এই প্রাইভেট রোড ধরে খানিক দূর গেলেই যে সিনেটর পিটের লজ দেখা যাবে তা ভালো করেই জানে মোহাম্মদ ইসমাইল। মার্সিডিটা চলে গেল স্কি শহর ব্রেকেনরিজ-এর দিকে।

মার্সিডিজটা যে সরকারি গাড়ি, বুঝতে পারল মোহাম্মদ ইসমাইল। প্রাইভেট রোডের ওপর সশস্ত্র লোকজন হাঁটাচলা করছে, মাঝেমধ্যে কথা বলছে, রেডিও ট্রান্সমিটারে, রাস্তার মুখেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা ডজ ভ্যান। এসব দেখে মোহাম্মদ ইসমাইলের বুঝতে বাকি থাকল না, ওয়াশিংটন থেকে ইয়াজিদের এজেন্টরা যে তথ্য সংগ্রহ করেছে তা মিথ্যে নয়।

একটা মার্সিডিজ-বেঞ্জ ডিলে সিডানের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মোহাম্মদ ইসমাইল, গাড়ির ভেতর বসা লোকটাকে আড়াল করে রেখেছে সে, চোখে বাইনোকুলার নিয়ে খোলা জানালা দিয়ে প্রাইভেট রোডটার দিকে তাকিয়ে লোকটা। গাড়ির ছাদে একটা ব্ল্যাক, তাতে কয়েক সেট স্কি। মোহাম্মদ ইসমাইলের পরনে সাদা স্কি স্যুট, মুখেও সে একটা স্কি মাস্ক পরেছে। স্কি র‍্যাক অ্যাডজাস্ট করার ছলে আরেক দিকে মুখ ফেরাল সে, জিজ্ঞেস করল, দেখা হলো?

আর এক মিনিট, বলল লোকটা। লজটা দেখছে সে, গাছের ফাঁক দিয়ে কোনো রকমে দেখা যাচ্ছে। লোকটার মুখ ভর্তি দাড়ি, মাথায় ঝাকড়া চুল।

তাড়াতাড়ি করো ঠাণ্ডায় কাপ ধরে যাচ্ছে। কী রকম বুঝছ?

সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচজন গার্ড। তিনজন বাড়ির ভেতর, দু’জন গাড়িতে। মাত্র একজন লোক বাড়িটাকে ঘিরে চক্কর দিয়ে আসছে ত্রিশ মিনিট পরপর। ঠাণ্ডা বলে কেউই বেশিক্ষণ বাইরে থাকছে না। তুষারের ওপর দিয়ে প্রতিবার একই পথ ধরে টহল দিচ্ছে ওরা। টিভি ক্যামেরার কোনো চিহ্ন দেখছি না। তবে, ভ্যানের ভেতর থাকতে পারে একটা, বাড়ির ভেতর নজর রাখছে।

হামলাটা করা হবে দুদিক থেকে, মোহাম্মদ ইসমাইল প্ল্যান দিল। একদল বাড়িটা দখল করবে, দ্বিতীয় দলটা টহল গার্ড আর ভ্যানটাকে সামলাবে-হামলা হবে পেছন থেকে, যেদিক থেকে বিপদের সবচেয়ে কম সম্ভাবনা।

আপনি কি আজ রাতেই হামলা করার চিন্তা করছেন? চোখ থেকে বাইনোকুলার নামিয়ে জিজ্ঞেস করল লোকটা।

না, কাল। সকালে যখন আমেরিকান শুয়োরগুলো নাস্তা খাবে।

কিন্তু দিনের বেলা…বিপদ হতে পারে।

আমরা কাপুরুষ নই যে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে কাজ সারব, রেগে গেল মোহাম্মদ ইসমাইল।

কিন্তু এয়ারপোর্টে ফেরার সময় শহরের মাঝখান দিয়ে যেতে হবে, প্রতিবাদ জানাল লোকটা। ট্রাফিক আর কয়েকশো স্কিয়ার থাকবে রাস্তায়। এ ধরনের অহেতুক ঝুঁকি নিতে রাজি হবেন না সুলেমান আজিজ।

চরকির মতো আধপাক ঘুরে ঠাস করে লোকটার গালে চড় কষাল মোহাম্মদ ইসমাইল। এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছি আমি! চাপা গলায় গর্জে উঠল সে। আমার সামনে ফের যদি তার নাম মুখে এনেছ তো খুন করে ফেলব! তার মাতব্বরি করার দিন শেষ হয়ে গেছে!

লোকটা ভয়ও পেল না, নতও হলো না। তার কালো চোখে ঘৃণা ফুটে উঠল। আপনি আমাদের সবাইকে খুন করবেন! শান্তভাবে বলল সে।

বিনিময়ে যদি হে’লা কামিল খুন হয়, তাতেও আমার আপত্তি নেই! হিস হিস করে বলল মোহাম্মদ ইসমাইল।

.

২৬.

অসাধারণ! পিট বলে।

অভিজাত, সত্যি অভিজাত, বিড়বিড় করে বলে লিলি।

মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় জিওর্দিনো, একটা জিনিস!

দুর্লভ গাড়ির একটা রিস্টোরেশন শপে দাঁড়িয়ে ওরা।

গাড়িটা দর্শনীয় বটে। উনিশশো ত্রিশ সালে তৈরি, এল-টোয়েনটি নাইন কর্ড টাউন করে শোফারের জন্য গাড়ির সামনের অংশটা খোলা। রক্তবর্ণ শরীর, ফেন্ডার হালকা হলুদ, প্যাসেঞ্জার কমপার্টমেন্টের ওপর চামড়ার তৈরি ছাদও তাই। গাড়িটা লম্বা, সুন্দর অভিজত চেহারা ফ্রন্ট হুইল ড্রাইভ। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মিটার লম্বা পিটের কার্ড। প্রায় অর্ধেকটাই হুড দিয়ে ঢাকা, শুরু হয়েছে রেস-কার-টাইপ গ্রিল দিয়ে আর শেষ হয়েছে সরু উইন্ডশিল্ড দিয়ে।

ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে কর্ডে চেপে বসল ওরা তিনজন। পিট ড্রাইভিং সিটে, ছাদের নিচে প্যাসেঞ্জার কমপার্টমেন্টে লিলিকে নিয়ে জিওর্দিনো। ইন্টারস্টেট সেভেনটিতে বেরিয়ে এল অ্যান্টিক কার কর্ড। তুষার ঢাকা রকি পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে ওরা। হুড ফেলে নিজেকে ঢাকল না পিট, মুখে ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটা ভালো লাগছে। আট সিলিন্ডার ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনছে ও, শুনছে এগজস্টের শব্দ। মেরামত করার পর কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। মনটা খুশি হয়ে উঠল ওর। জানে না অদূর ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে ওদের জন্য। জানলে, সোজা গাড়ি ঘুরিয়ে ডেনভারের পথ ধরত।

.

হোটেলে পৌঁছে রিসেপশন থেকে দুটো মেসেজ পেল পিট। পড়ে পকেটে রেখে দিল।

ড. রোথবার্গ তার বাড়িতে ডিনার খাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রাস্তার ওপারেই তার বাড়ি।

কখন? পেটে হাত বুলিয়ে আগ্রহের সাথে জানতে চাইল জিওর্দিনো।

সাড়ে সাতটায়।

হাত ঘড়িতে চোখ বুলালো লিলি। শাওয়ার নিয়ে চুল ঠিক করতে মাত্র চল্লিশ মিনিট সময় পাচ্ছি, আমি বরং কামরায় ঢুকি।

পোর্টারের পিছু নিয়ে লিলি চলে যাবার সাথে সাথে জিওর্দিনোকে সাথে আসার ইঙ্গিত দিয়ে ককটেল লাউঞ্জে চলে এল পিট। বারমেইড অর্ডার নিয়ে সরে যাবার পর পকেট থেকে দ্বিতীয় মেসেজটা বের করে হাত ধরিয়ে দিল।

জিওর্দিনো নিচু গলায় পড়ল, তোমাদের লাইব্রেরি প্রজেক্ট টপ প্রায়োরিটি পেয়ে গেছে। আগামী চার দিনের মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়ার ঠিকানা খুঁজে বের করাটা অত্যন্ত জরুরি। লাক, ড্যাডি। মুখ তুলে পিটের দিকে তাকাল সে। পড়তে ভুল করিনি তো? মাত্র চারদিনের মধ্যে? স্কি করার কথা ভুলে যাও।

ব্যস্ত হয়ে কী লাভ? বলল পিট। ইয়েজারের ভাগ্যে শিকে না ছেঁড়া পর্যন্ত আমাদের কিছু করার নেই। চেয়ার ছাড়াল ও তার একটা খবর নেয়া দরকার।

হোটেলের লবি থেকে ফোন করল পিট। ইয়েজার, পিট বলছি। কতদূর এগোবে?

এগোচ্ছি।

কিছু পেলে?

কয়েকটা কম্পিউটর কাজ করছে, ব্যাংকগুলোর জিওলজিকাল ডাকা, ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে জাঞ্জিবার পর্যন্ত, তন্নতন্ন করে যাচাই করা হচ্ছে। আফ্রিকা উপকূলে এমন কোনো স্পট নেই, যা তোমার নকশার সাথে মেলে। তিনটে অস্পষ্ট বা ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু পরে আমি সেগুলোও বাতিল করে দিয়েছি। ষোলোশো বছরে ল্যান্ডমাস ট্রান্সফরমেশন অবশ্যই ঘটেছে, সম্ভাবনাগুলোর সাথে তার হিসাব ধরলে কোনো মিলই আর পাওয়া যায় না।

তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ?

উত্তর দিকে সার্চ করব। সময় আরও বেশি লাগবে। কারণ ব্রিটিশ দ্বীপগুলো ছাড়াও বাল্টিক সী আর সাইবেরিয়া স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর উপকূল রেখা ধরে কাজ করতে হবে আমাকে।

চার দিনের মধ্যে শেষ করতে পারবে?

তুমি তাগাদা দিলে ভাড়াটে কর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে পারি।

তাগাদা খুব জোরাল বলে ধরে নাও। আর্জেন্ট প্রায়োরিটি।

ঠিক আছে, সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

ব্রেকেনরিজ, কলোরাভোয় রয়েছি আমরা। যদি কিছু পাও, ব্রেকেনরিজ হোটেলে খবর দেবে। ইয়েজারকে রুম আর ফোন নম্বর দিল পিট। ভালো কথা, তোমাকে এত খুশি লাগছে কেন?

নদীটা কোথায় এখনও তা আমি জানি না, জবাব দিল হিরাম ইয়েজার, কিন্তু জানি কোথায় সেটা নেই।

.

হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরোল ওরা, সাদা পাউডারের মতো তুষারে ঢাকা পড়ে গেল জামা-কাপড়। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ২২ বি নম্বরে থাকেন ড. বেরট্রাম রোথবার্গ। দরজা খুলে দিয়ে এমন আন্তরিকতার সাথে ওদেরকে তিনি অভ্যর্থনা জানালেন যেন কত বছরের পরিচয়। সিটিংরুমে, আগুনের চারপাশে বসালেন ওদেরকে। নিজে রান্না করতে শিখিনি, রেস্তোরাঁ থেকে দিয়ে যায়-আজ আটটার সময় দেবে। তার আগে একটু গরম হয়ে না, বাছারা! তিনি নিজেই সবার হাতে হুইস্কির গ্লাস ধরিয়ে দিলেন। পিট নিজেদের পরিচয় দিল না। সন্দেহ নেই, সিনেটর পিট আগেই ওদের সবার বর্ণনা পাঠিয়ে দিয়েছেন।

বাবা বলছিলেন আপনি নাকি সারা জীবন ধরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির ওপর গবেষণা করছেন।

ছোটখাট মানুষটা, মোটা সোয়েটার আর ট্রাউজার পরে আছেন, দাড়ি আর গোঁফে ঢাকা পড়ে আছ ছোট্ট মুখটা। সলজ্জভাবে একটু হাসলেন তিনি। বত্রিশ বছর। ধুলো ঢাকা বুকশেলফ আর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ঘেঁটে শুধু চোখ নষ্ট করেছি, বোধ হয় বিয়ে করে সংসারী হলেই ভালো করতাম। তবে সাবজেক্টটা আমার কাছে রক্ষিতার মতো কখনও কিছু চায় না, শুধু দেয়। আমি যে তার প্রেমে পড়ে গেছি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গলা ছেড়ে হেসে উঠলেন প্রৌঢ় ইতিহাসবেত্তা। তারপর লিলির দিকে ফিরে বললেন, একজন আর্কিওলজিস্ট হিসেবে তুমি আমার অনুভূতি বুঝতে পারবে।

লাইব্রেরিটা সম্পর্কে বলবেন আমাদের, প্লিজ? অনুবোধ জানাল জিওর্দিনো।

ফায়ারপ্লেসের আগুনটা উসকে দিয়ে এলেন ড. রোথবার্গ। প্রাচীন দুনিয়ার একটা বিস্ময় ছিল আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি। গোটা সভ্যতার সমস্ত দলিলপত্র আর নমুনা ওখানে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। আধবোজা চোখে বলে গেলেন তিনি, যেন তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

গ্রিক ঈজিপশিয়ান আর রোমানদের মহৎ শিল্প আর সাহিত্য ইহুদিদের পবিত্র বাণী, প্রাচীন দুনিয়ার সেরা মেধাসম্পন্ন মনীষীদের জ্ঞান আর কীর্তি, দর্শনের বিস্ময়কর তত্ত্ব, সুর আর সঙ্গীতের অপূর্ব সব আবিষ্কার, প্রাচীন বেস্টসেলার, বিজ্ঞান আর মেডিসিনের যুগান্তকারী সব কৃতিত্ব, কী না জমা ছিল লাইব্রেরিটায়!

ওটা কি সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকত?

মুর্খ বা ভিখিরীদের অবশ্যই প্রবেশাধিকার ছিল না, বললেন ড. রোথবার্গ। তবে গবেষক আর পণ্ডিতরা নিয়মিত যেতেন লাইব্রেরিতে-পরীক্ষা, যাচাই, অনুবাদ, সংশোধন করতেন তারা; ক্যাটালগ তৈরি করতেন। শুধু সংগ্রহশালা বললে ভুল হবে, ওটা ছিল দুনিয়ার প্রথম রেফারেন্স লাইব্রেরি। প্রতিটি আইটেম ক্যাটালগে ভোলা ছিল, সুন্দরভাবে সাজানো-গোছানো রাখা হতো।

পরবর্তী সম্রাটরা এবং বহু জাতি আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির ঋণ মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছে। প্রাচীন যুগে আর কোনো প্রতিষ্ঠানে এত জ্ঞান-সম্পদ ছিল না। প্লিনী, প্রখ্যাত রোমান পণ্ডিত, প্রথম খ্রিস্টাব্দে এনসাইক্লোপিডিয়া রচনা করেন। অ্যারিসটোফানেস, খ্রিস্টের জন্মের দুশো বছর আগে লাইব্রেরির প্রধান ছিলেন-তোমরা জানো, তিনিই প্রথম অভিধান রচনা করেন। ক্যালিম্যাচাস গ্রিক ট্র্যাজেডির বিখ্যাত লেখক, সবার আগে রচনা করেন হুজ হু! পণ্ডিত, অঙ্কশাস্ত্রবিদ ইউক্লিড জ্যামিতির ওপর প্রথম টেক্সটবুক লেখেন। সুষ্ঠুভাবে সাজিয়ে ব্যাকরণের নিয়মকানুন প্রথম প্রকাশ করেন। ডাইয়োনাইসিয়াস। আর্ট অব গ্রামার তার একটা মহৎ সৃষ্টি, প্রায় সব ভাষার জন্য ওটা একটা মডেল হয়ে ওঠে। এই সব মনীষীরা, আরও হাজার হাজার পণ্ডিতদের সাথে বসে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে কাজ করেছেন।

আপনি যেন একটা ইউনিভার্সিটির বর্ণনা দিচ্ছেন, মন্তব্য করল পিট।

ইউনিভার্সিটিই তো ছিল সেটা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডার। তখনকার দিনে লাইব্রেরি আর মিউজিয়ামটাকে এক করে বলাও হত তাই-হেলেনিস্টিক দুনিয়ার ইউনিভার্সিটি। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি বিশাল সব কাঠামোর মধ্যে পিকচার গ্যালারি ছিল, মূর্তিগুলোর জন্য ছিল আলাদা হলঘর, কবিতা পাঠের আসর বসত থিয়েটার হলে, পণ্ডিতরা জ্ঞানগর্ভ লেকচার দিতেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে। লাইব্রেরির সাথে ডরমিটরি, ডাইনিং হল, চিড়িয়াখানা আর বোটনিক্যাল গার্ডেনও ছিল। প্রকাণ্ড আকারের দশটা হলঘরে রাখা হতো বই আর পাণ্ডুলিপি। সেগুলোর কয়েক হাজার ছিল হাতে লেখা, হয় প্যাপিরাসে নয়তো পার্চমেন্ট। লেখার পর সেগুলো গুটিয়ে ব্রোঞ্জ টিউবে ঢুকিয়ে রাখা হতো।

দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী? প্রশ্ন করল অ্যাল।

প্যাপিরাস ট্রপিকাল প্লান্ট। মিসরীয়রা ওটার কাণ্ড থেকে লেখার জন্য কাগজের মতো এক ধরনের জিনিস তৈরি করত। পার্চমেন্ট, ভেল্যাম-ও বলা হয়, তৈরি হতো পশুর চামড়া থেকে-হাতি গরু ছাগল বা ভেড়ার বাচ্চার চামড়াই ব্যবহার করা হতো সাধারণত।

এত দিনে ওগুলো নষ্ট হয়ে যাবার কথা নয়? জিজ্ঞেস করল পিট।

প্যাপিরাসের চেয়ে বেশি দিন টেকার কথা পার্চমেন্টের, বললেন ড. রোথবার্গ। পিটের দিকে তাকালেন তিনি। মোলোশো বছর পর ওগুলোর অবস্থা কী হয়েছে নির্ভর করে কোথায় রাখা হয়েছে তার ওপর। মিসরীয় সমাধি থেকে পাওয়া তিন হাজার বছরের পুরনো প্যাপিরাসের লেখাও তো পড়া গেছে।

গরম আর শুকনো আবহাওয়া।

ধরুন, সুইডেন বা রাশিয়ার উত্তর উপকূল কোথাও আছে ওগুলো।

চিন্তিতভাবে মাথা নিচু করলেন ড. নোথবার্গ। শীত ওগুলোকে সংরক্ষণ করবে, কিন্তু গরমের দিনে পচে যেতে পারে।

লাইব্রেরিটাকে অক্ষত খুঁজে পাবার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে বুঝতে পেরে মন খারাপ হয়ে গেল পিটের। কিন্তু লিলি ওর মতো হাতাশ নয়। সে কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি যদি জুনিয়াস ভেনাটর হতেন, ড. রোথবার্গ, কী ধরনের বই আপনি রক্ষা করতে চাইতেন?

কঠিন প্রশ্ন, চোখ পিট পিট করে লিলির দিকে ফিরলেন ড. রোথবার্গ। আমি শুধু আন্দাজ করতে পারি। সোফোক্লিস, ইউরিপেডিস, অ্যারিস্টটল আর প্লেটোর সমগ্র রচনা তো থাকবেই। আরও থাকবে, অবশ্যই, হোমার। তিনি বই লিখেছেন চব্বিশটা, কিন্তু অল্প দুচারটে হাতে পেয়েছি আমরা। আমরা ধারণা, গ্রিক, এট্রাসক্যান, রোমান ও ঈজিপশিয়ান মিলিয়ে পঞ্চাশ হার ভলিউম ইতিহাস অবশ্যই সাথে নিয়েছিলেন ভেনাটর, কারণ জাহাজের সংখ্যা তো আর কম ছিল না। ঈজিপশিয়ান বইগুলো অত্যন্ত মূল্যবান হবে, কারণ ওগুলো শুধু আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে ছিল বলে প্রাচীন মিসরে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে কিছুই আমরা আনতে পারিনি। এট্রাসক্যান সভ্যতা সম্পর্কেও প্রায় কিছুই আমরা জানি না অথচ ক্লডিয়াস তাদেরকে নিয়ে বড়সড় একটা ইতিহাস লিখেছিলেন-সেটাও নিশ্চয়ই লাইব্রেরির কোনো শেলফে আছে। ভেনাটরের জায়গায় আমি হলে হিব্রু আর খ্রিস্টান আইন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে লেখাগুলোও সাথে নিতাম। ওগুলোয় হয়তো এমন সব তথ্য ও উপাদান আছে, যা আজকের খ্রিস্টান ধর্মের পণ্ডিতদের বেকায়দায় ফেলে দিত।

বিজ্ঞান?

