গুড বাই। অনেক করেছেন, সেজন্যে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
পিটের কাঁধে হাত রাখল অ্যাল, উৎসাহ দেয়ার ছলে চোখ মটকাল, আর কোন কথা না বলে এগিয়ে গেল নিজের এয়ারক্রাফটের দিকে।
পিট ওর গ্লাইডারে উঠল নিচের দিক থেকে, সরু একটা হ্যাঁচ গলে। ফোম রাবার প্যাডে পেট দিয়ে শুয়ে পড়ল ও। পা দুটোর চেয়ে সামান্য একটু উঁচুতে রয়েছে কাঁধ ও মাথা, কনুই দুটো মুক্ত অবস্থায় ঝুলছে মেঝে থেকে এক সেন্টিমিটার উপরে। সেফটি হারনেস আর বেল্ট অ্যাডজাস্ট করল ও। তারপর ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজার ও ব্রেক পেডালের গ্লিপ-এর পা ঢোকাল, এক হাতে ধরল কন্ট্রোল স্টিক, অপর হাতে অ্যাডজাস্ট করল কন্ট্রোল সেটিং।
উইন্ডস্ক্রীন দিয়ে ক্রুদের দিকে তাকাল পিট, কেবল রিলিজ করার জন্যে অপেক্ষা করছে তারা। স্টার্টার এনগেজ করল ও। সচল হলো টারবাইন। অ্যালের দিকে তাকাল। শুধু তার চোখ দুটো দেখতে পেল। বুড়ো আঙুল খাড়া করে সঙ্গেত দিল পিট, উত্তরে অ্যালও আঙুল খাড়া করল।
ইঙ্গিতে টাই-ডাউন কেবল রিলিজ করতে বলল পিট। তারপর ফুল স্টপে সরিয়ে আনল থ্রটল। জোরাল বাতাস আর টারবাইনের শক্তি পেয়ে কাঁপতে শুরু করেছে আইবিস। ব্রেক রিলিজ করল ও, তাকিয়ে আছে ল্যান্ডিং প্যাডের শেষ মাথার দিকে। লাফ দিয়ে ছুটল আইবিস। একটু পর ধীরে ধীরে কন্ট্রোল স্টিক পিছিয়ে আনল ও। গ্লাইডারের ছোট্ট নোজ হুইল প্যাড ছেড়ে শূন্যে উঠে পড়ল, সামনে মেঘ দেখতে পেল পিট।
চল্লিশ মিটার উঠে আইবিসকে সিধে করে নিল ও, ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল অ্যালের দিকে। ওর পিছনেই রয়েছে সে। দুজনেই জাহাজটাকে ঘিরে একটা চক্কর দিল, হাত নাড়ল ক্রু ও অফিসারদের উদ্দেশে। তারপর কোর্স স্থির করে রওনা হলো সোসেকি দ্বীপের দিকে। নিচে অশান্ত প্রশান্ত মহাসাগর।
পিটের ইচ্ছে হলো আকাশের আরও অনেক উপরে ওঠে যায়, দুএকটা ডিগবাজি খায়, মজা করে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। যে-কোন অস্বাভাবিক নড়াচড়া জাপানিদের রাডার স্ক্রীনে ধরা পরে যেতে পারে। আইবিসকে সোজা ও সরল একটা রেখায় রেখে, ঢেউয়ের মাথা ছুঁয়ে এগোলে, ধরা পড়ার কোন আশঙ্কা নেই।
এতক্ষণে ভাবতে শুরু করল পিট, দ্বীপে পৌঁছানোর পর কি ঘটবে। ভবনগুলোর উঠান থেকে পালানোর সুযোগ খুবই কম। কি একটা সেট-আপ, ভাবল ও। সুমার উঠান ক্র্যাশ ল্যান্ড করো, তার সিকিউরিটি ফোর্সের চোখে ধরা পড়ো, তা না হলে দ্বিতীয় দলটা ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারবে না।
নেভিগেশনে মন দিল পিট, একটা চোখ রাখল কম্পাসে। গতি বজায় রাখতে পারলে পঁয়ত্রিশ মিনিট পর দ্বীপে নামবে ওরা। তবে দুএক ডিগ্রী এদিক ওদিক হয়ে গেলে দ্বীপটাকে খুঁজে পাওয়াই কঠিন হবে।
