জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন কোরোরি ইয়োশিশু, কিন্তু কিছু দেখছেন বলে মনে হলো না। এক সময় মাথা নাড়লেন তিনি। করুণা হয়।
তার দিকে তাকাল সুমা। কার ওপর করুণা হয়, প্রাচীন বন্ধু?
ইউনাইটেড স্টেটস অভ আমেরিকার ওপর, নরম গলায় বললেন ইয়োশিশু। দেশটা সুন্দরী রমণীর মত, যে মারা যাচ্ছে ক্যান্সারে।
.
২৮.
মার্ভিন শওয়াল্টার নিজেদের দূতাবাস থেকে ট্রেনে চড়ে বাড়ি ফিরছেন। রোজকার মত আজও দুজন জাপানি এজেন্ট নজর রাখছে তার ওপর। সিট ছেড়ে দরজার দিকে এগোলেন তিনি, তারপর দরজা খোলার অপেক্ষায় আরোহীদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
দরজা খুলে গেল, আরোহীদের স্রোতটা নেমে এল প্ল্যাটফর্মে। নিচে নেমে দাঁড়িয়ে থাকলেন মার্ভিন শওয়াল্টার, এক দুই করে গুনতে শুরু করেছেন মনে মনে। পাশের একটা কমপার্টমেন্ট থেকে এজেন্ট দুজনও নেমেছে, ভিড়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে তারা। পঁচিশ পর্যন্ত গুনে হঠাৎ চরকির মত আধপাক ঘুরেই লাফ দিয়ে আবার ট্রেনে চড়লেন তিনি। দুসেকেন্ড পর বন্ধ হয়ে গেল দরজা, সেই সাথে চলতে শুরু করল ট্রেন। দেরি হয়ে গেছে, এজেন্ট দুজন আবার ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করেও সফল হলো না। গতি বাড়ল ট্রেনের, ঢুকে পড়ল টানেলে।
পরবর্তী স্টেশনে ট্রেন বদল করলেন মার্ভিন শওয়াল্টার। এরপর নামলেন টোকিওর উত্তরপুর এলাকায়। জায়গাটার নাম শিটামাচি। শিটামাচি পুরানো টোকিওর অংশ, প্রাচীন অনেক নিদর্শন এখনও এদিকটায় দেখতে পাওয়া যায়।
প্যাটফর্ম থেকে কাঁপাবাসি স্ট্রীটে বেরিয়ে এলেন মার্ভিন। ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলেন শহরের মাঝখানে, নামলেন একটা জাপানি সরাইখানার সামনে। সরাইখানার নাম রায়ওকন।
বাইরে থেকে দেখে স্নান ও বিধ্বস্ত মনে হলেও, সরাইখানার ভেতরটা পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম। দোরগোড়াতেই একজন স্টাফের সঙ্গে দেখা হলো, মাথা নত করে বলল সে, রিজ-এর স্বাগত, পেশীবহুল দৈত্যই বলা যায় নোকটাকে।
আমার ধারণা ছিল এটা একটা গেইস্ট হাউস।
কথা না বলে পথ ছেড়ে দিল ডোরম্যান, রিসেপশনে ঢুকলেন মার্ভিন। ওক। কাঠের পালিশ করা মেঝে। দেয়াল ঘেঁষে সৌখিন বেতের চেয়ার। জুতো খুলে প্লাস্টিকের স্লিপার পরার অনুরোধ করা হলো তাকে। জাপানিদের পা ছোট, তাদের স্লিপারও ছোট, তবে এগুলো এমারসনের বড় আকারের পায়ে ঠিকমতই ফিট করল। তার ধারণা হলো, স্লিপারগুলো আমেরিকা থেকে আমদানি করা হয়েছে। তিনি জানেন, রায়ওকন-এর মালিক আসলে একটা মার্কিন ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি। এদের কাজ হলো, এজেন্টরা অন্যায় কিছু করে ধরা পড়তে যাচ্ছে দেখলে গোপনে ও নিরাপদে জাপান থেকে পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দেয়া।