বিজ্ঞানের ওপর অসংখ্য বই লেখা হয়েছে সে যুগে। ভেনাটর সেগুলো না নিয়ে পারেন না।

রান্নার বইয়ের কথা ভুলে যাবেন না, লিলি বলে।

হেসে উঠলেন ড. রোথবার্গ। ভেনাটর অত্যন্ত বিবেচক ও বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন, জ্ঞানের কোনো শাখাই তার চোখ এড়িয়ে যায়নি। শুধু রান্নাবান্না কেন, দৈনন্দিন প্রয়োজনের ওপর বা ঘর-গেরস্থালির ওপর লেখা বইও তিনি জাহাজে তুলেছিলেন বলে ধরে নেয়া যায়। সবার জন্যই কিছু না কিছু নিয়েছিলেন তিনি।

বিশেষ করে প্রাচীন জিওলজিকাল ডাটা, বলল পিট।

হ্যাঁ।

আচ্ছা, এ কথা কি জানা গেছে, মানুষটা কেমন ছিলেন তিনি? লিলির প্রশ্ন।

ভেনাটর?

হ্যাঁ।

তার যুগে তিনি সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম ছিলেন। এথেন্সে পণ্ডিত বলে খ্যাতি ছিল তার, সেখানে তিনি শিক্ষকতা করতেন। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামের কিউরেটর হিসেবে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয় তাকে। আমরা জানি, রাজনীতি আর সামাজিক বিষয় নিয়ে একশোর ওপর বই লিখেছেন তিনি, আজ থেকে চার হাজার বছরের পুরনো পটভূমি সন্ধানও সেসব বইতে পাওয়া যায়। কিন্তু তার কোনো বই-ই রক্ষা পায়নি।

তাঁর সম্পর্কে আর কী জানেন আপনি? পিটের প্রশ্ন।

খুব বেশি না। ভেনাটরের অনেক মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যারা পরে বিখ্যাত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন অ্যানটিওক-এর ডায়োক্রেস। ডায়োক্লেস তার একটা রচনায় ভেনাটরের কথা উল্লেখ করেছেন-তার শিক্ষক নতুন কিছু প্রবর্তন বা আবিষ্কারের প্রতি নিবেদিত ছিলেন, এমন সব বিষয়ে গবেষণা চালাতেন তিনি, অন্যান্য পণ্ডিতরা সেসব বিষয়ে গবেষণা করতে ভয় পেতেন। যদিও খ্রিস্টান ছিলেন, তবে ধর্মকে তিনি সমাজবিজ্ঞান হিসেবে দেখতেন। আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ থিয়োফিলোস এর সাথে এই নিয়েই তার বিরোধ দেখা দেয়। ভেনাটরের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগেন থিয়োফিলোস, রায় দিয়ে বসেন লাইব্রেরি আর মিউজিয়াম পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণার ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে। শেষ পর্যন্ত তিনি সম্রাট থিয়োডোসিয়াসকে লাইব্রেরি আর মিউজিয়াম পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে রাজি করান। সম্রাট ছিলেন গোড়া খ্রিস্টান। পোড়ানোর সময় খ্রিস্টান আর অখ্রিস্টানদের মধ্যে তুমুল মারামারি শুরু হয়ে যায়। ধরে নেয়া হয়েছিল, থিয়োফিলোস-এর ফ্যানাটিকাল অনুসারীদের হাতে নিহত হন ভেনাটর।

কিন্তু এখন আমরা জানি সংগ্রহের ভালো একটা অংশ নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, বলল লিলি।

রাস্তার ঝাড়ুদার লটারিতে এক মিলিয়ন ডলার পেলে যেমন খুশি হয়, সিনেটর পিটের মুখে গ্রিনল্যান্ডে তোমরা কী আবিষ্কার করেছ শুনে আমিও ঠিক সে রকম খুশি হয়েছি।

ভেনাটর ওগুলো কোথায় রাখত পারেন, আপনি কোনো ধারণা দিতে পারেন? জিজ্ঞেস করল পিট।

দীর্ঘ এক মিনিট চুপ করে থাকলেন ড. রোথবার্গ। তারপর শান্ত গলায় তিনি বললেন, জুনিয়াস ভেনাটর সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন না। তিনি তার নিজের পথ অনুসরণ করছিলেন। জ্ঞানের পাহাড় ছিল তাঁর হাতে। বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি, অমূল্য সম্পদ ভাবী বংশধরদের জন্য সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি তিনি ব্যবহার করেছেন। ষোলোশো বছর পেরিয়ে যেতে চলল অথচ আজও লাইব্রেরিটার কোনো সন্ধান আমরা পাইনি, এ থেকেই কি প্রমাণ হয় না যে লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি? পরাজয় স্বীকার করার ভঙ্গিতে হাত দুটো মাথার ওপর তুললেন তিনি। আমি কোনো সূত্র দিতে অপরাগ। ভেনাটরের বুদ্ধির নাগাল পাওয়া আমার সাধ্যের অতীত।

কিন্তু আন্দাজ করতে অসুবিধা কী? জিজ্ঞেস করল পিট।

ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে, নৃত্যরত শিখাগুলোর দিকে দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন ড. রোথবার্গ। আমরা ধারণা, ভেনাটর ওগুলো এমন এক জায়গায় রেখেছেন, যেখানে খোঁজার কথা ভাববে না কেউ।

.

২৭.

মোহাম্মদ ইসমাইলের হাতঘড়িতে সাতটা আটান্ন মিনিট। একটা ঝোঁপের আড়ালে শুয়ে, পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে লজটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। দুটো চিমনির একটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। হে’লা কামিল, সে জানে, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠেন, রাঁধতেও জানেন ভালো। তার অনুমানটাই ঠিক, গার্ডদের জন্য ব্রেকফাস্ট তৈরি করছেন তিনি।

মরুর মানুষ, হিম শীতল ঠাণ্ডা তার সহ্য হচ্ছে না। গোড়ালি ব্যথা করছে, হাত পায়ের আঙুল দস্তানার ভেতর অসাড় হয়ে যাচ্ছে। হাটচলা করা সুযোগ থাকলে খুশি হতো সে। ধীরে ধীরে ভয়টা বাড়ছে তার, এভাবে তুষারের ওপর পড়ে থাকলে ক্ষিপ্রতা হারাবে সে। অপারেশনটা ভেস্তে যেতে পারে, কোনো উদ্দেশ্য পূরণ না করেই খুন হয়ে যেতে পারে প্রতিপক্ষের হাতে।

এ সবই আসলে অনভিজ্ঞতার ফল। মিশনের সংকটময় মুহূর্তে অস্থির হয়ে উঠছে সে। হঠাৎ তার সন্দেহ হলো, আমেরিকান গার্ডরা তার উপস্থিতির কথা জেনে ফেলেনি তো? নার্ভাস হয়ে পড়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার বা উপস্থিত বুদ্ধি খাটাবার ক্ষমতা হারাচ্ছে মোহাম্মদ ইসমাইল।

সাতটা উনষাট মিনিট। প্রাইভেট রোডে ঢোকার মুখে চট করে একবার তাকাল সে। ভ্যানটা সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। চার ঘণ্টা পর পর পালা বদল, লজ থেকে ভ্যানে আসে দু’জন, ভ্যান থেকে লজে ফিরে যায় অপর দু’জন। সময় ঘনিয়ে এসেছে, লজ থেকে দু’জন, যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে। লজ থেকে ভ্যানটা একশো মিটার দূরে।

বাড়ির পাশ ঘেঁষে একজন গার্ড টহল দিচ্ছে। বরফের ওপর দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে সে। মোহাম্মদ ইসমাইলের দিকে আসছে লোকটা। নিঃশ্বাস বাস্প হয়ে যাচ্ছে বেরিয়েই। সতর্ক দৃষ্টি বেমানান কিছু দেখার জন্য ছটফট করছে।

চারপাশের বৈচিত্র্যহীন দৃশ্য বা হাড় কাঁপানো শীত সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টকে নিস্তেজ করতে পারেনি। দৃষ্টিপথের প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে এগোচ্ছে সে। ডানে-বায়ে তাকাচ্ছে। আর এক মিনিটও নেই, তুষারের ওপর মোহাম্মদ ইসমাইলের পায়ের দাগ দেখতে পাবে সে।

ভাগ্যকে অভিশাপ দিল মোহাম্মদ ইসমাইল, নড়েচড়ে তুষারের ভেতর আরও সেঁধিয়ে যাবার চেষ্টা করল। ঝোঁপের আড়ালে থাকলে কী হবে, সরু পাতা আর চিকন ডালের ফাঁক দিয়ে অবশ্যই তাকে দেখতে পাবে লোকটা। ওগুলো বুলেটও ঠেকাতে পারবে না।

কাঁটায় কাঁটায় আটটা বাজল। সেই সাথে লজের সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল দু’জন লোক। তাদের মাথায় ক্যাপ, গায়ে স্কি কোট। রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে তারা, শান্তভাবে কথা বলছে, চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে তুষার ঢাকা আশপাশ।

পালাবদলের মুহূর্তে ভ্যানে লোক থাকবে চারজন, ইসমাইলের প্ল্যান ছিল ঠিক তখনই হামলা করবে তারা। হিসেবে ভুল হয়েছে তার, পজিশনে পৌঁছে গেছে সময়ের আগে। প্রাইভেট রোড ধরে পঞ্চাশ মিটারের মতো এগিয়েছে লোক দু’জন, এই সময় টহলরত গার্ড ইসমাইলের পায়ের ছাপ দেখতে পেল।

দাঁড়িয়ে পড়ল সে, ট্রান্সমিটার ধরা হাতটা উঠে গেল ঠোঁটের কাছে। ঠোঁট ফাঁকই হলো শুধু, কোনো আওয়াজ বেরোল না, তার আগেই ইসমাইলের হেকলার অ্যান্ড কোচ এমপি-ফাইভ সাবমেশিন গানের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তার গলা।

অনভিজ্ঞ ইসমাইল অসময়ে অ্যাকশন শুরু করতে বাধ্য হলো। পেশাদার কেউ হলে সাইলেন্সর লাগানো সেমিঅটোমেটিক ব্যবহার করত, গুলি করত মাত্র একটা, সেটা লাগত গার্ডের দুই চোখের ঠিক মাঝখানে। দশ রাউন্ড গুলি করে গার্ডের গলা আর বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছে সে, আরও বিশ রাউন্ডের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সামনের বনভূমিতে। তার সঙ্গীদের একজন ব্যস্ততার সাথে ভ্যান লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ল একের পর এক, আরেকজন ভ্যানের দুপাশে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ল। একটা গ্রেনেড উইন্ডশিল্ড দিয়ে ভেতরে ঢুকল, জোরাল আওয়াজের সাথে বিস্ফোরিত হলো সেটা। সিনেমায় যেমন দেখা যায় তেমন কিছু ঘটলো না, আগুনের কুন্ডলী নিয়ে বিস্ফোরিত হলো না গ্যাস ট্যাংক। ভ্যানের শরীর ফুলে উঠল, ফেটে গেল, যেন পাকা একটা ফল।

আরোহীদের দু’জনেই সাথে সাথে মারা গেছে।

রক্ততৃষ্ণায় অধীরে দুই খুনি, কারও বয়সই বিশের বেশি নয়, বিধ্বস্ত ভ্যানের ওপর বার বার আঘাত হানল, রাস্তার ওপর যে আরও দু’জন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট রয়েছে তাদের কথা ভুলে গেছে। ইতোমধ্যে গাছের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে তারা, কাঁধ থেকে উজি নামিয়ে অব্যর্থ নিশানায় ঘায়েল করল আনাড়ি দুই আতঙ্কবাদীকে। ভ্যানের ভেতর সঙ্গী যারা রয়েছে তাদের আর সাহায্য দরকার নেই, বুঝতে পেরে লজের দিকে দ্রুত পিছু হটতে শুরু করল তারা, একজন ইসমাইলের সাথে গুলি বিনিময় করছে। কাছেপিঠে একটা বড় পাথর পেয়ে তার আড়ালে কাভার নিয়েছে ইসমাইল।

ইসমাইলের প্ল্যানটা মার খেল আরও একটা কারণে। কথা ছিল, গুলির শব্দ হবার সাথে সাথে দশজন আতঙ্কবাদী লজের পেছনের দরজার দিকে ছুটবে। হাঁটু সমান উঁচু, আলগা তুষার বাধা দিল তাদেরকে। অনেক দেরি করে ফেলল তারা, লজের ভেতর থেকে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা ঝাঁক ঝাক গুলি ছুঁড়ে ঠেকিয়ে দিল তাদের।

সন্ত্রাসবাদীদের একজন লজের উত্তর দেয়ালের নিচে অল্প সময়ের জন্য আশ্রয় পেল। গ্রেনেডের পিন খুলে জানালা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল সে। জানালার কাঁচ কতটা পুরু ধারণা করতে পারেনি, ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল গ্রেনেড়। বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হবার আগে আতঙ্কে শুধু চেহারাটা বিকৃত করার সময় পেল সে।

লাফ দিয়ে ধাপ পেরোল এজেন্ট দু’জন, সদর দরজা স্যাৎ করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। বিরামহীন গুলি করছে সন্ত্রাসবাদীরা, একজনের পিঠে একটা বুলেট ঢুকল। পড়ে গেল লোকটা, তার শুধু পা দুটো দোরগোড়ায় দেখা গেল। এক সেকেন্ড পর টেনে ভেতরে ঢোকানো হলো তাকে, দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল দরজা।

অবিরাম গুলিবর্ষণের সব কয়টা জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ল, কিন্তু শক্ত কাঠের দেয়ালগুলোর তেমন কোনো ক্ষতিই হলো না। এজেন্টরা ইসমাইলের আরও দু’জন লোককে ফেলে দিল, তবে বাকি সবাই আড়াল নিয়ে এগিয়ে এল লজের আরও কাছাকাছি। এরপর তারা বিশ্ব মিটার দূর থেকে একের পর এক গ্রেনেড ছুঁড়তে শুরু করল জানালা লক্ষ্য করে।

লজের ভেতর কারও মুখে কথা নেই। একজন এজেন্ট নির্দয় ধাক্কা দিয়ে আনছে সে, ইচ্ছে ফায়ারপ্লেসের মুখটা আড়াল করবে, এই সময় এক ঝাঁক বুলেট ঢুকল ঘরের ভেতর। দেয়ালে পিছলে তিনটে বুলেট ছুটে এল, লোকটার শিরদাঁড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকল একটা, বাকি দুটো হৃৎপিণ্ড ফুটো করল। ডেস্কের আড়ালে বলে কিছুই দেখতে পেলেন না হে’লা কামিল, তবে কাঠের মেঝেতে পতনের শব্দটা তিনি শুনতে পেলেন।

গ্রেনেডগুলো বিপজ্জনক করে তুলল পরিস্থিতি। কাছ থেকে গ্রেনেডের টুকরো রাইফেল বুলেটের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। এজেন্টরা অভিজ্ঞ, নিশানাভেদে অব্যর্থ, কিন্তু এ ধরনের ব্যাপক হামলার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। অ্যামুনিশন শেষ হয়ে এসেছে, হাতে আর মাত্র কয়েকটা ক্লিপ।

ইসমাইল প্রথম গুলি করার সাথে সাথে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া হয়েছে, কিন্তু জরুরি আবেদনটা ডেনভার সিক্রেট সার্ভিস অফিস হয়ে স্থানীয় শেরিফের কাছে পৌঁছতে মাঝখানে অপচয় হয়েছে মূল্যবান কয়েকটা মিনিট।

স্টোররুমে বিস্ফোরিত হলো একটা গ্রেনেড, রং ভর্তি বড় একটা টিনের পাত্রে আগুন ধরে গেল। স্লেব্লোয়ারে ভরার জন্য যে গ্যাস ক্যানটা ছিল, বিস্ফোরিত হলো সেটা। দেখতে দেখতে লজের এক দিকের পুরোটা দেয়ালে আগুন ধরে গেল।

আগুন ভালো করে ছড়াবার সাথে সাথে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। চারদিক থেকে বৃত্তটাকে ছোটো করে আনল সন্ত্রাসবাদীরা। তাদের অটোমেটিক রাইফেল প্রতিটি জানালা আর দরজার দিকে তাক করা। আগুনের পুড়ে মরার ভয়ে লজের বাসিন্দারা বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে, ধৈর্যের সাথে সেই আশায় অপেক্ষা করছে।

এজেন্টদের মাত্র দু’জন এখনও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙাচোরা, উল্টে পড়া ফার্নিচারের সাথে রক্তাক্ত স্তূপের মতো পড়ে আছে বাকি সবাই। আগুনের শিখা সগর্জনে কিচেন হয়ে পেছন দিককার সিঁড়ি লক্ষ্য করে ছুটল, ছড়িয়ে পড়ল ওপরতলার বেডরুমগুলোয়। এরই মধ্যে আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে, ফায়ারব্রিগেড় ছাড়া আর কারও নেভাবার সাধ্য নেই। নিচের তলায় যারা রয়েছে, মৃত্যুর প্রহর গুনছে সবাই। আর বেশিক্ষণ এখানে তারা টিকতে পারবে না।

শহরের দিক থেকে ভেসে আসা সাইরেনের আওয়াজ উপত্যকায় প্রতিধ্বনি তুলল।

এজেন্টদের একজন ফায়ারপ্লেসের সামনে থেকে উল্টে পড়া ডেস্কটা সরাল। হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলেন হে’লা কামিল। এজেন্টের সাথে ক্রল করে নিচু একটা জানালার দিকে এগোলেন তিনি।

লোকাল শেরিফের ডেপুটিরা আসছেন, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল এজেন্ট। সন্ত্রাসবাদীরা ওদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়বে। সেই সুযোগে লজ থেকে বেরোব আমরা। তা না হলে পুড়ে মরতে হবে।

হে’লা কামিল শুধু নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাতে পারলেন। কানেও তিনি ভালো শুনতে পাচ্ছেন না। গ্রেনেডগুলোর বিস্ফোরণ তার কানে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। তবে চেহারায় ভয় বা হতাশার চিহ্ন মাত্র নেই, শুধু চোখ দুটো ভিজে রয়েছে। তাকে রক্ষার জন্য এজেন্টদের অকাতরে প্রাণ দিতে দেখেছেন তিনি, তাদের জন্য প্রার্থনা ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। একটা রুমাল দিয়ে চোখ দুটো চেপে ধরলেন, ধোঁয়ায় ভরে আছে ঘরের ভেতরটা।

বাইরে তুষারের ওপর শুষে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে মোহাম্মদ ইসমাইল। গোটা লজ দেখতে দেখতে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হলো। জানালা দিয়ে ধোঁয়া আর শিখা বেরিয়ে আসছে। কেউ যদি এখনও বেঁচে থাকে, এক্ষুনি বেরিয়ে না এলে পুড়ে মরতে হবে তাকে।

কিন্তু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার সময় নেই, বুঝতে পারল ইসমাইল। লাল আর নীল আলোর ঝলক দেখে টের পেয়ে গেছে সে, পুলিশের গাড়ির হাইওয়েতে পৌঁছে গেছে।

টিমে ছিল বাবোজন, তাকে নিয়ে সাতজন বেঁচে আছে। কেউ আহত হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে, আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স অফিসাররা যেন ইন্টারোগেট করতে না পারে। সাংকেতিক ভাষায় নিজের লোকদের নির্দেশ দিল সে। বৃত্ত ভেঙে পিছিয়ে এল লোকগুলো, তারপর এন্ট্রান্স রোডের দিকে ছুটল।

ডেপুটিদের প্রথম দলটা পৌঁছেই লজে ঢোকার রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করর। একজন রেডিও যোগে রিপোর্ট অপরজন সতর্কতার সাথে জ্বলন্ত লজটার দিকে তাকাল, শক্ত করে ধরে রিভলভারটা ওদের কাজ হলো দেখা রিপোর্ট করা, ব্যাকআপ টিমের জন্য অপেক্ষায় থাকা।

সশস্ত্র ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে কৌশলটা ভালো। কিন্তু অদৃশ্য আতঙ্কবাদীদের একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো কাজে লাগল না, কারণ তারা হঠাৎ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। পাল্টা আঘাতে হানার সুযোগ দেয়া হলো না, তার আগেই ডেপুটি দু’জন গুলি খেয়ে মারা পড়ল।

এজেন্টদের একজন জানালা পথে উঁকি দিয়ে বাইরেটা দেখছে, তার ইঙ্গিতে হে’লা কামিল নিচু জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বাইরের তুষারের ওপর পড়লেন। তিনি দাঁড়াবার আগেই এজেন্টরা লাফ দিল। দু’জন তার দুপাশে পাঁচিল তৈরি করল, তাঁর দুটো হাত ধরে ছুটিয়ে নিয়ে চলল কোনাকুনি পথ ধরে হাইওয়ের দিকে।

