রক্ত-মাংসের সিকিউরিটি গার্ড বা আইডেনটিটি ডিটেকশন মেশিনকে সহজেই ফাঁকি দেয়া গেছে, এবার শেষ বাধাটা পেরুতে হবে ওদেরকে। শেষ বার ব্রিফ করার সময় মেল পেনার বলেছেন, এটাই আসল বাধা।
সম্পূর্ণ খালি একটা কামরায় ঢুকল ওরা, ভেতরে চোখ ধাঁধানো আলো। সামনেই একটা রোবোটিক সেনসরি সিকিউরিটি সিসেটম। ঘরে কোনো ফার্নিচার নেই, দেয়ালগুলোয় নেই কোনো ছবি। কামরায় একটাই দরজা।
আপনাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলুন, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর, জাপানি ভাষায় জানতে চাইল রোবট।
ইতস্তত করছেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। তাকে বলা হয়েছে, রোবট সেন্ট্রি মেশিন প্রশ্ন করবে। চাকা লাগানো একটা ডাস্টবিন থেকে প্রশ্ন বেরিয়ে আসবে, এ তিনি আশা করেন নি। জবাব দিলেন, ফাইবার অপটিক কমিউনিকেশন সিস্টেম মডিফাই করতে হবে।
আপনার জব অর্ডার আর পাস কোড।
কমিউনিকেশন ইন্সপেকশন ও টেস্ট প্রোগ্রামের জন্যে ইমার্জেন্সি অর্ডার ফরটি সিক্স- আর, খোলা হাত দুটো এক করলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো, আঙুলের ডগাগুলো আলতোভাবে পরস্পরের সঙ্গে ছোঁয়ালেন, ফিসফিস করে তিনবার বললেন, বাহ বিপদ হলে এখনই হবে, ভাবলেন তিনি। ব্রিটিশ অপারেটর সঠিক পাস সাইন ও কোড রোবোটিক সিকিউরিটি মেমোরিতে জমা করতে পেরেছে কিনা তার ওপর। নির্ভর করছে সব কিছু।
আমার সেনসিং স্ক্রীনে আপনাদের ডান হাত চেপে ধরুন, নির্দেশ দিল রোবোগার্ড।
ড্রাম আকৃতির বুকে নীল স্ক্রীন মিটমিট করছে, পালা করে প্রত্যেকে ওরা ডান হাত চেপে ধরল সেটার ওপর। কয়েক সেকেন্ড বোবা হয়ে থাকল রোবট, কমপিউটারে ডাটা প্রসেস করছে, মেমোরি ডিস্কের বর্ণনার সাথে মুখের আকার আকৃতির ও শরীরের গড়ন মিলিয়ে দেখছে।
একপাশে সরে দাঁড়াল রোবট। আপনারা ভেতরে ঢুকতে পারেন। বারো ঘণ্টার বেশি থাকতে হলে ছনম্বর সিকিউরিটি ফোর্সকে জানাতে হবে।
ব্রিটিশ অপারেটর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। শেষ বাধাটাও নির্বিঘ্নে পেরিয়ে এসেছে ওরা। কামরা থেকে বেরিয়ে কার্পেট মোড়া একটা প্যাসেজে চলে এলো তিনজন। প্যাসেজটা মেইন টানেলের সঙ্গে মিলেছে।
একটা বোডিং প্ল্যাটফর্মে চড়ল ওরা। বেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল লাল আর সাদা আলো। নির্মাণ উপকরণে ভর্তি একটা ট্রেন আন্ডারগ্রাউন্ড রেলস্টেশন থেকে এইমাত্র রওনা হলো। টানেলের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো ট্রাক। টানেলের মুখটা চার কি পাঁচ মিটার হবে ডায়ামিটারে, আন্দাজ করলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো।
