পিছন থেকে বিস্ফোরণের ধাক্কা খেল পিট, দরজা দিয়ে কেউ যেন ছুঁড়ে দিল ওকে প্রচণ্ড বেগে। লোডিং ডকে ড্রপ খেল ও, ছিটকে পড়ল সরু গলিতে। রাস্তার ওপর পিঠ দিয়ে পড়ল পিট, ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গেছে। ওখানেই পড়ে থাকল, বাতাসের অভাবে হাঁসফাঁস করছে, ছুটে এসে টেনে তুলল ওকে অ্যাডমিরাল ও অ্যাল। হোঁচট খেতে খেতে তাদের সাথে গলিমুখের দিকে ছুটল ও। পাশেই একটা পার্কের কোণ, ভাঙা পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকল ওরা, কোণাকুণি ছুটে আরেক রাস্তায় বেরিয়ে যাবে।
ইলেকট্রিক তার পুড়ে যাওয়ায় সিকিউরিটি অ্যালার্ম থেমে গেছে। সাইরেনের আওয়াজ পেল ওরা। শেরিফ আর দমকল বাহিনীর লোকজন পৌঁছে গেছে।
পার্কের ভেতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে অ্যাল জিওর্দিনো ঘাড় ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। ভোরের প্রথম আলোয় আশাটাকে ধোয়ায় ঢাকা দেখতে পেল ও।
.
৪১.
লাস ভেগাসে শনিবারের রাত, ঝকমকে রঙিন গাড়ি গিজগিজ করছে বুলেভার্দে। হোটেল আর ক্যাসিনোগুলোয় জমজমাট জুয়ার আড্ডা বসেছে। অ্যাভান্তি-এর সীটে হেলান দিল স্টেসি ফক্স, জানালা দিয়ে নিওন সাইনগুলোর দিকে তাকাল। সত্যি সত্যি হানিমুন ছুটি কাটাতে এলে দারুণ ভাল লাগত, ভাবল সে। কিন্তু এখানে ওরা বিপজ্জনক কাজ নিয়ে এসেছে, সময়টা উপভোগ করার কোন সুযোগ নেই। জুয়া খেলার জন্যে আর যেন কত টাকা আছে আমাদের? জিজ্ঞেস করল সে।
জবাব দেয়ার আগে নতুন স্বামীর ভূমিকায় নিখুঁত অভিনয় করল ওয়েদারহিল, ঝুঁকে আলতোভাবে চুমো খেল স্টেসির গালে। এই ধরো হাজার দুয়েক ডলার। কাগজে-কলমে শুধুচন্দ্রিমা উদযাপন করতে লাস ভেগাসে এসেছে ওরা।
এমন হতে পারে, আমরা শুধু জিতবই? দুহাজার ডলার বাজি ধরলাম, পেলাম ও ছয়হাজার। ছয়হাজার ধরলাম, পেলাম আঠারো হাজার। এভাবে এক সময় দশ লাখ ধরলাম, পেলাম ষাট লাখ?
টাকাটা কে জিতবে? আমি, না তুমি?
এটা আমাদের টাকা। জিতব আমরা দুজনেই।
অসুবিধে আছে, বলল ওয়েদারহিল। অত টাকা জিতলে তুমি আমাকে ভাগ্যবান বলে মনে করবে। মেয়েমানুষের লোভ, ষাট লাখকে ষাট কোটি, তারপর সাত হাজার কোটি করার ইচ্ছেটা সামলাতে পারবে না। অর্থাৎ এই অভিনয়টা চালু রাখতে চাইবে তুমি।
তাতে অসুবিধে কি? আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিলাম। কথা দিচ্ছি, আমাকে বিয়ে করলে সুখীই হবে তুমি।
সুখী হব? কিভাবে? সত্যি সম্ভব নয়। তাহলে প্রস্তাবটা ফিরিয়ে নিলাম।
ড, টিমোথি ওয়েদারহিল গাড়ি-বোমা ভর্তি ট্রেইলার থেকে পালিয়ে আসার পর, তাঁকে ও স্টেসিকে লস এঞ্জেলসে চলে যাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন রেইমন্ড জর্ডান। সার্ভেইল্যান্স এক্সপার্টদের আরেকটা টিম দায়িত্ব বুঝে নেয়, কার ট্রান্সপোটারটাকে অনুসরণ করে চলে আসে লাস ভেগাসে। তারা রিপোর্ট করে, প্যাসিফিক প্যারাডাইস হোটেলের রেখে ট্রেইলারটা খালি অবস্থায় ফিরে গেছে।