মাত্র ত্রিশ পা এগিয়েছে ওরা, ইসমাইলের একজন তোক দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল। ছুটন্ত, পলায়নরত মানুষগুলোর চারদিকে বুলেট-বৃষ্টি শুরু হলো। এজেন্টদের একজন আচমকা মাথার ওপর খাড়া করল হাত দুটো, যেন আকাশটাকে খামচে চাইছে। হোঁচট খেয়ে তিন পা এগোল সে। আছাড় খেল সটান। সাদা তুষার টকটকে লাল হয়ে উঠল।

ওরা চেষ্টা করছে আমরা যেন হাইওয়ের দিকে যেতে না পারি। হাঁপাতে হাঁপাতে, ধমকের সুরে কথা বলছে সে, আমি আপনাকে কাভার দেব, ওদেরকে ঠেকাব। আপনি একা হাইওয়েতে পৌঁছতে চেষ্টা করবেন।

এজেন্টের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলেন হে’লা কামিল, কিন্তু লোকটা তার কাধ ধরে ঘুরিয়ে দিল, তারপর পিঠে হাত রেখে ঠেলে দিল সামনের দিকে। দৌড়ান, ফর গডস সেক, দৌড়ান! আর্তনাদ করে উঠল সে।

কিন্তু এজেন্ট দেখল, এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নিজেদের অজান্তেই হাইওয়েতে পৌঁছানোর জন্য ভুল একটা পথ বেছে নিয়েছে তারা। পথের শেষে, রাস্তার কাছাকাছি, জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটো মার্সিডিজ বেঞ্চ সেডান। উদ্ভ্রান্ত এজেন্ট উপলব্ধি করল, গাড়ি দুটো আতঙ্কবাদীদের। দিশেহারা বোধ করলেও, লোকটা তার কত ভুলল না। সন্ত্রাসবাদীরা হে’লা কামিলকে বাধা দেয়ার জন্য কোনাকুনি একটা পথ ধরে ছুটে আসছে। ওদেরকে সে ঠেকাতে পারবে না, জানে। নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে পারলে দেরি করিয়ে দিতে পারবে। সেই সুযোগে, ভাগ্য যদি সহায়তা করে, হে’লা কামিল রাস্তায় উঠে যেতে পারবেন। ভাগ্য যদি আরেকটু সহায়তা করে, হাইওয়ের কোনো গাড়ি হয়তো তাকে দেখে দাঁড়াতে পারে।

মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আতঙ্কবাদীদের দিকে সরাসরি ছুটল এজেন্ট, উজির ট্রিগারে আঙুল, কামানের গোলার মতো মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অশ্রাব্য খিস্তি।

মুহূর্তের জন্য ইসমাইল আর তার দল থমকে গেল, কারণ তাদের মনে হলো খোদ শয়তান ওদেরকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে। অবিশ্বাস্য দুটো সেকেন্ড পেরিয়ে গেল। তারপর তারা সবাই একেযোগে গুলি ছুড়ল। অকুতোভয় সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট বুলেটের আঘাতে ছিটকে পড়ল তুষারের ওপর। তবে তার আগে তিনজন শত্রুকে ধরাশায়ী করতে পেরেছে সে।

গাড়ি দুটোকে হে’লা কামিলও দেখলেন। আরও দেখলেন, সন্ত্রাসবাদীরা তার দিকে ছুটে আসছে। পেছন থেকে কান ফাটানো গুলিবর্ষণের আওয়াজ পেলেন তিনি। লম্বা পা ফেলে ছুটছেন, হাঁপাচ্ছেন, হোঁচট খেয়ে ছোট একটা গর্তের ভেতর আছাড় খেলেন। জগিং করা অনেক দিনের অভ্যেস, লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে আবার ছুটলেন তিনি। দেখলেন সামনেই কালো অ্যাসফল্ট। ছোটার গতি কমালেন না, যদিও জানেন অবধারিত মৃত্যুকে তিনি শুধু দেরি করাতে পারছেন, এড়াতে পারছেন না। নিশ্চিতভাবে জানেন, দুচার মিনিটের মধ্যে তারও লাশ পড়ে থাকবে।

.

২৮.

ব্রেকেনরিজ থেকে হাইওয়ে ধরে রওনা হলো কর্ড। পুরনো গাড়ি হলে কী হবে, নতুন রং করা হয়েছে, সকালের রোদ লেগে চকমক করছে গা। লিফটের দিকে হেঁটে যাচ্ছে স্কিয়ারা, ষাট বছরের পুরনো গাড়িটাকে দেখে সহাস্যে হাত নাড়ল তারা। ঘেরা অংশে, পেছনের সিটে বসে ঝিমুচ্ছে অ্যাল জিওর্দিনো। লিলি বসেছে। পিটের সাথে বাইরে।

ভোরে ঘুম ভেঙেছে পিটের ইতস্তত একটা ভাব নিয়ে। ব্রেকেনরিজে এসেছে অথচ স্কি করবে না, তা কি হয়? এর আগে যতবার এখানে এসেছে ও, তুষার ঢাকা পাহাড় আর প্রান্তরের ওপর ছোটছুটি করে পাঁচ বা সাতটা করে দিন মহা আনন্দে কাটিয়েছে। এবারের আসাটা অবশ্য কাজ নিয়ে, ড. ফোরম্যানের পরামর্শ দরকার ছিল। তাগাদা দেয়া হয়েছে, দুচারদিনের ভেতরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির হদিশ বের করতে হবে। কিন্তু হিরাম ইয়েজার কোনো সূত্র না দেয়া পর্যন্ত পিটের কিছু করার নেই। করার যখন কিছু নেই, স্কি করার সুযোগটা গ্রহণ করা উচিত নয়?

ঘুম থেকে তুলে প্রস্তাবটা দিতে যা দেরি, লিলি আর জিওর্দিনো লাফিয়ে উঠল। কোনো রকমে শাওয়ার সেরে, নাকেমুখে ব্রেকফাস্ট গুঁজে বেরিয়ে পড়েছে ওরা, যাচ্ছে স্কি সরঞ্জাম ভাড়া করার জন্য পরিচিত একটা দোকানে।

এত সকালে আতশবাজি পোড়ায় কে? হঠাৎ অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল লিলি।

আতশবাজি নয়, বলল পিট, গুলিবর্ষণের তীক্ষ্ণ শব্দ আর গ্রেনেড বিস্ফোরণের ভোঁতা প্রতিধ্বনি আগেই ওর কানে গেছে। মনে হচ্ছে যেন পদাতিকে বাহিনী যুদ্ধে নেমেছে।

আওয়াজটা আসছে ওদিকের জঙ্গল থেকে, একটা হাত তুলে দেখল লিলি। রাস্তার ডান দিক থেকে।

কর্ডের গতি বাড়িয়ে দিল পিট, ডিভাইডার উইন্ডোর গায়ে নক করল। তন্দ্রা ছুটে গেল, সিটের ওপর সিধে হয়ে বসে জানালার কাঁচ সরাল সে। শোনো, বলল পিট।

মুখে ঠাণ্ডা বাতাস লাগায় চোখ কোঁকাল জিওর্দিনো। কানের পেছনে হাত রাখল একটা। ধীরে ধীরে বিস্ময় ফুটে উঠল চেহারায় রাশিয়া ছত্রীসেনা পাঠিয়েছে?

দেখো, দেখো–ওহে, গড! চেঁচিয়ে উঠল লিলি। জঙ্গলে আগুন ধরে গেছে?

গাছপালার মাথার ওপর হঠাৎ ভাসতে দেঘা গেল কালো ধোয়া; ধোয়ার নিচে কমলা রঙের লকলকে শিখা। বড় বেশি ঘন, তাই না, ধোয়াটা? মন্তব্য করল জিওর্দিনো, আমি বলব, গাছপালা নয়, নিরেট কোনো কাঠামোয় আগুন ধরেছে-হয় কোনো বাড়ি, নয়তো দোচালায়।

হ্যাঁ, শান্ত সুরে বলল পিট। কী ঘটছে না বুঝে নামা উচিত হবে না। প্রথমে পাশ কাটিয়ে যাব আমরা। অ্যাল, সামনে চলে এসো। লিলি, পেছনে বসো, মাথা নিচু করে থাকবে।

কেন, আমাকে সামনে বসতে হবে কেন?

তোমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে কাভার দেয়ার জন্য, বলল পিট। তাড়াতাড়ি করো! ধমক লাগল ও। আমি সন্দেহ করছি, গোলাগুলি আর আগুন ধরাবার সাথে সন্ত্রাসবাদীরা জড়িত থাকতে পারে।

সন্ত্রাসবাদী! কী বলছ! পিট, তুমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছ?

পিট জবাব দিল না। তাতেই যা বোঝার বুঝে নিল জিওর্দিনো। লিলিকে পেছনে আসতে সাহায্য করল সে, নিজে সামনে গিয়ে বসল।

প্রাইভেট রোডের মুখ থেকে আধ মাইল দূরে, হাইওয়ের পাশে থেমে আরোহীরা যার যার গাড়ির আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে উঁকি মারছে, কালো ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে অটোমেটিক রাইফেলের আওয়াজ শুনছে। শেরিফের অফিস থেকে এখনও কেউ পৌঁছায়নি দেখে অবাক হলো পিট। তার পরই ওর চোখ পড়ল বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ভ্যানটার ওপর। প্রাইভেট রোডের মুখে একটা বাধা হয়ে রয়েছে ভ্যানটা।

ডান দিকে তাকাল পিট, ধোঁয়া আর আগুন ছাড়িয়ে আরও সামনে কিছু দেখার চেষ্টা করল। এমন সময় হঠাৎ জঙ্গলের কিনারা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা মূর্তি, সরাসরি কর্ডের দিকে ছুটে এল সে।

ব্রেকের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল পিট, ডান দিকে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাল। নব্বই ডিগ্রি বাক নিয়ে রাস্তার ওপর আড়াআড়ি ঘুরে গেল কর্ড। পেভমেন্টের সাথে ঘষা খেল টায়ার। অবধারিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়ে স্থির পাথর হয়ে গেছে মূর্তিটা, ড্রাইভারের কাছ থেকে মাত্র এক মিটার দূরে।

পিটের হার্টবিট বেড়ে গেল। সিট থেকে ঝুঁকে নারীমূর্তির দিকে ভালো করে তাকাল ও, চোখে ফুটে উঠল সমীহ আর অকৃত্রিম বিস্ময়।

আ-আপনি। হে’লা কামিল হাঁপিয়ে উঠলেন। সত্যিই কি আপনি?

মিস কামিল? শূন্য চোখে চেয়ে আছে পিট।

ওহ্, থ্যাঙ্ক গড! ফিসফিস করে বললেন হে’লা কামিল। প্লিজ, সাহায্য করুন আমাকে! সবাইকে ওরা মেরে ফেলেছ! ওরা আ-আমাকে খুন করতে আসছে!

পিট হুইলের পেছন থেকে, আর লিলি প্যাসেঞ্জার কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে পড়ল। পেছনের সিটে উঠতে হে’লা কামিলকে সাহায্য করল ওরা। কারা? জিজ্ঞেস করল পিট।

আখমত ইয়াজিদের ভাড়াটে লোক। সিক্রেট সার্ভিসের সব কয়জন এজেন্টকে মেরে ফেলেছে। গাড়ি ছাড়ন, প্লিজ। এক্ষুনি এসে পড়বে ওরা!

শান্ত হোন, তার একটা হাত ধরে মৃদু চাপ দিল লিলি, এই প্রথম লক্ষ করল মহাসচিবের কাপড়চোপড় ধোয়া লেগে কালো হয়ে আছে, চুল এলোমেলো। আপনাকে আমরা সরাসরি একটা হাসপাতালে নিয়ে যাব।

তাড়াতাড়ি! জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বললেন হে’লা কামিল। দেরি করলে আপনারাও মারা পড়বেন।

হে’লা কামিলের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ফেরাল পিট, আর ঠিক সেই সময় ঝোঁপ-ঝাড় ফুড়ে হাইওয়েতে বেরিয়ে এল মার্সিডিজ দুটো। এর সেকেন্ডের বেশি দেখল না ও, লাফ দিয়ে উঠে পড়ল ড্রাইভিং সিটে। ফার্স্ট গিয়ার দিয়েই মেঝের সাথে চেপে ধরল অ্যাকসিলারেটর, কর্ড ঘোরাল ওর জন্য খোলা একমাত্র দিকটায় ব্রেকেনরিজ-এর ফিরতি পথ ধরে ছুটল গাড়ি।

স্পেয়ার টায়ারের মাথায় একটা আচ্ছাদন রয়েছে, সেটার ওপর বসানো রিয়ার ভিউ মিররে তাকাল পিট। মার্সিডিজ দুটো পিছু নিয়েছে, মাত্র তিনশো মিটার দূরে ওগুলো। পরমুহূর্তে দৃশ্যটা চুরমার হয়ে গেল একঝাঁক বুলেট ছুটে এসে আয়নার কাঁচ গুঁড়িয়ে দেয়ায়।

মেঝের সাথে সেঁটে থাকুন! চিৎকার করল পিট।

পেছনের অংশে ড্রাইভ শ্যাফট না থাকায় মেঝেতে প্রচুর জায়গা, হে’লা কামিলকে নিয়ে সেখানে কুণ্ডলী পাকাল লিলি।

চিন্তা করবেন না, অভয় দিয়ে বলল ও। একবার শহরে পৌঁছতে পারলে আমরা নিরাপদ।

মাথা নাড়লেন হে’লা কামিল। এ যাত্রা আমাদের কেউ বাঁচতে পারবে না। আমরা ফ্যানাটিকাল আতঙ্কবাদীদের পাল্লায় পড়েছি।

সামনের সিটে কুঁকড়ে যতটা সম্ভব ছোট হয়ে গেছে অ্যাল জিওর্দিনো। এটার টপ স্পিড কত? তুমি জানো, এখনও আমি বিয়ে করিনি!

এল-টোয়েনটি নাইনের টপ স্পিড রেকর্ড করা হয়েছে সাতাত্তর, জবাব দিল পিট, ওগুলো কী?

ঝট করে ঘুরল জিওর্দিনো, দরজার ওপর ঝুঁকে উঁকি দিল পেছনে। সামনে থেকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কোনো মডেলেরর মার্সিডিজ, তবে সম্ভবত থ্রি হানড্রেড এস.ডি.এল.।

ডিজেল?

টার্বো চার্জড ডিজেল, ঘণ্টায় দুশো বিশ কিলোমিটার ছুটতে পারে।

দূরত্ব কমছে?

ছারপোকাকে বানর তাড়া করলে দূরত্ব কমে না বাড়ে? ঝাঁঝের সাথে পাল্টা প্রশ্ন করল জিওর্দিনো। শেরিফের অফিস অনেক দূরে থাকতেই ওরা আমাদেরকে ধরে ফেলবে।

পায়ের চাপ দিয়ে মেঝের সাথে সেঁটে ধরল পিট ক্লাচ। গিয়ার বদলে থার্ডে দিল। কোথাও না থেমে নাগালের বাইরে থাকার চেষ্টা করব। থামতে যাচ্ছি দেখলেই এলোপাতাড়ি গুলি করবে ওরা, তাতে বহু নিরীহ মানুষ মারা পড়তে পারে। খুন করা ওদের এক ধরনের নেশা।

আবার একবার পেছন দিকে তাকাল জিওর্দিনো। ওদের চোখের সাদা অংশটুকুও আমি দেখতে পাচ্ছি।

.

হাতের অস্ত্র জ্যাম হতেই ভাগ্যকে গালি দিল মোহাম্মদ ইসমাইল, মার্সিডিজ থেকে হাইওয়ের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল সেটা। পেছনে বসা এক সঙ্গীর হাত থেকে আরেকটা অস্ত্র ছিনিয়ে নিল সে, জানালার দিকে ঝুঁকে এক ঝাঁক গুলি ছুড়ল কর্ড লক্ষ্য করে। মাজল থেকে মাত্র পাঁচটা শেল বেরোল, অ্যামুশিন ক্লিপ খালি হয়ে গেছে। আরেকটা ক্লিপের সন্ধানে পকেট হাতড়াতে শুরু করে আবার গাল দিল সে, ক্লিপটা বের করে স্লটে ঢোকাল।

উত্তেজিত হয়ো না, শান্তভাবে বলল ড্রাইভার। সামনের এক কিলোমিটারের মধ্যেই ওদেরকে ধরে ফেলব। কর্ডের বাঁ দিকে থাকব আমরা, দ্বিতীয় মার্সিডিজ নিয়ে সাদ্দাম থাকবে ডান দিকে। দুদিক থেকে গুলি করে সব কটাকে পাঠিয়ে দেব জাহান্নামে।

মাঝখানে যারা বাদ সেধেছে তাদের আমি নিজের হাতে মারতে চাই! গর্জে উঠল ইসমাইল।

সুযোগ তুমি পারে। ধৈর্য ধরো।

বলা যায়, বায়না ধরা শিশুর মতো, যার আবদার রক্ষা করা হয়নি, হাঁড়িপানা মুখ নিয়ে ধপাস করে সিটের ওপর বসে পড়ল ইসমাইল, চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে থাকল সামনের গাড়িটার দিকে।

মোহাম্মদ ইসমাইল নিকৃষ্টতম খুনিদের একজন। অপরাধবোধের সাথে তার পরিচয় নেই। হাসতে হাসতে একটা মাতৃসদন উড়িয়ে দিতেও তার বাধবে না। প্রথমশ্রেণীর খুনিরা তাদের কাজের ধরন-ধারণ নিয়ে মাথা ঘামায়, কাজটা সারার পর ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে চিন্তা করে, আরও নিখুঁত হবার চেষ্টা করে পরবর্তী কাজটায়। মোহাম্মদ ইসমাইলের কাছে এ সবের কোনো গুরুত্ব নেই। যথেষ্ট সময় আর মেধা খরচ না করায় তার প্ল্যানে স্কুল সব ভুল থেকে যায়, সেজন্য অঘটনও কম ঘটে না। ইতিমধ্যে দুবার দু’জন মানুষকে মারতে গিয়ে তাদের বদলে অন্য দু’জনকে মেরে এসেছে সে। এ ধরনের ঘটনা ইসমাইলের মতো খুনীদের আরও বিপজ্জনক করে তোলে। উত্তেজিত হাঙরের মতো অস্থিরমতি, কখন কী করবে ধারণা করা যায় না, ঘটনাচক্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালে পাইকারি হারে নিরীহ মানুষজনকে খুন করবে। তার প্রেরণার উৎস হলো ধর্ম। তার ধারণা, ধর্মের নামে কাফেরদের খুন করে বিপুল সওয়াব হাসিল করছে সে। খুন করে ভারি মজা পায় মোহাম্মদ ইসমাইল, আরও খুন করা প্রেরণা অনুভব করে, ধরে নেয় আল্লাহ তার প্রতি বিশেষভাবে সন্তুষ্ট বলেই তাকে এত আনন্দ দান করছেন।

গাড়ি আরও জোরে চালাও! ড্রাইভারকে তাগাদা দিল সে। মনে থাকে যেন, সব কয়টার মাথায় গুলি করতে চাই আমি! বেজন্মাদের আমি দেখিয়ে দেব!

.

ওরা বোধ হয় অ্যামুনিশন বাঁচাচ্ছে, কৃতজ্ঞচিত্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল জিওর্দিনো।

আমাদেরকে মাঝখানে রেখে স্যান্ডউইচ তৈরি করতে চাইছি, বলল পিট। যাতে মিস না করে। রাস্তার দিকে চোখ, তবে মাথার ভেতর পালানোর পথ খোঁজার কাজ চলছে দ্রুত।

একটা রকেট লঞ্চার পেলে আমি আমার রাজ্য হারাতেও রাজি আছি।

ভালো কথা মনে করেছ। সকালে গাড়িতে ওঠার সময় কী যেন একটা ঠেকেছিল পায়ে, ঠেলে সিটের তলায় পাঠিয়ে দিই, বলল পিট।

মেঝের দিকে ঝুঁকে পিটের সিটের নিচেটা হাতড়াল জিওর্দিনো। ঠাণ্ডা, শক্ত কী। যেন একটা ঠেকল হাতে। চেহারা ব্যাজার হয়ে উঠল তার। স্রেফ একটা সকেট রেঞ্চ, এ দিয়ে কিছুই হবে না।

সামনে একটা জিপ ট্রেইল, স্কি রান-এর চূড়ায় উঠে গেছে। সাপ্লাই আর ইকুইপমেন্ট নিয়ে দুচারটে গাড়ি মাঝেমধ্যে যায় ওদিকে। জঙ্গল বা নালায় গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ এনে দিতে পারে। হাইওয়েতে থাকলে বাঁচার কোনো আশা নেই।

সামনে কতদূর?