সরাইখানার ভেতরের একটা কামরায় নিয়ে আসা হলো মার্ভিনকে। ঘরের সাথে বারান্দা আছে, বারান্দার নিচে বাগান। কোন চেয়ার বা ফার্নিচার নেই, কার্পেটের ওপর আছে শুধু কুশন। একটা বিছানাও আছে একপাশে, বালিশবহুল। কামরার মাঝখানে একটা গর্তের ভেতর আগুন জ্বলছে, টকটকে লাল হয়ে আছে কয়লাগুলো। কাপড়চোপড় খুলে খাটো একটা আলখেল্লা পরলেন মার্ভিন। এরপর কিমানো পরা এক পরিচালিকা এসে সরাইখানার বারোয়ারি গোসলখানায় নিয়ে গেল তাকে। আলখেল্লা ও হাতঘড়ি খুলে একটা বেতের ঝুড়িতে রাখলেন মার্ভিন, কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে ঢুকে পড়লেন ঘেরা গোসলখানায়। প্রথমে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজলেন কিছুক্ষণ, তারপর ধূমায়িত বাথটাবে নামলেন। বাথটাব তো নয়, ছোটখাট একটা সুইমিং পুল বললেই চলে।
একটা ছায়ামূর্তিকে আগেই দেখেছেন তিনি, বুক সমান পানিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মার্ভিনই প্রথম কথা বললেন, টিম হোন্ডা, ধরে নিচ্ছি।
মাত্র অর্ধেকটা, জবাব দিল রয় ওরশিয়া। জিম হানামুরা যে-কোন মুহূর্তে এসে পড়বে বলে আশা করছি। সাকি চলবে?
অপারেশনে রয়েছি, তবে ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি। দিন।
পুলের কিনারা থেকে বোতলটা তুলে নিয়ে গ্লাসে সাকি ঢালল রয় ওরশিয়া। দূতাবাসের খবর কি?
ঠিকই আছে সব। গ্লাসটা নিয়ে চুমুক দিলেন মার্ভিন। ইনভেস্টিগেশন কেমন চলছে? টিম লিঙ্কনের কাছ থেকে যে সূত্র পাওয়া গিয়েছিল, সেটা কোন কাজে লাগল?
মুরমটো কোম্পানি ম্যানেজমেন্ট চেক করেছি আমি। করপরেট এক্সিকিউটিভ অফিসারদের সাথে ও অরহেডের সরাসরি কোন যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় না। আমার ধারণা, ওরা কিছু জানে না।
কেউ না কেউ নিশ্চয়ই জানে।
নিঃশব্দে হাসল রয় ওরশিয়া। অ্যাসেম্বলি লাইন ওয়ার্কারদের মধ্যে মাত্র দুজনের জানার কথা।
মাত্র দুজন কেন?
অ্যাসেম্বলি লাইন ওয়ার্কারদের মধ্যে একজন গাড়িতে এয়ারকন্ডিশনার বসানোর কাজ তদারক করে। তার যা পজিশন, ওয়ারহেড বসানোর জন্যে নির্দিষ্ট একটা গাড়ি বাছাই করার সুযোগ একমাত্র তারই আছে। দ্বিতীয় লোকটা হল ইন্সপেক্টর, যার কাজ ডিলারের কাছে গাড়িগুলো পাঠানোর আগে চেক করে দেখা ইউনিটটা ঠিকমত কাজ করছে কিনা। এয়ারকন্ডিশনার কাজ করছে না জানা সত্ত্বেও রিপোর্ট দেয়, সব ঠিক আছে।
তৃতীয় একজনও থাকার কথা, বললেন মার্ভিন শওয়াল্টার। কারখানার কমপিউটারাইজড শিপিং ডিপার্টমেন্টে। সে গাড়ি-বোমার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলে। শুধু বিল অভ লেডিং ছাড়া, কারণ বিদেশী কাস্টমস অফিসারদের ওটা দেখাতে হবে।