তিন মিনিট ভৌতিক নিস্তব্ধতার ভেতর কাটল। একটা মাত্র রেললাইনের ওপর দিয়ে প্ল্যাটফর্মে এলো কারটা। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি ওটা, মাথাটা বুদবুদ আকৃতির কাঁচ দিয়ে ঢাকা, দশজন লোক বসতে পারবে। কারের ভেতরটা ফাঁকা, কন্ট্রোলে কেউ নেই। হিসহিস শব্দে খুলে গেল দরজা, কারে চড়ল ওরা।
এটা একটা ম্যাগলেভ, টিমোথি ওয়েদারহিল বললেন।
একটা কী? জিজ্ঞেস করল স্টেসি।
ম্যাগলেভ, ম্যাগনেটিক লেভিটেশন। দুটো চুম্বক পরস্পরকে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ করে। এর ওপর ভিত্তি করে ধারণাটা গড়ে উঠেছে। ট্রেনের নিচে শক্তিশালী ম্যাগনেট আছে, আর আছে সিঙ্গেল লাইনের কিনারায়, ওগুলোর ইন্টার অ্যাকশনে ফরে কারটা ছোটে একা ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম ফিল্ডের ওপর দিয়ে। সেজন্যেই এটাকে সাধারণত ফ্লোটিং ট্রেন বলা হয়।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কমপিউটরাইজড সেনসর সঙ্কেত দিল, সামনে কোনো বাধা নেই। ট্রাক-এর ওপর সবুজ আলো জ্বলে উঠল। নিঃশব্দে মেইন টিউব-এ ঢুকে পড়ল ওরা। ক্রমশ বাড়ছে গতি।
ড্রাগন খানিক পর স্টেসি জানতে চাইল, কত স্পীডে ছুটছি আমরা?
ঘণ্টায় তিনশো বিশ কিলোমিটার, টিমোথি ওয়েদারহিল জবাব দিলেন।
মাথা ঝাঁকালেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। এই গতিতে পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব আমরা।
কয়েক মিনিট পরই ফ্লোটিং ট্রেনের গতি কমতে শুরু করল। তারপর কোনো শব্দ না করে দাঁড়িয়ে পড়ল। আরেকটা খানি প্ল্যাটফর্মে নামল ওরা। ওরা নামতেই একটা টার্নটেবিলে উঠল ট্রেন। উল্টো দিকের রেইল-এ চলে গেল, তারপর এডো সিটির দিকে ছুটল আবার।
লাইনের শেষ মাথা, বিড়বিড় করলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। প্ল্যাটফর্মে একটা দরজা, সবাইকে নিয়ে সেদিকে এগোলেন তিনি। প্যাসেজে বেরিয়ে এলো ওরা। প্যাসেজটা শেষ হয়েছে এলিভেটরের সামনে।
এলিভেটরে চড়ে আরবি সংখ্যা লেখা কন্ট্রোলগুলোর দিকে তাকালেন টিমোথি ওয়েদারহিল। ওপরে, না নিচে? জানতে চাইলেন তিনি।
কটা ফ্লোর? কোনটায় রয়েছি আমরা? পাল্টা প্রশ্ন করল স্টেসি।
ফ্লোর বারোটা। দু নম্বরে রয়েছি।
কিন্তু হানামুরার স্কেচে মাত্র চারটে ফ্লোর ছিল, বললেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো।
ওগুলো প্রাথমিক ড্রইং ছিল, পরে নিশ্চয় বদলানো হয়।
তার মানে লেআউটের ওপর নির্ভর করাটা বোকামি হবে, মন্তব্য করল স্টেসি।
কমপিউটারাইজড ইলেকট্রনিক্স স্টেশন কোন দিকে জানি না, বললেন টিমোথি ওয়েদারহিল। কাজেই অরিজিন্যাল প্ল্যান ধরে কাজ করতে হবে আমাদের। প্রথমে যাব পাওয়ার জেনারেটিং স্টেশন।
যদি কেউ বাধা না দেয়। ইলেকট্রিকাল ওয়ারিং অনুসরণ করলে সময় কম লাগবে।
বারোটা ফ্লোরে অসংখ্য কামরা, অসংখ্য প্যাসেজ, বিড়বিড় করল স্টেসি। হয়তো ঘণ্টার পর ঘন্টা ঘুরঘুর করাই সার হবে।
