কোন ছাপ আছে?
ব্রিজ পেরিয়ে এল গাড়ি, রাস্তার দুপাশে এখন আর কোন গাছ নেই। যতদূর দৃষ্টি যায় খেত, মাঠ, খাল আর প্রকাণ্ড আকারের কংক্রিটের সাইলো।
দ্বিতীয় হেলিকপ্টারটা একদিকে কাত হলো, ফলে গায়ের লেখাগুলো পরিষ্কার পড়তে পারলেন ম্যানকিউসো। হেনরিকো কাউন্টি শেরিক ডিপার্টমেন্ট। রোটর ব্লেডের শব্দকে ছাপিয়ে উঠল তার চিৎকার। পরমুহূর্তে অ্যাল জিওর্দিনোকে চিনতে পারলেন তিনি, হেলিকপ্টারের খোলা দরজা থেকে হাত নাড়ছে। সময়মতই। পৌঁছেছে সে, বুড়ি স্টাজের দশ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
দ্বিতীয় হেলিকপ্টারকে বেধে ফেলেছে প্রথমটার পাইলট। হঠাৎ করে দিক বদলাল সে, অনেকটা নিচে নেমে দ্রুতবেগে ছুটল উত্তরপূর্ব দিকে। ফসল ঢাকা একটা মাঠের শেষ মাথায় সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে আছে, আড়াল পাবার জন্যে পালাচ্ছে সেদিকে।
ধীরে ধীরে রাস্তার একপাশে সরে গেল সাদা লিংকন। আঁতকে উঠল পিট, দেখল রাস্তার কিনারা থেকে নিচের দিকে খসে পড়তে যাচ্ছে গাড়িটা। ছোট একটা গতে পড়ল সাদা লিমুসিন,তারপর ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল খেতের দিকে, যেন হেলিকপ্টারের পিছু নিতে চায়।
দ্রুত চোখ বুলিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিল পিট, হুইল ঘুরিয়ে অনুসরণ করল লিমুসিনকে। শুকলো ও ভঙ্গুর আঘাত করল উইন্ডস্ক্রীনে, তাড়াতাড়ি মাথাটা গাড়ির ভেতর টেনে নিলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো।
সাদা গাড়িটাকে ধাওয়া করছে স্টাজ। সামনে ধুলোর পাহাড়। প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না পিট, তবু গণি একটু কমাল না।
কাঁটাতারের একটা বেড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এল ওরা। বুঝতে পারেনি পিট, যাচ্ছে। তীর বেগে ছুটে এসে সরাসরি কংক্রিটের একটা সাইলোর সাথে ধাক্কা খেল লিঙ্কন।
ওহ গড! আঁতকে উঠলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো, বুঝতে পাচ্ছে সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব নয়।
সংঘর্ষ এড়াবার জন্যে মরিয়া হয়ে ডান দিকে হুইল ঘোরাল পিট, সাইলোর কোণ ঘেষে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা। স্টাজ ঘুরতে শুরু করল, পিছনটা বাড়ি খেল বিধ্বস্ত লিংকনের সাথে। খানিক দূরে এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ওদের গাড়ি।
গাড়ি দাঁড়াবার আগেই নেমে পড়েছে পিট, লিমুসিনের দিকে ছুটছে। বাঁক ঘুরতেই ছ্যাৎ করে উঠল বুক, দুমড়ে মুচড়ে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে লিংকন। এ ধরনের সংঘর্ষের পর কারও পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। ফ্রন্ট-সিট ভেঙে বেরিয়ে এসেছে এঞ্জিন, ছাদে ঠেকে রয়েছে স্টিয়ারিং হুইল। ড্রাইভারকে কোথাও না দেখে পিট ধরে নিল, গাড়ির অপর দিকে ছিটকে পড়েছে লোকটা।
প্যাসেঞ্জার সিট বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই, ছাদের সাথে জোড়া লেগে গেছে। দরজাগুলো তুবড়ে ডেবে গেছে ভেতর দিকে। জানালার কাঁচ যেটুকু অবশিষ্ট আছে, লাথি মেরে ভেঙে ফেলল পিট, ভেতরে মাথা গলালো।
ভেতরে কেউ নেই।
