লম্বা একটা গ্যালারিতে আলো ফেলল পিট, পরমুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। ওর চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী, মাথাটা একদিকে সামান্য কাত করে তাকিয়ে আছে, দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা শ্বাসরুদ্ধকর। তুলনাহীন সৌন্দর্যের আধার ওই মুখ, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি লেগে রয়েছে।
মেয়েটি একা নয়। তার পাশে ও পিছনে আরও কয়েকটি নারীদের দেখা গেল, তাদের নিস্পলক দৃষ্টি যেন সরাসরি পিটের ওপরই নিবদ্ধ। সবাই ওরা নগ্ন, আবরণ বলতে শুধু প্রায় হাঁটু পর্যন্ত লম্বা বেণী করা চুল।
মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে, ঘোষণা করল অ্যাল। সুন্দরীদের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
উত্তেজিত হয়ো না, সাবধান করল পিট। রঙ করা মূর্তি ওগুলো। প্রমাণ আকৃতির নারীমূর্তিগুলোর মাঝখানে হাঁটাহাঁটি করছে ও। তারপর মাথার ওপর ভাইভ আলোটা তাক করল। সোনার চকচকে একটা সাগর দেখতে পেল ও। গিলটি করা ছবির ফ্রেম ওগুলো। যতদূর আলো পৌচেছে, তারপর আরও অনেক দূর পর্যন্ত, সারির পর সারি শুধু র্যাক আর র্যাক, প্রতিটি র্যাকে অসংখ্য দামী পেইন্টিং, মূর্তি, ভাস্কর্য শিল্প, ধর্মীয় নিদর্শন, দুপ্রাপ্য বই, প্রাচীন ফার্নিচার, অ্যার্কিওলজিক্যাল আন্টিকস ইত্যাদি।
আমার মনে হয়, বিড়বিড় করল পিট। এইমাত্র জাদুর কাঠি আবিষ্কার করেছি আমরা।
.
৩৭.
দক্ষতা জার্মানদের চরিত্রের একটা বৈশিষ্ট্য। চার ঘণ্টার মধ্যে ডিকনটামিনেশন এক্সপার্টরা পৌঁছে গেল, দূষিত বাতাস পাম্প করে ভরে ফেলল একটা কেমিক্যাল ট্যাংক ট্রাকে। সাফ-সুতরোর কাজ চলছে, রেইনহার্টের লোকজন ফসজিন রিলিজ মেকানিজম ডিঅ্যাকটিভেট করে ক্যানিস্টারগুলো ডিকনটামিনেশন ক্রুদের হাতে তুলে দিল। সবশেষে লাশগুলো তোলা হলো অ্যাম্বুলেন্সে।
পাতালের পানিও পাম্প করে কাছাকাছি একটা নদীতে ফেলার কাজ শুরু হয়ে গেছে। শ্রমিকরা মাটি কাটছে, বাংকারে নামার আসল পথটা উন্মুক্ত করার জন্যে, যুদ্ধের পরপরই ওটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পুরো সময়টা কৃষক কওসেনের বাড়িতে ঘুমিয়ে কাটাল অ্যাল। মিসেস কওসেন নুমার পুরো টিমটাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে ভাল করে খাইয়ে দিল।
বিখ্যাত কয়েকজন রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তার একটা দল, নামকরা শিল্পী বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক ও টিভি ক্রুরা। মন্ত্রী মহোদয় নির্দেশ দিলেন, সব কিছু ভাল করে সার্ভে না হওয়া পর্যন্ত নিউজ মিডিয়াকে কোন তথ্য দেয়া যাবে না।
ধাতব দরজার কাছ থেকে শুরু, তারপর গ্যালারিটা লম্বা প্রায় এক কিলোমিটার। টানেলে পানি থাকলেও, দরজাটা ছিল এয়ার টাইট, গ্যালারির ভেতর জলীয় বাষ্প ঢোকেনি, ফলে প্রতিটি শিল্পকর্ম অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। জার্মান বিশেষজ্ঞরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটা ল্যাবরেটরি ও একটা ওয়ার্কশপ খাড়া করে ফেলল। রেকর্ড করার জন্যে ফেলা হলো আলাদা তাঁবু।
জার্মান অফিশিয়ালের সঙ্গে আলাপ করল পিট। বার্লিনের জাপানি দূতাবাস থেকে যে শিল্পকর্ম সরানো হয়েছিল, আমরা শুধু সেগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী, তাঁকে জানাল ও।
আপনার ধারণা ওগুলো এখানে আছে?