পরবর্তী বাঁকের কছাকাছি।

কিন্তু হাইওয়ে ছাড়লে আমাদের স্পিড আরও কমবে, বলল জিওর্দিনো। ব্যাপারটা ফাঁদ হয়ে উঠবে না তো?

তুমিই বলো।

তৃতীয়বার পেছন দিকে তাকাল জিওর্দিনো। পঁচাত্তর মিটার দূরে ওরা, দূরত্ব প্রতি মুহূর্তে কমছে।

ওদের গতি মন্থর করতে হবে।

তুমি অনুমতি দিলে আমি আমার কুৎসিত চেহারাটা ওদেরকে দেখাতে পারি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতেও আপত্তি নাই, শুকনো গলায় প্রস্তাব রাখল জিওর্দিনো।

তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না, ওরা আরও বরং খেপে উঠবে। না হে, তার চেয়ে এক নম্বর কাজে লাগাও।

ব্রিফিংটা আমি মিস করেছি, ব্যাঙ্গের সুরে বলল জিওর্দিনো।

ছোঁড়াছুড়িতে তোমার হাত কেমন?

বুঝতে পেরে মাথা আঁকাল জিওর্দিনো। বাহনটাকে একটা সরলরেখায় ধরে রাখো, অ্যাল জিওর্দিনো-বম্ব এখন প্রতিপক্ষের ওপর নিক্ষিপ্ত হবে।

খোলা টাউন কার আদর্শ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চমৎকার উতরে গেলে। পেছন দিকে মুখ করে সিটে হাঁটু সাঁটিয়ে সিধে হলো জিওর্দিনো, ছাদের ওপর উঁচু হলো তার কাঁধ আর মাথা। লক্ষ্যস্থির করল সে, হাত তুলল, ছুঁড়ে দিল রেঞ্চটা। ধনুকের মতো বাঁকা একটা পথ তৈরি করে ছুটল হাতিয়ার, সামনের মার্সিডিজটাকে লক্ষ্য করে।

পলকের জন্য থেমে গেল হৃৎপিণ্ড। রেঞ্চ টার্গেটে পৌঁছনোর আগেই বড় বেশি নিচে নেমে যাচ্ছে। টার্গেটে নয়, পড়ল হুডের ওপর। তবে পড়ে ছিটকে গেল, উইন্ডশিল্ডটা নিখুঁতভাবে চুরমার করে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

আতঙ্কবাদী ড্রাইভার জিওর্দিনোকে জিনিসটা ছুঁড়তে দেখেছিল। তার ক্ষিপ্রতা ভালো হলেও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ভালো নয়। ব্রেকে চাপ দিল সে, বন বন করে হুইল ঘোরাল রেঞ্চের পথ থেকে সরে যাবার জন্য, ঠিক তখনই হাজারটা টুকরো হয়ে গেল উইন্ডশিল্ডের কাঁচ, ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে। স্টিয়ারিং হুইলের গায়ে বাড়ি খেয়ে মোহাম্মদ ইসমাইলের কোলের ওপর পড়ল রেঞ্চটা।

দ্বিতীয় মার্সিডিজের ড্রাইভার ইসমাইলের ঠিক পেছনেই ছিল, সে দেখতেই পায়নি বাতাস চিরে একটা মিসাইল ছুটে আসছে। সামনের হেডলাইট হঠাৎ করে লাল হয়ে উঠতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। পেছনে থেকে প্রথম মার্সিডিজকে ধাক্কা দেয়ার সময় অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, দেখল ধাক্কা খেয়ে ঘুরে যাচ্ছে গাড়িটা, চোখের পলকে উল্টো দিকে অর্থাৎ তার দিকে মুখ করল সেটা।

তুমি কি ঠিক এটাই চাইছিলে? ফুর্তির সাথে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।

অক্ষরে অক্ষরে। শক্ত হও, অ্যাল, বাঁকের কাছে এসে পড়েছি। স্পিড কমাল পিট, সরু একটা তুষার ঢাকা পথে ঘুরিয়ে নিল কর্ডকে। পথটা আঁকাবাঁকা, কোনো কোনো বাকের পর উল্টো দিকে বিস্তৃত হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে পাহাড়ের চূড়ায়।

পিচ্ছিল, অমসৃণ পথ। ভারী গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে একশো পনেরো ঘোড়ার স্ট্রেইট-এইট ইঞ্জিনের ওপর খুব ধকল যাচ্ছে। স্প্রিংবহুল চেসিস সবাইকে নিয়ে টেনিস বলের মতো খেলতে লাগল।

মেঝে থেকে তুলে নিজেদেরকে সিটের ওপর বসিয়েছে মহিলা আরোহীরা, দুজোড়া পা ডিভাইডার পার্টিশনটাকে পেঁচিয়ে রেখেছে, সিলিংয়ের স্ট্র্যাপ ধরে ঝুলে আছে।

ছয় মিনিট পর জঙ্গলটাকে পেছনে ফেলে এল ওরা। রাস্তার দুধারে এখন বড়বড় বোল্ডার আর গভীর তুষার। পিটের প্রথম ইচ্ছে ছিল কর্ড ফেলে পালাবে ওরা, পাথর আর জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে কেটে পড়বে। কিন্তু ইচ্ছেটা বাতিল করে দিতে হলো পাউডার-মিহি তুষার দেখে, পা ফেলামাত্র হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাবে। বিকল্প উপায় একটাই আছে, চূড়ায় উঠে যাওয়া, তারপর একটা চেয়ার লিফট নিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে শহরে নামা, হারিয়ে যাওয়া ভিড়ের মধ্যে।

আমরা ফুটছি, ঘোষণা করল জিওর্দিনো।

র‍্যাডিয়েটর ক্যাপের চারদিকে থেকে বাষ্প উঠছে, আগেই দেখেছে পিট। টেমপারেচার গজের কাঁটাও উঠে গেছে হট লেখা ঘরে। এভাবে দৌড় খাটানো হবে ভেবে তৈরি করা হয়নি গাড়িটা, বলল ও। এখনও যে ভেঙে চারখানা হয়ে যায়নি সেটাই আশ্চর্য।

রাস্তা শেষ হয়ে গেলে? কী করব আমরা?

দুনম্বর প্ল্যানটা কাজে লাগাব। চেয়ার লিফটে চড়ে ধীরেসুস্থে নেমে যাব কাছাকাছি একটা সেলুনে।

তোমার স্টাইলটা পছন্দ হলেও, না বলে পারছি না যে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, পেছন দিকে ইঙ্গিত করল জিওর্দিনো। বন্ধুরা ফিরে এসেছে।

এত ব্যস্ত ছিল পিট, অনুসরণকারীদের খবর রাখার সময় পায়নি। দুর্ঘটনা সামলে নিয়ে দুটো মার্সিডিজই আবার নতুন উদ্যমে কর্ডটাকে ধাওয়া শুরু করেছে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাবারও অবসর পেল না ও পেছনের জানালার কাঁচ, হে’লা কামিল আর লিলির মাথার মাঝখানে, এক ঝাঁক বুলেটের আঘাতে গুঁড়িয়ে গেল, সামনের উইন্ডশিল্ড ফুটো করে বেরিয়ে গেল ঝাকটা। চোখের সামনে তিনটে ফুটো দেখতে পেল পিট, কিনারাগুলো এবড়োখেবড়ো। মহিলা আরোহীদের কিছু বলতে হলো না, আবার তারা আশ্রয় নিল গাড়ির মেঝেতে। এবার তারা চেষ্টা করল মেঝে ফুটো করে ভেতরে সেঁধোবার।

আমরা সন্দেহ হচ্ছে, রেঞ্চটা ছুঁড়ে দেয়ায় ওদের খুব রাগ হয়েছে, আঁচ করল জিওর্দিনো।

আমরা গাড়িটাকে যেভাবে ঠেলছে ওরা, আমারও খুব রাগ হচ্ছে!

চুলের কাটার মতো তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিল পিট, গাড়ি সিধে করার সময় চুরি করে তাকাল ধাওয়ারত মার্সিডিজগুলোর দিকে। দৃশ্যটার মধ্যে বিপদের উপাদান যথেষ্ট পরিমাণেই রয়েছে।

সামনের মার্সিডিজ এঁকেবেঁকে ছুটে আসছে। কর্ডের চাকা তুষারের ওপর গভীর গর্ত তৈরি করেছে, সেই গর্তের ফাঁদে পড়ার কোনো ইচ্ছে নেই ড্রাইভারের, উন্মত্ততার সাথে সারাক্ষণ হুইল ঘোরাচ্ছে সে। প্রতিটি বাকে পিছলে রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করছে না। প্রায়ই তুষারের স্তূপে আটকা পড়ছে চাকা। মার্সিডিজে স্লে টায়ার লাগানো নেই দেখে অবাক হলো পিট। ওর জানা নেই, নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য গাড়িগুলো মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে চালিয়ে এনেছে সন্ত্রাসবাদীরা। অস্তিত্বহীন একটা টেক্সাটাইল কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রি করা ওগুলো, হে’লা কামিলের জান কবচ করার পর দুটোকেই ফেলে যাওয়া হবে ব্রেকেনরিজ এয়ারপোর্টে।

যা দেখল, মোটেও, খুশি হতে পারল না পিট। মাঝখানের দূরত্ব দ্রুত কমছে। ওরা মাত্র পঞ্চাশ মিটার পেছনে। পছন্দ হলো না অটোমেটিক রাইফেল হাতে লোকটাকেও, সামনের মার্সিডিজের ভাঙা উইন্ডশিল্ডের ফাঁক দিয়ে ব্যারেল বের করে ওদের দিকে লক্ষ্যস্থির করার চেষ্টা করছে সে।

ভগ্নদূতেরা আসছে! চেঁচাল পিট, হুইলের নিচে মাথা লুকাল, ড্যাশবোর্ডের কিনারা দিয়ে কোনো রকমে দেখতে পাচ্ছে সামনের রাস্তা। সবাই নিচু হও!

কথাগুলো মুখ থেকে বেরোতে যা দেরি, কর্ডের গায়ে আঘাত করল এক ঝাঁক বুলেট। প্রথম বিস্ফোরণে ডান দিকের ফেন্ডার মাউন্টিংয়ের ওপর শাখা স্পেয়ার টায়ার আর হুইল ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল। পরের ঝক ছাদটাকে ফুটো করল। নিজের অজান্তেই মাথাটা আরও নামিয়ে নিল পিট। পেছনের দরজা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল কজাগুলো, দরজাটাও উড়ে গেল বাতাসে ডানা মেলে। একটা গাছের সাথে ঘষা খেল কর্ড। বৃষ্টির মতো ঝরল কাঁচের টুকরো। মহিলা আরোহীদের একজন আর্তনাদ করে উঠল, দু’জনের মধ্যে কে বোঝা গেল না। ড্যাশবোর্ডে গাঢ় রক্তের পোচ দেখতে পেল পিট। পরমুহূর্তে উপলব্ধি করল, একটা কান এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে বুলেট। কী আশ্চর্য, কৌতুকপ্রবণ ইটালিয়ান যুবক টু-শব্দটিও করল না।

নির্লিপ্তভাবে ক্ষতটা স্পর্শ করল জিওর্দিনো, ভাবটা যেন ওটা অন্য কারও কান। তারপর মাথা কাত করে পিটের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল। আমার সন্দেহ হচ্ছে, কাল রাতে খাওয়া মদটুকু ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসছে।

সিরিয়াস?

দুহাজার ডলার লাগবে প্লাস্টিক সার্জারি করাতে, ফুটো হয়েছিল কিনা টেরও পাবে না। মহিলাদের কোনো খবর জানো?

না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল পিট, লিলি, তোমরা ঠিক আছে তো?

কাঁচের টুকরো চামড়ায় দুএকটা দাগ কেটেছে, প্রায় সাথে সাথে, উঁচু গলায় জবাব দিল লিলি। তাছাড়া আমরা অক্ষতই আছি।

কর্ডের র‍্যাডিয়েটর থেকে বাষ্প এবার সশব্দ প্রতিবাদের সাথে বেরোচ্ছে। ইঞ্জিনের শক্তি কমছে, টের পেল পিট। সামনে শেষ বাক, তারপর চুড়া। গাড়িটাকে ঘোরানোয় মন দিল ও। পেছনের বাম্পারে প্রায় সেঁটে আছে প্রতিপক্ষরা।

অতিরিক্ত উত্তাপে ইঞ্জিনের বেয়ারিংগুলো প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আরও এক ঝাঁক বুলেট বামদিকের পেছনের ফেন্ডার গুঁড়িয়ে দিল, চ্যাপ্টা করে দিল টায়ারটাকে। কর্ডের পেছনের অংশ রাস্তা থেকে নেমে যেতে চাইছে, ধরে রাখার জন্য হুইলের সাথে যুদ্ধ করছে পিট। রাস্তার পাশে অসংখ্য বোল্ডার, গাড়ি ধাক্কা খেলে ছাতু হয়ে যাবে আরোহীরা।

হুডের নিচ থেকে নীল ধোয়া বেরোতে দেখে পিট বুঝল, মারা যাচ্ছে কর্ড। রাস্তার কিনারায় পড়ে থাকা একটা পাথরকে এড়াতে পারেনি ও, অয়েল প্যানে খোঁচা লাগায় গর্ত তৈরি হয়েছে, ইঞ্জিনের নিচ থেকে ঝরে পড়ছে তেল। অয়েল প্রেশার গজ দ্রুত শূন্যের ঘরে নেমে এল। পাহাড় চূড়ায় পৌঁছানোর আশা ত্যাগ করাই ভালো।

পিছলানো চাকা নিয়ে সামনের মার্সিডিজ শেষ বাকটা ঘুরতে শুরু করল। কর্ডের হুইল শক্ত করে ধরে অনবরত ঘোরাচ্ছে পিট। ধাওয়ারত শত্রুদের চেহারায় উল্লাস কল্পনা করতে পারল ও, তারা বুঝে ফেলেছে পালানোর কোনো উপায় নেই শিকারের।

চারদিকে উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে আশ্রয়ের কোনো সন্ধান দেখল না পিট। পা সম্বল কোথাও বেশিদূর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাস্তার একদিকে তুষার আর বোল্ডার, আরেকদিকে ঝপ করে নেমে গেছে গভীর খাদ, মাঝখানের সরু রাস্তায় আটকা পড়েছে ওরা। ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়েছে, একেবারে দাঁড়িয়ে পড়ার আগেই ঘটে যাবে যা ঘটার।

মরিয়া হয়ে উঠল পিট, মেঝের সাথে চেপে ধরল অ্যাকসিলারেটর-পেড়াল গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে, সেই সাথে বিধাতা সাহায্য চেয়ে আবেদন জানাল ওপর মহলে।

আশ্চর্যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রাচীন বাহনের এখনও কিছু দেয়ার আছে। জ্যান্ত একটা প্রাণীর মতো, লোহা আর ইস্পাতসহ কুঁকড়ে গেল কর্ড। ইঞ্জিনের আওয়াজ বদলে গেল, সামনের চাকাগুলো দেবে গেল তুষারের ভেতর, পরমুহূর্তে ছেড়ে দেয়া স্প্রিংয়ের মতো সামনে লাফ দিল কর্ড, একবারের চেষ্টাতেই উঠে এল চূড়ায়।

পেছনে নীল ধোয়া আর সাদা বাষ্পের মেঘ উঠল, খোলা স্কি রান-এর মাথায় পৌঁছে গেল ওরা। ট্রিপল-চেয়ার স্কি লিফট ওদের একশো মিটার দূরেও নয়। কর্ডের সরাসরি নিচের ঢালে কেউ স্কি করছে না দেখে প্রথমে ভারি অবাক হলো পিট। লোকজন চেয়ার থেকে নেমে পড়ছে, ঘুরে যাচ্ছে লিফটের উল্টোদিকে, তারপর ছুটছে সমান্তরাল স্কি ট্রেইল ধরে।

তারপর লক্ষ করল ও, ওর দিকের ঢালটা রশি দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। বিপজ্জনক বলে এদিকে কাউকে কি করতে নিষেধ করা হয়েছে, রশির সাথে ঝুলে থাকা রঙিন বোর্ডগুলোয় তাই লেখা।

রাস্তার এটাই শেষ মাথা, হতাশ কণ্ঠে বলল জিওনিনা।

তার সাথে একমত হয়ে পিট বলল, লিফটের দিকে যাব, তা সম্ভব নয়। দশ মিটার পেরোবার আগেই গুলি করে আমাদের সব কয়টাকে ফেলে দেবে ওরা।

তুষারের বল তৈরি করে ছুঁড়ে মারা যায়। নাকি আত্মসমর্পণ করার কথা ভাবছ?

তিন নম্বর প্ল্যানের কথাটা ভুলে গেছ? তিরস্কার করল পিট।

কৌতূহল নিয়ে পিটকে দেখল জিওর্দিনো। প্রথম দুটোর চেয়েও খারাপ হবে সেটা, এ আমি বিশ্বাস করি না। তার পরই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। তুমি কী ভাবছ…ওহ, গড়, নো!

মার্সিডিজ দুটো পৌঁছে গেল, প্রতিপক্ষ থুথু ছুড়লেও ওদের গায়ে লাগবে। কর্ডের দুপাশে চলে এসেছে প্রায়। হুইল মোচড় দিল পিট, গাড়িটাকে নামিয়ে দিল স্কি রান এ, অর্থাৎ বিপজ্জনক ঢালে।

.

২৯.

আল্লাহ সহায় হোন! উন্মাদ! ওরা উন্মাদ! বিড়বিড় করে বলল ইসমাইলের ড্রাইভার। ওদেরকে ধরা সম্ভব নয়।

তাড়া করো! হুঙ্কার ছাড়ল ইসমাইল। যদি পালায়, তোমাকে আমি খুন করব!

পালিয়ে যাবে কোথায়! হিসহিস করে বলল ড্রাইভার। দেখছ না, আত্মহত্যা করছে ওরা? পাহাড়ের মাথা থেকে সচল গাড়ি নিয়ে নামতে চেষ্টা করলে কেউ বাঁচে?।

অটোমেটিক রাইফেলের ব্যারেলটা স্যাঁৎ করে ঘোরালো ইসমাইল, ড্রাইভারের কানে মাজল চেপে ধরল। বেজন্মা শুয়োর, ওদের ধর, নয়তো আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেব তোকে!

ইতস্তত করল ড্রাইভার, বুঝতে পারছে ধাওয়া করলেও, মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হবে, না করলেও। হাল ছেড়ে দিয়ে কর্ডের পিছু নিল সে, কিনারা থেকে ঢালে নামিয়ে আনল মার্সিডিজকে। আল্লাহ, অন্তত আমাকে তুমি রক্ষা করো!

ভাঙা উইন্ডশিল্ডের ভেতর রাইফেলের ব্যারেল লম্বা করে ইসমাইল বলল, গাড়ি সিধে করে রাখো। দ্বিতীয় গাড়ির ড্রাইভার ইতস্তত করেনি, প্রথমটার পিছু পিছু নেমে এসেছে ঢালে।

.