সাতাশ মিনিট পর, দিগন্তরেখায় খিলান আকৃতির আংশিক সূর্য দেখা যাচ্ছে উইন্ডস্ত্রীনের ভেতর দিয়ে সামনে তাকাল পিট।
কি যেন একটা দেখা যাচ্ছে সাগর আর আকাশের মাঝখানে লালচে-বেগুনি একটা ছায়া যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে বেশি কল্পিত। ধীরে ধীরে একটা দ্বীপের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠছে। এবড়োথেবড়ো পাহাড়-প্রাচীন অশান্ত সফেন সাগর থেকে খাড়া উঠে এসেছে।
মাথা ঘুরিয়ে পাশের জানালা দিয়ে তাকাল পিট, ওর ডান দিকেও খানিকটা পিছনে রয়েছে অ্যাল। একটা হাত তুলে দ্বীপটার দিকে ইঙ্গিত করল সে।
ইন্সট্রুমেন্ট চেক করে নিল পিট, তারপর আইবিসকে কাত করে দিক পরিবর্তন করল, পূর্ব দিকের অন্ধকার হয়ে আসা আকাশ থেকে বেরিয়ে এল দ্বীপটার মাঝখানে। নিচের মাটি খুঁটিয়ে দেখার জন্যে চক্কর দেয়া যাবে না। বিস্ময় ওদের একমাত্র বন্ধু। প্রথম সুযোগেই ছোট্ট আইবিসকে বাগানে নামাতে হবে, সারফেস-টু এয়ার মিসাইল আঘাত করার আগেই।
প্যাগোডা আকৃতির ছাদগুলো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে পিট, দেখতে পাচ্ছে বাগানটাকে ঘিরে থাকা গাছপালার পাঁচিলে একমাত্র ফাঁকটা। একটা হেলিকপ্টার প্যাড দেখল ও, মেল পেনারের মডেলে ছিল না। প্যাডটা সম্ভবত। পরিত্যক্ত, কারণ আকারে খুব ছোট মনে হলো, চারপাশে প্রচুর গাছ।
কব্জি ঘুরিয়ে আইবিসকে একবার ডানে, পরমুহূর্তে বাম দিকে যোরাল পিট। নিচে ঝাপসা লাছে সাগরটাকে। আকাশ ছোঁয়া পাহাড়-প্রাচীরগুলো ছুটে আসছে, দ্রুত ঢেকে ফেলছে উইন্ডস্ক্রীন। স্টিক খানিকটা পিছিয়ে আনল পিট। তারপর হঠাৎ যেন ওর নিচে থেকে চাদর সরিয়ে নেয়া হয়েছে, অদৃশ্য হলো সাগর, আইবিসের হুইল কঠিন আগ্নেয় শিলার মাত্র কয়েক মিটার উপর রয়েছে।
ল্যান্ডিং গিয়ারের টায়ার কয়েকটা ঝোঁপের ডগা ছুঁয়ে দিল। থ্রটল পিছিয়ে আনল পিট। স্টিক সামান্য একটু টানল। ল্যান্ডিং হুইল ঝাঁকি খেল হালকাভাবে স্পর্শ করেছে লন, একটা ফ্লাওয়ার বেড-এর কিনারা থেকে পাঁচ মিটার দূরে।
এঞ্জিন বন্ধ করে ব্রেকে চাপ দিল পিট। গতি কমছে না। লনের ঘাস ভিজে আছে, চাকাগুলো হড়কে যাচ্ছে যেন তেলের উপর।
সামনে এক সারি গাছ। তারপর কি আছে পিট দেখতে পাচ্ছে না। এভাবে ছুটতে থাকলে গাছের সাথে ধাক্কা লাগবে। আর ধাক্কা লাগলে বাঁচার কোন আশা নেই। আইবিসের নাক থেকে পিটের দূরত্ব মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার। আড়ষ্ট হয়ে উঠল পিটের শরীর। ঝোঁপ ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল আইবিস, এখনও ঘণ্টায় ত্রিশ কিলোমিটার গতি। ডানায় লেগে ঝোঁপের ডালপালা ভাঙছে, ছড়িয়ে পড়ছে, চারদিকে। কয়েকটা গাছকে পাশ কাটিয়ে ডাইভ দিল আইবিস, সরাসরি ঝপাৎ করে পড়ল একটা পুকুরে।