জাপানে পাঠানোর সময় ছিল না, ব্যাখ্যা করলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। রাশিয়ানরা শহরটাকে ঘিরে রেখেছিল। অ্যামব্যাসডর বাড়িটায় তালা দিয়ে স্টাফদের নিয়ে কোনরকমে জান বাঁচিয়ে পালান সুইজারল্যান্ডে। রেকর্ড বলছে, দূতাবাসের সমস্ত শিল্পকর্ম নাৎসীদের হাতে তুলে দেয়া হয় নিরাপদে সংরক্ষণ করার জন্যে। তারা সেগুলোর একটা এয়ারফিল্ডে লুকিয়ে রাখে।
কিন্তু আমেরিকান সরকার জাপানি শিল্প সম্পর্কে এত আগ্রহী কেন?
দুঃখিত, বলল পিট। এই কারণটা বলা যাবে না। তবে এটুকু আশ্বাস দিতে পারি, জার্মান সরকারের কোন ক্ষতি আমরা করব না।
আমি জাপানিদের কথা ভাবছি। ওরা তাদের জিনিস ফেরত চাইবে।
আমরা কোন জিনিস নিচ্ছি না, শুধু কয়েকটার ফটো তুলব। তবে যদি দুএকটা খুব বেশি পছন্দ হয়ে যায়, আপনার কাছ থেকে চাইলে আপনি কি আর
এক সেকেন্ড চিন্তা করলেন অফিসার। চ্যান্সেলর স্বয়ং নির্দেশ দেওয়ায় নুমার দলটাকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনিয়েছেন তিনি। আগেই তার সন্দেহ হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু একটা খুঁজছে ওরা, সেটা পেলে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাইবে। কাঁধ ঝাঁকালেন তিনি, বললেন, ঠিক আছে, সে দেখা যাবে।
.
নারীমূর্তিগুলোর পঞ্চাশ মিটার পিছনে জাপানি দূতাবাসের কনটেইনারগুলো পাওয়া গেল। বাক্সগুলো চিনতে পারা গেল সহজেই, জাপানি হরফ দেখে। কি লেখা রয়েছে? ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসোকে জিজ্ঞেস করল পিট।
চার নম্বর বাক্স, অনুবাদ করলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। জাপান সম্রাটের সম্পত্তি।
সাবধান খোলা হলো বাক্সটা। ঢাকনি তোলার পর দেখা গেল ভাঁজ করা একটা পর্দা, কয়েকটা পাহাড়চূড়ার আশপাশ দিয়ে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে। অবশ্যই দ্বীপ নয়, কাঁধ ঝাঁকাল পিট।
আরও দুটো বাক্স খোলা হলো। ভেতর থেকে অনেক পেইন্টিংই বেরল, কিন্তু কোনটাই ষোড়শ শতাব্দীর নয়, আরও প্রাচীন যুগের। বাকি বাক্সগুলোয় অন্যান্য শিল্পকর্ম রয়েছে, কোন পেইন্টিং নেই। অবশেষে বাকি থাকল শুধু একটা বাক্স, আকার দেখে মনে হলো ভেতরে কোন পেইন্টিং থাকলেও থাকতে পারে।
ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসোর চেহারায় উত্তেজনার ছাপ। কপালে চকচক করছে ঘাম। শেষ বাক্সটাও খুলল পিট। পানি দেখতে পাচ্ছি, বলল ও। সম্ভবত সাগরের দৃশ্য। আরে, সত্যি সত্যি একটা দ্বীপ দেখছি।
