স্টেশন ওয়াগনে গুলি চালিয়ে আরোহীদের ছাতু বানাবার প্ল্যানটা ভেস্তে গেছে। পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় রণকৌশল বদলাতে হবে ওদেরকে। তাড়াহুড়ো করল না, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করছে।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ওদের বুদ্ধি ঘোলা করে দিল। পালাবার সময় স্টেশন ওয়াগন থেকে কোন গুলি করা হয়নি, ওরা ধরে নিল প্রতিপক্ষ নিরস্ত্র, কাজেই সিদ্ধান্ত নিল দোকানের দিকে একযোগে ছুটে এসে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবে।
তবে ওদের টিম লীডার সতর্ক হবার মত বুদ্ধি রাখে। রাস্তার উল্টো দিকের একটা দোরগোড়া থেকে বিধ্বস্ত দোকানটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। রাস্তার আলো দোকানের ভেতরে খুব কমই ঢুকেছে। স্টেশন ওয়াগনটা ছায়ার ভেতর লুকিয়ে রয়েছে। কর্কশ অ্যালার্ম বাজছে, ফলে কোন শব্দও শুনতে পেল না সে।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখছে, এই সময় দোকানের উপর কয়েকট অ্যাপার্টমেন্টের জানালা আলোকিত হয়ে উঠল। এখুনি কিছু একটা করার তাগাদা অনুভব করল সে। বাড়ি-ঘর থেকে লোকজন বেরিয়ে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। যে-কোন মুহূর্তে পুলিশ পৌঁছে যেতে পারে। আরও একটা ভুল করল সে, স্টেশন ওয়াগনের অন্তত দুএকজন লোক আহত হয়েছে। তার ধারণা হলো, মৃত্যুভয়ে দোকানের ভেতর লুকিয়েছে তারা। দোকানের পিছনে লোক পাঠানো দরকার, এই বুদ্ধিটা তার মাথায় এল না।
দোকানের ভেতর ঢুকে ওদেরকে মেরে ভ্যানে ফিরে আসবে, তিন মিনিটের মধ্যে। সাবধানের মার নেই, রাস্তার আলোগুলো গুলি করে নিভিয়ে দিল সে। বাঁশি বাজিয়ে নিজের লোকদের সঙ্কেত দিল প্রস্তুত হবার, দেখতে হবে সবার ৫,৫৬ মিলিমিটার, ৫১-রাউন্ড সওয়া অটোমেটিক রাইফেলের সিলেক্টর সুইচ যাতে সে পজিশন থেকে সরানো থাকে। এরপর তিনবার বাঁশি বাজাল সে। শুরু হলো হামলা।
ভৌতিক ছায়ার মত নিঃশব্দে দোকানের ভেতর ঢুকল, মোট ছয়জন। ভেতরে পা দিয়েই স্থির হয়ে গেল যে যার পজিশনে, সামনে লম্বা হয়ে আছে মাজল, একদিক থেকে আরেকদিকে দ্রুত ঘুরছে, অন্ধকার ভেদ করতে চাইছে নিস্পলক চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তারপর হঠাৎ জ্বলন্ত কাপড়ে জড়ানো রঙের একটা প্যাচানো ক্যান উড়ে এসে পড়ল ওদের আর ফুটপাথের মাঝখানে, বিস্ফোরিত হলো নীল ও কমলা শিখা। একই সাথে পিট ও অ্যাল গুলিবর্ষণ শুরু করল, আগুনের দিকে অ্যাডমিরাল স্যানডেকার ছুঁড়ে দিলেন আরেকটা রঙের ক্যান।
কোল্টটা দুহাতে ধরে গুলি করছে পিট। তাক করছে, তবে সতর্কতার সাথে লক্ষস্থির করছে না। ওর গুলিতে জানালার ডান দিকে দাঁড়ানো তিনজন লোক ধরাশয়ী হলো, কি ঘটছে বুঝতে পারার আগেই। তাদের মধ্যে মাত্র একজনই ক্ষণস্থায়ী এক পশলা গুলি করার সময় পেল বুলেটগুলো সারি সারি ক্যানগুলোকে ফুটো করে দিল, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল তরল রঙ।