জমাট বাঁধা শক্ত বরফের ওপর দিয়ে তীরবেগে নামছে কর্ড, প্রতি মুহূর্তে আরও বাড়ছে গতি। হুইলটা আলতোভাবে ছুঁয়ে আছে পিট, প্রায় ঘোরাচ্ছেই না। ব্রেকের ওপরও কোনো চাপ দিচ্ছে না। একটু এদিক-ওদিক হলেই চরকির মতো ঘুরতে শুরু করবে কর্ড। যদি আড়াআড়িভাবে পিছলাতে শুরু করে, অবধারিত পরিণতি হবে ঘন ঘন ডিগবাজি খাওয়া, পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছবে কিছু ভাঙা হাড় আর লোহালক্কড়।

সিট বেল্টের প্রশ্ন তোলার জন্য এটা কি আদর্শ সময় নয়? জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।

মাথা নাড়ল পিট। উনিশশো ত্রিশে সে ধরনের কিছু ছিল না।

বুলেটে ঝাঁঝরা পেছনের চাকার রাবার খসে যাওয়ায় ভাগ্যকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দিল ও। চুপসে যাওয়া টায়ার থেকে মুক্ত হয়ে কাঠামোর জোড়া কিনারা বরফের গায়ে ভালোভাবে কামড় বসাতে পারছে, ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য পাচ্ছে পিট।

স্পিডমিটারের কাঁটা ষাটের ঘরে উঠে গেল, এই সময় এক ঝাঁক মুঘলকে ছুটে আসতে দেখল ও তুষারের অতিকায় স্তূপ, দক্ষ স্কিয়াররা এ ধরনের বাধা পেরোতে ভালোবাসে। স্কি নিয়ে ঢাল পেরোবার সময় বাধাগুলো পিটেরও খুব প্রিয়। কিন্তু দুহাজার একশো বিশ কিলোগ্রাম ওজনের গাড়ি নিয়ে মুঘলদের মাঝখান দিয়ে পথ করে নেয়ার কথা ভাবতে পারে শুধু পাগলরা। অ্যাল ধারণা, পিট বর্তমানে তাদের ভূমিকাতেই অভিনয় করছে।

আলতো স্পর্শে ট্রেইল থেকে সামান্য সরিয়ে দিল পিট গাড়িটাকে, চলে এল মসৃণ বরফে। সামনের পরীক্ষাটা সূচের ফুটোয় অলিম্পিক মশাল ঢোকানোর সাথে তুলনা করা যায়। আপনা থেকেই শরীরের পেশি শক্ত হয়ে গেল, ঝাঁকি খাবার জন্য তৈরি। এক চুল এদিক ওদিক হলে ছাতু হয়ে যাবে সবাই ওরা।

একপাশে অনেকগুলো তুষার স্তূপ, আরেক পাশে সারি সারি গাছ, মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। কোনোটার সাথে ঘষা লাগল না, সরু পথ ধরে পরিষ্কার বেরিয়ে এল কর্ড। চওড়া, বাধাহীন ঢালে বেরিয়ে এসেই ঝট করে পেছন দিকে তাকাল পিট।

প্রথম মার্সিডিজের ড্রাইভার কাণ্ডজ্ঞানের চমৎকার পরিচয় দিল। মুঘলদের এড়াবার জন্য কর্ডের ফেলে আসা চাকার দাগ অনুসরণ করল সে। দ্বিতীয় মার্সিডিজের ড্রাইভার হয় মুঘলদের দেখেনি বা বিপজ্জনক বলে মনে করেনি। নিজের ভুল বুঝতে পারল অনেক দেরিতে, ব্যস্ততার সাথে সংশোধনের জন্য গাড়িটাকে ঘন ঘন ডানে বায়ে ঘোরাল সে। এভাবে তিন কী চারটে মুঘলকে এড়াতে সফল হলো লোকা, তারপর একটার সাথে মুখোমুখি ধাক্কা খেল। গাড়ির সামনের অংশ তুষারের ভেতরে ঢুকে গেল, উঁচু হলো পেছনটা। নব্বই ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে বুঝলে থাকল সেটা। তারপর শুরু হলো ডিগবাজি খাওয়া। নিরেট বরফে পড়ল, খাড়া হলো, আবার পড়ল, আবার খাড়া হলো-প্রতিবার গাড়ি থেকে কিছু না কিছু ছিটকে পড়ছে, শুধু আরোহীরা বাদে, কারণ ডিগবাজি খাওয়ায় চ্যাপ্টা হয়ে গেছে বডি, জ্যাম হয়ে গেছে দরজা। গাড়ি থেকে ছিটকে পড়লে আরোহীরা হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত।

মাউন্টিং থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল ইঞ্জিন, ছিটকে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। চাকা, ফ্রন্ট সাসপেনশন, রিয়ার-ড্রাইভ ট্রেন, এক এক সবগুলো চেসিস থেকে বেরিয়ে ঢাল বেয়ে সবেগে নামতে শুরু করল।

যদি বলি একটা খতম, ব্যাকরণ সম্মত হবে কি? প্রশ্ন করল জিওর্দিনো।

খুশি হবার কিছু নেই, দাঁতে দাঁত চেপে বলল পিট। সামনে তাকাও।

সামনে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠল জিওর্দিনো। সামনে নতুন একটা ট্রেইল শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানে উজ্জ্বল রঙের স্কি সুট পরা অনেক লোকের ভিড়। উইন্ডশিল্ড ফ্রেমের কিনারা ধরে সটান খাড়া হলো সে, উন্মত্তের মতো হাত নেড়ে চিৎকার জুড়ে দিল। কর্ডের জোড়া হর্ন বাজাচ্ছে পিট।

চমকে উঠে ওদের দিকে ফিরল স্কিয়াররা। দেখল, দুটো ছুটন্ত গাড়ি প্রায় তাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় আছে, ছিটকে একপাশে সরে গেল সবাই, কর্ডটাকে পাশ কাটাতে দেখল, দেখল তীরবেগে সেটাকে ধাওয়া করছে একটা মার্সিডিজ।

ট্রেইলে উঁচু হয়েছে একটা স্কি জাম্প, নেমেছে একশো মিটার দূরে। তুষার ঢাকা র‍্যাম্প ঠিক কোথায় পাহাড়ের গায়ে মিশেছে, দেখার অবসর নেই পিটের। কোনো রকম ইতস্তত না করে স্টাটিং ড্রপ-অফ-এর দিকের র‍্যাডিয়েটর অর্নামেন্ট তাক করল

লাফ দেবে, না? তাজ্জব জিওর্দিনো প্রশ্ন করল।

চার নম্বর প্ল্যান, তাকে আশ্বস্ত করল পিট। শক্ত হও। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারি।

আছে নাকি যে হারাবে?

অলিম্পিক কমপিটিশনের জন্য যে ধরনের কাঠামো তৈরি করা হয়, এটা তার চেয়ে অনেক ছোট। এটা শুধু অ্যাবেটিক আর হটডগ প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে র‍্যাম্পটা কর্ডকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট চওড়া, খানিকটা জায়গা পড়েও থাকবে। ক্রমশ উঁচু হয়েছে ঢালটা, তারপর সমতল খানিকটা বিস্তৃতি, সবশেষে দেবে গেছে র‍্যাম্প, ত্রিশ মিটার এগিয়ে গ্রাউন্ড-এর বিশ মিটার ওপরে হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে।

স্টার্টিং গেটের দিকে গাড়ি তাক করল পিট, কর্ডের চওড়া বডির আড়ালে লুকিয়ে রাখল স্কি জাম্প। সাফল্য নির্ভর করছে সময়জ্ঞান আর প্রয়োজনমতো স্টিয়ারিং হুইল ঘোরানোনার ওপর।

একেবারে শেষ মুহূর্তে, সামনের চাকা স্টার্টিং লাইন পেরোবার আগেই, স্টিয়ারিং হুইল ঘোরানোর ওপর।

একেবারে শেষ মুহূর্তে, সামনের চাকা স্টার্টিং লাইন পেরোবার আগেই, স্টিয়ারিং হুইলে মোচড় দিল পিট। কর্ডের পেছনটা ঘুরে গেল, চরকির মতো পাক খেতে শুরু করে র‍্যাম্পটাকে এড়িয়ে গেল গাড়ি। কর্ডের আকস্মিক অস্থিরতা লক্ষ করে ঘাবড়ে গেল ইসমাইলের ড্রাইভার, সংঘর্ষ এড়াবার জন্য সরলরেখা থেকে সরিয়ে নিল মার্সিডিজকে, স্টার্টিং গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল নিখুঁতুভাবে।

কর্ডকে সোজা পথে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে পিট, ঘাড় ফিরিয়ে মার্সিডিজের দিকে তাকিয়ে আছে জিওর্দিনো। সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কিনারা থেকে নেমে গেল গাড়িটা। মুহূর্তের জন্য সেটাকে আকাশের গায়ে ডানাবিহীন মোটাসোটা একটা পাখির মতো লাগল। র‍্যাম্পের কিনারা ছাড়ার মুহূর্তে ঘণ্টায় একশো বিশ কিলোমিটার বেগে ছুটছিল ওটা। নিচে পড়ে প্রথমে ওটা চ্যাপ্টা হলো, তারপর গড়িয়ে নামার সময় খুলে খুলে পড়ল একেকটা পার্ট। পাইনগাছের সারিতে ধাক্কা খাওয়ার আগেই আরোহীরা সবাই দলা পাকিয়ে গেছে।

আরেকটু হলে আমরাও আকাশে উড়তাম! ঢাক গিলে পিটকে তিরস্কার করল জিওর্দিনো।

তার বদলে সম্ভবত পাতালে নামতে যাচ্ছি! সতর্ক করল পিট। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরতি পথ ধরতে গিয়ে সফল হলেও, কর্ডের চাকা ঢালে নেমে এসে পিছলাতে শুরু করেছিল। স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে পিছলানো সামলে নিয়েছে পিট, কিন্তু ঢাল বেয়ে পতনের গতি কমাতে পারছে না। ঢালের অর্ধেকটা পেরিয়ে আসতেই ব্রেকের শূন্য পুড়ে গেল, স্টিয়ারিং টাই রঙ বেঁকে গেছে, সেটাও একটা থ্রেড-এর মাথায় ঝুলছে। কর্ড ছুটে চলেছে তার অবধারিত পথে, সরাসরি একটা স্কি ফ্যাসিলিটি আর রেস্তোরাঁ বিল্ডিংয়ের দিকে, চেয়ার লিফটের গোড়ায়। একটা কাজই করার আছে রানর, করছেও তাই, বাচ্চাদের মতো অনবরত হর্ন বাজাচ্ছে।

মহিলা আরোহীরা দ্বিতীয় মার্সিডিজের ধ্বংস চাক্ষুষ করেছে নির্দয় কৌতুল আর বিশাল স্বস্তিকর অনুভূতি নিয়ে। স্বস্তিটুকু ক্ষণস্থায়ী। ভবনটা সবেগে ছুটে আসছে দেখে আঁতকে উঠল তারা।

মি. পিট, কিছুই কি আমাদের করার নেই? পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলেন হেলা কামিল। প্রশ্নটা প্রায় বুলেটের মতো ছুটে এল।

পরামর্শ দেয়ার অধিকার ইচ্ছে করলেই আপনি প্রয়োগ করতে পারেন, পাল্টা গুলি ছুড়ল পিট। পরমুহূর্তে ব্যস্ত হয়ে উঠল বাচ্চাদের তৈরি খেলাঘর এড়বার জন্য, খেলাঘরের চারপাশে তারা স্কি নিয়ে ছোটাছুটি করছে।

স্কিয়ারদের প্রধান অংশটা মার্সিডিজের পতন দেখেছে, কর্ডের আওয়াজও তাদের কানে গেছে। ট্রেইলের একপাশে দ্রুত সরে গেল তারা, হাঁ করে পাশ কাটাতে দেখল গাড়িটাকে।

চেয়ার লিফটের উঁচু প্রান্তটা থেকে ফোনে একাধিক গাড়ির দৌড় প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে, বেস এরিয়া থেকে লোকজনকে সরিয়ে রয়েছে, স্কি ইনস্ট্রাকটররা। স্কি সেন্টারের ডান দিকে অগভীর একটা পুকুর রয়েছে, বরফে জমাট বাঁধা! পিটের ইচ্ছে, ওই পুকুরের ওপর পৌঁছানো। জমাট বাঁধা বরফ ভেঙে গেলে কর্ডের রানিং বোর্ড পর্যন্ত ডুবে যাবে, স্থির হবে গাড়ি। কিন্তু সমস্যা হলো, লোকজন কি ঘটে দেখার লোভে এমনভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের মাঝখানে রেস্তোরাঁ ভবন পর্যন্ত একটা করিডর তৈরি হয়েছে, পুকুরের দিকে যাবার কোনো পথ খোলা রাখেনি।

আশা করতে পারি, গম্ভীর সুরে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো, এবার তুমি ঝোলা থেকে পাঁচ নম্বর প্ল্যানটা বের করবে?

প্ল্যান সব শেষ, বলল পিট। দুঃখিত।

হে’লা কামিল গলা লম্বা করে তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে। তাঁকে মিথ্যে অভয় দেবে, সে উৎসাহও পাচ্ছে না লিলি। সংঘর্ষ অনিবার্য, আর দেরিও নেই, বুঝতে পেরে পরস্পরকে তারা জড়িয়ে ধরল, তারপর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্রাইভিং সিটের পেছনে।

স্কি আর পোল রাখা হয় র‍্যাকগুলোয়, কয়েকটার সাথে ধাক্কা খেল কর্ড। টুথপিকের মতো চারদিকে উড়ে গেল স্কি আর পোলগুলো। মুহূর্তের জন্য মনে হলো তুষারের ভেতর চাপা পড়েছে গাড়ি, তারপর বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে এসে আবার ছুটল সেটা, কংক্রিটের সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি উঠে পড়ল বারান্দায়, কাঠের দেয়াল ভেঙে ঢুকে পড়ল ককটেল লাউঞ্জে।

রুমটা খালি করা হয়েছে, রয়ে গেছে শুধু পিয়ানো বাদক। সে তার কি-বোর্ডের সামনে বসে আছে, বিস্ময়ে পঙ্গু। এক সেকেন্ড পর দেখা গেল আরও একজন রয়ে গেছে। বার-এর নিচ থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলল বারটেন্ডার, কর্ডটা ভেতরে ঢুকছে দেখে আবার ঝপ করে বসে পড়ল সে। চেয়ার-টেবিল খুঁড়িয়ে উন্মত্ত হাতির মতো ছুটে এল কর্ড, উল্টোদিকের দেয়াল ভেঙে নিচে লাফ দেয়ার পাঁয়তারা করল। দেয়ালের বিশ ফুট নিচে শক্ত বরফ।

আশ্চর্যই বটে, দেয়াল ভাঙার পর গর্তের ভেতর খানিকটা নাক গলিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে গেল কর্ড, বোঝা গেল লাফ দেয়ার কোনো ইচ্ছে ওটার নেই।

র‍্যাডিয়েটরের হিসহিস শব্দ ছাড়া কামরার ভেতর ভৌতিক নিস্তব্ধতা নেমে এল। উইন্ডশিল্ড ফ্রেমের সাথে মাথাটা ঠুকে গেছে পিটের, চুলের আড়ালে সদ্য তৈরি ক্ষত থেকে গাল বেয়ে নেমে আসছে রক্ত। দেয়ালের দিকে ফিরল ও। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে এমন স্থিরভাবে বসে আছে সে, যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাল পিট। মহিলা আরোহীদের দু’জনের চেহারাতেই প্রশ্নসূচক এখনও আমরা বেঁচে আছি! ভাব।

বারটেন্ডার এখনও লুকিয়ে আছে, কাজেই পিয়ানো বাদকের দিকে ফিরল পিট। তিন পায়াওলা একটা টুলে হতভম্ব চেহারা নিয়ে বসে আছে সে। তার মাথায় কাত হয়ে রয়েছে ডার্বি হ্যাট, ঠোঁটের কোণে ঝুলে রয়েছে আধপোড়া সিগারেট, ছাইটুকু এখনও ঝরে পড়েনি। কি-র ওপর তাক করা রয়েছে তার হাত দুটো, গোটা শরীর আড়ষ্ট। রক্তাক্ত আগন্তুকের দিকে তাকাল সে, আগন্তুক হাসল।

ক্ষমা করবেন, ভাই, সবিনয়ে বলল পিট। একটু বাজিয়ে শোনাবেন নাকি–ফ্লাই মি টু দ্য মুন?

৩০. দ্য লেডি ফ্ল্যামবোরো

তৃতীয় পর্ব – দ্য লেডি ফ্ল্যামবোরো

১৯ অক্টোবর, ১৯৯১ উক্সমাল, ইউকাটান

৩০.

চারদিকে বহুবর্ণ ফ্লাডলাইটের ছড়াছড়ি। অতিকায় কাঠামোর প্রতিটি পাথর শিল্পকর্ম, সেগুলোয় প্রতিফলিত হয়ে উজ্জ্বল আলো অতিপ্রাকৃত একটা আভা বিকিরণ করছে। প্রকাণ্ড পিরামিডের দেয়ালগুলো নীল করা হয়েছে, পিরামিডের মাথার ওপর জাদুকরের মন্দির গোলাপি আভায় উদ্ভাসিত। লাল স্পটলাইট দ্রুত ওঠানামা করছে সিঁড়ি বেয়ে, প্রতিবার রক্ত ঢেলে দেয়ার একটা ছবি ফুটে উঠছে ধাপগুলোর ওপর। উপরে, মন্দিরের ছাদে, সাদা কাপড়ে মোড়া একটা মূর্তি।

নিজের দুদিকে হাত দুটো মেলে দিল টপিটজিন, মুঠো খুলল- তার এই ভঙ্গি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে অনেক আগেই। সামনের দিকে সামান্য একটু ঝুঁকে নিচে তাকাল সে।

ইউকাটান পেনিনসুলায় প্রাচীন মায়ান শহর উক্সমাল, মন্দির আর পিরামিডের চারদিকে গিজগিজ করছে মানুষ, হাজার হাজার ভক্ত মুখ তুলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। টপিটজিন তার ভাষণ শেষ করল প্রতিবারের মতোই কীর্তন গাওয়ার সুরে আযটেক গান গেয়ে। সুরটা ধরতে পারল বিশাল জনতা, একযোগে গেয়ে উঠল তারাও।

এই জাতির শক্তি, সাহস আর সাফল্য নিহিত রয়েছে আমাদের মধ্যে, আমরা যারা কখনোই অভিজাত বা ধনী হব না। আমরা অভুক্ত থাকি, মেহনত করি সেই সব নেতাদের জন্য যারা আমাদের চেয়ে কোনো অর্থেই বড় বা সৎ নয়। অবৈধ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো রকম মহত্ত্ব বা গৌরবের অস্তিত্ব মেক্সিকোয় থাকবে না। আর নয় দাসত্ব। আর নয় মুখ বুজে শোষণ আর অত্যাচার সহ্য করা। ভদ্রবেশী অভিজাত আর ধনীদের শায়েস্তা করার জন্য, তাদের দুর্নীতি থেকে জাতিকে চিরকালের জন্য উদ্ধার করার জন্য, আবার একজোট হয়েছেন দেবতারা। তারা আমাদের জন্য নতুন এক সভ্যতা উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন। সেটা আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে।

ভাষণ শেষ হবার সাথে সাথে বহুরঙা আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল, শুধু উজ্জ্বল সাদা আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে থাকল একা টপিটজিন। তারপর অকস্মাৎ সাদা স্পটলাইটও নিভে গেল, সেই সাথে অদৃশ্য হলো মূর্তিটা।

খোলা প্রান্তরে বহূৎসব জ্বলে উঠল ট্রাক বহর থেকে হাজার হাজার কৃতজ্ঞ ভক্তদের মধ্যে বিলি করা হলো বক্স ভর্তি খাবার। প্রতিটি বাক্সে নরম, সুস্বাদু রুটি আর মাংস আছে, আর আছে একটা করে পুস্তিকা। পুস্তিকাটা কার্টুন পত্রিকার মতো, প্রচুর ছবি, ক্যাপশন কম। ছবিতে দেখানো হয়েছে দৈত্য-দানবের চেহারা নিয়ে মেক্সিকো ছেড়ে পালাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো আর তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা, সীমান্তের ওপারে শয়তানরূপী আংকল স্যাম দুবাহু বাড়িয়ে তাদেরকে আলিঙ্গন করার জন্য তৈরি হয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট আর তার সঙ্গীদের তাড়া করছে দেবতার চেহারা নিয়ে টপিটজিন, তার সাথে রয়েছে আরও চারজন আযটেক দেবতা।

পুস্তিকায় নির্দেশের একটা তালিকাও স্থান পেয়েছে, বুদ্ধি দেয়া হয়েছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কিন্তু কার্যকরীভাবে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করার।

খাবার বাক্স বিলি করার সময় স্বেচ্ছাসেবক যুবক-যুবতীরা টপিটজিনের নতুন শিষ্য সংগ্রহ ও তাদেরকে তালিকাভুক্ত করার দায়িত্বও পালন করল। গোটা ব্যাপারটার আয়োজন করা হয়েছে পেশাদারি দক্ষতার সাথে। মেক্সিকো সিটি দখল করে সরকারকে উৎখাত করার জন্য এক পা এক পা করে এগোচ্ছে টপিটজিন। শুধু উক্সমালে নয়, আরও বহু প্রাচীন আযটেক শহরে ভাষণ দিয়েছে সে। নিজের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তার প্রতিটি ভাষণ অবিশ্বাস্য অবদান রাখছে। তবে আজ পর্যন্ত আধুনিক কোনো শহরে সমাবেশের আয়োজন করেনি সে।

সন্ত্রষ্ট জনতা টপিটজিনের নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল। কিন্তু তাদের সে জয়ধ্বনি তার কানে গেল না স্পটলাইট নেভার সাথে সাথে দেহরক্ষীরা তাকে নিয়ে পিরামিডের পেছন দিকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে বড়সড় একটা ট্রাক তথা সেমিট্রেইলর-এর পাশে। তাড়াহুড়ো করে ট্রাকে উঠে পড়ল টপিটজিন। স্টার্ট নিল ইঞ্জিন। ট্রাকের সামনে একটা প্রাইভেট কার থাকল, পেছনে থাকল আরেকটা। জনতার ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ধীরগতিতে এগোল গাড়িগুলো, উঠে এল হাইওয়েত, বাঁক নিয়ে রওনা হলো ইয়ুক্যাটান রাজ্যের রাজধানী মারিডার দিকে।

ট্রেইলরের ভেতরে দামি ফার্নিচার; একপাশে কনফারেন্স রুম, পার্টিশনের অপর দিকে টপিটজিনের লিভিং কোয়ার্টার।

ঘনিষ্ঠ ভক্তদের সাথে আগামীকালের শিডিউল নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করল টপিটজিন। বৈঠক শেষ হলো, এই সময় দাঁড়িয়ে পড়ল ট্রাক, শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল সবাই। প্রাইভেট কারে উঠে মারিডার একটা হোটেলে চলে গেল তারা।

দরজা বন্ধ করে দিয়ে লিভিং কোয়ার্টার ঢুকল টপিটজিন। মাথা থেকে পালকের মুকুট খুলল সে, খুলল সাদা আলখেল্লা, পরনে থাকল একজোড়া স্ন্যাকস আর একটা স্পোর্টস শার্ট। কেবিনেট থেকে দামি এক বোতল হুইস্কি বের করল। প্রথম দুবার তাড়াতাড়ি গলায় ঢালল তৃষ্ণা নিবারণের জন্য, তারপর আয়েশ করে ছোট ঘোট চুমুক দিল গ্লাসে।

পেশিতে ঢিল পড়ার পর ছোট্ট একটা খুপরিতে ঢুকল টপিটজিন, ভেতরে নানা ধরনের কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট রয়েছে। একটা হোলোগ্রাফিক টেলিফোনের কোড করা নাম্বারে চাপ দিয়ে ঘুরল সে, খুপরির ঠিক মাঝখানে মুখ করল হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে অপেক্ষায় আছে। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট একটা ত্রিমাত্রিক মূর্তি ফুটে উঠতে শুরু করল। একই ভাবে হাজার মাইল দূরে টপিটজিনকেও দেখা যাচ্ছে।

একসময় পরিষ্কার হলো ছবিটা। আরেকজন তোক একটা আরাম কেদারায় বসে তাকিয়ে রয়েছে টপিটজিনের দিকে। তার গায়ের রং গাঢ়, ব্যাকব্রাশ করা চুলে চকচক করছে তেল। শক্ত, দামি পাথরের মতো ঝলমলে তার চোখ জোড়া। পাজামার ওপর আলখেল্লা পরেছে সে। টপিটজিনের স্ন্যাকস আর শার্ট প্রু কুঁচকে লক্ষ করল লোকটা, লক্ষ করল হাতে মদের গ্লাসটাও। বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছ তুমি। এতটা বেপরোয়া হওয়া কি উচিত? ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল সে, বাচনভঙ্গি আমেরিকান। এরপর মেয়েমানুষের দিকে ঝুঁকবে, কী বলো?