কাজেই ওয়াশিংটনে বসে রেইমন্ড জর্ডান ও ডোনাল্ড কার্ন টিমোথি ও স্টেসির জন্যে এটা প্ল্যান তৈরি করলেন। সুমার তৈরি অ্যাটম বোমা পরীক্ষা করে দেখার জন্য একটা ওয়ারকন্ডিশনিং কমপ্রেসর চুরি করে আনতে হবে। বোমা অর্থাৎ সেটা দেখে হুবহু ওরকম দেখতে একটা তৈরিও করা হয়েছে। আসলটা বের করে নকলটা তার জায়গায় রেখে আসা হবে।
ওই যে হোটেলটা, বলল ওয়েদারহিল, মাথা ঝাঁকিয়ে বুলেভার্দের দিকটা দেখার স্টেসিকে। বিশাল আলোকমালায় সজ্জিত ভবনটা। নিওন দিয়ে তৈরি একটা পাম গাছ ঘন ঘন জ্বলছে আর নিভছে। নিচে সাঁতার কাটছে একটা সবুজ ডলফিন, তাও নিওনের তৈরি। বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে, জলকেলির জন্যে এমন আদর্শ জায়গা আর হয় না। ভবনের মাথায়, ছাদের উপর, আরেক ধরনের আলোকমালা। আলিঙ্গনে আবদ্ধ একটি পুরুষ ও একটি নারী মূর্তি, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, পরস্পরকে বারবার চুমো খাচ্ছে। হরফগুলো একসাথে জ্বলছে আর নিভছে-প্যাসিফিক প্যারাডাইস হোটেল।
প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকল ওয়েদারহিল, গাড়ি নিয়ে পাশ কাটাল বিরাট একটা সুইমিং পুলকে। পুলের চারদিকে বনভূমি, ঢাল ও জলপ্রপাত। গোটা হোটেলটাই যেন আফ্রিকার জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতরই পার্কিং লট।
হোটেলটার বিশালত্ব উপলব্ধি করে হাঁপিয়ে উঠল স্টেসি। সুমার আর কিছুর দরকার আছে কি?
প্যাসিফিক প্যারাডাইস-এর মত আরও নয়টা রিসর্ট হোটেল আছে তার বিভিন্ন দেশে।
ভাবছি ক্যাসিনোর নিচে চারটি অ্যাটম বোমা আছে শুনলে কি বলবে নেভাডা গেমিং কমিশন।
ভবনের সামনের দরজায় গাড়ি থামাল টিমোথি, ডোরম্যানকে বকশিশ দিল। গাড়ির পিছন থেকে লাগেজ নামাল লোকটা, অ্যাটেনড্যান্ট পার্ক করল গাড়ি। ডেস্কের সামেন দাঁড়িয়ে খাতায় নাম লেখাচ্ছে ওরা, ঠোঁটে মধুর হাসি আর চোখে সুখের নেশা ফুটিয়ে তুলে চেহারায় কনে-কনে ভাব আনার চেষ্টা করল স্টেসি।
নিজেদের কামরায় ঢুকে বেলম্যানকে বকশিশ দিল টিমোথি ওয়েদারহিল, তারপর বন্ধ করে দিল দরজা। এক সেকেন্ড দেরি করল না, সুইকেস খুলে হোটেলের এক স্টে বু প্রিন্ট বের করে বিছানায় মেলল। থার্ড-লেভেল বেসমেন্টের একটা বড় ভল্টে গাড়িগুলো সীল করে রেখেছে ওরা।
একটা প্ল্যানে নিচের বেসমেন্টের পুরোটা দেখানো হয়েছে। সেটার উপর চোখ বুলিয়ে সার্ভেইল্যান্স টিমের রিপোর্টটা পড়ল স্টেসি ডাবল রিএনফোর্সড কংক্রিট, তার উপর ইস্পাতের পাত। বড় একটা ইস্পাতের দরজা, সিলিং পর্যন্ত উঁচু। সিকিউরিটি ক্যামেরা আছে, গার্ড আছে তিনজন, সাথে দুটো ডোবারম্যান। তার মানে, সামনে দিয়ে ঢোকা সম্ভব নয়। ইলেকট্রনিক সিস্টেম যদি অচল করে দিয়ে যায়, কিন্তু শুধু আমরা দুজন গার্ড আর কুকুর দুটোকে সামলাতে পারব না।
