ক্লওসেনের জমির একটা অংশ লুফটভাফ ফাইটার স্কোয়াড্রন-এর এয়ারফিল্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে যুদ্ধের সময়। যুদ্ধের সময় জার্মানি ছেড়ে পালিয়েছিল সে, ফিরে এসে দেখে তার খেতগুলোর ছড়িয়ে আছে পোড়া ও ভাঙাচোরা প্লেন, মোটরগাড়ি, জীপ ইত্যাদি। বেশিরভাগই বাতিল লোহা-লক্কড় হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে সে।
মেঠো পথ ধরে দ্রুত এগোচ্ছে ট্রাক্টর। দুহপ্তা বৃষ্টি হয়নি, খটখট করছে মাটি। গর্তটার কাছে এসে ট্র্যাক্টর থামাল সে, নেমে এসে কিনারায় দাঁড়াল। কৌতুক বোধ করল রয়টার, কাল যেমন দেখেছিল আজ যেন তার চেয়ে একটু বেশি গভীর দেখাচ্ছে গর্তটাকে গর্তের নিচে, মাটির তলায় পানি থাকতে পারে, ভাবল সে। যদিও মাটিতে ভেজা কোন ভাব নেই।
ট্রাক্টরে আবার চডল কওসেন, কংক্রিট বাংকারের পাশে মাটির ঢিবির কাছে চলে এল। জায়গাটা গাছপালা দিয়ে ঢাকা, আশপাশের খেতে কেউ থাকলেও তাকে দেখতে পাচ্ছে না। স্কুপে মাটি ভরে গর্তের কিনারায় চলে এল সে। স্কুপের মাটি গর্তের মধ্যে ফেলতে যাবে, হঠাৎ লক্ষ করল ট্রাক্টরের সামনের অংশ নিচের দিকে ডেবে যাচ্ছে। প্রথম অবাক হলো কওসেন, তারপর আতঙ্কিত। ট্রাক্টরের সামনের চাকা মাটির তলায় সেঁধিয়ে যাচ্ছে।
কিনারা থেকে তলা পর্যন্ত ফাঁক হয়ে যাচ্ছে গর্তটা, সদ্য তৈরি বিশাল একটা হাঁ-র ভেতর ডাইভ দিচ্ছে ট্রাক্টর। আতঙ্কে, অবিশ্বাসে স্থির পাথর হয়ে গেল কওসেন। তাকে নিয়ে নিচের অন্ধকারে তলিয়ে গেল ট্রাক্টর। হুইলটা দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ধাতব মেঝেতে বসে পড়ল কওসেন। প্রায় বারো মিটার খসে পড়ল ট্রাক্টর,ছলাৎ করে আওয়াজ হলো। পাতালে জমে থাকা পানির মধ্যে পড়েছে সে। শুধু ট্রাক্টর নয়, তার সাথে ধুলোর মেঘ নেমে এল পানিতে, ঝাপসা হয়ে গেল চারদিক। পানিতে পড়েও খানিকদূর এগোল ট্রাক্টর, থামার পর দেখা গেল পিছনের উঁচু চাকাগুলো প্রায় পুরোটাই ডুবে গেছে পানিতে।
পতনের ঝাঁকি খেয়ে দম ফুরিয়ে গেছে মার্কের। পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল সে। শিরদাঁড়ার হাড় ভেঙ্গে গেছে বলে সন্দেহ হলো তার। দুটো পাঁজরের দাঁড়াও ভেঙেছে, স্টিয়ারিং হুইলটা বুকের সাথে ধাক্কা খাওয়ায়। ধড়ফড় করছে বুক, ব্যথায় গোঁড়াচ্ছে। বুকের কাছে পানি উঠে আসছে দেখে আতঙ্কে কান্না পেল তার।
তবু ভাগ্য ভাল যে ট্রাক্টরটা উল্টে যায়নি বা কাত হয়ে পড়েনি। সেক্ষেত্রে চিড়ে-চেপটা হয়ে মারা যেত সে। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল কওসেন, খাদের কিনারা এত খাড়া আর উঁচু যে একার চেষ্টায় ওপরে উঠার কোন প্রশ্নই উঠে না। চারপাশে চোখ বুলাল সে।