হেসে উঠল টপিটজিন। শোনো ভাই, আমাকে লোভ দেখিয়ে না! বিজাতীয় কাপড়ে চব্বিশ ঘণ্টা নিজেকে ঢেকে রাখা, পোপের মতো আচরণ করা, তার ওপর কৌমার্য অক্ষুণ্ণ রাখা, প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।

কেন, একই কাজ তো আমাকেও করতে হচ্ছে।

হ্যাঁ, তা হচ্ছে। কিন্তু আর যে পারি না!

সাফল্য নাগালের মধ্যে চলে এসেছে, এখন তোমার অসতর্ক হওয়া সাজে না।

হতে চাই না, হচ্ছিও না। আমার প্রাইভেসিতে নাক গলাবে এমন সাহস কারও নেই। যখন একা থাকি, ভক্তরা ধরে নেয় ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ করছি আমি।

দ্বিতীয় লোকটা নিঃশব্দে হাসল। ব্যাপারটার সাথে আমিও পরিচিত।

কাজের কথা শুরু করবে? জিজ্ঞেস করল টপিটজিন।

ঠিক আছে। বলো কি ব্যবস্থা করেছ?

সংশ্লিষ্ট লোকজন ছাড়া কাকপক্ষীও আয়োজনটার কথা জানে না। নির্দিষ্ট সময়ে সবাই যে যার জায়গায় উপস্থিত থাকবে। সমাবেশের জায়গাটা কোথায় জানার জন্য দশ মিলিয়ন পেসো ঘুস দিয়েছি আমি। বোকার দল তাদের কাজ শেষ করবে, তারপর তাদের বলি দেওয়া হবে। শুধু যে তাদের মুখ বন্ধ করাই উদ্দেশ্য তা নয়, আমাদের নির্দেশ পালনের জন্য যারা অপেক্ষা করছে তাদেরকে সতর্কও করা হবে।

আমার অভিনন্দন গ্রহণ করো। তোমার কাজ অত্যন্ত নিখুঁত।

কৌশল আর বুদ্ধিমত্তা দেখানোর সুযোগ তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি আমি।

টপিটজিনের মন্তব্যের পর কয়েকটা মুহূর্তে নিস্তব্ধতার ভেতর কাটল, দু’জনেই যে যার চিন্তায় মগ্ন। অবশেষে নড়ে উঠল দ্বিতীয় লোকটা, গাউনের ভেতর থেকে ব্র্যান্ডির একটা বোতল বের করল, উঁচু করে দেখল টপিটজিনকে। তোমার স্বাস্থ্য।

হেসে উঠে হুইস্কির গ্লাসটা টপিটজিনও উঁচু করল। যৌথ অভিযানের সাফল্য কামনায়।

আমি দেখার অপেক্ষায় আছি, আমাদের মেধা আর পরিশ্রমের ফল ভবিষ্যৎকে কীভাবে বদলে দেয়।

.

৩১.

ডেনভারের অদূরে বাকলি এয়ারফিল্ড থেকে আকাশে উঠে পড়ল চিহ্নবিহীন বিচক্রাফট জেট বিমানটা। ইঞ্জিনের গর্জন কমেছে কিছুটা। তুষার ঢাকা রকি পর্বতমালার চূড়াগুলো পিছিয়ে পড়ল, বিচক্রাফট জেট আকাশের আরও ওপরে উঠে এল।

প্রেসিডেন্ট শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, আপনি যাতে তাড়াতাড়ি সেরে ওঠেন, ডেইল নিকোলাস বললেন। ঘটনার বর্ণনা শোনার পর ভয়ানক অসন্তুষ্ট হয়েছেন তিনি…

তিনি উপলব্ধি করেছেন আপনার ওপর দিয়ে কী রকম বিশ্রী একটা ধকল গেছে, মন্তব্য করলেন জুলিয়াস শিলার।

এবং তিনি আমাদের সবার পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। বলেছেন, আপনার নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য যেকোনো ব্যবস্থা নিতে তৈরি আছে মার্কিন প্রশাসন।

তাঁকে বললেন, আমি কৃতজ্ঞ, হে’লা কামিল উত্তর দিলেন। আমার তরফ থেকে তাঁর প্রতি একটাই অনুরোধ, আমার প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে যারা মারা পড়েছে তাদের পরিবারকে যেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

জুলিয়াস শিলার নিশ্চয়ই দিয়ে বললেন, সে ব্যাপারে অবহেলা করা হবে না।

একটা বিছানায় শুয়ে আছেন হে’লা কামিল, পরনে সাদা সুইট-স্যুট। তার ডান গোড়ালি প্লাস্টার করা হয়েছে। এক এক করে জুলিয়াস শিলার, ডেইল নিকোলাস ও সিনেটর পিটের দিকে তাকালেন তিনি। আমি সম্মানিত বোধ করছি, আপনাদের মতো ব্যক্তিত্ব নিউ ইয়র্কের পথে আমাকে সঙ্গদান করছেন।

আপনি কিন্তু বিড়ালকেও হার মানিয়েছেন, মুচকি হেসে এই প্রথম কথা বললেন সিনেটর।

হে’লা কামিলের ঠোঁট জোড়া সামান্য ফাঁক হলো। দ্বিতীয় ও তৃতীয় জীবন দান করার জন্য আপনার ছেলের কাছে আমি ঋণী। অদ্ভুত সময়ে হাজির হওয়ার বিরল ক্ষমতা আছে ওর।

ডার্কের পুরনো গাড়িটার অবস্থা দেখেছি স্বচক্ষে। কেমন করে বেঁচেছেন সবাই, কে জানে। সিনেটর পিট বললেন।

অত্যন্ত সুন্দর একটা বাহন ছিল, আফসোসের সুর ধ্বনিত হলো হেলার কণ্ঠে। নষ্ট হয়ে গেল।

কাশি দিয়ে ডেইল নিকোলাস বললেন, জাতিসংঘে আপনার ভাষণ প্রসঙ্গে কথা বলতে পারি, মিস কামিল?

আপনার লোকেরা আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি সম্পর্কে নিরেট তথ্য প্রমাণ কিছু কি সংগ্রহ করতে পেরেছে? হেলার কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা।

চট করে জুলিয়াস শিলার আর জর্জ পিটের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলেন ডেইল নিকোলাস। জবাব দিলেন সিনেটর, ভালো করে সার্চ করার সময় পাইনি আমরা। চারদিন আগে যেখানে ছিলাম, আজও প্রায় সেখানে…

ডেইল নিকোলাস ইতস্তত ভাব নিয়ে শুরু করলেন, প্রেসিডেন্ট বলেছেন,…তিনি আশা প্রকাশ করেছেন…

সময় নষ্ট করার দরকার নেই, মি. নিকোলাস, হে’লা কামিল বাধা দিয়ে বললেন। আপনারা শান্ত হোন। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভাষণে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির কথা বলব।

আপনি মত পাল্টেছেন জেনে আমি আনন্দিত।

যা ঘটে গেল, আমি আপনাদের কাছে অন্তত এইটুকু ঋণী।

ডেইল নিকোলাস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আপনার ঘোষণা প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানকে কিছু রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেবে, অর্থাৎ আখমত ইয়াজিদ বেশ খানিকটা বেকায়দায় পড়বে। আমার তো ধারণা, ধর্মীয় মৌলবাদের বদলে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটবে মিসরে।

খুব বেশি কিছু আশা করো না, সতর্ক করলেন সিনেটর। দুৰ্গটা ধসে পড়ছে, আমরা শুধু ফাঁক-ফোকরগুলো ভরার চেষ্টা করছি।

জুলিয়াস শিলার আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, আমার ভয়, আখমত ইয়াজিদ মিস হে’লা কামিলের বিরুদ্ধে আরও মরিয়া হয়ে লাগবে।

আমি তা মনে করি না, দ্বিমত পোষণ করলেন ডেইল নিকোলাস। নিহত আতঙ্কবাদীদের সাথে ইয়াজিদের যোগাযোগ যদি এফ.বি.আই, আবিষ্কার করতে পারে, আর যদি ষাট জন প্লেন আরোহীর মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা সম্ভব হয়, সাধারণ মিসরীয়রা তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে। সারা দুনিয়া যদি তার সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে, মিস হে’লা কামিলের ওপর আবার আঘাত হানতে সাহস পাবে না সে।

একটা কথা ঠিক, মিসরীয়রা সুন্নি মুসলমান, শিয়া ইরানিদের মতো রক্তপিপাসু নয়-আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ধীরে ধীরে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চাইব। তবে আপনার দ্বিতীয় ধারণাটি ঠিক নয়। আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত আখমভ ইয়াজিদ ক্ষান্ত হবে না। একের পর এক চেষ্টা করে যাবে সে, তাকে আমি সেধরনের ফ্যানাটিক হিসেবেই চিনি। হয়তো এই মুহূর্তেও আমাকে খুন করার প্ল্যান করছে সে।

উনি ঠিক বলেছেন, সিনেটর একমত হলেন। আখমত ইয়াজিদের ওপর আমাদের কড়া নজর রাখা দরকার।

জাতিসংঘে ভাষণ দেয়ার পর আপনার প্ল্যান কী? জিজ্ঞেস করলেন জুলিয়াস শিলার।

আজ সকালে, হাসপাতাল ছাড়ার আগে, প্রেসিডেন্ট হাসানের একটা মেসেজ পেয়েছি আমি, বললেন হে’লা কামিল। তিনি আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।

ডেইল নিকোলাস সাবধান করে দিয়ে বললেন, আমাদের চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে গেলে আমরা কিন্তু আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো রকম গ্যারান্টি দিতে পারব না, মিস কামিল।

আপনাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই, মৃদু হেসে হে’লা কামিল বললেন, প্রেসিডেন্ট সাদাত আততায়ীদের হাতে নিহত হবার পরে আমার দেশের সিকিউরিটি সিস্টেম বেশ সজাগ।

জানতে পারি, মিস কামিল, সাক্ষাৎকারটি কোথায় অনুষ্ঠিত হবে? খোঁজ নিলেন। জুলিয়াস শিলার। নাকি অনধিকার চর্চা হয়ে গেল?

গোপন কোনো ব্যাপার নয়। দুনিয়ার সবাই জানবে। উরুগুয়ের পান্টা ডেল এসটে-তে মিলিত হব আমরা, আমি এবং প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান।

তোবড়ানো, বুলেটে ঝাঁঝরা কর্ডটাকে গ্যারেজে নিয়ে আসা হয়েছে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে গাড়িটার চারদিকে ঘুরল একবার এসবেনসন। গাড়ির অবস্থা যদি এই হয়, আপনারা বেঁচে আছেন কীভাবে?

গাড়ির মালিককে জিজ্ঞেস করো, পরামর্শ দিল অ্যাল জিওর্দিনো। তার একটা হাত স্লিংয়ে ঝুলছে, গলায় একটা পট্টি বাঁধা হয়েছে, ব্যান্ডেজ বাধা হয়েছে কানে।

ছয়টা সেলাই পড়েছে, তবে সবগুলো চুলের ভেতর আড়ালে, তাছাড়া অক্ষতই বলা যায় পিটকে। গাড়ির নাকে হাত বুলাচ্ছে ও, ওটা যেন একটা পোষা প্রাণী।

অফিসঘর থেকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এল লিলি। তার বাম গালে আঁচড়ের দাগ, ডান চোখে নিচটা ফুলে আছে।

টেলিফোনে হিরাম ইয়েজার।

মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে এল পিট। এসবেনসনের কাঁধে এক হাত রেখে বলল, আমার গাড়িটাকে আগের চেয়ে সুন্দর করে দাও।

কমপক্ষে ছয় মাস, সঙ্গে প্রচুর টাকা লাগবে। জানাল এসবেনসন।

সময়, টাকা কোনোটাই সমস্যা নয়, পিট বলে, সরকার দেবে বিল।

ঘুরে দাঁড়িয়ে, অফিস ঘরে ঢুকে টেলিফোন উঠালো সে, হিরাম, আমার জন্য কোনো খবর আছে?

বাল্টিক সাগর আর নরওয়ে উপকূল বাদ দিয়েছে আমি।

কারণ?

সেরাপিস লগ যে জিওলজিকাল বর্ণনা দিয়েছে তার সাথে ওই এলাকার বৈশিষ্ট্য মেলে না। রাফিনাস যে অসভ্যদের বর্ণনা দিয়েছে তার সাথে প্রথম দিককার ভাইকিংদেরও কোনো মিল নেই। সে যাদের কথা লিখেছে, তাদের সাথে বরং বেশ খানিকটা সিদিয়ানদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তবে গায়ের রং আরও গাঢ়।

কিন্তু সিদিয়ানরা এসেছিল সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে, বলল পিট। সোনালি চুল বা ফর্সা চামড়া কোত্থেকে পাবে তারা এক সেকেন্ড চিন্তা করল ও। আচ্ছা, আইসল্যান্ডের কথা ভেবেছ? আরও প্রায় পাঁচশো বছর ভাইকিংরা ওখানে বসবাস করেনি। রাফিনাস হয়তো এস্কিমোদের কথা বলে থাকতে পারে।

সম্ভব নয়, বলল ইয়েজার। চেক করে দেখেছি। এস্কিমোরা কখনোই আইসল্যান্ডে মাইগ্রেট করেনি। রাফিনাস পাইন বনের বর্ণনা দিয়েছে, আইসল্যান্ডে পাচ্ছ না। তাছাড়া, ভুলো না, ছয়শো মাইল লম্বা সাগর পাড়ি নিয়ে কথা বলছি আমরা, তার মধ্যে কয়েকটা সাগর সাংঘাতিক অশান্ত। ঐতিহাসিক মেরিন রেকর্ড বলছে, রোমান জাহাজের ক্যাপটেনরা তীরভূমিকে সাধারণত দুদিনের বেশি চোখের আড়াল করত না।

এখন তাহলে কোথায় খোঁজ করব আমরা?

ভাবছি আবার একবার পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে তল্লাশি চালাব। কিছু হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে।

অসভ্যদের সন্ধান পেতে চাইছ তুমি, বলল পিট। কিন্তু সেরাপিস গ্রিনল্যান্ডে এল কী করে, এলে কি ব্যাখ্যা দেবে?

কম্পিউটর আমাদের বাতাস স্রোতের হিসেবে দিলে বলতে পারব।

আজ রাতে আমি ওয়াশিংটন যাচ্ছি, বলল পিট। কাল তোমার সাথে দেখা করব।

ঠিক আছে, ম্লান কণ্ঠে বলল ইয়েজার।

ফোন রেখে অফিস থেকে বেরিয়ে এল পিট। ওর চেহারা দেখে লিলি বুঝল, আশাজাগানিয়া কিছু ঘটেনি।

ভালো কোনো খবর নেই, তাই না? পিটের পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল সে।

তার দিকে ফিরে কাঁধ ঝাঁকাল পিট। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, আবার সেখানেই ফিরে এসেছি।

পিটের বাহু ধরে মৃদু চাপ দিল লিলি। হতাশ হয়ো না তো। ইয়েজার পারবে, তুমি দেখো।

কিন্তু সে তো আর জাদুকর নয়!

অফিসঘরে উঁকি দিল জিওর্দিনো। প্লেন ধরতে হলে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হয়, পিট।

হেঁটে এসে এসবেনসনের উদ্দেশে মৃদু হাসল পিট। ওকে ভালো করে দাও, আমাদের সবার জীবন বাঁচিয়েছে গাড়িটা।

তা করব, এসবেনসন বলে, কিন্তু কথা দিতে হবে বুলেট আর স্কি ঢালের থেকে দূরে থাকবে?

ঠিক হ্যায়!

.

৩২.

পাবলিক গ্যালারিতে প্রশংসা আর হাততালির ঝড়; প্রধান ফ্লোরে বসে থাকা কূটনৈতিক নেতাদের সামনে কোনো রকম সাহায্য ছাড়াই মঞ্চে উঠে এলেন হে’লা কামিল। ক্রাচের সাহায্য নিয়ে হাঁটছেন তিনি। মাইকের সামনে একটু থেমে, জোরাল গলায় ভাষণ শুরু করলেন। স্পষ্ট, কাটা কাটা শব্দে। ধর্মের নামে নিরীহ লোকজনকে হত্যা থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ জানালেন প্রথমে।

আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি আবিষ্কারের সমূহ সম্ভাবনা ঘোষণা করার পর গুঞ্জন উঠল পুরো হলজুড়ে। তাকে হত্যা-প্রচেষ্টার জন্য সরাসরি আখমত ইয়াজিদকে দায়ী করলেন হেলা।

এরপর, দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি বললেন, যেকোনো ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাকে জাতিসংঘের মহাসচিবের পদ থেকে সরানো যাবে না।

মঞ্চ থেকে হেলা নেমে যাওয়ার বহুক্ষণ পরেও চলতে থাকল হাততালি।

.

দারুণ এক মহিলা, প্রশংসা করে বললেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তার মতো কাউকে পেলে মন্ত্রিসভায় থাকার জন্য অনুরোধ জানাতাম আমি। রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে টিভি সেট বন্ধ করে দিলেন প্রেসিডেন্ট।

চমৎক্তার বললেন মহিলা, সিনেটর পিট সায় দিলেন। শব্দচয়ন তুলনাহীন। আখমত ইয়াজিদকে একেবারে ধুয়ে দিয়েছেন।

হ্যাঁ, প্রেসিডেন্ট বললেন, আমাদের জন্য সেরা একটা ভাষণ।

সিনেটর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি জানেন নিশ্চয়ই, মিস কামিল প্রেসিডেন্ট হাসানের সাথে আলোচনা করার জন্য উরুগুয়ে যাচ্ছে?

ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকালেন প্রেসিডেন্ট। ডেইল নিকোলাস জানিয়েছে আমাকে। সার্চ কেমন এগোচ্ছে, সিনেটর?