অ্যালের গুলি খেয়ে জানালা গলে ফুটপাথে গিয়ে পড়ল এক লোক। বাকি দুজন অন্ধকারে ছায়া মাত্র, তবু রেমিংটন খালি না হওয়া পর্যন্ত থামল না সে। তারপর ফেলে দিল সেটা, লোড করা দ্বিতীয় একটা তুলে নিয়ে বারবার গুলি করল যতক্ষণ না পাল্টা গুলির শব্দ থামল।
দোকানের সামনে আগুন ও ধোয়া দুর্ভেদ্য পাচিল তৈরি করেছে, সেদিকে তাকিয়ে রি-লোড করল পিট। কালো নিনজা আউটফিট পরা খুনীরা পিছু হটে গেছে। মরিয়া হয়ে আড়াল খুঁজছে, নয়তো উঁচু ফুটপাথের নিচে নর্দমার চাকনির উপর শুয়ে পড়ছে। কিন্তু পালায়নি। এখনও দোকানের আশপাশেই আছে তারা, আগের মতই বিপজ্জনক।
আবার একত্রিত হবে ওরা, ফিরে আসবে। তবে এবার আরও সাবধানে। এবার তারা দেখতেও পাবে। দোকানের কাঠের ফ্রেমে আগুন ধরে গেছে, ভেতরটা দিনের মত উজ্জ্বল। গোটা ভবনসহ লোকজন ছাই হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি।
অ্যাডমিরাল? চিৎকার করল পিট।
এদিকে, জবাব দিলেন স্যানডেকার। পেইন্ট সেকশনে।
এখানে আমাদের মেয়াদ আগেই শেষ হয়েছে। পিছনে কোন দরজা আছে। কিনা দেখবেন, দুৰ্গটা আমি আর অ্যাল পাহারা দিই?
রওনা হয়ে গেছি।
তোমার সব খবর ভাল তো, দোস্ত?
হাতের রেমিংটনটা নাড়ল অ্যাল। ফুটো করার মত কাউকে পাচ্ছি না।
সময় হয়েছে যাবার। মনে আছে, আমাদের একটা প্লেন ধরতে হবে?
রাইট।
লাশগুলোর দিকে তাকাল পিট। ঝুঁকল, হাত বাড়িয়ে একটা মাথা থেকে হুডটা সরাল। আগুনের আভায় জাপানি লাগল চেহারা। হিদেকি সুমা নামটা মনে পড়তেই সারা শরীরে যেন আগুন ধরে গেল ওর।
হঠাৎ অ্যাডমিরাল স্যানডেকার চিৎকার করলেন, এদিকে কাঠ আর তক্তা, মাঝখানে প্যাসেজ। একটা দরজা দিয়ে লোডিং ডকে বেরিয়ে যাওয়া যায়।
খপ করে অ্যালকে ধরে ঠেলে দিল পিট। তুমি আগে যাও, আমি কাভার দিচ্ছি।
রেমিংটন হাতে প্যাসেজ ধরে ছুটল অ্যাল। ঘুরল পিট, শেষবার গুলি করল কয়েকটা। খালি হয়ে গেল অটোমেটিক। পরে লোড করবে ভেবে কোমরে খুঁজে রাখল ওটা, ছুটল দরজার দিকে।
প্রায় দরজার কাছে পৌঁছে গেল পিট। টিম লীডার,নিহত ছয়জনের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক, আগুনের উপর দিয়ে দোকানের ভেতর এক জোড়া স্টান গ্রেনেড ছুঁড়ল, তারপরই গুলি করল এ পশলা। উত্তপ্ত সীসা বৃষ্টির মতো আঘাত করল পিটের চারপাশে।
পরমুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো গ্রেনেড় দুটো। ব্রাউনস্ এমপোরিয়ামের ক্ষতবিক্ষত হৃৎপিণ্ডের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা-ও এবার ধ্বংস হয়ে গেল। শক ওয়েভের ধাক্কায় ধসে পড়ল ছাদটা, চারদিকে আগুনের ফুলকি ছুটল, আশপাশের প্রতিটি বাড়ির শার্সি ঝন ঝন শব্দে ভেঙে পড়ল। দোকানের ভেতর পুরোটা জায়গা জুড়ে এখন শুধু আগুন ছাড়া আর কিছু দেখার নেই।