ট্রাক্টরটা লাইমস্টোন-এর প্রকাণ্ড এক গুহার ভেতর পড়েছে। গুহার একটা দিকে পানি আছে, অপর দিকটা ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠে গেছে চওড়া এক সুড়ঙ্গে। গুহার অপর দিকেও একটা সুড়ঙ্গ রয়েছে, তবে মুখের কাছটা পানিতে ডোবা। দুটো সুড়ঙ্গই ছয় মিটারের মত উঁচু। মসৃণ ও সমতল সিলিঙ দেখে বোঝা যায়। লাইমস্টোন কেটে টানেলগুলো তৈরি করা হয়েছে ভারী ইকুইপমেন্টের সাহায্যে।
দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করছে কওসেন, হামাগুড়ি দিয়ে ও সাঁতার কেটে ঢাল বেয়ে উঠে এল শুকনো সুড়ঙ্গের মুখে। টানেলের ভেতর আলো খুব কম, সব কিছু ঝাপসা লাগল চোখে, তবু পরিচিত আকৃতিগুলো দেখেই চিনতে পারল সে। টানেলের ভেতরটা চওড়া হয়ে গেছে, চারদিকে সারি সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো প্লেন। দুচারটে নয়, ডজন ডজন! চিনতে পারল কওসেন, লুফটভাফ এর প্রথম টার্বোজেট এয়ারক্রাফট এগুলো। প্রায় পঞ্চাশ বছর কোন যত্ন নেয়া হয়নি, অথচ দেখে মনে হচ্ছে সবগুলো উড়তে পারবে। চ্যাপ্টা হয়ে আছে টায়ারগুলো, অ্যালুমিনিয়ামে সামান্য মরচে ধরেছে, বোঝা যায় অনেকদিন কারও হাত পড়েনি। মিত্র বাহিনী পৌঁছানোর আগেই সম্ভবত এই গোপন এয়ার বাস খালি করা হয়, সীল করে দেয়া হয় প্রবেশপথগুলো। তারপর এটার অস্তিত্ব ভুলে যাওয়া হয়।
এতই বিস্মিত ও উত্তেজিত হয়ে পড়েছে কওসেন, প্রায় কোন ব্যথাই অনুভব করছে না। প্লেনগুলোর মাঝখান দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে সে। ইতোমধ্যে চোখে সয়ে গেছে অন্ধকার। ফ্লাইট কোয়ার্টার ও মেইন্টেন্যান্স রিপেয়ার শেড-এ চলে এল সে। প্রতিটি জিনিস সাজানো অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে, দ্রুত পলায়নের কোন লক্ষণ চোখে পড়ে না।
এসব রয়েছে তার জমিনের নিচে, সেই এগুলোর মালিক। চিন্তাটা আরও উত্তেজিত করে তুলল কওসেনকে। সংগ্রাহকদের কাছে এসব প্লেন বেঁচতে পারলে কোটি কোটি টাকা পাওয়া যাবে।
ধীর পায়ে গুহার কিনারায় ফিরে এল কওসেন। শুধু ট্রাক্টরের স্টিয়ারিং হুইল আর ওপরের টায়ারগুলো ভেসে আছে পানির ওপর। মুখ তুলে আবার আকাশের দিকে তাকালো সে। না, একা তার পক্ষে ওঠা সম্ভব নয়।
ভয়টা দূর হয়ে গেছে, কারণ কওসেন জানে তার ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখলে বউ তাকে খুঁজতে আসবে। প্রতিবেশীদের সাহায্যে এই গুহা থেকে তাকে উদ্ধার করবে সে।
টানেলের ভেতর নিশ্চয়ই কোথাও একটা জেনারেটর আছে, ভাবল কওসেন। খুঁজে দেখতে হয়। ভাগ্য ভাল হলে ছোট একটা উনন জ্বালতে পারবে সে, তাতে করে আলোও পাওয়া যাবে। হাতঘড়ি দেখল কওসেন। ঘণ্টা চারেকের মধ্যে তাকে খুঁজে বের করে ফেলবে তার স্ত্রী, ধারণা করল সে। গুহার উল্টোদিকে তাকাল, ভাবল ওদিকের টানেলে কি আছে কে জানে।