লোকেশন খুঁজে বের করার জন্য নুমার কম্পিউটর ফ্যাসিলিটি কাজ করছে।

এগিয়েছে কত দূর?

চার দিন আগে যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি আমরা।

পেন ইউনিভার্সিটির একজনকে চিনি আমি, ট্রিপল-এ রিসার্চার বলা হয় তাকে, যদি মনে করেন তার সাহায্য নিতে পারেন আপনারা, পরামর্শ দিলেন প্রেসিডেন্ট।

আজই যোগাযোগ করব আমি, বললেন সিনেটর।

ধীর ভঙ্গিতে প্রেসিডেন্ট বললেন, প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানের কাছে আর্টিফ্যাক্ট দেয়ার সময় ধীরে আখমতকে সরিয়ে দিলে কেমন হয়?

আমিও তাই মনে করি। কিন্তু ইয়াজিদ যেন তেন লোক নয়।

নিশ্চই নিখুঁতও নয়।

তা বটে। কিন্তু আয়াতুল্লাহ খোমেনির মতো উন্মাদ নয় সে। চালাক লোক।

সিনেটরের দিকে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট। তার সম্পর্কে খুব কম জানি আমরা।

সে দাবি করে, জীবনের প্রথম ত্রিশ বছর সিনাই মরুতে একা একা ঘুরে বেড়িয়েছে, আলাপ করেছে আল্লাহর সাথে।

লোকটার উচ্চাশা আছে, মানতে হবে, তিক্ত হাসি ফুটল প্রেসিডেন্টের মুখে। পয়গম্বর হতে চায়। তার সম্পর্কে একটা রিপোর্ট তৈরি করতে বলেছিলাম সিআইএ চিফকে। বিশেষ করে ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে। দেখা যাক, কতদূর কী করল ওরা। ইন্টারকমে কথা বললেন তিনি, ডেইল, একটু আসবে?

পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে ওভাল অফিসে চলে এলেন ডেইল নিকোলাস।

আমরা আখমত ইয়াজিদকে নিয়ে আলাপ করছিলাম, তাকে জানালেন প্রেসিডেন্ট। সিআইএ কি ওর জীবনবৃন্তান্ত পেয়েছে?

ঘণ্টাখানেক আগে মার্টিন ব্রোগানের সাথে আমরা কথা হয়েছে। গবেষকরা এক কি দুদিনের মধ্যে ফাইল তৈরির কাজটা শেষ করতে পারবে বলে জানিয়েছে।

শেষ হলেই সেটা আমি দেখতে চাই। সোফা ছেড়ে উঠলেন প্রেসিডেন্ট।

ধরুন, বললেন সিনেটর, আগামী কয়েক সপ্তাহর মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির অস্তিত্ব আবিষ্কার হলো। আমরা সম্ভবত লাইব্রেরির শিল্পকর্ম আর নবশাগুলো মিসরকে ফিরিয়ে দেব। কিন্তু তার আগে, আনঅফিশিয়ালি, গোটা ব্যাপারটা সম্পর্কে আগেই যদি একটা আভাস দিয়ে রাখি প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানকে, কেমন হয় সেটা?

হ্যাঁ, তার জানা দরকার। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে ব্যাপারটা তাকে জানান আপনি, সিনেটর।

কাঁধ ঝাঁকালেন সিনেটর পিট। সরকারি বিমান পেলে মঙ্গলবার আমেরিকা ছেড়ে মিসরে উড়ে যেতে পারি আমি। প্রেসিডেন্ট হাসানকে গোটা ব্যাপারটা জানিয়ে আবার ফিরে আসব ওইদিন বিকেলেই।

প্রেসিডেন্ট হাসানকে ব্যক্তিগতভাবে বলবেন, ইয়াজিদের বিরুদ্ধে তিনি যদি কোনো অ্যাকশন নিতে চান, আমি তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করতে প্রস্তুত।

বাজে আইডিয়া, সিনেটর পিট বললেন, এই প্রস্তাব ফাস হলে আপনার সরকার টলে যাবে।

আপনার সতোর প্রতি আমার আস্থা আছে।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সিনেটর। লাইব্রেরির বই-পুস্তক, শিল্পকর্ম বিষয়ক কথাবার্তা আমি বলব। কিন্তু ইয়াজিদকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।

নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রেসিডেন্ট। সিনেটরের সঙ্গে হাত মেলালেন।

আমি কৃতজ্ঞ, বন্ধু। বুধবার আপনার রিপোর্টের আশায় থাকব।

বিদায়, প্রেসিডেন্ট।

ওভাল অফিস ছেড়ে বেরোনোর সময় সিনেটর পিটের মনে হলো, বুধবার সন্ধ্যেয় নির্ঘাত একা একা ডিনার করবেন প্রেসিডেন্ট।

.

৩৩.

আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মূল ভূখণ্ডের পশ্চিমে ডুব দেবে সূর্য, এই সময় পাল্টা ডেল এসটের ছোট্ট বন্দরে সাবলীল ভঙ্গিতে ঢুকে পড়ল প্রমোদতরী লেডি ফ্ল্যামবোরো। মৃদুমন্দ দেখিনা বাতাসে উড়ছে ব্রিটেনের পতাকা।

সুশোভিত, সুদর্শন একটা জাহাজ, দেখামাত্র চোখ জুড়িয়ে যায়। কখনোই একশোর বেশি আরোহী ভোলা হয় না। তাদের সেবা করার জন্য রয়েছে সমান সংখ্যক ক্রু সদস্য। সান হুয়ান থেকে আসার সময় এবার অবশ্য কোনো আরোহী নিয়ে আসেনি লেডি ফ্ল্যামবোরো।

টু ডিগ্রিজ পোর্ট, কৃষ্ণাঙ্গ পাইলট বলল।

টু ডিগ্রিজ পোর্ট, সাড়া দিল হেলমসম্যান।

খাকি শর্টস আর শার্ট পরে আঙুলের মতো লম্বা মাটির বাড়তি অংশটির ওপর হিসেবি চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল পাইলট, মাটির বাড়তি এই অংশটাই আড়াল করে রেখেছে বে-কে। ধীরে ধীরে সেটাকে ছাড়িয়ে এল লেডি ফ্ল্যামবোরো।

স্টারবোর্ডের দিকে ঘুরতে শুরু করো-হোল্ড স্টেডি অ্যাট জিরো এইট জিরো।

নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করল হেলমসম্যান, অত্যন্ত ধীরগতিতে নতুন কোর্স ধরল জাহাজ।

আরও অনেক রংচঙে প্রমোদতরী ও ইয়ট রয়েছে বন্দরে। অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষ্যে ভাড়া করা হয়েছে অনেক জাহাজ, বাকিগুলো তাদের আরোহীদের নামাচ্ছে।

নোঙর করার স্থান থেকে আধ কিলোমিটার দূরে থাকতে পাইলট নির্দেশ দিল ডেড স্টপ!

শান্ত পানি কেটে আপন গতিতে এগোল লেডি ফ্ল্যামবোরো, দূরত্ব কমিয়ে এনে ধীরে ধীরে থামছে। সন্তুষ্ট হয়ে পোর্টেবল ট্রান্সমিটারে পাইলট জানাল, পজিশনে পৌঁছেছি আমরা। হুক ফেলল।

নির্দেশটা বো-র দিকে পাঠানো হলো, সাথে সাথে পানিতে ফেলা হলো নোঙর। এতক্ষণে ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দিল পাইলট।

সাদা ইউনিফর্ম পরা এক ভদ্রলোক ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সহাস্য বদনে করমর্দনের জন্য পাইলটের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। প্রতিবারের মতই নিখুঁত, মি. ক্যাম্পোস। ক্যাপটেন অলিভার কলিন্স বিশ বছর ধরে পাইলট হ্যারি ক্যাম্পোসকে চেনেন।

আর যদি ত্রিশ মিটার লম্বা হতে জাহাজটা, কোনোমতেই বন্দরে ঢোকাতে পারতাম না। তামাকের দাগে কালো দাঁত বের করে হাসল ক্যাম্পোস। তবে আমরা ওপর নির্দেশ আছে, বন্দরেই নোঙর ফেলতে হবে, জেটিতে ভিড়তে পারব না।

অবশ্যই নিরাপত্তার কারণে, আন্দাজ করা যায়, ক্যাপটেন বললেন।

আধপোড়া একটা চুরুট ধরাল পাইলট। শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি গোটা দ্বীপটাকে ওলটপালট করে ছেড়েছে। সিকিউরিটি পুলিশের হাবভাব দেখে মনে হয় প্রতিটি পাম গাছের আড়ালে একজন করে স্নাইপার লুকিয়ে আছে।

ব্রিজের জানালা দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জনপ্রিয় খেলার মাঠের দিকে তাকালেন ক্যাপটেন। আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সম্মেলন চলার সময় এই জাহাজে মেক্সিকো আর মিসরের প্রেসিডেন্ট থাকবেন।

তাই? বিড়বিড় করে বিস্ময় প্রকাশ করল পাইলট। তাহলে সেজন্যই তীর থেকে দূরে রাখতে বলা হয়েছে আপনাকে।

আসুন না, আমার কেবিনে বসে গলাটা ভিজিয়ে নেবেন, আমন্ত্রণ জানালেন ক্যাপটেন কলিন্স।

অসংখ্য ধন্যবাদ, মাথা নেড়ে বলল ক্যাম্পোস। বন্দরের জাহাজগুলোর দিকে একটা হাত তুলল সে। আজ অনেক কাজ, আরেক দিন হবে।

কাগজপত্র সেই করিয়ে নিয়ে বন্দর পাইলট ক্যাম্পোস নিজের বোটে নেমে গেল। হাত নাড়ল সে, তাকে নিয়ে চলে গেল বোট।

এত আনন্দ আর কখনও পাইনি, কলিন্সের ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনি বলল। এরা সবাই হাজির, কিন্তু আরোহী বলতে কেউ নেই। ছয় দিন ধরে আমার মনে হচ্ছে, মারা যাবার পর স্বর্গে পাঠানো হয়েছে আমাকে।

কোম্পানির নির্দেশ, ক্রুরা যতটা সময় জাহাজ চালানোয় ব্যয় করবে, সেই একই পরিমাণ সময় ব্যয় করতে হবে আরোহীদের মনোরঞ্জনের জন্য। এই দায়িত্ব পছন্দ নয় মাইকেল ফিনির। অত্যন্ত দক্ষ একজন নাবিক সে, মেইন ডাইনিং সেলুনের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে থাকে, খাওয়া-দাওয়া সারে সঙ্গী অফিসারদের সাথে, সারাক্ষণ জাহাজের খবরদারিতে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে। শরীরটা তার প্রকাণ্ড, ড্রাম আকৃতির ধড়, আঁটসাট ইউনিফর্ম ছিঁড়ে সেটা যেন প্রতি মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে চাইছে।

নেতাদের গালগল্প নিশ্চয়ই তুমি শুনতে চাইবে, কৌতুক করে বললেন ক্যাপটেন।

চেহারায় অসন্তোষ নিয়ে মাইকেল ফিনি বলল, ভিআইপি প্যাসেঞ্জারদের সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। একই প্রশ্ন বারবার করা তাদের একটা বদঅভ্যেস।

কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে আরোহী মাত্রেই শ্রদ্ধেয়, মাইক। আগামী কয়েকটা দিন নিজের আচরণের প্রতি লক্ষ রেখো, প্লিজ। অতিথি হিসেবে এবার আমরা বিদেশি নেতা আর রাষ্ট্রপ্রধানদের পাচ্ছি।

জবাব দিল না মাইকেল ফিনি, সৈকতের দিকে তাকিয়ে আকাশছোঁয়া ভবনগুলো দেখছে। পুরনো শহরটায় যখনই আসি, প্রতিবার নতুন একটা হোটেল দেখতে পাই।

হ্যাঁ, তুমি তো উরুগুয়েরই লোক।

মন্টিভিডিয়োর সামান্য পশ্চিমে জন্ম আমার।

বাড়ি ফেরার আনন্দটুকু উপভোগ করছো না?

এ শহরে, শুধু শহরে কেন, এ দেশে আপন বলতে কেউ নেই আমরা। ষোলো বছর বয়স থেকে জাহাজে চাকরি নিয়ে সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সাগরই আমার আসল ঠিকানা। মাইকেল ফিনি-র চেহারা হঠাৎ বিরূপ হয়ে উঠল। জানালার দিকে একটা হাত তুলে দেখল সে। ওই যে, ব্যাটারা আসছে-কাস্টমস আর ইমিগ্রেশন ইন্সপেক্টরের দল।

প্যাসেঞ্জার নেই, ক্রুরাও কেউ তীরে নামছে না, রাবার স্ট্যাম্প মেরেই চলে যাবে ওরা।

হেলথ ইন্সপেক্টরকে বিশ্বাস নেই, প্যাঁচ কষলেই হলো!

পারসারকে জানাও, মাইক। তারপর ওদেরকে নিয়ে আমার কেবিনে চলো এসো।

মাফ করবেন, স্যার, একটু বেশি খাতির করা হয়ে যাবে না? স্রেফ কাস্টমস ইন্সপেক্টরদের ক্যাপটেনের কেবিনে ডাকা কি উচিত?

হয়তো একটু বেশি হচ্ছে, তবে বন্দরে থাকার সময় বিশেষ করে ওদের সাথে সদ্ভাভ রাখতে চাই আমি, ক্যাপটেন বললেন। বলা তো যায় না কখন আমাদের উপকার দরকার হয়।

ইয়েস স্যার!

লেডি ফ্ল্যামবোয়রার গায়ে বোট ভিড়ল, মই বেয়ে উঠে এল অফিসাররা। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। হঠাৎ করে জাহাজের আলো জ্বলে উঠে ঝলমলে করে তুলল আপার ডেক আর সুপারস্ট্রাকচার। শহর আর অন্যান্য জাহাজের আলোকমালার মাঝখানে নোঙর করা লেডি ফ্ল্যামবোরোকে গহনার বাক্সে হীরের একটা টুকরো মনে হলো।

উরুগুয়ের সরকারি অফিসারদের নিয়ে পাইলটের কেবিনের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনিকে। তাকে অনুসরণরত পাঁচজন লোককে খুঁটিয়ে লক্ষ করলেন ক্যাপটেন। অভিজ্ঞ মানুষ, তার চোখকে ফাঁকি দেয়া সহজ নয়। প্রায় সাথে সাথেই বুঝলেন তিনি, কোথায় কী যেন একটা মিলছে না। অন্তত পাঁচজনের মধ্যে একজনকে অদ্ভুত লাগল তাঁর। লোকটার মাথায় স্ট্র হ্যাট, এত চওড়া আর নিচে নেমে আছে যে তার চোখ দুটো দেখা গেল না। পরে আছে একটা জাম্পস্যুট। বাকি সবার পরনে স্বাভাবিক ইউনিফর্ম। ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোর বেশির ভাগ অফিসারই এই ইউনিফর্ম পরে।

অদ্ভুত লোকটা তার সঙ্গীদের পিছু পিছু আসছে মাথা নিচু করে। সবাইকে নিয়ে দোরগোড়ায় পৌঁছল মাইকেল ফিনি, একপাশে সরে দাঁড়িয়ে অফিসারদের আগে ঢোকার সুযোগ করে দিল।

সামনে বাড়লেন ক্যাপটেন কলিন্স। গুড ইভনিং, জেন্টলমেন। লেডি ফ্ল্যামবোরোয় আপনাদের স্বাগত জানাই। আমি ক্যাপটেন অলিভার কলিন্স।

কি ব্যাপার, অফিসাররা কেউ নড়ছে না বা কথা বলছে না কেন? মাইকেল ফিনির সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলেন ক্যাপটেন। এই সময় জাম্পস্যুট পরা লোকটা এক পা সামনে বাড়লো। পা থেকে ধীরে ধীরে জাম্পস্যুটটা খুলে ফেলল সে, ভেতরে দেখা গেল সোনার কাজ করা সাদা ইউনিফর্ম, হুবহু ক্যাপটেন কলিন্স যেমন পরে আছেন মাথা থেকে স্ট্র হ্যাটটা নামাল সে, পরল একটা ক্যাপ, ইউনিফর্মের সাথে মানানসই।

সাধারণত কোনো ব্যাপারেই দিশেহারা হন না ক্যাপটেন, কিন্তু আজ চোখের সামনে এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটতে দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো, তিনি যেন একটা আয়নায় তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছেন। আগন্তুককে তার যমজ ভাই বলে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়।

কে আপনি? বাকশক্তি ফিরে পেয়ে কঠিন সুরে জিজ্ঞেস করলেন ক্যাপটেন। কী ঘটছে এখানে?

নাম জেনে আপনার কাজ নেই, সবিনয় হাসির সাথে বলল সুলেমান আজিজ। আপনার জাহাজের দায়িত্ব এখন থেকে আমি নিলাম।

.

৩৪.

চোরাগোপ্তা হামলার সাফল্য নির্ভর করে হতচকিত করে দেয়ার ওপর। সুলেমান আজিজ আর তার অনুচররা কাজটা এমন নিখুঁতভাবে সারল যে ক্যাপটেন, ফাস্ট অফিসার আর পারসার ছাড়া জাহাজের আর কেউ জানতেই পারল না তাদের জাহাজে বেদখল হয়ে গেছে। ওদের তিনজনকে ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনি-র কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো, বাঁধা হলো হাত-পা, মুখে টেপ লাগানো হলো, বন্ধ দরজার ভেতর পাহারায় থাকল সশস্ত্র একজন লোক।

সুলেমান আজিজের সময়ের হিসাবটাও নিখুঁত। উরুগুয়ের নির্ভেজাল কাস্টমস অফিসাররা মাত্র বারো মিনিট পর হাজির হলো জাহাজে। মাইকেল কলিগের প্রায় নিখুঁত ছদ্মবেশ নিয়েছে সে, অফিসারদের অভ্যর্থনা জানাল এমনভাবে যেন তাদের সাথে তার কতকালের পরিচয়। মাইকেল ফিনি আর পারসারের ভূমিকায় যে দু’জনকে বেছে নিয়েছে, বেশির ভাগ সময় ছায়ায় ভেতর থাকল তারা। দু’জনেই তারা অভিজ্ঞ নাবিক, যাদের ভূমিকায় নামানো হয়েছে তাদের সাথে চেহারার মিলও যথেষ্ট। তিন মিটারের বেশি দূর থেকে খুব কম লোকই তাদের চেহারার পার্থক্য ধরতে পারবে।

অনুসন্ধান শেষ করে কাস্টমস অফিসাররা বিদায় নিল। কলিন্সের সেকেন্ড আর থার্ড অফিসারকে ক্যাপটেনের কেবিনে ডেকে পাঠাল সুলেমান আজিজ। এটাই হবে তার প্রথম ও কঠিনতম পরীক্ষা। এই দুই অফিসারের চোখকে যদি ফাঁকি দিতে পারা যায়, নিরীহ ও অজ্ঞ সহযোগী হিসেবে তার স্বার্থে আগামী চব্বিশ ঘণ্টা অমূল্য অবদান রাখবে তারা।

প্লেন হাইজ্যাক করার আগে, ক্যাপটেন ডেইল লেমকের ভূমিকা গ্রহণের সময়, ছদ্মবেশ নেয়ার পদ্ধতিটা ছিল অন্যরকম। ডেইল লেমকেকে খুন করার পর অনায়াসে তার মুখের একটা প্লাস্টিক ছাঁচ তৈরি করে নিয়েছিল সে। লেডি ফ্ল্যামবোরোর ক্যাপটেন অলিভার কলিন্সকে খুন করার সুযোগ হয়নি তার, কাজেই তার ছদ্মবেশ নিতে গিয়ে মাইকেল কলিন্সের আটটা ফটো সংগ্রহ করে সে। কণ্ঠস্বর কলিন্সের সমান পর্দায় তোলার জন্য বিশেষ এক ধরনের মেডিসিন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে।

দক্ষ একজন শিল্পীকে ভাড়া করে সুলেমান আজিজ, কলিন্সের ফটোগুলো দেখে লোকটা তাকে বানিয়ে দেয় একটা মূর্তি। ভাস্কর্যটি থেকে নারী ও পুরুষ, দুধরনের ছাঁচ তৈরি করা হয়। সেই ছাঁচ মুখোশ হিসেবে কাজে লাগায় সুলেমান আজিজ। কলিন্সের মুখের রং আনার জন্য মুখোশে ব্যবহার করা হয় গাছের দুধসাদা নির্যাস। ফোমের তৈরি কান লাগিয়েছে সুলেমান আজিজ। কলিন্সের চোখের রং পাবার জন্য কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেছে। দাঁতে পরেছে টুথক্যাপ।

ক্ষমা করবেন, জেন্টলমেন, ঠাণ্ডা লেগে গলাটা বসে গেছে।

জাহাজের ডাক্তারকে খবর দেব? সেকেন্ড অফিসার হারবার্ট পারকার জিজ্ঞেস করল। দীর্ঘদেহী সে, রোদে পোড়া তামাটে রং গায়ের, শিশুসুলভ নিরীহ চেহারা।

ভুল হয়ে গেছে, ভাবল সুলেমান আজিজ। ক্যাপটেন কলিন্সকে চেনে ডাক্তার, কাছ থেকে পরীক্ষা করলেই মুখোশটা চিনে ফেলতে পারে। এর মধ্যে তিনি আমাকে এক গাদা ট্যাবলেট দিয়েছেন, এখন ভালোর দিকে।

থার্ড অফিসার, স্কটল্যান্ডের অধিবাসী, নাম আইজ্যাক জোন্স, কপাল থেকে লাল চুল সরিযে গলাটা সামনের দিকে লম্বা করল। আমাদের কিছু করার আছে, স্যার?