সমস্ত অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে পিটের, বিধ্বস্ত গাড়িটার চারদিকে ঘুরছে। কিন্তু কোথাও কোন লাশ পড়ে নেই। কিছুই পেল না ও, একটু রক্ত বা এক টুকরো ছেঁড়া কাপড়ও নয়। তারপর ডেবে যাওয়া ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো ভৌতিক গাড়িটায় কেন কেউ নেই। ইলেকট্রিক্যাল কানেক্টর থেকে ছোট্ট একটা ইন্সট্রুমেন্টে খুলে নিয়ে পরীক্ষা করল ও, রাগে লালচে হয়ে উঠল চেহারা।
তখনও বিধ্বস্ত গাড়িটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পিট, নেমে আসা হেলিকপ্টার থেকে ছুটে এল অ্যাল। স্টাজ থেকে নেমে তার সাথে এলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসোও।
লরেন? ব্যাকুল কণ্ঠে জানতে চাইল অ্যাল।
মাথা নেড়ে হাতের ইন্সট্রুমেন্টটা অ্যালের দিকে ছুঁড়ে দিল পিট। আমাদেরকে বোকা বানানো হয়েছে, বলল ও। গাড়িটা ছিল টোপ। অপারেট করেছে একটা ইলেকট্রনিক রোবট ইউনিট, ঢালানো হয়েছে হেলিকপ্টার থেকে, রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে।
উদভ্রান্তের মত লিমুসিনের চারদিকে তাকালেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। আমি… আমি নিজের চোখে মিস লরেনকে চড়তে দেখেছি ওটায়।
আমিও দেখেছি, তাকে সমর্থন করল অ্যাল।
সেটা অন্য গাড়ি, শান্ত গলায় বলল পিট।
কিন্তু এটা তো একবারও আমাদের চোখের আড়ালে যায়নি।
গেছে। চিন্তা করে দেখুন। আমারা ধাওয়া করি বিশ সেকেন্ড পর। পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে আসারও বেশ খানিক পর এটাকে আমরা দেখতে পাই। গাড়ি বদলের ঘটনা ঘটেছে পার্কিং লটে।
কয়েক মুহূর্তে কথা বলল না কেউ। তারপর নিস্তব্ধতা ভাঙল অ্যাল। লরেন ওদের হাতে, যেন ব্যথায় কাতরে উঠল সে। ছাই হয়ে গেছে মুখের চেহারা। গড হেলপ আস, লরেন ওদের হাতে।
লিমুসিনের দিকে তাকিয়ে আছে পিট, হাত দুটো মুঠো করা, কিছুই দেখছে না। লরেনকে আমি উদ্ধার করব, বলল ও, গলার স্বর বরফের মত ঠাণ্ডা। ওর কোন ক্ষতি হলে ওদেরকে আমি ছাড়ব না।
.
তৃতীয় পর্ব
আজিমা দ্বীপ
অক্টোবর ১২, ১৯৯৩, বিলফিল্ড, পশ্চিম জার্মানি।
৩১.
কাঠের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে খেতের উপর নিয়ে ঢাল ও বনভূমির দিকে তাকাল অগাস্ট ক্লওসেন। গোটা উপত্যকা জুড়ে তার ফার্ম, উপত্যকটাকে ঘিরে রেখেছে আঁকাবাঁকা একটা পাহাড়ী নদী। কিছুদিন হলো নদীতে একটা বাঁধ দিয়েছে সে। কোটের বোতামগুলো লাগিয়ে গোলাবাড়ির দিকে এগোল, আজ তাকে ট্রাক্টর নিয়ে কাজে যেতে হবে।
শক্ত-সমর্থ ক্লওসেনের বয়স চুয়াত্তর হলেও ভোর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত একটানা পরিশ্রম করে সে। তার পরিবার পাঁচ পুরুষ ধরেই এই ফার্মের মালিক। দুই মেয়ে আছে তার, কোন ছেলে নেই, মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবার পর স্বামী-স্ত্রী একা হয়ে গেছে। ফসল কাটার সময় কাজের লোক রাখতে হয়, বছরের বাকি সময়টা নিজেরা খাটে। গোলাবাড়ি থেকে ট্রাক্টর নিয়ে বেরিয়ে এল সে, মেঠো পথ ধরে এগোল দূর প্রান্তের একটা খেতের দিকে। খেতের ফসল কাটা হয়ে গেছে, এক কোণে ছোট একটা গর্ত আজ তাকে মাটি ফেলে ভরতে হবে। কাল বিকেলে ট্রাক্টরের সামনের অংশে একটা যান্ত্রিক কোদাল অর্থাৎ স্কুপ লাগিয়ে রেখেছে সে, ওটার সাহায্যে মাটি বয়ে এনে গর্তের ভেতর ফেলবে। যুদ্ধের সময়কার একটা কংক্রিট ব্যাংকারের পাশে উঁচু ঢিবি আছে, কাজেই মাটি পাওয়া কোন সমস্যা নয়।