হ্যাঁ, আছে বৈকি, মি. জোন্স! অফিসারদের ফটো দেখা আছে, নাম-ধামও জানা কাজেই আলাপ চালিয়ে যেতে সুলেমান আজিজের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আমাদের ভিআইপি প্যাসেঞ্জাররা কাল বিকেলে আসছেন। অভ্যর্থনা কমিটির নেতৃত্ব দেবে তুমি। একসাথে দু’জন প্রেসিডেন্টকে অতিথি হিসেবে পাওয়া দুর্লভ একটা সম্মান, স্বভাবতই কোম্পানি আশা করবে প্রথম শ্রেণীর আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করব আমরা।

ইয়েস স্যার, দৃঢ়কণ্ঠে বলল জোন্স। ভরসা রাখতে পারেন।

মি. পারকার।

ক্যাপটেন।

এক ঘণ্টার মধ্যে একটা বোট আসছে, কোম্পানির কার্গো নিয়ে। তুমি লোডিং অপারেশনের চার্জে থাকবে। আজ সন্ধ্যায় সিকিউরিটি অফিসারদের একটা দলও আসছে। তাদের থাকার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করবে, প্লিজ।

কার্গো নিতে হবে? নোটিশটা আরও আগে পেলে ভালো হতো না, স্যার? আর, আমি ভেবেছিলাম, মিসরীয় ও মেক্সিকোর সিকিউরিটি অফিসাররা আসবেন কাল সকালে।

আমাদের কোম্পানির ডিরেক্টররা চিরকাল রহস্যময় আচরণ করেন, খানিকটা অভিযোগের সুরে বলল সুলেমান আজিজ। সশস্ত্র অতিথিদের কথা যদি বলেন, এ ক্ষেত্রেও কোম্পানির আদেশ কাজ করছে। সাবধানের মার নেই ভেবে তারা নিজেদের লোক রাখতে চাইছে।

তার মানে একদল সিকিউরিটি অফিসার আরেকদল সিকিউরিটি অফিসারের ওপর নজর রাখবে?

অনেকটা তাই। আমার ধারণা, লয়েডস ব্যাঙ্ক অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা দাবি জানিয়েছে, তা না হলে বীমার রেট বাড়িয়ে দেবে।

বুঝতে পারছি।

কোনো প্রশ্ন, জেন্টলমেন?

কারও কোনো প্রশ্ন নেই, অফিসাররা চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।

হারবার্ট, আরেকটা কথা, বলল সুলেমান আজিজ। কার্গো লোড করবে যতটা সম্ভব চুপচাপ আর তাড়াতাড়ি, প্লিজ।

ঠিক আছে, স্যার।

ডেকে বেরিয়ে গিয়ে হারবার্ট পারকার, আইজ্যাক জোন্সের দিকে তাকাল। শুনলে? উনি আমার নামের প্রথম অংশ ধরে ডাকলেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়?

জোন্স নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকাল। উনি বোধহয় সত্যি খুব অসুস্থ।

ঠিক এক ঘণ্টা পরই লেডি ফ্ল্যামবোরার পাশে এসে থামল লোডিং ক্রাফট, সাথে সাথে একটা সেতুবন্ধ রচনা করা হলো। কার্গো লোড করার সময় কোনো বিঘ্ন ঘটল না। সুলেমান আজিজের বাকি লোকরাও, সবার পরনে বিজনেস স্যুট, পৌঁছল জাহাজে। চারটে খালি স্যুইট ছেড়ে দেয়া হলো তাদেরকে

মাঝরাতের দিকে মাল খালাস করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ল্যান্ডিং ক্রাফট। লেডি ফ্ল্যামবোরোর সেতু তুলে নেয়া হলো। হোল্ডের ভেতর ঠাই পেয়েছে কার্গো, হোন্ডের বিশাল ডাবল ডোর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

মাইকেল ফিনি-র দরজায় তিনবার টোকা দিল সুলেমান আজিজ। সামান্য ফাঁক হলো কবাট, ভেতর থেকে উঁকি দিল সশস্ত্র গার্ড। কার্পেট মোড়া প্যাসেজওয়ের দুদিকে চট করে একবার তাকাল সুলেমান আজিজ, কেউ কোথাও নেই। তাড়াতাড়ি কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ল সে।

গার্ডের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করল সে। নিঃশব্দে এগিয়ে গেল গার্ড। ক্যাপটেন মাইকেল কলিঙ্গের মুখ থেকে টেপটা খুলে দিল সে।

কষ্ট দিতে হচ্ছে, সেজন্য সত্যি আমি দুঃখিত, ক্যাপটেন, বলল সুলেমান আজিজ। কিন্তু ধরুন, যদি আপনাকে আটকে না রেখে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিতাম, আপনি পালাতে চেষ্টা করতেন না? বা ক্রুদের সাবধান করতেন না?

একটা চেয়ার আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বসে আছেন ক্যাপটেন, হাত আর পা চেয়ারের সাথে বাঁধা, চোখে আগুন ঝরা দৃষ্টি। তুমি একটা নর্দমার কীট!

তোমরা ব্রিটিশরা, জুতসই গাল দিতেও জানো না! হেসে উঠল সুলেমান আজিজ। আমেরিকানরা এ ব্যাপারে ওস্তাদ। তারা চার অক্ষরের শব্দ ব্যবহার করে যা বলে তারচেয়ে খারাপ খিস্তি আর হয় না।

তুমি আমার ক্রুদের কোনো সাহায্য পাবে না।

কিন্তু আমি যদি আমার লোকদের অর্ডার দিই, আপনার মহিলা ক্রুদের গলা কেটে সাগরে ফেলে দিতে? এদিকের পানিতে হাঙর আছে তা তো আপনি জানেনই।

হাত-পা বাঁধা থাকলেও, রাগের মাথায় সুলেমান আজিজের দিকে লাফিয়ে পড়তে চাইল মাইকেল ফিনি। তার তলপেটে রাইফেলের মাজল চেপে ধরে বাঁধা দিল গার্ড চেয়ারে পিছিয়ে গেল ওয়েট, ব্যথায় কুঁচকে উঠল তার চেহারা।

ক্যাপটেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সুলেমান আজিজের দিকে। যা খুশি করতে পারো তুমি, টেরোসিস্টদের সাথে কোনো সহযোগিতার প্রশ্ন ওঠে না, দৃঢ়কণ্ঠে বললেন তিনি।

সন্ত্রাসবাদী বলুন আর যাই বলুন, প্রথম শ্রেণীর প্রফেশনাল আমরা, শান্তভাবে ব্যাখ্যা করল সুলেমান আজিজ। কাউকে খুন করার কোনো ইচ্ছেই আমাদের নেই। টাকা চাই, আর তাই আমরা প্রেসিডেন্ট হাসান ও প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জোকে আটক করব। আপনারা যদি বাধা হয়ে না দাঁড়ান, দুই সরকারের সাথে একটা সমঝোতায় আসব আমরা, টাকা নিয়ে চলে যাব।

সুলেমান আজিজের মুখোশ আঁটা চেহারা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন ক্যাপটেন কলিন্স, লোকটা মিথ্যে বলছে কিনা বুঝতে চাইছেন। তার মনে হলো, লোকটা সত্যি কথাই বলছে। ভদ্রলোকের জানা নেই, সুলেমান আজিজের রয়েছে দুর্লভ অভিনয় প্রতিভা।

তা না হলে তুমি আমার ক্রুদের খুন করবে?

তাদের সাথে আপনাকেও।

কী চাও তুমি?

প্রায় কিছুই না। মি. পারকার আর মি. জোন্স আমাকে ক্যাপটেন কলিন্স বলে বিশ্বাস করে নিয়েছেন। কিন্তু আমার দরকার ফাস্ট অফিসারের সার্ভিস। আপনি তাকে আমার নির্দেশ মানার হুকুম দিন।

কেন, মি, ফিনির সার্ভিস কেন দরকার তোমার?।

আপনার কেবিনে ডেস্ক ড্রয়ারটা খুলে অফিসারদের পার্সোনাল রেকর্ড পড়েছি আমি, বলল সুলেমান আজিজ। মি. মাইকেল ফিনি এদিকের পানি সম্পর্কে জানেন।

ঠিক কী চাইছ?

একজন পাইলটকে জাহাজে ডাকার ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না, ব্যাখ্যা করল সুলেমান আজিজ। কাল সন্ধের পর হেলম-এর দায়িত্ব ফিনিকে নিতে হবে, জাহাজটাকে চালিয়ে চ্যানেল থেকে বের করে নিয়ে যাবেন উনি খোলা সাগরে।

শান্তভাবে প্রস্তাবটি বিবেচনা করলেন ক্যাপটেন। খানিক পর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন তিনি। বন্দর কর্তৃপক্ষ খবর পাওয়ামাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দেবে, ক্রুদের তোমরা খুন করার ভয় দেখাও আর নাই দেখাও।

টের পাবে না। কালো রং করা একটা জাহাজ কালো রাতে অনায়াসে কর্তৃপক্ষের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে।

কতদূর যেতে পারবে বলে মনে করো? দিনের আলো ফোঁটার সাথে সাথে লেডি ফ্ল্যামবোরোর একশো মাইল ঘিরে চারদিকে গিজগিজ করবে পেট্রল বোট।

তারা আমাদের খুঁজে পাবে না, আশ্বস্ত করার সুরে বলল সুলেমান আজিজ।

সামান্য অস্থির দেখাল ক্যাপটেনকে। বললেই তো হবে না! লেডি ফ্ল্যামবোয়রার মতো একটা জাহাজকে কেউ লুকিয়ে ফেলতে পারে না।

সত্যি কথা, বলল সুলেমান আজিজ, সবজান্তর হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। অন্যের বেলায় সত্যি। কিন্তু আমি এটাকে গায়েব করে দিতে পারি।

কাল সকালে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান, নিজের কেবিনে বসে নোট লিখছে আইজ্যাক জোন্স। দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল হারবার্ট পারকার। ক্লান্ত সে, ইউনিফর্ম ঘামে ভিজে আছে।

ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল জোন্স। লোডিং ডিউটি শেষ হলো?

হ্যাঁ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।

ঘুমোবার আগে এক ঢোক চলবে নাকি?

তোমার স্কটিশ মল্ট হুইস্কি?

ডেস্ক ছেড়ে উঠল আইজ্যাক জোন্স, ড্রেসারের দেরাজ থেকে একটা বোতল বের করল। দুটে গ্লাসে হুইস্কি ভরে ফিরে এল সে। ব্যাপারটাকে এভাবে দেখো-ভোররাতে নোঙর পাহারা দেয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছ।

কার্গো লোডিংয়ের চেয়ে সেটাই ভালো ছিল, ক্লান্ত সুরে বলল মার্টিন। তোমার কি খবর?

এই মাত্র ডিউটি শেষ হলো।

তোমার পোর্টে আলো না দেখলে ভেতরে ঢুকতাম না।

সকালের অনুষ্ঠানটা সুন্দর হওয়া চাই, তাই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো লিখে রাখছিলাম।

ফিনিকে কোথাও দেখতে পেলাম না, তাই ভাবলাম তোমার সাথেই কথা বলি।

এই প্রথম জোন্স লক্ষ করল পারকারের চেহারায় কেমন যেন একটা দিশেহারা ভাব। কী ব্যাপার, কী হয়েছে তোমার?

গলায় হুইস্কি ঢেলে খালি গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে থাকল পারকার। এ ধরনের কার্গো আগে কখনও তুলিনি আমরা। এটা একটা প্রমোদতরী, তাই না?

এ ধরনের কার্গো মানে? কী তুলেছ তোমরা? কৌতূহলী হয়ে উঠল জোন্স। চুপচাপ বসে থাকল পারকার, শুধু এদিক ওদিক মাথা নাড়ল। তারপর মুখ তুলে তাকাল সে, বলল, পেইন্টিং গিয়ার। এয়ার কমপ্রেসার, ব্রাশ, রোলার আর পঞ্চাশটা ড্রাম-বোধ হয় রং ভর্তি।

রং? জোন্স দ্রুত জিজ্ঞেস করল। কী রং?

মাথা নাড়ল পারকার। তা বলতে পারব না। ড্রামের লেখাগুলো স্প্যানিশ।

এর মধ্যে আশ্চর্য হবার কী আছে? রিফিটের সময় লাগবে মনে করে কোম্পানি ওগুলো হাতের কাছে রাখতে চাইতে পারে।

আহা, সবটুকু আগে শোনোই না। শুধু ওগুলো নয়, প্লাস্টিকের বিশাল আকারের অনেকগুলো রোলও আমরা তুলেছি।

প্লাস্টিক?

প্লাস্টিক আর প্রকাণ্ড আকারের অনেকগুলো ফাইবারবোর্ড, বলল পারকার। অন্ত ত কয়েক কিলোমিটার তো হবেই। লোডিং ডোর দিয়ে বহু কষ্টে ঢোকানো গেছে। ভেতরে গুজতেই বেরিয়ে গেছে তিন ঘণ্টা।

জোন্স তার খালি গ্লাসের দিকে আধবোজা চোখে তাকিয়ে থাকল। তোমার কি ধারণা, কোম্পানি ওগুলো নিয়ে কী করবে?

চোখে বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকাল পারকার, কপাল কুঁচকে উঠল। কী জানি! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

৩৫. সূর্য ওঠার খানিক পর

৩৫.

সূর্য ওঠার খানিক পরই পৌঁছে গেল মিসরীয় ও মেক্সিকোন সিকিউরিটি এজেন্টরা। জাহাজে ওঠার সাথে সাথে কাজ শুরু করল তারা। প্রথমে বিস্ফোরকের খোঁজে তল্লাশি চালালো জাহাজের প্রতিটি কোণে, তারপর সম্ভাব্য আততায়ীকে খুঁজে বের করার জন্য ক্রুদের রেকর্ড চেক করল। পাকিস্তানি ও ভারতীয় ক্রু অল্প কয়েকজন, বেশির ভাগই ব্রিটিশ, তাদের কারও মিসর বা মেক্সিকো সরকারের শত্রুতা নেই।

সুলেমান আজিজসহ আতঙ্কবাদী গ্রুপের সবাই অনর্গল স্প্যানিশ বলতে পারে, সিকিউরিটি এজেন্টদের প্রতি অত্যন্ত সহযোগিতার মনোভাব দেখল তারা। প্রত্যেকের কাছে ভুয়া ব্রিটিশ পাসপোর্ট আর ইনস্যুরেন্স-সিকিউরিটি ডকুমেন্ট রয়েছে, চাওয়ামাত্র দেখাতে ইতস্তত করল না।

প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো জাহাজে পৌঁছুলেন আরও খানিক পর। ছোটখাটো মানুষটার বয়স হয়েছে, পাকা চুল কটাও ঝরো ঝরো, চোখ জোড়া বেদনাকাতর, বুদ্ধিজীবীসুলভ তীক্ষ্ণ চেহারা।

প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জোকে অভ্যর্থনা জানাল সুলেমান আজিজ, মাইকেল কলিঙ্গের ভূমিকায় তার অভিনয় চমৎকার উতরে গেল। জাহাজের অর্কেস্ট্রা মেক্সিকোর জাতীয় সঙ্গীত বাজাল, তারপর মেক্সিকোর নেতা আর তাঁর স্টাফকে পথ দেখিয়ে পৌঁছে দেয়া হলো লেডি ফ্ল্যামবোয়রার স্টারবোর্ড সাইডে, যার যার আলাদা স্যুইটে।

দুপুরের খানিক পর জাহাজের গায়ে এসে ভিড়ল অদ্ভুত সুন্দর একটা ইয়ট। ইয়টের মালিক একজন মিসরীয় কোটিপতি, রফতানি তার প্রধান ব্যবসা। ইয়ট থেকে লেডি ফ্ল্যামবোরোয় পা রাখলেন প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান। ভদ্রলোকের বয়স যাই হোক, চুলে পাক ধরলেও, চেহারা আর স্বাস্থ্য দেখে মনে হবে এখনও তিনি যৌবনকে ধরে রাখতে পেরেছেন। তাঁর হাড়গুলো চওড়া, চামড়ার নিচে অতিরিক্ত মেদ জমতে দেননি, দাঁড়াবার ভঙ্গিটা টান টান।

মিসরের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হলো। তারপর অতিথিদের পৌঁছে দেয়া হলো পোর্ট সাইডের স্যুইটে।

তৃতীয় বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশজন সরকারপ্রধান পান্টা ডেল এসট শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন। কেউ কেউ তাদের জাতীয় নাগরিকদের কেন প্রাসাদতুল্য অট্টালিকায় উঠেছেন, কেউ পাঁচতারা হোটেলে, আবার কেউ বা তীর থেকে দূরে নোঙর করা প্রমোদতরীতে।

রাস্তা ও রেস্তোরাঁগুলো আগন্তুক কূটনীতিক আর সাংবাদিকে ভরে উঠল। হঠাৎ করে চলে আসা বিদেশি ব্যক্তিত্বের এই ভিড় সামলাতে পারবে কি না ভেবে উরুগুয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। এমনিতেই এসময়টায় পান্টা ডেল এসটে-তে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসে, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য জাতীয় সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সাধ্যমতো সব কিছু করলেও, মানুষের বিরতিহীন মিছিলে তাদের উপস্থিতি নগণ্য হয়ে পড়ল। প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াল যানবাহন নিয়ন্ত্রণ। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় যানজট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগল ছাড়াতে। সব দায়িত্ব কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে অবশেষে তারা শুধু সরকারপ্রধানদের নিরাপত্তার দিকটা দেখবে বলে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো।

স্টারবোর্ড ব্রিজ উইংয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুলেমান আজিজ, চোখে বাইনোকুলার, তাকিয়ে আছে শহরের দিকে। চোখ থেকে সেটা একবার নামিয়ে হাতঘড়ি দেখল সে।

পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে বিশ্বস্ত ভক্ত ও বন্ধু ইবনে। আপনি কি রাত নামার অপেক্ষায় আছেন?

তেতাল্লিশ মিনিট পর সূর্য ডুববে, না তাকিয়েই বিড়বিড় করে বলল সুলেমান আজিজ।

পানিতে বড় বেশি ব্যস্ততা, বলল ইবনে। বন্দরের চারদিকে ছোটোছুটি করছে ছোট ছোট অসংখ্য বোট, একটা হাত তুলে দেখল সে। প্রায় প্রতিটি বোটে সাংবাদিকরা রয়েছে, ডেকে দাঁড়িয়ে হৈচৈ করছে তারা-সরকারপ্রধানদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে

মেক্সিকান বা মিসরীয় ডেলিগেট, যারা প্রেসিডেন্টদের স্টাফ, শুধু তাদেরকে জাহাজে উঠতে দেবে, ইবনেকে নির্দেশ দিল সুলেমান আজিজ। আর কেউ যেন উঠতে না পারে।

আমরা বন্দর ত্যাগ করার আগে কেউ যদি তীরে যেতে চায়?

অনুমতি দেবে, বলল সুলেমান আজিজ। জাহাজের রুটিন স্বাভাবিক থাকা চাই। শহরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আমাদের উপকারে আসবে। ওরা যখন খেয়াল করবে আমরা নেই, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষকে বোকা মনে করা ঠিক নয়। সন্ধ্যার পর আমাদের আলো না জ্বললে খোঁজ নেবে ওরা।

ওদের জানানো হবে আমাদের মেইন জেনারেটর মেরামত করা হচ্ছে। আরেকটা প্রমোদতরীর দিকে হাত তুলল সুলেমান আজিজ, তীর থেকে আরও খানিক দূরে লেডি মেরেয়েটা আর ধনুক আকৃতির পেনিনসুলার মাঝখানে নোঙর ফেলেছে সেটা। ওটার আলো তীর থ